গণভোট: উত্তর কলম্বিয়ায় শান্তির নামে প্রহসন বনাম শ্রেণী সংগ্রামের ধারা

Posted: নভেম্বর 14, 2016 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , ,

লিখেছেন: অজয় রায়

কলম্বিয়ায় গত ২ অক্টোবর বামপন্থী এফএআরসি (ফার্ক) বিদ্রোহীদের সঙ্গে সেদেশের দক্ষিণপন্থী সরকারের শান্তিচুক্তি গণভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ফলাফলে ৫০.২ শতাংশ না ভোট পড়েছে এবং ৪৯.৮ শতাংশ হ্যাঁ ভোট পড়েছে।[] স্পষ্টতই চরম দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলির দাপট বাড়ায় সেদেশে মেরুকরণ তীব্র হচ্ছে। আর সংকট ঘনাচ্ছে। এদিকে সম্প্রতি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কলম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি হুয়ান ম্যানুয়েল সান্টোস। যদিও তিনি পূর্বতন আলভারো উরিবে সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালে ফল্স পজিটিভ কেসের মতো বিভিন্ন গণহত্যায় মদত দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

যেটা লক্ষণীয়, কলম্বিয়ার গণভোটে ব্যবধান ছিল মাত্র ০.৪ শতাংশ। এই গণভোটের ফলাফল অনুসারে চলাও আইনত বাধ্যতামূলক ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি সান্টোস শান্তিচুক্তি বিরোধী শিবিরের নেতা সেদেশের পূর্বতন রাষ্ট্রপতি আলভারো উরিবের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে এখন চুক্তিটিতে বড় রকমের পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করছেন। আর এফএআরসি’র সঙ্গে এনিয়ে আলোচনা চালাচ্ছেন। যখন অস্ত্রবিরতি শেষ হতে চলেছে ডিসেম্বরে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি থেকে মানুষের নজর ঘুরিয়ে দিতেই শাসকশ্রেণী শান্তির নামে বিভ্রম তৈরি করছে। মুখে শান্তির কথা বললেও কলম্বিয়ার শাসকশ্রেণীর উভয় গোষ্ঠীরই প্রকৃত উদ্দেশ্য বামপন্থী এফএআরসি গেরিলাদের এবং সেই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ জনআন্দোলনকারীদেরকেও আত্মসমর্পণ করানো। আর তার পর ক্রমে তাদের ধ্বংস করা। গত চার বছর ধরে যেমন কিউবা ও নরওয়ের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা চলাকালে আংশিক অস্ত্রবিরতির অবস্থার সুযোগ নিয়ে সরকারি বাহিনী ও দক্ষিণপন্থী প্যারামিলিটারি গোষ্ঠীগুলি নিজেদের পুন:সংগঠিত করেছে। দেশীবিদেশী ধনিক শ্রেণীর স্বার্থে এলাকা দখলের তৎপরতাও বাড়িয়েছে। শাসক মহলের মদতপুষ্ট প্যারামিলিটারি ঘাতকবাহিনী লাগাতার সন্ত্রাস, হত্যা, হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এর মধ্যেই কলম্বিয়ায় ২০১৫ সালে ট্রেড ইউনিয়নের কর্মী খুনের ২০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে যেকোনো দেশের মধ্যে যা সর্বোচ্চ সংখ্যক।[] সেদেশে মানবাধিকার রেকর্ডও খুবই খারাপ।

গত ২৬শে সেপ্টেম্বর শান্তিচুক্তিতে সই করেছিলেন রাষ্ট্রপতি সান্টোস এবং রেভলিউশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়ার (এফএআরসি) নেতা টিমোলিওন হিমেনেজ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কলম্বিয়ায় ৫২ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে ২৬০,০০০ মানুষ মারা গেছেন। বাস্তুহারা হয়েছেন প্রায় ৭০ লাখ।[] গৃহযুদ্ধের শিকার হয়েছেন আনুমানিক ৮০ লাখ মানুষ। আর শতকরা ৮০ ভাগ নির্যাতনের ঘটনার ক্ষেত্রেই অভিযোগের আঙুল উঠেছে দক্ষিণপন্থী প্যারামিলিটারি বাহিনীর দিকে।[]

বর্তমানে আলোচিত শান্তিচুক্তিটি মোতাবেক এফএআরসি গেরিলাদের কলম্বিয়ার প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের নির্দেশিত একটি প্রক্রিয়ার অধীন হতে হবে। তাঁদের অস্ত্র সমর্পণ করে বাস করতে হবে জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে অস্থায়ী শিবিরে। যা কার্যত মুক্ত কারাগার বলেই মনে করছেন গেরিলাদের একাংশ। প্যারামিলিটারি ঘাতকবাহিনীর হিংস্র তৎপরতার প্রেক্ষিতে এভাবে থাকাটা কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা। আশির দশকেও যেমন কলম্বিয়ার সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনার ভিত্তিতে এফএআরসি প্রকাশ্য রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিল। আর প্যাট্রিওটিক ইউনিয়ন নামে একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করেছিল। কিন্তু তখন তাঁদের কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিল সরকারি বাহিনী ও দক্ষিণপন্থী প্যারামিলিটারি গোষ্ঠীগুলি।

প্রস্তাবিত শান্তিচুক্তিটি অনুসারে, নিবন্ধনভুক্ত গেরিলারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত কিনা, তাও তদন্ত করে দেখা হবে। যেক্ষেত্রে বিচারে তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ। আর শান্তিচুক্তিটিতে অন্তর্ভুক্ত থাকা ‘কৃষি সংস্কার’ কেবল কিছু গ্রামীণ পরিকাঠামো কার্যক্রমের প্রতিশ্রুতি। স্পষ্টতই নয়াউদারবাদী নীতি অনুসরণকারী কলম্বিয়ার সরকারের পক্ষে কখনও প্রকৃত ভূমিসংস্কার করা সম্ভব নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ১৯৬৪ সালে এফএআরসি গেরিলা বাহিনীর জন্ম হয়েছিল।[] তাদের মূল লক্ষ্য ছিল কলম্বিয়ার ভূমি ও সম্পদের উপর একচেটিয়া অধিকারের অবসান ঘটানো। যদিও সেই আর্থসামাজিক সমস্যা এখনও রয়ে গিয়েছে। কলম্বিয়ার বর্তমান বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটাতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ শান্তিচুক্তিটিতে অন্তর্ভুক্ত নেই। কেবল এফএআরসি সংগঠনকে বেসামরিক রাজনৈতিক দলে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আর আত্মসমর্পণের বিনিময়ে এফএআরসি (তার নেতারা) ২০২৬ সাল অবধি কলম্বিয়ার সংসদে ১০টি সংরক্ষিত আসন পেতো[]

মার্কসবাদী এফএআরসি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা নেতা ছিলেন ম্যানুয়েল টিরোফিজোমেরুল্যান্ডা। তিনি প্রয়াত হন ২০০৮ সালে। তাঁর নেতৃত্বাধীন গেরিলা বিহিনীটিতে গত দশকের গোড়ায়ও ছিল ২০ হাজার যোদ্ধা। যারা সেদেশে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ এলাকার উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছিলেন।[] কিন্তু মাদকবিরোধী যুদ্ধের অজুহাতে বামপন্থী গেরিলাদের দমন করতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিশেষ করে গত দেড় দশক ধরে কলম্বিয়ার সরকারকে বিপুল সামরিক সাহায্য দিয়েছে প্ল্যান কলম্বিয়াঅনুসারে। যার পরবর্তী সংস্করণ পাজ কলম্বিয়াচলছে এখনও। ফলে এফএআরসি কিছুটা দুর্বল হয়েছে। এখনও অবশ্য তাদের বাহিনীতে রয়েছে সাত হাজার যোদ্ধা।[] আর তাদের প্রভাবাধীন কলম্বিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল কার্যত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। শান্তিচুক্তিটির মাধ্যমে এফএআরসি আত্মসমর্পণ সম্পন্ন হলে এই সমস্ত এলাকাতেই দেশীবিদেশী বড় ব্যবসায়িক সংস্থাগুলির প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবসম্পদ শোষণের পথ আরও সুগম হবে বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা।

তবে এফএআরসি গেরিলা বাহিনীর মূল শাখাগুলির অন্যতম আর্মান্দো রিয়স ফার্স্ট ফ্রন্ট গত জুলাইতেই ঘোষণা দিয়েছে, তারা অস্ত্র সমর্পণ করবেন না। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন তারা।[] এই শাখাটির মতে, কলম্বিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলির প্রকৃত সমাধানের চেষ্টা না করে কেবল বিদ্রোহীদের নিরস্ত্র করতে চাইছেন রাষ্ট্রপতি সান্টোস।

এদিকে, বিপ্লবী সংগ্রামে থাকতে চান এফএআরসি যেসব যোদ্ধারা, তাদের একাংশ কলম্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্রোহী বাহিনী ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মিতে (ইএলএন) যোগ দিতে পারেন বলেও খবর মিলছে সংবাদমাধ্যম সূত্রে। যখন সম্প্রতি বামপন্থী সংগঠন ইএলএনএর সঙ্গে শান্তি আলোচনা বিলম্বিত করেছে সান্টোস সরকার।

তথ্যসূত্র

[] Deep divisions apparent in Colombia as citizens reject FARC peace deal”, October 3, 2016, Xinhua

[] ITUC GLOBAL RIGHTS INDEX 2016 – THE WORLD’S WORST COUNTRIES FOR WORKERS”, International Trade Union Confederation (ITUC) Report 2016

[] Colombia announces end of world’s longest conflict”, September 22, 2016, Xinhua

[]Fragile Peace: Another Campesino Activist Murdered in Colombia”, November 2, 2016, Telesur

[] FARC-EP: Colombian Guerrillas Who Waged the World’s Longest War”, Telesur

[] Patrick Oppmann, “FARC-Colombia peace deal finalized”, August 25, 2016, CNN

[] Manuel “Tirofijo” Marulanda: Father of the FARC”, March 26, 2016, Telesur

[] Jacobo Garcia, “Farc: Meet Colombia’s rebel fighters preparing for peace after more than half-century of conflict with government”, 28 January, 2016, The Independent

[] Sylvia B. Zarate, “Fears grow about FARC internal strife over Colombian peace deal”, July 19, 2016, Xinhua

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s