লিখেছেন: অজয় রায়

%e0%a6%ab%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b2-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%8bগত ২৫ নভেম্বর কিউবা বিপ্লবের শীর্ষ নেতা ও দেশটির সাবেক রাষ্ট্রপতি ফিদেল কাস্ত্রো রুজ প্রয়াত হয়েছেন।[] বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তিনি ছিলেন বিংশ শতকের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিদ্রোহের এক মূর্ত প্রতীক। সুপারপাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দোরগোড়াতেই কিউবায় তিনি গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে সরকার পরিচালনা করেছিলেন। তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা হয়েছে অনেকবার। হত্যার চেষ্টাও হয়েছে। ২০০৬ সালের জুলাইয়ে অবশ্য ফিদেল অসুস্থতার দরু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব হস্তান্তর করে দেন তাঁর ভাই রাউল কাস্ত্রোকে, যিনি সে সময় কিউবার উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন।[]

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৫৯ সালে কিউবায় গেরিলা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মার্কিন মদতপুষ্ট স্বৈরশাসক ফুলগেন্সিও বাতিস্তার শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে ফিদেলের বাহিনী।[] তাঁর নেতৃত্বাধীন ‘২৬শে জুলাই আন্দোলন’ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, জাতীয়তাবাদী চরিত্রের ছিল। যা তখন বিশেষত গ্রামীণ সর্বহারার একাংশের (ক্যাম্পেনসিনোস) সমর্থনও পেয়েছিল। আর ফিদেল গভীরভাবে সাইমন বলিভার এবং কিউবার বিপ্লবী কবি হোসে মার্তির দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। কিউবায় মার্কিন নব্য উপনিবেশবাদের অবসান ঘটানোর বিপ্লবী সংগ্রামে তাঁর প্রধান সহযোগী ছিলেন চে গেভারা, ক্যামিলো এবং রাউল কাস্ত্রো।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার মুখেও কিউবার বিপ্লবী সরকার শিল্পসংস্থাগুলির জাতীয়্করণের পথে হাঁটে। বিপ্লব সমাজতন্ত্র অভিমুখী রূপান্তরের লক্ষ্যে উদ্যোগ নিতে শুরু করে। তবে তা সেই থেকে রূপান্তর পর্বেই রয়ে গেছে। যার কারণ স্পষ্ট: ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটির সামনে তখন দুটো রাস্তা খোলা ছিল। ওয়াশিংটনের কাছে আত্মসমর্পণ করা। কিংবা মস্কোর সাহায্য নিতে যাওয়া। কিউবা হেঁটেছিল দ্বিতীয় পথে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কিউবার উপর চাপ তৈরি করে। প্রতিবিপ্লব সংঘটিত করার অপচেষ্টায় মদত দেয়। দেশটির উপর অর্থনৈতিক অবরোধও আরোপ করে ওয়াশিংটন; যা এখনও জারি রয়েছে। ফলে, ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটিকে তখন সংশোধনবাদী ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য নিতে হয়। পরিণতিতে, কিউবার অনেক সীমাবদ্ধতাও দেখা গেছে, বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক চীনের মধ্যে মহাবিতর্কের প্রেক্ষিতে। তাছাড়া মার্কিন ষড়যন্ত্র মোকাবিলার জন্য কিউবায় কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হয়। যা নাগরিক স্বাধীনতা বিকাশে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। আমলাতান্ত্রিকতাও বেড়েছে। সেইসঙ্গে ক্রমবর্ধমান অরাজনৈতিক প্রবণতা লক্ষণীয়।

তবে যাবতীয় প্রতিকূলতার মধ্যেও নিঃস্বার্থ, নির্লোভ, সৎ মনোভাবাপন্ন ফিদেলের নেতৃত্বাধীন কিউবার সরকার সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সম্পদের সুষম বন্টনের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রগতিশীল সংস্কারের পদক্ষেপ নেয়। বিশ্বমানের স্বাস্থ্য পরিষেবা, সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা এবং জাতিগত ও লিঙ্গগত সমতা প্রতিষ্ঠা করে। বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে সেদেশে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে কিউবা। বিশ্বের নানা প্রান্তে চিকিৎসক, শিক্ষক ও বিজ্ঞানী পাঠিয়ে সহায়তা করেছে। আর আফ্রিকার স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তা জুগিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামিল হয়েছে। ‘আফ্রিকার স্তালিনগ্রাদ’ কুইটো কুয়ানাভালের লড়াই যেমন বিশেষভাবে স্মরণীয়। সংশোধনবাদী সোভিয়েত নেতৃত্বের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েই এ্যাঙ্গোলাকে সাহায্য করেছিল কিউবা।

চে গেভারাও সংশোধনবাদী সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতির সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর চিন্তাধারার এখনও প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে বলেই মনে করেন কমিউনিস্ট মহলের একাংশ। কিউবায় ১৯৮০র দশকের মধ্যভাগে ‘শুদ্ধিকরনের’ সময় চের বিশ্লেষণগুলি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যার ভিত্তিতে তখন সোভিয়েত মডেল থেকে সরে আসারও চেষ্টা করে কিউবা। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের পরে ১৯৯১ সালে তীব্র আর্থসামাজিক সংকটের মধ্যে পড়ে দেশটি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তৎপরতাও বাড়ে। তবে নয়াউদারবাদী ধনবাদের নীতি বিপর্যয় ডেকে আনে। পরিণতিতে, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রগতিশীল আন্দোলনের শক্তি বাড়ে লাতিন আমেরিকায়। সরকার বদল হয় ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া ও ইকুয়েডরের মতো দেশগুলিতে। এ অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংহতি জোরদার হয়। যা কিউবার জন্য সহায়ক হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিককালে এই প্রগতিশীল আন্দোলনে ভাটার টান দেখা যাচ্ছে। কিউবার বৈদেশিক আয়ের একটা বড় অংশ যেখান থেকে আসে, সেই ভেনেজুয়েলায় যেমন সংকটের ছায়া ঘনিয়েছে। ফলে কিউবার উপর চাপ বাড়ছে।

আর এরমধ্যেই কিউবার সংস্কারের বর্তমান অভিমুখ বিষয়ক বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করেছে। ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের ধারণা, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও শৃঙ্খলা বৃদ্ধির ব্যাপারে উপযুক্ত গুরুত্ব দেওয়ার পরিবর্তে সেদেশের সরকার তথা শাসক দলের একটা প্রভাবশালী অংশ জোর দিচ্ছে বাজারমুখী সংস্কারে। ইতিমধ্যেই যেমন ব্যাপক হারে সরকারি কর্মচারী ছাঁটাই করা হয়েছে। আর বেসরকারীকরণের গতি বৃদ্ধি করা হচ্ছে। সেইসঙ্গে বাড়ছে অসাম্য। বহু প্রবাসী কিউবান স্থাবর সম্পত্তি কিনছেন কিউবায়। আবাসন ক্ষেত্রের বাণিজ্যিকরণ করা হয়েছে, যাতে আইনি অধিকার বদল করা ছাড়া সরকারের তেমন কোন ভূমিকা নেই। বেসরকারী বিক্রেতা ও ক্রেতাদের মধ্যে লেনদেন থেকে সরকারের আয়ের ব্যবস্থা হতে পারে এমন রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত কোন বাজার প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। এর পাশাপাশি অবশ্য আরও সমবায় তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে সেদেশে। তবে বাজারীকরণ বৃদ্ধির কারণে সমস্যা হওয়ার যথেষ্ট সম্ভবনা রয়েছে।

স্পষ্টতই মিশ্র বাজার অর্থনীতির প্রসার ঘটানো হচ্ছে কিউবায়। যা তথাকথিত ‘সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতির’ ধাঁচে পূর্ণমাত্রায় পুঁজিবাদ পুন:প্রতিষ্ঠা করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। এদিকে কিউবা ও আমেরিকা আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। তবে যেটা লক্ষণীয়, কিউবার জনসাধারণ চাইছেন, সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলি বজায় রাখা হোক। যখন ফিদেলহীন কিউবার ভবিষ্যৎ প্রশ্নচিহ্নের মুখে, উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলা করে অর্জিত অধিকার রক্ষার লড়াইকে জোরদার করার ক্ষেত্রে চে গেভারার চিন্তাধারা পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তাও অনুভূত হচ্ছে।

১৫/১২/২০১৬

তথ্যসূত্র

[] “Fidel Castro: A Latin American Legend”, November 25, 2016, Telesur

[] Ibid

[] Ibid

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s