Posts Tagged ‘পিসিপি’


লিখেছেন: অভয়ারণ্য কবীর

১৮ আগস্ট খাগড়াছড়িতে নিহত হলেন সাত জন আদিবাসীএর আগে ১৪ আগস্ট চার জন আদিবাসীকে অপহরণেপর জনগণের প্রতিরোধের মুখে তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় অপহরণকারীরা। অপহরণের প্রতিবাদে ১৮ আগস্ট ছিল ইউপিডিএফের (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট) নেতৃত্বে সমাবেশ। ইউপিডিএফের নেতাকর্মীরা সকাল থেকেই স্বনির্ভর বাজারে অবস্থিত সংগঠনের অফিসে জড়ো হচ্ছিলেন। সকাল সাড়ে আটটার দিকে একদল বন্দুকধারী তাদের উপর এলোপাথাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে নিহত হন ছয় জন। আরও কয়েকজন আহত হন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন পিসিপির (পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ) নেতা তপন চাকমা। তিনি বেশ অগ্রসর চিন্তা ধার করতেন। বিপ্লবী রাজনৈতিক মহলেও আন্তরিক এ নেতা বেশ পরিচিত ছিলেন।

নিশ্চিতভাবেই এটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। যা শুরু হয়েছে বহুদিন আগেই। পাহাড়ে বিদ্যমান অশান্তির মূলে রয়েছে সেনাবাহিনী। রাষ্ট্রের অনুমতি সাপেক্ষে তারা পাহাড়ে অঘোষিত সেনা শাসন জারি রেখেছে। আর সেখানে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ ছাড়া এ হামলা যে সম্ভব নয়, তা বলাই বাহুল্য। কারণ দুদফায় হামলা করেছে সন্ত্রাসী চক্র। স্বনির্ভর বাজারে বিজিবি পুলিশ ক্যাম্প রয়েছে। তাদের সামনেই কিভাবে হামলা চালালো সন্ত্রাসীরা? বিজিবি ও পুলিশ কেন কোনো অ্যাকশন নিলো না? এ প্রশ্নগুলো পাহাড়ি জনগণ তুলছেন। প্রশ্নগুলো যৌক্তিক এবং অতীতের ধারাবাহিকতায় এটাও যে সেনা মদদপুষ্ট, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না!

তপনদের রক্ত বৃথা যাবে না

পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরেই সেনামদদে পাহাড়িদের মধ্যে বিভক্তি ও সংঘাতের রাজনীতি চলমান রয়েছে। পাহাড়িদের মধ্যে ডিভাইড এন্ড রুল তত্ত্বের প্রয়োগ করা হয়েছেপাহাড়িদের হাতে পাহাড়িদের হত্যা করিয়ে পাহাড়ের শক্তিকে দুর্বল ও ভঙ্গুর করে দেয়া এ নীতির উদ্দেশ্য। সম্প্রতি ইউপিডিএফের নেতৃস্থানীয় সংগঠক মিঠুন চাকমাকে বাড়ির সামনে থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। গত ১০ মাসে একের পর এক হামলাপাল্টা হামলার ঘটনায় অন্তত ৩৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ লাশের মিছিল নতুন করে ভাববার বাস্তবতা সামনে এনেছে। পাহাড়ের সংগ্রামকে সারসসংকলন না করে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। প্রকৃত বন্ধু শত্রুদের সম্পর্কে নতুন করে না ভাবতে পারলে সংগ্রাম বারবার বিপর্যয়ের দিকেই ধাবিত হবে। আমরা হারাবো আন্তরিক নেতৃত্বকে। যারা প্রকৃতই পাহাড়ের নিপীড়িত জনগণের পক্ষে লড়াই করতে এসেছিলেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়। মুক্তিযুদ্ধে এদেশের বাঙালি জনগণের সাথেই পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীরাও অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু এর বিপরীতে রাষ্ট্র তাদের কিছুই দেয়নি। জনগণের নূন্যতম মৌলিক অধিকার বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি। জনগণের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, বিদেশের কর্তৃত্বহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার, শোষণ মুক্তির কোনোটা পূরণ হয়নি। এখানে কখনো সোভিয়েতের, কখনো আমেরিকার আবার কখনো বা ভারতের অথবা চীনের মদদে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে।

যে বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তির লড়াই করেছে, সেই দেশের কথিত স্বাধীন সরকার ১৯৭২ সালেই বাংলাদেশেসকল জাতিসত্তার মানুষকে বাঙালি বানাতে চেয়েছিলেন। অন্যান্য জাতিসত্তাকে স্বীকৃতি পর্যন্ত দেয়নি। ১৯৭২ সাল থেকেই পাহাড়ে জাতিসত্তাসমূহ লড়াই চালিয়ে আসছে। পাহাড়ে বাংলাদেশের সকল সরকার নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। লোগাং, লংগদু থেকে শুরু করে অসংখ্য গণহত্যা পাহাড়ে সংগঠিত হয়েছে। পাহাড়ের প্রশ্নে এদেশের শাসকশ্রেণীর সকল অংশের ভূমিকা একই রকম। পাহাড়ের জনগণ এ সমস্ত নিপীড়নের বিরোধিতা করে আসছেন ধারাবাহিকভাবে। আজ পাহাড়ে দিনেরাতে নিপীড়নের স্বীকার হচ্ছেন। পাহাড়ী নারীরা ধর্ষিত হচ্ছেন, খুন হচ্ছেন। তাদের মিটিংমিছিল, সভাসমাবেশ করার অধিকার দেয়া হচ্ছে না। কল্পনা চাকমাদের কোনো খোঁজ রাষ্ট্র দিতে পারেনি আজও। কিলোমিটার প্রতি পর পর সেনাক্যাম্প বসিয়ে পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীকে সামরিক শাসনের ভেতরে রাখা হয়েছে।

বাঙালি গরীব জনগণকে পাহাড়ে পুনর্বাসন করে কৃত্রিমভাবে দাঙ্গা তৈরি করার সকল চক্রান্ত বাস্তবায়ন করে চলেছে বাঙালি ধনিকশ্রেণীর সরকারগুলো। সেটেলারদেরকে জাতিগত উসকানি দিয়ে শাসকগোষ্ঠী ও সেনাবাহিনী সেখানে শক্ত সামরিক ঘাঁটি বানিয়েছে। পাহাড়ীদের নিজেদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে সেটেলারদের বসানো হয়েছে এ প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে।

সবের বিরুদ্ধে পাহাড়ের জনগণ বিভিন্নভাবে আন্দোলন করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রকৃত জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারেননি। তারা একই বৃত্তে ঘুরপাক খেয়ে চলেছেদীর্ঘদিন ধরেঅতিসত্তর পাহাড়ের সংগ্রামকে এ বৃত্ত থেকে বের করে আনা দরকার

পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে যে সংগ্রাম চলছে, তাকে ভাতৃঘাতী সংঘাতে পরিত করতে পেরেছে শাসকশ্রেণী। তারা পাহাড়ে যেমন নব্য পাহাড়ী আমলাদালাল তৈরি করেছে। তেমনি তৈরি হয়েছে নানা রঙের বুর্জোয়া। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ সন্তু লারমা। তারা পাহাড়ের জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কিন্তু এর বিপরীতে যারা দাঁড়াতে চেয়েছিল সেই ইউপিডিএফও এখন পর্যন্ত সঠিক বিপ্লবী দিশা হাজির করতে পারেনি। বরং পাহাড়ের বিরোধী দলের মতো করে গড়ে উঠেছে। যদিও ইউপিডিএফের মধ্যেই পাহাড়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নবীন মানুষ রয়েছেন, যারা পাহাড়কে নিপীড়নমুক্ত করতে চান। তাঁদের এখন নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ ইউপিডিএফ এবং অন্যান্য সব গ্রুপই পাহাড়ের লড়াইকে পথ দেখাতে পারছে না।

আসুন, একটু লক্ষ্য করি উপরের কথাগুলো সত্য নাকি মিথ্যা! গত কয়েক বছরের কথা যদি আমরা পুনর্মূল্যায়ন করি তাহলে দেখবো পাহাড়ে শুধু পাহাড়ি জনগণই হত্যার্ষণের স্বীকার হচ্ছেন। এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। উপরন্তু পাহাড়ে নিজ জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেই সংঘাত চলছে। এখানে লাভবান হচ্ছে কে? লাভবান হচ্ছে সেনাবাহিনী, বাঙালি ধনী বুর্জোয়া এবং পাহাড়ি নব্যদালাল ধনীকশ্রেণী

মাও সেতুঙ বলেছিলেন, কে শত্রু আর কে মিত্র এই বিষয়টি ঠিক করাই হচ্ছে সংগ্রামের মূল বিবেচ্য দিক।

এক্ষেত্রে পাহাড়ে শত্রু হলো সেনাবাহিনী, বাঙালি ধনিক শাসকশ্রেণী এবং পাহাড়ের নব্যদালাল বুর্জোয়াশ্রেণী। আর বন্ধু বা মিত্র কারা? পাহাড়ের ব্যাপক নিপীড়িত জনগণ, সমতলের ব্যাপক নিপীড়িত জনগণ, প্রকৃত বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠনযারা প্রকৃতই পাহাড়ের শোষণমুক্তির পক্ষে। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকবে পাহাড়ের সর্বহারাশ্রেণী।

পাহাড়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এখানে যাদের সেটেল করা হচ্ছে তারাও মূলত শত্রু শিবিরের নয়। পাহাড়ে যেসব বাঙালিকে সেটেল করা হয়েছে, তারাও সমতলে নিপীড়িত। তারা সেনা মদদে বাধ্য হয়েই সেটেল হচ্ছেন। এদের মধ্যকার মানবিক, সবচেয়ে নিপীড়িত অংশটি সংগ্রামের শত্রু নয়। জমি দখলের প্রশ্নে প্রতিরোধ যদিও অনিবার্য। কিন্তু তারা জনগণেরই আরেকটি নিপীড়িত অংশ। তাদেরকে চোখ বন্ধ করে শত্রুর কাতারে ফেলে দেয়াটা হবে মারাত্বক ভুল। যা শাসকরা সব সময়েই চাইবে। পাহাড়ে দীর্ঘদিন আগে সেটেল হওয়া বাঙালিদের মধ্যে অনেকেই এখন লুটপাটের মধ্য দিয়ে নব্যধনীকশ্রেণীতে পরিণত হয়েছে। মূলত তারাই শাসকশ্রেণীর পক্ষে উগ্রবাঙালি চেতনার প্রয়োগকারী, বিভেদ সৃষ্টিকারী। এদের বিরুদ্ধেও লড়াইয়েও নিপীড়িত বাঙালিরা মিত্রশক্তি। অর্থাৎ লড়াইটা হবে শ্রেণীর লড়াই এবং শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। কিন্তু বর্তমানে তা হচ্ছে না।

সারাবিশ্বেই আজ জাতিগত লড়াই সংকীর্ণ আকার ধার করেছে। উগ্রজাতীয়তাবাদ কোনো সমাধান হতে পারে না। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে আরেক জাতীয়তাবাদ কখনো মুক্তি দিতে পারে না। রুশ বিপ্লব এবং চীন বিপ্লব তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে! এর পরেও আমাদের দেশের পাহাড়ি নেতৃত্ব এটা বুঝতে ব্যর্থ হলে, তা হবে হতাশাজনক। তারা এখনো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেই ঘুরপাক খাচ্ছেন। এটাকে বৃহত্তর লড়াইয়ে পরিণত করতে পারেননি।

বৃহত্তর লড়াইয়ে পরিণত করতে হলে অবশ্যই মাওবাদী বিপ্লবী পথ অবলম্বন করতে হবে প্রকৃত শত্রুর বিরুদ্ধে প্রকৃত মিত্রকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

এক্ষেত্রে আমাদের শিখতে হবে ভারতের মাওবাদী পার্টির নেতৃত্বে মধ্যভারতে আদিবাসী জনগণের সংগ্রাম থেকে। তারা কিভাবে জাতিগত লড়াইকে একটি বৃহত্তর দিকে এগিয়ে নিয়েছেন, তা থেকে আমাদের ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হবে এবং পাহাড়েও নতুন ভিত্তিতে লড়াইকে জোড়দার করতে হবে। পাহাড়সমতলের সমগ্র নিপীড়িত জনগণ এক হয়ে এই শোষণমূলক রাষ্ট্র উচ্ছেদ করে, গড়ে তুলতে হবে এক মানবিক, নয়াগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রএছাড়া শহীদ তপন চাকমাদের রক্ত বৃথা যাবে। আমরা তা হতে দিতে পারি না। আমাদের অবশ্যই তপন চাকমাদের আত্মত্যাগকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে বৃহত্তর সংগ্রামের জন্যই প্রস্তুত হতে হবে।

পাহাড় থেকে সেনা শাসন তুলে নিতে হবে!

অবিলম্বে সেটেলার বাঙালিদের অন্যত্র সম্মানজনক পুনর্বাসন করতে হবে!

পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি থেকে আদিবাসী উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে!

জঙ্গলের অধিকার আদিবাসীদের হাতে দিতে হবে!

Advertisements

মতাদর্শগত প্রশ্নে

সংকলন: শিহাব ইশতিয়াক সৈকত

(পূর্ব প্রকাশের পর…)

এল দিআরিও: চেয়ারম্যান, পেরুতে সংশোধনবাদের প্রবক্তা কে?

চেয়ারম্যান গনজালো

চেয়ারম্যান গনজালো:ইউনিটি’ বলে একখানা পত্রিকা, যা প্রকাশ করে বা করতো সোভিয়েত সংশোধনবাদের দালাল তথাকথিত পেরুর কমিউনিস্ট পার্টির চাঁচাছোলা সংশোধনবাদী নেতা যোরগে দেল প্রাদোযিনি ‘সময় সাপেক্ষ বিপ্লবী’ বলেও পরিচিত। দ্বিতীয়তঃ জন দেংএর স্তাবক ও চীনা সংশোধনবাদের সেবক পত্রিকা রোজা। দ্বিতীয় জন দেংএর স্তাবক ও চীনা সংশোধনবাদের সেবক পত্রিকা রোজা।

এল দিআরিও: আপনি কি মনে করেন পেরুর জনগণের মধ্যে সংশোধনবাদের প্রভাব থাকায় পেরুর বিপ্লব বিঘ্নিত হচ্ছে?

চেয়ারম্যান গনজালো: যদি আমরা লেনিনের শিক্ষা এবং চেয়ারম্যান মাও যার উৎকর্ষ সাধন করে গেছেন এবং বিকাশের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন, তা গ্রহণ করে থাকি – তাহলে দেখতে পাই সংশোধনবাদ নামক বুর্জোয়াদের এই দালাল সর্বহারা শ্রেণীর মধ্যে বিরাজ করে তাদের মধ্যে বিভাজনের বিষ ছড়ায়। এরা কমিউনিস্ট আন্দোলন ও কমিউনিস্ট পার্টিতে ভাঙ্গন সৃষ্টি করে। এরা ট্রেড ইউনিয়নে ভাঙ্গন ধরায় এবং গণআন্দোলনকে টুকরো টুকরো করে বিপর্যস্ত করে।

সংশোধনবাদকে ক্যান্সার রোগ বলা চলেতাই এই রোগকে নির্মমভাবে ছেঁটে ফেলা দরকার। তা না হলে বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবেনা। লেনিনের কথায় বলতে গেলে সারসংক্ষেপে বলতে হয়আমাদের দুটো জিনিসের উপর লক্ষ রাখা দরকার তা হচ্ছে আক্রমণাত্মক বিপ্লবী কর্মকাণ্ড আর সুবিধাবাদ ও সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে বিরামহীন সংগ্রাম। (বিস্তারিত…)


মতাদর্শগত প্রশ্নে

সংকলন: শিহাব ইশতিয়াক সৈকত

(পূর্ব প্রকাশের পর…)

এল দিআরিও: আমরা এবার অন্য প্রশ্নে চলে আসছি। আচ্ছা সর্বহারার মতাদর্শ বলতে আমরা কী বুঝি এবং সমাজজীবনে আজকের দিনে এটা কী ভূমিকা পালন করছে? মার্কস, লেনিন ও মাওএর ধ্রুপদী চিন্তা বলতে পিসিপি কী বোঝে?

চেয়ারম্যান গনজালো

চেয়ারম্যান গনজালো: আগামীদিনের এবং এই যে ঝঞ্ঝামুখর দিনগুলোতে আমরা হাঁটা চলা করছিআমরা দেখতে পাচ্ছি সর্বহারার মতাদর্শ অত্যন্ত বেশি গুরুত্ব অর্জন করে বহু বহু দূর এগিয়ে গেছে। যদিও বিষয়টি আমাদের প্রত্যেকেরই জানা তবুও যে বিষয়টির ওপর আমি প্রাধান্য আরোপ করছি তা হচ্ছে শ্রেণীবিভক্ত সমাজে সব থেকে অগ্রগামী শ্রেণীর তত্ত্ব ও প্রয়োগের ভূমিকা। বিশ্বের সর্বহারা সংগ্রামের ফসল হচ্ছে সর্বহারার মতাদর্শ। এটা পড়লে আমরা অনুভব করি সর্বহারা শ্রেণীর আবির্ভাবের আগে শ্রেণীসংগ্রামের ঐতিহাসিক ধারার অধ্যয়ন ও অনুধাবনের প্রয়োজন। বিশেষ করে কৃষকদের সেই বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের কথাযে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় এই সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছে, তা বোঝবার জন্য উন্নত স্তরের পড়াশুনা ও মননশীলতা দরকার। এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, মার্কসের যুগান্তকারী সৃষ্টি সর্বহারার মতাদর্শ, আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গীর যে সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শনে মানুষ আজ সমৃদ্ধ, এমন একটা সম্পদ যা মানুষ আবার কবে লাভ করবে কে জানে। বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গীর এমন একটা বৈজ্ঞানিক মতাদর্শ মানবজাতি বিশেষ করে আমাদের শ্রেণী তথা জনগণ কারায়ত্ত করেছে যেটা তত্ত্ব ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের কাছে একটা হাতিয়ার হয়ে উঠেছে যার সাহায্যে পৃথিবীটা পাল্টে দেয়া দেয়া সম্ভব হয়ে উঠেছে। এখন আমরা দেখতে পাচ্ছিযে সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন এবং যে মন্তব্য তিনি করেছিলেনসেইসব মন্তব্য সত্যে রূপান্তরিত হচ্ছে। মার্কসবাদ নিয়ত সমৃদ্ধ হয়ে মার্কসবাদলেনিনবাদএ পরিণত হয়েছে এবং বর্তমানে এর মার্কসবাদলেনিনবাদমাও সেতুংএর চিন্তায় উত্তরণ হয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি এটাই একমাত্র মতাদর্শযা গোটা দুনিয়াকে পাল্টে দিয়ে বিপ্লব ঘটাবে। (বিস্তারিত…)


মতাদর্শগত প্রশ্নে

সংকলন: শিহাব ইশতিয়াক সৈকত

(পূর্ব প্রকাশের পর…)

এল দিআরিও: চেয়ারম্যান, পিসিপি, মাওবাদ ইত্যাদি আদর্শগত ভিত্তির উপর আমাদের মধ্যে একটু আলোচনা করা যাক। মাওবাদকে মার্কসবাদের তৃতীয় স্তর বলে আপনি চিহ্নিত করেন কেন?

চেয়ারম্যান গনজালো

চেয়ারম্যান গনজালো: এটা একটা অত্যন্ত কঠিন প্রশ্ন এবং প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ। আমাদের কাছে মার্কসবাদ হচ্ছে উন্নয়নের একটি ধারা। এই মহান ধারা আমাদের উচ্চতম পর্যায়ের তৃতীয় নতুন এক স্তর উপহার দিয়েছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে মাওবাদ নামে এই উচ্চতম পর্যায়ে তৃতীয় এক নতুন স্তরে আমরা উপনীত হয়েছি এমন মনে করার কারণ কী? চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ মার্কসবাদের তিনটি উপাদানকেই উন্নত পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। এটা পরীক্ষা নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে বলেই একে আমরা মার্কসবাদের তৃতীয় পর্যায় বলে অভিহিত করি। আসুন একটু প্রাঞ্জল ব্যাখ্যায় যাওয়া যাকমার্কসীয় দর্শনে দ্বন্দ্বতত্ত্বের বিকাশে মাওএর মহান অবদানের কথা কেউই অস্বীকার করতে পারেন না; এই দ্বান্দ্বিক নিয়মগুলোর আচার আচরণের ওপর নতুন আলোকপাত করে একেই মৌলিক সূত্র বলে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন। রাজনৈতিকঅর্থনীতির ব্যাপারে দুটো জিনিসকে এই নতুন তত্ত্ব বিশেষ করে পাদপ্রদীপের তলায় নিয়ে এসেছে। তার প্রথমটি আমলাতান্ত্রিক মূলধনরূপে পরিগণিতঅত্যন্ত নির্দিষ্টভাবে যার তাৎক্ষণিক গুরুত্ব আমাদের কাছে অপরিসীম। দ্বিতীয়ত, সমাজতান্ত্রিক কাঠামোতে এই অর্থনীতির বিকাশ। এসবের একত্র বিন্যাসে একথা নিশ্চিতভাবে বলা চলে সমাজতান্ত্রিক সমাজে এই অর্থনীতির বিকাশ ও উন্নয়নের ব্যাপারে মাও সেতুঙই একমাত্র স্থপতি। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে জনযুদ্ধের উল্লেখ করাই যথেষ্টকারণ মাও সেতুঙএর এই তত্ত্বের দ্বারা সর্বহারার আন্তর্জাতিকতা পূর্ণ বিকশিত এক সমরনীতির সঙ্গে পরিচিত হয়যে সমরনীতি আমরা সর্বহারাদের ক্ষেত্রে শ্রেণীগত প্রশ্নে সব জায়গায় সমভাবে প্রয়োগ করতে পারি। আমরা বিশ্বাস করি, এই তিনটি প্রশ্নে এই তত্ত্ব এক বিশ্বজনীন বিকাশের সাক্ষ্য বহন করে। আচ্ছা আসুন, দেখাই যাকনা, এই নতুন স্তরে উন্নীত হওয়ার সুবাদে কিভাবে আমরা সমৃদ্ধ হলামআর একে কেন আমরা তৃতীয় পর্যায় বলে অভিহিত করছি। মার্কসবাদ এর আগে মার্কস ও লেনিনের মাধ্যমে দুটো পর্যায় অতিক্রম করে এসেছে বলেই আমরা মার্কসবাদলেনিনবাদের কথা বলি। এটা একটা উচ্চতম পর্যায়কারণ মাও সেতুঙএর চিন্তার আলোকে আলোকিত হয়ে ভাবাদর্শগতভাবে সর্বহারা আন্তর্জাতিকতা বর্তমানে এক উন্নত পর্যায়ে বিকশিত হয়েছেযা এক সুউচ্চ শিখরে অবস্থান করছে। আমার পুনরাবৃত্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলছিআপনারা তো জানেন দ্বন্দ্বের সমন্বয়কেই আমরা মার্কসবাদ বলে থাকিযা কিনা উল্লম্ফনের মাধ্যমে উন্নত পর্যায়ে উপনীত হয় আর এক দীর্ঘ উল্লম্ফনের পরই এটা তার বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করেছে। কাজেই আজকের পৃথিবীতে আমরা যা পাচ্ছিতাকে মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদ বলা হলেও মূলতঃ মাওবাদই ক্রিয়ারত। আমরা বিশ্বাস করি আজকের দুনিয়ায় একজন মার্কসবাদী হতে গেলে, একজন কমিউনিস্ট হতে হলে তাকে অতি অবশ্যই মার্কসলেনিন ও মাওয়ের চিন্তাভাবনা সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান অর্জন করে মাওবাদের ব্যাপারে বিশেষ করে ওয়াকিবহাল হতে হবে। এসব না করলে তারা নিষ্ঠাবান কমিউনিস্ট বলে পরিগণিত হতে পারবেন না। (বিস্তারিত…)


সংকলন: শিহাব ইশতিয়াক সৈকত

উদ্দেশ্য

এল দিয়ারিও: চেয়ারম্যান গনজালো আমদের জানতে আগ্রহ হচ্ছে দীর্ঘ নীরবতার পর কি ভেবে এই সাক্ষাৎকার দিতে আপনি রাজী হলেন? এবং তাও এই এল ডিয়ারিও পত্রিকায়

চেয়ারম্যান গনজালো

চেয়ারম্যান গনজালো: আসুন আমরা এই ভাবেই শুরু করি। পেরুর এই যে কমিউনিস্ট পার্টি (Partido Comunista del Peru-PCP)- যারা কিনা দীর্ঘ আট বছরেরও বেশি সময়সীমা ধরে পেরুতে জনযুদ্ধ পরিচালিত করছেতারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নথিপত্রের মাধ্যমে জনগণের কাছে নিজেদের প্রকাশ করছেন। এই নিজেদের প্রকাশ করার ব্যাপারটার উপর আমরা সমধিক গুরুত্ব আরোপ করিকেননা এভাবেই স্ফটিকশুভ্র স্বচ্ছতায় প্রতীয়মান হয় পিসিপিই সাহস করে জনযুদ্ধের উদ্যোগ নিয়েছেএকে পরিচালিত করছেএকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। (বিস্তারিত…)


সংকলন: শিহাব ইশতিয়াক সৈকত

পেরু'র কমিউনিস্ট পার্টি-শাইনিং পাথ'এর পোস্টার

কমরেড গনজালো। পুরো নাম অ্যাবিমেল গুজমান রেইনোসো। ১৯৩৪ সালের ৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ পেরুর এরিকুইপায় তার জন্ম। ক্যাথলিক হাই স্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন। কলেজে দর্শন ও আইনশাস্ত্র অধ্যয়নকালে তিনি হয়ে উঠেন কমিউনিস্ট। ১৯৬২ সালে আয়াকুচোর হুয়ামান্‌গা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করার সময়েই ড. অ্যাবিমেল গুজমান কৃষক ও তরুণ বিপ্লবীদের মধ্যে প্রেরণার উৎস হিসেবে দেখা দেন। ১৯৭৫ সালে আন্ডারগ্রাউন্ডে যাবার আগ পর্যন্ত পেরুতে সংশোধনবাদ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। আয়কুচোর সেই ‘রেড ফ্ল্যাগ’ গ্রুপই জন্ম দেয় আজকের মাওবাদী পিসিপি ১৯৮০ সালের ১৭ মে আয়াকুচোর একটি নির্বাচন কেন্দ্র আক্রমণের মধ্য দিয়ে তাঁর নেতৃত্বে সূচিত হয় সশস্ত্র গণযুদ্ধ। ১৯৮৪ সালে চতুর্থ আন্তর্জাতিকের প্রস্তুতি সংগঠনRevolutionary Internationalist Movement (RIM)গঠনে তিনি নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৯২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পেরুর বর্তমান শাসক ফুজিমারো সরকারের সন্ত্রাস বিরোধী পুলিশ বাহিনীর হাতে গ্রফতার হন। সামরিক আদালতের এক প্রহসনমূলক বিচারে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হন। চশমা এবং অসুধবিহীন অবস্থায় এল কলাও সামরিক নৌঘাটির এক অন্ধ কুঠুরিতে তিনি বন্দি। সাক্ষাতের কোন অনুমতি নেই। শুয়ে আছেন এক অমানবিক কফিনে। (বিস্তারিত…)