Posts Tagged ‘পাহাড়ের সংগ্রাম’


লিখেছেন: অভয়ারণ্য কবীর

১৮ আগস্ট খাগড়াছড়িতে নিহত হলেন সাত জন আদিবাসীএর আগে ১৪ আগস্ট চার জন আদিবাসীকে অপহরণেপর জনগণের প্রতিরোধের মুখে তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় অপহরণকারীরা। অপহরণের প্রতিবাদে ১৮ আগস্ট ছিল ইউপিডিএফের (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট) নেতৃত্বে সমাবেশ। ইউপিডিএফের নেতাকর্মীরা সকাল থেকেই স্বনির্ভর বাজারে অবস্থিত সংগঠনের অফিসে জড়ো হচ্ছিলেন। সকাল সাড়ে আটটার দিকে একদল বন্দুকধারী তাদের উপর এলোপাথাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে নিহত হন ছয় জন। আরও কয়েকজন আহত হন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন পিসিপির (পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ) নেতা তপন চাকমা। তিনি বেশ অগ্রসর চিন্তা ধার করতেন। বিপ্লবী রাজনৈতিক মহলেও আন্তরিক এ নেতা বেশ পরিচিত ছিলেন।

নিশ্চিতভাবেই এটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। যা শুরু হয়েছে বহুদিন আগেই। পাহাড়ে বিদ্যমান অশান্তির মূলে রয়েছে সেনাবাহিনী। রাষ্ট্রের অনুমতি সাপেক্ষে তারা পাহাড়ে অঘোষিত সেনা শাসন জারি রেখেছে। আর সেখানে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ ছাড়া এ হামলা যে সম্ভব নয়, তা বলাই বাহুল্য। কারণ দুদফায় হামলা করেছে সন্ত্রাসী চক্র। স্বনির্ভর বাজারে বিজিবি পুলিশ ক্যাম্প রয়েছে। তাদের সামনেই কিভাবে হামলা চালালো সন্ত্রাসীরা? বিজিবি ও পুলিশ কেন কোনো অ্যাকশন নিলো না? এ প্রশ্নগুলো পাহাড়ি জনগণ তুলছেন। প্রশ্নগুলো যৌক্তিক এবং অতীতের ধারাবাহিকতায় এটাও যে সেনা মদদপুষ্ট, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না!

তপনদের রক্ত বৃথা যাবে না

পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরেই সেনামদদে পাহাড়িদের মধ্যে বিভক্তি ও সংঘাতের রাজনীতি চলমান রয়েছে। পাহাড়িদের মধ্যে ডিভাইড এন্ড রুল তত্ত্বের প্রয়োগ করা হয়েছেপাহাড়িদের হাতে পাহাড়িদের হত্যা করিয়ে পাহাড়ের শক্তিকে দুর্বল ও ভঙ্গুর করে দেয়া এ নীতির উদ্দেশ্য। সম্প্রতি ইউপিডিএফের নেতৃস্থানীয় সংগঠক মিঠুন চাকমাকে বাড়ির সামনে থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। গত ১০ মাসে একের পর এক হামলাপাল্টা হামলার ঘটনায় অন্তত ৩৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ লাশের মিছিল নতুন করে ভাববার বাস্তবতা সামনে এনেছে। পাহাড়ের সংগ্রামকে সারসসংকলন না করে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। প্রকৃত বন্ধু শত্রুদের সম্পর্কে নতুন করে না ভাবতে পারলে সংগ্রাম বারবার বিপর্যয়ের দিকেই ধাবিত হবে। আমরা হারাবো আন্তরিক নেতৃত্বকে। যারা প্রকৃতই পাহাড়ের নিপীড়িত জনগণের পক্ষে লড়াই করতে এসেছিলেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়। মুক্তিযুদ্ধে এদেশের বাঙালি জনগণের সাথেই পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীরাও অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু এর বিপরীতে রাষ্ট্র তাদের কিছুই দেয়নি। জনগণের নূন্যতম মৌলিক অধিকার বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি। জনগণের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, বিদেশের কর্তৃত্বহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার, শোষণ মুক্তির কোনোটা পূরণ হয়নি। এখানে কখনো সোভিয়েতের, কখনো আমেরিকার আবার কখনো বা ভারতের অথবা চীনের মদদে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে।

যে বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তির লড়াই করেছে, সেই দেশের কথিত স্বাধীন সরকার ১৯৭২ সালেই বাংলাদেশেসকল জাতিসত্তার মানুষকে বাঙালি বানাতে চেয়েছিলেন। অন্যান্য জাতিসত্তাকে স্বীকৃতি পর্যন্ত দেয়নি। ১৯৭২ সাল থেকেই পাহাড়ে জাতিসত্তাসমূহ লড়াই চালিয়ে আসছে। পাহাড়ে বাংলাদেশের সকল সরকার নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। লোগাং, লংগদু থেকে শুরু করে অসংখ্য গণহত্যা পাহাড়ে সংগঠিত হয়েছে। পাহাড়ের প্রশ্নে এদেশের শাসকশ্রেণীর সকল অংশের ভূমিকা একই রকম। পাহাড়ের জনগণ এ সমস্ত নিপীড়নের বিরোধিতা করে আসছেন ধারাবাহিকভাবে। আজ পাহাড়ে দিনেরাতে নিপীড়নের স্বীকার হচ্ছেন। পাহাড়ী নারীরা ধর্ষিত হচ্ছেন, খুন হচ্ছেন। তাদের মিটিংমিছিল, সভাসমাবেশ করার অধিকার দেয়া হচ্ছে না। কল্পনা চাকমাদের কোনো খোঁজ রাষ্ট্র দিতে পারেনি আজও। কিলোমিটার প্রতি পর পর সেনাক্যাম্প বসিয়ে পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীকে সামরিক শাসনের ভেতরে রাখা হয়েছে।

বাঙালি গরীব জনগণকে পাহাড়ে পুনর্বাসন করে কৃত্রিমভাবে দাঙ্গা তৈরি করার সকল চক্রান্ত বাস্তবায়ন করে চলেছে বাঙালি ধনিকশ্রেণীর সরকারগুলো। সেটেলারদেরকে জাতিগত উসকানি দিয়ে শাসকগোষ্ঠী ও সেনাবাহিনী সেখানে শক্ত সামরিক ঘাঁটি বানিয়েছে। পাহাড়ীদের নিজেদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে সেটেলারদের বসানো হয়েছে এ প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে।

সবের বিরুদ্ধে পাহাড়ের জনগণ বিভিন্নভাবে আন্দোলন করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রকৃত জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারেননি। তারা একই বৃত্তে ঘুরপাক খেয়ে চলেছেদীর্ঘদিন ধরেঅতিসত্তর পাহাড়ের সংগ্রামকে এ বৃত্ত থেকে বের করে আনা দরকার

পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে যে সংগ্রাম চলছে, তাকে ভাতৃঘাতী সংঘাতে পরিত করতে পেরেছে শাসকশ্রেণী। তারা পাহাড়ে যেমন নব্য পাহাড়ী আমলাদালাল তৈরি করেছে। তেমনি তৈরি হয়েছে নানা রঙের বুর্জোয়া। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ সন্তু লারমা। তারা পাহাড়ের জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কিন্তু এর বিপরীতে যারা দাঁড়াতে চেয়েছিল সেই ইউপিডিএফও এখন পর্যন্ত সঠিক বিপ্লবী দিশা হাজির করতে পারেনি। বরং পাহাড়ের বিরোধী দলের মতো করে গড়ে উঠেছে। যদিও ইউপিডিএফের মধ্যেই পাহাড়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নবীন মানুষ রয়েছেন, যারা পাহাড়কে নিপীড়নমুক্ত করতে চান। তাঁদের এখন নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ ইউপিডিএফ এবং অন্যান্য সব গ্রুপই পাহাড়ের লড়াইকে পথ দেখাতে পারছে না।

আসুন, একটু লক্ষ্য করি উপরের কথাগুলো সত্য নাকি মিথ্যা! গত কয়েক বছরের কথা যদি আমরা পুনর্মূল্যায়ন করি তাহলে দেখবো পাহাড়ে শুধু পাহাড়ি জনগণই হত্যার্ষণের স্বীকার হচ্ছেন। এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। উপরন্তু পাহাড়ে নিজ জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেই সংঘাত চলছে। এখানে লাভবান হচ্ছে কে? লাভবান হচ্ছে সেনাবাহিনী, বাঙালি ধনী বুর্জোয়া এবং পাহাড়ি নব্যদালাল ধনীকশ্রেণী

মাও সেতুঙ বলেছিলেন, কে শত্রু আর কে মিত্র এই বিষয়টি ঠিক করাই হচ্ছে সংগ্রামের মূল বিবেচ্য দিক।

এক্ষেত্রে পাহাড়ে শত্রু হলো সেনাবাহিনী, বাঙালি ধনিক শাসকশ্রেণী এবং পাহাড়ের নব্যদালাল বুর্জোয়াশ্রেণী। আর বন্ধু বা মিত্র কারা? পাহাড়ের ব্যাপক নিপীড়িত জনগণ, সমতলের ব্যাপক নিপীড়িত জনগণ, প্রকৃত বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠনযারা প্রকৃতই পাহাড়ের শোষণমুক্তির পক্ষে। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকবে পাহাড়ের সর্বহারাশ্রেণী।

পাহাড়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এখানে যাদের সেটেল করা হচ্ছে তারাও মূলত শত্রু শিবিরের নয়। পাহাড়ে যেসব বাঙালিকে সেটেল করা হয়েছে, তারাও সমতলে নিপীড়িত। তারা সেনা মদদে বাধ্য হয়েই সেটেল হচ্ছেন। এদের মধ্যকার মানবিক, সবচেয়ে নিপীড়িত অংশটি সংগ্রামের শত্রু নয়। জমি দখলের প্রশ্নে প্রতিরোধ যদিও অনিবার্য। কিন্তু তারা জনগণেরই আরেকটি নিপীড়িত অংশ। তাদেরকে চোখ বন্ধ করে শত্রুর কাতারে ফেলে দেয়াটা হবে মারাত্বক ভুল। যা শাসকরা সব সময়েই চাইবে। পাহাড়ে দীর্ঘদিন আগে সেটেল হওয়া বাঙালিদের মধ্যে অনেকেই এখন লুটপাটের মধ্য দিয়ে নব্যধনীকশ্রেণীতে পরিণত হয়েছে। মূলত তারাই শাসকশ্রেণীর পক্ষে উগ্রবাঙালি চেতনার প্রয়োগকারী, বিভেদ সৃষ্টিকারী। এদের বিরুদ্ধেও লড়াইয়েও নিপীড়িত বাঙালিরা মিত্রশক্তি। অর্থাৎ লড়াইটা হবে শ্রেণীর লড়াই এবং শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। কিন্তু বর্তমানে তা হচ্ছে না।

সারাবিশ্বেই আজ জাতিগত লড়াই সংকীর্ণ আকার ধার করেছে। উগ্রজাতীয়তাবাদ কোনো সমাধান হতে পারে না। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে আরেক জাতীয়তাবাদ কখনো মুক্তি দিতে পারে না। রুশ বিপ্লব এবং চীন বিপ্লব তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে! এর পরেও আমাদের দেশের পাহাড়ি নেতৃত্ব এটা বুঝতে ব্যর্থ হলে, তা হবে হতাশাজনক। তারা এখনো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেই ঘুরপাক খাচ্ছেন। এটাকে বৃহত্তর লড়াইয়ে পরিণত করতে পারেননি।

বৃহত্তর লড়াইয়ে পরিণত করতে হলে অবশ্যই মাওবাদী বিপ্লবী পথ অবলম্বন করতে হবে প্রকৃত শত্রুর বিরুদ্ধে প্রকৃত মিত্রকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

এক্ষেত্রে আমাদের শিখতে হবে ভারতের মাওবাদী পার্টির নেতৃত্বে মধ্যভারতে আদিবাসী জনগণের সংগ্রাম থেকে। তারা কিভাবে জাতিগত লড়াইকে একটি বৃহত্তর দিকে এগিয়ে নিয়েছেন, তা থেকে আমাদের ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হবে এবং পাহাড়েও নতুন ভিত্তিতে লড়াইকে জোড়দার করতে হবে। পাহাড়সমতলের সমগ্র নিপীড়িত জনগণ এক হয়ে এই শোষণমূলক রাষ্ট্র উচ্ছেদ করে, গড়ে তুলতে হবে এক মানবিক, নয়াগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রএছাড়া শহীদ তপন চাকমাদের রক্ত বৃথা যাবে। আমরা তা হতে দিতে পারি না। আমাদের অবশ্যই তপন চাকমাদের আত্মত্যাগকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে বৃহত্তর সংগ্রামের জন্যই প্রস্তুত হতে হবে।

পাহাড় থেকে সেনা শাসন তুলে নিতে হবে!

অবিলম্বে সেটেলার বাঙালিদের অন্যত্র সম্মানজনক পুনর্বাসন করতে হবে!

পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি থেকে আদিবাসী উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে!

জঙ্গলের অধিকার আদিবাসীদের হাতে দিতে হবে!

Advertisements