লিখেছেন : শাহেরীন আরাফাত

১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর (গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে) রাশিয়ায় যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, তাতে বিপ্লবী কমিউনিস্টরা নিশ্চয় দ্বিমত করবেন না। তবে বলশেভিক বিপ্লব নিয়ে কথা বলার সময় একটা বিষয় অনেকেই এড়িয়ে যান যে, এরপর ১৯২২ সাল পর্যন্ত এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সেখানে চলমান ছিল, যেখানে প্রাণ হারিয়েছিলেন কয়েক লাখ মানুষ। এমন এক পরিস্থিতিতে বৈপ্লবিক সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণকাজ একরৈখিকভাবে চলমান ছিল না। আর এক পশ্চাৎপদ সমাজে এই বিনির্মাণ প্রক্রিয়ায় পশ্চাদপসরণও ওই বিপ্লবেরই অংশ। কিন্তু তা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে কমিউনিস্ট বা বামপন্থী নামধারী কেউ কেউ এ বিপ্লবকে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করছেন। তারা সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে এক কথিত বিশুদ্ধ সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখছেন। সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ প্রক্রিয়ায় যে সমাজতান্ত্রিক উপাদান বিদ্যমান ছিল, তারা সেটাকেই মুখ্য হিসেবে তুলে ধরে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবএর তত্ত্ব ফেরি করছেন। আর তাই একটা নির্ধারিত বিষয় নিয়ে নতুন করে লেখার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও, কেন আমরা বলশেভিক বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বলছি, তা স্পষ্ট করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। বলশেভিক বিপ্লবের ঘটনাবলী, তৎকালীন সময়ে রাশিয়ার আর্থসামাজিক অবস্থা এবং বিপ্লব পরবর্তী পুনর্গঠনকালে পার্টি গৃহীত কার্যক্রমে আলোকপাত করার চেষ্টা থাকবে এ লেখায়। রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচী থেকে আমরা কৃষিপ্রধান দেশে সমাজতন্ত্রের পথে প্রাথমিক পুনর্গঠন সম্পর্কে ধারণা পেতে সক্ষম হই। যা এই বিপ্লবের ধরণ সম্পর্কেও আমাদের সম্মক ধারণা প্রদান করে। আর এ ক্ষেত্রে কমরেড ভ্লাদিমির লেনিন ও বলশেভিক পার্টির বক্তব্যকেই মূল তথ্যসূত্র হিসেবে ধরা হয়েছে।

এক.

সপ্তদশঅষ্টাদশ শতকে সমগ্র ইউরোপব্যাপী জাতীয়তাবোধ ক্রমেই বিকশিত হতে থাকে। যার নেতৃত্বে ছিল উঠতি বুর্জোয়াশ্রেণী, আর তাদের প্রতিপক্ষ শক্তি সামন্ততন্ত্র। তবে এই জাতীয় আন্দোলনে পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্যও পরিলক্ষিত হয়। পশ্চিম ইউরোপের জাতিসমূহ বিকশিত হলো জাতিরাষ্ট্রের দিকে। কিন্তু পূর্ব ইউরোপে গঠিত হলো বেশ কয়েকটি জাতিসত্তা নিয়ে বহুজাতিক রাষ্ট্র। পুঁজিবাদের বিজয়সূচক অগ্রগতি এবং সামন্ততান্ত্রিক অনৈক্যের ওপর পুঁজিবাদের বিজয় অর্জনের সময়কালেই ব্রিটিশ, ফরাসি, জার্মান, ইতালীয় ইত্যাদি আধুনিক জাতি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

উল্লেখ্য, রাজতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে পুঁজিবাদের সংগ্রাম ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। সমাজের এই বিবর্তন নিহিত রয়েছে তার অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া, বস্তুগত উৎপাদন ও শ্রম বিভাজনের মাঝে। সামন্তবাদে উৎপাদন ও শ্রম কাঠামো ছিল সামন্ত বা রাজার অধীন। সেখানে ব্যক্তিসত্তার কোনো কিছু করা বা বলার অধিকার ছিল না। অপরদিকে, পুঁজিবাদের মূল কথা হলো শ্রমের সামাজিকীকরণ, সেখানে শ্রমিক পায় তার শ্রমের মালিকানা। যা সামন্তবাদী কাঠামো থেকে মূলগতভাবে পৃথক।

ইউরোপে যখন পুঁজিবাদ ক্রমেই বিকশিত হয়ে সাম্রাজ্যবাদে রূপ নিচ্ছে, তখনো রাশিয়ায় ক্ষমতাসীন রাজতন্ত্র। আবার এর মাঝেই সেখানে পুঁজিবাদ দ্রুত বিকশিত হতে শুরু করে। জারতন্ত্র তার অধীনেই পুঁজিবাদ বিকাশের সুযোগ করে দেয়। আর এশিয়ায় সমুদ্র উপকূলে উপনিবেশ স্থাপনের আশায় ১৯০৪ সালে জার নিকোলাস দ্বিতীয় জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু সেই যুদ্ধে রাশিয়া শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। আর সৈনিকদের এই অকাতরে নিহত হওয়ার ঘটনা সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এ সময় রুশ শ্রমিকরা প্রথমবারের মতো ব্যাপক ধর্মঘট পালন করেন। কৃষি সংস্কারের বিষয়টিও সামনে আসে প্রবলভাবে। এতে সোশ্যালিস্ট রেভলিউশনারি এবং রাশিযান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টি নেতৃত্ব দেয়। কিন্তু সঠিক রাজনৈতিক দিশা না থাকায় ১৯০৫ সালের প্রথম রুশ বিপ্লব সফলতা পায়নি। জার নিকোলাসের বাহিনী হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে। তবে এর ফলে শাসন কাঠামোয় কিছু পরিবর্তন আনেন জার। তিনি নিজের হাতে সর্বময় ক্ষমতা ধরে রাখলেও বহুদলীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করেন, দুমা (পার্লামেন্ট) গঠিত হয় এবং ১৯০৬ সালে নতুন সংবিধান প্রবর্তিত হয়। কমরেড ভ্লাদিমির লেনিন ১৯০৫ সালের বিপ্লবকে বিপ্লবের মহড়া বলে উল্লেখ করেছেন।

উল্লেখ্য, ১৯০০ সালেই বিপ্লবী সর্বহারা পার্টি বানানোর জন্য উদ্যোগ নেন লেনিন। পার্টির নাম দেওয়া হয় রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টি (আরএসডিএলপি)। লেনিন এমন এক পার্টি গড়ে তোলার কথা বলেন, যেখানে পার্টির নেতৃত্বকারী ভূমিকায় থাকবেন পেশাদার বিপ্লবীরা, যারা গোপনে লাখ লাখ শ্রমিককে সমাবেশিত করে বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তুলবেন। আর এটাই হবে তাদের পেশা। তাঁরা অন্য কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না। আঞ্চলিক স্তরে থাকবে এক বিশাল পার্টি নেটওয়ার্ক, সেখানে থাকবে লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের সমর্থনপুষ্ট অসংখ্য পার্টি সেল

বিপ্লবী পার্টি গঠনে লেনিনের চিন্তার সঙ্গে কেন্দ্রীয় সব নেতারা একমত ছিলেন না। ১৯০৩ সালের জুলাইআগস্টে আরএসডিএলপির দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই বিতর্ক জোরালোভাবে সামনে আসে। একদিকে দৃঢ় সুশৃঙ্খল, পেশাদার বিপ্লবীদের নেতৃত্বাধীন, গোপন এবং কার্যকরী বিপ্লবী পার্টির ধারণা, যার পক্ষে ছিলেন লেনিন ও অন্যান্য বিপ্লবীরা। যেখানে পার্টির সব সদস্যকেই কোনো না কোনো পার্টি কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে। অন্যদিকে, মার্তভদের মতো অর্থনীতিবাদীরা চাইছিলেন একটা ঢিলেঢালা আইনি পার্টি। যেখানে পার্টিকে লেভি (আর্থিক সহায়তা) দিলে এবং পার্টির কর্মসূচীকে সমর্থন করলেই তাদের সদস্যপদ দেওয়া যাবে। ১৯০৫ সালে পার্টি ভেঙে পড়ে। বিপ্লবীদের মতামতই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আর এ থেকেই পার্টির নামকরণ হয় বলশেভিক, যার অর্থ সংখ্যাগুরু। মার্তভরা মেনশেভিক (সংখ্যালঘু) নামে পরিচিতি পান।

১৯০৫ সালে বলশেভিকদের তৃতীয় কংগ্রেসের তাৎপর্য উল্লেখ করে গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যালডেমোক্রাসির দুই রণকৌশল শীর্ষক গ্রন্থটি রচনা করেন লেনিন। যা জেনেভা থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। একই বছর আরএসএলডিপি(বলশেভিক পার্টি) কেন্দ্রীয় কমিটি এবং মস্কো কমিটি কর্তৃক পৃথকভাবে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। সেখানে লেনিন গণতান্ত্রিক বিপ্লবের রূপরেখা উপস্থাপন করেন। গ্রন্থে তৎকালীন রাশিয়ার বিপ্লবের স্তর গণতান্ত্রিক বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সেখানে সর্বহারাশ্রেণীর অবস্থান সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। সর্বহারাশ্রেণীই হবে এ বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি। কৃষকশ্রেণী হবে তাদের সহযোগীশক্তি। জারতন্ত্র উচ্ছেদের পর প্রলেতারিয়েত ও কৃষকদের বৈপ্লবিক গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব এবং বৈপ্লবিক সরকার গঠিত হবে। এই বিপ্লব জারতন্ত্র ও ভূমিদাসপ্রথা উচ্ছেদ করবে, গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা অর্জন করবে। অর্থাৎ তৎকালীন রাশিয়ায় প্রধান দ্বন্দ্ব ছিল ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের সঙ্গে জারতন্ত্র ও সামন্তবাদের দ্বন্দ্ব। লেনিনের মতে, সর্বহারাশ্রেণী এই বিপ্লবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে, কারণ তা সমাজতন্ত্রের ভিত রচনা করবে। পরে ১৯১৭ সালের অক্টোবরে সংঘটিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব লেনিনের তত্ত্বের সঠিকতা প্রমাণ করে।

লেনিন ১৯০৫ সালের বিপ্লবকে বুর্জোয়া বিপ্লব বলেই অভিহিত করেন। তবে তিনি সর্বহারা নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, মার্কসবাদ সর্বহারাশ্রেণীকে এই শিক্ষা দেয় যে, তারা বুর্জোয়া বিপ্লব থেকে দূরে থাকতে পারে না, বিপ্লব সম্পর্কে উদাসীন থাকতে পারে না, বিপ্লবের নেতৃত্ব বুর্জোয়াদের হাতে ছেড়ে দিতে পারে না। মার্কসবাদের শিক্ষা হলো সর্বহারাশ্রেণী যেন বিপ্লবে সর্বোচ্চ সতেজভাবে অংশগ্রহণ করে, প্রকৃত সর্বহারা গণতন্ত্রের জন্য এবং বিপ্লবকে যথার্থ লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়ার জন্য তারা যেন সবচেয়ে দৃঢ প্রতিজ্ঞভাবে সংগ্রাম করে।

এই গণতান্ত্রিক বিপ্লব সারবস্তুতে বুর্জোয়া বিপ্লব, যেখানে জারতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্র উচ্ছেদ করে জাতীয় পুঁজির বিকাশের পথ উন্মুক্ত করা হবে। কিন্তু অন্তর্গতভাবে তা বুর্জোয়া বিপ্লবের চেয়ে ভিন্ন। এখানে বিপ্লবের নেতৃত্বে থাকছে সর্বহারাশ্রেণী। যার লক্ষ্য বুর্জোয়া একনায়কত্বের বদলে শ্রমিককৃষকের বৈপ্লবিক একনায়কত্ব কায়েম করা। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব পরবর্তী সময়ে রচিত এপ্রিল থিসিসের আগে পর্যন্ত এটাই ছিল বলশেভিক পার্টির লাইনগত অবস্থান।

১৯১৪ সালে শুরু হয় প্রথম সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধ। এতে একদিকে ছিল অটোমান সাম্রাজ্য, অস্ট্রিয়াহাঙ্গেরি, জার্মানি এবং বুলগেরিয়া। আর অপরদিকে ছিল সার্বিয়া, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, ইতালি, রুমানিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র। অটোমান সাম্রাজ্যের বেশকিছু এলাকা নিজের দখলে নিতে জার এ যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন।

ওই সময়কালের একটা চুক্তি বিশেষ গুরুত্ববহ, যা আরবে সাম্রাজ্যবাদীদের ভাগবাটোয়ারা বুঝতে যেমন সহায়তা করবে, তেমনি জাতীয় প্রশ্নে ধর্মের ব্যবহারও এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই চুক্তি ইতিহাসে সাইকসপিকোট চুক্তি নামে পরিচিত। নভেম্বর ১৯১৫ থেকে মার্চ ১৯১৬ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদীদের নিজেদের মধ্যে দরকষাকষি চলতে থাকে। অতঃপর ১৬ মে ১৯১৬ এই চুক্তি সম্পন্ন হয়। রাশিয়ার সম্মতিতে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে ব্রিটেনের পক্ষে স্যার মার্ক সাইকস ও ফ্রান্সের পক্ষে ফ্রান্সিস জর্জেস পিকোট স্বাক্ষর করেন। সাম্রাজ্যবাদের টেবিলে লিখিত হয় আরবের ভবিষ্যৎ।

ওই চুক্তি অনুসারে, ব্রিটেন বর্তমান জর্ডান, ইরাক, কুয়েতের দখল নেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। ফ্রান্সের ভাগে পড়ে বর্তমান সিরিয়া, লেবানন ও দক্ষিণ তুরস্ক। এদের সহযোগী হিসেবে জার অটোমানদের সীমান্ত অঞ্চল দখল করতে চেয়েছিলেন। রুশ বিপ্লবএর পর ১৯১৭ সালের ২৩ নভেম্বর প্রাভদা ও ইজভেস্তিয়া পত্রিয়ায় ওই চুক্তি ছাপা হয়। পরবর্তীতে, ২৬ নভেম্বর তা ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ানেও ছাপা হয়।

১৯১০ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে রাশিয়ায় বলশেভিকরা ক্রমাগত রাজনৈতিক সংগ্রাম তীব্র করে তোলে। ১৯১৭ সালের জানুয়ারি থেকে গণঅসন্তোষের তীব্রতা ক্রমেই বেড়ে চলে। মস্কো, পেত্রোগ্রাদ, বাকু ইত্যাদি বড় বড় শিল্প শহরে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ধর্মঘটে সামিল হলেন। বলশেভিকরা তাতে পূর্ণ সমর্থন জানালেন। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বলশেভিক পার্টির আহ্বানে পেত্রোগ্রাদের শ্রমিকেরা ধর্মঘটের ডাক দেন, তাতে দুই লাখেরও বেশি শ্রমিক অংশগ্রহণ করেন। স্বৈরতন্ত্র ধ্বংস হোক, যুদ্ধ ধ্বংস হোক, রুটি চাই স্লোগান সামনে রেখে পথে নামেন শ্রমিকেরা। শ্রমিকদের সঙ্গে যোগ দেন সৈনিকরা। ৮ মার্চ (জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে ২৩ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বলশেভিকদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শ্রমজীবী নারীরা ব্যাপক পরিমাণে রাস্তায় নামলেন। তারা যুদ্ধ, অনাহার ও জারতন্ত্রের অবসান চেয়ে ধর্মঘট আহ্বান করেন। ১১ মার্চ শ্রমিকশ্রেণী সর্বাত্মক ধর্মঘটে রাস্তায় নেমে আসে। ওই দিনই বলশেভিকদের কেন্দ্রীয় কমিটি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের আহ্বান জানায়। ১২ মার্চ (জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে ২৭ ফেব্রুয়ারি) ৬০ হাজার সৈনিক বিদ্রোহ করে বিপ্লবের পক্ষে চলে আসেন। এই সংবাদ ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে জারের সরকারি পদাধিকারী ও সৈন্যরা বিদ্রোহে সামিল হতে শুরু করেন। যুগের পর যুগ রাশিয়ার জনগণকে নিপীড়ন করে আসা জারতন্ত্রের পতন ঘটে। এটি ফেব্রুয়ারি বিপ্লব নামে পরিচিত। কারণ রাশিয়ায় জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হতো, যাতে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সঙ্গে ১৩ দিনের পার্থক্য রয়েছে।

১৫ মার্চ (জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে ২ মার্চ) কনস্টিটিউশন্যাল ডেমোক্র্যাট বুর্জোয়া, সোশ্যালিস্ট রেভলিউশনারি ও মেনশেভিকদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। প্রথমে আইনমন্ত্রী ও যুদ্ধমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করলেও জুলাইয়ে আলেকজান্দার কেরেনস্কিকে ওই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করা হয়। জারের মতোই এ আগ্রাসী বুর্জোয়া সরকারও যুদ্ধবাজ। তারা যুদ্ধকে সামনে রেখে জাতীয় ভাবাবেগ নিজেদের পক্ষে রাখার চেষ্টা করে। জুনে জার্মানহাঙ্গেরীয় বাহিনীর হাতে বিপুলভাবে পর্যুদস্ত হয় রুশ সেনাবাহিনী। জোর করে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া রুশ সেনাদের যেমন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছিল না, তেমনি তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘদিন টিকে থাকার রসদও ছিল না। এতে সেনাবাহিনীতে বাড়তে থাকা ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে।

এর বিপরীতে বলশেভিকদের নেতৃত্বে কৃষক, শ্রমিক, সৈনিকদের সোভিয়েত গঠনকাজ চলতে থাকে। অর্থাৎ, একইসঙ্গে দুই ভিন্ন ব্যবস্থা চলমান থাকে। অস্থায়ী সরকারের মধ্য দিয়ে মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভলিউশানারিদের সামনে রেখে বুর্জোয়া একনায়কত্ব এবং শ্রমিক ও সৈনিক ডেপুটিদের সোভিয়েতএর মধ্য দিয়ে শ্রমিককৃষকের একনায়কত্ব। লেনিন এই অবস্থাকে দ্বৈত ক্ষমতা বলে উল্লেখ করেন।

১৯১৭ সালের ১৬ এপ্রিল (জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে ৩ এপ্রিল) লেনিন দীর্ঘ নির্বাসনের পর পেট্রোগ্রাদে ফিরে আসেন এবং পরদিন তিনি বলশেভিকদের একটি সভায় বর্তমান বিপ্লবে সর্বহারাশ্রেণীর কর্তব্য শীর্ষক একটি প্রতিবেদন পেশ করেন। ওই প্রতিবেদনই এপ্রিল থিসিস নামে পরিচিত। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পার্টির করণীয় নির্ধারণে এ প্রতিবেদন বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। লেনিন অস্থায়ী সরকারের বিরোধিতা করে, সমস্ত ক্ষমতা শ্রমিক ও সৈনিক ডেপুটিদের সোভিয়েতএর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য লড়াইয়ের আহ্বান রাখেন এবং এর মধ্য দিয়ে কি করে শান্তি, ভূমি ও রুটির নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে, তার কর্মসূচী হাজির করেন। জারতন্ত্রের উচ্ছেদের পর লনিন গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বদলে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রূপরেখা সামনে আনেন। সেখানে সমগ্র কৃষক নয়, সমাজের সবচেয়ে দরিদ্রতম অংশ কৃষককে সঙ্গে নিয়ে সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে ক্ষমতা দখলের কথা বলা হয়। পরবর্তী সময়ে এ থিসিসের যথার্থতা প্রমাণিত হয়। পাশাপাশি, যেহেতু শ্রমিকশ্রেণীর প্রধান লক্ষ্য কমিউনিজম তথা সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা, তাই লেনিন থিসিসে পার্টির নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখেন। পরে রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টির (বলশেভিক) নাম বদলে পার্টির নাম রাখা হয় কমিউনিস্ট পার্টি অফ রাশিয়া (বলশেভিক)। আর তখন থেকেই বিশ্বের দেশে দেশে সর্বহারাশ্রেণীর দায়িত্ব এসে পড়ে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বদলে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলা।

পরবর্তীতে বলশেভিকরা ক্রমেই শক্তিশালী হতে থাকে। লেনিন ৭ অক্টোবর (জুলিয়ান ক্যালেন্ডার) লেনিন পেত্রোগ্রাদে ফিরে এসে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পক্ষে মত দিলেন। ৮ অক্টোবর উত্তরাঞ্চলের সোভিয়েতগুলোর বিভাগীয় কংগ্রেসে অংশগ্রহণকারী বলশেভিকদের কাছে লেখা চিঠিতে লেনিন রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। তিনি লিখেন, বিলম্ব হবে মৃত্যুর সমতুল্য।

১৬ অক্টোবর কালিনিনের সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে সিদ্ধান্ত হয়। ওই সিদ্ধান্তের পক্ষে পড়ে ১৯ ভোট, বিপক্ষে ২ ভোট এবং ৪ জন সদস্য ভোটদানে বিরত থাকেন। কেন্দ্রীয় কমিটি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রস্তুতির জন্য সকল সংগঠন, শ্রমিক ও সৈনিকদের কার্যকর ও শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়। ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় কমিটিকে লেখা এক ঐতিহাসিক চিঠিতে লেনিন লিখেন, বিপ্লবীরা যেখানে আজই জয়লাভ করতে পারে, সেখানে যদি তারা গড়িমসি করে তাহলে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলে অনেক কিছুই হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে, বস্তুত সবকিছুই হারানোর সম্ভাবনা। ২৫ অক্টোবর, গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৭ নভেম্বর, সকাল নাগাদ শীত প্রাসাদ ও সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তর ছাড়া গোটা পেত্রোগ্রাদ বিপ্লবী শ্রমিক, সৈনিকদের দখলে চলে আসে। শীত প্রাসাদে, যা এক সময়ে জারের প্রাসাদ ছিল আর তখন কেরেনস্কি সরকারের কেন্দ্র, সন্ধ্যায় বিপ্লবীদের আক্রমণে তার পতন ঘটে। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে বলশেভিক সরকার।

দুই.

বিজ্ঞান ও কারিগরিবিদ্যার অগ্রগতির ফলে উৎপাদনের সীমাহীন বিস্তারের সুযোগ খুলে যাওয়ায়, জাতীয় বাজার একচেটিয়া পুঁজির পক্ষে খুবই ছোট আর সংকীর্ণ হয়ে আসে। কাজেই উচ্চমাত্রায় পুঞ্জিভূত ও কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে একচেটিয়া পুঁজিতে পরিণত হওয়া জাতীয় পুঁজি বিশ্ববাজার দখলের সংগ্রাম শুরু করে। একইসময়ে পুঁজির আঙ্গিক গঠন অত্যন্ত উঁচু হওয়ার ফলে মুনাফার হারের পতনের ঝোঁককে সামলানোর জন্য একচেটিয়া পুঁজি উপনিবেশগুলি এবং সেই সঙ্গে নিজ দেশের জনগণের ওপর শোষণ আরও তীব্র করার চেষ্টা করে। বিভিন্ন দেশে পুঁজিবাদের অসম বিকাশ আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বকে বাড়িয়ে তোলে এবং তা ক্ষেত্র বিশেষে যুদ্ধে রূপ নেয়। পুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদী পর্যায়ের বিকাশ ও সর্বোচ্চ মুনাফা লাভের তীব্র প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যম্ভাবীভাবে সমস্ত দ্বন্দ্ব ও বৈরিতা গভীরতর আর ব্যাপকতর হয়ে ওঠে। এসবই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ, বিধ্বংসী বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট, ফ্যাসিবাদ, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ভাঙন আর সমাজতান্ত্রিক ও জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মতো পৌনঃপুনিক সামাজিক বিস্ফোরণের জন্ম দেয়।

জার আমলের রাশিয়াও যে উপনিবেশ স্থাপনে পিছিয়ে ছিল না, তা লেনিন ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ গ্রন্থে স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিকঅর্থনৈতিক অর্থে উপনিবেশ বলতে কী বোঝায়? মার্ক্সের বক্তব্য অনুসারে, এই ধারণার প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো) অনধিকৃত, মুক্ত জমি, উপনিবেশ স্থাপনকারীদের কাছে সুগম্য এমন দেশের অস্তিত্ব। ২) একটা সুপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ব শ্রমবিভাগ ও একটা বিশ্ব বাজার অস্তিত্ব। যার জন্য উপনিবেশগুলো বিশেষায়িত হয়ে উঠতে পারে কৃষি পণ্যসামগ্রীর ব্যাপক উৎপাদনে। বিনিময়ে পেতে পারে তৈরি শিল্পজাত পণ্যসামগ্রী, যা তাদের নিজেদেরই উৎপাদন করতে হতো ভিন্নতর অবস্থায়। উপনিবেশ শব্দটি অধিকতর প্রযোজ্য হয় অন্যান্য বহিরাঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রে, উদাহরণস্বরূপ, ককেশাস। রাশিয়া কর্তৃক এই অঞ্চলটির অর্থনৈতিক বিজয় সংঘটিত হয়েছিল রাজনৈতিক বিজয়েরও বহু আগে, কিন্তু সেই অর্থনৈতিক বিজয় আজও সম্পূর্ণভাবে সাধিত হয়নি। সংস্কারোত্তর কালপর্বে, একদিকে ককেশাসের উপনিবেশায়ন ঘটেছে ব্যাপকভাবে, উপনিবেশবাদীদের দ্বারা জমির ব্যাপক চাষাবাদ চলেছে (বিশেষভাবে উত্তর ককেশাসে), তারা বিক্রির জন্য গম, তামাক প্রভৃতি ফসল উৎপাদন করেছে এবং রাশিয়া থেকে বিপুলসংখ্যক গ্রামীণ মজুরিশ্রমিককে সেখানে যেতে আকৃষ্ট করেছে। অপরদিকে, যুগ যুগ ধরে চলে আসা স্থানীয় হস্তশিল্পক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে মস্কোয় উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়, তা এখন সম্পূর্ণ উচ্ছেদ হওয়ার মুখে। সুপ্রাচীন বন্দুকনির্মাণ শিল্পটিরও অবনতি ঘটেছে টুলা ও বেলজিয়াম থেকে আমদানিকৃত পণ্যের প্রতিযোগিতার কারণে। লৌহজাত দ্রব্যাদির হস্তশিল্পেরও অবনতি ঘটেছে আমদানিকৃত রুশ পণ্যের প্রতিযোগিতার মুখে। এছাড়াও অবনতি ঘটেছে স্বর্ণ, রৌপ্য, মৃত্তিকা, চর্বি, সোডা, চামড়া, ইত্যাদি হস্তশিল্পের ক্ষেত্রে। এখন এসব দ্রব্যসামগ্রী অনেক সস্তায় রুশ ফ্যাক্টরিতে উৎপন্ন হচ্ছে। যা ককেশাসে সরবরাহ করা হয়।

রুশীয় পুঁজিবাদ এভাবে ককেশাসকে টেনে আনছে বিশ্ব পণ্য সঞ্চালন বলয়ের মধ্যে। নিশ্চিহ্ন করে চলেছে তার স্থানীয় যতো বৈশিষ্ট্য, যথা প্রাচীন পিতৃতান্ত্রিক বিচ্ছিন্নতার জেরগুলোকে, আর স্বয়ং নিজেই একটা বাজার জুগিয়ে চলেছে নিজের ফ্যাক্টরিগুলোর জন্য।

একই গ্রন্থে লেনিন আরও বলেন, পুঁজিবাদের জন্য একটি বাজার গঠনের রয়েছে দুটি দিক পুঁজিবাদের গভীরতায় বিকাশ, অর্থাৎ, সুনির্দিষ্ট ও পরিবেষ্টিত অঞ্চলের মধ্যে পুঁজিবাদী কৃষি ও শিল্পের অধিকতর ক্রমবৃদ্ধি; এবং পুঁজিবাদের প্রস্থীয় বিকাশ, অর্থাৎ, নতুন নতুন অঞ্চলে পুঁজিবাদী কর্তৃত্বের বলয় সম্প্রসারণ। অর্থাৎ, সীমান্ত অঞ্চলের উপনিবেশীকরণ এবং রুশীয় অঞ্চলে পুঁজির সম্প্রসারণ। ককেশাস ছাড়াও আর্কাঞ্জেলের মতো প্রদেশের উপনিবেশীকরণ হয় জার আমলে। রেলপথ সম্প্রসারণের মাধ্যমে সেখানে রুশ পণ্য সরবরাহ করা হয় এবং সেখানকার প্রাকৃতিক, খনিজ ও কৃষিজ পণ্য রুশ পুঁজিবাদের কাঁচামাল ও রসদের যোগান দেয়।

বিপ্লব পূর্ববর্তী রাশিয়ায় পুঁজিবাদ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত না হলেও তা ছিল দ্রুত বর্ধিষ্ণু। আর সেখানে পুঁজিবাদী বিকাশের তিনটি প্রধান পর্যায় ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদন (ক্ষুদ্র, প্রধানত কৃষক শিল্প), পুঁজিবাদী ম্যানুফ্যাকচার এবং ফ্যাক্টরি (বৃহদায়তন যন্ত্রশিল্প) ছিল আন্তঃসম্পর্কযুক্ত।

এ তিন পর্যায়ের পার্থক্য হলো ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রে প্রাচীন হস্তচালিত প্রযুক্তি ব্যবহƒত হয়ে আসছে। এখানে কৃষক নিজেই উৎপাদক, যিনি কাঁচামাল প্রক্রিয়াকরণের জন্যও ঐতিহ্যগত পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এটি আসে কৃষক অর্থনীতির বিকাশের অনুবর্তী হয়ে। ক্ষুদ্র শিল্পের বাজার খুবই সীমিত। অপরদিকে ম্যানুফ্যাক্টরি কাজ করে বিশাল এক বাজারের জন্য। ম্যানুফ্যাকচারে উৎপাদন প্রযুক্তি বিকশিত হয় ধীরগতিতে। কৃষক এখানে রূপান্তরিত হতে থাকেন এমন এক শ্রমিকে, যিনি উৎপাদনের একটি ক্ষুদ্র প্রক্রিয়ার সঙ্গেই শুধু জড়িত থাকেন। স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে শ্রমবিভাগ। তবে এর মাঝেও হস্তচালিত শিল্প টিকে থাকে। তবে বৃহদায়তন যন্ত্রশিল্পে মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়। কারণ তা কায়িক দক্ষতা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। উৎপাদনকে নতুন ও যুক্তিসঙ্গত নীতির ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত করে। যান্ত্রিক উৎপাদন পদ্ধতির দ্রুত অগ্রগতি পুঁজিবাদের বিকাশে বিশেষ প্রভাব রাখে। তবে তখনও পর্যন্ত যেসব শিল্প ফ্যাক্টরির অধীনে আসেনি, সেখানে প্রযুক্তির বিকাশে নিশ্চলতা দেখা যায়।

রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ গ্রন্থে লেনিন এ প্রসঙ্গে বলেন, ক্ষুদ্র পণ্যউৎপাদনের ঝোঁক হলো পুঁজিবাদের বিকাশের দিকে, বিশেষভাবে, ম্যানুফ্যাকচারের উদ্ভবের দিকে। আর ম্যানুফ্যাকচার প্রচণ্ড দ্রুততায় বৃদ্ধি পেয়ে আমাদেরই চোখের সামনে পরিণত হচ্ছে বৃহদায়তন যন্ত্রশিল্পে। শিল্পের পারস্পরিক রূপসমূহের মধ্যকার নিবিড় ও প্রত্যক্ষ সংযোগের অত্যন্ত সুস্পষ্ট প্রকাশগুলোর অন্যতম হলো সম্ভবত এই ঘটনাটি যে, বহুসংখ্যক বৃহৎ এবং বৃহত্তম ফ্যাক্টরির মালিকরা একদা ক্ষুদ্র শিল্পপতিদের মধ্যে ক্ষুদ্রতম ছিলেন এবং তারা জনপ্রিয় উৎপাদন থেকে পুঁজিবাদ পর্যন্ত এর সবগুলো পর্যায়কে অতিক্রম করেছেন।

পুঁজিবাদের বিকাশের বিভিন্ন পর্যায় সংযুক্ত রয়েছে বিভিন্ন ব্যবস্থার সঙ্গে। ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদন এবং ম্যানুফ্যাকচার চিহ্নিত রয়েছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের ব্যাপকতার দ্বারা, যেগুলোর মধ্য থেকে উত্থান ঘটে গুটিকয়েক বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের। বৃহদায়তন যন্ত্রশিল্প ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণরূপে উচ্ছেদ করে। পুঁজিবাদী সম্পর্ক উদ্ভূত হয় ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোতেও (কর্মশালায় মজুরিশ্রমিক নিয়োগের এবং বণিক পুঁজির রূপে), কিন্তু এসব সম্পর্কের এখনও বিকাশ ঘটেনি এবং দানাও বাঁধেনি উৎপাদনে অংশগ্রহণকারী গ্রুপগুলোর মধ্যে তীব্র বৈপরীত্যে। বড় পুঁজি কিংবা ব্যাপক সর্বহারাশ্রেণী, কোনোটিরই অস্তিত্ব এখনো পর্যন্ত নেই। ম্যানুফ্যাকচারের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই উভয়েরই উত্থান।

লেনিনের ভাষ্য থেকেই দেখা যায় যে, ১৮৯৯ সালে রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটছিল ঠিকই, কিন্তু তখনো পর্যন্ত সেখানে ব্যাপক আকারে বৃহৎ পুঁজি বা সর্বহারাশ্রেণীর উপস্থিতি ছিল না। আবার সেখানে ম্যানুফ্যাক্টরি কেন্দ্রিক শ্রমিকদেরও বড় আকারে উপস্থিতি ছিল। রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ গ্রন্থটি প্রকাশের ১৮ বছর পর রাশিয়ার পুঁজিবাদ যে অতিমাত্রায় বিকশিত হয়নি, তা খুবই স্বাভাবিক। সমাজ বিকাশের ধারায় ১৯১৭ সাল নাগাদ সেখানে পুঁজিবাদ যে মাত্রায় বিকশিত হয়েছিল, সেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিল্পীয় শ্রমিকের উপস্থিতি ছিল।

তিন.

উনিশ শতকের শেষে এবং বিংশ শতকের গোড়ায় পুঁজিবাদ যখন সাম্রাজ্যবাদের স্তরে প্রবেশ করলো, তখনই যুদ্ধ একেবারে অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়লো। কারণ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোতে শিল্প ও ব্যাংকের লগ্নি পুঁজি সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে, প্রয়োজন হয় নতুন বাজার, নতুন উপনিবেশের, পুঁজি রপ্তানি করার জন্য নতুন নতুন ক্ষেত্র, কাঁচামাল ও খনিজ জোগাড় করার জন্য নতুন নতুন দেশ। একে অন্যের উপনিবেশ দখল করা ছাড়া গত্যন্তর থাকল না, যেহেতু আগে থেকেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি উপনিবেশ বিস্তার করে রেখেছিল। পুঁজিবাদের অসমবিকাশের নিয়মে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির আপেক্ষিক পরিবর্তনের ফলে দুনিয়াকে নতুন করে ভাগবাটোয়ারা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে বৃহৎ একচেটিয়া অধিজাতিক কর্পোরেশনগুলি। অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ। যেহেতু দুনিয়া লুটের এই মহাযজ্ঞে ছোটবড় সকল পুঁজিপতিদের স্বার্থই নিহিত ছিল, তাই সকলেই ক্রমে ক্রমে যুদ্ধে নেমে পড়ল। ফলে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিলো।

এদিকে, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী বিপ্লবীদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের বাসেল সম্মেলনের (নভেম্বর, ১৯১২) প্রস্তাবে বলা হয়, ইউরোপের বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে বর্তমান যুদ্ধকে বিন্দুমাত্র হলেও জনগণের স্বার্থের সাথে সংগতিপূর্ণ’– এই বলে সামান্যতম অছিলায়ও সমর্থন করা যেতে পারে না, এবং এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করাকে ও পুঁজিপতিদের মুনাফার স্বার্থে নিজেদের পরস্পরকে গুলি করে হত্যা করাকে শ্রমিকরা এক নারকীয় অপরাধ হিসেবে মনে করবে। আরও ঘোষণা করা হয়েছিল, জনগণকে জাগিয়ে তোলার জন্য ও পুঁজিবাদের পতনকে ত্বরান্বিত করার জন্য সমাজতন্ত্রীদের কর্তব্য হলো যুদ্ধ যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করবে ও শ্রমিকদের মেজাজকে আগুন করে তুলবে, তার সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগানো। যুদ্ধকালীন সময়ে এই প্রস্তাবকে ধামাচাপা দিতে উঠে পড়ে লাগে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সংশোধনবাদী অংশ। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে পিতৃভূমি রক্ষার পবিত্র যুদ্ধ বলে ঘোষণার মাধ্যমে এক দেশের শ্রমিককে অন্য দেশের শ্রমিকের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলছিল। এই নির্লজ্জ বিশ্বাসঘাতকতাকে ঢেকে রাখার জন্য যুদ্ধের সাম্রাজ্যবাদী প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণী চরিত্রটিকে গুলিয়ে দিয়ে কাউৎস্কি, প্লেখানভ প্রমুখ সেদিন কুটতর্ক এনে হাজির করেছিল কে আক্রমণকারী, কে আক্রান্ত আর এই তত্ত্বের ভিত্তিতে তারা বোঝাতে চেষ্টা করেছিল যে সত্যিকারের আন্তর্জাতিকতার মানেই হলো পিতৃভূমি রক্ষার নামে জার্মান শ্রমিকদের ফরাসি শ্রমিকদেরকে, ফরাসি শ্রমিকদের জার্মান শ্রমিকদেরকে গুলি করে মারার কাজকে সমর্থন দেওয়া। এর জবাবে লেনিন ঘোষণা করেন, যদি যুদ্ধটা প্রতিক্রিয়াশীল সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ হয় অর্থাৎ যদি এই যুদ্ধ হিংস্র, লুণ্ঠনকারী, প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়াদের নিয়ে গঠিত দুই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বজোটের দ্বারা বাঁধানো হয়ে থাকে, তাহলে প্রত্যেকটি বুর্জোয়া (এমনকি ক্ষুদ্রতম দেশের হলেও) এই লুণ্ঠনে অংশগ্রহণ করে এবং বিপ্লবী সর্বহারার একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমার কর্তব্য হলো এই দুনিয়াজোড়া পাশবিক হত্যার বিভীষিকা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হিসেবে বিশ্ব সর্বহারা বিপ্লবের প্রস্তুতি নেওয়া। আন্তর্জাতিকতাবাদ বলতে এটাই বোঝায় এবং এটাই হলো আন্তর্জাতিকতাবাদীদের, বিপ্লবী সর্বহারাদের ও সত্যিকারের সমাজতন্ত্রীদের কর্তব্য।

কমরেড লেনিনের শিক্ষানুসারে, যুদ্ধ বা তীব্র সংকটের ফলে জন্ম হয় এক দুর্বল গ্রন্থির; যখন সমাজের সকল মৌলিক দ্বন্দ্বগুলো একবিন্দুতে এসে হাজির হয়। আর তখন ওই দুর্বল গ্রন্থিতে সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে যদি সেই সংকটকে কাজে লাগানোর জন্য কোনো শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি উপস্থিত থাকে। প্রথম সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়ায় এই দ্বন্দ্বগুলো এক কেন্দ্রবিন্দুতে (ফোকাল পয়েন্ট) এসে দাঁড়িয়েছিল; যেখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিপ্লবী উপাদান মজুদ ছিল। তৎকালীন রাশিয়ায় জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠের জীবন দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিল। সেখানে আদিম সাম্যবাদ থেকে আধুনিক বৃহদায়তন শিল্প পর্যন্ত সমাজ বিকাশের বিভিন্ন পর্যায় একসঙ্গে বিদ্যমান ছিল; আর সমগ্র নিপীড়িত জনগণ এক নিপীড়ক শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্ত হতে চাচ্ছিলো। আর ওই সংকটে বিপ্লবী নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য উপস্থিত ছিল শক্তিশালী বলশেভিক পার্টি।

লেনিন বলেন, আমরা রাশিয়ায় জয়ী হতে পেরেছিলাম এবং এতো সহজে জয়লাভ করেছিলাম শুধুমাত্র এই কারণে যে, সাম্রাজ্যবাদী লড়াইয়ের সময় থেকেই আমাদের বিপ্লবের জন্য আমরা তৈরি হতে শুরু করেছি। এটা ছিল প্রাথমিক শর্ত। রাশিয়ায় দশ লক্ষ শ্রমিক ও কৃষকের হাতে অস্ত্র ছিল; আর আমাদের আওয়াজ ছিল সাম্প্রতিকতম সময়ের মধ্যে যে কোনো মূল্যে শান্তি চাই। আমরা জয়লাভ করেছিলাম, কারণ কৃষক সম্প্রদায়ের বিরাট একটা অংশ বিপ্লবী চিন্তাধারা নিয়ে বড় বড় জোতদারদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়েছিল। (কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের রণকৌশলের সমর্থনে ভাষণ, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকএর তৃতীয় কংগ্রেস, ১ জুলাই ১৯২১)

গৃহযুদ্ধ প্রসঙ্গে লেনিন বলেন, গৃহযুদ্ধ একটি সত্য ঘটনা। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের গৃহযুদ্ধে পরিবর্তন, যার কথা আমরা বিপ্লব এবং যুদ্ধের শুরুতেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম এবং এতে সমাজতান্ত্রিক সমাজের একটি স্বীকৃত অংশ বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গীতে দেখেছিল সেটা ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর যুদ্ধরত দেশগুলোর অনুন্নত এবং বৃহত্তম অঞ্চলে সত্য সত্যই সংঘটিত হয়েছিল। এই গৃহযুদ্ধে জনগণের একটা বড় অংশ আমাদের পক্ষাবলম্বন করেছিল এবং সেজন্য এতো সহজে আমরা জয়লাভ করেছি। আমাদের স্লোগান, সোভিয়েতের হাতে সব ক্ষমতা এটা জনগণ দীর্ঘকালীন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছে এবং এখন এটা তাদের মজ্জাগত হয়ে গেছে। (সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক প্রতিবেদন, ৭ মার্চ ১৯১৮)

১৯১৯ সালের মার্চ মাসে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেসে শ্বেতসন্ত্রাস সম্পর্কে শীর্ষক গৃহীত প্রস্তাবে রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদী হত্যাযজ্ঞের নৃশংসতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ যখন গৃহযুদ্ধের রূপ নিতে শুরু করলো, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপরাধী দুনিয়ার শাসকশ্রেণীরা বুঝতে পারলো যে, তাদের অত্যাচারী শাসনকালের অবলুপ্তির আশংকা দেখা দিয়েছে এবং তারপর তাদের নৃশংসতা আর কোনো বাধা মানলো না।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে রক্ষা করার লড়াইয়ে বুর্জোয়াশ্রেণী অভাবিত নৃশংসতার যে কোনো পদ্ধতি ব্যবহারে প্রস্তুত; যার পাশে মধ্যযুগের অত্যাচার, ধর্মীয় বিচার (ইনক্যুইজিশন) আর উপনিবেশিক বিস্তারও ফিকে হয়ে যায়।

বুর্জোয়াশ্রেণী নিজের ধ্বংস আসন্ন বুঝতে পেরে মানব সমাজের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদিকা শক্তি সর্বহারাশ্রেণীকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। তার নীচ প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা নগ্ন হয়ে গেছে।

জার জমানার জীবন্ত প্রতিমূর্তি রুশ সেনাধ্যক্ষরা শ্রমিকদের উপর গুলি চালাচ্ছে এবং সামাজিক বেইমানদের (সোশ্যাল ট্রেইটর) (**এখানে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের কথা বলা হচ্ছে লেখক) প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাহায্যে তা চালিয়ে যাচ্ছে; সোশ্যালরেভলিউশনারি আর মেনশেভিকদের শাসনকালে হাজার হাজার শ্রমিককৃষক জেলে আটকা ছিল এবং সেনাধ্যক্ষরা আনুগত্যহীনতার জন্য রেজিমেন্টের পর রেজিমেন্ট ভেঙে দিয়েছে। মিত্র শক্তিগুলোর (entente powers) সাগ্রহ সহায়তায় ক্রাসনভ ও দেনিকিন হাজার হাজার শ্রমিককে গুলি করেছে এবং ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে, প্রতি দশজনে একজনকে হত্যা করা হয়েছে এবং জনসাধারণের মধ্যে ভীতির উদ্রেক ঘটাতে কয়েকদিন যাবৎ ফাঁসিকাষ্ঠে দেহগুলো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে; উরাল এবং ভলগা অঞ্চলে চেকোশ্লোভাকীয়রা তাদের বন্দীদের টুকরো টুকরো করে কেটেছে, ভলগায় ডুবিয়ে দিয়েছে, জীবন্ত কবর দিয়েছে; সাইবেরিয়ায় জারের সেনাধ্যক্ষেরা হাজার হাজার কমিউনিস্টকে হত্যা করেছে, অগুনতি শ্রমিককৃষককে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।

চার.

১৯১৭ সালেও রাশিয়ায় জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ছিল কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া বিপ্লব যে সাফল্যমণ্ডিত হতে পারতো না, সে কথা লেনিন বহু আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। আর রাশিয়ার আর্থসামাজিক বিশ্লেষণের ভিত্তি ছিল রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ গ্রন্থটি। সেখানে তিনি কৃষক সমাজের মধ্যকার বিভাজনও তুলে ধরেন। যা থেকে এটা নির্ধারণ করা যায়, কারা হবেন সর্বহারাশ্রেণীর সবচেয়ে কাছের মিত্রশক্তি। এরপর ১৯০২ সালে প্রকাশিত কী করতে হবে গ্রন্থে লেনিন সুস্পষ্টভাবে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ওপর জোর দেন। সেখানে তিনি যেমন অর্থনৈতিক আন্দোলন ও অর্থনীতিবাদী আন্দোলনের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন, তেমনি কৃষকদের মধ্যে সবচেয়ে নিকটবর্তী মিত্র অংশটিকে বিপ্লবে অগ্রণী ভূমিকা রাখার কথা বলেন। পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসির দুই রণকৌশল গ্রন্থেও লেনিন বিপ্লবে কৃষকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার কথা আলোচনা করেন। আর বিপ্লব পরবর্তী বিভিন্ন বিবৃতি, রাজনৈতিক প্রতিবেদন ও ভাষণে লেনিন ১৯১৭ সাল ও গৃহযুদ্ধের সময়কালে রাশিয়ার পরিস্থিতি কেমন ছিল, তা খুব পরিষ্কারভাবেই তুলে ধরেছেন।

১৯২১ সালের ১৪ অক্টোবর অক্টোবর বিপ্লবের চতুর্থ বার্ষিকী উপলক্ষে শীর্ষক বিবৃতিতে লেনিন বলেন, রাশিয়ায় বিপ্লবের সরাসরি ও আশু কর্তব্যটা ছিল বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক; মধ্যযুগীয়তার অবশেষগুলোর উচ্ছেদ, সেগুলোকে শেষপর্যন্ত চূর্ণ করা, রাশিয়া থেকে এই বর্বরতা, এই লজ্জা, আমাদের দেশের সমস্ত সংস্কৃতি ও সমস্ত প্রগতির এই প্রচন্ডতম বাধাটার বিলুপ্তি। আর সঙ্গতভাবেই আমরা গর্ব বোধ করতে পারি যে, বিলুপ্তির সেই কাজটা আমরা করেছি। ১২৫ বছর আগেকার মহান ফরাসি বিপ্লবের চেয়েও বেশি দৃঢভাবে, বেশি দ্রুত, বেশি সাহস ও সাফল্যের সঙ্গে এবং জনগণের উপর প্রতিক্রিয়ার দিক থেকে বেশি ব্যাপক ও গভীরভাবে।

বিপ্লবের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সারবস্তুর অর্থ হলো মধ্যযুগীয়তা থেকে, ভূমিদাসপ্রথা থেকে, সামন্ততন্ত্র থেকে দেশের সামাজিক সম্পর্কের (ব্যবস্থাধারার, প্রতিষ্ঠানের) মুক্তি। ১৯১৭ সাল নাগাদ রাশিয়ায় ভূমিদাসপ্রথার কোন কোন প্রধান অভিব্যক্তি, জের, অবশেষ বিদ্যমান ছিল? রাজতন্ত্র, সম্প্রদায় ব্যবস্থা, ভূম্যধিকার, ভূমিবন্দোবস্ত, নারীদের অবস্থা, ধর্ম, জাতিসত্তার পীড়ন। উন্নত রাষ্ট্রগুলো, যারা ১২৫, ২৫০ ও তারও বেশি বছর আগে (ইংল্যান্ডে ১৬৪৯ সালে) বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করেছে, তারাও এই অজিয়ান আস্তাবল অনেকাংশেই অপরিষ্কার রেখেছিল। সেই অজিয়ান আস্তাবলের যে কোনোটাকে ধরুন, দেখবেন, আমরা তা পুরো সাফ করে ছেড়েছি। ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর (গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারে ৭ নভেম্বর) থেকে শুরু করে ৫ জানুয়ারি, ১৯১৮ সংবিধান সভা ভেঙে দেওয়া অবধি এই গোটা দশেক সপ্তাহের মধ্যেই এক্ষেত্রে আমরা যা করেছি, তা বুর্জোয়া গণতন্ত্রী ও উদারনীতিকেরা (কাদেতরা) এবং পেটিবুর্জোয়া গণতন্ত্রীরা (মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্টরেভলিউশনারিরা) তাদের ক্ষমতার আট মাসে যা করেছিল তার হাজার গুণ বেশি।

১৯১৮ সালের ৭ মার্চ সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক প্রতিবেদনে লেনিন বলেন, বুর্জোয়া বিপ্লব এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মৌল পার্থক্যটা হলো বুর্জোয়া বিপ্লব, সামন্ততন্ত্র থেকে উদ্ভূত হয়, যেখানে নতুন অর্থনৈতিক সংগঠনগুলো পুরনো পদ্ধতি থেকেই উদ্ভূত হয় এবং ক্রমান্বয়ে সামন্ততান্ত্রিক সমাজের সমস্ত উদ্দেশ্যকে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত করে, বুর্জোয়া বিপ্লবকে পূর্বোক্ত সামাজিক অবস্থার সকল শৃঙ্খলকে দূরে সরিয়ে দেওয়া, তাদের ধ্বংস করা এই একটি মাত্র কাজের সম্মুখীন হতে হয়। এই কাজ সম্পূর্ণ করতে পারলেই তাদের সকল চাওয়া পূর্ণ হয়।

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অবস্থানটা সম্পূর্ণ আলাদা। ইতিহাসের উত্থানপতনের জন্য এটা প্রমাণিত যে, অধিকতর অনুন্নত দেশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শুরু করার ক্ষেত্রে প্রথম সারিতে থাকতে পারে। আবার ওইসব দেশের পক্ষে পুরাতন পুঁজিপতি সম্পর্ক থেকে সমাজতান্ত্রিক সম্পর্কে যাওয়া বিশেষ অসুবিধাজনক। আর এক্ষেত্রে সর্বহারাশ্রেণীকেই দায়িত্ব নিতে হয় বুর্জোয়ারা যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, তা পূরণ এবং একে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের অংশ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে। কারণ পুঁজিবাদ যেমন তার বিকাশের সময়ে সামন্ততন্ত্রের জন্মদাগ বহন করে, তেমনি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাও পুঁজিবাদের দাগ বহন করে। আর এর মধ্য দিয়েই সাম্যবাদের লক্ষ্যে গড়ে উঠে সমাজতান্ত্রিক কাঠামো। তৎকালীন রাশিয়ার মতো পশ্চাৎপদ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, যেখানে ভূস্বামী, ভূমি দাসত্বসহ বহু প্রাকপুঁজিবাদী ব্যবস্থা একই রূপে বিরাজমান, সেখানে সর্বহারাশ্রেণীকেই সামন্তীয় কাঠামো ধ্বংসের কাজ হাতে নিতে হয়। আর এ ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক কাঠামোতে সাময়িক সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদও আসীন থাকতে পারে। বাস্তবতা বিচারেই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া বাঞ্ছনীয়।

কোনো সমাজে সামন্ত অবশেষ ধ্বংস করাটা অবশ্যই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক কাজ, যেমনটা লেনিন উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কোন শ্রেণী ক্ষমতায় আসলো, প্রধানত কোন শ্রেণীকে উৎখাত করা হল আর তার লক্ষ্য কী, তার ওপরই নির্ভর করে বিপ্লবের ধরণ বা তার নামকরণ। রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণীকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হয়, ক্ষমতাসীন হয় সর্বহারাশ্রেণী আর তার লক্ষ্য কমিউনিজমের লক্ষ্যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। এমন ক্ষেত্রে ওই বিপ্লবকে কীভাবে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বলা যেতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তরও লেনিন নিজেই দিয়েছেন। তিনি বলেন, সোভিয়েত ব্যবস্থা হলো শ্রমিক ও কৃষকদের জন্য সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিকতা এবং সেইসঙ্গেই এটার মানে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিকতা থেকে বিচ্ছেদ এবং গণতন্ত্রের নতুন, বিশ্বঐতিহাসিক একটা ধরনের অর্থাৎ সর্বহারা গণতান্ত্রিকতার বা সর্বহারা একনায়কত্বের অভ্যুদয়। (অক্টোবর বিপ্লবের চতুর্থ বার্ষিকী উপলক্ষে, ১৪ অক্টোবর ১৯২১)

রুশ বিপ্লবের পর এই বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আসে যে, বুর্জোয়াশ্রেণীর নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব কিনা। প্রশ্ন ওঠে উপনিবেশিক সমাজে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের চরিত্র কি হবে? যদিও উপনিবেশিকতা থেকে জাতীয় মুক্তিতে সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্ব সম্পর্কে ১৮৮২ সালেই এঙ্গেলস ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কার্ল কাউৎস্কিকে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেন, স্থানীয় অধিবাসীরাই বসবাস করে এমন সব দখলীকৃত দেশ ভারত, আলজেরিয়া, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ ও স্পেনীয় অধিকৃত দেশগুলো এদের ভার সাময়িকভাবে সর্বহারাশ্রেণীকে নিতে হবে এবং যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। এ প্রক্রিয়া ঠিক কিভাবে বিকাশ লাভ করবে তা বলাটা মুশকিল। ভারতে হয়তো, প্রকৃতপক্ষেই যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, বিপ্লব করবে এবং নিজের মুক্তির প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত শ্রেণী হিসেবে সর্বহারাশ্রেণী যেহেতু কোনো উপনিবেশিক যুদ্ধ করতে পারে না, তাই সেই বিপ্লবকে তার নিজ পথে চলতে দিতে হবে। সব ধরনের ধ্বংস ছাড়া তা এগোতে পারে না। একই কথা আলজেরিয়া বা মিশরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেটাই হবে নিশ্চিতভাবে আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো বিষয়।

তবে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, একচেটিয়া কর্পোরেট পুঁজির বিশ্বব্যাপী আগ্রাসনে এখন আর কোনো দেশেই বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব নয়। আর তাই এই গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সর্বহারাশ্রেণীকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। আর তাই এই বিপ্লবের ধরণও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে ভিন্ন হতে বাধ্য।

পাঁচ.

মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, পৃথিবীর সকল সভ্যতা একইভাবে গড়ে ওঠেনি, বিকশিতও হয়নি। বরং একেক সভ্যতা তার নিজস্ব আঙ্গিকে গড়ে উঠেছে। আবার কোনো সভ্যতার কবরে অঙ্কুরিত হয়েছে নতুন কোনো সভ্যতার বীজ। তেমনি পুঁজির বিকাশও সব সমাজে একই প্রকারে সাধিত হয়নি। বিশ্বব্যাপী পুঁজির অসম বিকাশ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

আবার পুঁজিবাদ তার জন্মলগ্ন থেকেই উপনিবেশবাদী জাত্যাভিমান ও জাতিদম্ভ তার সংস্কৃতি এবং জাতিরাষ্ট্র তার হাতিয়ার। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে বুর্জোয়া বিপ্লবের সমগ্র প্রক্রিয়াকালের বাণিজ্যিক পুঁজি ছলেবলেকৌশলে পৃথিবীর বিভিন্ন সমৃদ্ধ অঞ্চলকে নিজেদের উপনিবেশিক শাসনের কবলে এনে স্বভূমির শিল্পবিপ্লবকে ও বৈষয়িক সমৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে, ফলে সেখানে জাতীয়তাবাদ ও জাতিরাষ্ট্র বৈষয়িক বিকাশের হাতিয়ার এবং জাতীয় সমৃদ্ধির সমার্থক হয়ে গেছে, যা পরবর্তীকালের শিল্পনির্ভর পুঁজিবাদ ও লগ্নিপুঁজিনির্ভর সাম্রাজ্যবাদী নীতিকে ওইসব দেশের জনগণের বৃহত্তম অংশের কাছে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। কিন্তু উপনিবেশিক, আধা বা নয়া উপনিবেশিক এবং ফেব্রুয়ারিবিপ্লবপূর্ব রাশিয়ার মতো আধাসামন্তবাদী পশ্চাৎপদ পুঁজিবাদী দেশে সর্বহারাশ্রেণীকেই গণতান্ত্রিক বিপ্লবের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়। লেনিন তাঁর দূরদর্শী মূল্যায়নে বিপ্লব পূর্ববর্তী সময়েই রাশিয়ার মতো পশ্চাৎপদ পুঁজিবাদী দেশগুলোকে বিপ্লবী ক্ষেত্র বলে উল্লেখ করেছিলেন। উপনিবেশিক, আধা বা নয়াউপনিবেশিক দেশ না হলেও রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য সামন্তবাদ ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রধান স্তম্ভ। আর বস্তুত রাশিয়ার বিপ্লব ছিল সমাজতান্ত্রিক গঠন প্রক্রিয়ার গবেষণাগার। এর আগে তত্ত্বগত বিকাশ লাভ হলেও, এবারই প্রথম হাতেকলমে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ ও তার বাস্তব চর্চাটা সামনে আসে।

বলশেভিক বিপ্লবের পর তৎকালীন রাশিয়া মুখোমুখি হয় এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের। যে কারণে লেনিনকে পশ্চাদপসরণ করতে হয় অনেক ক্ষেত্রে। ১৯১৮ সালে যে করণীয় সামনে আসে, তা হলো সোভিয়েত সরকারের আশু কর্তব্য; যা ছিল সর্বহারা বিপ্লবের পুনর্গঠনের স্বার্থে অনস্বীকার্য। উক্ত রচনায় কমরেড ভ্লাদিমির লেনিন বলেন, এরকম একটি বিপ্লবকে সাফল্যমণ্ডিত করা যেতে পারে কেবলমাত্র যদি জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এবং প্রধানত মেহনতি জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠরা ইতিহাসের স্রষ্টা হিসেবে স্বাধীন সৃজনশীল কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কেবলমাত্র যদি সর্বহারা এবং দরিদ্র কৃষকেরা যথেষ্ট শ্রেণীসচেতনতা, আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা, আত্মত্যাগ ও অধ্যবসায় প্রদর্শন করেন; তাহলেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয় সুনিশ্চিত হবে। স্বাধীনভাবে নতুন সমাজ গড়ে তোলার কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয় এমন এক রাষ্ট্র, সোভিয়েত ধরনের রাষ্ট্র গঠন করে আমরা এই কঠিন সমস্যার একটি ক্ষুদ্র অংশেরই সমাধান শুরু করেছি মাত্র।

গৃহযুদ্ধ চলমান এমন এক দেশে ক্ষমতা দখল করাটাই সর্বহারাশ্রেণীর জন্য যথেষ্ট ছিল না; প্রয়োজন পড়ে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের; দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির। আর এজন্য দরকার পড়ে বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের।

বিপ্লব পরবর্তী পশ্চাদপসরণ সম্পর্কে লেনিন বলেন, উচ্চস্তরের বিশেষজ্ঞদের রাষ্ট্র কাজে লাগাতে পারে দুইভাবে পুরনো বুর্জোয়া পদ্ধতিতে (অর্থাৎ অনেকবেশি বেতন দিয়ে); নয়তো নতুন সর্বহারা পদ্ধতিতে। আমাদের এখন পুরনো বুর্জোয়া পদ্ধতিই গ্রহণ করতে হবে এবং উচ্চস্তরের বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের কাজের জন্য অত্যন্ত বেশি বেতন দিতে আমাদের সম্মত হতে হবে। এই ব্যাপারটির সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে তারা সকলেই এর গুরুত্ব উপলব্ধি করেন; কিন্তু সর্বহারা রাষ্ট্র কর্তৃক এই ব্যবস্থা অবলম্বনের গুরুত্ব সম্পর্কে সকলেই চিন্তা করে দেখেন না। সুস্পষ্টভাবেই, এই ব্যবস্থা হলো একটা আপস, এটা হলো প্যারি কমিউনের এবং প্রতিটা সর্বহারা রাষ্ট্রশক্তির মূলনীতির ব্যতিক্রম এই মূলনীতি সকলের বেতনকেই সাধারণ শ্রমিকের মজুরির স্তরে নিয়ে আসার আহবান জানায় এবং এই কথাই ঘোষণা করে যে, ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার উচ্চাকাক্সক্ষার ধারণার বিরুদ্ধে শুধু কথায় নয়, কাজেও লড়াই করতে হবে।

এই ব্যবস্থা অবলম্বনের মানে শুধু এই নয় যে, পুঁজির বিরুদ্ধে (পুঁজি কতোগুলো টাকার যোগফল নয়, পুঁজি একটা সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক) অভিযান কয়েকটি ক্ষেত্রে এবং বেশকিছু মাত্রায় বন্ধ করা হচ্ছে; এর আরও মানে হলো যে, আমাদের সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাষ্ট্রশক্তি এক পা পিছু হটে এসেছে; আমাদের এই সোভিয়েত রাষ্ট্র গোড়াতেই বড় বড় অফিসারদের বেতন কমিয়ে সাধারণ শ্রমিকের মজুরির স্তরে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল এবং এই নীতিই অনুসরণ করে চলেছিল।

বেশি বেতনে বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের নিযুক্ত করা যে প্যারি কমিউনের মূলনীতি থেকে পশ্চাদপসরণ, সে কথা জনসাধারণের কাছ থেকে গোপন করে রাখার মানে হবে বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদের স্তরে পতিত হওয়া এবং জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা। এই এক পা পিছু হটার ব্যবস্থা কি পরিস্থিতিতে এবং কেন আমরা অবলম্বন করলাম; তা খোলাখুলিভাবে ব্যাখ্যা করা এবং তারপর যে সময় নষ্ট হয়েছে তা পূরণ করার কি কি পন্থা উন্মুক্ত রয়েছে; তা প্রকাশ্যে আলোচনা করার অর্থ হলো জনগণকে শিক্ষিত করে তোলা এবং অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা; কিভাবে সমাজতন্ত্র গড়তে হবে তা জনগণের সঙ্গে এককাতারে শেখা। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আমরা যে অভিযান আরম্ভ করেছি; তা সবচেয়ে কঠিন; সামরিক অভিযানের চেয়েও লাখো লাখো গুণ কঠিন। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ বা আংশিক পশ্চাদপসরণ ঘটেছে বলে হতাশায় ম্রিয়মান হয়ে পড়া হবে নির্বোধের কাজ এবং অপমানজনক। (সোভিয়েত সরকারের আশু কর্তব্য)

বিপ্লবের এই প্রেক্ষাপটে লেনিন বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর কথা উল্লেখ করেছেন। এই সময়কালেই রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব করেন। তিনি দেশব্যাপী জনগণকে শিক্ষিত করে তোলার; নতুন সংস্কৃতিকে ধারণ করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। অনভিজ্ঞ সোভিয়েত সরকার হিসাবরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সংগঠিত করতে পারছিল না। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন বৃদ্ধি করাও সম্ভব হচ্ছিলো না; আর তাই সার্বিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য দরকার পড়ে পশ্চাদপসরণের।

লেনিন বলেন, শ্রমের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি করার অন্য শর্ত হলো প্রথমত, ব্যাপক জনসাধারণের শিক্ষা ও সংস্কৃতির মান উন্নত করা। এটা এখন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ঘটছে; বুর্জোয়া রুটিনের বাইরে যারা কিছু দেখতে পায় না, তারাই এই ঘটনা লক্ষ্য করতে অক্ষম; সোভিয়েত ধরনের সংগঠনের ফলে জনগণের নি¤œতরস্তরে জ্ঞানার্জনের জন্য এবং উদ্যোগ গ্রহণের জন্য যে কী বিরাট আগ্রহ এখন বিকশিত হচ্ছে; তা বুঝতে তারা অক্ষম। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের ব্যবস্থা করতে হলে শ্রমজীবী জনগণের শৃঙ্খলা, তাদের দক্ষতা, কর্মকুশলতা, শ্রমের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির ধারা উন্নত করতে হবে এবং উন্নততর সংগঠন গড়তে হবে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এক অস্বাভাবিক রকমের কঠিন, জটিল এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে কৌশল প্রয়োগ করার এবং পশ্চাদপসরণ করার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে; পশ্চিমা দেশগুলোতে দুঃখজনক মন্থরগতিতে বিকাশ লাভ করছে, সেখানে বিপ্লবের নতুন নতুন বহিঃপ্রকাশের জন্য অপেক্ষা করে থাকারই পর্যায় চলছে। দেশের মধ্যে চলছে ধীরগতিতে নির্মাণকার্যের এবং নির্মমভাবে নিয়মশৃঙ্খলা কঠোর করার পেটিবুর্জোয়া বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের উপাদানের বিরুদ্ধে সুদৃঢ় সর্বহারা শৃঙ্খলার দীর্ঘস্থায়ী ও দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ একটানা সংগ্রামের পর্যায় সংক্ষেপে এটা হলো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যে বিশেষ স্তরে আমরা এখন অবস্থান করছি, তার বৈশিষ্ট্যসূচক লক্ষণগুলো। ()

উন্নত শিক্ষাসংস্কৃতিতে ঋদ্ধ জনগণের মানোন্নয়নের মাধ্যমেই কেবল এই পশ্চাদপসরণ থেকে সরে আসা সম্ভব; কারণ মেহনতি জনগণকে বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের স্থানপূরণে সক্ষম করে তোলা সম্ভব হলে ওই বিশেষজ্ঞদের যেমন প্রয়োজন ফুরোবে; তেমনি অর্থনৈতিক পুনর্গঠনেও রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রক্ষমতায় কোনো মিত্রশক্তি না থাকায় উৎপাদিকাশক্তি বৃদ্ধির কাজটাও সোভিয়েত সর্বহারাদের নিজেদেরই করতে হচ্ছিলো। আর এজন্য বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন হয়। এই বিশেষজ্ঞদের বেশিরভাগই বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গীসম্পন্ন। আর এটাই স্বাভাবিক; যেহেতু তারা ওই বুর্জোয়া সাংস্কৃতিক চেতনাতেই গড়ে উঠেছেন। লেনিনের মতে, এসব বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার মধ্য দিয়ে তাদের বুর্জোয়া চেতনা থেকে বাইরে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে। আর পশ্চাদপসরণের ঐতিহাসিক শিক্ষা থেকে আমরা বুঝতে সক্ষম হই যে, সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ প্রক্রিয়া কখনোই সরলরৈখিক নয়।

লেনিন বলেন, পুরাতন শ্রেণীকে সরিয়ে নতুন শ্রেণী ক্ষমতায় এসে তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে কেবলমাত্র অন্য শ্রেণীর সঙ্গে সংগ্রাম করে। আর তারা তখনই চূড়ান্তভাবে সাফল্য অর্জন করতে পারে যখন তারা সমস্ত শ্রেণীর বিলোপ সাধন করতে পারে। শ্রেণীসংগ্রাম এই জটিল এবং বিস্তৃত পদ্ধতি দাবি করে। অন্যথায় আপনারা বিভ্রান্তির অতলে তলিয়ে যাবেন। (রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিবেদন, ২৯ মার্চ ১৯২০)

লেনিন এখানে সমাজতন্ত্রের সুদীর্ঘ পর্যায় জুড়ে শ্রেণীসংগ্রামের আবশ্যকতার কথাই উল্লেখ করেছেন। সেই সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক গঠনে পরাজিত শ্রেণীকে ব্যবহারের ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। যখন বুর্জোয়ারা সামন্ততান্ত্রিক প্রভুদের ডিঙিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল, তখন তাদের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য ওই সামন্ততান্ত্রিক শাসকদের থেকেই অভিজ্ঞ লোকের প্রয়োজন পড়ে। আর এর মধ্য দিয়েই পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে। কোনো ব্যবস্থাই আকাশ থেকে নেমে আসেনি। মার্কস যথার্থই বলেছিলেন, প্রতিটা সমাজই তার পূর্ববর্তী সমাজের জন্মদাগ বহন করে। আর তাই তা পরিচালনার জন্য পূর্বতন ব্যবস্থা থেকে অভিজ্ঞদের ব্যবহার করা যেতে পারে। আর ওই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেই এগোতে হবে। সর্বহারাশ্রেণী ক্ষমতাসীন হলেও এমনি করে দরকার পড়ে পূর্বতন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতাকে। এখানে মূল বিষয়টা হলো কোন শ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন রয়েছে, সেটা। আর সেই শ্রেণীর আধিপত্যের লক্ষ্যেই ওই অভিজ্ঞতাকে ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে।

লেনিন বলেন, শাসনকার্য এবং রাষ্ট্রগঠনের কাজে আমাদের এমন লোকদের দরকার যারা প্রশাসনের পদ্ধতি জানেন এবং যাদের রাষ্ট্র এবং ব্যবসার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আর তা অন্য কোনো শ্রেণী নয়, আমরা কেবলমাত্র পুরাতনশ্রেণীর ওপর নির্ভর করতে পারি।

আমরা যে শ্রেণীকে উৎখাত করেছি, তাদের লোকজনদের দিয়েই আমাদের প্রশাসনিক কাজ চালাতে হবে। তারা নিজেদের শ্রেণীর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন রয়েছে, তাদের শিক্ষিত করতে হবে। একই সময়ে আমাদের নিজেদের শ্রেণী থেকেও প্রশাসক নিয়োগ করতে হবে। কমিউনিস্টদের তত্ত্বাবধানে মেহনতি কৃষক, কারখানা শ্রমিক, প্রাপ্তবয়স্ক সর্বহারাদের শিক্ষিত করার কাজে আমাদের সমস্ত রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করতে হবে। ()

সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্যের জন্য লেনিন তিনটি তত্ত্ব প্রদান করেন () সম্পত্তি সম্পর্কের বদল; () পূর্ববর্তী শাসকশ্রেণীর অভিজ্ঞদের থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা; এবং () শ্রমিকশ্রেণী থেকে জাতীয় স্তরে প্রশাসক নিয়োগ এবং এই শ্রেণীকে প্রশিক্ষিত করে তোলা।

ছয়.

কৃষিপ্রধান দেশে বিপ্লবের ক্ষেত্রে কৃষিঅর্থনীতির পুনর্গঠন আবশ্যক। সোভিয়েত রাশিয়াতেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। কৃষকদের সমবায় ও কমিউনগুলোকে শক্তিশালী করা এবং একচেটিয়াগুলোর বাজেয়াপ্তকরণ হলো এর কেন্দ্রীয় বিষয়। এখানে কৃষকদের শ্রেণীবিভাগ বোঝাটাও জরুরি। কৃষিপ্রধান দেশে কৃষিমজুর ও ভূমিহীন কৃষক বিপ্লবের চালিকাশক্তি। আর স্বল্প পরিমাণ জমিসম্পন্ন কৃষক হলো সর্বহারাশ্রেণীর নিকটতম মিত্র; মাঝারি কৃষক দোদুল্যমান মিত্র এবং বৃহৎ কৃষক দূরবর্তী মিত্র। মাঝারি কৃষক সমাজতন্ত্রের প্রতি শর্তনিরপেক্ষ পূর্ণ আস্থা রাখবে, এমনটা প্রত্যাশা করা যায় না। তারা তখনই সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করবে, যখন তারা বুঝতে পারবে যে, বুর্জোয়ারা পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার পর সমাজতন্ত্র ছাড়া আর কোনো পথ নেই। মাঝারি কৃষক ও পেটিবুর্জোয়াদের সঙ্গে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার।

এ প্রসঙ্গে লেনিন বলেন, আমরা মাঝারি কৃষকদের অধিকারচ্যুত করতে চাই না এবং পেটিবুর্জোয়া গণতান্ত্রিকদের বিরুদ্ধে কোনো শক্তি প্রয়োগ করতেও চাই না। আমরা তাদের বলি যে, আপনারা আমাদের কোনো বিপজ্জনক শত্রু নন আমাদের মূল শত্রু হলো বুর্জোয়ারা। কিন্তু আপনারা যদি তাদের সঙ্গে যোগ দেন, তাহলে আমরা আপনাদের প্রতিও সর্বহারাদের গৃহীত পদক্ষেপ প্রয়োগ করতে বাধ্য হবো। (কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিবেদন, ১৮ মার্চ ১৯১৯)

তিনি আরও বলেন, রাশিয়ার কৃষকদের একটা বড় অংশই মাঝারি কৃষক, সেজন্য ব্যক্তিগত ভিত্তিতে বিনিময়ের জন্য ভীত হবার কোনো কারণ নেই। রাষ্ট্রের সঙ্গে বিনিময়ের জন্য প্রত্যেকেই কিছু না কিছু দিতে পারে। প্রথমত, তাদের উদ্বৃত্ত শস্য; দ্বিতীয়ত, তাদের উৎপাদিত শস্য; তৃতীয়ত, তাদের শ্রম। ()

ক্ষুদ্র সম্পত্তির মালিকানা এবং মাঝারি কৃষকদের প্রশ্নে সোভিয়েত রাষ্ট্রের গৃহীত পরিকল্পনার ৪৭ নং ধারায় বলা হয়, মাঝারি কৃষকদের ব্যাপারে রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির নীতি হবে তাদের ধীরে ধীরে সমাজতান্ত্রিক গঠনের কাজে টেনে আনা। এর জন্য দলকে কতোগুলো কাজে ব্রতী হতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম হলো কুলাকদের থেকে তাদের আলাদা করা, তাদের বিভিন্ন প্রয়োজনের দিকে দৃষ্টি রেখে, আদর্শগত অস্ত্রে তাদের অনুন্নতিকে দূর করে, কোনোরূপ দমনমূলক আচরণ না করে, তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল ব্যাপারে প্রয়োজনবোধে কোনো বাস্তব চুক্তি করে, সমাজতান্ত্রিক গঠনের জন্য তাদের প্রয়োজনীয় সুবিধা দান করে ওই শ্রেণীকে মেহনতি মানুষের কাতারে এনে দাঁড় করাতে হবে।

এঙ্গেলসের বরাতে লেনিন আরও বলেন, এঙ্গেলসই কৃষকদের ছোট, মাঝারি এবং বৃহৎ এই তিন বিভাগকে নির্দেশ করেন এবং ইউরোপের বহুদেশে এখনও এই বিভাগ চালু রয়েছে। এঙ্গেলস বলেছিলেন, হয়তো কোনো কোনো জায়গায় বড় কৃষকদেরও দমন করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই; আর মাঝারি কৃষকদের উপর অহেতুক বলপ্রয়োগ করার কথা কোনো অনুভূতিসম্পন্ন সমাজতন্ত্রী চিন্তাও করতে পারেন না (ছোট কৃষকরা আমাদের বন্ধু)

১৯১৮ সালেই সোভিয়েত রাষ্ট্রে দরিদ্র কৃষক সমিতি গঠিত হয়। লেনিন যেমন বলেছেন যে, এই দরিদ্র কৃষক সংগঠন কাজ শুরু করলেই তা সমাজতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হতে পারে। যখন বিপ্লব গ্রামাঞ্চলে, প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছানো সম্ভব হবে; তখনই তা সর্বহারা বিপ্লবের ভিত্তিকে মজবুত করতে পারবে। গ্রামীণ অর্থনীতির অগ্রগতি সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

লেনিন বলেন, গত বছরে রাজনৈতিক নেতৃত্বগ্রহণের ফলে আমরা প্রধান যে শিক্ষাটি লাভ করেছি তা হলো এই ক্ষেত্রে সাংগঠনিক সমর্থন অর্জন করতে হবে। যেসব ক্ষেত্রে আমরা চরম অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছিলাম, সেসব ক্ষেত্রে দরিদ্র কৃষক সমিতি গঠন করে, সোভিয়েতগুলোর নতুন নির্বাচন করে, এবং খাদ্যনীতির পরিবর্তন করে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। রাশিয়ার সেই সকল দূরবর্তী জায়গা যেমন, ইউক্রেন এবং ডন অঞ্চল এইসব জায়গায় এই নীতিকে হয়তো পরিবর্তন করতে হতে পারে। রাশিয়ার সব জায়গার জন্যও একই ধরনের আইন প্রণয়ন করা অসঙ্গত হবে। (কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিবেদন, ১৮ মার্চ ১৯১৯)

মার্কসবাদকে বাস্তবিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ভৌগোলিক, আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ভিন্নতাকে মাথায় নিয়ে প্রয়োগের কথাই বলেছেন লেনিন। যান্ত্রিক প্রয়োগ কখনোই উত্তরণের পথ নির্দেশ করে না।

লেনিন বলেন, এটা খুবই স্বাভাবিক যে, যখন সর্বহারা বিপ্লব দানা বেঁধে উঠছে, তখন সামাজিক জীবনে প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোকে একদম সামনে নিয়ে আসতে হবে। এটা আরও নিশ্চিত যে, বিপ্লব কোনো একটিমাত্র দল বা সরকার নয়, জীবনের সর্বাপেক্ষা গূঢ় ভিত্তি এবং জনসংখ্যার এক বিরাট অংশের ওপর তার প্রতিক্রিয়া বিস্তার করে, সে একইসঙ্গে জীবনের সকল অংশকে জড়িয়ে নিতে পারে এবং যদি এখন আমরা মফস্বলের কাজ নিয়ে আলোচনা করি এবং সেই সঙ্গে মাঝারি কৃষকদের অবস্থাকেও বিশেষ গুরুত্ব দিই, তখন সাধারণভাবে সর্বহারা বিপ্লবের দৃষ্টিকোণ থেকে সেটা অস্বাভাবিক কিছু হবে না। (মফস্বলের কাজের প্রতিবেদন, ২৩ মার্চ ১৯১৯)

১৯১৭ সালের অক্টোবরে কয়েক লক্ষ কৃষক বিপ্লবে সামিল হয়েছিলেন। তারা একচেটিয়া কারখানা আর ব্যাংকের হাত থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগের মতো অগ্রসর তারা ছিল না। আর এক্ষেত্রেই আবশ্যক হয় সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্ব।

লেনিন বলেন, ১৯১৮ সালের গ্রীষ্মকালে গ্রামীণক্ষেত্রে সত্যিকারের সর্বহারা বিপ্লব শুরু হয়েছিল। যদি আমরা এই বিপ্লবকে উজ্জীবিত করতে না পারি, তাহলে আমাদের কাজ অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। প্রথম স্তর হলো শহরে ক্ষমতা অধিগ্রহণ এবং সোভিয়েত ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠা। দ্বিতীয় স্তর হলো তা, যা সকল সমাজতন্ত্রীদের জন্য মৌলিক ব্যাপার এবং যা বাদ দিলে কেউ সমাজতন্ত্রী হয়ে উঠতে পারে না। আর তা হলো গ্রামীণ জেলাগুলোতে সর্বহারা এবং আধাসর্বহারা উপাদানগুলোকে আলাদা করা এবং মফস্বলে সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য শহরের সর্বহারাদের সঙ্গে তাদের সমঝোতা করিয়ে দেওয়া। ()

তৎকালীন রাশিয়া ছিল এমন একটি দেশ; যেখানে কারখানার শ্রমিকেরা সংখ্যালঘু এবং কৃষকেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই দুটো শ্রেণীর স্বার্থ ভিন্ন; কৃষক ও শ্রমিক এক জিনিস নয়। কৃষকদেরক তথা সমগ্র জনগণকে সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্যে টেনে আনতে অবশ্যই নতুন শিক্ষাসংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ করে তোলার প্রয়োজন পড়ে। গ্রামের কৃষকদের উৎপাদিত শস্যের সঙ্গে শিল্প দ্রব্যের অধিকমাত্রায় বিনিময় কৃষকের জীবনযাত্রা, উৎপাদনের মান এবং চেতনা জগতের পরিবর্তন করতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের সমবায় স্থাপনের উপর লেনিন গুরুত্বারোপ করেন।

সাত.

অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য নয়াঅর্থনৈতিক কার্যক্রম গৃহীত হয় ১৯২১ সালের মার্চে রুশ কমিউনিস্ট পার্টির দশম কংগ্রেসে লেনিনের প্রতিবেদন অনুসারে। এর ভিত্তি ছিল কর হিসেবে দ্রব্য দেয়া, যা যুদ্ধকালীন কমিউনিজমের সময়কার বাড়তি সামগ্রী দখলের বদলি হয়েছিল। নয়াঅর্থনৈতিক কার্যক্রম প্রবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল সমাজতান্ত্রিক কাঠামোতে কোটি কোটি কৃষককে শরিক করা, শ্রমিক ও কৃষকের ঐক্য মজবুত করা এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সৃষ্টি।

এই কার্যক্রম অনুসারে, কৃষকেরা উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সুযোগ পান। আর এই উদ্বৃত্ত ফসলের মাধ্যমে তারা নির্ধারিত খাজনা পরিশোধেরও সুযোগ পান এবং খাজনা দেওয়ার পর উদ্বৃত্ত অংশ নিজেদের ইচ্ছামাফিক বিক্রয় করারও সুযোগ তাদের দেওয়া হয়। রাষ্ট্রের সঙ্গে বিনিময়ের সুযোগও কৃষকদের দেওয়া হয়। আর এর ফলে ব্যক্তিগত বাণিজ্য এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের অনুমোদন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। লক্ষ্য ছিল দ্রুত শস্য উৎপাদন বাড়ানো। আর এই শস্যের উদ্বৃত্ত বৃহৎ শিল্পের বিকাশের সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। এই কার্যক্রমও নিশ্চিতভাবেই পশ্চাদপসরণ। লেনিন এই ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ বলে অভিহিত করেন। একইসঙ্গে তিনি একে সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর সিড়ি বলেও উল্লেখ করেন।

এ প্রসঙ্গে লেনিন বলেন, উদ্দীপনার তরঙ্গে উত্থিত হয়ে, প্রথমে জনগণের সাধারণ রাজনৈতিক ও পরে সামরিক উদ্দীপনাকে জাগিয়ে তুলে আমরা সরাসরি ওই উদ্দীপনার জোরেই (সাধারণ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তব্যের মতো) সমান বৃহৎ অর্থনৈতিক কর্তব্যকেও সাধন করার ভরসা করেছিলাম। আমরা ভরসা করেছিলাম, অথবা বোধ হয় সঠিকভাবে বললে, যথেষ্ট বিচার না করেই আমরা অনুমান করেছিলাম যে, সর্বহারা রাষ্ট্রের সরাসরি আদেশেই একটা ক্ষুদে কৃষকপ্রধান দেশে কমিউনিস্ট ধরনের রাষ্ট্রীয় উৎপাদন এবং উৎপাদনের রাষ্ট্রীয় বণ্টনের সুব্যবস্থা করা যাবে। বাস্তব জীবন আমাদের ভুল ধরিয়ে দিয়েছে। দরকার হয়েছে একগুচ্ছ উৎক্রমণ পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের, যাতে কমিউনিজমে উত্তরণের প্রস্তুতি করতে হবে বহু বছরের কাজের মাধ্যমে। সরাসরি উদ্দীপনা দিয়ে নয়, বরং মহাবিপ্লবে প্রসূত উদ্দীপনাটার সাহায্য নিয়ে, ব্যক্তিগত স্বার্থের ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত স্বার্থপ্রেরণার ভিত্তিতে, অর্থনৈতিক হিসাবের ভিত্তিতে আগে সেসব মজবুত সেতু নির্মাণের কাজে করুন, যা ক্ষুদে কৃষকপ্রধান দেশকে সমাজতন্ত্রে পৌঁছে দেয় রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের মধ্য দিয়ে, অন্যথায় আপনারা কমিউনিজমে পৌছবেন না, অন্যথায় কোটি কোটি মানুষকে আপনারা কমিউনিজমে নিয়ে যেতে পারবেন না। বাস্তব জীবনই আমাদের এই কথা বলেছে। এই কথা বলেছে বিপ্লব বিকাশের বাস্তব গতি।

আমাদের শেষ কাজটা কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে কঠিন এবং সবচেয়ে অসমাপ্ত কাজটা হলো অর্থনৈতিক ন্মিাণ, চূর্ণবিচূর্ণ সামন্তবাদী ও অর্ধচূর্ণ পুঁজিবাদী ইমারতটার জায়গায় নতুন সমাজতান্ত্কি ইমারতের অর্থনৈতিক বনিয়াদ স্থাপন। এই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে কঠিন কাজটায় আমরা সবচেয়ে বেশি অসফল্। এখানেই ভুল হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এমন বিশ্বঐতিহাসিক নতুন কাজটা শুরু করতে গেলে কী আর ভুলভ্রান্তি হবে না কিন্তু কাজটা আমরা শুরু করেছি। কাজটা আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। ঠিক এই বারই আমরা আমাদের নয়া অর্থনৈতিক কর্মনীতি দিয়ে আমাদের একগুচ্ছ ভুল শুধরে নিচ্ছি, ক্ষুদে কৃষকপ্রধান এক দেশে সমাজতান্ত্কি ইমারতটার নির্মাণ কীভাবে চালিয়ে যেতে হয় ভুল না করে, সেটা আমরা শিখে নিচ্ছি। (অক্টোবর বিপ্লবের চতুর্থ বার্ষিকী উপলক্ষে, ১৪ অক্টোবর ১৯২১)

নয়াঅর্থনৈতিক কার্যক্রমএর আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিদেশি পুঁজিপতিদের রাশিয়াতে আসার সুযোগ দেওয়া। জ্বালানি, খনিজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানিকে রাশিয়ায় ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রথমদিকে, এই বিদেশি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতে গিয়ে বেশকিছু ছাড়ও দিতে হয়েছিল; আর এই সবকিছু থেকেই অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছিল; যা পরবর্তীতে সংশোধিত হয়েছিল। যেখানে জনগণের স্বার্থকেই সর্বাগ্রে স্থান দেওয়া হয়েছিল। একইসঙ্গে সেখানে বেশকিছু মিশ্র সংস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব সংস্থা বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ কারখানা গড়ে তোলে। অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত একটা দেশে এই উদ্যোগ নিতে হয়েছিল নিজেদের শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার স্বার্থে।

লেনিন তৎকালীন রাশিয়ার অর্থনৈতিক উপাদানগুলোকে এভাবে উল্লেখ করেন. পিতৃগত আদিম চেহারার কৃষিব্যবস্থা; . ক্ষুদ্রায়তনে পণ্য উৎপাদন (যেসব কৃষক শস্য বিক্রি করে, তাদের বেশিরভাগই পড়ে এর মধ্যে); . ব্যক্তি মালিকানাধীন পুঁজিবাদ; . রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ; এবং ৫. সমাজতন্ত্র। রাশিয়ার বিশাল আয়তনে বিপ্লবপরবর্তী পুনর্গঠনের সময়ে এমন বৈচিত্র্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থাকাটা খুবই স্বাভাবিক; আর এসবের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্য পরিচালনা ছিল এক অসাধ্য সাধনের মতো ব্যাপার; যা লেনিন করেছিলেন। তৎকালীন রাশিয়ায় উৎপাদনের সামাজিকীকরণ একইপ্রকারে সকল স্থানে বর্তমান ছিল না। উক্ত অর্থনৈতিক উপাদানগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদই এই সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারতো। আর যেহেতু সর্বহারাশ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন এই সামাজিকীকরণের মানে হলো সমাজতান্ত্রিক গঠনের দিকেই আরেকধাপ অগ্রসরতা। তবে এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, কোনো অসমাজতান্ত্রিক উপাদান যেন অধিক প্রাধান্য না পায়। লেনিন বলেন যে, সমাজতন্ত্রকে জয়ী হতে হলে গ্রাম ও শহরের মাঝে পণ্য বিনিময় বাড়াতে হবে। সমাজতান্ত্রিক শিল্পব্যবস্থা এবং কৃষকদের কৃষি কাজের মাঝে সুদৃঢ় বন্ধন আবশ্যক। আর এই ব্যবস্থাপনা ও বিচক্ষণ বাণিজ্যের কৌশল রপ্ত করেই এই সংগ্রামে জয়ী হওয়া সম্ভব।

সোভিয়েতসমূহে পুঁজিবাদের উপস্থিতি সম্পর্কে লেনিন বলেন, করের বিনিময়ে দ্রব্য সামগ্রী মানেই হলো বাণিজ্যিক স্বাধীনতা। করের বিনিময়ে দ্রব্য সামগ্রী দেবার পর অবশিষ্ট খাদ্যাংশ নিয়ে কৃষক যেভাবে খুশী বিনিময় করতে পারে। বাণিজ্যিক স্বাধীনতার অর্থ হলো পুঁজিবাদের স্বাধীনতা; তবে সে স্বাধীনতা কিছুটা নতুন ধরনের। এর অর্থ হলো আমরা খানিকটা নতুন করে পুঁজিবাদ তৈরি করছি। খোলাখুলিভাবে আমরা একাজটাই করছি। এটা হলো রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ। বুর্জোয়া কর্তৃত্বাধীন কোনো সমাজে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ আর সর্বহারাশ্রেণীর কর্তৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ দুটো ভিন্ন চিন্তাধারা। একটা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের অর্থ হলো এই পুঁজিবাদ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি প্রাপ্ত এবং বুর্জোয়াশ্রেণীর উপকারার্থে এবং সর্বহারাশ্রেণীর অপকারার্থেই পরিচালিত। আর সর্বহারাশ্রেণীর কর্তৃত্বে পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থাতে তা কার্যকর থাকে সর্বহারাশ্রেণীর উপকারার্থে; এখনও পর্যন্ত টিকে থাকা জাঁদরেল বুর্জোয়াদের প্রতিরোধ করা এবং সংগ্রাম পরিচালনার স্বার্থেই সবকিছু ঘটে থাকে। (রুশ কমিউনিস্ট পার্টির রণকৌশল সংক্রান্ত প্রতিবেদন, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকএর তৃতীয় কংগ্রেস, ২৫ জুলাই ১৯২১)

তিনি আরও বলেন, আমরা যে প্রকার পুঁজিবাদ চালু করেছি সেটা অপরিহার্য। যদি এটা কুৎসিত ও খারাপ হয়; তবে আমরা একে শোধরাবার চেষ্টা করবো; কারণ ক্ষমতা আমাদের হাতে

আমরা নিশ্চয় শিখবো, আমরা নিশ্চয় লক্ষ্য রাখবো যে, একটি সর্বহারা রাষ্ট্রে সর্বহারাদের দ্বারা বর্ণিত রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের কাঠামো ও শর্তের বাইরে যেন তা না চলে যায়। সর্বহারাশ্রেণীর উপকারে আসবে এমন অবস্থার বাইরে যেন না যায়।

আমরা পুঁজিবাদকে অনুমোদন করেছি; কিন্তু কৃষকদের প্রয়োজনের সীমার মধ্যে। এটা অপরিহার্য। এটা ছাড়া কৃষকরা বাঁচতে পারতো না এবং তাদের কৃষিকাজ চালাতে পারতো না। (কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক প্রতিবেদনের সমাপ্তি ভাষণ, ২৮ মার্চ ১৯২২)

১৯২২ সালের পার্টি কংগ্রেসেই লেনিন বলেন, নয়াঅর্থনৈতিক কার্যক্রম গ্রহণ করে এক বছর যাবৎ আমরা পিছু হটেছি। এখন পার্টির নামে পশ্চাদপসরণ বন্ধের আহবান জানাতে হবে। পশ্চাদপসরণের যে উদ্দেশ্য ছিল, তা পূরণ হয়েছে। পশ্চাদপসরণের এই যুগ শেষ হয়েছে বা হচ্ছে। এখন আমাদের উদ্দেশ্য স্বতন্ত্র নিজেদের শক্তিকে নতুন করে বিন্যস্ত করা।

এখানে লেনিন সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণে নতুন উদ্যমে সামিল হওয়ার আহবান জানাচ্ছেন। অবশ্যই এই বিনির্মাণকালও সমাজতন্ত্রের অংশ নিত্যনতুন বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সমাজতন্ত্রের নতুন সংযোজনবিয়োজনও অবশ্যম্ভাবী। আর তাতে পশ্চাদপসরণের কালে গৃহীত কর্মসূচীও এক নিমিশেই মিলিয়ে যায় না; বরং পর্যায়ক্রমে তা সমাজতান্ত্রিক রূপ পরিগ্রহ করে।

সর্বহারাশ্রেণীর মহান শিক্ষক কমরেড লেনিনের পর সোভিয়েতের সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ কাজ পরিচালিত হয় কমরেড জোসেফ স্তালিনের নেতৃত্বে। উল্লেখ্য, ১৯২২ সালের ৩ এপ্রিল সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে কমরেড লেনিনের প্রস্তাবে স্তালিন পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। একই বছরে গঠিত হয়েছিল ইউনাইটেড সোভিয়েত সোস্যালিস্ট রিপাবলিক (ইউএসএসআর)

লেনিনের জীবনাবসানের পর পার্টির অভ্যন্তরে তীব্র মতাদর্শগত বিরোধ দেখা দেয়। স্তালিন একদিকে নবগঠিত সোভিয়েতে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণকাজ চালু রাখেন; অন্যদিকে আন্তঃপার্টি সংগ্রাম চালিয়ে যান ট্রটস্কিবুখারিনজিনোভিয়েভকামেনেভরাডেক চক্রের বিরুদ্ধে। বিভেদবাদীরা পার্টি, কমরেড স্তালিন ও সোভিয়েত সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ চালাতে থাকে। এই সংকটের মধ্যেই মার্ক্সবাদের বিকশিত তত্ত্বকে লেনিনবাদ হিসেবে সূত্রবদ্ধ করেন কমরেড স্তালিন। এর সংজ্ঞা নির্ধারিত করে তিনি বলেছিলেন, লেনিনবাদ হলো সাম্রাজ্যবাদ ও শ্রমিকবিপ্লবের যুগের মার্ক্সবাদ। যা মার্ক্সবাদের আরও বিকশিত রূপ। স্তালিন ১৯২৪ সালে লেনিনবাদের ভিত্তি এবং ১৯২৬ সালে লেনিনবাদের সমস্যা লিখেন। সেখানে তিনি লেনিনবাদের আদর্শগত ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন।

কমরেড স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েতে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯২৮৩২) ছিল সার্বিক অগ্রগতির বিশেষ উল্লম্ফন। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো এই পরিকল্পনা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপও করেছিল; কিন্তু যখন প্রথম চার বছরেই কৃষি, শিল্প, শিক্ষাসহ সবকটি মৌলিক ক্ষেত্রেই গড়পড়তা ৯৩ শতাংশ সাফল্য সামনে আসে, তাদের মুখে কূলুপ এঁটে যায়। প্রতিক্রিয়াশীল সংবাদমাধ্যমেও এ ঘটনার প্রশংসা করা হয়। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার চার বছরে সোভিয়েতে যখন শিল্পোৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছিল; তখন পুঁজিবাদী দেশ যথাক্রমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তা কমেছে শতকরা ৫৭ ভাগ, ব্রিটেনে কমেছে শতকরা ১৮ ভাগ, জার্মানিতে শতকরা ৪০ ভাগ এবং ফ্রান্সে শতকরা ৩০ ভাগ শিল্পোৎপাদন হ্রাস পায়। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় রাশিয়ার কৃষি সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান না হওয়ায় দ্বিতীয় পরিকল্পনায় (১৯৩৩৩৭) কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ কাজ পরিচালিত হয়। এর ফলে ১৯৩৫ সালের প্রথমদিকেই ৮৫ শতাংশ জমি যৌথ খামারের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং উৎপাদিত পণ্য বৃদ্ধি পায় ২৬৯ শতাংশ। পরবর্তীতে, সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি আরও সুসংহত রূপ লাভ করে। যা স্তালিনের জীবনাবসান পর্যন্ত চালু ছিল।

আট.

কৃষিপ্রধান দেশে সর্বহারা বিপ্লবের ক্ষেত্রে লেনিনের বিপ্লবী তত্ত্বকে আরও অগ্রসর করেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের আরেক মহান শিক্ষক কমরেড মাও সেতুঙ কৃষিপ্রধান উপনিবেশিকসামন্তবাদী সমাজে বিপ্লবের তত্ত্ব নয়াগণতন্ত্র সম্পর্কে থিসিস রচনার মাধ্যমে। এটি ছিল আধাউপনিবেশিক আধাসামন্ততান্ত্রিক চীনে বিপ্লবের পথনির্দেশক। এর সাথে উপনিবেশ নয়, এমন সামন্ততান্ত্রিক, আধাসামন্ততান্ত্রিক সমাজের জন্য প্রজোয্য বিপ্লবের শ্রমিককৃষকের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক চরিত্রের সাথে গুলিয়ে ফেলা হবে ভুল।

এই থিসিসে মাও দেখান, বিপ্লব দুটি পর্বে বিভক্ত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবী গণতন্ত্রের পর্ব এবং সমাজতন্ত্রের পর্ব। রুশ বিপ্লবের শিক্ষাই এক্ষেত্রে মূল উপজীব্য হিসেবে কাজ করেছে। উল্লেখ্য, বিপ্লবপূর্ব রাশিয়া ও চীন উভয় দেশই ছিল পশ্চাৎপদ ও কৃষিপ্রধান; বিদ্যমান ছিল সামন্তীয় কাঠামো। কিন্তু রাশিয়া কোনো উপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসনে ছিল না। অপরদিকে, বিপ্লব পূর্ববর্তী চীন ছিল একাধিক উপনিবেশিক শক্তির কলোনি। আর তৎকালীন বাস্তব পরিস্থিতি ব্যাখ্যায় লেনিনের শিক্ষাকে আরও একধাপ অগ্রসর করে মাও দুই স্তরবিশিষ্ট বিপ্লবের তত্ত্ব উপস্থাপন করেন প্রথম পর্বের কাজ হলো সমাজের এই উপনিবেশিক, আধাউপনিবেশিক ও আধাসামন্ততান্ত্রিক রূপকে একটা স্বাধীন, গণতান্ত্রিক সমাজে পরিবর্তিত করা; দ্বিতীয় পর্বের কাজ হলো বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। (নয়াগণতন্ত্র সম্পর্কে, জানুয়ারি ১৯৪০)

বিপ্লবের প্রথম পর্বে সকল পুঁজি বাজেয়াপ্ত করা হয় না, কেবলমাত্র বৃহৎ একচেটিয়াদের উৎখাত করা হয়, ক্ষুদ্র পুঁজির বিকাশ ঘটে; দ্বিতীয় পর্বে ক্রমান্বয়ে সুসংহতভাবে সকল ব্যক্তিগত পুঁজি বাজেয়াপ্ত করা হয়। নয়াগণতান্ত্রিক স্তরে কৃষি জমিতেও ক্ষুদে ব্যক্তিগত মালিকানা বজায় থাকে রূপগতভাবে জমির রাষ্ট্রীয়করণ হলেও জমির ব্যক্তিগত চাষাবাদ বজায় থাকে ব্যক্তিগত মালিকানার মতোই। সারগতভাবে তাতে জমিতে কৃষকের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিপ্লবের এই পর্বে ভূমি সংস্কারের মানে হলো প্রকৃত কৃষকের হাতে জমি প্রদান আর অকৃষকদের জমির মালিকানা থেকে উচ্ছেদ করা।

রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরপরই সমস্ত জমিকে রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে কার্যত জমিতে কৃষকদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ১৯৩০এর দশক পর্যন্ত সেখানে ধনীকৃষক অর্থনীতির অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। একইসঙ্গে সেখানে বিভিন্ন শ্রেণীর কৃষক বিদ্যমান ছিল। শহরেও ক্ষুদ্র উৎপাদকশ্রেণী বিদ্যমান ছিল। এক দীর্ঘ, জটিল, রক্তক্ষয়ী ও কষ্টকর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উৎপাদনউপায়সমূহকে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে অগ্রসর করা সম্ভব হয়। বেশ দীর্ঘ একটা সময়ের পরই রাশিয়ায় সমবায়গুলো গঠিত হতে পেরেছিল। সমবায় গঠনের পরও কৃষিক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় খামার (জনগণের মালিকানা) ও যৌথ খামার (যৌথ মালিকানা) এই দুই ধরনের পরিস্থিতি বজায় ছিল।

বিপ্লব পরবর্তী সময়ে রাশিয়ায় প্রথমেই ব্যাংক, রেলপথ, বিমানপথের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান এবং একচেটিয়াগুলো, তা দেশীয় হোক, অথবা বিদেশী সেগুলো রাষ্ট্রায়ত্বকরণ করা হয়। যাতে ব্যক্তিগত পুঁজি জনগণের জীবনযাত্রার ওপর আধিপত্য না করতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ, পুঁজি নিয়ন্ত্রণের নীতি গ্রহণের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সহায়ক হিসেবে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ গড়ে তোলা হয়।

নয়াগণতন্ত্রের থিসিসেও মাও সেতুঙ এ কথাটাই উল্লেখ করেছেন সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে পরিচালিত নয়াগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অর্থনীতি সমাজতান্ত্রিক চরিত্রসম্পন্ন হবে। আর এটাই হবে জাতীয় অর্থনীতির পরিচালিকাশক্তি। কিন্তু এই প্রজাতন্ত্র অন্যান্য ধরনের পুঁজিবাদী ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবে না, এবং যে পুঁজিবাদী উৎপাদন জনগণের জীবনযাত্রার ওপর আধিপত্য করতে পারে না তার বিকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করবে না, কারণ চীনের অর্থনীতি এখনো অত্যন্ত পশ্চাৎপদ স্তরে রয়েছে।

জমিদারদের জমি বাজেয়াপ্ত করে তা ভূমিহীন কৃষক ও অল্প জমির মালিক কৃষকদের মধ্যে বিলি করে দেওয়ার, . সান ইয়াৎসেনের স্লোগান, কৃষকের হাতে জমি দাও’– কার্যকর করার, গ্রামাঞ্চলে সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্ক বিলুপ্ত করার এবং জমিকে কৃষকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করার জন্য এই প্রজাতন্ত্র কতকগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। গ্রামাঞ্চলে ধনীকৃষক অর্থনীতি যেমন আছে, তেমনই চলতে দেওয়া হবে এটাই হলো ভূমিস্বত্ব সমীকরণের নীতি। এই নীতির সঠিক স্লোগান হলো কৃষকের হাতে জমি দাও। এই পর্যায়ে সাধারণভাবে সমাজতান্ত্রিক কৃষিব্যবস্থা স্থাপন করা হবে না, কিন্তু কৃষকের হাতে জমি দাও’– এই নীতির ভিত্তিতে বিকশিত নানাধরণের সমবায়অর্থনীতিতে সমাজতান্ত্রিক উপাদানও থাকবে।

“‘পুঁজি নিয়ন্ত্রণ এবং ভূমিস্বত্ব সমীকরণএর পথ ধরে চীনের অর্থনীতিকে চলতে হবে এবং কোনোমতেই তাকে মুষ্টিমেয় লোকের একচেটিয়া অধিকারে থাকতে দেওয়া হবে না; আমরা কিছুতেই মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি ও জমিদারদের জনগণের জীবনযাত্রার ওপর আধিপত্য করতে দিতে পারি না; আমরা কোনোমতেই ইউরোপআমেরিকার পদ্ধতিতে পুঁজিবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে দেবো না।

এটাই হলো নয়াগণতন্ত্রের অর্থনীতি। আর নয়াগণতন্ত্রের রাজনীতি হলো এই নয়াগণতন্ত্রের অর্থনীতিরই কেন্দ্রীভূত অভিব্যক্তি। ()

১৯৪৯ সালে বিপ্লবের পর চীনকে স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসতে প্রায় তিন বছর লেগে যায়। এসময়ে পরাজিত কুওমিনটাং, তাদের দালাল, জমিদার, সাম্রাজ্যবাদের চর এবং তাদের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড দমন করতে হয় সর্বহারাশ্রেণীকে। ১৯৫২ সালের মধ্যে ভূমি সংস্কার সম্পন্ন হয়। এই সময়ের মধ্যে নয়াগণতান্ত্রিক পুনর্গঠন সম্পন্ন করতে বিভিন্ন বাস্তবিক পদক্ষেপ ও কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। সেখানে সদ্যমুক্ত এলাকায় জমিদারদেরকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে প্রথমে শুধু তাদের উপরই আঘাত হানা হয়। পরবর্তীতে একটু সুস্থির ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে ধনীকৃষকদেরও ভূমি সংস্কারের আওতায় আনা হয়।

১৯৫৩ সালের মধ্যে কৃষি ও গ্রামীণ সমাজের চেহারা পাল্টে যায়। ভুস্বামীদের ক্ষমতার ভিত্তি উৎপাটিত হয়। ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে সৃষ্ট নতুন সম্পর্ক সমাজে প্রাণখুলে বিকশিত হবার চেষ্টা করতে থাকে। প্রায় ৩১ কোটি মানুষ ভূমি সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ৩০ কোটি কৃষক, যাদের খুব কম জমি ছিল; কিংবা কৃষিমজুরবর্গাচাষী, যাদের কোনো জমি ছিল না ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে তাদের হাতে আসে প্রায় ১২ কোটি একর জমি আর তার সঙ্গে কৃষি যন্ত্রপাতি, গবাদিপশু, ঘরবাড়ি।

ভূস্বামীদের জমি বাজেয়াপ্ত ও তার বন্টনের পর শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব। প্রথমে প্রাচীন পারস্পরিক সহযোগিতার প্রথা অনুযায়ী গড়ে উঠে পারস্পরিক সহযোগী দল। একে বলা হয় প্রাকসমবায় স্তর। ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরে পার্টি গৃহীত নীতি অনুযায়ী, কয়েকটি পারস্পরিক সহযোগী দল মিলে আধাসমাজতান্ত্রিক চরিত্রের প্রাথমিক সমবায় গঠন শুরু হয়। এই কাঠামোতে জমি, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদির ওপর সদস্যদের ব্যক্তিমালিকানা থাকতো। একসঙ্গে আবাদ হতো এবং জমি, গবাদিপশু, কৃষি সরঞ্জাম এবং শ্রম অনুযায়ী ফসল বিতরণ হতো।

চীনের বিপ্লবী সরকার প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে ১৯৫৩ সালে। তখন থেকেই সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণকাজ শুরু হয়; যা ১৯৫৬ সালে একটা পর্যায় অতিক্রম করে। এই সময়ের মধ্যে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও হস্তশিল্প এই প্রধান ক্ষেত্রগুলোর সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরে বিপুল অগ্রগতি সাধিত হয়। সেই সঙ্গে গ্রামেশহরে নতুন প্রতিষ্ঠান, উৎপাদন সম্পর্ক এবং নতুন সংস্কৃতি নির্মাণের অবিরাম কর্মউৎসব ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে সারাদেশে। অর্থনীতি ও রাজনীতির প্রতিফলনই ঘটে সংস্কৃতিতে। আর এজন্যই দরকার পড়ে নতুন বিপ্লবী সংস্কৃতির বিকাশ সাধনের।

গ্রামাঞ্চলে ভূমি সংস্কারের পর্যায়ক্রমিক অগ্রগতি নিয়ে ক্রমান্বয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষিকে যৌথ চাষাবাদ ও সমবায়ের দিকে নিয়ে যাওয়া এবং শিল্পের বিকাশ সম্পর্কে মাও সেতুঙ বলেন, চীনে বিশাল জনসংখ্যার জন্য অপর্যাপ্ত জমি (সারা দেশে গড়পড়তা মাথাপিছু জমি ৩ মৌ, দক্ষিণাঞ্চলের প্রদেশগুলোর বিভিন্ন অঞ্চলে মাথাপিছু জমি ১ মৌ কিংবা তারও কম) রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ খুবই ঘনঘন (প্রতি বছর বিশাল পরিমাণ আবাদী জমি বন্যা, খরা, পোকা, ইত্যাদি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়)। বর্তমানে বিক্রয়ের মতো খাদ্যশস্য এবং কাঁচামাল উৎপাদনের মাত্রা খুবই নিচু; কিন্তু এগুলোর জন্য রাষ্ট্রের চাহিদা প্রতিদিনই বাড়ছে, এবং এতে সৃষ্টি হয়েছে গভীর দ্বন্দ্ব। দ্বিতীয়ত, সমাজতান্ত্রিক শিল্পায়নের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা ভারী শিল্প; যা কৃষিতে ব্যবহারের জন্য ট্রাক্টরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক সার, পরিবহণের জন্য আধুনিক উপকরণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হবে তখনই যখন বৃহদায়তন চাষাবাদ করা যাবে এবং তা সমবায়ের মাধ্যমেই সম্ভব। আমরা সমাজব্যবস্থাতেই শুধু বিপ্লব আনছি না, ব্যক্তি মালিকানাধীন থেকে সামাজিক মালিকানায় রূপান্তর শুধু নয়, তা আনতে হবে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে, হস্তশিল্প থেকে প্রবর্তন করতে হবে বৃহদায়তন আধুনিক যন্ত্রশিল্পের। এবং এই দুই দিকের বিপ্লব ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এছাড়া হালকা শিল্পের ব্যাপক বিকাশের জন্য একইসঙ্গে কৃষি এবং ভারী শিল্পের বিকাশ প্রয়োজন। উল্লেখ্য, চীনা পরিমাপের একক মৌ। এই পরিমাপ অনুসারে, ১ একর সমান ৬ দশমিক ০৭ মৌ।

তৎকালীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে দুটো বিপরীত মত বিদ্যমান ছিল। একটি মত ছিল আইন করে সকল ব্যক্তি মালিকানা বিলুপ্ত করে শিল্প কৃষিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ করার পক্ষে। এর বিপরীত মত ছিল যৌথ চাষাবাদের প্রবর্তন না করে বাজার, পণ্য উৎপাদনের বিধি মোতাবেক ব্যক্তি মালিকানার বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটানো। শিল্পখাতের বড় অংশ বাজার অর্থনীতির নিয়মে চালানোর পক্ষেও ছিলেন তারা। আমদানি রপ্তানি ও আভ্যন্তরীণ ব্যবসাবাণিজ্যে সরকারি নিয়ন্ত্রণেরও তারা বিরোধী ছিলেন। মাও সেতুঙ এই দুই বিপরীত মতকেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অবিরাম আলোচনা, বিতর্ক, ও গবেষণার মধ্য দিয়ে পার্টি ও দেশকে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের দিকে নিয়ে যান তিনি।

বিপ্লবপূর্ব চীনে শিল্পবাণিজ্যের শতকরা ৮০ ভাগের মালিকানা ছিল আমলামুৎসুদ্দি পুঁজিপতিদের হাতে। নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রক্রিয়ায় এই পুঁজিকে বাজেয়াপ্ত করা হয়। এসম্পর্কে মাও বলেন, এর একটি গণতান্ত্রিক বিপ্লবী চরিত্র ছিল, এটা যতোটা দালাল পুঁজিবাদের বিরোধিতা করছে; কিন্তু এর একটা সমাজতান্ত্রিক চরিত্রও ছিল, যতটা তা বৃহৎ বুর্জোয়াদের বিরোধিতা করেছিল।

যুদ্ধ পরিচালনা করে আমরা বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী পার্টির শাসনকে উৎখাত করেছিলাম এবং আমাদের সমগ্র পুঁজিবাদী অর্থনীতির শতকরা ৮০ ভাগ যে আমলাতান্ত্রিক পুঁজি, তাকে বাজেয়াপ্ত করেছিলাম; শুধুমাত্র এভাবেই বাকি যে ২০ ভাগ জাতীয় পুঁজি, তাকে পুনর্গঠনের জন্য শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি গ্রহণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াতেও আমাদেরকে প্রচণ্ড সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল (ক্রিটিক)

চীন বিপ্লবে জাতীয় চরিত্রসম্পন্ন বুর্জোয়াদের মিত্র শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রাশিয়ায় এ ধারণাটি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ না থাকলেও, চীনের মতো আধাউপনিবেশিক আধা সামন্ততান্ত্রিক দেশে তা ছিল বিপ্লবী রণনীতি তৈরির ক্ষেত্রে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। চীন ছিল পশ্চাৎপদ একটি দেশ; শিল্পের বিকাশ ছিল অনুন্নত। শিল্পবাণিজ্যের বিকাশের জন্য যোগ্য ব্যক্তি ছিল না। আর এজন্যই দরকার পড়ে জাতীয় বুর্জোয়াদের; তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার না করার কোনো কারণ ছিল না। আর এজন্যই বিপ্লবের পরও তাদের সঙ্গে চীনা পার্টির যুক্তফ্রন্ট বজায় ছিল। তাই জাতীয় বুর্জোয়াদের উৎখাতের কাজটা করা হয়েছিল ধাপে ধাপে। এই উৎখাতের কথা মাথায় রেখেই কমরেড লেনিন নির্দেশিত রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের তত্ত্বকে (রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ) মাও সুচারুরূপে প্রয়োগ করেন। মাও বলেন, রাষ্ট্রব্যক্তিগত যৌথপরিচালনা; ব্যক্তিগত উদ্যোগাধীন সংগঠনগুলোতে রাষ্ট্রের নির্দেশানুসারে উপাদান প্রস্তুত করা অথবা সামগ্রী তৈরি করা, সেখানে রাষ্ট্র সর্বপ্রকার কাঁচামাল যোগানের ব্যবস্থা করবে এবং সবরকম প্রস্তুত দ্রব্য নিয়ে নিবে এবং অনুরূপভাবে নির্দেশসমূহ দিয়ে রাষ্ট্র সব না হলেও প্রায় সব প্রস্তুত দ্রব্য নিয়ে নিবে। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন শিল্পের ক্ষেত্রে এই তিন প্রকার রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ গ্রহণ করা যেতে পারে। (নির্বাচিত রচনাবলী, ৫ম খণ্ড)

১৯৫৩ সালে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের প্রথম পর্যায়ে মাও এই পুঁজিবাদকে বর্ণনা করেন এভাবে এটি সাধারণ নয়, বরং একটি বিশেষ ধরনের পুঁজিবাদী অর্থনীতি। এর অস্তিত্ব প্রধানত পুঁজিবাদীদের মুনাফা তৈরির জন্য নয়, বরং জনগণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন মেটানোর জন্য। ()

চীনে ১৯৫৬ সাল নাগাদ কৃষি সমবায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিকশিত হয়। এপর্যায়ে জমি ও কৃষি সরঞ্জামের মালিকানাও ক্রমে সমবায়ের হাতে স্থানান্তরিত হয়। সেই সঙ্গে শিল্পের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে ধাপে ধাপে। যা ছিল সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের দিকে আরেক ধাপ অগ্রসরতা।

নয়.

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ বিষয়টা স্পষ্ট হয় যে, মার্কসবাদ যান্ত্রিক কোনো মতবাদ নয়; আর তাই তার প্রয়োগও যান্ত্রিকভাবে করা সম্ভব নয়; এ মতাদর্শ বাস্তব চর্চার মধ্য দিয়েই বিকশিত হয়েছে ও হচ্ছে। যারাই এর যান্ত্রিক প্রয়োগে নিমজ্জিত হয়েছেন, তাদের স্থান হয়েছে সংশোধনবাদ আর সুবিধাবাদের আঁস্তাকুড়ে। বিপ্লবের কোনো পর্যায়ে পশ্চাদপসরণ করাটাও ওই বিপ্লবেরই অংশ। সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণে পশ্চাদসরণও সেই সমাজতন্ত্রেরই অংশ। আর সে বিপ্লবও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক হয়ে যায় না। কেউ হয়তো রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু এই রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ কোন শ্রেণী, কোন পরিস্থিতিতে, কী লক্ষ্যে গড়ে তুলছে; আর এ সময়ে জনগণের সঙ্গে ক্ষমতাসীন শ্রেণীর সম্পর্ক যা প্রকাশিত হয় কর্মসূচীর মাধ্যমে এর ওপরই বিপ্লবের বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে। আর এর ভিত্তিতেই আমরা দেখতে পাই যে, বলশেভিক বা অক্টোবর বা নভেম্বর বিপ্লব ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব

সকল বিপ্লবেরই মৌলিক প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রশ্ন। লেনিন অত্যন্ত সহজবোধ্য ও গভীরভাবে দেখিয়েছেন যে, সর্বহারা বিপ্লবের মৌলিক প্রশ্ন হলো সর্বহারা একনায়কত্বের প্রশ্ন। বৈপ্লবিক পন্থায় বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে চূর্ণবিচূর্ণ করে প্রতিষ্ঠিত এই একনায়কত্ব হলো একদিকে সর্বহারাশ্রেণী আর অন্যদিকে কৃষক সম্প্রদায় ও অন্যান্য সকল মেহনতি জনগণের মধ্যেকার বিশেষ ধরনের মৈত্রী। এটা হলো অন্যরূপে ও নতুন অবস্থাধীনে শ্রেণীসংগ্রামেরই ধারাবাহিকতা। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে শোষক শ্রেণীগুলোর প্রতিরোধের বিরুদ্ধে, বৈদেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং পুরাতন সমাজের শক্তি ও অভ্যাসের বিরুদ্ধে এক লাগাতার সংগ্রাম একই সময়ে রক্তাক্ত ও রক্তপাতহীন, হিংসাত্মক ও শান্তিপূর্ণ, সামরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংগ্রাম। সর্বহারা একনায়কত্ব দ্বারা এবং এইসব ফ্রন্টে দৃঢ়তার সঙ্গে ও লাগাতারভাবে সংগ্রাম আয়োজনের জন্যে মেহনতি জনগণকে পুরোপুরিভাবে সংঘবদ্ধ করা ছাড়া সমাজতন্ত্রের বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়।

এ সময়ে আমরা দেখতে পাই যে, একচেটিয়া আর্থিক পুঁজিবাদ, বা কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ দেশে দেশে নয়াউপনিবেশিক আগ্রাসন চালাচ্ছে। আবার এ পুঁজিবাদ পুরো বিশ্বে, এমনকি পুঁজিবাদী দেশেও সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে দ্বৈত নীতি অবলম্বন করে। একদিকে তা সামন্ত ব্যবস্থাকে নিজের স্বার্থ অনুযায়ী উচ্ছেদ করে। আবার তা ততটুকুই যতটুকু সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী সাম্রাজ্যবাদীরা সামন্ত ব্যবস্থাকে আংশিক সংরক্ষণও করে। আর এ পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিকাশ ঘটে এক গণবিরোধী সংস্কৃতির। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থায় বহুজাতিক কোম্পানির হাতেই থাকে অর্থনীতির মূল চাবিকাঠি। আর এর সুষ্পষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। পুঁজিবাদ যে সামন্তীয় ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে না, তা কমরেড লেনিন বহুবছর আগেই দেখিয়েছেন। যা এ লেখায় আগেই বলা হয়েছে।

আমরা আজ যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের দিকে তাকালে দেখতে পাই যে, সেখানে আজও বর্ণবাদ রয়েছে বহাল তবিয়তে, রয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন, জারি রয়েছে রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ। এখন যদি সেখানে সর্বহারা বিপ্লব সংঘটিত হয়, তার পরমুহূর্তেই কী এসব দূর হয়ে যাবে, নাকি একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এ সামাজিক ক্ষত দূর করতে হবে? আবার বিপ্লব পরবর্তী সময়ে প্রথমেই কিন্তু বৃহৎ একচেটিয়াদের রাষ্ট্রায়ত্ব করতে হয়, পরে ধাপে ধাপে তার সামাজিকীকরণ করা হয়। এখন এ বিনির্মাণকালে আধাসমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু থাকতে পারে। ভুলত্রুটি থাকতে পারে, পিছিয়ে আসতে হতে পারে, যেমনটা কমরেড লেনিন বিভিন্ন আলোচনাবিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন। এজন্য কী ওই বিপ্লবকে আমরা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বলতে পারি? না, তা কখনোই আমরা বলতে পারি না। ক্ষমতাসীন শ্রেণী, লক্ষ্য ও কর্মসূচীর কারণেই এটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব

সমাজতন্ত্র আকাশ থেকে পড়ে না। সর্বহারাশ্রেণীর ওপরই এ ঐতিহাসিক কাজের দায়িত্ব ন্যস্ত। আর বিপ্লব মানে এ নয় যে, কেউ পুরো সমাজতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে নিয়ে অপেক্ষায় আছে, বিপ্লব করলাম, সুইচ চাপলাম, আর সমাজতান্ত্রিক কাঠামো চালু হয়ে গেলো বিপ্লবী কাজে নিযুক্ত রাজনৈতিক পার্টি, গ্রুপ বা ব্যক্তি, সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের এই ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলে তারা ক্রমেই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন।

এক্ষেত্রে একটি কথা মনে রাখাটা জরুরি সর্বহারাশ্রেণী হলো দ্বান্দি¦ক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী; ঐতিহাসিক ভাববাদ ও যান্ত্রিক বস্তুবাদের বিরোধী। বাস্তবিক অবস্থায় বাস্তবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই যার মূল কর্মনীতি। যে কোনো মতবাদ, একেবারে সর্বোৎকৃষ্ট মতবাদ, এমনকি মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সংযুক্ত না হলে, বাস্তবিক অবস্থার নিরিখে তা চাহিদা পূরণ না করতে পারলে, অর্থাৎ জনগণের সমস্যার সমাধানে মতাদর্শের আলোকে কার্যকর কর্মসূচী প্রদান না করতে পারলে, তা অকেজোই থেকে যায়। অর্থাৎ, বাস্তব পরিস্থিতির নিরিখে রণনীতিরণকৌশল নির্ধারণ করতে সক্ষম না হলে কোনো মতবাদই কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।

উল্লেখ্য, কমরেড মাও যে নয়াগণতন্ত্রের থিসিস দিয়েছেন, সেখানে তিনি সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন, এই নয়াগণতন্ত্র সমাজতন্ত্রের বাইরের কিছু নয়। বরং পশ্চাৎপদ সমাজে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের জন্য এটি অপরিহার্য।

এই বিপ্লবের প্রথম পর্যায় বা প্রথম পর্ব এখনো মূলত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিকই রয়েছে এবং তার বাস্তব দাবি যদিও হলো পুঁজিবাদের বিকাশের পথ পরিষ্কার করা; তবু এই বিপ্লব আর সেই পুরনো ধরনের বিপ্লব নয় যা বুর্জোয়াশ্রেণীর নেতৃত্বে পরিচালিত হতো এবং যার লক্ষ্য ছিল এক পুঁজিবাদী সমাজ ও বুর্জোয়া একনায়কত্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তোলা। বরং এই বিপ্লব এক নতুন ধরনের বিপ্লব; যা সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে পরিচালিত এবং যার লক্ষ্য বিপ্লবের প্রথম পর্যায়ে এক নয়াগণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং সমস্ত বিপ্লবীশ্রেণীর যুক্ত একনায়কত্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই বিপ্লবই আবার সমাজতন্ত্রের বিকাশের জন্য আরও বিস্তৃত পথ পরিষ্কার করবে।

এই বিশ্ববিপ্লব আর পুরনো বিশ্ববিপ্লব নয়; পুরনো বুর্জোয়া বিশ্ববিপ্লব বহুদিন আগেই শেষ হয়ে গেছে। এই বিপ্লব নতুন বিশ্ববিপ্লব; সমাজতান্ত্রিক বিশ্ববিপ্লব। (নয়াগণতন্ত্র সম্পর্কে, জানুয়ারি ১৯৪০)

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে রাশিয়া ও চীন বিপ্লবের অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় যে, সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের লক্ষ্যে পরিচালিত এই বৈপ্লবিক শিক্ষা বাংলাদেশ, ভারতসহ পশ্চাৎপদ সকল দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে তা হতে হবে চীনরাশিয়ার অনুকরণে নয়; বরং বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষাপটে সেই শিক্ষাকে কাজে লাগানোর মধ্য দিয়ে।।

অক্টোবর ২০১৭

(** লেখাটি সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত স্মারক গ্রন্থে প্রথম গ্রন্থিত হয়)

মন্তব্য
  1. shahjahan sarker বলেছেন:

    সাক্ষাতে বলা যাবে।

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.