লিখেছেন : শাহেরীন আরাফাত

কোভিড১৯ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ধস নেমেছে। উৎপাদনসরবরাহভোগের পুঁজিবাদী চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়েছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকার মানেসবার উপার্জনই থমকে যাওয়া। তবে এতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন সেই খেটে খাওয়া মানুষগুলো, যাদের শ্রমেঘামেরক্তে গড়ে ওঠে সম্পদের পাহাড়। ইতিমধ্যে সংকট মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন খাতকে প্রাধান্য দিয়ে আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। গত ৫ এপ্রিল সকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন; যা জিডিপির .৫২ শতাংশ। এখন প্রশ্ন হলো প্রণোদনায় কত শতাংশ ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের স্বার্থের প্রতিফলন দেখা যায়?

এই প্রণোদনা প্যাকেজের পাঁচটি ভাগ রয়েছে। অথবা বলা যায়, এটি পাঁচটি প্যাকেজের একটি কম্বো

এক. শিল্প সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা দেওয়া। ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্প সুদে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দেওয়ার লক্ষ্যে ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা প্রণয়ন করা হবে। ঋণ সুবিধার সুদের হার হবে শতাংশ। ঋণের সুদের অর্ধেক অর্থাৎ .৫০ শতাংশ ঋণ গ্রহীতা শিল্প/ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করবে এবং অবশিষ্ট .৫০ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে দেবে।

এই ৩০ হাজার কোটি ঋণ (পড়ুন খেলাপি ঋণ) হিসেবে বরাদ্দ এখানকার মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের জন্য। যে ঋণ কখনোই শোধ করা হবে না।

দুই. ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল প্রদানের লক্ষ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা প্রণয়ন করা হবে। সুদের হার শতাংশএর মধ্যে শতাংশ সুদ ঋণ গ্রহীতা শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করবে এবং অবশিষ্ট শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে দেবে।

এই অংশটিও ঋণ হিসেবে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের জন্য বরাদ্দ। ব্যাংকের মাধ্যমে প্রদানের কথা বলা হলো; যে ব্যাংক ব্যবস্থা ইতিমধ্যে ধসে পড়েছে খেলাপি ঋণে।

উপরের দুটি প্যাকেজে ঋণের কথা বলা হলেও কার্যত এটি দালালবুর্জোয়াদের করোনাভাইরাসের সময়ে উপঢৌকন স্বরূপ!

তিন. রফতানি উন্নয়ন তহবিলে (ইএফআই) দেড় বিলিয়ন ডলার বা ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ইএফআই হবে পাঁচ বিলিয়ন ডলার। কার্যত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে সুবিধার জন্য ইএফআই গঠন করা হয়। যে তহবিল থেকে ধার নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করা যায়। এখন ইএফআই সুদের হার .৭৩ থেকে কমিয়ে শতাংশ করা হয়েছে।

প্যাকেজটিও দালালবুর্জোয়াশ্রেণীকে আরও খানিকটা খুশি করতেই দেওয়া হয়েছে।

চার. প্রিশিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স স্কিম নামে বাংলাদেশ ব্যাংক হাজার কোটি টাকার একটি নতুন ঋণ সুবিধা চালু করবে। ঋণ সুবিধার সুদের হার হবে শতাংশ।

তৈরি পোশাক এক্সপোর্টইমপোর্ট ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের জন্য দেওয়া হয়েছে এই প্রণোদনা; যারা দালালবুর্জোয়া চরিত্রের।

পাঁচ. প্রণোদনা প্যাকেজের এই অংশটি আগেই ঘোষণা দেওয়া হয়। রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিককর্মচারীদের বেতন/ভাতা পরিশোধ করতে হাজার কোটি টাকার একটি আপৎকালীন প্রণোদনা প্যাকেজ।

এটিও ওই দালালবুর্জোয়া শ্রেণীর সুবিধার জন্যই দেওয়া হয়েছে। তিন মাসের জন্য শ্রমিকদের কোনো বেতনভাতা তারা দেবে না। ভাবটা এমন যেন তারা শ্রমিকদের ওপর দয়া করছে!

কার্যত আর্থিক প্যাকেজটি একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করেই দেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের জন্য এতো কিছু দিলেও শ্রমিকদের জন্য কোনো প্রণোদনা দেয়নি সরকার। অন্তত তাদের জন্য রেশনের একটা ঘোষণা থাকতে পারতো; কিন্তু তা নেই। অসংগঠিত শ্রমিকরিকশাচালক, সিএনজিচালক, চা বিক্রেতা, হকার, গৃহশ্রমিকযারা দিন আনেদিন খায়, তাদের কথা কে মনে রাখে! এমন শ্রমজীবী মানুষদের কি আসে যায় ওই প্রণোদনায়!

সাধারণ ছুটি ঘোষণার পরও খোলা রাখা হলো গার্মেন্টস কারখানা। গণপরিবহন বন্ধ করে গার্মেন্টস ছুটি ঘোষণা করলো। আমরা দেখলাম লাখো শ্রমিক পায়ে হেঁটে, ট্রাকেট্রাক্টরে গাদাগাদি করে বাড়ির পথে ছুটেছেন। কারণ ঢাকা বা চট্টগ্রামে তাদের খাওয়ার নিশ্চয়তাটুকুও সরকার দিতে পারেনি। আবার সাধারণ ছুটির মাঝেই খোলা হলো গার্মেন্টস। আমরা দেখলাম, লাখো শ্রমিক পায়ে হেঁটে কারখানায় ফিরেছেন। বহু নাটকের পর বেশিরভাগ কারখানা বন্ধ ঘোষণা করলো। শ্রমিকরা আবারও বাড়ি যেতে হেঁটে পাড়ি দিলেন কয়েকশো কিলোমিটার পথ। এরই মধ্যে অনেক কারখানা শ্রমিকদের জন্য কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই তাদের কাজ করতে বাধ্য করেছে। এমনকি এই সংকটকালীন অবস্থায়ও শ্রমিকদের পাওনা মজুরি দেয়নি অনেক গার্মেন্টস কারখানা। অথচ এ নিয়ে সরকার, রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা মুখে কূলুপ এঁটে রেখেছে। সার্বিকভাবে সরকাররাষ্ট্রের শ্রমিকবিরোধী অবস্থান সুস্পষ্ট। তাদের প্রণোদনায় শ্রমিক থাকে কী করে! তারা অঘোষিত লকডাউন দিয়েছে মানুষকে ঘরে রাখার কথা বলে। অথচ এভাবে লাখো শ্রমিককে রাজপথে হাঁটিয়ে, মজুরি আটকে রেখে কোন ধরনের ‘সামাজিক দূরত্ব’ তারা নিশ্চিত করলো!

কৃষি ক্ষেত্রে কোনো প্রণোদনা এই প্যাকেজে ছিল না। শস্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়াসহ বহু খামার বন্ধ হয়ে পড়েছে। দেশজুড়ে হাজারও গরুর খামার, ফিশারিস, হাঁসমুরগীর খামার, চিংড়ি ঘের, এমনকি কাঁকড়ার খামারও গড়ে উঠেছে। অনেক ছোট খামার বন্ধ হয়ে পড়ছে। প্রান্তিক কৃষক তো দূরের কথা, কৃষি খাত নিয়েও কোনো কথা ছিল না ওই কথিত সংবাদ সম্মেলন বা ঘোষিত প্রণোদনায়।

মধ্যশ্রেণী শুধুই ভোক্তা। তাদের কিছু না দিলেও কিছু বলবে না। কারণ, তারা না খেয়ে মরবে না! অথচ আমরা দেখছি, আজকের এই তীব্র সংকটকালে মধ্যশ্রেণীর অনেক পরিবার কার্যত চলছে ধারকর্য করে। ঘরে ভাত নেই, বাচ্চাকে খাওয়ানোর দুধ নেইকাউকে বলতেও পারে না! শুধু শ্রমিকরাই নন, মধ্যশ্রেণীর একাংশও চাকরি হারাতে পারে আগামী কয়েক মাসে। তাদের জন্যও কিছু নেই প্যাকেজে। অথচ প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে শ্রেণীটিই সবচেয়ে বেশি আলোচনামুখর!

মহামারির সময়ে যে স্বাস্থ্য খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথাতা পুরোপুরি উপেক্ষিত। মহামারির সময়ে স্বাস্থ্যকর্মীরাই কিন্তু প্রধান যোদ্ধা; অথচ তাদের মাস্ক, গগলস, সুরক্ষা পোশাক (পিপিই) অপ্রতুল। ভাইরাসের টেস্ট এখনো চলছে ঢিমেতালে। বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যাচ্ছে। অথচ এর কোনো দায় সরকারের নেই। কারণ, তারা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসেনি, এসেছে লুটেরা দালালবুর্জোয়াদের ম্যান্ডেট নিয়ে। যার বাস্তবায়ন সর্বক্ষেত্রেই দৃশ্যমান। আর তাই বেহাল স্বাস্থ্য খাতকে চলনসই করার কোনো প্রণোদনাও রাদের কাছ থেকে আসেনি।

শিক্ষা খাতে যে ক্ষতি হচ্ছে, তা হয়তো এখন চোখে দেখা যাবে না; কিন্তু সামনের দিনগুলোতে তা আরও প্রকট হবে। অবস্থায় অনন্তকাল তো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা যায় না। নিয়ে সরকারের করণীয় কী নিয়ে কোনো কথা নেই। কার্যত তাদের কোনো ভাবনাই নেই শিক্ষা খাত নিয়ে। স্বাস্থ্য খাতের মতো এটাও বেসরকারিকরণে ইজারা দেওয়া!

নারীদের নিয়ে একটা বাক্যও উচ্চারিত হয়নি ওই সংবাদ সম্মেলনে। এতে নারীবিদ্বেষী, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবও স্পষ্ট। অথচ নারী অর্ধেক আকাশ। নারীর ক্ষমতায়নের নামে তারা যে পুরুষতন্ত্রের সেবা করে, সেটা আবারও প্রমাণিত।

বয়স্কদের নিয়েও কোনো মাথাব্যাথা দেখা গেলো না। যে বয়স্ক মানুষের দেখাশোনার কেউ নেই, করোনাকালে তার দায়িত্ব নেওয়ার অভিনয়টুকু অন্তত করতে পারতো সরকার!

প্রণোদনায় রাষ্ট্র, সরকার, শাসকশ্রেণীর শ্রেণীচরিত্রের প্রকাশ ঘটেছে। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে যে কোনো শাসনই শ্রেণীর শাসন। কোনো বিপত্তিতে জনগণ বলতে তারা যে ওই ক্ষমতাসীন শ্রেণীকেই বোঝায়, তা আবারও প্রমাণিত হলো। ক্ষমতাসীনরা কোভিড১৯ মহামারিতে জনগণের নামে দালালবুর্জোয়াশ্রেণীর বন্দেগীতেই আত্মনিয়োগ করেছেযেখানে ব্যাপক নিপীড়িত জনগণ উপেক্ষিত। ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের গণতান্ত্রিক উত্থানই পারে ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে, পিরামিডটাকে উল্টে দিতেযেখানে জনগণের তালিকায় দালালের দল উপেক্ষিত।।

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.