‘আন্তর্জাতিক গঠনের জন্য উদ্যোগী হওয়াটা সময়ের দাবি’

Posted: নভেম্বর 17, 2019 in মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন : শাহেরীন আরাফাত

সংগ্রামী সহযোদ্ধাগণ,

আজ আমরা এমন একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে এখানে সমবেত হয়েছি, যার ফলে বিশ্বে মানবিকতার ইতিহাস এক নতুন পথে পরিচালিত হয়েছে। আর তাই এ আয়োজনের কারণটা ব্যাখ্যা করা খুব জরুরি। আর তা পেছনে থাকা ব্যানারের তিনটি স্লোগানেই প্রকাশিত। আমি আমার লিখিত বক্তব্যে ইতিহাস বিচারে এ স্লোগানগুলোর তাৎপর্য তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

আন্তর্জাতিক’শুধু একটা শব্দ নয়। এটি আমাদের দেখায় যে, মানুষ ও মানবিকতা জাতি, ধর্ম, বর্ণে আবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। এসব আবদ্ধ চিন্তা কার্যত শ্রেণীর ভিত্তিতেই বিভক্ত। ‘আন্তর্জাতিক’আমাদের শেখায়, শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়েই শ্রেণীর বিলোপ সম্ভব, যা জাতীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়। সর্বহারাশ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদই এর ভিত্তি।

কার্যত কমিউনিস্ট রাজনীতির ভিত্তি হলো শ্রেণী সংগ্রাম, যার লক্ষ্য হলো শ্রেণী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে শ্রেণীর বিলোপ এবং মানব মুক্তি। তাই কমিউনিস্টরা সবসময়ই হবে আন্তর্জাতিকতাবাদী। এই আন্তর্জাতিকতাবাদের মানে এ নয় যে, পুরো বিশ্বে এক সঙ্গে বিপ্লব হবে। বরং এর মানে হলোকমিউনিস্টরা যে যেখানে আছেন, সেখানেই বিপ্লবের পথে আত্মনিয়োগ করবেনএ বিপ্লব কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি বিশ্ব বিপ্লবেরই অংশ।

সমাজতন্ত্র হলো সর্বহারাশ্রেণী নেতৃত্বাধীন এক ব্যবস্থা। বিশ্বব্যাপী এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার দৃষ্টিভঙ্গিআন্তর্জাতিকতাবাদ। আর এ জন্যকমিউনিস্ট ইশতেহার ঘোষণার সময় থেকেই ‘দুনিয়ার মজদুর এক হওস্লোগানটি উচ্চারিত হয়ে আসছে। শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্বের প্রকাশ ঘটে সারা দুনিয়ায় শ্রমিক শ্রেণি কমিউনিস্ট আন্দোলনে সংহতি প্রকাশের মধ্য দিয়ে।

আজ যে কমিউনিস্টরা বাংলাদেশে বিপ্লবের জন্য লড়ছেন, যারা ভারতে বিপ্লবের জন্য গণযুদ্ধে করছেন, অথবা নেপাল, স্পেন, তুরস্কে যে কমিউনিস্টরা লড়ছেনতারা সবাই এক সূতোয় বাঁধা। সর্বহারাশ্রেণী হলো আন্তর্জাতিক ও আন্তর্জাতিকতাবাদী। বাংলাদেশের কোনো কমরেড হয়তো নামও শোনেননি, এমন এক কমরেড ভারতে শহীদ হলেন, তার জন্য অন্তর থেকে এক আবেগের স্ফূরণ ঘটে। কেন? কারণ দুজনই বিশ্ব বিপ্লবের অংশ। আর সেটাই সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদ। পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদে বিকশিত হওয়ার পর তা এক বিশাল আন্তর্জাতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তাই পুঁজিবাদসাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করতে হলে সর্বহারাশ্রেণী আন্তর্জাতিকভাবে জোটবদ্ধ হওয়াটা খুব জরুরি।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি ইউরোপজুড়ে এক সংগ্রামী পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। ১৮৪৭ সালের ১ জুন লন্ডনে কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেদরিখ এঙ্গেলসের নেতৃত্বে বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠে। যার নাম ছিল ‘কমিউনিস্ট লিগ’। এ সংগঠনেরই স্লোগান– ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও!’ ‘কমিউনিস্ট লিগ’এর পক্ষ থেকেই ১৮৪৮ সালে মার্ক্সএঙ্গেলস রচনা করেন কমিউনিস্ট ইশতেহার। যা ‘কমিউনিস্ট লিগ’এর কর্মসূচী আকারে গৃহীত হয়। এ সংগঠনটি ছিল আন্তর্জাতিক গঠনের ভ্রূণ সংগঠন। এর ধারাবাহিকতায় ১৮৬৪ সালে গঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক। যার নাম ছিল ‘শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতি’। সেখানে কমিউনিস্ট, বামপন্থী, অ্যানার্কিস্টরা এক ছাতার নিচে জোটবদ্ধ হয়েছিল। প্যারি কমিউন বিপ্লবের পর প্রুঁধোর নেতৃত্বে অ্যানার্কিস্টদের বিভ্রান্তিকর তাত্ত্বিক আক্রমণের যথাযথ জবাব দেন মার্ক্সএঙ্গেলসের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা। এর ফলশ্রুতিতে ১৮৭২ সালে প্রথম আন্তর্জাতিকে বিভক্তি আসে। আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায় ১৮৭৬ সালে। ১৮৮৩ সালে মার্ক্স মৃত্যুবরণ করেন।

প্রথম আন্তর্জাতিকের ধারাবাহিকতায় ১৮৮৯ সালে এঙ্গেলসের নেতৃত্বে গঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক। এতে কমিউনিস্ট ও বামপন্থী সংগঠনগুলো অংশগ্রহণ করে। বাদ দেওয়া হয় অ্যানার্কিস্টদের। এঙ্গেলস মৃত্যুবরণ করেন ১৮৯৫ সালে। তাঁর মৃত্যুর পর বার্নস্টাইন, কাউটস্কিরা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতা হন। তাদের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ক্রমেই অর্থনীতিবাদসংস্কারবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

উনিশ শতকের প্রথম দিকে লেনিন রাশিয়ায় অর্থনীতিবাদসংস্কারবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করেন। যা বলশেভিকবাদ নামে প্রচার লাভ করে। কার্যত এই সংগ্রাম শুধু রাশিয়ার বিষয় ছিল না। এই সংগ্রাম পরিচালিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সংশোধনবাদসংস্কারবাদঅর্থনীতিবাদের বিরুদ্ধে। প্রথম সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে এ সংগ্রাম আরও তীব্রতর হয়। এ সময়ে কাউটস্কি ‘পিতৃভূমি’ রক্ষার নামে নিজ নিজ দেশের বুর্জোয়া শ্রেণীর পক্ষে যুদ্ধ করার সংশোধনবাদী গণবিরোধী তত্ত্ব হাজির করেন। এর বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম করেন কমরেড ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লবী কমিউনিস্টরা। তারা সংশোধনবাদী তত্ত্বের বিপরীতে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরোধিতা করে বিপ্লবের মাধ্যমে বুর্জোয়া শ্রেণীর পরাজয়ের তত্ত্ব ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন। পরস্পরবিরোধী দুই লাইনের রেশ ধরে ১৯১৬ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের বিলোপ ঘটে।

১৯১৭ সালে রাশিয়ায় কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে কালক্ষেপন না করেই লেনিন আন্তর্জাতিক গঠনে উদ্যোগী হন। ১৯১৯ সালের ২ মার্চ মস্কোতে বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টি, সমমনা দল ও গ্রুপ নিয়ে গঠিত হয় তৃতীয় আন্তর্জাতিক। তখনও পর্যন্ত কমিউনিস্টরা নিজেদের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচয় দিতেন। তৃতীয় আন্তর্জাতিক গঠনের সময় লেনিন ঘোষণা করলেন, তারা আর নিজেদের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচয় দেবেন না। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সুবিধাবাদীসংশোধনবাদী পার্টিগুলো সে পরিচয়টিকে পচিয়ে ফেলেছে। তাই এখন থেকে আন্তর্জাতিকের পার্টিগুলো হবে কমিউনিস্ট পার্টি। তাই তৃতীয় আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক বা কমিন্টার্ন নামে পরিচিত।

তৃতীয় আন্তর্জাতিকের সবচেয়ে বড় অবদান হলোদেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলা। সেই সঙ্গে ওই দেশের বিপ্লবী অবস্থান ব্যাখ্যা করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯২০ সালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে সংসদবাদকে খারিজের কথা, অথবা ব্রিটিশ বুর্জোয়া দল লেবার পার্টিতে অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে মূল্যায়নের কথা। তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশ শ্রমিকদের একটা বড় অংশ লেবার পার্টিতে যুক্ত ছিল। নবগঠিত গ্রেট ব্রিটেন কমিউনিস্ট পার্টির কমরেডরা যেন বিভ্রান্ত না হয়, লেনিন খুব সঠিকভাবেই মূল্যায়ন টানলেনসংগঠনের নামে, বা সংগঠনে শ্রমিক থাকলেই সেটি শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠন হয়ে যায় না। লেবার পার্টি একটি বুর্জোয়া দল। আর সেটি জেনেবুঝেই ওই পার্টিতে কমরেডদের অনুপ্রবেশ করতে হবে। আর সেটি জেনেবুঝেই বুর্জোয়া সংস্কারবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করতে হবে।

উপনিবেশবাদবিরোধী আন্দোলনকে জাতীয় মুক্তির লড়াইয়ে পরিণত করার লাইন গ্রহণ করে তৃতীয় আন্তর্জাতিক। তৃতীয় আন্তর্জাতিকের প্রভাবে ইউরোপভিত্তিক কমিউনিস্ট আন্দোলন এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এ ভূখণ্ডেও কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছিলভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই)। ১৯২৮ সালে ভারতের পার্টির বরাবর কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক থেকে আশু কর্তব্য নির্দেশ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পাঠানো হয়। সেখানে এক নম্বরে বলা হয়ভারতের কমিউনিস্টদের কর্তব্য হলো, সাম্রাজ্যবাদের জোয়াল থেকে দেশকে মুক্ত করা। শ্রমিককৃষকের যৌথ একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব সংহত ও শক্তিশালী করা। সেই সঙ্গে জনগণের সামনে সাম্রাজ্যবাদের দালাল গান্ধীর স্বরূপ উন্মোচনের কথাও বলা হয়। ১৯৩০ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ওই প্রস্তাব কর্মসূচী আকারে গ্রহণ করলেও, সংশোধনবাদীসুবিধাবাদী নেতৃত্ব এই কর্মসূচী কখনোই বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়নি। তবে এখনো বাংলাদেশ, ভারত, নেপালে সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই কমিউনিস্টরা বিপ্লবের মশাল জ্বালিয়ে রেখেছেন।

১৯২৪ সালে কমরেড লেনিন মৃত্যুবরণ করেন। লেনিন পরবর্তী সময়ে রাশিয়া ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগ্যতার সঙ্গেই নেতৃত্ব দেন কমরেড জোসেফ স্তালিন। মার্ক্সবাদলেনিনবাদকে তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ, এক দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মতো মতাদর্শিক অবস্থান দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করে স্তালিনের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক ট্রটস্কি পন্থার বিরুদ্ধে জোরালো সংগ্রাম গড়ে তোলে। এ সময়ে পার্টি বহির্ভুত জনগণকে আন্দোলনে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য গণসংগঠন গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়। ত্রিশের দশক থেকে ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটতে থাকে। আর তার বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই সরব ছিলেন কমিউনিস্টরা। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক থেকে ফ্যাসিবাদ মোকাবেলায় পপুলার ফ্রন্ট বা যুক্ত ফ্রন্ট গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়।

১৯৪১ সালের ২২ জুন হিটলারের নাৎসি বাহিনী রাশিয়া আক্রমণ করলে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে জড়িত হতে বাধ্য হয়। প্রতিরোধ যুদ্ধে কমরেড স্তালিন ঘোষণা করলেন, “কেবল আমাদের দেশকেই মুক্ত করা নয়, ফ্যাসিবাদী প্রভুত্বে নিপীড়িত জনগণকেও আমরা মুক্ত হতে সাহায্য করব। যুদ্ধ সমগ্র মানবজাতির মুক্তি গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপান্তরিত হবে।

ফ্যাসিবাদনাৎসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ইঙ্গমার্কিন জোটের সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া। এ ত্রিশক্তির জোট ‘মিত্রশক্তি’ নামে পরিচিত। এভাবে সমাজতান্ত্রিক দেশ, উপনিবেশিকআধাউপনিবেশিক দেশ এবং সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর একাংশ যৌথভাবে একত্রে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামিল হয়।

তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতিতে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক থেকে যুক্তফ্রন্টের কাজকেই প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যার ফলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর উপনিবেশগুলোতে জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। অথচ এর আগে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে বিরোধিতার মধ্য দিয়ে জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম বিকশিত করার নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল।

দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকালীন এবং যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি যান্ত্রিকভাবে যুক্ত ফ্রন্টের নীতি প্রয়োগ করে এগোনোর চেষ্টা করে। অপরদিকে, কমরেড মাও সেতুঙএর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি বিপ্লবকে কেন্দ্র করে এগোনোর নীতি গ্রহণ করেন। চীনা পার্টি বাস্তব অবস্থায় বাস্তব সিদ্ধান্ত নিয়ে এগোতে সক্ষম হওয়ায় বিপ্লব সফল হয়।

তৃতীয় আন্তর্জাতিক অকার্যকর হয়ে পড়ার পেছনে দুটো প্রধান কারণ বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। এক. জটিল বিশ্ব পরিস্থিতিতে বিশ্ব পার্টি ধরনের একক কেন্দ্র থেকে সব দেশের বিপ্লবের সমাধান দেওয়া নয়, বা সমীচীন নয়। আর দুই. ফ্যাসিবাদবিরোধী লাইনকে বিশ্বজনীন সাধারণ লাইন আকারে উপস্থাপন করাটা প্রথম কারণটি থেকে জন্ম নেওয়া সমস্যাকে আরও ঘনীভূত করে। মূলত এ দুটি কারণেই ১৯৪৩ সালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক আনুষ্ঠানিকভাবে বিলোপ হয়।

১৯৫৩ সালে কমরেড স্তালিন মৃত্যুবরণ করেন। এরপর থেকেই সোভিয়েত পার্টির নেতৃত্ব ক্রুশ্চেভের মতো সংশোধনবাদীদের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। আর ১৯৫৬ সালে রাশিয়ায় পুঁজিবাদের পুনরুত্থান ঘটে। এ সময়ে কমরেড মাও সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহাবিতর্কের সূচনা করেন। আর এ বিতর্ক শুধু তাত্ত্বিক সংগ্রাম নয়। একইসঙ্গে এটি অনুশীলনের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কমরেড স্তালিনের সারসংকলন করে কমরেড মাও দেখালেন, সমাজতান্ত্রিক কাঠামোয় শ্রেণী সংগ্রামের মূল ক্ষেত্রটি হলো ক্ষমতাসীন সর্বহারাশ্রেণীর পার্টি। কমরেড মাও সেতুঙকে সুবিধাবাদসংশোধনবাদের বিরুদ্ধে, ডান ও বাম বিচ্যুতির বিরুদ্ধে লাগাতার সংগ্রাম পরিচালনা করে যেতে হয়েছে। সেখানে পার্টি নেতৃত্বের মাঝেই যখন আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তিনি তখন তিনি ডাক দিলেন মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের। বললেন, হেড কোয়ার্টারে কামান দাগাও। এর মানে হলোএক সময় বিপ্লবী থাকার মানেই আজীবন বিপ্লবী নয়। বরং আজীবন নিরলসভাবে বিপ্লবী কাজ করে যাওয়াটাই একজন বিপ্লবীর পরিচয়।

যদিও এ নিয়ে আরও ব্যাপক গবেষণা হতে পারে এবং হওয়া উচিতওতবে চীনা পার্টির অভ্যন্তরে এবং আন্তপার্টি সংগ্রাম পরিচালনায় একটা বড় সময় কমরেড মাও সেতুঙকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। মতাদর্শগত বিকাশের ধারাবাহিকতায় আসে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এটি ছিল বিশ্বে অভূতপূর্ব এক বিপ্লব। সমাজতান্ত্রিক একটি দেশে পুঁজিবাদী পথযাত্রী পার্টি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চালিত বিপ্লব। যেখানে জনগণকে নতুন সর্বহারা সংস্কৃতিতে সজ্জিত করার চেতনা গ্রহণ করা হয়। গণযুদ্ধের সর্বজনীনতাকে বিপ্লবের মৌলিক বিষয় হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এ সময়ে মতাদর্শের তৃতীয় স্তর হিসেবে মাও সেতুঙ চিন্তাধারাকে গ্রহণ করা হয়। যা দেশে দেশে কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা মতাদর্শ আকারে গ্রহণ করেন।

১৯৭৬ সালে মাও সেতুঙ মৃত্যুবরণ করেন। মাও পরবর্তী সময়ে চীনে পুঁজিবাদের পুনরুত্থান ও আলবেনিয়ার হোক্সাপন্থী অধপতনের প্রেক্ষিতে বিশ্বের মাওবাদীদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং নতুন একটি আন্তর্জাতিক গঠনের লক্ষ্যে ১৯৮৪ সালে বিপ্লবী আন্তর্জাতিকতাবাদী আন্দোলন (রিম) গঠিত হয়। কার্যত এটি ছিল চতুর্থ আন্তর্জাতিক গঠনের একটি ভ্রূণ সংগঠন। ১৯৯৩ সালে রিমের পক্ষ থেকে মাওবাদের সূত্রায়ন করা হয়। মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদের (এমএলএম) ভিত্তিতে পরিচালিত রিম মাওবাদী বিপ্লবীদের প্রধানতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক প্রশ্নেও রিম একটি মূল্যায়ন হাজির করে। সেখানে খুব সঠিকভাবেই বলা হয়, বিশ্ব পার্টি ধরনের একক কেন্দ্র আকারে বিশ্ব বিপ্লবের গাইড লাইন দেওয়া অনুশীলন থেকে সরে আসতে হবে। বিশ্ব পরিস্থিতির জটিল সমীকরণের জন্য এমনটা করা সম্ভব বা উচিত নয়। নতুন ধরনের গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বিকাশের কথা বলা হয়।

রিম মাওবাদের উপলব্ধি ও প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটায়। যা দেশে দেশে মাওবাদী পার্টি গঠন ও তার নেতৃত্বে বিপ্লবী আন্দোলনকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখে। মতবাদিক অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম সত্ত্বেও যতদিন রিম কার্যকর ছিল, ততদিন এমন অনুশীলনই সংগঠনটি করেছিল।

আজ রিম কার্যকর না থাকলেও, রিমের গঠনটি ছিল একটি অগ্রসর পদক্ষেপ। রিমের ইতিবাচকতাকে ভিত্তি করেই সামনের দিনে নতুন আন্তর্জাতিক গড়ে উঠতে পারে। উল্লেখ্য যে, আজকের দিনে কমিউনিস্ট বলতে আমরা মাওবাদীদেরই বুঝি। এখন পর্যন্ত মতাদর্শের সর্বোচ্চ স্তর মাওবাদকে ধারণ না করলে এখন আর কারও পক্ষে মার্ক্সবাদী থাকা সম্ভব নয়আজকের দিনের মার্ক্সবাদ হলো মাওবাদ। আর মাওবাদী বিপ্লবীদের অংশগ্রহণেই নতুন আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে উঠতে পারে। যা কার্যকর হবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা ও যৌথ নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে। তার মানে হলোকোনো একক পার্টি সেখানে নেতৃত্ব দেবে নাবরং অংশগ্রহণকারী পার্টিসংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে তা অগ্রসর হবে।

আমরা আজ এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উগ্রডানপন্থা ও ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটছে। ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদ, ফিলিপাইনে ক্ষমতায় ফ্যাসিবাদী দুতের্তে, সৌদি আরবে মোহাম্মদ বিন সালমান, ইসরায়েলে নেতানিয়ানহুর জায়নবাদ, ব্রাজিলে বলসোনারো, এমনকি ইউরোপে নব্যনাৎসিদের উত্থান ঘটছে। আমাদের দেশেও ক্ষমতায় রয়েছে হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী ফ্যাসিবাদ। আজ আমরা এমন এক বাস্তবতায় বসবাস করছি, যেখানে আমাদের বলার অধিকার, এমনকি চিন্তার অধিকারও আইন করে হরণ করেছে ফ্যাসিবাদীরা।

এখানকার ফ্যাসিবাদীরা তাদের ফ্যাসিবাদকে গণতন্ত্রের মোড়কে মুড়িয়ে সামনে এনেছে ‘উন্নয়নের গণতন্ত্র’যার ভিত্তি উগ্রজাতীয়তাবাদের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির মেলবন্ধন। ট্রেন দুর্ঘটনা হলে, শেখ হাসিনা বলেনশীতকাল এলেই নাকি এমন দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে! সুন্দরবন না থাকলে বুলবুলের মতো ঝড় কতটা ক্ষতি করতে পারতো তা ফ্যাসিবাদের মন্ত্রীরাও স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ তার কাছে ভারতের দালালিটাই মুখ্য, মানুষের জীবন নয়। কারণ তারা উনাকে ক্ষমতায় বসিয়ে রেখেছে। পেঁয়াজের দাম বাড়লে তিনি পেঁয়াজ না খাওয়ার তত্ত্ব হাজির করেন। কৃষক জমিতে আগুন দিলেও তাদের কিচ্ছু এসে যায় না! সবক্ষেত্রেই ফ্যাসিবাদীদের কৃষকশ্রমিক বিরোধী নীতি সুস্পষ্ট। ক্যাসিনোর মতো ঘটনা তারা নিজেরাই ঘটায়, আবার তা বিচারের প্রহসন করে। এখন যেহেতু শাসকশ্রেণীর বিরোধী অংশ শক্তিশালী নেই, নির্বাচনের নাটকও তাদের দরকার নেই। তারা ২০১৪ সাল থেকে ভারতচীনমার্কিনের দালালীর জোরেই ক্ষমতায় রয়েছে। তাই জনগণের প্রতি নয়, তারা সাম্রাজ্যবাদের প্রতিই দায়বদ্ধ। ফ্যাসিবাদের সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগ আবরার হত্যার মধ্য দিয়ে এ বিষয়টা প্রমাণ করেছে যে, এখন আওয়ামী ফ্যাসিবাদই শুধু নয়, তাদের ক্ষমতাসীন করা সম্প্রসারণবাদী ভারতের সমালোচনা করাটাও তারা সহ্য করতে পারে না। কারণ দেশ বিক্রির চুক্তি করেই তো তারা ক্ষমতায় থাকতে পারছে! সম্প্রতি সৌদি আরবে নারী শ্রমিকদের নির্মম নির্যাতনের কথাগুলো আমাদের কারও অজানা নয় আশা করি। অথচ এর পরেও সৌদি আরবের মতো ফ্যাসিবাদী, নারী নির্যাতন ব্যবস্থায় নারী শ্রমিক পাঠানো চলছে। অথচ নেপাল, ভুটানের মতো দেশ এসব সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করেছে। আসলে সৌদিরা গৃহশ্রমের জন্য শ্রমিক নেয় না, তারা দাসী কিনে নেয়, সে দেশের আইনে এবং বিভিন্ন ডক্যুমেন্টারিতে এসব বিষয় উঠে এসেছে। ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদীরা তা জেনেও এড়িয়ে চলে। সৌদিরা যেন মনক্ষুণ্ন না হয়! কার্যত এটা ক্ষমতাসীন ফ্যাসিবাদীদের দেহ ব্যবসা ভিন্ন কিছু নয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি শিশু নির্যাতন, নারী নির্যাতনে ক্রমেই নতুন রেকর্ড গড়ে চলেছে। সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেই আমরা যা জানতে পারছি, তা রীতিমতো রোমহর্ষক। বাস্তব অবস্থাটা আরও ভয়াবহ। এ রাষ্ট্রে বিচারবহির্ভুত হত্যা এখন আর নতুন কোনো বিষয় নয়। এখন অবশ্য লাশ মিলবে কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন। অনেক ক্ষেত্রে মানুষগুলো স্রেফ গায়েব হয়ে যাচ্ছে! ফ্যাসিবাদীরা বলছে, প্রেমে ধোঁকা, আর ব্যবসা মন্দায় মানুষ পালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ফ্যাসিবাদীদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ফ্যাসিবাদীদের পুষ্ট ভিসিরাও ওই ফ্যাসিবাদী চেতনা ধারণ করে দেদারসে লুট করছে জনগণের সম্পদ। তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে। কিন্তু সঠিক দিক নির্দেশনা না থাকায়, তা সমস্যার মূলে আঘাত হানতে পারছে না। এ ব্যবস্থা একদিকে বেকারত্ব বৃদ্ধিতে রেকর্ড গড়ছে। আরেকদিকে অতিধনী জন্ম দিচ্ছে চক্রবৃদ্ধি হারে। ব্যাংক থেকে ফ্যাসিবাদের চাটুকাররা লুটে নিচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। অথচ এগুলো তাদের কাছে খুবই নগণ্য।ফ্যাসিবাদের অর্থমন্ত্রীর কাছে এগুলো ‘রাবিশ’। আর মোটা দাগে এগুলোই ফ্যাসিবাদী রাবিশদের ‘উন্নয়নের গণতন্ত্র’!

সংশোধনবাদী পার্টিগুলো ফ্যাসিবাদের মৃদু সমালোচনা করলেও, ‘মন্দের ভালো’ তত্ত্ব আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তিকর অবস্থায় তারা হীনমন্যতায় ভোগে। আবার সংশোধনবাদীদের কেউ কেউ বাকশাল কায়েম করার উপদেশও ফেরি করছে টকশোগুলোতে। তাই এসময়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামকে ঐক্যবদ্ধ করার মধ্য দিয়েই বিপ্লবীরা ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে অগ্রসর হতে পারেন।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ফ্যাসিবাদীরা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, অথচ বিপ্লবী মাওবাদীদের কোনো আন্তর্জাতিক ফোরাম এখন আর কার্যকর নেই। তাই এ সময়ে আন্তর্জাতিক গঠনের জন্য উদ্যোগী হওয়াটা সময়ের দাবি। প্রকৃত অর্থে কোনো পার্টি সর্বহারাশ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করলে সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদই তাকে আন্তর্জাতিক গঠনের পথে পরিচালিত করবে। আর এখানেই ব্যানারে লেখা স্লোগানটির স্বার্থকতামার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদের আদর্শে দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলুন, পুনর্গঠন করুন, শক্তিশালী করুন।

অনেক আলাপআলোচনা এই স্বল্প পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব হলো না। আশা করি, পরবর্তী বক্তারা তার অনেকখানিই পূরণ করতে সক্ষম হবেন।

ধন্যবাদ সবাইকে।

লাল সালাম!!!

[বক্তব্যটি ১৫ নভেম্বর ২০১৯ ‘তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের শতবর্ষ উদযাপন কমিটির আলোচনা সভায় পাঠ করা হয়]

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.