মুক্তিসংগ্রামের উত্তরাধিকার ও ভিয়েতনামের ‘সংস্কার’ অভিমুখ

Posted: অগাষ্ট 28, 2019 in বিভাগ সমূহ
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

লিখেছেন: অজয় রায়

বিপ্লবী নেতা হো চি মিনএর ১৩০তম জন্মবার্ষিকী সমাগত। আর টেট আক্রমণের অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হয়েছে। যার উদযাপন চলেছে শুধু ভিয়েতনামে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন এ নিয়ে কিছু প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসছে। যেমন, ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করছেন কারা? আজকের ভিয়েতনাম যাচ্ছেই বা কোন দিকে?

বিপ্লবী নেতা হো চি মিন (১৮৯০১৯৬৯) সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন।[] তিনি ছিলেন ভিয়েতনামের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম পথিকৃৎ১৯৩০ সালে তিনি ইন্দোচীনের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি ফ্যাসিস্ট বাহিনী ভিয়েতনাম আক্রমণ করেএর মধ্যেই ১৯৪১ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন; আর প্রতিষ্ঠা করেন ভিয়েতনামের স্বাধীনতা লীগ, অর্থাৎ ভিয়েত মিন বাহিনীযারা গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে জাপানি দখলদারদের হটিয়ে দেয় ১৯৪৫ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে ভিয়েতনাম।

তবে সেসময় আবার ইন্দোচীনে উপনিবেশ স্থাপন করে ফরাসীরা। যাদের সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকে১৯৫৪ সালে দিয়েন বিয়েন ফুর যুদ্ধে জেনারেল গিয়াপের নেতৃত্বে ভিয়েতনামের গণফৌজ ফরাসী বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করেকিন্তু দেশটি সাময়িকভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। উত্তর ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন জনগণের সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু দক্ষিণ ভিয়েতনামে উপনিবেশ স্থাপন করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদতারা সেখানে পুতুল সরকার তৈরি করেআর স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেযার বিরুদ্ধে মুক্তি সংগ্রাম চলতে থাকে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন গণপ্রজাতন্ত্রী ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপতি হো চি মিন

এর মধ্যেই ১৯৬৮ সালের ৩১ জানুয়ারি চান্দ্র নববর্ষের দিনে দক্ষিণ ভিয়েতনামের জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট, অর্থাৎ ভিয়েতকং বাহিনী এবং উত্তর ভিয়েতনামের সেনা অভিযান চালায় দক্ষিণ ভিয়েতনামের শতাধিক শহরনগরে[] সেই টেট আক্রমণ যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়মার্কিন মুলুকে তা ছিল নির্বাচনের বছরযখন তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি লিন্ডন জনসনের প্রশাসনও গভীর রাজনৈতিক সঙ্কটে পড়ে। আর দিকে দিকে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়।

যেটা লক্ষণীয় সেটা হলো, ভিয়েতনামে মারাত্মক যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। সেদেশে ৫ লাখ মার্কিন সেনা মোতায়ন করা হয়আর অবাধে নাপাম বোমাবর্ষণ করা হয়। কনসেনট্রেশন ক্যাম্প গড়া হয়। বহু গ্রামে গণহত্যাও সংঘটিত হয়। সেই সঙ্গে রাসায়নিক যুদ্ধ চালায় মার্কিন বাহিনী। স্থায়ীভাবে পরিবেশ ধ্বংস করেযুদ্ধে অন্তত ৪০ লাখ ভিয়েতনামী নিহত হন[] আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার দোসরেরা যুদ্ধকে সম্প্রসারিত করে কম্বোডিয়া ও লাওসে। যাতে আরও লাখো মানুষ প্রাণ হারান। এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্টতই ভিয়েতনামের বিপ্লবকে ধ্বংস করা। আর এ অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করা।

তবে ১৯৭৫ সালে যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরাস্ত হয়। বিদেশি আগ্রাসন ও স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হয় দক্ষিণ ভিয়েতনামযা পরের বছর সেদেশের পুনরেকত্রীকরণের পথ প্রশস্ত করে। সায়গন শহর মুক্ত হলে হো চি মিনের সম্মানার্থে তার নামকরণ করা হয় হো চি মিন সিটি। হো চি মিন নামের অর্থ হচ্ছে ‘আলোর দিশারী’

সমগ্র বিশ্বের সামনেই অত্যন্ত জরুরি ও সময়োপযোগী একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ভিয়েতনাম। সেদেশের দেশপ্রেমিক জনসাধারণ বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। হো চি মিনের নেতৃত্বে লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁরা হয়ে ওঠেন অগ্রণী চেতনার মহান যোদ্ধা। আর তাঁরা নির্ভীকভাবে লড়াই চালিয়ে বহু আত্মত্যাগের মূল্যে বিজয় অর্জন করেন

ভিয়েতনামের বিপ্লবীরা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যান সেখানে আলুথালু পোশাকের মুষ্টিমেয় গেরিলাদের সংগঠিত করে ক্রমে গড়ে তোলা হয় বিশ্বের সবথেকে কার্যকরী সেনাবাহিনীএক গণফৌজ। যা ছিল মেহনতি মানুষের সেনাবাহিনী, অর্থাৎ ‘শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির নেতৃত্বাধীন শ্রমিক ও কৃষকের ফৌজ’ জেনারেল গিয়াপ তেমনভাবেই গণফৌজের বর্ণনা দেনআর ছোট্ট দেশ ভিয়েতনাম যুদ্ধে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়যেহেতু তাঁরা এক ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ চালানযা ছিল গণযুদ্ধ।

মাও সেতুঙএর মতাদর্শে সমরবিজ্ঞানের যে উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটেছিল, তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ভিয়েতনামের বিপ্লবীরা। তাঁরা দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের রণনীতি ভিয়েতনামের বাস্তবতা অনুযায়ী সৃজনশীলভাবে প্রয়োগ করেনআর বিপ্লবী অনুশীলনের নিজস্ব মডেল তৈরি করেন।

ভিয়েতনামে সর্বদা একসাথে সামরিক, রজনৈতিক ও কূটনৈতিক রণনীতির সংশ্লেষ ঘটানো হয় মানুষকে সম্পূর্ণরূপে সংহত করা হয়। আর জনসাধারণের উপর দৃঢ় ভাবে নির্ভর করা হয়। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে অধ্যবসায়ের মাধ্যমেই বিপ্লবী জনগণ বিজয় অর্জন করেনমার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক অস্ত্র সম্ভার ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি শেষ পর্যন্ত কাজে আসেনি। জেনারেল গিয়াপ যেমন বলেন, “যুদ্ধে দুটি উপাদান থাকেমানুষ ও অস্ত্রশস্ত্রশেষ অবধি মানুষই নির্ণায়ক উপাদান হয়ে ওঠে[] ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রামের এই ইতিহাসকে বিকৃত করতে অবশ্য লাগাতার চেষ্টা চলছে

আজকের ভিয়েতনাম কোন দিকে যাচ্ছে

ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রাম বিশ্বের নানা প্রান্তে নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে প্রেরণা জোগায়। তবে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ফল সেদেশের জনসাধারণ তেমনভাবে ভোগ করতে পারেননি। যু্দ্ধের পর সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ইন্দোচীনে প্রভাব বিস্তার করে। যখন ভিয়েতনামের সেনাবাহিনী কম্বোডিয়ার জনগণের বিরুদ্ধে নব্য ঔপনিবেশিক যুদ্ধে লিপ্ত হয়।

আর যেটা লক্ষণীয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার দোসরেরা ভিয়েতনামে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালায়যুদ্ধপরবর্তীকালে দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধও আরোপ করে সেই সঙ্গে ভিয়েতনামের উপর প্রবল রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে। তবে সেখানকার সমস্যার মূলে এই বহিরাগত কারণগুলির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কারণও ছিল১৯৬৯ সালে হো চি মিন প্রয়াত হনপরবর্তীকালে সেদেশের নেতৃত্ব মতাদর্শগত প্রশ্নে দৃঢ় থাকতে পারেননি। আধুনিক সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংগ্রামে তারা যেমন মধ্যপন্থী অবস্থান নেন। আর সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদকে ক্রমে প্রয়োগবাদসর্বস্বতা ও জাতীয়তাবাদ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করেন। ফলে তারা জনগণকে সংগঠিত করে প্রকৃত অর্থে স্বনির্ভরতাভিত্তিক নতুন ভিয়েতনাম গড়তে সক্ষম হননি। বরং আপসের রাস্তায় হাঁটেন। আর শেষঅবধি পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের স্রোতে গা ভাসান।

ভিয়েতনামের সমাজ এবং শাসকদলের মধ্যেও পুঁজিবাদী সামাজিক সম্পর্কের রোগের সংক্রমণ ঘটেছে সেদেশের সরকার যেমন বাজারমুখী দইমই নীতি নিয়েই চলেছে। মুখে মার্কসবাদের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে নয়াউদারবাদী সংস্কার কর্মসূচীর রূপায়ণ চলছে। এর ফলে বৈষম্য বাড়ছে ভিয়েতনামে সস্তা শ্রম পাওয়া যায়। যা অবাধে শোষণ করছে কর্পোরেট সংস্থাগুলোআর জমি থেকে কৃষকদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোরও বেসরকারিকরণ চলছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে দুর্নীতিযার সঙ্গে যুক্ত শাসকমহলের একাংশ, অর্থাৎ বিশেষ সুবিধাভোগী আমলাতন্ত্র। এদিকে, দক্ষিণ চীন সাগরের তলদেশের জ্বালানির ভাণ্ডারকে কেন্দ্র করে বিরোধ ঘনীভূত হচ্ছে। যখন চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্ররোচনা দিচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দোসরেরা। যাদের সাথে সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে চলেছে ভিয়েতনাম।

এই প্রেক্ষিতে ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে মূলত দ্বিবিধ শিক্ষা মেলেপ্রথমত, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী যুদ্ধ চালানো সম্ভব। দ্বিতীয়ত, বিপ্লবী মতাদর্শে যে পার্টি প্রকৃত অর্থে দৃঢ়, তেমন পার্টিরই বিপ্লবের নেতৃত্বে থাকা জরুরি

সাম্রাজ্যবাদী শোষণ এবং আগ্রাসন এখনো বাড়ছে; আর যুদ্ধের বিপদ ঘনিয়ে আসছে। যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার দোসরেরা সামরিক হস্তক্ষেপ করে চলেছে তবে সাম্রাজ্যবাদ এবং শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াইও চলছেস্পষ্টতই, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সমতুল্য। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামকে জনসাধারণের জীবনজীবীকার লড়াই এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মতো আন্দোলনগুলোর সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণদেশে দেশে যারা এভাবে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সমাজ প্রগতি এবং সমাজতন্ত্র অভিমুখী শ্রেণীসংগ্রাম ও গণসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁরাই প্রকৃতপক্ষে ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করছেন।

৩১/০৭/২০১৯

তথ্যসূত্র

[] Jean Lacouture, ‘‘Ho Chi Minh: PRESIDENT OF NORTH VIETNAM’, Encyclopædia Britannica

[] Mike Marqusee, “Remembering a resistance”, The Hindu, January 27, 2008

[] Michael D. Yates, ‘‘Honor the Vietnamese, Not Those Who Killed Them’’, May 01, 2015, Monthly Review

[] Stanley Karnow, “Giap Remembers”, June 24, 1990, The New York Times Magazine

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.