লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

গত ১৪ জুন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী সংঘ পুনর্গঠিত হয়। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে আহবায়ক করে ১২ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠিত হয়। এছাড়াও যারা কমিটি গঠনের সভায় উপস্থিত ছিলেন তাদেরকেও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সংঘের বাইরের সমাজতন্ত্রে আস্থাশীল অন্যান্য প্রগতিশীল লেখকশিল্পীসাহিত্যিকবুদ্ধিজীবীগণ সমালোচনাপর্যালোচনা করে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এসব সমালোচনায় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বুদ্ধিজীবীদের একটি একক সংগঠনে সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়াপদ্ধতি কি হওয়া উচিত, তার ব্যাখ্যা নেই। তাই সমাজতন্ত্রের একজন সমর্থক হিসেবে এ প্রশ্নে আমার অবস্থান ব্যক্ত করা দায়িত্ব মনে করছি।

প্রথমেই বলে নেয়া দরকার, কমিটিতে যারা যুক্ত হয়েছেন তারা মোটাদাগে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার বিপরীতে সমাজতন্ত্রকমিউনিজমে আস্থাশীল। সে অবস্থান থেকেই সমাজতন্ত্রকে সাধারণ মানদণ্ড করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু আইসিএম ও এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিকাশের ঐতিহাসিক কারণেই সমাজতন্ত্রের প্রশ্নে বিভক্তি ক্রিয়াশীল। তারা একই অবস্থান থেকে সমাজতন্ত্রকে দেখেন নাএটাই বস্তুগত বাস্তবতা। আর যেহেতু সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী সংঘ পুনর্গঠিত কমিটির সদস্যদের রাজনৈতিকমতাদর্শিক লাইনগত অবস্থান এক নয়, তাই সমাজতন্ত্রের মানদণ্ডে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি গ্রহণও সম্ভব নয়। তাহলে এই বুদ্ধিজীবীগণ ঐক্যবদ্ধ হবেন কিভাবে? সমাজতন্ত্রের শত্রু সাম্রাজ্যাবাদসম্প্রসারণবাদ ও তাঁর এদেশীয় দালাল শাসকশ্রেণীর বিরোধী কর্মসূচির মধ্যদিয়েই প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীগণ ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন। যা সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের একমঞ্চে নিয়ে আসতে পারে। সমাজতান্ত্রিক নামকরণ ও তাকে মানদণ্ড করলে তা সম্ভব নয়।

সাংগঠনিক কাঠামোগত সমস্যা

কোনো সংগঠন মৌলিক নীতিগত বিষয়ে মতভিন্নতা রেখে সদস্যদের এক কেন্দ্রে কার্যকর রাখতে সক্ষম হতে পারে না। সমাজতান্ত্রিক বুদ্বিজীবী সংঘএর নামের মাঝেই তার মৌলিক নীতিগত অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেছে। সংগঠনটির নামের মাঝে দুটি সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছেসমাজতান্ত্রিক ও বুদ্ধিজীবিতা। অর্থাৎ, সমাজতন্ত্র সম্পর্কে এ সংগঠনের একটা মৌলিক ব্যাখ্যা থাকবে, যা সংগঠনে শামিল বুদ্ধিজীবীরা সঠিক বলে মূল্যায়ন করবেন। যদিও এখনো সংগঠনটির কোনো ঘোষণাপত্র বা গঠনতন্ত্র প্রকাশিত হয়েছে বলে জানা নেই। সংগঠনটি সমাজতন্ত্রের ব্যাখ্যায় মতভিন্নতার কারণেই সদস্যদের এক কেন্দ্রে ধরে রাখতে ব্যর্থ হবে, তা একপ্রকার নিশ্চিত করেই বলা যায়। আর নামের মাঝেই এর সাংগঠনিক ত্রুটি সামনে আসে।

উল্লেখ্য, . আহমদ শরীফ যখন সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী সংঘ গঠন করেছিলেন, তখনও কিন্তু সমাজতন্ত্রের প্রশ্নে বিভক্তি বিদ্যমান ছিল। ড. আহমদ শরীফের ব্যক্তিগত ইমেজের কারণে এ নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধেনি। তবে সংগঠনটি কেন তাঁর মৃত্যুর পর কার্যকর থাকতে পারেনিএর উত্তরটুকুও নিহিত ওই গঠনগত ত্রুটির মাঝেই।

এই সংগঠনে যুক্ত হওয়াদের মধ্যে কেউ কেউ নিকিতা ক্রুশ্চেভ বা তেঙ শিয়াওপিঙএর মতো সংশোধনবাদীদের সমাজতন্ত্রী মনে করেন; কারো মতে চীন এখনো সমাজতান্ত্রিক; কেউবা মনে করেন ৯০এর দশকে পতনের আগপর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক ছিল, তাদের একাংশ আবার রাশিয়াকে সাম্রাজ্যবাদী বলতে নারাজ; কেউ আবার কিউবা, ভেনিজুয়েলা বা উত্তর কোরিয়াকে সমাজতান্ত্রিক বলে গণ্য করেন। আবার এমন কেউ কেউ আছেন, যারা মনে করেনযথাক্রমে স্তালিন ও মাও পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ও চীনে সমাজতন্ত্রের পতন হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলোএতো মতের সমাহারে সমাজতন্ত্রের বিষয়টা ফয়সালা হবে কি করে?

সমাজতন্ত্র বলতে আমরা কী বুঝবো

সর্বহারাশ্রেণীর ক্ষমতাধীন সমাজই সমাজতান্ত্রিক সমাজযেখানে পুঁজিবাদকে ক্ষমতা থেকে সমূলে উৎখাত করা হয়েছে। সর্বহারাশ্রেণী কর্তৃক রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল, পুরনো ব্যবস্থাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে নতুন ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিস্থাপন, উৎপাদনউপায়সমূহের সামাজিকীকরণ এবং রাষ্ট্র ক্রমশ নিজেই নিজেকে শুকিয়ে মারাএগুলোই সমাজতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এমন সমাজে ক্ষমতার সাধারণ ও মূল রূপটি হলো সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব।

সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বের অর্থ হলোব্যাপক জনগণের স্বার্থে শোষকদের ক্ষুদ্র দলটির ওপর শ্রেণীগত আধিপত্য। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে সর্বহারাশ্রেণী শাসকশ্রেণীতে পরিণত হয়সকল সামাজিকীকৃত উৎপাদন পরিচালনা করে, শোষকশ্রেণীর প্রতিরোধ চূর্ণবিচূর্ণ করে, সকল নিপীড়িত শ্রেণীগুলোকে নেতৃত্ব দান করে ও মতাদর্শিক পুনর্গঠনে নেতৃত্ব প্রদান করে।

শাসকশ্রেণীতে পরিণত হয়েই সর্বহারাশ্রেণী শ্রেণীহীন সমাজ গড়ার কাজ চালিয়ে যেতে থাকে অর্থনৈতিক ক্রমউত্তরণ ও রাজনৈতিক মতাদর্শিক সংগ্রাম পরিচালনার মাধ্যমে। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সর্বহারাশ্রেণীর বিরামহীন বিপ্লব ও সম্পত্তির মালিকানার সামাজিকীকরণের মাধ্যমেই কেবল সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সাধন তাৎক্ষণিকভাবেই সম্পন্ন করা যায় না। একটি দীর্ঘ উত্তরণকাল এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এটি হলোপুঁজিবাদ উৎখাতের পর থেকে সাম্যবাদে উত্তরণকালীন একটা পর্ব। এ সময়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজও পুঁজিবাদে অধঃপতিত হতে পারে; আবার পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ ঘটতে পারে। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত সর্বহারা একনায়কত্বের যে সব অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে রয়েছে, তাতে আমরা সমাজতন্ত্র নামক সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো বস্তুর দেখা পাই না। বরং এমন সমাজ যেখানে পুঁজিবাদের উৎখাত ঘটেছে; সেই সমাজ ক্রমউত্তরণের মধ্যদিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়। সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণকালীন পুরো পর্যায়টিই সমাজতন্ত্রের অন্তর্গত। বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেই সাম্যবাদের পর্বটির আবির্ভাব ঘটবে। কিন্তু সুপ্রতিষ্ঠিত, অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের সবগুলো নীতি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসৃত না হলেও, যদি সেখানে সমাজতন্ত্রের বিকাশ ক্রমউত্তরণকালীন পর্যায়ে থাকে; তবে তাকে অবশ্যই সমাজতন্ত্র বলতে হবেসর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বই এক্ষেত্রে মূল মানদণ্ড।

সমাজতন্ত্র আর সাম্যবাদ বা কমিউনিজমের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। সাধ্য অনুযায়ী শ্রম ও শ্রম অনুযায়ী ভোগএটা হলো সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। অপরদিকে, সাধ্য অনুযায়ী কাজ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভোগএটা হলো সাম্যবাদের বৈশিষ্ট্য। সমাজতন্ত্রে শ্রেণী থাকবে, তাই শ্রেণীসংগ্রামও থাকবে, আর তাই রাষ্ট্রও থাকবে, থাকবে সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব। যা কার্যকর হবে মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদের সমসায়িক সর্বোচ্চ বিকশিত অবস্থান ও তাঁর ভিত্তিতে পরিচালিত বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে। কিন্তু সাম্যবাদে শ্রেণী থাকবে না, তাই শ্রেণীসংগ্রামও থাকবে না, যেহেতু দমন করার মতো কোনো শ্রেণীর অস্তিত্ব থাকবে না, তাই রাষ্ট্রের কার্যকারিতা থাকবে না, আর তাই সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বও থাকবে না।

বিপ্লবের স্তর

বর্তমান যুগে সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত দেশে সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিককৃষকমধ্যবিত্তসহ ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্বই হলো প্রকৃত গণতন্ত্র। এ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে সাম্রাজ্যবাদ ও তার এদেশীয় দালাল আমলামুৎসুদ্দি বুর্জোয়াশ্রেণী ও অবশিষ্ট সামন্ততন্ত্রকে বিপ্লবের মাধ্যমে উচ্ছেদ করতে হবে। যা শোষণবৈষম্যহীন সমাজ সমাজতন্ত্রকমিউনিজমের লক্ষ্যে এগিয়ে চলবে। আর এ বিপ্লবের নামই নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব। নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যদিয়ে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠে সেটাই জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ ও তার দালাল শাসকশ্রেণীর সকল শোষণ-নিপীড়ন থেকে জাতি ও জনগণকে মুক্ত করে বলে এটাকে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবও বলা হয়। আমাদের দেশ সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত কৃষিপ্রধান দেশ। এখানে সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদকে প্রয়োজন মতো সংস্কার করে আমলামুৎসুদ্দি বুর্জোয়াশ্রেণীর মাধ্যমে এদেশকে শোষণশাসন করে। উপনিবেশিক যুগের মতো সরাসরি শাসন করে না। ফলে এখানে আমলামুৎসুদ্দি বুর্জোয়াশ্রেণীর সঙ্গে শ্রমিককৃষক মধ্যশ্রেণীসহ ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের দ্বন্দ্বই প্রধান দ্বন্দ্ব। যদিও সামন্তবাদের অবশেষগুলো শাসনব্যবস্থার মৌলিক উপাদান হিসেবে রয়েছে। এজন্য সামন্তবাদের সাথে শ্রমিককৃষকসহ নিপীড়িত জনগণের দ্বন্দ্বও একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব। এবং প্রধান দ্বন্দ্বকে সমাধানের অধীনে সামন্তবাদের অবশেষকে ধ্বংস করতে হবে। আর এজন্যই আমাদের দেশে বিপ্লবের স্তর নয়াগণতান্ত্রিক।

নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের রয়েছে দুটি কর্তব্যজাতীয় ও গণতান্ত্রিক। জাতীয় দিকটি হলো, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে উচ্ছেদ করা এবং গণতান্ত্রিক দিকটি হলো, সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদের দালাল শাসকশ্রেণীকে রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিককৃষকমধ্যবিত্ত ও দেশপ্রেমিক বুর্জোয়াদের গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা।

এই বিপ্লব দুটি পর্বে বিভক্তসাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবী গণতন্ত্রের পর্ব এবং সমাজতন্ত্রের পর্ব। প্রথম পর্বের কাজ হলোসমাজের এই নয়াউপনিবেশিক, সামন্ত অবশেষের রূপকে একটা স্বাধীন, গণতান্ত্রিক সমাজে পরিবর্তিত করা; দ্বিতীয় পর্বের কাজ হলোবিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।

বিপ্লবের প্রথম পর্বে সকল পুঁজি বাজেয়াপ্ত করা হয় না, কেবলমাত্র বৃহৎ একচেটিয়াদের উৎখাত করা হয়, ক্ষুদ্র পুঁজির বিকাশ ঘটে; দ্বিতীয় পর্বে ক্রমান্বয়ে সুসংহতভাবে সকল ব্যক্তিগত পুঁজি বাজেয়াপ্ত করা হয়। নয়াগণতান্ত্রিক স্তরে কৃষি জমিতেও ক্ষুদে ব্যক্তিগত মালিকানা বজায় থাকেরূপগতভাবে জমির রাষ্ট্রীয়করণ হলেও জমির ব্যক্তিগত চাষাবাদ বজায় থাকে ব্যক্তিগত মালিকানার মতোই। সারগতভাবে তাতে জমিতে কৃষকের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিপ্লবের এই পর্বে ভূমি সংস্কারের মানে হলোপ্রকৃত কৃষকের হাতে জমি প্রদান আর অকৃষকদের জমির মালিকানা থেকে উচ্ছেদ করা। শহরেও ক্ষুদ্র উৎপাদকশ্রেণী বিদ্যমান থাকে। রাশিয়া ও চীনের সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ প্রক্রিয়া থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারিএক জটিল ও কষ্টকর সংগ্রামের মধ্যদিয়ে উৎপাদনউপায়সমূহকে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে অগ্রসর করা সম্ভব। বেশ দীর্ঘ একটা সময়ের পরই সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। সমবায় গঠনের পরও কৃষিক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় খামার (জনগণের মালিকানা) ও যৌথ খামার (যৌথ মালিকানা)- এই দুই ধরনের পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে। তবে এর পুরো প্রক্রিয়াটুকুই সমাজতন্ত্রের অংশ। কারণ এর নেতৃত্বে রয়েছে সর্বহারাশ্রেণী এবং মালেমাএর তত্ত্বে সজ্জিত কমিউনিস্ট পার্টি। কাজেই শ্রেণীহীন সমাজ কমিউনিজমে পৌঁছার আগপর্যন্ত সর্বহারাশ্রেণীকে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে অব্যাহতভাবে বিপ্লব চালিয়ে যেতে হবে। বিগত শতাব্দীর সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস আমাদেরকে এ শিক্ষা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিবাচক অর্জনসমূহকে ভিত্তি করেই সমাজতন্ত্রের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তিখণ্ডন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশকিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলো সম্পর্কে মূল্যায়ন তুলে ধরা হলো-

সংগঠনের নামে বুদ্ধিজীবী কথাটি থাকতে পারে কী? হ্যাঁ, এটা থাকতে পারে। বুদ্ধিজীবী কোনো শ্রেণী নয়, তবে এটা একটি গোষ্ঠীযারা বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা করেন এবং বিশ্লেষণের মধ্যদিয়ে নতুন চিন্তা উৎপাদন করেন। তবে অবশ্যই সমাজমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই চিন্তা প্রগতিশীলতা ধারণ করতে পারে না। তাই বুদ্ধিজীবীদের ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী সংঘএর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে কেউ কেউ ব্যক্তিগত আক্রমণও করেছেন। যা অবশ্যই কাম্য নয়। সমালোচনা অবশ্যই থাকবে, ব্যক্তির সমালোচনাও হতে পারে। তবে সেটা যেন হয় রাজনৈতিক মানদণ্ডে, ব্যক্তিগত নয়এ বিষয়টি আমলে রাখাটা জরুরি। তা না হলে সবচেয়ে প্রগতিশীলবিপ্লবী মতাদর্শ ধারণকারীও অপরকে উৎসাহিত করতে ব্যর্থ হবেন। যা বিচ্ছিন্নতাকেই আকৃষ্ট করবে। সমালোচনা করার সময় এ কথাটাও মাথায় রাখা দরকার, ওই ব্যক্তিদের কেউ কিন্তু বিপ্লবের শত্রু নয়, বরং মিত্রতাই এখানে সমালোচনা হতে হবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দরজা খোলা রেখেঐক্যসংগ্রামবৃহত্তর ঐক্য। তাই রাজনৈতিক বিতর্ক জারি রাখার প্রয়োজনেই যেকোনো আলোচনাসমালোচনাপর্যালোচনায় ব্যক্তিগত আক্রমণ পরিহার করা খুব জরুরি।

কেউ কেউ ফেসবুকে কিছু প্রশ্নে সঠিকভাবেই সমাজতান্ত্রিক কনসেপ্ট নিয়ে বলেছেনসংশোধনবাদীদের সমাজতন্ত্র, আর মার্ক্সবাদীদের সমাজতন্ত্র এক নয়। তারা বলেছেনযথাক্রমে স্তালিন ও মাও পরবর্তী সময়ে রাশিয়া ও চীনে সমাজতন্ত্রের পুঁজিবাদে অধপতনের কথা। এমনকি মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু তারা খুব কৌশলে বিপ্লবের স্তর, কমিউনিস্ট পার্টির ভুমিকা ও ক্ষমতা দখলের পথের প্রশ্নটি এড়িয়ে যান। বিপ্লবের মতবাদ, পার্টি গঠন ও তার ভূমিকা, বিপ্লবের স্তর, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পথইত্যাদি নির্ধারিত হয় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মৌলিক বৈজ্ঞানিক সূত্রের ভিত্তিতে। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সঠিক যুক্তি তুলে ধরে বিতর্কে গেলেও, সমগ্রভাবে তারা লাইনগত অবস্থান স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ দৃষ্টিভঙ্গী এসেছে সর্বহারাশ্রেণী ও বিপ্লবে নেতৃত্ব দানকারী কমিউনিস্ট পার্টির অধীনস্ততা মেনে না নেওয়ার পেটিবুর্জোয়া সুবিধাবাদ থেকে।

বুদ্ধিজীবীরা সংগঠিত হবেন কোন মানদণ্ডে

মোটা দাগে আমাদের দেশের শ্রেণীসমূহকে দুইভাগে ভাগ করা সম্ভব। একদিকে, গণনিপীড়ক শ্রেণী হলোএখানকার দালালবুর্জোয়া শাসকশ্রেণীযারা সামরিকবেসামরিক আমলামুৎসুদ্দি পুঁজির ধারক, সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের স্থানীয় সহযোগীযারা এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে ছলেবলেকৌশলে কাজ করে যাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের সেবাদাস হিসেবে; সাথে রয়েছে তাদের শ্রেণীগত লুণ্ঠনতন্ত্র। অপরদিকে, ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের অন্তর্গত শ্রেণীসমূহশ্রমিককৃষকমধ্যবিত্ত, বিভিন্ন পেশাজীবী ইত্যাদিযারা প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।

আমাদের দেশে ব্রিটিশ আমল থেকেই বিপ্লবী ও প্রগতিশীল আন্দোলন বহু উত্থানপতনের মধ্যদিয়ে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলেছে। এবং তার সপক্ষে কিছু শিল্পসাহিত্যও গড়ে উঠেছে। নানাবিধ সীমাবদ্ধতাসহ প্রগতিশীল লেখকবুদ্ধিজীবীশিল্পীসাহিত্যিকগণ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। যদিও এতে প্রকৃত বিপ্লবী রাজনীতি ও তার লড়াইসংগ্রামের ইতিহাসঐতিহ্যকে ভিত্তি করা ও ঊর্ধ্বে তুলে ধরার ক্ষেত্রে দুর্বলতা ছিল। তারপরও আশির দশক পর্যন্ত প্রগতিশীল লেখকবুদ্ধিজীবীগণ ব্যক্তিগত ও বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যদিয়ে ভূমিকা রেখেছেন। ৯০এর দশক থেকে এই ধারা আরও দুর্বল হতে থাকে। যার ধারাবাহিকতা আজও বিদ্যমান। ২০১৪ সাল থেকে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্র ক্ষমতায়। ২০১৮এর প্রহসনের নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ক্ষমতায় এসে তা আরো ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে। প্রগতিশীলবিপ্লবী ও গণতান্ত্রিক শক্তির অগ্রযাত্রাকে নানাবিধ ফ্যাসিবাদী পদক্ষেপের মধ্যদিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার অপচেষ্টা করছে। এমতাবস্থায় বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্তভাবে না থেকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রগতিশীল লেখকবুদ্ধিজীবীশিল্পীসাহিত্যিকদের একটি সাংগঠনিক কাঠামোতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া আজ সময়ের জরুরী দাবি। যার ভিত্তি হতে হবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা। এই মানদণ্ডকে সামনে রেখেই সংগঠিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে সাম্রাজ্যবাদভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার দালাল শাসকশ্রেণী এবং বর্তমান আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে।

ষাটের দশক থেকে শুরু হওয়া ঐতিহ্যবাহী বিপ্লবী, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক শক্তি তীব্র রাষ্ট্রীয় দমনে বিপর্যস্ত এবং সাম্রাজ্যবাদী ও দেশীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতিতে লাইনগতমতাদর্শগত পুনর্গঠনের এক জটিল সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। এ পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করে বিপ্লবীরা নতুন ধরণের সংগঠনসংগ্রাম গড়ে তোলার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। যা প্রকৃতপক্ষে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়াএদেশের গৌরবোজ্জ্বল বিপ্লবী আন্দোলনের ধারাবাহিকতা। যে প্রক্রিয়া এদেশের শ্রমিককৃষকনিপীড়িত নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জাতিসত্তার দৈনন্দিন লড়াইসংগ্রামের সাথে সম্পৃক্ত এবং বিশ্বের সকল প্রান্তের নিপীড়িত জাতিজনগণের মুক্তি সংগ্রামকে সমর্থন ও সংহতিতে সোচ্চার। প্রগতিশীল লেখকবুদ্ধিজীবীকবিশিল্পীসাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীগণকে তাই এ প্রক্রিয়ার বাস্তব অনুশীলন থেকে সাহিত্যের উপাদান সংগ্রহ করে নতুন নতুন সাহিত্য রচনা করতে হবে। এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের কাঠামো গড়ে তুলে শ্রমিককৃষকসহ ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

এজন্য আমাদের দেশের প্রগতিশীললেখকবুদ্ধিজীবীকবিশিল্পীসাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীগণকে সমাজতন্ত্রের শত্রু সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদ ও তার দালাল শাসকশ্রেণীর বিরোধী কর্মসূচির মধ্যদিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যার নামকরণ হতে পারে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রগতিশীল লেখকবুদ্ধিজীবী সংঘ/পরিষদ/আন্দোলন ইত্যাদি। এখানে লাইনগত ভিন্নতা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রগতিশীলগণ অংশ নিতে পারবেন। কারণ এখানে সবাইকেই লড়াই করতে হচ্ছে একই সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধেএ প্রশ্নে ঐক্যটাই হতে পারে এমন সংগঠনের মূল মানদণ্ড।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.