সন্ত্রাসী হামলা ও কাশ্মীরের স্বাধীনতা সংগ্রাম

Posted: ফেব্রুয়ারি 17, 2019 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , ,

লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

কাশ্মীরে পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠী জইশমোহাম্মদ হামলা চালিয়ে অন্তত ৪৪ জন আধা সামরিক বাহিনীর (সিআরপিএফ) সদস্যকে হত্যা করেছে। এ নিয়ে কয়েকজন বন্ধুর বিক্ষিপ্ত মন্তব্যের প্রেক্ষিতেই নিজের অবস্থান জানান দেওয়াটা জরুরি মনে করছি।

শত্রুর শত্রু মিত্রএমন চিন্তা যেমন সঠিক নয়; তেমনি শত্রুর উপর হামলা হলেই সেটা ন্যায্যতা পেতে পারে না। বরং কে, কোন উদ্দেশ্যে, কার উপর হামলা চালালোসেটাই বিষয়টির দৃষ্টিভঙ্গীর মোদ্দা কথা। কোনো সন্ত্রাসীগোষ্ঠী সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদের বুকে ছুরি চালালেও ওই সংগঠন সন্ত্রাসীই থাকে। আবার জনগণের মধ্যকার কোনো বিপ্লবী শক্তির যদি সেই মাপের সশস্ত্র আক্রমণ করার শক্তি নাও থাকে, তবুও সেটি অবশ্যই বিপ্লবী শক্তি। কারণপার্থক্যটা গড়ে দেয় সেই চিন্তা কাঠামোযা নির্ধারণ করে কে কার পক্ষেকে গণমুখী, আর কে গণবিরোধী। আর এ কারণেই যখন সাধারণ কাশ্মীরী, বা তাদের স্বাধীনতার পক্ষে কোনো সংগঠন এমন হামলা চালালে, তার এক ভিন্ন ন্যায্যতা প্রাপ্য। আবার পার্শ্ববর্তী দেশের সেনাসমর্থিত সন্ত্রাসীরা ওই হামলা চালালে তা ন্যায্যতা পেতে পারে না। সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য স্বাধীনতা নয়, কাশ্মীরের পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তি!

এবার আসা যাক ভারতের রাজনীতির সঙ্গে এ হামলার সংযুক্তির প্রশ্নে। চলতি বছরের মে মাসে ভারতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদি সরকারের অবস্থা গত কয়েক মাসে বেশ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। রাফালে, নোটবন্দী, বেকারত্ব, অর্থপাচার, কৃষক অসন্তোষ, দলিত আন্দোলনসহ বিবিধ প্রশ্নে জর্জরিত মোদির জনপ্রিয়তা ক্রমেই আচ্ছে দিন থেকে বুরে দিনএর নির্দেশ দিচ্ছে। মুসলিম বিদ্বেষী প্রচারণা, বা রাম মন্দির ইস্যুও এখন আর কেউ খাচ্ছে না। হিন্দুত্ববাদের সমর্থকরাও মোদির নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অর্ণব গোস্বামীদের হিন্দুত্ববাদী মিডিয়া দিয়েও জনগণকে ঘোল খাওয়ানো যাচ্ছে না সেভাবে। আর তাই এখানে শেষ অস্ত্র পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ বা যুদ্ধাবস্থা। এতে যদি উগ্র জাতীয়তাবাদ কিছু ভর পায়! হামলার পরপরই পাকিস্তানকে দায়ী করার মধ্যদিয়ে সেই ক্ষেত্রটিই প্রস্তুত করছে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার।

এবারের এই সন্ত্রাসী হামলার ফলে ভোটের ঠিক আগমুহূর্তে জনগণের সামনে থেকে সব জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সরিয়ে, তুলে ধরা হলোভারতীয় জাতীয়তাবাদের চুপসে যাওয়া বেলুন! তারমানে এ হামলায় সবচেয়ে লাভবান হবে নরেন্দ্র মোদি। উল্লেখ্য, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, হামলার আগেই এমন কোনো ঘটনার গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল। কিন্তু তা আমলে নেওয়া হয়নি। আর তা কেন আমলে নেওয়া হয়নি, এর পেছনে কোনো ভিন্ন কারণ আছে কি না, প্রমাণ না থাকায়, এটি প্রশ্ন আকারেই থাকলো!

অপরদিকে, পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন সেনানিয়ন্ত্রিত বেসামরিক সরকার। দেশটির শাসন কাঠামো বরাবরই কর্পোরেট সেনাবাহিনীর অধীনস্ত। বেসামরিক সরকারকে স্থিতিশীল না রাখতে দেশটির সেনা গোয়েন্দাবাহিনী রয়েছে সদা তৎপর। আর তাই পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন ভারতে হামলা চালানোর দায় তাদের উপর কম বর্তায় না! যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সেনাবাহিনী শাসন কাঠামোর সবক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা চর্চাটা ক্রমেই বাড়ানোর সুযোগ পাবে। আর এ হামলাটি তাই তাদের জন্যও লাভজনক।

এবার আশা যাক, কাশ্মীরীদের প্রশ্নে। ১৯৪৭ সালের ১৪ ১৫ আগস্ট যথাক্রমে পাকিস্তান ভারতের জন্মের পরপরই অনির্ধারিত এলাকা এবং রাজ্যগুলোর বিষয়ে দ্বন্দ্ব সংঘাতে রূপ নিতে থাকে। কাশ্মীর ছিল এমনই এক রাজ্যযার রাজা ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হরি সিং, কিন্তু জনগণের বেশিরভাগই মুসলিম। তিনি প্রথমে কাশ্মীরের আত্মনিয়ন্ত্রণ চাইলেও, পরবর্তীতে গণবিক্ষোভের মুখে ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে মাউন্ট ব্যাটেন বরাবর চিঠি পাঠান এবং নিজেকে রক্ষার আবেদন জানান। ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ভারতপাকিস্তানের মধ্যে অস্ত্রবিরতি কার্যকর হয়। তখন থেকেই কাশ্মীরের পশ্চিম উত্তর সীমান্ত পাকিস্তানের দখলে এবং মূল কাশ্মীর উপত্যকা, জম্মু এবং লাদাখ ভারতের দখলে রয়েছে। আবার লাদাখের একাংশ রয়েছে চীনের দখলে।

জম্মুকাশ্মীর ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার পর জওহরলাল নেহরু তার চিঠি ভাষণে বহুবার বলেছেন যে, কাশ্মীরের মালিক কাশ্মীরী জনগণ, তারাই সিদ্ধান্ত নেবেনকাদের সাথে থাকতে চায়। গণভোটের আশ্বাসও দেওয়া হয়, তবে তা বাস্তবতা পায়নি। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর রেডিওতে প্রচারিত এক বার্তায় নেহরু বলেন, ‘আমরা ঘোষণা করেছি যে, কাশ্মীরীদের ভাগ্য কাশ্মীরীরাই নির্ধারণ করবেন। আমরা এই বিষয়টি কাশ্মীরী জনগণ এবং সমগ্র বিশ্বের কাছে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই। আমরা এই অবস্থান থেকে সরে আসতে পারি না আর তা আমরা কখনোই করবো না।’ ১৯৫৫ সালের ৩১ মার্চ লোকসভায় প্রদত্ত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘কাশ্মীর কোনো বিনিময়ের বস্তু নয়, যা ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে। বরং কাশ্মীরের প্রাণ রয়েছে, তার পৃথক সত্তা রয়েছে। কাশ্মীরী জনগণের সদিচ্ছা এবং মতামত ছাড়া কিছুই করা যাবে না।’ বক্তব্যটি এপ্রিল ১৯৫৫ তারিখে হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

তবে নেহরু বললেও কাশ্মীরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কখনোই কাশ্মীরীদের হাতে আসেনি। বরং কাশ্মীর লাখো সেনা দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালের পর থেকে অন্তত পাঁচ লাখ কাশ্মীরী নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন আরও দশ লাখের মতো। খোদ ভারতের সরকারি হিসাবে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রভাবশালী ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া এক প্রতিবেদনে জানায়, ১৯৯০ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে ৪৩,৪৬০ জন কাশ্মীরী নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, ওই ১১ বছরে নিহতের সংখ্যা লক্ষাধিক এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও লাখ।

যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে লেখা এক নিবন্ধে অরুন্ধতী রায় বলেন, ‘এটি বিশ্বের সবচেয়ে সামরিকায়িত এলাকা। এখানে রয়েছে ভারতের পাঁচ লাখ সৈনিক। প্রতি চারজন বেসামরিক নাগরিকের বিপরীতে একজন সৈন্যআবু গারিবের আদলে এখানকার আর্মি ক্যাম্প টর্চার কেন্দ্রগুলোই কাশ্মীরীদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা গণতন্ত্রের বার্তাবাহক। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবিতে সংগ্রামরত কাশ্মীরীদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে, এখন পর্যন্ত ৬৮ হাজার মুক্তিকামীকে হত্যা করা হয়েছে এবং ১০ হাজারকে গুম করা হয়েছে। নির্যাতিত হয়েছেন আরও অন্তত এক লাখ মানুষ।’

২০১৪ সাল থেকে হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরে গরুর মাংসও নিষিদ্ধ। গণআন্দোলনগুলোতে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী পেলেট হামলা চালিয়ে হাজারো মানুষকে হতাহত করেছে। আবার ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে জম্মুকাশ্মীরের কাঠুয়া জেলায় আট বছর বয়সী এক মুসলিম আদিবাসী মেয়েকে মন্দিরে আটকে রেখে আট দিন ধরে পালাক্রমে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ময়নাতদন্তে জানা যায়, মেয়েটিকে ঘুমের অসুধ দিয়ে ধর্ষণ করা হতো। ঘটনায় জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে অভিযুক্তদের আটক করা হয়। এর বিপরীতে মুসলিম বিদ্বেষী স্লোগান দিয়ে ধর্ষকদের পক্ষে রাস্তায় নামে বিজেপি।

এসব ঘটনার ফলে কাশ্মীরে ভারতবিরোধিতা ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠেছে। যা এমন সন্ত্রাসী হামলার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। উল্লেখ্য, জইশমোহাম্মদ সন্ত্রাসীরা সাধারণ কাশ্মীরীদের উপর হামলা চালায়নি, সিআরপিএফ কনভয়ে গাড়ি বোমা হামলা চালিয়েছে। যা অবশ্যই সন্ত্রাসী হামলা। কিন্তু যখন ওই সিআরপিএফ বেসামরিক কাশ্মীরীদের হত্যা করে, ধর্ষণ করে, পেলেট হামলা চালায়, হাজারে হাজারে কারাগারে বন্দী রেখে নির্যাতন চালায়তখন ওই বাহিনীও কি সন্ত্রাসী নয়? এটি নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস।

আর তাই এ হামলার দায় যেমন ভারত রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। তেমনি ভারতের কথিত মূলধারার, বিশেষত নির্বাচনপন্থী দলগুলোও কোনোভাবেই নিজেদের দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। হামলার পর ওই আমলামুৎসুদ্দি পুঁজির দালালেরা নিজেদের কে কতো বড় ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, তার প্রতিযোগিতা শুরু করেছে।

কাশ্মীরের সংগ্রামদখলমুক্ত করার সংগ্রামস্বাধীনতার সংগ্রামআজাদীর সংগ্রাম। আর তা অর্জনের আগপর্যন্ত এ কাশ্মীর শান্ত হবার নয়। কাশ্মীর কোনোভাবেই ভারত, পাকিস্তান বা চীনের অংশ নয়। কাশ্মীরীরাই নির্ধারণ করবে তাদের ভবিষ্যত। আর তাই কাশ্মীরীদের স্বাধীনতার সংগ্রামে আমাদের নিরঙ্কুশ সমর্থন আছে এবং থাকবে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.