ফ্রান্সে তের সপ্তাহ ধরে চলছে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন

Posted: ফেব্রুয়ারি 14, 2019 in আন্তর্জাতিক

লিখেছেন: অজয় রায়

আমি সপ্তাহে ৬০ ঘন্টা কাজ করি; আর তাতে এমনকি ন্যূনতম মজুরিটুকুও মেলেনা’সংবাদমাধ্যমকে জানান স্ট্রাসবুর্গে বিক্ষোভে যুক্ত হওয়া মরিস নামের ৬০ বছরের এক কাঠমিস্ত্রি। ফ্রান্সজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে। তের সপ্তাহ ধরে এই ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন চলছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ মাসের ২ তারিখেও সারা দেশে ৫৮,৬০০ মানুষ রাস্তায় নামেন।[] ঐদিন দেশজুড়ে মোতায়েন করা হয় নিরাপত্তা বাহিনীর ৮০ হাজার সদস্য।[] আর বেশকিছু আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সঙ্ঘর্ষও হয়। ইতিমধ্যে পুলিশের ছোঁড়া রাবার বুলেটের আঘাতে ফ্রান্সে অনেক মানুষ আহত হয়েছেন। আর পুলিশি আক্রমণের প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছেন আন্দোলনকারীরা।

জ্বালানির লাগামছাড়া দামবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত বছরের ১৭ নভেম্বর শুরু হয় ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা ‘জিলেত জোন’ আন্দোলন।[] ফ্রান্সে গাড়িচালকদের জন্য হলুদ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক। সেই জ্যাকেট পরেই সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে পথে নামেন। ক্রমে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর পদত্যাগ, মজুরি ও অবসরভাতা বৃদ্ধি, ধনীদের উপর কর আরোপ এবং জনকল্যাণ খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির মতো বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে সোচ্চার হন তারা।

প্রবল চাপের মুখে মাখোঁ সরকার অবশ্য ডিসেম্বরের গোড়ায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে। কিন্তু তার পরেও বিক্ষোভআন্দোলন চলছে। এই আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিকঅর্থনৈতিক কারণ। সরকারের জনবিরোধী নয়াউদারবাদী নীতির ফলে জনগণের জীবনমানের গুরুতর অবনতি ঘটেছে। প্রেসিডেন্ট মাখোঁ মেহনতি মানুষকে উপেক্ষা করে চলেছেন। চলমান সংকটের বোঝা চাপানো হচ্ছে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। সরকারি ব্যয় সঙ্কোচনের পথে গিয়ে জনকল্যাণ খাতে ব্যয় কমানো হচ্ছে। দেশে বেকারত্বের সমস্যাও আছে। এদিকে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। কিন্তু মজুরি বাড়ছে না। অসাম্য বেড়ে চলেছে। শ্রমজীবী জনগণের অর্জিত অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। শ্রম আইন শিথিল করা হচ্ছে। আর ধনীদের সম্পদের উপর কর কমিয়েছেন মাখোঁ। সেজন্যেই আন্দোলনকারীদের দাবি, মাখোঁ আসলে ধনীদের প্রেসিডেন্ট।

শিক্ষা ক্ষেত্রেও সংস্কারের নামে সরকারি বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। ফি বৃদ্ধি করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বহু শিক্ষার্থী। আর তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও চলছে বিক্ষোভ।

লক্ষণীয় বিষয় হলোতৃণমূল স্তরে এই স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক দল ও ট্রেড ইউনিয়নগুলির পরিধির বাইরে। আর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তা ঝড় তুলেছে। শ্রমিকরা রাস্তায় নেমেছেন। মধ্যবিত্ত, কৃষক এবং ছোট ব্যবসায়ীদের মতো সমাজের অন্যান্য অংশের মানুষও বিক্ষোভে শামিল হয়েছেন। মূলত গ্রামাঞ্চলে এবং ছোটমাঝারি শহরগুলিতে শুরু হয় এই আন্দোলন। যা ক্রমে বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। লাখো মানুষ বিক্ষোভে শামিল হয়েছেন।

এদিকে, মাখোঁ তিন মাসের ‘জাতীয় বিতর্কের’ আয়োজন করেছেন। তবে ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের মতে, তিনি জনগণের চোখে ধুলো দিতে চাইছেন। যদিও তাতে জনসাধারণের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন চলছে। কারণ, সাধারণ মানুষ আর সহজে বোকা বনতে রাজি নন। তাছাড়া এই স্বতস্ফূর্ত আন্দোলনের উপরে সংস্কারবাদী সংগঠনগুলোরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। স্পষ্টতই, ‘ইয়েলো ভেস্ট’ প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ইউরোপ, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এই আন্দোলনের আঁচ লেগেছে।

তবে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীদের উপর নির্মম দমনপীড়ন নামিয়ে আনছে সরকার। যার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা স্পষ্ট। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও রবার বুলেট ব্যবহার করছে। পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছে বারংবার। ইতিমধ্যেই বহু আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন সহস্রাধিক পুলিশ সদস্য এবং ১,৭০০ বিক্ষোভকারী।[] কয়েকজন আন্দোলনকারী নিহতও হয়েছেন।

এক শ্রেণীর সংবাদমাধ্যম ‘হলুদ জ্যাকেটধারীদের’ বিরুদ্ধে লাগাতার অপপ্রচার করছে। এদিকে, ফ্রান্সে চরম দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলোও তৎপরতা চালাচ্ছে। ইসলামোফোবিয়া ও জাতিবিদ্বেষে উসকানি দিচ্ছে। অভিবাসীবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে। স্পষ্টতই, ক্ষুব্ধ মানুষের নজর ঘোরাতে চাইছে শাসকশ্রেণী। সরকারও মেরি লে পেন এবং তার পার্টিকে ব্যবহার করছে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করার লক্ষ্যে। তবে দেখা গেছে, বিভিন্ন শহরে আন্দোলনকারীরা তাঁদের মিছিল থেকে বের করে দিয়েছেন ফ্যাসিস্টদের। অপরদিকে বামপন্থী এবং প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো এই আন্দোলনে শামিল হয়েছে। তারা প্রতিক্রিয়াশীলদের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে আন্দোলনটির প্রগতিশীল অভিমুখ বজায় রাখার প্রচেষ্টার অংশীদার হচ্ছেন।।

তথ্যসূত্র

[] ‘France “Yellow Vest” protests continue for 12th straight week’, February 03, 2019, Xinhua

[] Peter Allen, “Heavily-armed officers blast rubber bullets and tear gas at Yellow Vest activists marching through Paris for ‘victims of police violence’ – as protests calling for uprising against Macron reach 12th week in row”, February 02, 2019, Daily Mail

[] “Thousands ‘Yellow Vests’ Protesters March Against Macron’s Gov’t Amid Heavy Police Crackdown”, February 02, 2019, Telesur

[] Ibid

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.