লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

প্রচলিত সাংবিধানিক নিয়মে পাঁচ বছর ঘুরে আবারও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ডামাডোল শুরু হলো। চলছে নির্বাচনী প্রচারণা। সেই সঙ্গে জনমনে আবারও শঙ্কামৃত্যুর মিছিল এবং নির্বাচনী সহিংসতারও। সরকার, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল, অথবা নির্বাচনপন্থী কথিত বাম দলগুলোর প্রচারণায় মনে হতে পারে, যেন নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র! পাঁচ বছর পর পর ভোটগ্রহণ আর তাতে শাসক নির্ধারণের মানেই জনগণের গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র শ্রেণীনিরপেক্ষও নয়। নির্বাচন প্রশ্নে কেন্দ্রীয় বিষয়টি হলোআমরা কোন ব্যবস্থায় নির্বাচনের কথা বলছি!

আজকাল অনেক কথিত বুদ্ধিজীবী বা বামপন্থী নামধারীদের বলতে শোনা যায়, দেশে নাকি আইনের শাসন নেই, কার্যকর ব্যবস্থাটি নাকি সংবিধানসম্মত নয়! বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান বা আইনগুলো পর্যালোচনা করলে ওই দাবির অসারতা বোঝা যায়। কার্যত দেশে সংবিধানসম্মত উপায়েই চলছে ‘আইনের শাসন’। চলুন দেখে নেওয়া যাক, রাষ্ট্র পরিচালনায় বাংলাদেশের সংবিধান কি বলছে

সংবিধানের প্রথম অধ্যায়ের ৭() অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ, কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।” এখানে ক্ষমতার মালিকানা জনগণকে দেওয়া হলেও প্রয়োগের মালিকানা নিয়ে কিছু নির্দেশনা আছে সংবিধানে।

২০১৩ সালে ‘গণতান্ত্রিক আইন ও সংবিধান আন্দোলন’ কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের সংবিধান পর্যালোচনা’ শীর্ষক বইয়ে বলা হয়, সংবিধানের “অনুচ্ছেদ ৪৮() এ বলা হচ্ছে যে, ‘কেবল প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।’ তার মানে হলোজনগণের মালিকানাধীন সকল ক্ষমতার একটি অংশ, প্রয়োগের বিধান বাহ্যত রাষ্ট্রপতির জন্য বরাদ্দ, জনগণের হাতে নয়। সংবিধান দৃশ্যত প্রধানমন্ত্রীর জন্য যতটুকু ক্ষমতা বরাদ্দ করেছে বলে মনে হয়, অনুচ্ছেদ ৪৮() এর বদৌলতে তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি ভোগ করার অধিকারী।

অনুচ্ছেদ ৫৫() অনুযায়ী যদিও মন্ত্রীপরিষদ যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী থাকার কথা, কিন্তু অনুচ্ছেদ ৭০ দেখলেই বোঝা যায়, গোটা সংসদই দল তথা দলীয় প্রধানের কাছে দায়বদ্ধ শুধু নয়, একান্ত অনুগত ও বাধ্যগত হতে সংবিধান অনুযায়ীই বাধ্য। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী সংসদকে যখন যে ধরনের আইন প্রণয়নের নির্দেশ প্রধান করবেন জাতীয় সংসদ তখন সেই ধরনের আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য। কারণ অনুচ্ছেদ ৭০ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য যদি তার নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেয়, তাহলে সংবিধান অনুযায়ী তার সদস্যপদই বিলুপ্ত হবে (১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব সদস্যপদ বিলুপ্তির জন্য যে আদেশটি জারি করা হয়েছিল তা স্মর্তব্য)। অনুচ্ছেদ ৭০এর সঙ্গে অনুচ্ছেদ ১৪২ মিলিয়ে পড়লে দেখা যাবে যিনি প্রধানমন্ত্রী তিনি যদি দলীয় প্রধান হন, আর তার দল যদি জাতীয় সংসদে দুইতৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন তাহলে তিনি সংবিধান সংশোধনের এমন অপরিমেয় ক্ষমতা ভোগ করবেন যা পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী কল্পনাও করতে পারে না।”

যেখানে পুরো ব্যবস্থাটাই গড়ে উঠে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে, অর্থাৎ যেখানে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা মনোক্র্যাটিক ব্যবস্থা প্রবর্তন হয়, সেটা আর যাই হোক গণতান্ত্রিক নয়। এমন ব্যবস্থায় বুর্জোয়া গণতন্ত্র তো দূরের কথা, এমনকি নির্বাচনসর্বস্ব গণতন্ত্রও কার্যকর থাকতে পারে না! কার্যত এমন ব্যবস্থায় ওই ব্যক্তিই থাকেন সার্বভৌম, বাকি সব তার অধীনস্ত। যা বাস্তবিকভাবেই স্বৈরতান্ত্রিক, বা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হওয়ার শর্ত জারি রাখে।

দুই.

বাংলাদেশে নির্বাচনের মানে হলোক্ষমতাসীন আমলামুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীর কোন অংশটি দেশ ও জনগণকে পরের পাঁচ বছর শাসনশোষণ করবে, সেটাই নির্ধারণ করা। তবে শাসকশ্রেণীর নিজেদের মধ্যকার অনৈক্যে সেটিও সম্ভব হচ্ছিল না। প্রবর্তন করা হয় অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। তখন এ দাবির পক্ষে রাজপথ গরম করেছিল আওয়ামী লীগ ও তার জোটবদ্ধ অংশটি। কিন্তু ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পাল্টে যায় সে অবস্থান। এখন তারা সংবিধান থেকেই ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি গায়েব করে দিয়েছে। অপরদিকে, ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় এ ব্যবস্থার বিরোধিতা করা বিএনপিজামায়াত জোট এখন ওই ব্যবস্থাটিকেই ফিরিয়ে আনতে চায়।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়। তৎকালীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালের ২৮ মার্চ সংবিধান সংশোধন করে ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা চালু করা হয়। এটাই হলো ত্রয়োদশ সংশোধনী।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে দুইতৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে সরকার গঠনের পরই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের বিষয়টি সামনে আসে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করার পর এ রায়ের দোহাই দিয়েই ২০১২ সালের ৩ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল ও অন্যান্য সংশোধনীসহ পঞ্চদশ সংশোধনী আনা হয়।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ‘নিয়ম রক্ষার নির্বাচন’ বলা হলেও ছলেবলেকৌশলে পাঁচ বছর চালিয়ে দিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। নির্বাচনকে ঘিরে সারা দেশে শুরু হয় জ্বালাওপোড়াও আর পেট্রোল বোমার সন্ত্রাস। এসব কর্মকাণ্ডে শুধু যে বিএনপি ও তাদের জোটকর্মীরাই জড়িত ছিলেন, তা নয়! সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে জানা যায়, অনেক স্থানে ছাত্রলীগকর্মীরাও পেট্রোল বোমা ছোড়ার সময় ধরা পড়েছে। এ সহিংসতায় নিহত হন দেড় শতাধিক মানুষ। ওই বিতর্কিত নির্বাচনে দেড় শতাধিক আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

আগামী নির্বাচনেও ক্ষমতা না ছাড়ার বন্দোবস্ত করাই আছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’এর বিভিন্ন কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ সামনে এসেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে, এটা ছিল সম্ভবত এর মহড়া! নির্বাচনের আগেই বিভিন্ন মামলায় বিরোধী পক্ষের নির্বাচনী এজেন্টদের একটা অংশকে গ্রেফতার করা, জাল ভোট, ইভিএম ইঞ্জিনিয়ারিংযেখানে যেকোনো বাটন চাপলেই ভোট যাবে ক্ষমতাসীনদের ঘরেএসবই দেখা যেতে পারে আসন্ন নির্বাচনে। আবার কোনো কোনো আসন ছেড়ে দেওয়াও হতে পারে বিরোধীদের জন্য। অপরদিকে, একাংশে হস্তক্ষেপমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হতে পারে, যেখানে থাকবেন নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরাযারা নির্বাচনকে ‘অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য’ বলে সার্টিফাই করবেন।

কোনো অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা নিয়ে যেন কোনো প্রচারণা না থাকে, এজন্য নিত্যনতুন আইন হাজির করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম যে সেন্সরড, তা সমাজের চিন্তাশীল মানুষদের অজানা নয়! আসছে সম্প্রচারমাধ্যম আইন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এসেছে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন২০১৮’, সঙ্গে থাকছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিশেষ বাহিনীযাদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ওই আইন অনুসারে, কেউ সামাজিকমাধ্যমে প্রমাণ (সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা আদালতের সার্টিফায়েড) ছাড়া কিছু পোস্ট করলেই তা অপরাধ হিসেবে আমলযোগ্য হবে, থাকছে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার, আর জামিন অযোগ্য অপরাধের ধারা।

শাসকশ্রেণীর সরকারবিরোধী অংশ বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং বর্তমানে ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া’ভুক্ত দলগুলো গত ১০ বছরে জনগণের কোনো দাবি আদায়ের আন্দোলনে রাজপথে নেমেছে, এমন নজির নেই। বিএনপি তাদের ‘জনসভা’ থেকে কিছু দাবিনামা পেশ করেছে। পাঁচ বছর সংসদে বিরোধী দল এবং পাঁচ বছর সংসদের বাইরে সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে দলটি এখন পর্যন্ত কোনো জনগণের ইস্যুতে আন্দোলনে নামেনি! এবারের দাবিনামায়ও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তাদের ৭ দফা দাবির ৭() বাদে জনগণের আন্দোলনের পক্ষে তাদের কোনো বক্তব্যও নেই। এমনকি ভয়ংকর সব আইন, ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা (৯ মাসে ৪১৩ জন), মূল্যস্ফীতি, অতিধনীর বাম্পার ফলন, কৃষকশ্রমিকের বেহাল, ফসলী জমি কমে আসার রেকর্ড, জলাবদ্ধতা, নদী দখল, সীমান্তহত্যা, তীব্র বৈষম্যপূর্ণ আমদানিনির্ভর বাণিজ্যনীতি, বিদেশনীতিএসব নিয়ে কোনো কথা নেই বিএনপির।

বিএনপিজামায়াত ক্ষমতাসীন থাকার সময় যেসব গণবিরোধী চুক্তি কিংবা আইন করেছে, যেভাবে ভিন্নমত পোষণকারীদের হত্যা করা হয়েছেতা ভুলে যাওয়াটা কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচায়ক নয়। দেশের কোনো কোনো পুঁজিবাদসাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে গিয়ে বিএনপিজামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছেন। তাদের সঙ্গে কোনোরকম জোটবদ্ধতার মানেওই গণবিরোধিতা সমর্থনেরই নামান্তর!

এদিকে, নির্বাচনপন্থী বাম দলগুলোও একটি নির্বাচনী জোট করেছে। তাদের মধ্যে কেউ কথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আবার কেউ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসংবিধান প্রবর্তনের দাবিতে নির্বাচনী দৌঁড়ে নামছে! তবে শ্রমিকশ্রেণীর রাজনীতি করার দাবিদারদের রাষ্ট্রব্যবস্থা না পাল্টে নির্বাচনে নেমে পড়াটা নিখাদ সবিরোধিতা। ওই ‘বামপন্থী’ দলগুলো এমনকি জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন বা মধ্যশ্রেণীর দাবি আদায়ের আন্দোলন থেকেও এখন পিছিয়ে এসেছে। জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার মতো নেতৃত্ব না থাকা এবং বিভিন্ন বিষয়ে অস্পষ্ট অবস্থান তাদেরকে শ্রমিকশ্রেণীই শুধু নয়, পুরো জনগণ থেকেই বিচ্ছিন্ন করেছে বরাবরের মতো। কার্যত তারা শাসকশ্রেণীর পাতানো খেলায় অংশ নিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে তাদের কেউ কেউ জোট ভেঙে শাসকশ্রেণীর কোনো অংশের আশ্রয় গ্রহণ করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না!

তিন.

প্রচলিত নির্বাচনকেন্দ্রিক কথিত গণতন্ত্রের ধারকরা যখন এ ব্যবস্থাটিকে ‘অহিংস পন্থা’ বলে উল্লেখ করেন, তখন কিছু পরিসংখ্যানই সম্ভবত তাদের মুখ বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট হবে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৯৪টি ঘটনায় ২০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই হাজার ৬০৯ জন। এরমধ্যে আওয়ামীলীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিহত হন ৪ জন।

গত পাঁচ বছরে (২০১৩২০১৭) রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন এক হাজার ৩৬ জন। নিচে বছরওয়ারি সহিংসতার তালিকা দেওয়া হলো

আসক আরও জানায়, ১৯৯৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ১৪ বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হন এক হাজার ৯৩১ জন। নিচে বছরওয়ারি নিহতের সংখ্যা উল্লেখ করা হলো

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, (ইত্তেফাক, জনকণ্ঠ, ভোরের কাগজ ও সংবাদ) ১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় ২৮৫ জন নিহত হন। শাসনামল হিসেবে ১৯৯১ সালের জুন থেকে ১৯৯৬ সালের মে পর্যন্ত ১৭৪ জন, ১৯৯৬ সালের জুন থেকে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮৯৮ জন, ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ৮৭২ জন নিহত হয়েছেন।

গত এক দশকে রাজনৈতিক সহিংসতার চরিত্র মৌলিকভাবে পাল্টেছে। তা হয়েছে জনগণের জন্য আরও উদ্বেগজনক। বোমাবাজি করে ভয় দেখানোর জায়গায় এসেছে টার্গেট কিলিং। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ কাজে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। এর আগে সহিংসতা ছিল প্রধানত শাসকশ্রেণীর এক দলের বিরুদ্ধে অপরদলের হামলা পাল্টাহামলায় সীমিত। এখন ব্যক্তিগত আক্রোষ এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলোর মধ্যে এ হামলা বহুগুণে বেড়েছে। ২০১৬ সালে বিএনপির বয়কট করা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বোচনের সহিংসতায় নিহত হওয়া ১১৬ জনের মধ্যে ৭১ জনই ছিল আওয়ামী লীগের। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ৮৪৫টি সহিংসতার ঘটনায় ১০ হাজার ১৪৫ জন আহত ও ১৪৬ জন নিহত হন। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১৬০টি ঘটনায় আহত হন এক হাজার ৭০২ জন এবং নিহত হন ১৪ জন।

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং আসকএর নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, ‘আমাদের রাজনীতির ধরণটাই হয়ে গেছে সহিংস। কোনো দলই এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। এমনকি কেউ চেষ্টাও করছে না। যখন ক্ষমতার পালাবদলের সময় আসে, তখন এ সহিংসতা আরও বাড়ে। কিন্তু কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে হিংস্রতা বা সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কাজেই রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করতেই হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া উচিত, জনগণেরও উচিত চাপ সৃষ্টি করা।’

সুলতানা কামালের ভাষ্যেও একটা কথা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে শাসকশ্রেণীর কোনো রাজনৈতিক দল অহিংস নয়। তারা কেউ অহিংস উপায়ে ক্ষমতায় যেতেও পারবে না। ওই বক্তব্যে আরেকটা বিষয়ও উঠে এসেছেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এমন হতে পারে না, অর্থাৎ এ ব্যবস্থাটি কোনো ক্রমেই গণতান্ত্রিক নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের জন্য জনগণকে, বা জনগণের রাজনৈতিক পার্টিকেই এগিয়ে আসতে হবে। আর এ প্রক্রিয়াটিও কোনোভাবেই অহিংস থাকবে না! হিংস্র হামলাকারীদের সামনে অহিংস উপায়ে কেবল আত্মসমর্পণই করা যায়, লড়াই নয়! মার খেলে, পাল্টা মার দিতেও হবেতা না হলে সহিংস শাসকশ্রেণীর দলগুলোর সামনে কারো পক্ষে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।

চার.

বিগত ৪৫ বছর ধরে সাম্রাজ্যবাদভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ শাসকশ্রেণীর দলগুলো পালা করে ক্ষমতায় এসেছে। দলীয় বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের একটা বড় অংশই কার্যত সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদের দেশীয় এজেন্ট, দুর্নীতিবাজ, রাষ্ট্রীয় ও জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনকারী, জলজঙ্গলজমি বিনাশকারী, সামরিক শাসনের হোতা, যুদ্ধাপরাধারী, সাম্প্রদায়িক, ভাষাগতজাতিগতধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনকারী, ভূমিদস্যু, মানব পাচারকারী, মাদক ব্যবসায়ী, গডফাদার। বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচন হলে, তাতে কারচুপি হোক বা না হোক, তারাই ক্ষমতায় আসবে।

ইদানিং শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন অংশ থেকেও বলতে শোনা যাচ্ছেনির্বাচনে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারসহ ব্যবহারের কথা। একটি বেসামরিক নির্বাচনে সামরিকবাহিনীকে ব্যবহারের চিন্তাটা যে ভয়ঙ্কর অগণতান্ত্রিক, সেটুকু বোধও সম্ভবত তাদের অবশিষ্ট নেই। আর এর মধ্যদিয়ে কার্যত সামরিক শাসনকেই ন্যায্যতা দেওয়া হয়।

বিদ্যমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুসারে, নির্বাচনী ব্যয়সীমা ২৫ লাখ টাকা। যদিও বাস্তবে এ নির্বাচনী ব্যয় যে কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, তা এক অঘোষিত বাস্তবতা! যেহেতু এ ব্যয় দেখানো যাবে না, তাই অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ এখানে ব্যবহার করা হয়। এটা যেন এক ধরনের ব্যবসায়িক বিনিয়োগ! নির্বাচনে জিতে সে টাকা তুলতে জনগণের ওপর শোষণের নতুন নতুন পাঁয়তারা শুরু হয়। আর নির্বাচনী ব্যয়সীমা বাড়ানোর জন্য শাসকশ্রেণীর প্রতিটা দলই দাবি জানিয়েছে।

এখন ধরা যাক, কোনো প্রার্থী আইন মেনে ২৫ লাখ টাকাই খরচ করবেন, তার বেশি নয়! কিন্তু ওই ২৫ লাখ টাকা, বা জামানতের ৫০ হাজার টাকাও যার কাছে নেই, তার কী হবে? জনসমর্থন থাকলেও তিনি নির্বাচনে যেতে পারবেন না। সমাজের তলানিতে বাস করা মানুষগুলো, যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, সরকারি হিসেবেই তাদের সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি। ওই মানুষগুলো, যারা বিত্তবান নয়, তাদের কোনো প্রতিনিধি যদি নির্বাচন করতে চায়, ওই ২৫ লাখ টাকার নির্বাচনী ব্যয়, বা ৫০ হাজার টাকা জামানতের কারণে তিনি সে সুযোগ পাবেন না। কার্যত জনগণের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্বাচনী ব্যয় বা জামানত ব্যবস্থাটিই থাকতে পারে না। জনসমর্থনের প্রমাণ হিসেবে নির্দিষ্ট পরিমাণ মানুষের সমর্থন দেখালেই নির্বাচনের সুযোগ থাকা উচিত। যেখানে খরচের দায়ভার নেবে রাষ্ট্র। সব প্রার্থীর থাকবে সমান সুযোগ।

লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েলথ এক্স’ চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে জানায়, অতিধনী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে দ্রুতহারে বাডছে যেসব দেশে, সে তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে সবার উপরে। বাংলাদেশে ১৭ দশমিক তিন শতাংশ হারে এদের সংখ্যা বাডছে। উল্লেখ্য, অতিধনী বা ‘আলট্রা হাই নেট ওয়ার্থ’ বলে তাদেরকেই বিবেচনা করা হয়, যাদের সম্পদের পরিমাণ তিন কোটি ডলার বা তার চেয়ে বেশি। বাংলাদেশি টাকায় যার মূল্য আডাইশো কোটি টাকারও বেশি।

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “এই তথ্য থেকে আমি মোটেও অবাক হইনি। কারণ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে যে একটা গোষ্ঠীর হাতে এ ধরনের সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে, সেটা আসলে দেখাই যাচ্ছে। এই সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া তো এক দিনে তৈরি হয়নি। এটা কয়েক দশক ধরেই হয়েছে। এখন এটি আরও দ্রুততর হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “এশিয়া বা আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেটা হয়, যাদের হাতে সম্পদ আসে, সেটার পেছনে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যের একটা বড় ভূমিকা থাকে। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য যারা পান, বা যাদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার যোগাযোগ থাকে, প্রাথমিকভাবে তারাই সম্পদের মালিক হন। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেহেতু সুশাসনের অভাব থাকে বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থাকে, তখন এ সুযোগটা একটা বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে রয়ে যায়। খুব ক্ষুদ্র একটা গোষ্ঠী সম্পদের মালিক হয়, যাদের সঙ্গে প্রভাবশালীদের যোগাযোগ থাকে।”

. ফাহমিদা খাতুন আরও জানান, অতিধনীদের অনেকেই তৈরি পোশাক শিল্প, ঔষধ শিল্প, জাহাজ ভাঙা শিল্প, চামড়া শিল্প এবং সেবা খাতে বিনিয়োগ করেছেন। অনেকেই আবার অবকাঠামো নির্মাণ খাতের বৃহৎ প্রকল্পেও জড়িত। তাদের সবারই একটা সম্পদ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেরই আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকবীমা ইত্যাদি রয়েছে। তার পাশাপাশি সেবা খাত, তথ্য প্রযুক্তি খাতেও অতিধনীদের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে।

অবকাঠামো নির্মাণের একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকামাওয়া চার লেন রাস্তায় কিলোমিটার প্রতি ১ কোটি ১৯ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে ভারতে চার লেনের এক কিলোমিটার রাস্তা তৈরিতে (জমি অধিগ্রহণসহ) খরচ হয় ১১ লাখ থেকে ১৩ লাখ ডলার এবং চীনে ১৩ লাখ থেকে ১৬ লাখ ডলার। ইউরোপের দেশগুলোতে খরচ হয় ৩৫ লাখ ডলার। একই লুটপাটের চিত্র দেখা যাবে অবকাঠামো নির্মাণের অন্যান্য প্রকল্পসহ প্রতিটা কথিত ‘উন্নয়ন’ কর্মকাণ্ডে। যেখানে জনগণের নয়, উন্নয়ন হয় শুধুই লুটেরাদের।

একদিকে অতিধনী তৈরি হওয়া এবং অন্যদিকে দরিদ্রদের আরও দরিদ্র হওয়া কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এগুলো দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ফসল। যার কেন্দ্রে রয়েছে লুটপাটকেন্দ্রিক রাজনীতি।

বাংলাদেশে বৈষম্য বাড়ছে এবং দরিদ্রতম মানুষের আয় কমছে। বৈষম্য মাপার স্বীকৃত পরিমাপকজিনি সহগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এই সহগের মান ২০১৬ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৪৮৩, যা ২০১০ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৪৬৫। অর্থাৎ আয়ের বৈষম্য বাড়ছে, জিনি সহগ শূন্য দশমিক ৫ পেরিয়ে গেলে উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, বাংলাদেশের অবস্থান তা থেকে খুব দূরে নয়। ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে দেশে সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে ৫৯ শতাংশ। তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৭৩৩ টাকায়, যা ২০১০ সালেও ছিল ১ হাজার ৭৯১ টাকা। দেশে এখন হতদরিদ্রের সংখ্যা পৌনে দুই কোটি। দেশের একতৃতীয়াংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। আজ যে শিশু জন্ম নেবে, তার মাথায় ৬০ হাজার টাকা ঋণের দায় চাপবে। বছরে যা বেড়েছে প্রায় ৯ হাজার টাকা। আগামী এক বছরে আরও সাড়ে ৭ হাজার টাকা বাড়বে। ফলে ওই সময়ে মাথাপিছু ঋণের স্থিতি দাঁড়াবে ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী চারপাঁচ বছরের মধ্যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।

আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির এ গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে বাড়ছে অপরাধ, হতাশা ও আতঙ্ক। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতি বছর টাকার অবমূল্যায়ন ঘটায় সাধারণের ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, ১৮ বছরের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে ৬৬ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে টাকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে প্রতি ডলার কিনতে ব্যয় হতো ৫০ দশমিক ৩১ টাকা। সেখানে চলতি বছরের মার্চে প্রতি ডলার কিনতে খরচ হয়েছে ৮৩ টাকা ৪০ পয়সা। পণ্য আমদানি করতে ব্যবসায়ীকে এখন আগের থেকে ডলারপ্রতি প্রায় দেড়গুণ বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়ায় বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে দ্বিগুণতিনগুণ হারে। বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। গত অর্থবছরে (২০১৭১৮) গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা তার আগের অর্থবছরে (২০১৬১৭) ছিল ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

অতিধনী উৎপাদনের সঙ্গে অর্থ পাচারের ক্ষেত্রেও ‘চ্যাম্পিয়ন’ বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশগুলোর মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে বাংলাদেশ। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটেগ্রিটি’র (জিএফআই) ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। গত ১০ বছরে ওই অর্থপাচারের পরিমাণ ছিল সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা । নির্বাচনী বছরে এ অর্থপাচার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

২০১৭ সাল শেষে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮ কোটি ১৩ লাখ ১৭ হাজার সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। মালয়েশিয়া সরকারের ‘সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচির আওতায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাংলাদেশি সে দেশে তাদের আবাস কেনার অনুমতি পেয়েছেন। জনপ্রতি খরচ ১২ কোটি টাকা হিসাবে প্রায় ৪২ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা অবৈধ পথে মালয়েশিয়ায় চলে গেছে। এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়, চীন ও জাপানের পরেই।

পাঁচ.

শ্রেণী বিভক্ত সমাজে গণতন্ত্রও সবার জন্য সমান হয় না। এখানে একদিকে আছে নিপীড়ক শাসকশ্রেণী অপরদিকে ব্যাপক নিপীড়িত জনগণ। পার্থক্যরেখাটা খুবই স্পষ্ট। নির্বাচন নিয়ে মৃত্যুর খেলাটাই ওই শাসকশ্রেণীর গণতন্ত্রের স্বরূপ। এ নির্বাচনে দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মেহনতি মানুষের কোনো উত্তরণ সম্ভব নয়। জনগণের পক্ষের কোনো পার্টি বিদ্যমান ব্যবস্থা টিকিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারে না। প্রকৃত গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য দরকার ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা, যা শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এজন্য দরকার শ্রমিককৃষকসহ ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। সেখানে সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদের সুশীল এজেন্ট, কর্পোরেট মিডিয়া, এনজিওবাদীদের কোনো স্থান নেই।

একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও জনগণের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য ন্যূনতম যে শর্তগুলো পূরণ করা দরকার, তার মধ্যে রয়েছে

১। দেশের রাজনীতিতে পরামর্শ, নির্দেশ, মতামতের নামে নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিদেশী দূতাবাস এবং বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, আইডিবির মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার হস্তক্ষেপ অবৈধ ঘোষণা করা। হস্তক্ষেপকারীদের বহিষ্কার করা।

২। অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদের মালিক, ঋণ খেলাপি, অর্থপাচারকারী, মাদক পাচারকারী, সন্ত্রাসের গডফাদারদের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করা ও তাদের তালিকা প্রকাশ করা।

৩। বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক, বিরোধী বা নিজ দলের রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার ও তাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা।

৪। বিভিন্ন সময়ে সামরিক ও স্বৈরতান্ত্রিক একদলীয় শাসনের হোতাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা।

৫। ধর্মের নামে পরিচালিত গণবিরোধী সশস্ত্র সাম্প্রদায়িক বাহিনীর গডফাদার ও মদতদাতাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা। নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা।

৬। যুদ্ধাপরাধী ও পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সহযোগীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা।

৭। জাতিগত, ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে সংসদে নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরক্ষিত রাখা।

৮। সকল শ্রেণীপেশার প্রতিনিধিত্ব হিসেবে সংসদে নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরক্ষিত রাখা।

৯। সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়া।

১০। প্রার্থীদের সম্পদ ও আয়ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রচার করা এবং নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্বারা যাচাই করা।

১১। নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানত প্রথা বাতিল করা। ব্যক্তিগত খরচ নিষিদ্ধ করা। সকল খরচ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় করা।

১২। পার্টির নিবন্ধন ব্যবস্থা বাতিল করা।

উপরোক্ত শর্তগুলো পূর্ণ হলেই কেবল তাকে জনগণের গণতন্ত্রায়নের প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। যে ব্যবস্থা পরিচালনা ও পরিবর্তনের ক্ষমতাও থাকবে জনগণের হাতে। আর জনগণের গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়নের মধ্য দিয়েই গণতান্ত্রিক সংবিধান ও রাষ্ট্র কায়েম সম্ভব। যে সংবিধান ব্যক্তি, বা গোষ্ঠীর হাতে নয়, ক্ষমতা প্রদান করবে জনগণকে। যেখানে প্রতিষ্ঠিত হবে জনগণের সার্বভৌমত্ব।

বিদ্যমান ব্যবস্থায় উপরোক্ত শর্তগুলো পূরণ করা সুদূর পরাহত। শাসকশ্রেণীর দলগুলো জনগণকে নির্বাচনের নামে ধোঁকা দিয়ে গেছে দিনের পর দিন। আর এজন্য কিছু গৎবাঁধা বুলি দেওয়া হয় সার্বভৌমত্বের নামে, অখণ্ডতার নামে, ধর্মের নামে, জাতীয়তাবাদের নামে। কিন্তু যে ব্যবস্থা স্বয়ং নিপীড়ক, গণবিরোধী; তার গায়ে হাজারো তেল মালিশ করলে, হাজার রঙে রাঙালেও তার কোনো গুণগত পরিবর্তন সম্ভব হয় না। আর এ কারণেই এ ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ‘চেঞ্জ’ বা পরিবর্তনের বুলি আওড়ানোর মানে হলো শোষণের পুনঃনবায়ন করা। এতে জনগণের ক্ষমতায়নের কোনো সুযোগ থাকে না। বরং বিপ্লবী আন্দোলনসংগ্রামের মধ্য দিয়েই বিপ্লবী জনগণের ক্ষমতায়ন সম্ভব।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.