উদ্বাস্তু, জাতি বিদ্বেষ, এনআরসি :: সমস্যার গোড়া ধরাটা জরুরি

Posted: অক্টোবর 6, 2018 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

লিখেছেন: সৌম্য মণ্ডল

শুধু মাত্র বিজেপির চক্রান্ত হিসেবে দেখলে বা বাঙালি অসমীয়া হিন্দু মুসলিম আত্মপরিচয়ের নিরিখে দেখলে ন্যাশনাল রেজিস্ট্রি অফ সিটিজেন্স বা এনআরসি সমস্যায় অবস্থান গ্রহণ অনেক সহজ হয়ে যায়। কিন্তু চাপা পড়ে যায় গভীর সমস্যা। যার সমাধান সহজ নয়। তবে যারা যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে মেহনতি জনতার পক্ষে অবস্থান নেয়, তাদের পক্ষে এটা খুবই জটিল এক সময়। কারণ এ ক্ষেত্রে লড়াইটা শোষক বনাম শোষিতের নয়, লড়াইটা শোষিত জনগণের নিজেদের মধ্যে। একদিকে অসমীয়া বোরো ও অন্যান্য আদিবাসীরা, অন্যদিকে রাষ্ট্রহীন হতে চলা লাখ লাখ মানুষ। দার্শনিক মাও সেতুঙ মনে করতেন যে, শোষিত জনগণের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শত্রুতামূলক নয়, কিন্তু সঠিক সময়ে বন্ধুত্বপূর্ণ উপায়ে এ দ্বন্দ্বের মীমাংসা না হলে তা শত্রুতামূলক দ্বন্দ্বে পরিণত হয়। আর শোষিত মানুষের মধ্যে শত্রুতা শোষকের ঠোঁটের কোণে পৈশাচিক হাসির জন্ম দেয়!

লক্ষণীয় যে, এনআরসি বিরোধিতা বাংলায় বিজেপিকে বাদ দিয়ে প্রায় স সংসদীয় ও সংসদবহির্ভূত রাজনৈতিকসামাজিক সংগঠন, বিভিন্ন ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের ঐকমত্যে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে অসমের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যরকম, সেখানে বিজেপিসহ প্রায় স অসমীয়া, বোরো ও অন্যান্য আদিবাসীদের সংগঠন, শিল্পীবুদ্ধিজীবী সমাজ এনআরসির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। যেন ব্যাপারটা অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ও স্বাভাবিক। অসমের গণআন্দোলনের পোস্টারবয় উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলন ও আরটিআই আন্দোলনের কর্মী অখিল গগৈ এনআরসির চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশের দিনটিকে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেছেন ও সুপ্রিম কোর্টকে ধন্যবাদ ও অসমবাসীদের অভিনন্দন জ্ঞাপন করেছেন শুধু তাই নয় বিদেশিদের বিরুদ্ধে হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু), অসম গণ পরিষদ (অগপ), শান্তি আলোচনাপন্থী ইউনাটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ আসাম (আলফা) এনআরসিকে সমর্থন করেছে। রাজ্যসভায় বোরোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্টের (বিপিএফ) সাংস বিশ্বজিৎ দইমারি এনআরসিকে সমর্থন করে বলেছেন যে, ভারতের যদি অসমের সমস্যা নিয়ে কোনো চিন্তা না থাকে, তবে উত্তর পুর্বাঞ্চলকে অসমের হাতে ছেড়ে (স্বাধীনতা) দেওয়া হোক! অন্যদিকে শান্তি আলোচনা বিরোধী গুপ্ত সংগঠন আলফা (স্বাধীন) নেতা পরেশ বড়ুয়া নিউজ১৮ অসম চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, এনআরসি হলো অসমের ভারতীয়করণের প্রচেষ্টাশুধু বাংলাদেশীরা নয়, ভারতীয়রাও অসমে অনুপ্রবেশকারী এনআরসিতে আমার নাম আসলো কি আসলো না, তাতে আমার কিছু যায় আসেনা, আমি ভারতীয় নই, আমি অসমীয়া বরাকের বেংগলী ইউনাইটেড ফোরাম অফ আসাম হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়া ও ডিটেনশন ক্যাম্প উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলে আলোচনাপন্থী আলফা নেতা মৃণাল হাজারিকা পালটা সম্মুখ সমরের আহ্বান জানায় বাঙালি সংগঠনটিকে।

অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে যে সমস্ত অসমীয়া আদিবাসী সংগঠন এনআরসির পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে, তারা প্রত্যেকে কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব আইন সংশোধনীর বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। এ বিলে দেশের বাইরে থেকে আসা উদ্বাস্তুদের ১২ বছর থাকার পর নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারার অধিকারকে সংশোধন করে ৬ বছর করা হয়েছে। অন্যদিকে, বলা হয়েছে যে, মুসলমান বাদে বাকি সবাই উদ্বাস্তু মর্যাদা পাবে। অগপ ও বিপিএফ বিজেপিকে সরকার ছেড়ে বেড়িয়ে আসার হুমকি দিয়েছে। আলোচনাপন্থী আলফা নেতারা হুমকি দিয়েছে আবার সশস্ত্র পথে ফিরে যাবে বলে! ইন্ডিয়ান আইডল গায়ক যুবিন গর্গসহ অসমের শিল্পীবুদ্ধিজীরা ধর্মীয় ভিত্তিতে নাগরিক আইন সংশোধনের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছেন। তার অন্যতম একটা বড় কারণ এই বিল পাস হলে বাঙালি হিন্দুরা স্থায়ী নাগরিকত্ব পেয়ে যাবে এবং আরো বেশি করে হিন্দু বাঙালিরা অনুপ্রবেশে উৎসাহ পাবে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে বিজেপির অনুপ্রবেশ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, সমস্যা মুসলমানদের নিয়ে। অন্যদিকে, অসমীয়া আর অন্যান্য আদিবাসীদের মুসলমান নিয়ে কোন সমস্যা নেই, সমস্যা বাঙালি অনুপ্রবেশ নিয়ে।

আদমশুমারি অনুযায়ী, ১৯৫১ সালের তুলনায় ১৯৭১ সাল পর্যন্ত অসমে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে ৮২.১৫ শতাংশ । এ সময়কালে ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে ৩৪.১২ শতাংশ। অর্থাৎ সারা ভারতের তুলনায় ৪৮.০৩ শতাংশ বেশি! অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে যে, ১৯৭১ সাল থেকে ২০১১ সালের শেষ জনগণনা অনুযায়ী, অসমে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে ১১৩.৩৬ শতাংশ। ঐ সময় পর্বে ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে ১২০.৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ সারা ভারতের তুলনায় ৭.৫৩ শতাংশ কম! এনআরসিতে বাতিল ৪০ লাখ মানুষ, মানে অসমের মোট জনসংখ্যার ১২.১৮ শতাংশ, যার মধ্যে অসমীয়া আর অসমের অন্যান্য আদিবাসী গরীব জনতাও আছে। চূড়ান্ত তালিকায় এ সংখ্যা আরো কমবে বলে বিজেপিসহ সমস্ত পক্ষের আশা।

প্রতিবেশী দেশ থেকে অনুপ্রবেশ হয় এই বাস্তবতা মেনে নিয়েও উপরোক্ত তথ্য থেকে অনুমান করা যায় যে, ১৯৭১ সালকে যদি ডেড লাইন ধরা হয়, তবে ১৯৭১ থেকে ২০১১ সালের শেষ জনগণনা পর্যন্ত বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ জনসংখ্যায় কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তারই করতে পারেনি। ফলে অনুপ্রবেশ আতঙ্ক একটি মিথ প্রতিপন্ন হচ্ছে। কিন্তু যদি ১৯৫১ থেকে ১৯৭১ সালের জনসংখ্যা বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া যায় তবে দেখা যাবে যে, সত্যি অসমে বহিরাগতদের আগমনে জনসংখ্যায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। আসাম আকর্ড অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের আগে আসা বাংলাদেশীদের যদি অসমের নাগরিক ধরা হয়, তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বাংলাদেশী খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সংবাদ সংস্থা স্ক্রলএর একটি রিপোর্ট বলছে যে, বন্যা ও বিভিন্ন কারণে যে বাঙালিরা অসমের ভেতরেই স্থানান্তরিত হচ্ছে, তাদেরকে বাংলাদেশী মনে করছে নতুন অঞ্চলের স্থানীয়রা।

বহিরাগত আগমন ও অসমের আদিবাসীদের বিপন্নতার সমস্যা নতুন নয়। ঐতিহাসিকভাবে সম বিভিন্ন মঙ্গোলীয় এবং আর্য ট্রাইবের মিলনস্থল।১২২৮১৮১৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মঙ্গোলীয় শান ট্রাইবভুক্ত অহমরা অসম শাসন করতো এবং তারা আঞ্চলিক মানুষের ভাষা সংস্কৃতির সাথে মিশে গিয়েছিল। ১৮১৯ থেকে ১৮২৪ সালের বার্মিজ আক্রমণ অসমে অহম রাজাদের রাজত্ব শেষ করে। এরপর ১৯২৬ সালে ইয়েন্দাভু চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশরা অসমকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বেঙ্গল প্রভিন্সের সঙ্গে যুক্ত করে। সে সময় ব্রিটিশরা বাঙালিদের বিভিন্ন সরকারী সংস্থায় উচ্চপদে অফিসার নিয়োগ করতে থাকে। ফলে ব্রিটিশ শাসন চলতো বাঙালি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে। ব্রিটিশের আধুনিক কলেজবিশ্ববিদ্যালয় বাঙালিদের অনেক পরে ১৯০১ সালে অসমে তৈরি হওয়ায় অসমের শিক্ষিত মধ্যশ্রেণী অনেক পরে তৈরি হয়েছে। ফলে উচ্চপদে চাকরিতে অসমীয়রা সবসময় পিছিয়ে থেকেছে বাঙালিদের থেকে।

অন্যদিকে অসমের কৃষকরা স্থানান্তর কৃষি পদ্ধতিতে চাষে অভ্যস্ত ছিল, যা থেকে বাঙালি কৃষকদের কৃষি কৌশল ছিল উন্নত। সন্তোষ রাণা লিখেছেন, বিস্তীর্ণ ব্রহ্মপুত্রের চর এলাকা বছরে চারপাঁচ মাস প্লাবিত হয়ে থাকতো, বন্যার জলস্তর হতো কয়েক ফুট গভীর। অসমের কৃষকরা এই প্লাবিত চর অঞ্চলে চাষ করার পদ্ধতি জানতো না। উনিশ শতকের মাঝামাঝি ব্রিটিশরা যখন চা বাগিচা স্থাপন শুরু করলো, তখন লাখো মজুরকে ঝাড়খণ্ড অঞ্চল হতে নিয়ে আসা হয়েছিলো। এই বিপুল জনসংখ্যাকে খাদ্যশস্য সরবরাহ এক বাস্তব সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। ব্রিটিশ শাসকরা খেয়াল করেছিলো পুর্ব বাংলার ময়মনসিংহ ও আশেপাশের জেলার চাষিরা প্লাবিত এলাকায় ধান চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহল। ইংরেজরা বাঙালি মুসলমান ও নিচু জাতের হিন্দু চাষিদের চর অঞ্চলে বসতি স্থাপন ও চাষ করতে উৎসাহিত করে। ময়মনসিংহের গ্রামগুলোতে ঢাক পিটিয়ে বলা হতো, যে অসম যাবে সে যতটা জমি চাষ করতে পারবে ততটাই জমি পাবে, বিনামূল্যে এক জোড়া বলদ এবং অনুদান হিসেবে পাঁচ টাকা পাবে ফলে লাখ লাখ মুসলমান ও দলিত বাঙালি কৃষক অসমে আসতে থাকে। অসমীয়া, বোরো, কার্বি, লুলুংদের থেকে বাঙালি চাষিরা উন্নত হওয়ায় বিভিন্নভাবে তারা জমি হস্তগত করতে থাকে ও আদিবাসীরা পরিণত হয় ভূমিহীনে। একদিকে জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব ও ভাষা সংস্কৃতিগত পার্থক্যের কারণে পূর্ববাংলার কৃষকরা মিশে যেতে পারেনি অসমীয়া সমাজে। অন্যদিকে পশ্চিমবাংলার সাথে পুর্ববাংলার ভাষা সংস্কৃতির মিল আছে, ফলে পশ্চিমবাংলায় তাদের মিশে যেতে অসুবিধা হয়নি। ব্রিটিশরা চা শ্রমিকদেরও বাইরে থেকে নিয়ে আসতো, কারণ তারা অতদূরে বাড়ি পালিয়ে যেতে পারবে না, তাদের সস্তাশ্রম মুনাফার পাহাড় গড়বে। ১৮৮৩ সালে সমগ্র অসমে নিযুক্ত চা শ্রমিকদের মধ্যে মাত্র ৫.শতাংশ ছিল অসমীয়া।

স্থানান্তর সমস্যাকে মাথায় রেখে ব্রিটিশরা ১৯২১ সালে লাইন সিস্টেমের মাধ্যমে জমিকে তিন ভাগে ভাগ করে। প্রথম অঞ্চল যেখানে বহিরাগতরা স্বাধীনভাবে বসতি স্থাপন করতে পারবে, দ্বিতীয়টি ছিলো সেই অঞ্চল, যেখানে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ। এবং তৃতীয় অঞ্চল যেখানে বহিরাগতরা লাইনের এক পাশে শুধু বসতি স্থাপন করতে পারবে। এই ব্যবস্থা করা হয়েছিলো যাতে বহিরাগতরা জমি কব্জা করতে না পারে। কিন্তু এই নিয়ম কার্যকর হয়নি। বিভিন্ন পন্থায় বহিরাগতরা জমি কব্জা করতে থাকে। ১৯৩১ সালে আসামে আদম শুমারি কমিশনার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে পূর্ববঙ্গ থেকে বিশাল স্থানান্তর যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে অচিরেই ইন্ডিজেনাস মানুষরা শিবসাগর বাদে সর্বত্র সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে জনপ্রিয় কংগ্রেস নেতা গোপিনাথ বরলদোলৈয়ের স্লোগান ছিল সম মীদের জন্য। ঐ নির্বাচনে কংগ্রেস বিপুল ভোটে জয়লাভ করে ও অসম কোনোরকমে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে বেঁচে যায়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিপুল পরিমাণ অসহায় বাঙালি উদ্বাস্তুদের অসমে আসতে বাধ্য করে। ১৯৪৭ আর ১৯৭১ সালের মাঝের বছরগুলোতেও বিপুল পরিমাণ মানুষ অসমে বসতি স্থাপন করে। ১৯৬১ ও ১৯৭১ সালের জনগণনায় অসমের জনসংখ্যা বৃদ্ধি দেখানো হয়েছে যথাক্রমে ৩৪.৯৮ শতাংশ ও ৩৪.৯৫ শতাংশ। যেখানে ঐ দুই আদমসুমারিতে সারাভারতে জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটেছিলো যথাক্রমে ২১.৬৪ শতাংশ ও ২৪.৮০ শতাংশ। ক্রমেই বাংলাদেশ থেকে আগত মানুষরা অসমে নির্বাচন কেন্দ্রগুলোতে নির্ধারক শক্তি হয়ে ওঠে। ২০১৭ সালে প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার এইচ এস ব্রহ্মের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের কমিটি জানায় যে, আসামের ৩৩টি জেলার মধ্যে ১৫টিতে বাংলাদেশীরা সংখ্যাগুরু।

সাংসদ হিরালাল পাটোয়ারির মৃত্যু হলে ১৯৭৯ সালে মঙ্গলদই কেন্দ্রে উপনির্বাচনের ভোটার লিস্টকে কেন্দ্র করে ছাই চাপা ক্ষোভের বিস্ফোরণ হয়। আনুমানিক ৭০ হাজার জন বিদেশি ভোটার লিস্টে আছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিচারে ২৬ হাজার জন বিদেশি বলে চিহ্নিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা সমর্থন হারাবার ভয়ে ভোটার লিস্ট থেকে বিদেশীদের বাতিল করা বন্ধ করে। অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন দাবি করে বাংলাদেশ বর্ডার সিল করার। বিদেশী চিহ্নিতকরণ, ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাতিল ও নিজের দেশে ফেরত পাঠাবার দাবিতে প্রথম সারা সম বন্ধ পালিত হয় ১৯৭৯ সালের জুন মাসে। ক্রমেই এ দাবিতে বিক্ষোভ আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। নেমে আসে ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর দমন পীড়ন। চলে টানা ছয় বছরের দীর্ঘতম বিক্ষোভ। খুন হন ৮৫৫ জন আন্দোলনকারী। টি গার্ডেন ওয়ার্কার অ্যাসোসিয়েশন, অল ইন্ডিয়া শিখ স্টুডেন্টস ফেডারেশন, বাঙালিদের কিছু সংগঠন পর্যন্ত সমর্থন করে এ বিক্ষোভকে। কোনো দাবি না মেনে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৮৩ সালে ভোট করাতে চাইলে সর্বাত্মক ভোট বয়কট হয়। এই ভোটকে কেন্দ্র করে একদিকে অসমীয়া ও আদিবাসী চা শ্রমিকরা অন্যদিকে হিন্দু ও মুসলমান বাঙালি এ দুই তরফের বধ্যে ব্যাপক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। নির্বাচনী প্রচারে এসে প্রণব মুখার্জি, গনি খান চৌধুরীর মত কংগ্রেসের হেভিওয়েট নেতারা বাঙালিদেরকে অসমীয়াদের আক্রমণ করতে বলে। স্বাভাবিকভাবেই এ ভোটে কংগ্রেস বিপুলভাবে জয়ী হয়। কিন্তু আসু নবনির্বাচিত হিতেশ্বর সৈকিয়া সরকারের সঙ্গে কোনোরকম আপোষে রাজি হয় না। রাজিব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১৯৮৫ সালে আসুর সঙ্গে আসাম অ্যাকর্ড সই করে। যেখানে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় ১৯৭১ সালের পরে আগত বিদেশিদের বিতাড়িত করা হবে তৃতীয় তেল রিফাইনারি, একটি আইআইটি ও একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে। এছাড়াও আসুর দাবি মতো, হিতেস্বর সৈকিয়ার পদত্যাগের দাবিও মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু আলফা এ আসাম অ্যাকর্ডকে অসমীয়া আকাঙ্ক্ষার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখে এবং আসাম আকর্ডকে ইয়েন্দাভু চুক্তির সাথে তুলনা করে। আলফা ১৯৮৫ সালে ঘোষণা করে ভারতীয় বুর্জোয়াদের হাত থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মাতৃভূমির স্বাধীনতা এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র একমাত্র অসমে বসবাসকারীদের মুক্তি দিতে পারে। এরপর ব্রহ্মপুত্র দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। অসংশোধিত ভোটার লিস্ট মেনে নিয়েই আসু নির্বাচন লড়েছে। ১৯৯৬ সালে অসম গণ পরিষদ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের কাছে ভোটও চেয়েছে। ২০১২ সালে কোঁকড়াঝাড়ে হয়ে গেছে ব্যাপক বোরোবাঙালি দাঙ্গা। এনআরসি ও নাগরিক আইন সংশোধনীকে কেন্দ্র করে আবার উতপ্ত হয়ে উঠেছে অসম।

একদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শোষণ অন্যদিকে বাঙালি আধিপত্যই অসমীয়া জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়েছে। পরবর্তীকালে কৃষি ব্যবস্থার আধাসামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ও ভারতের বৃহৎ বুর্জোয়াদের দ্বারা অসমের প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদের শোষণ, অসমের বুর্জোয়াদের হাতে পুঁজি সঞ্চয়ের অন্তরায় ও অসমের সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা। অসমের উৎপাদন ও সমাজ ব্যবস্থাকে পশ্চাদপদ করে রেখেছে। ভারতের বৃহৎ বুর্জোয়াদের মধ্যে অসমসহ উত্তরপূর্বাঞ্চলের বুর্জোয়ারা নেই বললেই চলে। রাজস্বসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য ভারত রাষ্ট্রের গতান্ত্রিকীকরণের পথে অন্তরায়। ফলে নিপীড়িত জাতিসত্তারা নিজেদের ভারতের ভ্যন্তরীণ উপনিবেশ ভাবে। কখনো কখনো দেখা যায়, বিভিন্ন রাজ্যের মূলধারার সংসদীয় দলগুলোর নেতারাও এ নিয়ে ক্ষোভ উগড়ে দেন। যেমন সম্প্রতি ২০১৮ সালের জুলাইয়ে কলকাতায় একটি সম্মেলনে কেন্দ্র সরকার রাজ্য থেকে যথেচ্ছ রাজস্ব সংগ্রহ করে, কিন্তু রাজ্যের পাওনা মেটাবার সময় ভিখারিকে ভিক্ষা দেওয়ার মতো আচরণ করে বলে কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ ক্ষোভ প্রকাশ্য করেন।

অসমের মধ্যেই বাঙালি ছাড়াও অসমীয়া আধিপত্য নিয়েও বোরো, রাভাসহ বিভিন্ন আদিবাসীদের ক্ষোভ রয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ বাঙালি মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল জুড়ে দেওয়া হয় আসামের সাথে। এদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় পরিজনরা কাটা তারের ঐপারে থাকে। ফলে এপার ওপাড় হওয়াটা স্বাবাভিক। এই বাঙালিরাও অসমীয়াদের আধিপত্যের দ্বারা নিপীড়িত। অসমে বাঙালি জাতিস্বত্বার উপর অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হলে অসম সরকারের তীব্র দমন পীড়ন নেমে আসে। পুলিশের গুলিতে নিহত হন ১১ জন আন্দোলনকারী। এনআরসি বিতর্ক প্রত্যেক বাঙালিকে সন্দেহভাজন বিদেশি বানিয়ে দিয়েছে।

আদতে ভারতের রাষ্ট্র গঠনের গোড়াতেই রয়েছে বিস্তর গণ্ডগোল। দেশভাগ করা বা জোড়া লাগানো কোনটাতেই জনগণের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। হয়নি কোনো গণভোট। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ এবং তাদের দালাল বৃহৎ বুর্জোয়ারা নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী এই কাজ করেছে। যেমন সুনীতি কুমার ঘোষের প্রখ্যাত বই বাংলা বিভাজনের রাজনীতি অর্থনীতিতে দেখানো হয়েছে যে, জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক কংগ্রেস নেতা শরৎ চন্দ্র বসু, যিনি সম্পর্কে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর দাদা, ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন বাংলা গড়তে ডাক দিয়েছিলেন, যা ভারত ইউনিয়নে যোগদান করবে। এর বিপরীতে মাড়োয়াড়ি বৃহৎ বুর্জয়াদের ব্যবসায়িক স্বার্থকে মাথায় রেখে তাদের প্রতিনিধি হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী বাঙালিদের দেশ ভাগ করার জন্য আন্দোলন শুরু করে। এ সুগভীর জাতি সমস্যাকে সমধানের বদলে রাজনৈতিক দলগুলো ভোট ব্যাংকের স্বার্থে জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে এক জাতিকে অন্য জাতিবিরুদ্ধে উস্কে দিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। বিশেষত বিজেপি গোটা সমস্যাকেই হিন্দুমুসলিম দ্বন্দ্ব হিসেবে প্রতিপন্ন করতে ব্যস্ত।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বর্তমান লেখক ২০০৩ সালে আসামে বিজেপির একটি দেয়াল লিখন দেখেছিল, যেখানে লেখা ছিল অসমকে বাংলাদেশে যুক্ত করার চক্রান্তকে ব্যর্থ কর। এই চক্রান্ত কে, কবে, কোথায় করলো সেটা কেউ জানে বলে আমার জানা নেই। বিজেপিরও জানা নেই নিশ্চিতভাবে বলা চলে। বিজেপির প্রচারে বার বার আসছে রোহিঙ্গাদের কথা। তারাও নাকি ভারতে ইসলামিক সন্ত্রাস ছড়াতে আসছে! প্রতিবেশী দেশ থেকে মূলত গরীবরা বিজেপি কথিত ইসলামি চক্রান্তের অংশ হয়ে ভারতে আসে না। আসে প্রাণ বাঁচাতে, পেটের টানে। যেমনিভাবে যেসব ভারতীয় হিন্দু বিদেশে পাড়ি দিয়েছে, তারা নিশ্চয়ই আরএসএসের হিন্দু সাম্রাজ্যের স্বপ্ন চরিতার্থ করতে যায়নি।

ইসলামিক জিহাদ বা বৌদ্ধ সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি যাই বলা হোক না কেন, মিয়ানমারে অব্যবহৃত আনুমানিক ১১ থেকে ২৩ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট তেলগ্যাসের খনি, সিউই প্রজেক্ট যা মাটির উপর দিয়ে ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার পাইপলাইন, যার সাথে জড়িয়ে আছে ভারত, দক্ষি কোরিয়া, চীনসহ মিয়ানমারের ২০টি পুঁজিপতি পরিবারের স্বার্থ। আর এটাই হলো রোহিঙ্গা বিতারণের মূল কারণ। শুধু রোহিঙ্গা নয়, মিয়ানমারের কাচিন প্রদেশেও এ পাইপলাইনের জন্য মিয়ানমারের সরকারি সেনা নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু কাচিন জাতিসত্তার নিজস্ব শক্তিশালী কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি থাকায় (যেটা কিনা মিয়ানমার সরকারের কাছে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী), মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী সফল হচ্ছে না। এক্ষেত্রে দুর্বলতা ছিলো রোহিঙ্গাদের। উল্লেখ্য এ কাচিনরা দুর্ধর্ষ মুসলমান জনগোষ্ঠী নয়। কাচিন জনগণের মধ্যে ৬৪ শতাংশ বৌদ্ধ, ৩৩. শতাংশ খ্রিস্টা এবং. শতাংশ মুসলমান।

বাংলাদেশের সঙ্গে অভিন্ন ৫৪টি নদীর মধ্যে ৪৭টিতে বাঁধ দিয়েছে ভারতের মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ারা ফলে বাংলাদেশের নদী খাল বিল শুকিয়ে যাচ্ছে। অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে বাংলাদেশের কৃষকমৎসজীবীপ্রকৃতি। ২০১৭ সালে ০৬ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাক জানাচ্ছে, ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশভারত পানি সমস্যা শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিস্তা চুক্তি সাক্ষরিত না হলে ভারতের সাথে সব চুক্তি বাতিলের দাবি ওঠে ও ভবিষ্যতে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করে বক্তারা। সেখানে মেজর হাফিজ বলেন, ভারত আমাদের বন্ধু। একাত্তরে তারা আমাদের যুদ্ধ জয়ে সহযোগিতা করেছে, সেজন্য জাতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে কেয়ামত পর্যন্ত এ ঋণ শোধ করতে হবে, এটা তো সম্ভব নয়।

সিরিয়ায় মার্কিনইউরোপীয়দের বোমা বর্ষণ বা মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা উচ্ছেদ যা এ সময়ে উদ্বাস্তু সমস্যার দুটো উদাহরণ, দুক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ সহিংসতা লক্ষণীয়। কিন্তু মানুষ উদ্বাস্তু হয় শুধুমাত্র হাতে মারার কারণে নয়, ভাতে মারার কারণেও। যেখানে বোমারু বিমান নয়, বরং নয়াউপনিবেশিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিঃশব্দ ঘাতকের ভূমিকা পালন করে! কেউ কি কখনো শুনেছে যে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ইত্যাদি উন্নত পুঁজিবাদী দেশের মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার গরীব দেশগুলোতে সমস্যা তৈরি করছে? বরং উল্টোটাই হয়। বিশ্ব জুড়েই অনুপ্রবেশ আজ এক জ্বলন্ত ইস্যু। সাধারণত এ স্থানান্তর, মাইগ্রেশন হয় অনুন্নত দেশ থেকে উন্নত দেশে (ভারতের অর্থনীতি বাংলাদেশের থেকে উন্নত হলেও আসাম রাজ্য খুবই পিছিয়ে পড়া অঞ্চল)। উন্নত দেশের সরকারগুলো এরকম ভাব করে যে, এ উদ্বাস্তুরা অবাঞ্ছিত বা দয়ার পাত্র। কিন্তু কখন মানুষ নিজের দেশ, নিজের আপনজনদের ছেড়ে অন্য দেশের অনিশ্চয়তার মধ্যে যেতে বাধ্য হয়? আদতে যে পরিস্থিতি কারণে মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে উদবাস্তু হতে বাধ্য হয়, তার কারণ সৃষ্টি করে ঐ উন্নত দেশেরই বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণী।

মানুষের উৎপত্তি যে এপ বা বানরের প্রজাতি থেকে তার আদি বাসভূমি আফ্রিকা। সুতরাং দুনিয়ার সমস্ত মানুষের পূর্বপুরুষরা স্থানান্তরিত হয়েই গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে । মানুষের এই স্থানান্তরিত হওয়া প্রথমদিকে হতো নৈব্যক্তিক কারণে, যেমন খাবারের খোঁজে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি। ধীরে ধীরে, বিশেষত পুঁজিবাদের যুগে মানবগোষ্ঠী স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হলো স্রেফ কিছু মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির লোভের কারণে বা ফলাফলে। একদিকে বৃহৎ পুঁজিপতিদের বিভিন্ন প্রকল্প অতি মুনাফার লোভে গরীব মানুষকে উচ্ছেদ করে উদ্বাস্তু হয়ে দেশের অভ্যন্তরে বা দেশের বাইরে স্থানান্তরে বাধ্য করে। অন্যদিকে, এই উদ্বাস্তু মানুষের সস্তা শ্রমের জোগান ও দর কষাকষির অক্ষমতা আরো অতি মুনাফার জন্ম দেয়।

বিজেপি সভাপতি অমিত শাহসহ একাধিক বিজেপি নেতা হুমকি দিয়েছে যে, বাংলাসহ গোটা দেশে এনআরসি হবে। প্রসঙ্গত, আসাম অ্যাকর্ড অনুযায়ী, অসমের ক্ষেত্রে এনআরসিতে নাম তোলার ডেড লাইন ১৯৭১ হলেও সারাদেশের ক্ষেত্রে তা ১৯৪৮। কিন্তু কতজন নাগরিক এটা প্রমাণ করতে পারবেন যে, তিনি বা তার বাপ, ঠাকুরদা ১৯৪৮ সালের আগে ভারতে বা ৭১ সালের আগে আসামে ছিলেন? কেউ কি আগে জানতো যে ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড থাকার পরেও তার নাগরিকত্ব একদিন প্রশ্নের মুখে পড়বে, তাই দাদুরঠাকুমার কাগজপত্র যত্নে গুছিয়ে রাখা উচিত? বিশেষত যেখানে আমাদের দেশের গরীবদের এক বিরাট অংশ শিক্ষার আলো পায়নি, যারা অফিস কাছারি ভয় পায়! আর এই মানুষদের বেশিরভাগই তো দলিত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু যাদের কাছে দুর্নীতিবাজ পুলিশআমলারা টাকা আদায় করে! হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্টে মামলা চালানো তো দূরের কথা, গাড়ি ভাড়া করে উচ্চ আদালতে পৌঁছতে পারে না দেশের গরীব, শ্রমজীবী মানুষ। সুতরাং এনআরসি একদিকে ৪৮ সালের পরে যারা ভারতে এসেছিলেন তাদের আতংকিত করবে এবং অমুসলিমদের ২০১৯ সালের ভোটের আগে জোর করে বিজেপিকে সমর্থন করতে বাধ্য করবে। কারণ নতুন সংশোধনীতে মুসলমান বাদে সবাই ৬ বছর পর নাগরিক হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবে! শক্তিশালী হবে বিজেপির হিন্দু রাষ্ট্রের এজেন্ডা। যেখানে মুসলমানের কোনো নাগরিক অধিকার নেই। কিন্তু কি হবে এই অনাগরিক মানুষদের? ইন্ডিয়া টিভিতে এক বিতর্কে বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র জানিয়েছেন যে, কাউকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হবে না ভর্তুকি, সম্পত্তির,অধিকার, ভোটাধিকারের মতো কোনো নাগরিক অধিকার থাকবে না এসব অনাগরিকদের। সুতরাং এই অনাগরিকরা অধিকারহীন সস্তা শ্রম হিসেবে বেঁচে থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় এই অনাগরিক বিপুল জনগোষ্ঠী যে আগামী প্রজন্মের জন্ম দেবে, তারা কি নাগরিকত্ব পাবে? এই ভাবে কি ভারতে বাড়তে থাকবে নাগরিক অধিকারবিহীন মানুষের সংখ্যা?

কোনো তাৎক্ষণিক সমাধানই আদতে কোনো সমাধান নয়। কারণ বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যাবস্থার শোষণ যত দিন মানুষকে উদ্বাস্তু হতে বাধ্য করবে, ততদিন উদ্বাস্তু সমস্যা থাকবে। পাসপোর্টভিসা বানিয়ে যাদের আসার ক্ষমতা নেই, তারা কাঁটাতার ডিঙ্গিয়েই আসবে। ১ শতাংশ মানুষের হাতে যদি ৭৩ শতাংশ সম্পদ জমা হয়ে থাকে, তবে ৯৯ শতাংশ মানুষ মাত্র ২৭ শতাংশ সম্পদের উপর বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়। একফালি জমির জন্য এই ৯৯ শতাংশ মানুষের ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়াটা কি অস্বাভাবিক কিছু? সমস্ত জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ছাড়া নিজের ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় নিয়ে বিপন্নতা বোধ ও আত্মরক্ষামূলক আক্রমণে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অর্থাৎ নিজেদের জল, জমি, জঙ্গল, খনি তথা অর্থনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ, নাগরিকত্ব বিধি কি হবে তার উপর নিয়ন্ত্রণ, অন্য জাতির সঙ্গে তার সম্পর্ক কি হবে তার উপর নিয়ন্ত্রণ, কোন ভাষা তার সরকারি ভাষা হবে, তার উপর নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। সমস্ত জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ সহাবস্থান, সমমর্যাদার ভিত্তিতে ঐক্য ও বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে স্থায়ী সমাধানের পথে এগুনো সম্ভব।।

সৌম্য মণ্ডল :: লেখক, এক্টিভিস্ট (পশ্চিমবঙ্গ)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.