লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ঔপনিবেশিক আমলের একটি সামন্তীয় চেতনার আইনকে অসাংবিধানিক বলে খারিজ করেছেন। ওই আইনে নারীকে পুরুষের সম্পত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছিল। ব্যক্তির স্বাভাবিক যৌন সম্পর্ককে ফৌজদারি আইনের অধীনস্ত করা হয়েছিল। তা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আর এ কারণেই ওই আইনটি বাতিল করা হয়।

দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় ‘ব্যভিচারের’ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। তাতে বলা হয়, যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো নারীর সঙ্গে তার স্বামীর সম্মতি ব্যতীত যৌনসঙ্গম করেন এবং অনুরূপ যৌনসঙ্গম যদি ধর্ষণের অপরাধ না হয়, তাহলে সে ব্যক্তি ব্যভিচারের দায়ে দায়ী হবেন, যার শাস্তি পাঁচ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।

ব্যভিচার’ কি? প্রচলিত সংজ্ঞানুসারে, সমাজআইনের বিধিভুক্ত যে যৌন সম্পর্কের নির্দেশনা, তার বাইরে যাওয়ার মানেই হলো ‘ব্যভিচার’। একটা শব্দ যে পুরো ব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এ শব্দটিযা প্রচণ্ডভাবে নারীবিদ্বেষী, পুরুষতান্ত্রিক এবং সামন্তীয় চেতনাধীন। এর দ্বারা কার্যত নারীর যৌন স্বাধীনতাকেই অস্বীকার করা হয়। বিয়ের পর নারী তার স্বামীর বাইরে কিছু চিন্তা করতে পারবে না, এমন বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। কার্যত ওই ‘ব্যভিচারের’ জুজু দেখিয়ে নারীকে পুরুষের ‘যৌনদাসীতে’ পরিণত করা হয়। ওই ‘ব্যভিচার’এর শাস্তি দিতে যে আইন করা হয়েছে, তা কমিউনিস্ট কেন, কোনো বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যক্তিও মেনে নেবেন না নিশ্চয়!

আদালতের রায়ে আরও বলা হয়েছে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জন্য যে কেউ বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারেন। তার মানে, কারও সঙ্গীর আরেকজনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে জেনেও ওই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আপনি বাধ্য নন। আর এ রায়টি ইতিবাচকভাবে না গ্রহণ করার কোনো যৌক্তিকতাই নেই।

ব্রিটিশদের তৈরি করা ১৮৬০ সালের ওই আইনে বলা আছে, কোনো ব্যক্তির স্ত্রী তার সম্মতিতে অপর পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। এ আইনে স্পষ্টভাবেই নারী যৌনতার স্বাধীনতা, তার নারীসত্তার স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে, তাকে পুরুষের অধস্তন ক্রীতদাসী রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। এমন আইন মূলত সামন্তীয় চিন্তাপ্রসূত। যেখানে নারীকে তার স্বামীর সম্পত্তি হিসেবে দেখানো হয়।

ওই আইনে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে বিবাহিত নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করা পুরুষের জন্য। নারীকে শাস্তির আওতায় আনা হয়নিবস্তু বা সম্পত্তির শাস্তি দেওয়া যায় নাএ চেতনা থেকেই। আর এটি নারীপুরুষ উভয় সত্তার স্বাভাবিক যৌনতারও পরিপন্থী।

একজন মানুষের যৌন সম্পর্ক, যেখানে কোনো আধিপত্যবাদী অবস্থান নেই, নেই কোনো জবরদস্তি, সেটাকে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করাটা কোনো গণতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় থাকতে পারে না। নারীপুরুষের স্বাভাবিক মানবিক সম্পর্ক কোনো ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ নয়! যেমনটা এ ভূখণ্ডে বিয়ের ক্ষেত্রে ঘোষিতঅঘোষিত সামাজিক বিধি আরোপের মাধ্যমে বৈধঅবৈধতার লেবাসে সামনে আসে।

বুর্জোয়া ব্যবস্থায়ও যে যৌনতার প্রশ্নে নারীকে অধস্তন করার আইন বলবৎ থাকে, আর তা থেকে প্রকৃত উত্তরণের জন্য সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আবশ্যক, সে প্রসঙ্গে কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন বলেন, “বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ও বিবাহবহির্ভূত সন্তান এবং সেই সঙ্গে এক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতির বিষয়ে বুর্জোয়া দেশের আইনবিধির সঙ্গে সামান্যমাত্র পরিচয় থাকলে এ সম্পর্কে আগ্রহী যেকোনো ব্যক্তিই দেখবেন যে, আধুনিক বুর্জোয়া গণতন্ত্র এমনকি সর্বাধিক গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রও এ ব্যাপারে নারীদের প্রতি এবং বিবাহবহির্ভূত সন্তানের প্রতি আচরণে ঠিক ভূমিদাসমালিক রূপেই নিজেকে জাহির করে।

বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, বিবাহবহির্ভূত সন্তানদের অবস্থাপ্রভৃতি প্রশ্নের ক্ষেত্রে বলশেভিক বিপ্লবই হলো একমাত্র সুসঙ্গতরূপে গণতান্ত্রিক বিপ্লব। আর এ প্রশ্ন যেকোনো দেশের অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যার স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট।” (সংগ্রামী বস্তুবাদের তাৎপর্য প্রসঙ্গে, মার্চ ১৯২২)

দুই.

আদালতের রায়ে একটা সামন্তীয় চেতনার আইন বাতিল হলো। অথচ কর্পোরেট মিডিয়ায় বলা হলো আদালত নাকি ‘পরকীয়া’ বৈধ করেছে! এমন প্রচারণাটাও সমাজে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিকতারই নিদর্শন। আর এ ‘পরকীয়া’ শব্দের মাধ্যমে কাউকে নিশ্চয় ‘আপন’ বলে মনে করা হচ্ছে। ওই আপনটা কে? স্বামীযাকে এ সমাজে নারীর প্রভু রূপে উপস্থাপন করা হয়?

ব্যভিচার’, ‘পরকীয়া’শব্দগুলোর মাঝেই সমাজের পুরুষতান্ত্রিক চেতনা প্রস্ফুটিত হয়। ‘পরকীয়া’ ধারণাটাই সমাজতান্ত্রিক বা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। প্রকৃতপক্ষে নারী বা পুরুষ যার সঙ্গে সম্পর্কে আবদ্ধ হচ্ছে, সেই তার আপন। আপন বলেই একেঅপরের সঙ্গে আবদ্ধ হয়। আবার আপন মনে না হলে, অর্থাৎ সম্পর্ক ভেঙে গেলে তারা আলাদা হয়ে যাবে। এ প্রক্রিয়া খুবই স্বাভাবিক।

নারী বা পুরুষ একটা সম্পর্কে থাকা অবস্থায় অন্য কোনো সম্পর্কে জড়ালে পূর্বের সম্পর্কটি ভেঙে দেওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে কেউ দুটি সম্পর্ক একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলতে পারেন। এমন ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির দুজন পার্টনারই যদি বিষয়টি না জানেন, অথবা না মেনে নেন, তবে তা অবশ্যই অগণতান্ত্রিক। তখন ওই ব্যক্তিবর্গকেই সম্পর্ক ভাঙার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আইন করে মনস্তাত্ত্বিক, বা প্রেমযৌনতার সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বরং তা চরমভাবে অগণতান্ত্রিক, সামন্তীয় চেতনার বহিঃপ্রকাশ এবং মার্ক্সবাদবিরোধী।

আবার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তির একাধিক যৌন সম্পর্ক বা বহুগামিতা। কমিউনিজম বহুগামিতার বিরুদ্ধে নয়। তবে কপটতার বিরুদ্ধে। সম্পর্কের স্বচ্ছতা বজায় রেখে কেউ একাধিক সম্পর্কে জড়াতে পারেন। কিন্তু একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে যৌন সম্পর্ক তৈরি করা, বা পার্টনারের সঙ্গে আলোচনাবোঝাপড়া ছাড়াই কপটতার আশ্রয় নিয়ে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের দোহাই দিয়ে আত্মকেন্দ্রিক ভোগের জন্য বহুজনের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করে বেড়ালে, সেক্ষেত্রে বিষয়টা কতোটুকু গ্রহণযোগ্য হতে পারে? এটাও কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক চেতনারই বাইপ্রডাক্ট। সম্পর্কে স্বচ্ছতা খুবই জরুরি। আর যে সম্পর্কে স্বচ্ছতার অভাব দেখা যায়, তা ভেঙে ফেলাটাই অধিক যৌক্তিক।

নারীপুরুষের যৌন সম্পর্কএকগামিতা, বহুগামিতার প্রশ্নটি পরিবার গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যেই নিহিত নারীকে অধস্তন করে পুরুষের সম্পত্তি রূপে স্থাপনের চেতনা, যার ভিত্তি নিশ্চিতভাবেই অর্থনৈতিক। ‘পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ গ্রন্থে কমরেড ফ্রেদরিখ এঙ্গেলস বলেন, “একেবারে খাঁটি একগামিতা যদি সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ বলে বিবেচিত হয়, তবে তো সুতোলি ক্রিমি পোকাগুলোই সবচেয়ে ভালো বলতে হবে। এই পোকাগুলোর দেহে ৫০টা থেকে ২০০টা পর্যন্ত অংশ আছে। প্রত্যেকটার মধ্যেই সম্পূর্ণ পুরুষ অঙ্গ ও স্ত্রী অঙ্গ আছে। তাই এ পোকারা সারাজীবন ধরে নিজের সঙ্গেই নিজে যৌন সঙ্গম করে থাকে। কিন্তু আমরা যদি স্তন্যপায়ী জীবদের বিষয়ে আলোচনা করি, তবে দেখতে পাবো যে, তাদের মধ্যে বিচিত্র যৌন সম্পর্ক রয়েছেঅবাধ যৌন সম্পর্ক, দলগত যৌন সম্পর্ক, বহুগামিতা, একগামিতা।

বর্বর যুগের মধ্যস্তর থেকে উচ্চস্তরে পরিবর্তনের সময় এ একবিবাহ প্রথার প্রবর্তন হয়। এ প্রথার ভিত্তিতে আছে পুরুষ প্রাধান্য। এ ব্যবস্থার স্পষ্ট উদ্দেশ্য হলোসন্তানদের পিতৃত্ব যাতে অবিসংবাদিত হয়। এর প্রয়োজন হলোযাতে সন্তানেরা যথাসময়ে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে ভোগ দখল করতে পারে। জোড় পরিবারের বিবাহ প্রথার সঙ্গে একবিবাহ প্রথার পার্থক্য হলোএকবিবাহ প্রথায় বিবাহের বন্ধন অনেক শক্ত। এখন আর স্বামী বা স্ত্রী যে কোনো একজনের ইচ্ছে হলেই বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করতে পারবে না। এখন নিয়ম হলোকেবলমাত্র পুরুষই ইচ্ছে করলে বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করতে পারবে। দাম্পত্য জীবনে ব্যভিচারের (বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক) অধিকারও পুরুষের বেলায় কার্যক্ষেত্রে রয়ে গেলো। কিন্তু স্ত্রী যদি প্রাচীন যুগের যৌন সম্পর্কের কথা মাথায় রেখে স্বাধীন যৌনজীবন যাপন করতে চায়, তবে তাকে আগেকার যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে।

একবিবাহ প্রথার সঙ্গে গোলামীর অস্তিত্ব, পুরুষের অধিকারের অন্যান্য সম্পত্তির সঙ্গে সঙ্গে ক্রীতদাসীর অস্তিত্বএসবই গোড়া থেকেই একবিবাহ প্রথার উপর এক বিশেষ ধরনের ছাপ মেরে দিয়েছে যে, একবিবাহ ব্যাপারটা শুধু নারীদের জন্যই পুরুষদের জন্য নয়, আজ পর্যন্ত সে অবস্থায়ই রয়ে গেছে।

এ প্রথা ব্যক্তিগত প্রেমযৌনতার ফলে হয়নি, আর ব্যক্তিগত প্রেমযৌনতার সঙ্গে এর একেবারেই কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ বিবাহ প্রথা ব্যাপারটা আগের মতো এখনও সুবিধা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। এ পরিবার প্রথা কোনো স্বাভাবিক কারণে উদ্ভূত হয়নি। অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে, অর্থাৎ সম্পত্তির উপর স্বাভাবিক যৌথ অধিকারের স্থলে ব্যক্তিগত মালিকানা প্রথার প্রবর্তনের ফলেই এ একবিবাহমূলক পরিবার প্রথার প্রবর্তন হয়।”

এঙ্গেলস পুরুষতান্ত্রিকতাকে শ্রেণী শোষণ বলেও উল্লেখ করেছেন এবং নারী প্রতিরোধকে শ্রেণীসংগ্রাম হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। একই গ্রন্থে তিনি বলেন, “…সুতরাং ইতিহাসে একবিবাহ প্রথা ব্যাপারটা নারী ও পুরুষের সম্প্রীতির মধ্য থেকে উদ্ভূত হয়নি। আর নারী ও পুরুষের মধ্যে সম্প্রীতির শ্রেষ্ঠ প্রকাশ হিসেবে একবিবাহ প্রথাকে তো কোনোমতেই ধরা যায় না। অপরপক্ষে নারীর উপর পুরুষের প্রাধান্যের রূপ হিসেবেই এ প্রথা প্রবর্তিত হয়। এ একবিবাহ প্রথার মধ্যে নারী ও পুরুষের পরস্পরের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের ঘোষণাও দেখতে পাওয়া যায়।যে দ্বন্দ্ব কিনা প্রাগৈতিহাসিক যুগে ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। ১৮৪৬ সালে আমার (এঙ্গেলস) ও মার্ক্সের লেখা একটি পুরনো অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিতে লেখা ছিলনারী ও পুরুষের মধ্যে সন্তান জন্ম ও লালনপালনের ক্ষেত্রে যে শ্রমবিভাগ হয়, সেটাই হলো সর্বপ্রথম শ্রমবিভাগের সৃষ্টি। তার সঙ্গে এখন আরও যুক্ত করতে পারি যে, একবিবাহ প্রথার মধ্য দিয়ে নারীপুরুষের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও ইতিহাসে শ্রেণীদ্বন্দ্ব ঠিক একই সময়ে দেখা দেয়। আর এক শ্রেণীর দ্বারা অপর শ্রেণীকে শোষণ এবং পুরুষের দ্বারা নারীকে শোষণও ঠিক ওই সময়েই দেখা দেয়।”

যেসব দেশে বিপ্লব হয়েছে, সেখানে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণই বিপ্লবী অগ্রযাত্রাকে নির্দেশ করে। যেমনটা কমরেড মাও বলেছেন, ‘নারী অর্ধেক আকাশ’, আর জনগণের অর্ধেক অংশের স্বার্থ সরাসরি পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত শ্রেণীসংগ্রামে জড়িত।

১৯২০ সালে কমরেড ক্লারা জেটকিনের সঙ্গে আলাপচারিতায় লেনিন বলেন, “বুর্জোয়া রাষ্ট্রে বিবাহ ও পরিবার সম্পর্কে যে আইনের নিগড় বর্তমান, সেটা অমঙ্গলকে বাড়ায় আর বিরোধকে তীক্ষ্ণতর করে তোলে। এটাই হলো ‘পবিত্র ব্যক্তিমালিকানার’ নিগড়। ক্রয়বিক্রয় মনোবৃত্তি, নীচতা ও কদর্যতাকে তা পবিত্র বলে উল্লেখ করে। বাকিটুকু সম্পূর্ণ হয় ‘সম্ভ্রান্ত’ বুর্জোয়া সমাজের অন্তর্নিহিত প্রবঞ্চনা দ্বারা। প্রচলিত জঘণ্যতা এবং বিকৃতির বিরুদ্ধে লোকজন বিদ্রোহ করে। আর বর্তমান যুগে যখন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো গুড়িয়ে যাচ্ছে, যখন প্রভুত্বের পুরনো সম্পর্ক ছিড়ে যাচ্ছে, যখন সমগ্র এক সামাজিক জগত লোপ পেতে চলেছে, তখন ব্যক্তি হিসেবে আলাদা আলাদা মানুষের অনুভূতিগুলোরও দ্রুত পরিবর্তন হয়।” (ক্লারা জেটকিন, আমার স্মৃতিতে লেনিন, ১৯৫৫)

তিন.

একটি সামন্তীয় চেতনার আইন বাতিলের বিরোধিতা করার মানে হলোওই পশ্চাদপদ, সামন্তীয় চেতনার পুনর্জাগরণকে স্বীকৃতি দেওয়া। এমন আইন বলবৎ রাখার পক্ষে যারা উল্লম্ফন দেখান, তাদের চেতনায় সামন্ত অবশেষ সুস্পষ্টভাবেই দেখতে পাওয়া যায়। প্রগতিশীলতা, এমনকি বিপ্লবী চেতনার কারও মাঝেও সামন্ত অবশেষের ছোঁয়া থাকতে পারে। সমাজে যখন সামন্ত অবশেষ বিদ্যমান, তখন এ সমাজ থেকে উঠে আসা প্রগতিশীল, বিপ্লবীদের মাঝেও এমন পশ্চাদপদ চেতনা বিদ্যমান থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এসব পশ্চাদপদ চেতনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করাটাও বাঞ্ছণীয়।

বিষয়টা এমনও নয় যে, বিপ্লব হওয়া মাত্রই জাদুবলে সব বদলে যাবে! বরং বিপ্লবপরবর্তী কঠোর সংগ্রামের মধ্য দিয়েই মানবিকতার পথে, নারীমুক্তির পথে এগোতে হয়। লেনিন বলেন, “যেখানে জমিদার, পুঁজিপতি, বণিক বর্তমান, সেখানে এমনকি আইনের ক্ষেত্রেও পুরুষের সঙ্গে নারীর সমতা হতে পারে না। যেখানে জমিদার, পুঁজিপতি, বণিক নেই, যেখানে এসব শোষক ছাড়াই মেহনতি মানুষের ক্ষমতা নতুন জীবন গড়ে তুলছে, সেখানে আইনের ক্ষেত্রে নারীপুরুষের সমতা বর্তমান।

কিন্তু এটা যথেষ্ট নয়। আইনের সমতা মানেই জীবনের ক্ষেত্রেও সমতা নয়। আমরা চাই যেন নারী শ্রমিকেরা শুধু আইনের ক্ষেত্রে নয়, জীবনের ক্ষেত্রেও পুরুষ শ্রমিকের সঙ্গে সমতা অর্জন করে। এজন্য দরকার নারী শ্রমিকরা যেন আরও বেশি বেশি করে রাষ্ট্রীয় পরিচালনায় সামাজিক উদ্যোগে অংশ নেয়।” (নারী শ্রমিকদের নিকট, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯২০)

একই সময়কালে লেনিন বিপ্লবী পার্টির অভ্যন্তরেও কমরেডদের মধ্যে পুরনো সমাজের অবশেষ বয়ে বেড়ানোর সমালোচনা করে বলেন, “এমনকি সর্বহারাদের মধ্যে খুব কম স্বামীই ভাবে যে তারা যদি ওই ‘মেয়েলী কাজে’ সাহায্য করে, তাহলে তাদের স্ত্রীদের কাজ ও বোঝাকে কতো লাঘব করতে পারে, অথবা তাদের সম্পূর্ণভাবে স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু না, সে কথা তারা ভাবে না, কারণ সেটা হলো ‘স্বামীদের অধিকার ও মর্যাদার’ বিরোধী। তারা দাবি করে নিজের বিশ্রাম ও আরাম। নারীদের ঘরোয়া জীবন হলোহাজারো তুচ্ছতার মধ্যে প্রতিদিন নিজেদের বিসর্জন দেওয়া। স্বামীর সাবেকী প্রভুত্বাধিকার গোপনে টিকে থাকছে। তার ক্রীতদাসীও বাস্তব ক্ষেত্রে তার ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে এবং সেটাও গোপনেইনারীদের পশ্চাদপদতায়, তাদের স্বামীদের বৈপ্লবিক আদর্শকে বুঝতে না পারায় লড়াইয়ে স্বামীর উৎসাহ ও সংকল্প দুর্বল হয়ে পড়ে। এগুলো হলো সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কীটের মতো, যারা অদৃশ্যভাবে, ধীরে ধীরে অথচ নিশ্চিতভাবে কুরে কুরে খায়। নারী সমাজের মধ্যে আমাদের কমিউনিস্ট কাজ এবং আমাদের রাজনৈতিক কাজের মধ্যে পড়ে পুরুষদের শিক্ষাদানের একটা প্রভূত কাজ। সেই প্রাচীন ক্রীতদাসপ্রভুর দৃষ্টিভঙ্গীর শেষ শেকড়টি পর্যন্ত আমাদের নির্মূল করতে হবে। পার্টি এবং জনগণউভয়ের ভেতর থেকেই। এটা আমাদের অন্যতম রাজনৈতিক কর্তব্য, ঠিক যেমন মেহনতী নারী সমাজের মধ্যে পার্টির কাজ চালানো এবং এগিয়ে দেওয়ার জন্য জরুরি কর্তব্য হলোতাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষাপ্রাপ্ত নারী ও পুরুষ কমরেডদের নিয়ে একটি স্টাফ গঠন করা।” (ক্লারা জেটকিন, আমার স্মৃতিতে লেনিন, ১৯৫৫)

বিপ্লব পরবর্তী পুনর্গঠনে যে পরিবার এবং প্রেমযৌনতার পুরনো ধারণা ভেঙে পড়তে বাধ্য, এ প্রসঙ্গে ১৯২০ সালে কোলনতাই বলেন, “এ সত্যটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, পুরনো ধরনের পরিবারের দিন শেষ, পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্র কর্তৃক বলপূর্বক ধ্বংস সাধনের কারণে নয়, বরং এইজন্যে যে, পরিবারের প্রয়োজন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের কাছে পরিবারের প্রয়োজনীয়তা নেই, কারণ ঘরোয়া আর্থিক কাঠামো আর সুবিধাজনক নয়পরিবার শ্রমিককে আরো কার্যকরী ও উৎপাদনশীল হওয়া থেকে বিরত করে। পরিবারের সদস্যরা আর পরিবারের কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না, কারণ বাচ্চাকে বড় করার যে দায়িত্ব এতোদিন তাদের উপর ছিল, তা আরো বেশি বেশি করে সমষ্টির হাতে চলে যাচ্ছে। নরনারীর পুরনো সম্পর্কের জায়গায় বিকশিত হচ্ছে নতুন এক সম্পর্কঅনুরাগ ও কমরেডশিপের মিলন, যারা দুজনেই মুক্ত, দুজনেই স্বাধীন, দুজনেই শ্রমিকসাম্যবাদী সমাজের এমন দুই সমকক্ষ সদস্যের মিলন। নারীর আর গার্হস্থ্য বন্ধন নেই, পরিবারের ভেতরে আর বৈষম্য নেই। সাহায্যহীন পরিত্যক্ত অবস্থা এবং সঙ্গে বাচ্চাকে মানুষ করতে হবে, এসবে নারীদের আর ভয় পাবার দরকার নেই। কমিউনিস্ট সমাজে নারীকে আর তার স্বামীর উপর নির্ভর করতে হয় না, বরং নির্ভর করতে হয় নিজের কাজের ওপর। তিনি তার নির্ভরতার জায়গা খুঁজে পাবেন আপন কর্মক্ষমতার মধ্যে, স্বামীর মধ্যে নয়। সন্তানের জন্য তার উদ্বিগ্ন হবার দরকার নেই। তাদের দায়িত্ব নেবে শ্রমিক রাষ্ট্র। বিবাহ, পরিবারিক জীবনকে পঙ্গুকারী যাবতীয় বস্তুগত হিসেবনিকেশের উপাদানসমূহ হারাবে। পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বাস আছে, এমন দুজন মানুষের মিলনই হবে বিবাহ। এই মিলন নিজেদের এবং চারপাশের জগতকে বোঝে এমন শ্রমজীবী নারীপুরুষকে পরিপূর্ণ সুখ এবং সর্বোচ্চ পরিতৃপ্তি দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। অতীতের বৈবাহিক দাসত্বের পরিবর্তে কমিউনিস্ট সমাজ নারী ও পুরুষকে এক মুক্তমিলনের সুযোগ করে দেয়, যা সেই কমরেডশিপে সমৃদ্ধ, যা এই সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছে।

শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্রের প্রয়োজন যেকোনো লিঙ্গের মধ্যে নতুন সম্পর্কের, যেমন নিজের সন্তানের প্রতি মায়ের সংকীর্ণ ও সংরক্ষিত স্নেহকে অবশ্যই ছড়িয়ে দিতে হবে, মহান সর্বহারা পরিবারের সমস্ত সন্তানের প্রতিও, যেমন নারীর দাসত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অবিচ্ছেদ্য বিবাহের জায়গা নেবে শ্রমিক রাষ্ট্রের দুই সমকক্ষ সদস্যের মধ্যেকার এমন এক মুক্তমিলন, যা ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বন্ধনে আবদ্ধ। ব্যক্তিগত ও আত্মবাদী পরিবারের জায়গায় শ্রমিকশ্রেণীর এক বিরাট সর্বজনীন পরিবার বিকশিত হবে, যার অভ্যন্তরে সর্বোপরি সমস্ত শ্রমিক নারীপুরুষ নির্বিশেষে কমরেড বলে বিবেচিত হবেন। এই হলো কমিউনিস্ট সমাজে নারীপুরুষ সম্পর্কের ধরন। এই নতুন ধরনের সম্পর্কগুলো মানবতাকে, যাবতীয় আনন্দসহ এমন এক ভালোবাসাকে সুনিশ্চিত করবে, যে ভালোবাসা বাণিজ্যিক সমাজে ছিল অধরা, যে ভালোবাসা হবে মুক্ত এবং সঙ্গী বা সঙ্গীনীর সত্যিকারের সামাজিক সাম্য নির্ভর।” (কমিউনিজম এবং পরিবার)

চার.

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় সুস্পষ্টভাবে সমাজে বিদ্যমান সামন্তীয় চেতনাকে আঘাত করেছে। কিছুদিন আগে ‘সমকামিতা ফৌজদারি অপরাধ নয়’ উল্লেখ করে যে রায় সুপ্রিম কোর্ট দিয়েছিলেন, সেটিও সমাজে বিদ্যমান সামন্তীয় চেতনাকে আঘাত করেছিল। সর্বোচ্চ আদালতের এসব অবস্থান ইতিবাচক মনে হলেও তা কার্যত ভারতের নয়া-ঔপনিবেশিক, আধা-সামন্তীয় ব্যবস্থা বলবৎ রাখার মধ্য দিয়ে কথিত সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের মুখোশ ধরে রাখারই নামান্তর। কারণ সমাজ ব্যবস্থা থেকে সামন্ততন্ত্র, পুরুষতন্ত্র দূর না করে, আইনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে উঠে না। ভারতে এখনো আফসপা, ইউএপিএ-র মতো চরম গণবিরোধী আইন কার্যকর রয়েছে। এসব প্রশ্নে ভারত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত বা শাসকশ্রেণীর দলগুলোর কোনো মতভিন্নতা নেই। আর এখানেই আদালতের দ্বিচারিতা, কপটতা সুস্পষ্ট। 

ভারতের পার্লামেন্ট নির্বাচন আগামী বছর অনুষ্ঠিত হবে। চারিদিকে হিন্দুত্ববাদের আগ্রাসনও ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে। ভারতে আদালত বা বিচার বিভাগ যেটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে, সেটুকুও আগামীতে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এমন একটা সময়ে আদালত এসব রায়ে আপাত শক্ত অবস্থান প্রকাশ করছেন। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার অপছন্দ সত্ত্বেও রায়গুলো মেনে নিচ্ছে। কারণ বিরোধ করতে গেলে তা ভোটে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।

এ রায়ের মধ্য দিয়ে আদালত যেমন ভারতের কথিত গণতান্ত্রিক চেহারা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন; তেমন এর আর্থসামাজিক ভিত্তিটুকুও বোঝা জরুরি। এমন আইনের ফায়দা পাবেন মূলত শহুরে নারীরা। যে নারীরা শ্রমজীবী, যে নারীরা পণ্যের ভোক্তাও। এ নারীদের সস্তা শ্রমের জোরেই মেগাসিটিগুলো ফুলে ফেঁপে উঠছে।

কিন্তু এর বাইরে রয়েছে এক ভিন্ন ভারত। যেখানে নারীদের ‘যৌনবস্তু’ ও ‘সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র’ বলেই গণ্য করা হয়। ভারতে এমন সমাজও রয়েছে, যেখানে পুরোদমে সামন্তবাদ বিরাজমান। কোনো কোনো জায়গায় ভ্রূণহত্যা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেখানে নারীদের শতকরা হার ২০ শতাংশের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। এসব জায়গায় নারীদের কেনাবেচার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে গেছে! এখানে এমন এক ভারতও রয়েছে যেখানে আদালত তো দূরের কথা, দেশটির প্রধানমন্ত্রীর নামও হয়তো বলতে পারবে না নারীরা।

ওই সামন্তীয় আইন খারিজ হওয়ার মানে এ নয় যে, সেখানে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটে গেলো! বরং এ আইন রহিতকরণের মধ্য দিয়ে সমাজের কলুষিত চেহারাটাই আরও প্রকটভাবে সামনে এসেছে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব না হওয়ায় ভারতে ঔপনিবেশিক চেতনা ব্যাপক আকারে বিরাজমান। উপনিবেশের জায়গায় যখন আসলো নয়াউপনিবেশবাদ, তখন সেটিও সামন্তবাদকে আগলে রেখেছে। ভারতে বিদ্যমান জাতিবর্ণ ব্যবস্থা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তবে বহুজাতিক কর্পোরেশনের বিনিয়োগ নিশ্চিত করতেই ভারত রাষ্ট্রকে এ সামন্ত ব্যবস্থার কিছু ব্যবচ্ছেদ টানতে হয়। এনজিও এবং ক্ষুদ্রঋণ এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। আর নগরায়ন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন প্রচুর সস্তাশ্রম। যা ওই নারীদের কাছ থেকে পাওয়া সম্ভব। এ কারণে নারীবিদ্বেষী আইন বাতিল করাটাও জরুরি হয়ে পড়ে। যদিও আজ পর্যন্ত বহু আইনে নারীবিদ্বেষী চেতনা বিরাজমান।

ভারতে এখনো হাজার হাজার কৃষক ঋণের জালে আটকা পড়ে আত্মহত্যা করে। বিচারের প্রহসনে সাইবাবাদের প্রতিবাদী কণ্ঠ কারাগারে দাবিয়ে রাখা হয়। এখনো আদিবাসীদলিতধর্মীয় সংখ্যালঘুরা প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। বছরের পর বছর বিনা বিচারে কারাগারে বন্দী রাখা হয় সাধারণ মানুষকে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দ্বারা আদিবাসী নারীদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণ যেন এক নিত্যদিনের ঘটনা! সোনি সোরিদের যৌনাঙ্গে পাথর ঢুকিয়ে নির্যাতন চালানো অঙ্কিত গর্গরা পায় রাষ্ট্রপতির সম্মাননা। হিন্দুত্ববাদী চেতনায় গরুর মাংস নিষিদ্ধ করা হয়। দলিত, মুসলিম ও প্রগতিশীলদের সংঘবদ্ধ হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়। জাতিসত্তার মুক্তি আন্দোলন স্তব্ধ করা হয় বন্দুকের জোরে। কাশ্মির দখলে নিযুক্ত পাঁচ লক্ষাধিক ভারতীয় সেনা। মুক্তিকামী বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে নামানো হয় হেলিকপ্টার গানশিপ। মাওবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গঠিত হয় হরেক রঙের সন্ত্রাসী বাহিনী, খরচ করা হয় হাজার কোটি টাকা। অথচ এমন হাজারো অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক, ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আদালত থাকেন নিশ্চুপ! এটাই ‘সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের’ বাস্তবতা!

পাঁচ.

এখন আসছি সম্পর্কে ‘নৈতিকতার’ প্রশ্নে। কেউ যদি এমন কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান, যিনি তার থেকে বয়সে অনেক ছোট বা বড়; অথবা তাদের কোনো একজন বা উভয়েই কোনো একটি সম্পর্কে থাকা অবস্থায় নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট হলেনএটিকে ‘ভুল’, বা ‘দুর্ঘটনাবশত’ বলার মানেই হলো সমাজের কথিত নৈতিকতার নামে মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্নতা; যা সর্বোপরি একটি যান্ত্রিক চিন্তা।

ওই কথিত সামাজিক নৈতিকতা আদতে আমাদের ওপর সম্পর্ক, পরিবার, সামাজিকতা সম্পর্কে এক কথিত নৈতিকতার বোঝা চাপিয়ে দেয়। সম্পর্ক, তা যে কোনো মানুষ বা প্রাণীর সঙ্গেই হোক, যে কোনো পর্যায়ের, তা যখন চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে ভালোবাসাটাই উবে যায়। দুজন মানুষের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন হতেই পারে। তারা বিচ্ছিন্নও হয়ে যেতে পারেন। অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে তাকে বলা হচ্ছে ‘প্রতারণা’, কথিত নৈতিকতার নামে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পর্কে থাকাটাও কী প্রতারণা নয়?

মানুষের চিন্তা কাঠামো সমাজ বিচ্ছিন্ন, পারিপার্শ্বিক বা বাস্তবতা থেকে মুক্ত নয়। আর তাই আমরা দেখতে পাই, সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা কাঠামোও পরিবর্তিত হয়। আবার যারা অগ্রসর চিন্তা ধারণ করেন, তারাই সমাজ পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাই সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করা মানুষদের সমাজের এই কথিত নৈতিকতা সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা রচনা করাটা জরুরি বলে মনে করি।

১৯২১ সালে লেখা এক নিবন্ধে কমরেড আলেকজান্দ্রা কোলনতাই বলেন, “সামন্ততান্ত্রিক সমাজে যৌনতার নৈতিকতা গোত্রগত জীবনধারা থেকে বিকশিত হয়েছে, যেখানে যৌথ অর্থনীতি ও গোত্রগত কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্ব, যা ব্যক্তি সদস্যদের ব্যক্তিক ইচ্ছাকে শ্বাসরোধ করতো। এটাই উঠতি বুর্জোয়াদের নতুন এবং বিস্ময়কর নৈতিক আচরণবিধির সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করেছিল। বুর্জোয়াদের যৌনতার নৈতিকতা সেসব নীতির ওপর স্থাপিত হয়েছিল, যেগুলো সামন্ততান্ত্রিকতার মৌলিক নৈতিকতার তীব্র বিরোধী। পুরুষতান্ত্রিক জীবনের স্থানিক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বৈশিষ্ট্য যৌথ কাজকে প্রতিস্থাপন করলো কঠোর ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, স্বাতন্ত্র্যতা, ‘একক পরিবার’এর বিচ্ছিন্নতা। পুঁজিবাদের অধীনে একান্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের আধিপত্যবাদী নীতিগুলো বিকশিত হলো এবং গোত্রগত সমাজেই যে গোষ্ঠীর ধারাণা তখনো অবশিষ্ট ছিল, তার সবই ধ্বংস হলো।

“‘সর্বহারা নৈতিকতা’ বা ‘সর্বহারাশ্রেণীর যৌনতা সম্পর্কিত নৈতিকতা’ সম্বন্ধে মূল্যবান কিছু বলতে চাওয়া হলোসেই বস্তাপচা ধারণার সমালোচনা করা যে, সর্বহারা যৌনতার নৈতিকতা ‘উপরিকাঠামো’ ছাড়া কিছু নয় এবং যতক্ষণ না সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি পরিবর্তিত হচ্ছে ততক্ষণ এক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তনের স্থান নেই। যেন যখন সামাজিকঅর্থনৈতিক সম্পর্কগুলো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, কোনো একটি শ্রেণীর আধিপত্যের গ্যারান্টি পরিপূর্ণ হয় কেবলমাত্র তখনই সেই শ্রেণীটির মতাদর্শ গঠিত হয়। ইতিহাসের সমস্ত অভিজ্ঞতা আমাদের এ শিক্ষা দেয় যে, একটি সামাজিক গোষ্ঠী বিপরীত সামাজিক শক্তিগুলোর সঙ্গে তার সংগ্রামের প্রক্রিয়ার মতাদর্শ নিয়ে লড়াই করে এবং কাজের মধ্য দিয়েই তার যৌনতার নৈতিকতারও রূপদান করে।

আমাদের অবশ্যই মনে রাখা উচিত যে, কেবল শ্রমিকশ্রেণীর সমস্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যৌন নৈতিকতার রীতিনীতিই শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামী অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা আমাদের এই শিক্ষা যথেষ্ট দিয়েছে। আমরা, যারা কমিউনিস্ট নিয়ম এবং লিঙ্গগুলোর মধ্যেকার গভীরতর এবং আরও আনন্দদায়ক নতুন সম্পর্কগুলোর জন্য লড়াই করছি, শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থে এই অস্ত্রকে ব্যবহার করতে কি কেউ আমাদের বাধা দিতে পারে?” (যৌন সম্পর্ক এবং শ্রেণীসংগ্রাম)

কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’তে কমরেড কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেদরিখ এঙ্গেলস বলেন, “সর্বহারাদের জীবনে পূর্বেকার সামাজিক পরিবেশ ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলা চলে। সর্বহারাদের কোনো সম্পত্তি নেই। তাদের স্বামীস্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যেকার সম্পর্ক যেমন, তার সঙ্গে বুর্জোয়া পারিবারিক সম্পর্কের কোনো মিল নেই। আধুনিক শিল্পশ্রম, আধুনিক ধরনের পুঁজির বশ্যতার চরিত্র ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, আমেরিকা বা জার্মানিতে একই প্রকার। তার কাছে আইনকানুন, নৈতিকতা, ধর্ম এসবই বুর্জোয়া সংস্কার বিশেষযার পেছনে লুকিয়ে আছে বিভিন্ন বুর্জোয়া স্বার্থ।

পরিবার প্রথার বিলোপ! এমনকি চরম গণতন্ত্রীরাও কমিউনিস্টদের এ ‘কুখ্যাত’ প্রস্তাবে ক্ষেপে ওঠে। বর্তমান পরিবার, বুর্জোয়া পরিবার কিসের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে? পুঁজির ভিত্তির উপর। আর সে পরিবারগুলো, সবদিক থেকে সম্পূর্ণভাবে শুধু বুর্জোয়াদের মধ্যেই রয়েছে। অপরদিকে দেখা যাবে সর্বহারাদের মধ্যে কার্যত পরিবার প্রথার বিলোপ হয়ে গেছে, আর বাজারে দেহব্যবসা চলছে।

সময়ের গতিতে এ পরিস্থিতির বিলোপের সঙ্গে সঙ্গে বুর্জোয়া পরিবারেরও বিলোপ হয়ে যাবে, আর পুঁজির বিলোপের সঙ্গে সঙ্গে উভয়েরই বিলোপ হয়ে যাবে।”

ছয়.

প্রেমযৌনতার ক্ষেত্রে অপরপক্ষকে যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে মনে করা হয়, এর পেছনে আছে বস্তুগত ভিত্তি। দাস যুগেও নারী ও অপরাপর সত্তাকে সম্পত্তি বলে গণ্য হতো, যার পূর্ণ মালিকানা ছিলো দাস মালিকের হাতে। আবার সামন্ততন্ত্রেও এ প্রেমযৌনতার ধারণায় পুরুষই একমাত্র ক্রিয়াশীল সত্তা। সমাজে বিরাজমান, নারী বা অপরাপর সত্তার যৌনাকাঙ্ক্ষা সেখানে ‘অগুরুত্বপূর্ণ’। আবার পুঁজিবাদী সমাজে নারী যৌনতা উপভোগের আংশিক অধিকার পেলেও সে যৌনতাকেও এসময়ের কর্পোরেট পুঁজিবাদ পণ্যে পরিণত করেছে।

বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে, তা হলোশ্রমের মজুরি, নারীর ব্যক্তিগত পরিচয়, তার সঙ্গী নির্বাচনের স্বাধীনতা, ব্যক্তির যৌন স্বাধীনতা ইত্যাদি। এর সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে পরিবারের ধারণা, পাল্টেছে আর্থসামাজিক ভিত্তি। আরও পাল্টেছে নৈতিকতার ধারণা।

যৌনানুভূতি আছে বলেই কেউ অপরের সান্নিধ্য বা তাকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বোধ করেন। এটা এমন নয় যে, অপরদিক থেকে একই অনুভূতি হতে হবে। অপরদিক থেকে একই অনুভূতি পেলে সেই প্রেমযৌনতার সম্পর্ক আরো খানিকটা এগিয়ে যেতে পারে। তবে এ আকাঙ্ক্ষাও কিন্তু চিরস্থায়ী নয়। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের নিয়মে আমরা জানি, বস্তু পরিবর্তনশীল। ভালোবাসাও রূপ বদলায়। তা একই অবস্থায় থাকে না।

এখন কথা হলো, কোনো নারী বা পুরুষের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করাটা কী অস্বাভাবিক? তা কখনোই নয়। তবে হ্যাঁ, অপরপক্ষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পর্কে অগ্রসর হওয়াটা আধিপত্যবাদী চিন্তাকেই নির্দেশ করে।

প্রেমযৌনতার সম্পর্কে স্থায়িত্ব নির্ভর করছে মূলত পারস্পরিক বোঝাপড়া, সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থান এবং যৌনাকাঙ্ক্ষার ওপর। শ্রেণীগত অবস্থান ভিন্ন হলে সম্পর্কের স্থায়িত্ব বহুলাংশে কমে আসে। এখানে শুধু একটি বা একাধিক উপাদানের কারণে সম্পর্কে বিচ্ছেদ আসতে পারে।

প্রেমযৌনতার বিষয়টাআমাদের মতো সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদপীড়িত, নয়াঔপনিবেশিক কাঠামো, যেখানে সামন্ত অবশেষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ তীব্রভাবে কার্যকরসেখানে খুবই জটিল অবস্থায় থাকে, আর তা সঠিকভাবে না বুঝে উঠতে পারলে ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, সামাজিক বহুবিধ সমস্যা সামনে আসবে নিশ্চিতভাবেই। আর এজন্য শ্রেণী রাজনীতির অবস্থান থেকেই আমাদের এ বিষয়টা বোঝা জরুরি।

আমাদের মতো নয়াঔপনিবেশিক দেশের ক্ষেত্রে বিষয়টা কেমন হবে?

সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে নয়াউপনিবেশবাদের রয়েছে দ্বৈতনীতি। একদিকে, নয়াউপনিবেশবাদ সামন্তব্যবস্থাকে নিজের স্বার্থ অনুযায়ী উচ্ছেদ করে। আবার তা ততোটুকুই, যতোটুকু সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী নয়াউপনিবেশবাদ সামন্তব্যবস্থাকে আংশিক সংরক্ষণও করে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটিই চলে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থানুযায়ী। অর্থাৎ, নয়াঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় পূর্ণমাত্রায় সামন্তবাদ উপস্থিত না থাকলেও সামন্তঅবশেষ বিদ্যমান থাকে। আর তা খুব স্বাভাবিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদের পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে।

এখানে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ একদিকে সামন্তবাদ উচ্ছেদ করেছে, আবার তা রক্ষাও করেছে নিজস্বার্থে। আর তাই অর্থনৈতিক ভিত্তিতে সামন্ততন্ত্র অনেকাংশেই কার্যকর না থাকলেও উপরিকাঠামোয় সামন্তীয় চেতনা বেশ ভালোমতোই বিরাজমান। বাংলাদেশ, ভারতের মতো সব নয়াঔপনিবেশিক দেশের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। আর এর ফলে এখানকার প্রেমযৌনতার চিন্তায় যেমন সামন্তীয় রক্ষণশীল মানসিকতা বিরাজমান, তেমনি পুঁজিবাদ প্রদর্শিত যৌনতার পণ্যায়নও বিদ্যমান।

বুর্জোয়াশ্রেণীর প্রেমযৌনতার সম্পর্ক নিয়ে বলতে গেলে আমাদের পুঁজিবাদী দেশগুলোর দিকেই তাকাতে হবে। আমাদের সমাজের দিকে তাকিয়ে বুর্জোয়া কাঠামোকে ব্যাখ্যা করা যায় না। এখানে সেই অর্থে বুর্জোয়া নেই, আছে কমপ্র্যাডর বা দালাল বুর্জোয়া। এ দুটো মৌলিকভাবে ভিন্ন। দালাল বুর্জোয়ারা বহুজাতিক বা অধিজাতিক কর্পোরেট পুঁজিরই এ দেশীয় এজেন্ট। আর এ উপমহাদেশে জাতীয় বুর্জোয়া বিকশিত না হওয়ায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবও অসম্পূর্ণ। যা সম্পন্ন করার দায়িত্বও আছে বিপ্লবী কমিউনিস্টদেরই কাঁধে। আর এই আর্থসামাজিক কাঠামোর কারণেই এখানকার দালাল বুর্জোয়া চেতনায় সামন্তীয় মানসিকতা তীব্রভাবে বিরাজমান।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশ বা ভারতে অনেক ক্ষেত্রেই ঘোষণা দিয়ে ‘লিভ ইন রিলেশন’ চিন্তাও করা যায় না। এমনকি কোনো নারী একা বাসা ভাড়া নিতেও বেশ বেগ পেতে হয়। বাসায় পুরুষ বন্ধু আসার ক্ষেত্রেও শত প্রশ্ন। নারী সম্পর্কে বিচ্ছেদ টানবে, সেটা এই সমাজ মেনে নিতে রাজি নয়। আর এসবই ওই সামন্তীয় মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। যা বুর্জোয়া সমাজে অবর্তমান। আবার বুর্জোয়া সমাজে নারীকে পণ্যায়িত করা হয়। মানুষের যৌনতাকে পণ্যায়িত করা হয়। সবকিছুই বুর্জোয়া ব্যবস্থায় পণ্যায়িত, এমনকি ‘ভালোবাসাটুকুও’। আমাদের সমাজে সামন্তীয় মানসিকতা এবং নারী সত্তার পণ্যায়নদুটোই একসঙ্গে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়।

বুর্জোয়া ব্যবস্থায় যৌনতা নিয়ে রাখঢাক থাকে না। আবার বুর্জোয়া সমাজে বিয়ে বা প্রেমযৌনতার সম্পর্ক ভাঙতে কোনো বাধা থাকে না। সমঝোতার মধ্য দিয়ে যে সম্পর্ক গড়ে বা ভাঙে, সেখানে প্রধান মানদণ্ড থাকে বৈষয়িক বিষয়াদি। এমনকি বুর্জোয়া চেতনা মানুষের সংগ্রামী অর্জনগুলোকেও অস্বীকার করে সবকিছুকে পরিবর্তন করে তার ছাঁচে ঢেলে সাজাতে চায়। সবকিছুকে পণ্যায়ন বা কমোডিটাইজ করাটাই এখানে মুখ্য।

অপরদিকে, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের আলোকে বিপ্লবী চিন্তায় ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে যে সম্পর্ক গড়ে উঠে, তার মৌলিক পার্থক্যের জায়গাটা হলো কমরেডশিপ। যেখানে পরস্পর জীবন সংগ্রামের সাথী। পারস্পরিক সমঝোতা বুর্জোয়াশ্রেণীর প্রেমযৌনতার মাঝেও উপস্থিত থাকতে পারে। কিন্তু সেখানে আর্থিক বিষয়টি মুখ্য, কিন্তু বিপ্লবী চিন্তার ভালোবাসায় পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং শ্রদ্ধাবোধটাই থাকে মুখ্য। আর এ বোঝাপড়াটাও অদ্বান্দ্বিক নয়। বরং ঐক্যসংগ্রামবৃহত্তর ঐক্যের শিক্ষায় ঋদ্ধ। শ্রেণীসংগ্রামের চেতনাই যার মূল চালিকাশক্তি।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.