আত্মত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ‘বিপ্লবী তানিয়া’

Posted: সেপ্টেম্বর 8, 2018 in মতাদর্শ, সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , ,

লিখেছেন: লাবণী মণ্ডল

তানিয়া। একটি নাম। এক তেজোদীপ্ত তরুণী। যে নামের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আত্মত্যাগ আর বিপ্লবী চেতনা যে নামের অন্তর্নিহিত শক্তিতে চেতনার জগতে প্রবেশ করে বিপ্লবী তেজ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তীব্র মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসন সত্ত্বেও আমরা স্বপ্ন দেখতে চাই, দেখাতে চাই। এজন্য বিপ্লবী তানিয়াদের জীবনচরিত পাঠ করা খুব জরুরি। তানিয়াদের বিপ্লবী তেজ তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা জরুরি। তানিয়াকে জানাবোঝার জন্য, পাঠ করার জন্য খুব বেশি তথ্যউপাত্ত ইতিহাসে নেই বললেই চলে। বেশিভাগ সময় এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাঁকে চে গুয়েভারার একজন সহযোগী হিসেবেই উপস্থাপন করেছে। এর বাইরেও যে মানুষটির অবদান নিজস্ব সত্তায় যে মানুষটি বিপ্লবের জন্য জীবন দিয়েছিলেন সে অবদান কালের বির্বতনে হারিয়ে যাওয়ার পথে।

তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা আর পি লিডভের তানিয়াবই দুটি হাতে পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। যা আমায় বিপ্লবী আন্দোলনে আগ্রহী করেছিল। তানিয়া আমার মাঝে নতুন চিন্তার জন্ম দিয়েছিল কিছুটা হলেও! নির্মম নির্যাতনের চিত্র আমার চিন্তায় আঘাত করেছিল, অগ্নিদীপ্ত করেছিল। যা আজ পরিষ্কারভাবেই উপলব্ধি করতে পারছি।

তানিয়া ১৯৩৮ সালে জন্মেছিলেন বিপ্লবী চে গুয়েভারার দেশ আর্জেন্টিনায়। তানিয়া নামে পরিচিত হলেও তাঁর জন্মগত নাম ছিল হাইদি তামারা বুনকে বিদার। তাঁর পরিবারের বাসস্থান ছিল জার্মানিতে। নাৎসিদের পৈশাচিক অত্যাচারনিপীড়ন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বাধ্য হয়েই তানিয়ার পরিবার আর্জেন্টিনায় চলে আসে এবং সেখানেই জন্মগ্রহণ করেন বিপ্লবী তানিয়া।

প্রগতিশীল পরিবারেই বেড়ে ওঠা তানিয়ার। তাঁর বাবা এরিখ ছিলেন একজন অধ্যাপক, তিনি ১৯২৮ সালে জার্মান কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। মা নাদিয়া ছিলেন পোলিশ। জার্মানি দুভাগ হওয়ার পর তাঁর পুরো পরিবার জার্মানিতে ফিরে আসে। সময়টা ছিল ১৯৫৮ সাল। পূর্ব জার্মানিতে কায়েম হয় কমিউনিস্ট শাসনসেখানে তাঁর পরিবার বসবাস শুরু করে। তানিয়ার বয়স তখন ২০ বছর। আর পাঁচ বছর আগে, মাত্র পনের বছর বয়সেই তানিয়া মার্ক্সবাদে দীক্ষা নেন। এক্ষেত্রে সুকান্ত ভট্টাচার্যের আঠারো বছর কবিতাটি খুব প্রাসঙ্গিক

“…আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ,

স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,

আঠারো বছর বয়সেই অহরহ

বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি

যতদিন মানবসভ্যতা টিকে থাকবে ততদিন এ কথাগুলোও টিকে থাকবে। পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। আমরা দেখতে পেয়েছি, সাম্প্রতিককালে কিশোরকিশোরীদের আন্দোলনে এই কবিতাটির গুরুত্ব।

জার্মানিতে ফিরে যাওয়ার পর তানিয়া কমিউনিজমের উপর পড়াশোনার ইচ্ছে ব্যক্ত করেন। ওই ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে তাঁর বাবা বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। সেখান থেকে তিনি কমিউনিজমের উপর উচ্চতর ডিগ্রি নেন। লাতিন আমেরিকার যে নেত্রীবৃন্দ তখন পূর্ব জার্মানিতে যেতেন, তাঁদের দোভাষী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তানিয়া। যে দায়িত্বটিকে তিনি বিপ্লবী কর্তব্য হিসেবেই মেনে নিয়েছিলেন।

তানিয়ার তখন ২১ বছর বয়স, তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ঘটে বিপ্লবী চে গুয়েভারার। সেসময় থেকেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরতে থাকে। চে গুয়েভারার অনেক গুণই তানিয়াকে আকৃষ্ট করে তোলে, আরো বেশি দৃঢ় করে তোলে, বিপ্লবী তেজকে অগ্নিদীপ্ত করে তোলে

১৯৫৯ সালে কিউবার ফেডারেল ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে পূর্ব জার্মানিতে চলে আসেন চে গুয়েভারা উদ্দেশ্য ছিল কিউবার বিপ্লবী সরকারের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা। এসময় চে গুয়েভারার দোভাষী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তানিয়া। তাঁর ভেতরে বিপ্লবী স্পৃহা, জানাবোঝার আগ্রহ চে গুয়েভারাকে ব্যাপকভাবেই নাড়া দেয়।

কিউবার সফ বিপ্লবের নায়ক চে গুয়েভারার আদর্শের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৬১ সালে সকিছু ছেড়ে কিউবায় চলে আসেন তানিয়া। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর গেরিলা জীবন। যে জীবনেই মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছিলেন অবিচল। এখানে নিকোলাই অস্ত্রোভস্কির কবিতাটি প্রাসঙ্গিক

আমার সমস্ত শক্তি আমি উৎসর্গ করেছি

জগতের মহত্তম লক্ষ্যে

মানবজাতির মুক্তির জন্য

সংগ্রামের লক্ষ্যে

কবিতার পঙতিগুলো এরকম মহান মানুষের সাথেই যায়। যুগ যুগ ধরে যেজন্য এ কবিতাগুলো বেঁচে আছে

১৯৬১ সাল। তানিয়া তখন তেইশ বছর বয়সের তরুণী। ওই বছরই লাতিন আমেরিকাতে বিপ্লব পরিচালনার জন্য গেরিলা দল প্রস্তুত করতে থাকেন চে গুয়েভারা। বলিভিয়াতে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয় তানিয়াকে। চে গুয়েভারার শেষ দিনগুলি ও বলিভিয়ার ডায়েরি দ্রষ্টব্য। ১৯৬৬ সালের ৭ নভেম্বর থেকে শুরু করে ১৯৬৭ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত লেখা ডায়েরিতে তানিয়ার কথা অসংখ্যবার এসেছে। যা থেকে তানিয়ার বিপ্লবী দায়িত্ব সম্পর্কে আরো পরিষ্কার হওয়া যায়। তানিয়া তখন বলিভিয়ার বনেজঙ্গলে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে ঘুরে বেড়াচ্ছে

তানিয়ার প্রথম মিশন ছিলো ১৯৬৪ সালে। তাঁ কাজ ছিল বলিভিয়ার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বলিভিয়ার আর্মির ক্ষমতা সম্পর্কে সংবাদ যোগাড় করা। তিনি তাঁর এপার্টমেন্টের দেয়ালে একটি রেডিও লুকিয়ে রেখে তা দিয়ে হাভানায় ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার গেরিলা বাহিনীকে কোডেড মেসেজ পাঠাতেন। তিনি সেখানকার রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং সেনাবাহিনীর ক্ষমতা সম্পর্কে সকল তথ্য সংগ্রহ করে ফেলেন অল্প কিছুদিনের মধ্যেই।

১৯৬৭ সালের ৩ নভেম্বরে চে মস্কো, প্রাগ, প্যারিস, মাদ্রিদ, সাও পাওলো ঘুরে সিআইর চোখ ফাঁকি দিয়ে এসে পৌঁছান বলিভিয়াতে। চের অনুপস্থিতিতে বলিভিয়ার পুরো দায়িত্ব পালন করেন তানিয়া। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের মদদপুষ্টদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের দিনগুলোতে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা চের গণবাহিনীর বর্হিবিশ্বের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম ছিলেন তানিয়া। ফিদেল কাস্ত্রোসহ সবার সঙ্গে সংযোগ করেন বিপ্লবী তানিয়া। কিন্তু তাঁর অবস্থানের কথা শত্রুপক্ষের কাছে ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর তানিয়া চের বিপ্লবী বাহিনীতে যোগ দেন। তখন তানিয়ার দায়িত্ব ছিল রেডিও কমিউনিকেশন এবং সৈন্যদের জন্য খাবার সংগ্রহের।

বলিভিয়ার ডায়েরিতে তানিয়ার কর্মজীবনের অনেকটাই তুলে এনেছিলেন চে গুয়েভারা। ১১ মাসের এই ডায়েরিটিতে প্রায় প্রত্যেকদিনের লেখাতে তানিয়ার কথা উঠে এসেছে। ১৯৬৭ সালের ৩১ আগষ্ট তানিয়া আর ১৫ জন সহযোদ্ধা নিয়ে রিও গ্রাঁদে নদী পার হচ্ছিলেন। তাদের মাথায় ছিল গেরিলাদের জন্য বিস্কুট আর পিঠে ছিল অস্ত্র। এমন অবস্থায় তাঁরা শত্রুপক্ষের অ্যাম্বুশের মুখে পড়েন। প্রথম গুলিতে তাঁর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, দ্বিতীয় গুলিতে বিদীর্ণ হয় তাঁর ফুসফুস। নদীর জলে ভেসে যায় তানিয়াসহ আট জন বিপ্লবীর লাশ।

মাত্র ২৯ বছর বয়সে বিপ্লবী তানিয়া ঘাতকদের হাতে মৃত্যুবরণ করেন। চে গুয়েভারা তানিয়ার মৃত্যুর খবরটি পান ৭ সেপ্টেম্বর। রেডিও জানায়, রিও গ্রাঁদে নদীর তীরে যে গেরিলা যোদ্ধার মরদেহটি পাওয়া গেছে, সেটি তানিয়ার। তখনও চে গুয়েভারার কাছে বিষয়টি অবিশ্বাস্য ছিল। খবরটির সত্যতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেন চে গুয়েভারা। তখন চে গুয়েভারা একটি জঙ্গল পার হচ্ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করার জন্য এটি বলিভিয়ান সরকারের আরেকটি প্রোপাগান্ডা। তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে ফিদেল কাস্ত্রো তানিয়াকে কিউবা বিপ্লবের নায়ক হিসেবে ঘোষণা করেন। বিপ্লবী তানিয়া আমাদের বিপ্লবী কাজে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।

জয়তু বিপ্লবী তানিয়া!

লাল সালাম!

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.