রাষ্ট্র-কর্পোরেটের পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে জনবিক্ষোভ বাড়ছে ভারতে

Posted: জুলাই 30, 2018 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: অজয় রায়

বায়ুর গুণগতমান উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অক্ষমতার জন্য গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট পারফরমেন্স ইন্ডেক্স ২০১৮এর সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান (১৭৭) তলানিতে এসে ঠেকেছে।[] গত জুনে সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টএর সহায়তায় ডাউন টু আর্থ ম্যাগাজিন কর্তৃক প্রকাশিত পরিসংখ্যানে ভারতের পরিবেশের অবস্থা (এসওই) ২০১৮ শীর্ষক বার্ষিক সারসংক্ষেপে তেমনটাই দেখা গেছে। এদিকে, দেশের কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৭ সালে গড়ে প্রতিদিন বনাঞ্চলে প্রায় ৬টি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ছাড়পত্র দিয়েছে। আর গত এক বছরে বনসংক্রান্ত না এমন ক্রিয়াকলাপের জন্য অরণ্যভূমির চরিত্র পরিবর্তনের ক্ষেত্র বৃদ্ধি ঘটেছে ১৪৬ শতাংশ।[]

স্পষ্টতই, সাম্রাজ্যবাদ নির্দেশিত নয়াউদারবাদী উন্নয়নের যে মডেল চলছে তাতে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। আর জনসাধারণের দুর্দশা বাড়ছে। তারা জীবনজীবিকা হারাচ্ছেন। উচ্ছেদ হচ্ছেন। ফলে বাড়ছে জনবিক্ষোভ। যা নির্মমভাবে দমন করতে তৎপর রাষ্ট্রকর্পোরেট যৌথশক্তি।

সম্প্রতি যেমনটা দেখা গেছে তামিলনাড়ুর তুতিকোরিনে। বেদান্ত গ্রুপের ইউনিট স্টারলাইটএর তামা কারখানা থেকে যে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বহুদিন ধরেই গড়ে উঠে আন্দোলন। গত ২২ মে বিক্ষোভকারীদের উপর পুলি গুলি চালায় তে নিহত হন ১৩ জন। আহত শতাধিক।[] স্নাইপার দিয়ে গুলি চালাতেও দেখা যায় বিশেষ কমান্ডো বাহিনীকে। যা রাষ্ট্রকর্পোরেটের যৌথ সন্ত্রাসকেই নির্দেশ করে।

উল্লেখ্য, স্টারলাইট কারখানা সমস্ত পরিবেশ আইন ভঙ্গ করেই গড়ে উঠেছে। এ অঞ্চলের মাটি, বাতাস ও ভূগর্ভের জল বিষিয়ে দিয়েছে। যার থেকে বিভিন্ন ধরনের রোগ ছড়াচ্ছে। এর বিরুদ্ধে অবশ্য গত দুই দশক ধরেই লাগাতার গণতান্ত্রিক আন্দোলন চলছে। কিছুদিন আগে কারখানাটি সম্প্রসারণের যে আর্জি জানানো হয়েছিল, তাও পরে স্থগিত করে দিয়েছে আদালত। তবে আন্দোলনকারীদের উপর নির্যাতননিপীড়ন চলছে।

এদিকে, গত এপ্রিলে মহারাষ্ট্রের গচিরোলিতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে ৪০ জন নিহত হয়েছেন।[] সংবাদমাধ্যমের একাংশ ও কিছু মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করেছে যে, এটা একটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। যাতে শুধু মাওবাদী বিদ্রোহীরাই নন, সাধারণ নাগরিকরাও প্রাণ হারিয়েছেন। এর বিপরীতে পুলিশের দাবি, মাওবাদীদের সঙ্গে ংঘর্ষ হয়েছে। তবে যেটা লক্ষণীয়, কোনো পুলিশ কর্মী আহত হননি। []

উল্লেখ্য, ওই অঞ্চলের সুরজাগড়ে আকরিক লোহার খনি চালু করেছে লয়েডস মেটালস অ্যান্ড এনার্জি। আরও বিভিন্ন সংস্থাকে খননের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে আদিবাসীদের জীবনজীবিকা ও বাসস্থান বিপন্ন হচ্ছে। প্রতিবাদে পথে নামছেন তারা। আন্দোলনকারীদের উপর ব্যাপক দমনপীড়ন চলছেমাওবাদীরাও গণবিরোধী খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে। আর তাই রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে কর্পোরেট স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে।

স্পষ্টতই, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে তাঁবেদার শাসকশ্রেণী জনবিরোধী, গণতন্ত্রবিরোধী ও পরিবেশবিরোধী পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে। আর এর প্রতিবাদকারীদের উপর বর্বর আক্রমণ নামিয়ে আনছে। খুন, সন্ত্রাস, বিনা বিচারে আটক ও যৌন হয়রানি চলছে আবাধে। প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ এবং দুর্নীতির দ্বারা পরিবেশগত ও মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত তথ্য নথিভুক্তকারী অলাভজনক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল উইটনেসএর ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুসারে, পরিবেশ ও ভূমি রক্ষা আন্দোলনের কর্মীদের জন্য চতুর্থ প্রাণঘাতী দেশ হচ্ছে ভারত।[] আরও যেটা লক্ষণীয়, দেশের কেন্দ্রীয় সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে কর্পোরেট অর্থ নিতে সক্ষম করে তুলতে আইন সংশোধন করেছে। পরিবেশ সংক্রান্ত বিধিনিষেধও লঘু করছে। সেই সঙ্গে চলছে ব্যাপক দুর্নীতি।

যখন তখন যত্রতত্র খনি খননের ও বাঁধ নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। আর এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের উপরে নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। যেমন দেখা গেছে তেহরি বাঁধ থেকে শুরু করে নর্মদা বাঁধ ও সর্দার সরোবরের মতো প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে। পুথুভাইপ গ্যাস টার্মিনালবিরোধী লড়াইকেও দমন করা হচ্ছে। আর উড়িশ্যার নিয়মগিরি পাহাড়ে বেদান্তর খনি খনন পরিকল্পনা প্রতিরোধ করতে ডোঙ্গরিয়া কোন্ড আদিবাসীদের যে আন্দোলন চলছে, তার উপর আক্রমণ করা হচ্ছে।

কেন্দ্রের সঙ্গে মিলে তামিলনাড়ু সরকার কুদানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা আন্দোলনকে দমন করেছে এবং সেখানে কাজ শুরু করেছে। তবে মহারাষ্ট্রের জাইতাপুরে স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও নিরাপত্তার প্রস্তাবিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছেন স্থানীয় মানুষজন

বর্তমানে স্পষ্টতই আর্থসামাজিক ও পরিবেশগত সংকট ক্রমে বাড়ছে। এই সংকট পুঁজিবাদের ব্যবস্থাগত সংকট। এ অবস্থা মোকাবিলার জন্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিপরীতে একমাত্র বিকল্প সমাজতন্ত্র। তার জন্য রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটানো জরুরি যা সমতাভিত্তিক ও টেকসই মানব উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করতে পারে। আর এরই দিকনির্দেশনা প্রদর্শন করছে মার্ক্সবাদ।

এই সময়কালে বিশ্বব্যাপী কার্ল মার্ক্সের দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। স্মরণে রাখা প্রয়োজন, মার্ক্স মেটাবলিক রিফ্ট, অর্থাৎ জৈবভূরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ভাঙনের ধারণা দেন।[] যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নির্দেশ করে। চলতি ব্যবস্থার লক্ষ্য পুঁজির কেন্দ্রীভবনের উদ্দেশ্যে এই গ্রহের সীমিত পরিসরের মধ্যে সীমাহীন ক্ষতিকারক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উৎসাহ দিয়ে চলা। এদিকে, বহুজাতিক লগ্নিপুঁজির দুনিয়াজোড়া তৎপরতায় দেশে দেশে পরিবেশগত সর্বহারা বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যাচ্ছেযখন বহুমাত্রিক প্রতিরোধসংগ্রামের প্রেক্ষিতে পরিবেশ রক্ষার ফ্রন্ট লাইনেও মার্ক্সবাদের প্রাসঙ্গিকতা আরও বাড়ছে।।

২৭/০৭/২০১৮

———————————

তথ্যসূত্র

[] Ajanta Chakraborty, “India at bottom of 2018 global environment performance index”, Jun 11, 2018, The Times of India

[] Ibid

[] Sterlite protest: 13 dead, over 100 hurt; Harsh Vardhan to look into matter”, May 25, 2018, Business Standard

[] Gadchiroli collector orders probe into killing of 40 Naxals”, May 02, 2018, The New Indian Express

[] Ibid

[] India focus: Worst year ever for environmental and land rights activists: at least 200 killed in 2016 as crisis spreads across globe”, July 13, 2017, Global Witness

[] John Bellamy Foster, “Marx’s Theory of Metabolic Rift: Classical Foundations for Environmental Sociology”, American Journal of Sociology, vol. 105, no. 2 (September 1999), pp. 366-405

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.