লিখেছেন: অভয়ারণ্য কবীর

প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর দীর্ঘদিন ধরেই নকশালবাড়ি আন্দোলন ও কমরেড চারু মজুমদারের উপর বিভিন্নভাবে আক্রমণ চালিয়ে আসছেনতিনি ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে বরাবরই শুধুমাত্র ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করেছেন, রাজনৈতিক লাইনের নিরিখে মূল্যায়ন করেননিযদিও বদরুদ্দীন উমর লেনিনস্তালিনের নাম ব্যবহার করে শোধনবাদী রাজনীতির চর্চা করেন; তথাপি তিনি ও তাঁর সংগঠন (মুক্তি কাউন্সিল) বাংলাদেশের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে লেখায় বদরুদ্দীন উমরের ব্যক্তিগত সমালোচনা নয়, বরং তাঁর রাজনৈতিক লাইন ও দৃষ্টিভঙ্গীতে ভ্রান্তি নিয়ে আলাপ করা হবেকেননা এই ভ্রান্ত দৃষ্টি দিয়েই তাঁর সম্পাদিত ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকার জুন ২০১৮ সংখ্যায় তিনি নকশালবাড়ি আন্দোলনের নেতা ভাস্কর নন্দীর (যিনি পরবর্তীতে নকশালবাড়ির বিপ্লবী পথ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন) স্মরণে লেখা একটি প্রবন্ধে কমরেড চারু মজুমদারকে (সিএম) যাচ্ছেতাইভাবে আক্রমণ করেছেন নকশালবাড়ি আন্দোলনের বিপ্লবী ঐতিহ্যকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে, কথিত নির্ভুল বিপ্লবের তত্ত্বের সাগরে গা ভাসিয়ে . সিএমকে মূল্যায়ন করেছেন নিছক বিলোপবাদী দৃষ্টিতে

.

বদরুদ্দীন উমর তাঁর লেখা কয়েক জায়গায় ভাস্কর নন্দীকে উদ্ধৃত করেছেনপ্রথমেই ভাস্কর নন্দীকে উদ্ধৃত করে তিনি এক মিথ্যাচার করলেন, “এ সময় ১৯৬৯ এর মার্চ মাসে চারু মজুমদার ভাস্করকে ডেকে পাঠিয়ে বলেন, তিনি যা করছেন সেটা অর্থনৈতিক সংস্কারবাদ, রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য কিছুই করছেন না। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য কি করতে হবে একথা জিজ্ঞেস করায় চারু মজুমদার বললেন মানুষ হত্যা (খতম) করতে হবে। ভাস্কর নন্দী পরে এক জায়গায় বলেছেন, ‘এখন এটা বলতে কোন ক্ষতি নেই যে, যত আমি খতমের রাজনীতি করতে থাকলাম ততই আমি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকলাম। খতমের রাজনীতির সাথে সাথে সকল ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক সংগঠন ও ছাত্র সংগঠন ভেঙে দেওয়া হলো। ১৯৭০ সালে আমি গ্রেফতার হলাম। যে লোকরা আগে আমাদেরকে আশ্রয় দিতো এবং আড়াল করে রাখতো তারাই পুলিশকে খবর দিয়ে আমাকে ধরিয়ে দিল।’

আসুন আমরা দেখি, ট্রেড ইউনিয়ন ও গণসংগঠন প্রশ্নে কমরেড চারু মজুমদার কি বলছেন

শোধনবাদী চিন্তাধারার মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে কৃষকসভা ও ট্রেড ইউনিয়নকে পার্টির একমাত্র কাজ হিসাবে চিন্তা করা। পার্টির কমরেডরা প্রায়ই কৃষক সভা ও ট্রেড ইউনিয়নের কাজের সঙ্গে পার্টির রাজনৈতিক কাজকে গুলিয়ে ফেলেন। তারা ভাবেন না যে, পার্টির রাজনৈতিক কর্তব্য কৃষকসভা ও ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে করা যায় না। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষক সভা আমাদের উদ্দেশ্য সাধনের অনেকগুলি হাতিয়ারের মধ্যে একটি। পক্ষান্তরে ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষকসভাকে পার্টির একমাত্র কাজ হিসেবে কল্পনা করার অর্থই হলো পার্টিকে অর্থনীতিবাদের পক্ষে নিমজ্জিত করা। এই অর্থনীতিবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম করা ছাড়া সর্বহারা বিপ্লবকে সফল করা যায় না। কমরেড লেনিন এই শিক্ষাই দিয়েছেন।” ২ নং দলিল

১৯৫৯ সাল থেকে ভারতবর্ষের প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উপর সরকার ক্রমশই হিংস্র আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। এই হিংস্র আক্রমণের বিরুদ্ধে আমরা কোনো সক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেইনি। আমরা এই আক্রমণের সামনে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের আওয়াজ রেখেছি, যেমন খাদ্য আন্দোলনের পর শোক মিছিল প্রভৃতি। আমাদের মনে রাখতে হবে কমরেড মাও সেতুঙের শিক্ষাদমননীতির বিরুদ্ধে শুধুমাত্র নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ জনসাধারণের সংগ্রামী ঐক্যে ফাটল ধরায় এবং অনিবার্যভাবে আত্মসমর্পণের পথে নিয়ে যায়। কাজেই আজকের যুগে যে কোনো গণআন্দোলনের সময় সক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠিত করতে হবে। সক্রিয় প্রতিরোধের কার্যক্রম আজ যে কোনো গণআন্দোলনের সামনে অনিবার্য প্রয়োজন হিসাবে দেখা দিয়েছে। এই কার্যক্রম ছাড়া আজ যে কোনো গণআন্দোলন সংগঠিত করার অর্থ হলো জনসাধারণকে হতাশাগ্রস্ত করে তোলা। ১৯৫৯ সালের নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের ফলে ’৬০-’৬১ সালের কলকাতায় খাদ্যের দাবীতে কোনো গণসমাবেশ করা সম্ভব হয়নি। এই সক্রিয় প্রতিরোধের সংগঠন জনসাধারণের মনে নতু ভরসা জাগিয়ে তুলবে এবং সংগ্রামের জোয়ার আসবে।” নং দলিল

সাম্রাজ্যবাদ যত ভয়ংকরভাবেই আসুক না কেন, আধুনিক সংশোধনবাদ তাদের সাহায্য করতে যত কুৎসিত জালই বিছাক না কেন, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির দিন ঘনিয়ে এসেছে, মার্কসবাদলেনিনবাদমাও সেতুঙএর চিন্তাধারার উজ্জ্বল সূর্যালোক সব অন্ধকার ধুয়ে মুছে নিঃশেষ করে দেবে। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, তাহলে কি এই যুগে আংশিক দাবীর ভিত্তিতে কৃষকের কোনো গণআন্দোলন করার দরকার নেই? নিশ্চয়ই আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ ভারতবর্ষ বিরাট দেশ এবং কৃষকও বহু শ্রেণীতে বিভক্ত। কাজেই রাজনৈতিক চেতনার মান সব এলাকার এবং সব শ্রেণীর মধ্যে একই স্তরে থাকতে পারে না, তাই আংশিক দাবীর ভিত্তিতে কৃষকের গণআন্দোলনের সুযোগ ও সম্ভাবনা সব সময়েই থাকবে এবং কমিউনিস্টদের সেই সুযোগের পুরো সদ্ব্যবহার সব সময়েই করতে হবে। আংশিক দাবীর আন্দোলন আমরা কি কৌশলে পরিচালিত করবো এবং কিইবা তার লক্ষ্য? আমাদের কৌশলের মূল কথা হলো ব্যাপক কৃষকশ্রেণীর জমায়েত হচ্ছে কিনা এবং আমাদের মূল লক্ষ্য হবে কৃষকের শ্রেণীচেতনা বাড়লো কিনাব্যাপক কৃষক সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে এগিয়ে গেল কিনা। আংশিক দাবীর ভিত্তিতে আন্দোলন শ্রেণীসংগ্রামকে তীব্র করে তুলবে। ব্যাপক জনতার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াবে। ব্যাপক কৃষক জনতা ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ হবে, সংগ্রাম ছড়িয়ে পরবে নতুন নতুন এলাকায়। আংশিক দাবীর আন্দোলনের ধরণ যেকোন রূপ হতে পারে কিন্তু কমিউনিস্টরা সব সময়ে উন্নত ধরণের সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা কৃষক সাধারণের মধ্যে প্রচার করবে। কোন অবস্থাতেই যে ধরণ কৃষকদের দ্বারা গৃহীত হল তাকেই সেরা বলে চালাবার চেষ্টা করবেন না। আসলে কমিউনিস্টরা সব সময়েই কৃষকদের মধ্যে বিপ্লবী রাজনীতি অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতি আর বন্দুক সংগ্রহ অভিযান চালানোর প্রচার চালাবে। এই প্রচার চালানো সত্ত্বেও কৃষক হয়তো গণডেপুটেশনের সিদ্ধান্ত নেবে এবং আমাদের সেই আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে। শ্বেত সন্ত্রাসের যুগে এই গণডেপুটেশনের কার্যকারিতা কোন ক্রমেই ছোট করে দেখলে চলবে না, কারণ এই ডেপুটেশনগুলোই সংগ্রামে বেশী করে কৃষককে টেনে আনবে। অর্থনৈতিক দাবীর আন্দোলন কোন সময়েই অন্যায় নয় তবে অর্থনৈতিক কায়দায় এই আন্দোলনকে পরিচালনা করা অপরাধ। আর অপরাধ এই প্রচার চালানো যে অর্থনৈতিক দাবীর আন্দোলন নিজের থেকেই রাজনৈতিক সংগ্রামে রূপ নেবে কারণ এটা হল স্বতঃস্ফূর্ততার পূজা করা। এর কোনটাই জনতাকে পথ দেখাতে পারে না, দৃষ্টিভঙ্গীর স্বচ্ছতা আসে না, সংগ্রামে ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ করে না।” ৮ নং দলিল

ট্রেড ইউনিয়নে সমস্ত শ্রমিককে সংগঠিত করোএ আওয়াজ শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক চেতনা বাড়ায় না। এর অর্থ অবশ্যই এ রকম নয় যে, আমরা আর ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠিত করবো না। এর অর্থ পার্টির বিপ্লবী কর্মীদের আমরা নিশ্চিয়ই ট্রেড ইউনিয়নের কাজে আটকে রাখব না, তাদের কাজ হবে শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে রাজনৈতিক প্রচার আন্দোলন চালানো অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতি ও বন্দুক সংগ্রহ অভিযান চালানোর রাজনীতি প্রচার করা ও পার্টি সংগঠন গড়ে তোলা। মধ্যবিত্তশ্রেণীর মধ্যেও আমাদের রাজনৈতিক প্রচার চালানোর প্রথম কাজ কৃষক সংগ্রামের তাৎপর্য প্রচার করা। অর্থাৎ পার্টির সব ফ্রন্টেই দায়িত্ব হচ্ছে কৃষক সংগ্রামের গুরুত্ব বোঝানো এবং সেই সংগ্রামের অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানানো।” ৮নং দলিল

লক্ষ্য করুন কমরেডগণ, লাইনগতভাবে কমরেড চারু মজুমদার কখনোই ট্রেড ইউনিয়ন বা কৃষক সভা অথবা ছাত্রদের সংগঠন ভেঙে দেয়ার কথা বলেননিতিনি সবসময় তৎকালীন শোধনবাদী কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর নীতিকে সমালোচনা করেছেন ও অর্থনীতিবাদী ঢঙে পার্টি চালানোর বিরোধিতা করেছেনসেটা করতে গিয়েই ক. সিএম শুধুমাত্র ট্রেড ইউনিয়ন করাকে সমালোচনা করেছেনকিন্তু তিনি কখনোই গণসংগঠনের বিরোধিতা করেননিতাঁর লিখিত ঐতিহাসিক আট দলিল যার জ্বলন্ত উদাহরণতিনি গণসংগঠন করতে নিষেধ করেছেন মন মিথ্যাচার যারা করেন, তারা হয় রাষ্ট্রের মতো করেই কমিউনিস্টদের জনগণের সামনে তুলে ধরতে চান, অথবা নিজের অসারতা ঢাকতেই কমরেড চারু মজুমদারের নামে মিথ্যাচার করছেন

খতম লাইনকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে তারা শ্রেণী সমন্বয়ের লাইন হাজির করেনবুর্জোয়ারা কি শ্রেণীশত্রু খতম করে না? রাশিয়া চীনে কি শান্তিপূর্ণভাবে বিপ্লব হয়েছিল? শত শত কমরেডদের জার বা চিয়াং কাই শেকের বাহিনী হত্যা করেনি? ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীকে হত্যা করতে হয়নি?

এই সমস্ত প্রশ্নে তারা নিশ্চুপ থাকেনতারা নিশ্চুপ থাকেন, কারণ তারা বিপ্লব করতে চান নিরাপদ স্থানে থেকেশ্রেণীশত্রু খতমের লাইনকে একচেটিয়া বিরোধিতা করতে গিয়ে বদরুদ্দীন উমর যে শ্রেণী সমন্বয়ের লাইন হাজির করছেন তা তিনি বুঝেই করছেনকারণ বার বার বিভিন্ন লোকজন বদরুদ্দীন উমরের ভ্রান্তি ধরিয়ে দিলেও তা থেকে তিনি শিক্ষা নেননি

শ্রেণীশত্রু খতম লাইন কমিউনিস্ট আন্দোলনে শ্রেণীসংগ্রামেরই অংশ। লেনিন, মাও থেকে আজ পর্যন্ত চর্চিত বিষয়এর মানে এ নয় যে, বিরোধী শ্রেণীভুক্ত সবাইকে খতম করতে হবে! তবে এ লাইন কখনো কখনো যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে, সেটা লাইনের সমস্যা না, সমস্যাটা অনুশীলনেরওই ভুল অনুশীলনকেই লাইন মনে করলেই আসে তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি!

খতম লাইনের মর্মার্থ হলোশত্রুশ্রেণীর কেউ হামলা চালালে, বা ষড়যন্ত্র করলে, বা বারবার সতর্ক করার পরও গণবিরোধী অবস্থা থেকে সরে না আসলে তাকে উচ্ছেদ বা খতম করা। এটা প্রতিরোধ যুদ্ধেরই অংশ।

খতম লাইন প্রয়োগে তৎকালীন ভুলগুলো আমাদের চিহ্নিত করতে হবে এটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি আমাদের খতম লাইনের নির্দিষ্ট বাস্তবতার সফলতাকেও আলোচনা করতে হবেকাজ করলে ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর পরবর্তীতে যারা সে কাজে আত্মনিয়োগ করবে, তাকে পূর্ববর্তী কাজের যথাযথ মূল্যায়নের উপর ভিত্তি করেই এগোতে হবে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) যারা ভারতের সর্ববৃহৎ কমিউনিস্ট পার্টি তারা ক. সিএমএর সীমাবদ্ধতারও সমালোচনা করেছেন; কিন্তু তাঁর বিপ্লবী অবদান, বা খতম লাইনকে অস্বীকার করে নয়

.

এরপরে বদরুদ্দীন উমর বলছেন চারু মজুমদারের মাধ্যমে ব্যাপক মানুষ আকৃষ্ট হলোকিন্তু কেন আকৃষ্ট হলো, তার কোনো সদুত্তর বদরুদ্দীন উমর দেননিব্যাপারটা যেন এমন যে, চারু মজুমদার দৈববাণীর মাধ্যমে জনগণকে আলোড়িত করলেন! আসলে ক. সিএম সঠিক লাইন হাজির করার জন্যই বিপ্লবী রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেনআর সে কারণেই অসংখ্য বিপ্লবাকাঙ্ক্ষী মানুষ তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। 

.

বদরুদ্দীন উমর বলছেন, “কিন্তু তাঁর এই ঐতিহাসিক ভূমিকা সত্ত্বেও এটা অবশ্যই বলা দরকার যে, তিনি ক্ষমতা দখলের ডাক দিলেও ক্ষমতা কিভাবে, কোন লাইনে ও কৌশলের মাধ্যমে, কি ধরনের সংগ্রাম সংগঠিত করে অর্জন করতে হবে সে বিষয়ে তাঁর কোন ধারণাই ছিল না। মার্কস, লেনিন ও মাও এর রচনাবলীর সাথেও তাঁর প্রকৃত কোন পরিচয় ছিল বলে মনে হয় না। কারণ বিপ্লব ও রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য ব্যাপক জনগণের মধ্যে নানা সংগঠনের মধ্যে কাজ বাদ দিয়ে হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের কথা মার্কস, এঙ্গেল্স, লেনিন, মাও কারও শিক্ষার মধ্যে নেই। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের আওয়াজ তোলার পর কি করতে হবে এ বিষয়ে তাঁর কোন ধারণাই ছিল না। কাজেই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর তিনি তাঁর অজ্ঞতা এবং অবিমিশ্রকারীতার মাধ্যমে নিজেই আন্দোলন ধ্বংস করেছিলেন।”

এখানেও বদরুদ্দীন উমর কমরেড চারু মজুমদারকে ভ্রান্তভাবে আক্রমণ করলেনতিনি দাবি করলেন, . সিএম মার্ক্সলেনিনমাও পড়েননিএ রকম নোংরা ব্যক্তি আক্রমণের কি কারণ থাকতে পারে? একজন কমিউনিস্ট কখনো আরেকজন বিপ্লবী কমিউনিস্টকে নোংরা ব্যক্তি আক্রমণ করতে পারেন না, যা বদরুদ্দীন উমর করেছেনতিনি কমরেড চারু মজুমদার যা বলেননি, তা তার মুখে এঁটে দিয়েছেন মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে. সিএম যে গণসংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়নের বিরোধিতা করেননি, তা এ লেখার শুরুতেই আট দলিল উদ্ধৃত করে দেখানো হয়েছে

.

ভাস্কর নন্দীকে আবার উদ্ধৃত করে প্রেক্ষিত বিহীন অবান্তর বক্তব্য দিয়ে কমরেড চারু মজুমদারকে আক্রমণ করেছেন বদরুদ্দীন উমর. সিএম নাকি ভাস্কর নন্দীকে বলেছিলেন, “চারু মজুমদারের সাথে একবার দেখা হওয়ার সময় তাঁর হাতে একটা বই দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন বইটা কি? বইটা দেখিয়ে ভাস্কর বললেন, লেনিনের What is to be Done। এরপর চারু মজুমদার বললেন, Read the Red Book and that is to be done!

আমরা দেখতে পাচ্ছি, বদরুদ্দীন উমর এখানে এক ধরনের মিথ্যার আশ্রয় নিলেন। ‘অন্তরঙ্গ চারু মজুমদার’ নামক বইয়ে দেখা যাচ্ছে, ভাস্কর নন্দীকে উদ্ধৃত করে বলা হচ্ছে, চারু মজুমদার ভাস্কর নন্দীকে বলেছিলেন, “Read the book and that is to be done!”

কেউ যদি শুধু ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান’ পড়ে আর কাজের বেলায় ‘সংশোধনবাদ ইজ টু বি ডান’ চর্চা করে, তবেই কেবল কমরেড চারু মজুমদারের বক্তব্যের বিকৃতি ঘটিয়ে এভাবে অপপ্রচার চালানো যায়যা বদরুদ্দীন উমর করেছেনএকটা প্রেক্ষিতবিহীন আলোচনাকে তিনি সামনে এনেছেন

.

সবশেষ, তিনি চারু মজুমদারের ছাত্রযুবদের প্রতি আহবান, রেড বুক অধ্যয়ন ও গ্রামে যাওয়ার বিরোধিতা করেছেনচারু মজুমদারের বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেনতিনি বলছেন, “চারু মজুমদার এমনিতেই কর্মীদের পড়াশোনার বিরোধী ছিলেন। তাঁর রচনাবলীতেই দেখা যায় তিনি কর্মীদেরকে বলছেন গ্রামে যাওয়ার সময় তারা যেন বই সঙ্গে না নিয়ে যায়। কারণ হাতে বই দেখলে কৃষকরা তাদেরকে নিজেদের লোক না ভেবে ভদ্দরলোক ভাববে!”

আসুন দেখা যাক কমরেড চারু মজুমদার ছাত্রযুবদের প্রতি কি আহবান করছেন

আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি ছাত্র আন্দোলনের ভালো বক্তা এবং ছাত্রদের দাবি বা কোন রাজনৈতিক দাবিতে ব্যারিকেড করা ছাত্রও পরে আই, ,এস পরীক্ষা দিয়ে হাকিম হয়েছে অর্থাৎ সোজাসুজি প্রতিবিপ্লবী ক্যাম্পে যোগ দিয়েছেতাই চেয়ারম্যান বলেছেনঃযে ছাত্রযুবক, কৃষক ও শ্রমিক জনতার সাথে মিশে যেতে পারে তাঁরাই বিপ্লবী এবং যারা পারবে না তারা প্রথমে অবিপ্লবী এবং কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিবিপ্লবী ক্যাম্পে যোগ দেবেএশিক্ষা শুধু চীনের নয়,এ শিক্ষা পৃথিবীর সমস্ত দেশেরএ কাজ না করলে শহরে বিপ্লবী কর্মীরা হতাশাগ্রস্থ ও অধঃপতিত হয়ে যাবে, এটাই আমার অভিজ্ঞতা।” ছাত্র ও যুব সমাজের প্রতি আহবান, দেশব্রতী, ২ রা মে, ১৯৬৮

বিপ্লবী হতে হলে নিজের সঙ্গে অনেক লড়াই করতে হয়। তবেই তো একটা মানুষের পরিবর্তন হয়। সে নতুন বিপ্লবী মানুষে পরিণত হয়।

তোমাদের এখন শেখার সময়। এখন নিশ্চয় শিখতে হবে। এখন শেখা বলতে শাসক শ্রেণী কী কী বোঝে আর আমরা কী বুঝি। শাসক শ্রেণী বোঝে যে শিক্ষা এমন হোক যাতে তাদের প্রয়োজন মেটে এবং সেই শিক্ষা মারফতে তারা তোমাদের উপযুক্ত করে তুলতে চায়, তাদের স্বার্থ সংরক্ষনের হাতিয়ার হিসাবে। তাই তারা শিক্ষাকে বাস্তব কাজ থেকে আলাদা করে রাখে এবং শিক্ষার ভেতর দিয়ে তারা তোমাদের জনতা বিরোধী আত্মচিন্তাকে প্রধান করে তোলে। তাই চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘The more you read, the more you become foolish’। কারণ যতো পড়বে ততো বাস্তব কাজ থেকে তুমি যাবে দূরে সরে এবং যতো পড়বে ততো তুমি হবে জনবিরোধী, আত্মম্ভির এবং আত্মকেন্দ্রিক; স্বার্থপরতা বেড়ে যাবে এবং বাস্তব কাজ থেকে বিচ্যুত থাকায় জনতার সেবার পক্ষে তুমি হবে ততো অনুপযুক্ত। তাহলে আমরা শিক্ষা বলতে কি বুঝি? আমরা জানি জ্ঞানের তিনটি সূত্র,

) উৎপাদনের জন্য সংগ্রাম

) শ্রেণী সংগ্রাম

) বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য সংগ্রাম।

জ্ঞানের তিনটি সূত্র সত্যি সত্যি তোমরা পাবে যদি তোমরা উৎপাদনের সাথে যুক্ত হও। আজকের সমাজে তোমাদের সে সুযোগ খুবই কম। তাই আজকের যুগে তোমাদের শিক্ষার ভিত্তি হওয়া উচিৎ

) মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদ, মাওসেতুঙের এর চিন্তাধারা আয়ত্ত করার শিক্ষা।

) ভারতবর্ষের সংগ্রামের ইতিহাস

) আমাদের জীবনে দৈনন্দিন কাজের সমস্যা।

এইগুলোকে ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যয়ন করতে হবে। এই শিক্ষাই খাঁটি শিক্ষা এবং এগুলো থেকেই তোমার ভবিষ্যৎ জীবনের গতিপথ নির্ধারিত হবে। ডাক্তারি যদি শিখতেই হয় তাহলে শিখতে হবে এই ভারতবর্ষের মানুষকে রোগ ব্যাধি থেকে মুক্ত করার জন্য। এই ভারতবর্ষ হচ্ছে কৃষকের দেশ কাজেই কোটি কোটি কৃষকের জীবনে আধুনিক বিজ্ঞান এবং মনুষ্য সমাজের সমস্ত আরোগ্য পদ্ধতি নিয়ে যেতে হবে, যাতে তারা রোগের যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হতে পারে। এই সংগ্রামে তুমি হবে সৈনিক এবং তোমার লক্ষ হবে ব্যাপক কৃষক জনতাকে যাতে স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারোকয়েকটি বিশেষ রোগের বিশেষজ্ঞ হবার জন্য নিশ্চয় নয়। আমরা যা কিছু করবো, যা কিছু শিখবো সবই জনতার জন্য; তার মানে আমাদের দেশ কৃষকের জন্য। এই কৃষককে চেনা, কৃষককে বোঝা, কৃষকদের সাহায্য করার নামই হল দেশপ্রেম, যে দেশপ্রেমের জন্য জীবন দেওয়া প্রত্যেকটি মানুষের একটি পবিত্র কাজ। দৈহিক পরিশ্রম করতে যারা ভয় পায় তারা কিছু করতে পারেনা। আলস্য, নিষ্ক্রিয়তা হল সামন্তশ্রেণীর দান। শ্রমিকশ্রেণীর দর্শন শেখায় অক্লান্ত পরিশ্রম করতে। ভীরুতা, কাপুরুষতা ধনিক শ্রেণীর দানকারণ তারা ব্যাক্তি স্বার্থকে সর্বোচ্চ স্থান দেয়। তাই ধনিক শ্রেণীর সাহিত্যে কাপুরুষতার প্রশস্তি গাওয়া হয়েছে। শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থ যেহেতু সকলে মিলেই সিদ্ধ হতে পারে এবং সফল হতে পারে চরম ত্যাগস্বীকারে, তাই শ্রমিকশ্রেণীর দর্শন শেখায় মৃত্যুঞ্জয়ী সাহসের অধিকারী হতে।

ভবিষ্যতের মানুষ হওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি কর। মনকে বিপ্লবী বানাতে হয় প্রথম। মানুষের অগ্রগতির ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস। আর সংগ্রাম করতে হয় নিজের সাথে। বারবার ব্যাক্তি স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে। এই ব্যাক্তি স্বার্থ শোষণভিত্তিক সমাজের দান। স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম মানুষের চরিত্র পরিবর্তনের সংগ্রাম। সামাজিক মানুষ হওয়া সাধারন নয়। এই লড়াই শুরু হয়েছে মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লবে। বিরাট জয়ের সম্ভাবনা আমাদের সামনে। তার জন্য নিজেকে প্রস্তুত কর।”

[“এবং জলার্ক” পত্রিকার অক্টোবর ২০০৯ মার্চ ২০১০ সংখ্যায় প্রকাশিত “চারু মজুমদারের অপ্রকাশিত চিঠি” এর নির্বাচিত অংশ।]

কমরেড চারু মজুমদার কোথাও পড়াশোনা করার বিরোধিতা করেননিতিনি যা করেছেন তা হলো বুর্জোয়া শিক্ষা ব্যবস্থার বিরোধিতাতিনি কর্মীদের বুর্জোয়া শিক্ষা গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেনতিনি এমন সময় এই আহবানগুলো রেখেছিলেন, যখন সারা ভারতব্যাপী বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থাকে মহান করে দেখানো হচ্ছিলোতিনি সেই সময়ে বিপ্লবী ঔদ্ধত্যপূর্ণ, বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থা বিরোধী যে বক্তব্য দিয়েছেন তার সমসাময়িক কোন কমিউনিস্ট নেতাই তা বলতে পারেননিকমরেড চারু মজুমদার কর্মীদের সর্বদায় বিপ্লবী শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেনরাজনৈতিক ক্লাসের উপর জোড় দিয়েছেনকর্মীদের রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে বলেছেনকিন্তু বদরুদ্দীন উমর কমরেড চারু মজুমদার এর এই সব আলোচনা পড়ার পরেও কেনো মিথ্যাচার গুলো করছেন তা বোধে আসে নানাকি তিনি চারু মজুমদার এর রচনাবলী পড়েননি!যে অভিযোগ তিনি চারু মজুমদার সম্পর্কে করেছেন যে, চারু মজুমদার মার্ক্সলেনিনমাও পড়েননিএকই অভিযোগ এখন তার সম্পর্কে করা যায় যে তিনি চারু মজুমদার এর লেখাপত্র পড়েননি

এর আগেও শিক্ষা প্রশ্নে বদরুদ্দীন উমর তার লেখায় স্পষ্ট বক্তব্য রাখেননিতিনি বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থার সাথে বিপ্লবী শিক্ষাকে গুলিয়ে ফেলেনগুলিয়ে ফেলেন বিপ্লবী জনগণের কাছে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তার সাথে বড় বড় ডিগ্রীর শিক্ষাকে

ভারতবর্ষের বিপ্লবে কমরেড চারু মজুমদার ও নকশালবাড়ি আন্দোলনের সঠিক পর্যালোচনা বা সারসংকলন ছাড়া ক্ষমতা দখলের বিপ্লবী সংগ্রাম এগিয়ে নেয়া সম্ভব নাআমরাও মনে করি, . সিএম ও নকশালবাড়ির সঠিক বিশ্লেষণ জরুরিকিন্তু এই জরুরি কাজ করতে গিয়ে কোনোভাবেই ক. সিএমকে ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ বলার কাণ্ডজ্ঞানহীন পরিচয় আমরা দিতে চাই নাএ ক্ষেত্রে ক. সিএম ও নকশালবাড়ি আন্দোলনের যোগ্য উত্তরসূরী ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) যে মূল্যায়ন করেছেন, তা আমাদের আমলে নিতে হবে

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) প্রথম কংগ্রেসে গৃহিত ‘আসুন, অতীতের সারসংকলন করে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাই’ নামক দলিলে সারসংকলন প্রশ্নে তারা কি বলছে দেখুন

সংগ্রাম পরিচালনা করতে গিয়ে অনভিজ্ঞতার জন্য ভুল করা বিপ্লবী পার্টির পক্ষে অস্বাভাবিক কিছু নয়, আমাদের যে পার্টি এই সংগ্রাম পরিচালনা করেছে, বয়স এবং অভিজ্ঞতার দিক থেকে সে ছিলো নবীনসংশোধনবাদের প্রতি ঘৃণা, বিপ্লব এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্প আর মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাও সেতুঙ চিন্তাধারার (তখন মাওবাদের পরিবর্তে মাও সেতুঙ চিন্তাধারা ব্যবহৃত হতো) ওপর অবিচল আস্থা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক বিপ্লবে যে শ্রেণীগুলো অংশগ্রহণ করবে, শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে তাদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় ধৈর্য্য, দক্ষতা ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার এবং একই সঙ্গে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কৃষক জনতাকে উদ্ধুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিলোএই অবস্থায় পার্টি যে ভুল করবে, তা অসম্ভব কিছু নয়এর ফলে বিপ্লবী কর্মীদের মধ্যে মতাদর্শগত বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে ;কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে মতাদর্শগত বিচ্যূতিগুলো কৌশলগত কৌশলগত লাইনে প্রতিফলিত হয়েছে, আর বিচ্যূতিজনিত ধাক্কা ও ক্ষতিগুলো হয়েছে আরো মারাত্বকএই অবাঞ্চিত ধারণাগুলো আমাদের চিহ্নিত ও সংশোধন করতে হবেতা সত্ত্বেও আমাদের পার্টিই কমরেড চারু মজুমদারের নেতৃত্বে আত্মত্যাগের গৌরবজনক ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছেআমরা যদিও আমাদের বহু প্রিয় নেতা, যাঁরা জনগণের অগাধ আস্থা অর্জন করেছিলেন, তাদের হারিয়েছি, তবুও আমাদের পার্টি সরকারের বর্বর আক্রমণের মুখে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পেরেছিলোএখানেই আমাদের পার্টির বিশেষত্বআমরা অবশ্যই মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাও সেতুং চিন্তাধারার আলোয় আমাদের অতীত ভুলভ্রান্তির, আমাদের উপলব্ধির সীমাবদ্ধতার এবং তাদের শ্রেণী ভিত্তির সমালোচনা করবোএইভাবে আমরা আমাদের মতাদর্শগত, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে পারি এবং বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারি

আমরা যদি আমাদের ভুল আর ক্ষয়ক্ষতির বিবরণের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখে সাফল্যগুলো না দেখি এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অগ্রগতি বুঝতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা থেকে ভুল শিক্ষা নেব এবং ভবিষ্যতের কর্তব্য পালনে মারাত্বক বিচ্যূত হবোআমাদের পার্টিতে এখন দু ধরনের ঝোঁক দেখা যায়একদল আমাদের অতীতের ভুলকে বাড়িয়ে দেখাচ্ছে এবং সুচতুরভাবে সাফল্যকে কম করে দেখাচ্ছেঅন্য এক ধারা একটাও ভুল স্বীকার করতে রাজি নয়এই দুটো ঝোঁকই বিপজ্জনক ;দুটোরই বিরোধিতা করতে হবেতবে প্রথম ঝোঁকটা একটু বেশি বিপজ্জনকবিশ্বজুড়ে এখনো যখন সংশোধনবাদই প্রধান বিপদ, তখন প্রথম ঝোঁকটা আমাদের সংশোধনের পাঁকেই নিয়ে যাবে এবং সশস্ত্র সংগ্রামের পথে অনতিক্রম্য বাধার সৃষ্টি করবেদ্বিতীয় ধারা অর্থাৎ বামহঠকারীঝোঁকের বিরোধিতা করতে গিয়ে প্রথম ধারার প্রভাবে যেনো না পড়ি, সে ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতে হবেতাছাড়া সাধারণত কোনো ব্যর্থতার পরে লোকে যেখানে ভুল নেই সেখানেও ভুল খুঁজে পায়যারা সরকারি নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে বিভিন্ন ধরনের দুর্বলতা দেখিয়েছিলেন, তারা এই মানসিকতার অন্যায় সুযোগ নিয়ে বলে বেড়াচ্ছেন যে, স্রেফ পার্টি ভুল করেছিল বলেই তারা এই ভূমিকা নিতে বাধ্য হয়েছেনতাঁরা নিজেদের দূর্বলতা ঢাকা দিয়ে, যাঁরা লড়াইয়ে দৃঢ় ছিলেন, তাদেরই পার্টির ক্ষয়ক্ষতি এবং নিজেদের অধঃপতনের জন্য দায়ী করছেনএখনও সংগ্রামের মধ্যে আছেন যে কমরেডরা তারা এই ভণ্ডামোকে ঘৃণা করেন

আত্মসমালোচনা একদিনে শেষ হতে পারে নাএটা হলো একটা আন্দোলন, যাকে পার্টির ওপর তলা থেকে নিচুতলা অবধি নিয়ে যেতে হবেএটা হলো নতুন উদ্যোমে বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে একটা বিরাট শিক্ষা অভিযান,যা পার্টি সদস্যদের উপলব্ধি ও অনুশীলনের মধ্যে জমে থাকা ভুল চিন্তাগুলোকে ঝেড়ে ফেলবে এবং মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাও সেতুং চিন্তাধারার আলোকে সঠিক নীতি ও উপলব্ধিতে পৌঁছাতে সাহায্য করবেতাই আত্মসমালোচনা নিজেই একটা সংগ্রামএটা পার্টির অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম, যা আসলে বাইরের শ্রেণী সংগ্রামেরই প্রতিফলনস্রেফ গঙ্গায় ডুব দিলে যেমন কেউ পুরোপুরি পরিষ্কার হয় না, তেমনি শুধুমাত্র অতীতের ভুলগুলোর জন্য দুঃখ করে আমরা পার্টির মধ্যে গেড়ে বসে থাকা ভুল ধারনাকে উপড়ে ফেলতে পারবো নানিজেদের ভুলগুলো বুঝতে পারা তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ, কিন্তু তাঁর পরিবর্তে প্রত্যেকটা পরিস্থিতিতে কি করতে হবে , সেটা যদি কেউ সঙ্গে সঙ্গে না বুঝতে পারে, তাতে বিস্মিত হবার কিছু নেইপ্রকৃত বিপ্লবী অনুশীলনের মাধ্যমে জনগণের কাছে থেকে শিখতে হবেআমাদের প্রকৃত শিক্ষক জনগণের কাছ থেকে শেখার জন্য প্রয়োজনীয় ধৈর্য্য, বিনয় এবং জ্ঞান আমাদের অর্জন করতে হবেতা না করে আমরা যদি বিষয়ীগত চিন্তার খপ্পরে পড়ে আমাদের মুখস্ত করা ফর্মুলার কাঠামোর মধ্যে বাস্তবকে খাপ খাওয়াতে চাই, আর নিজেদের সর্বজ্ঞ ধরে পার্টির ওপর অবাস্তব সমাধান চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে পুরোনো ভুল শোধরানোর বদলে আমরা আরো ক্ষতিকর ভুল প্রচেষ্টার স্বীকার হবোএই কারণে বিশ্ববিপ্লবের অগ্রনী চীনা কমিউনিস্ট পার্টি তার দশটা অভ্যন্তরীণ সংগ্রামের পুনর্মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছে যে, একটা ভুল ঝোঁক সংশোধন করার সংগ্রামের মধ্যে অন্য একটা ভুল ঝোঁকের বীজ সুপ্ত থাকেএভাবে তারা সারা বিশ্বের বিপ্লবীদের সাবধান করেছে যে, পূর্ববর্তী কোনো ভুল ঝোঁক সংশোধন করার সময় মতো সাবধানতা অবলম্বন না করলে নিশ্চিতভাবেই তারা দ্বিতীয় ভুলের খপ্পরে পড়বেনএই সতর্কবাণী আমরা উপেক্ষা করতে পারি না, বিশেষ করে, বিপ্লব পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার বিচারে আমরা যখন সাংগঠনিকভাবে দেশের বিপ্লবী পরিস্থিতির চেয়ে পিছিয়ে আছি।”

নকশালবাড়ি সংগ্রাম ও কমরেড চারু মজুমদার এর মূল্যায়ন প্রশ্নে সিপিআই (মাওবাদী)-র দলিলটি বিশ্লেষণ করে কমরেড সব্যসাচী গোস্বামীর লেখা বই ‘প্রসঙ্গ নকশালবাড়ি পঞ্চাশ বছরের গৌরবময় পথচলা’ (উৎস পাবলিশার্স, অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮) থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করছিতাহলে সহজেই আমরা বুঝতে পারবো, . সিএম ও নকশালবাড়ি আন্দোলনের মূল্যায়ন কেমন হওয়া উচিত

নকশালবাড়ি সংগ্রামের ইতিবাচক দিকগুলো

) এই প্রথম ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে গেঁড়ে থাকা সুবিধাবাদ, দক্ষিণপন্থী সংসদসর্বস্বতার অচলায়তনে জোর ধাক্কা লাগলো।

) এই প্রথম ভারত রাষ্ট্রের আধাসামন্ততান্ত্রিক, আধাঔপনিবেশিক শ্রেণী চরিত্রকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হলো। দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের পথ ভারতীয় বিপ্লবের পথ হিসেবে সামনে এলো। ভারতীয় বিপ্লবের শত্রুমিত্রকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশল স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হলো। সশস্ত্র বিপ্লব, গণফৌজ, ঘাঁটি এলাকা গড়ার প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নটা দৃঢ়ভাবে সামনে আনা হলো। নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবকে ভারতীয় বিপ্লবের স্তর হিসেবে ঘোষণা করা হলো। এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখল, গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও, অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের সামরিক রণনীতি সামনে এলো স্পষ্টভাবে।

সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে এদেশের কৃষক জনতার দ্বন্দ্বটা যে এদেশের প্রধান দ্বন্দ্ব, এই সত্যকে সামনে এনে, কৃষিবিপ্লব যে এদেশের অক্ষ, এই বিষয়টাকে সামনে আনা হলো।

মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের উৎস ও বিকাশ যে সম্পূর্ণভাবে সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরশীল, তা চিহ্নিত হলো। ভারতীয় শাসকশ্রেণীর মুৎসুদ্দি চরিত্রকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হলো এবং ভূয়া স্বাধীনতার মুখোশকে উন্মোচিত করা হলো।

) সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করা হলো এবং তাকে ভারতীয় জনগণের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হলো।

আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে চলমান মতাদর্শগত মহাবিতর্কে, মাও সেতুঙয়ের নেতৃত্বাধীন সংগ্রামের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া হলো এবং মাও সেতুঙ চিন্তাধারার ব্যাপক প্রচারের কর্মসূচী হাতে নেওয়া হলো। আন্তর্জাতিকভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের চীন বিরোধী কুৎসার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার করা হলো।

) সশস্ত্র সংগ্রামকে শুধুমাত্র আলোচনার বিষয়বস্তু না করে, তা কাজে রূপান্তরিত করা হলো। অর্থাৎ বিপ্লব আর শুধুমাত্র পুথিসর্বস্ব বিষয় হয়ে রইল না, বরং তা হাতেকলমে অনুশীলিত হলো। নকশালবাড়ির আন্দোলন ছাত্রযুবাদের একটা বড় অংশকে বিপ্লবে সামিল করতে, শ্রমিককৃষকের সঙ্গে একাত্ম হতে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিল। বিপ্লবে আত্মত্যাগের ভূমিকাকে বিরাটভাবে সামনে আনলো এবং বলা বাহুল্য একটা বিরাট অংশকে তাতে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হলো নকশালবাড়ির আন্দোলন, যা এ দেশের ইতিহাসে ছিল এক অভূতপূর্ব ব্যাপার।

) কাশ্মীর ও নাগা জাতিসত্তাসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের জাতি ও জাতিসত্তাগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে (বিছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ) সমর্থন জানানোর মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনে জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে লেনিনীয় নীতিকে এই প্রথম স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা হলো।

) প্রথম থেকেই রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের সচেতন লক্ষ্য নিয়ে নকশালবাড়ি, শ্রীকাকুলাম, ডেবরা, গোপিবল্লভপুর ইত্যাদি অঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রামকে উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।

বস্তুত, নকশালবাড়িই প্রথম ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে দক্ষিণপন্থী পঙ্কিল বদ্ধ জলা থেকে মুক্ত করে সঠিক বিপ্লবী দিশায় প্রতিষ্ঠা করলো।

সংগ্রামের সীমাবদ্ধতা

মার্ক্সবাদের মহান শিক্ষক মাও সেতুঙ আমাদের শিখিয়েছেন, প্রতিটি বস্তুকেই বিপরীতের ঐক্যের নিয়মে তথা ‘এক ভেঙ্গে দুই’এর নিয়মে দেখতে। এই নিয়মে না দেখে শুধু সাফল্যগুলোকে দেখা, ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতাকে না দেখা হচ্ছে এক ধরণের একদেশদর্শিতা। এটা বাস্তব, যে বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে নকশালবাড়ির কৃষক সংগ্রাম শুরু হয়েছিল সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে, প্রবল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুখে তা ভেঙে পড়ে। সিপিআই (এমএল) পার্টি বহু গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়। কেন এই বিপর্যয়, তা উপলব্ধি করতে গেলে আমাদেরও এই সংগ্রামকে ‘এক ভেঙ্গে দুই’এর দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করতে হবে। সীমাবদ্ধতা বা ব্যর্থতাকে উপলব্ধি এবং স্বীকার না করতে পারলে, আত্মসমালোচনার প্রশ্নে সাহসী না হতে পারলে, সংগ্রামকে কখনোই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। মহান শিক্ষক মাও আমাদের শিখিয়েছেন যে, এমন কোনো আত্মসমালোচনা নেইযা করতে কমিউনিস্টরা ভয় পায়। এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে প্রকৃত বিপ্লবীরা আন্দোলনকে মূল্যায়ন করলেন। আসুন, দেখা যাক তারা কি কি সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন

) প্রথম সীমাবদ্ধতা ছিল যুগের চরিত্র বোঝার প্রশ্নে। ‘অতীতের সারসংকলন’ তথা ‘আত্মসমালোচনামূলক রিভিউ’ দলিলটিতে স্পষ্টভাবেই বলা হয়, “৮১টি দেশের কমিউনিস্ট পার্টির মস্কো কনফারেন্স বর্তমান যুগের চরিত্র সম্পর্কে বলেছিল– ‘এটা হলো সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত পতনের যুগ এবং সমাজতন্ত্রের বিশ্ববিজয়ের যুগ। ’ বিশ্বের সমস্ত কমিউনিস্ট পার্টি এই মূল্যায়নকে স্বীকার করে নিয়েছে। আমরা একে ঠিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলাম, ভেবেছিলাম যুগের চরিত্রেরই একটা গুণগত পরিবর্তন হয়েছে এবং সেই কারণে, লেনিনের যুগের কৌশল সেকেলে হয়ে গেছে; যদিও এটা সত্যি যে, রণনীতির দিক থেকে দেখলে শক্তির ভারসাম্য সমাজতন্ত্রের অনুকূলে পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু আমরা ভেবেছিলাম রণকৌশলের দিক থেকেও একই পরিবর্তন হয়েছে। এই কারণে ভ্রাতৃপ্রতীম পার্টিগুলোর মন্তব্যকে আমরা ভুল ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম সাম্রাজ্যবাদের দিন ঘনিয়ে এসেছে। ‘বিভিন্ন দেশের জনগণ কখনও তাদের হাতে, কখনও তার পায়ে, কখনও কোমরে আঘাত করছেফলে সাম্রাজ্যবাদ মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে’এক কথায় আমরা ভেবেছিলাম বিশ্বসমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শেষ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে এবং এই সময় সাম্রাজ্যবাদকে চূড়ান্ত আঘাত হানতে হবে। কাজেই আমাদের সমস্ত শক্তি, লোকবল, অর্থবল আর অস্ত্র দিয়ে আঘাত হানতে হবে; প্রত্যেকে যখন তাদের সুযোগ আর সামর্থ্য মতো আঘাত হানছে, তখন আমরা যদি উপযুক্ত মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করি, তাহলে কার্যত আমরা আমাদের বিপ্লব এবং বিশ্ববিপ্লবের প্রতি অন্যায় করবো, যা হবে সাম্রাজ্যবাদকে সহায়তা করারই সামিলএ রকমই ছিল আমাদের চিন্তন পদ্ধতি, এই কারণেই আমাদের এবং শত্রুর অবস্থানের শক্তি আর দুর্বলতার বাস্তবানুগ মূল্যায়নের ভিত্তিতে আমাদের নীতি ও কৌশল, অর্থাৎ সংগ্রামের রূপ, সংগঠনের রূপ ইত্যাদি নির্ধারণের পরিবর্তে আমরা শুধু বিশ্ব বিপ্লবের কাল্পনিক শেষ যুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাসের উপরই নির্ভর করেছিলাম। বিপ্লবের কোনো একটা পর্যায়ে যদি রণকৌশল নির্ধারিত হয় কোনো একটা দ্বন্দ্বের ফলাফল সম্পর্কে নেতৃত্বের পবিত্র ইচ্ছার উপর নির্ভর করে, তাহলে বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। ”

প্রথম সীমাবদ্ধতাটি ছিল সংগ্রামের ব্যর্থতার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি, বস্তুত এই উপলব্ধি, অর্থাৎ ‘লেনিনের যুগের রণনীতি সেকেলে হয়ে গেছে’এই উপলব্ধির হাত ধরেই এসেছে আরো কিছু ভুল।

) জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভুল করা হলো। এক্ষেত্রে তৎকালীন নেতৃত্ব পুরোপুরি বিষয়ীগতবাদের শিকার হয়ে পড়েছিলেন। উক্ত দলিলটিতে এ বিষয় নিয়ে বলতে গিয়ে বলা হলো, “বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে কোনো সাধারণ সত্যে পৌঁছানো এক জিনিস, আর আগে থেকেই কোনো সাধারণ সত্যে পৌঁছে বাস্তব ঘটনাকে দেখা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার। প্রথম পদ্ধতিটা মার্ক্সবাদীরা সাধারণত অনুশীলন করে থাকেন কোনো সাধারণ সত্যে পৌঁছানোর জন্য; কিন্তু দ্বিতীয়টা হলো ঠিক তার উল্টো। অথচ আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীর মূল্যায়নের জন্য আমরা এই অমার্ক্সীয় পথটাই বেছে নিয়েছিলাম। ”

লেখার শুরুতেই দেখিয়েছি যে, কম্বোডিয়া আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে চারু মজুমদার এই ঘটনাকে তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সূচনা হিসেবে ঘোষণা করেন। যদিও পরে তিনি মাও সেতুঙের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কিত ২০ মে ঘোষণাটিও একই সঙ্গে পার্টির সবাইকে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। মাওয়ের ওই ঘোষণায় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে পারে এই ইঙ্গিত থাকলেও, বলা হয়েছিল, হয় বিপ্লব যুদ্ধকে ঠেকাবে নয়ত যুদ্ধ বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করবে, বিপ্লবই এই যুগের প্রধান প্রবণতা। দলিলটিতে তাই সঠিকভাবেই বলা হলো– “যুদ্ধের বিপদ স্বীকার করা এক জিনিস আর যুদ্ধ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে বলে সিদ্ধান্তে আসা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার। বাস্তবে, এই দুই রকম পৃথক ক্ষেত্রে গৃহীত কর্মসূচী আলাদা না হয়ে পারে না। কোনো সম্ভাবনা বাস্তবে পরিণত হওয়ার আগেই তাকে বাস্তব বলে ধরে নিয়ে তাঁর ভিত্তিতে কর্মসূচী নির্ধারণ করা আদৌ মার্ক্সবাদী পদ্ধতি নয়। পরিস্থিতির এই ভুল মূল্যায়নের ফলশ্রুতি হলো– ‘টানেল খুঁড়ে সেই মাটি দিয়ে বাঁধ বানানোর মতো আকাশ কুসুম পরিকল্পনা করা। এই ভুল মূল্যায়ন থেকেই এসেছিল সশস্ত্র সংগ্রাম সংক্রান্ত ভুল রণকৌশল।

জাতীয় পরিস্থতির ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও একই কারণে গুরুতর ত্রুটি হয়েছিল। এর ফলে সংগ্রামে একটা দক্ষিণপন্থী ধারা যেমন জন্মেছিল, তেমনই একটা মতান্ধতাবাদী ধারারো জন্ম হলো। কমরেড লেনিন আমাদের শিখিয়েছেন, বাম এবং দক্ষিণ এই দুই বিচ্যুতিই হচ্ছে যমজ সন্তান। এই দুই বিচ্যুতির উৎস একটাই। তা হলো বিষয়ীগতবাদ। বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হওয়া। এক্ষত্রেও তাঁর ব্যতিক্রম হয়নি। বস্তুত এই দুটো ধারাই আমাদের দেশের অসম বিকাশের বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে একটা ধারা যেমন নিয়ে এলো কুখ্যাত পর্যায় তত্ত্ব। অর্থাৎ প্রথমে গণসংগঠনগণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশের জনগণকে বিপ্লবের জন্য পোড় খাওয়ানো; তারপর সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করা। এই দেশটা যে একটা আধাসামন্ততান্ত্রিকআধা ঔপনিবেশিক দেশ। অসম বিকাশের কারণে এখানে যে সাধারণভাবে সব সময়ই একটা বিপ্লবী পরিস্থিতি থাকলেও, দেশজুড়ে একসঙ্গে একই রকম বিপ্লবী পরিস্থিতি থাকতে পারে না। রাষ্ট্র যেখানে দুর্বল এমন কোনো কোনো জায়াগায় সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবী সংগ্রাম শুরু করা এবং মুক্তাঞ্চল গঠন করা সম্ভবএসব অঞ্চলে জনগণের ফৌজ গড়ে তোলা সম্ভব। দলিলে দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের অঙ্গীকার থাকলেও কার্যত ভুল শোধারানোর নামে এই কুখ্যাত ‘পর্যায় তত্ত্ব’ তাদের দক্ষিণপন্থার পাঁকে আবার ঠেলে নিয়ে গেলো। এর বিরুদ্ধে চারু মজুমদার অনেক আগেই সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। কিন্তু এর বিপরীতে যে ‘বাম বিচ্যুতি’ দেখা দিলো, তারাও কার্যত দেশের অসম বিকাশের বাস্তবতাকে উপলব্ধি না করতে পারার ফলে এবং ‘নতুন যুগে পুরনো কৌশল সেকেল হয়ে পড়েছে’এই ভুল উপলব্ধির ফলে, যেখানে সম্ভব সেখানেই সশস্ত্র বিপ্লব শুরু করে দেওয়ার লাইন হাজির করল। এমনকি কলকাতা মহানগরেও কোনো কোনো পাড়াকে মুক্তাঞ্চল ঘোষণার বালখিল্যতা এরই পরিণতিতে দেখা দিলো। দলিলটিতে তাই সঠিকভাবেই মূল্যায়ন করে বলা হলো, “প্রথম ধারাটি যেখানে সামগ্রিক চমৎকার বিপ্লবী পরিস্থিতিকে অস্বীকার করে জনগণকে অর্থনৈতিক সংগ্রামের মধ্যে আটকে রাখতে চেয়েছ এবং এইভাবে সশস্ত্র বিপ্লবের ক্ষতি সাধন করেছে; সেখানে দ্বিতীয় ধারাটি যেখানেই সম্ভব সেখানেই সশস্ত্র বিপ্লব করে ভারতীয় বিপ্লবের ইতিহাসে নতুন অধ্যয়ের সূচনা করা সত্ত্বেও অগণিত কৃষক জনতাকে সশস্ত্র সংগ্রামে সামিল করার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনগণের চেতনার স্তর অনুযায়ী সংগ্রামের বিভিন্ন রূপগুলোকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। তাছাড়া, ‘ভারতের প্রতিটি কোণাই অগ্নিগর্ভ এবং যেকোনো অঞ্চলকেই মুক্ত করা সম্ভব বলে চীনের মতো প্রথমে পার্বত্য অঞ্চলে ঘাঁটি এলাকা প্রতিষ্ঠা করে একের পর এক অন্য অঞ্চলগুলো মুক্ত করার প্রয়োজন নেই। ’এই ধরণের অবাস্তব ডাক দিয়েও এই ধারা আমাদের বিপ্লবের বিকাশের ক্ষতি সাধন করেছে। এইভাবে আমরা ঘাঁটি এলাকা স্থাপন করার ক্ষেত্রে দূর্গম আঞ্চলসহ অন্যান্য অনুকূল শর্তকে বিবেচনার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছি।

বিগত দশকে আমাদের সমগ্র বিপ্লব প্রচেষ্টাই হলো দ্বিতীয় ধারার। আমাদের এই ত্রুটির উৎস হলোবিপ্লবে দ্বন্দ্বের দুটো দিকে শক্তি এবং দুর্বলতা মাথায় না রেখে এই দ্বন্দ্বের ফলাফল সম্পর্কে নেতৃত্বের কল্পনাপ্রসূত চিন্তার ওপর ভিত্তি করে সংগ্রামের রূপ নির্ধারণ করার অমার্ক্সীয় পদ্ধতি।

) বস্তুত আত্মকেন্দ্রিকতা তথা বিষয়ীগতবাদ এতোটাই সংগ্রামকে তথা সংগ্রামের নেতৃত্বকে গ্রাস করে ফেলেছিল যে, বিষয়ীগত শক্তিগুলো বিকশিত করার প্রশ্নে একতা ঔদাসিন্য কাজ করেছিল। সংগ্রামের মধ্যে এরকম একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, বিষয়ীগত শক্তি যাই হোক না কেন, সশস্ত্র সংগ্রামের বিজয় কেউ আটকাতে পারবে না।

সাধারণভাবে বিষয়ীগত শক্তি বিষয়েও একটা দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদী ধারা এবং একটা বাম দুঃসাহসিকতাবাদী ধারা লক্ষ্য করা যায়। অতীতের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিপ্লবীরা তাই বলছেন, “প্রসঙ্গক্রমে, বিগত দশকের সশস্ত্র সংগ্রামে আমাদের অভিজ্ঞতায় পুনর্মূল্যায়ন করার সময় উদ্ভুত দুটো ধারাকে আমাদের মাথায় রাখতে হবে। একটা ধারা ছিল বিষয়ীগত প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হওয়ার আগে, অর্থাৎ সবদিক থেকে জনগণ প্রস্তুত হওয়ার এবং নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত পার্টি সংগঠন তৈরি হওয়ার আগে কোনো অবস্থায়ই সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার বিরোধী। এই ধারার যুক্তি মানলে নকশালবাড়িতে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করাটাই ভুল বলে স্বীকার করতে হয়। যে রূপেই এই ঝোঁক আত্মপ্রকাশ করুক না কেন, আসলে তা বিপ্লবের ছদ্মবেশে সংশোধনবাদী বিচ্যুতি ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের গত দশ বছরের প্রয়োগে আমরা অন্য একটা একই রকমের ভুলের শিকার হয়েছিলাম। ভাবতাম, বিষয়ীগত অবস্থা যাই হোক না কেন, তা কিছুতেই বিপ্লবের বিজয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এই মত অনুযায়ী, যেখানেই সম্ভব সেখানেই আমাদের সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করতে হবে আর তারপর নিজেই তা শক্তি সঞ্চয় করবে এবং নিশ্চিতভাবে লক্ষ্য অর্জিত হওয়া পর্যন্ত এগিয়ে যাবে। এটা যেহেতু সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত পতনের যুগ, তাই আমাদের পক্ষে শুধু একটা সংগ্রাম শুরু করাই যথেষ্ট, কারণ সংগ্রাম নিজেই তাঁর সমস্যা সমাধান করবে আর বিজয় অর্জন করা পর্যন্ত এগিয়ে যাবেএই চিন্তার ফলেই আমরা ভেবেছিলাম যে, সশস্ত্র সংগ্রাম সব সমস্যার সমাধান করতে পারে, জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করা বা পার্টি সংগঠনে সংহত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়ার প্রয়োজন নেই।”

উক্ত ভাবনার স্বাভাবিক প্রতিফলন ঘটেছিল পার্টি গঠন সংক্রান্ত অনুশীলনে। দলিলটি তাকে চিহ্নিত করলো সঠিকভাবে এবং কি কি সমস্যা হলো তা দেখালো। ওই দলিলে বলা হয়, “কঠোরভাবে লেনিনীয় নীতি অনুসরণ করে পার্টি গঠনের দিকটা অতীতে ভীষণভাবে অবহেলিত হয়েছিল। বস্তুত দেশের কিছু অংশে পার্টি সদস্য এবং বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বের একটা বড় অংশ কখনও পার্টি সংবিধান চোখে দেখেনি। এর ফলে অষ্টম পার্টি কংগ্রেসের পর থেকে কিছু অংশে একটা ভুল ধারণা গড়ে উঠতে শুরু করে এবং ১৯৭৩ সালের গোড়া থেকে দেশের কিছু অংশে একটা ভুল পদ্ধতি হিসেবে তা আরও বেড়ে উঠতে থাকেএ্যাকশান স্কোয়াডগুলোই পার্টি ইউনিটের সমার্থক হয়ে ওঠে। এর দুটো খারাপ ফল দেখা যায়। প্রথমত, পার্টিতে রাজনীতির ওপর জঙ্গীয়ানার আধিপত্য এবং দ্বিতীয়ত, পার্টির সাংগঠনিক রূপ (গোপনীয়তা) আর মতাদর্শগত মানে দুর্বলতা।”

উক্ত ভুল তিনটি থেকে যেসব ভুল ধারণা আমাদের মধ্যে তৈরি হয়, তা শেষ পর্যন্ত সংগ্রামে বেশ কিছু অপরিণত শ্লোগানের জন্ম দিয়েছিল– ‘পচাত্তর সালের মধ্যে ভারতবর্ষ মুক্তির মহাকাব্য রচনা করবে’। সম্প্রতি একটি মতান্ধতাবাদীদের পত্রিকায় একে যুক্তিগ্রাহ্য করে বলা হয়েছে, এটা নাকি একটা রাজনৈতিক ঘোষণা ছিল। তারা এটাকে দ্রুত বিজয়ের চিন্তার সঙ্গে জুড়তে নারাজ। বস্তুত, তাদের এই যুক্তি শুনতে যতই চিত্তাকর্ষক লাগুক না কেন তাঁর সঙ্গে মার্ক্সবাদের কোনো সম্পর্ক নেই। যেকোনো মার্ক্সবাদীর কাছে তা এক হাস্যকর যুক্তি বই কিছু নয়! বস্তুত, যুগের মূল্যায়ন সংক্রান্ত ভুল দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে কিভাবে দ্রুত বিজয়ের ধারণা আন্দোলনকে গ্রাস করেছিল, তা ইতিমধ্যেই বলা হয়েছে। আসলে মতান্ধতাবাদীরা এটা বোঝেন না যে, ‘অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ হয় না।’; তারা ভুলকে স্বীকার করতে সাহসী হয় না। একইভাবে আত্মরক্ষার যেকোনো চিন্তাকে সে সময় ‘সংশধনবাদী’ বলে চিহ্নিত করার প্রবণতা ছিল। ‘সংগ্রাম করতে সাহসী হও, আত্মত্যাগে নির্ভীক হও’মহান শিক্ষক মাওয়ের এই কথাকে যান্ত্রিকভাবে চর্চা করা হয়েছিল। বিপ্লবে আত্মত্যাগ অপরিহার্য, কিন্তু পাশাপাশি এটাও মাথায় রাখা উচিতযেকোনো যুদ্ধে জয়পরাজয়; আক্রমণপ্রতিরক্ষা; এগুলো পরস্পরের বিপরীত। শুধুই আক্রমণ করবো, প্রতিরক্ষার কথা ভাববো নাএই চিন্তা অদ্বান্দ্বিক। মাও বরং উল্টোটাই বলেছেন। তিনি গেরিলা যুদ্ধের নিয়ম দেখাতে গিয়ে বলেছেন, শত্রু যখন আক্রমণ করে বিপ্লবীরা তখন পিছু হঠে; শত্রু যখন আশ্রয় নেয়, বিপ্লবীরা তখন তাদের হয়রানি করে; শত্রু যখন পিছু হটে, বিপ্লবী বাহিনী তখন তাকে ধাওয়া করে। মাও আমাদের শিখিয়েছেন যুদ্ধের সবচেয়ে গোড়ার নীতি হলোনিজেদের শক্তিকে সংরক্ষণ করে শত্রুর শক্তিকে খর্ব করা। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল ঠিক এর উল্টোটাই।

) আমরা জানি বিপ্লব করতে আমাদের তিনটে যাদু দণ্ডের প্রয়োজনপার্টিগণফৌজযুক্তফ্রন্ট। এর মধ্যে আবার পার্টিই প্রধান, কারণ পার্টি বাকি দুটো যাদুদণ্ডকে পরিচালনা করে। মহান শিক্ষক মাও সেতুঙ তাই এটাও বলেছেন, পার্টির হাতে আছে দুটো তলোয়ার; একটা হলো গণফৌজ, অপরটি যুক্তফ্রন্ট। অতীতে এই পার্টি গঠনের কাজটাকেও আমরা অবহেলা করেছিলাম। পাশাপাশি যুক্তফ্রন্টের প্রশ্নেও সুবিধাবাদী ধারা এবং মতান্ধতাবাদী ধারার কারণে এই কাজটাও অবহেলিত হয়েছিল। ‘অতীতের সার সংকলন’ দলিলটিতে তার চমৎকার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। এ প্রসঙ্গে আমি দলিলটির একটি দীর্ঘ উক্তি তুলে ধরছি। দলিলটিতে বলা হয়েছে, “যদিও আমরা সর্বোতভাবে যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিয়েছিলাম, কিন্তু পরবর্তী ইতিহাস কিন্তু প্রমাণ করেছে যে, কীভাবে তা করতে হবে সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। কেবলমাত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হতে পারে এবং এভাবেই তা গড়তে হবে। সংগ্রামের একেবারে শুরু থেকে একে গড়ে তোলা শ্রমিকশ্রেণীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাঁর পরিবর্তে যদি বলা হয় যে, কয়েকটা মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগে অবধি যুক্তফ্রন্ট গঠন সম্ভব নয় এবং এটা কেবল তারপরেই সম্ভব, তাহলে বস্তুতপক্ষে বিপ্লবের বিজয়ের জন্য যুক্তফ্রন্ট প্রয়োজনীয়, এই সত্যকে নস্যাৎ করারই সামিল হয়ে দাঁড়ায়। এটা মারাত্মক ভুল। এই ভুলের জন্যই আমরা আমাদের পার্টি সদস্যদের যুক্তফ্রন্টের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি।

একইভাবে আমাদের পার্টি কর্মসূচীতে জাতীয় বুর্জোয়া এবং ধনী কৃষকদের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের অস্বচ্ছতা আর বিভ্রান্তির ফলে নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে নানারকম মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যা বিভ্রান্তিকে আরো বাড়িয়ে তোলে। ‘এ দেশের সমস্ত বুর্জোয়া প্রথম থেকেই মুৎসুদ্দি চরিত্রের’এ জাতীয় ধারণা পার্টির মধ্যে বিভ্রান্তিকে আরো চরমে তোলে। আর পার্টি তখন যুক্তফ্রন্টের গুরুত্ব উপলব্ধির জায়গায় ছিল না।

শ্রমিক, কৃষক, জাতীয় বুর্জোয়া (ছোটো ও মাঝারি) এবং মধ্যশ্রেণী, যাদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন সামন্ত ও মুৎসুদ্দি আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়াশ্রেণীর এবং সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব আছে, তারা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই না করলে, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারবে না। এই শ্রেণীগুলোর মধ্যে অনৈক্য থাকলে বিপ্লবের উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ঠিক এই কারণেই এদের প্রত্যেককে ঐক্যবদ্ধ লড়াই গড়ে তুলতে হবে। যুক্তফ্রন্ট হলো এমন একটা সংগঠনযা সংগ্রামের এই সমস্ত শ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে এবং তাদের সাধারণ লক্ষ্য, অর্থাৎ সামন্ত ও মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াশ্রেণীর হাত থেকে ক্ষমতা দখল করতে পারে।

যে শ্রেণীগুলো যুক্তফ্রন্ট গঠন করেছে তাদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব আছে। তাই তাদের মধ্যেও সংগ্রাম হবে, তা সত্ত্বেও তাদের শত্রু একই এবং তাদের একটা সাধারণ লক্ষ্যও আছে। তাদের সাধারণ লক্ষ্য হলোক্ষমতাসীন সামন্ত ও মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণী। তাদের সাধারণ লক্ষ্য হলোএদের থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া। তাই এদের মধ্যে ঐক্যের ভিত্তি আছে। সাধারণ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত একটা যুক্তফ্রন্টে সংগ্রাম ঐক্য দুইই থাকবে। যুক্তফ্রন্টের বিভিন্ন শ্রেণীর দ্বন্দ্ব যদি হয় সংগ্রামের ভিত্তি, তাহলে তাদের অভিন্ন লক্ষ্য হলো ঐক্যের ভিত্তি। এগুলো হলো যুক্তফ্রন্টের বাস্তব দুটো দিক, এ দুটোর মধ্যে কোনো একটাকে ভুলে গেলে বিপ্লবের ক্ষতি হবে। সাধারণ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ঐক্যের কথা ভুলে আমরা যদি শুধুমাত্র এই শ্রেণীগুলোর মধ্যেকার সংগ্রামে জড়িয়ে গিয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠি, তাহলে বাম বিচ্যুতিতে পড়ার সম্ভাবনা থাকছে। আবার শুধুমাত্র ঐক্যের কথা ভেবে যুক্তফ্রন্টের শোষক শ্রেণীগুলোকে সন্তুষ্ট করার জন্য শোষিত শ্রেণীর ন্যুনতম দাবিকে অগ্রাহ্য করলে দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতির সম্ভাবনা। পার্টি কংগ্রেসের পর বিভিন্ন সময়ে পার্টি নেতৃত্বের এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন বিবৃতি আমাদের পার্টি সদস্যদের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরির পরিবর্তে বাম বিচ্যুতির ভুল ধারণা তৈরি করেছে। ”

) অতীতের সংগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ছিল ‘শ্রেণীশত্রু খতমকে শ্রেণী সংগ্রামের একমাত্র লাইন’ হিসেবে দেখা এবং সংগ্রামের অন্যান্য লাইনকে নাকচ করে দেওয়া। এর পেছনেও ছিল সেই নতুন যুগ এবং ‘লেনিনীয় কৌশল সেকেলে হয়ে পড়েছে’ এই বিষয়ীগতবাদী ধারণা। প্রসঙ্গত বলা দরকার, শ্রেণী সংগ্রামের শুরুর দিন থেকেই শ্রেণীশত্রুর বিরুদ্ধে খতমকে একটা রণকৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে মেহনতি জনতা। সংগ্রামের কোনো স্তরে কোনো রূপই কমিউনিস্ট পার্টির মস্তিষ্কপ্রসূত কোনো ব্যাপার নয়। শ্রেণীশত্রু খতমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। পাশাপাশি যেকোনো দেশে, যেকোনো কালে, সংগ্রামের একটি নির্দিষ্ট কৌশলকেই একমাত্র পদ্ধতি হিসেবে বেছে নেওয়ার অর্থ হলো জনগণের সৃজনশীলতাকেই অস্বীকার করা। সংগ্রামের ক্ষেত্রে জনগণের সৃজনশীলতার দ্বারকে অবরুদ্ধ করা। বস্তুত আমাদের দেশের অসম বিকাশের কথাটি তাত্ত্বিকভাবে স্বীকার করলেও সেদিনের বিপ্লবী নেতৃত্ব একদিকে যেমন তা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল; পাশাপাশি ‘নতুন যুগের নতুন রণকৌশল’ এই তত্ত্ব হাজির হওয়ার পর ‘লেনিনের যুগের রণকৌশল বাতিল হয়ে গেছে’ এই ভ্রান্তি থেকে ধারণা জন্মায়গণসংগ্রাম, আংশিক দাবি দাওয়ার সংগ্রামের আর কোনো প্রয়োজন নেই। আমি এই লেখার শুরুতে দেখিয়েছি যে, চারু মজুমদারই প্রথম এ দেশের কমিউনিস্ট বিপ্লবী রাজনীতিতে গণসংগঠনগণআন্দোলন সম্পর্কিত সঠিক বিপ্লবী ধারণাটি স্পষ্টভাবে সামনে এনেছিলেন। একেবারে শুরুর দিকে তার মধ্যে ‘নতুন যুগ’ এই ধারণাটিও ছিল না। পরবর্তীতে এই যুগের ধারণা; জাতীয়আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিষয়ীগতবাদী বিভ্রম ইত্যাদি থেকে এই ভুলের জন্ম হয়েছিল।

বস্তুত শ্রেণীশত্রু খতমের ধারণা নতুনও নয় এবং তা জনগণের সংগ্রাম থেকেই উঠে আসা একটা হাতিয়ার, তাই তা বর্জনেরও প্রশ্ন নেই, কিন্তু ভুল হচ্ছে খতমকে শ্রেণী সংগ্রামের একমাত্র রাস্তা হিসেবে ভাবা। ‘অতীতের সারসংকলন’ দলিলে তাই বলা হয়েছে, “ভুলটা রয়েছে খতমকে এমন একটা লাইন হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যে, যা সংগ্রামের অন্যান্য সমস্ত রূপকে অর্থনীতিবাদ আর শ্রেণী সংগ্রামের প্রতিবন্ধক হিসেবে বাতিল করে। অতীতের সাফল্য এবং সীমাবদ্ধতা বিচার করার সময় আমরা যদি বলি যে শ্রেণীশত্রু খতমকে সংগ্রামের একটা রূপ হিসেবে দেখাটাই ভুল হয়েছে, তাহলে বাস্তবকে উল্টো করে দেখা হবে। এভাবে দেখলে আমরা একটা রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে সম্পূর্ণ অন্য রোগের ওষুধ দিয়ে বসবো। বস্তুত শ্রেণীশত্রু খতমকে সংগ্রামের একটা রূপ হিসেবে গ্রহণ করাটা ভুল হয়নি। ভুল হয়েছে নির্দিষ্ট অবস্থা নিরপেক্ষভাবে, অর্থাৎ ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলে শ্রেণীসংগ্রামের একটা অস্ত্র হিসেবে একে প্রয়োগ করার প্রয়োজন আছে কি না, তা বিবেচনা না করেই একে গ্রহণ করাটা।”

এই ভুলের হাত ধরেই এসেছিল গণসংগ্রামগণসংগঠন বয়কটের লাইন। এর ফলে মুখে জনগণকে সত্যিকারের ‘লৌহপ্রাকার’ হিসেবে বলা হলেও গণআন্দোলনের প্রতি ধীরে ধীরে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করায় ব্যাপক জনগণকে বিপ্লবী পার্টির চারধারে জড়ো করার এবং বিপ্লবে সামিল করানোর দায়িত্বপূর্ণ কাজটায় শেষ বিচারে সংগ্রামে ব্যর্থতা থেকেছে। শহরাঞ্চলে ব্যাপক ছাত্রযুবকে উদ্বুদ্ধ করতে পারলেও শেষ অবধি গণকার্যকলাপ থেকে সরে আসার এবং চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পর্কে ভুল ধারণার ফলে মূর্তিভাঙা, স্কুল পোড়ানোর ইত্যাদির লক্ষ্যে স্কোয়াড এ্যাকশানের ওপর জোর দিতে শুরু করে, ফলে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বহু মিত্র আন্দোলন থেকে দূরে সরে যায়।

) সংগ্রামের অনতিবিলম্বেই যেহেতু নানা আধিবিদ্যক, বিষয়ীগতবাদী ধারা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে, সঙ্গতভাবেই তার প্রভাব পার্টিতেও এসে পড়ে। আগেই আলোচনা করেছি, কিভাবে মার্ক্সবাদী চিন্তার আলোকে যৌথ নেতৃত্বের জায়গায় চারু মজুমদারের ব্যক্তি ‘কর্তৃত্ব’এর লাইন নিয়ে এসেছিল সৌরেন বসু, অসীম চ্যাটার্জীরা। অতীতের সারসংকলন দলিলে সঠিকভাবেই এই ভুলকে চিহ্নিত করা হয় এবং বলা হয়, “মানব সভ্যতার বিকাশে জনগণ এবং ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে আধিবিদ্যক ধারণার জন্যই আমাদের ব্যক্তি কর্তৃত্ব সম্পর্কে এই ভুল ধারণা হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই এই ভুল ধারণা পার্টি সংগঠনে আমলাতান্ত্রিকতার জন্ম দিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে দলিলটিতে বলা হয়েছে, “ শুরু থেকেই আমাদের পার্টিতে সমাজ বিকাশের সম্পর্কে আধিবিদ্যক ধারণা ছিল, তার ফলে রাজনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রের মতো পার্টি সংগঠন সংক্রান্ত ব্যাপারেও বেশ কিছু ভুল হয়েছিল। বিশেষ করে) আমলাতান্ত্রিক ঝোঁক পার্টির অগ্রণী কমিটিগুলোতে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার ক্ষতি করেছিল, যা ক্রমশ পার্টির ওপর ব্যক্তি কর্তৃত্বের ভুল প্রবণতার দিকে চলে যায়। খ) আত্মসমালোচনা এবং প্রয়োগ থেকে শিক্ষা নেওয়ার পদ্ধতি প্রায় উঠেই যায়। গ) পার্টি কমিটিগুলোর কাজ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘ) প্রয়োগ থেকে উঠে আসা মতপার্থক্য সমাধান করার ক্ষেত্রে সংকীর্ণ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়ে থাকে।”

মোটের উপর এইগুলোই ছিল মূল মূল কৌশলগত ভুল।

চারু মজুমদারের মূল্যায়ন

নকশালবাড়ির আন্দোলনের প্রধান তাত্ত্বিক নেতা ছিলেন চারু মজুমদার। তাঁর মূল মূল অবদানগুলো এই লেখার শুরুতেই আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব নেতারা বিপর্যয়ের যাবতীয় দায় চারু মজুমদারের উপর চাপিয়ে দিয়ে পলায়নকেই শ্রেয় মনে করেছেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গীকেও উন্মোচিত করার একটা প্রয়াস এ লেখায় নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এতদসত্ত্বেও নকশালবাড়ি আন্দোলনের সাফল্যের সিংহভাগ কৃতিত্ব যেমন চারু মজুমদারের, তেমনই ব্যর্থতার দায়ও অনেকাংশেই তাঁর। ‘অতীতের সারসংকলন’ দলিলটিতে খুব চমৎকারভাবে তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। চারু মজুমদারের ভুলের উৎসের অনুসন্ধান করতে গিয়ে দলিলটিতে বলা হয়েছে, “একটা প্রশ্ন উঠবেই যে, তাঁর (চারু মজুমদার) এই সমস্ত ভুলগুলো কি শুধুই বস্তুগত পরিস্থিতির জন্য? আসলে, এই পরিস্থিতিতেও ভুলগুলো অনিবার্য ছিল না। এরকম ভাবাটা মার্ক্সবাদ সম্মত নয়। কমরেড স্তালিনের ক্ষেত্রে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বলেছিল, ‘শুধুমাত্র বস্তুগত পরিস্থিতিই ভুলের পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি নয়। ভুলগুলো যিনি করেছেন, তাঁর চিন্তাপদ্ধতিই এজন্য মূলত দায়ী। ’ এই বস্তুগত উপাদানগুলোই ভুলের সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়। স্তালিনের চেয়ে অনেক জটিল পরিস্থিতির মধ্যেও লেনিন স্তালিনের মতো ভুল করেননি। এখানে ব্যক্তির চিন্তাপদ্ধতিই হলো নির্ণায়ক। তাঁর জীবনের শেষদিকে ক্রমাগত বিজয়ের এবং প্রশস্তির ফলে কমরেড স্তালিনের মাথা ঘুরে গিয়েছিল। কিন্তু চিন্তার দিক থেকে তিনি আংশিকভাবে, কিন্তু বিপজ্জনকভাবে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ থেকে সরে গিয়ে ভাববাদের খপ্পরে পড়েছিলেন (সর্বহারা একনায়কত্বের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আরো কিছু কথা) …কমরেড চারু মজুমদারের ক্ষেত্রেও একথা সত্যি। তাঁর চিন্তা পদ্ধতির ত্রুটির ফলে যুগের চরিত্র এবং আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিস্থিতির মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর ভুল হয়েছিল। এটাই ছিল তাঁর ভুলের উৎস। তার ওপরেও সংগ্রামের প্রাথমিক পর্যায়ে সংগ্রামে ক্রমাগত সাফল্য এবং পার্টি সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রবল আস্থা, শ্রদ্ধা আর প্রশস্তির ফলে তিনি বিনয় হারিয়ে ফেলেছিলেন, যা কমিউনিস্ট ঐতিহ্যের বিরোধী। ক্রমশ তিনি আরো বেশি বেশি করে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী চিন্তা থেকে দূরে সরে যেতে থাকলেন এবং ভাববাদের শিকার হয়ে পড়লেন। কোনো দ্বন্দ্ব সমাধানের ক্ষেত্রে তাঁর বিপরীতমুখী দিকগুলোর থেকে উদ্ভুত ফলাফলের উপর নির্ভর না করে, তিনি সেই সব দ্বন্দ্বের ফলাফল সম্পর্কে নিজস্ব চিন্তার উপর নির্ভর করা শুরু করলেন। সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে রূপায়িত হবার আগেই তাকে বাস্তব বলে ধরে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করলেন। এ সমস্তই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি বিরোধী। এটা আসলে ভাববাদী ধারা। তাঁর সমস্ত ভুলের প্রধান কারণ রয়েছে তাঁর এই চিন্তাপদ্ধতির মধ্যেই। বস্তুগত পরিস্থিতি তাঁকে সহযোগিতা করেছে মাত্র।

তা সত্ত্বেও তাঁর সাফল্য এবং ব্যর্থতাকে নিরপেক্ষভাবে দেখলে তাঁর সাফল্যগুলোই প্রধান আর ব্যার্থতাগুলো গৌণ। তাঁর উপলব্ধি এবং প্রয়াসের ফলে ভারতীয় বিপ্লবের ক্ষতির চেয়ে লাভ বহুগুণ বেশি হয়েছে। মূলগতভাবে তিনি হলেন একজন মার্ক্সবাদীলেনিনবাদী, একজন মহান বিপ্লবী, শোষিত জনগণের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় নেতা, যিনি ভারতীয় বিপ্লবকে নতুন পথে পরিচালনা করেছিলেন। তিনি একজন বিপ্লবীর জীবন যাপন করেছেন এবং বিপ্লবীর মৃত্যুই বরণ করেছেন। তাঁর নাম আজও বিপ্লবীদের প্রেরণার উৎস। ”

ঘটনা হলো যে, সংগ্রাম ধাক্কা খাওয়ার অনতিবিলম্ব পরেই এই মহান বিপ্লবী তা উপলব্ধি করতে শুরু করেন এবং তাঁর ভাবনার মোড়ও সে কারণে সঠিকভাবেই পরিবর্তিত হচ্ছিল ‘জনগণের স্বার্থই পার্টির স্বার্থ’ শিরোনামে তার শেষ লেখায় যার ইঙ্গিত ছিল। এই লেখায় তিনি নির্দ্বিধায় সশস্ত্র আন্দোলন যে ধাক্কা খেয়েছে, তা স্বীকার করেন তিনি। যদিও বস্তুগত পরিস্থিতি যে চমৎকার তাঁর উল্লেখ করে সংগ্রামের পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে সঠিকভাবেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। পাশাপাশি ঐ লেখায় তিনি যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, “আজ কর্তব্য হচ্ছে ব্যাপক মূল জনগণের মধ্যে পার্টি গঠন করার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং লড়াইয়ের ভিত্তিতে জনগণের ব্যপকতম অংশের সঙ্গে যুক্তমোর্চা প্রতিষ্ঠা করা। এমনকি, যারা এক সময়ে আমাদের প্রতি শত্রুতা করেছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে তারাও আমাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হতে এগিয়ে আসবে। এসব শক্তির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মতো মনের প্রসারতা আমাদের রাখতে হবে। মনের প্রসারতা কমিউনিস্টদের গুণ। জনগণের স্বার্থই আজ ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের দাবি জানাচ্ছে। জনগণের স্বার্থই পার্টির স্বার্থ। ”

গ্রেপ্তার হওয়ার মাত্র দু’দিন আগে স্ত্রীর কাছে লেখা চারু মজুমদারের শেষপত্রে চারু মজুমদার লেখেন, “ভিয়েতনাম ডেতে একটা মিছিল বের করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মিছিলটা হবে শ্রমিক কমরেডদের নিয়ে। ২০ শে জুলাই। কাগজে নিশ্চয়ই বেরোবে। আমাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম বড়ো কম হচ্ছে। তার কারণে খতমের উপর বড় বেশি জোর পড়ে গিয়েছে। এটা বিচ্যুতি। এই বিচ্যুতি আমরা কাটিয়ে উঠছি। পার্টির মধ্যে সমালোচনা বেড়েছে, কাজেই সংশোধিত হবে। আমাদের পার্টি অল্পদিনের, অভিজ্ঞতাও কম, ফলে বিচ্যুতি হওয়াটা স্বাভাবিক। কমরেডদের নজরে পড়েছে বিচ্যুতি, এটাই শুভ লক্ষণ।”

নকশালবাড়ির মতো একটি গৌরবোজ্জ্বল আন্দোলনের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এটাই হচ্ছে সঠিক পদ্ধতি। যা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) করেছে। তারা অতীত সংগ্রামের ইতিবাচক দিক কে ঝেড়ে ফেলে দিতে চায়নি, আবার নেতিবাচক দিককে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের নিরিখে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোনো ভুল করেনি। তারা নকশালবাড়ি আন্দোলনের ব্যর্থতার দায় খুঁজেছেন লাইনের কৌশলগত দিকে এবং নকশালবাড়ি আন্দোলনের নেতা কমরেড চারু মজুমদারকেই ব্যক্তি হিসেবে আন্দোলনের ব্যর্থতার সব দায় দিয়ে বিলোপবাদী অবস্থান নেয়নি। এটাই ইতিহাসকে পর্যালোচনা করার দ্বান্দ্বিক নিয়ম।

আগ্রহী পাঠকগণ সিপিআই (মাওবাদী)-র দলিলটি পড়ে দেখতে পারেন। অথবা আমাদের দেশে উৎস পাবলিশার্স কর্তৃক প্রকাশিত, সব্যসাচী গোস্বামী লিখিত প্রসঙ্গ ‘প্রসঙ্গ নকশালবাড়ি পঞ্চাশ বছরের গৌরবময় পথচলা’ বইটি পড়ে দেখতে পারেনআজকের দিনে মাওবাদীরা নকশালবাড়িকে কিভাবে মূল্যায়ন করছে।

ভাস্কর নন্দীকেও বদরুদ্দীন উমর মূল্যায়ন করেছেন নিছক ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা থেকে। ভাস্কর নন্দী রাজনৈতিক জীবনে কি ভূমিকা রেখেছেন সেসব মূল্যায়ন তিনি করেননি। একইভাবে ক. সিএম ও নকশালবাড়ি আন্দোলনের মূল্যায়ন তিনি করেছেন ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে। বদরুদ্দীন উমর তার সমগ্র জীবনব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলনকে মূল্যায়ন করেছেন এক ভ্রান্ত ব্যক্তিবাদী লাইন দ্বারা। তার এই ভ্রান্তির উৎপত্তিস্থল যদি আমরা অনুসন্ধান করি, তাহলে দেখতে পাবোতিনি মতাদর্শিকভাবে মার্ক্সবাদকে ধারণ করেন না, যা আজকের আজকের দিনে মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদ। আর মার্ক্সবাদের এই বিকাশ ধারণ না করলে বাস্তব অবস্থার সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়। কারণ নতুন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে তিনি ব্যর্থ হবেন। আন্দোলনকে একটি সঠিক দৃষ্টিতে দেখতে তিনি ব্যর্থ হবেন। শুধু বদরুদ্দীন উমরই নন। তাঁর মতো যারাই মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদের বিকশিত তত্ত্ব গ্রহণ করতে পারেননি, তাঁদের কেউই নতুন পরিস্থিতিতে বিপ্লবী থাকতে পারেননি।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.