লিখেছেন: সব্যসাচী গোস্বামী

যে স্বপ্ন দেখে না এবং অন্যকে স্বপ্ন দেখাতে পারে না সে বিপ্লবী হতে পারে না।”

সে অনেক বছর আগের কথা। কমিউনিস্ট আন্দোলনের একজন মহান শিক্ষক আমাদের বোকাবুড়োর গল্প শুনিয়েছিলেন। সে গল্প শুনে এদেশে এক বোকাবুড়ো শুরু করেছিলেন পাহাড় সরানোর কাজ। তাঁর ডাকে হাজার হাজার দেবদূত এসেছিলেন এ কাজে অংশ নিতে। তাঁরা প্রাণ দিয়েছিলেন কখনো পুলিশের গুলিতে; কখনো জেলের অন্ধুকুঠুরিতে; কখনো শাসক দলের গুন্ডা বাহিনীর হাতে। কেউ কেউ জীবনের দীর্ঘদিন কাটিয়েছিলেন কারান্তরালে। তাদের মধ্যে আজ কেউ কেউ পাহাড় সরানোর স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছেন। আজ তাঁরা গাইতিকোদাল নিয়ে ‘হেই সামালো’ হেঁকে চালিয়ে যাচ্ছেন পাহাড় সরানোর কাজ।

ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের বয়স নয় নয় করেও বিরানব্বইচুরানব্বই বছর হয়ে গেলো। কিন্তু আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ঘটে যাওয়া নকশালবাড়ির ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক ছাত্রযুবদের মধ্যে যে আলোড়ন তুলেছিল, তা এক কথায় বললেঅভূতপূর্ব। আত্মত্যাগের এ যেন এক আলোকোজ্জ্বল অধ্যায়। এই আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন সেই বোকাবুড়ো। কি ছিল তাঁর আবেদনে, যা শুনে হাজার হাজার ছাত্রযুব ক্যারিয়ারের মোহ ত্যাগ করে, ঘরবাড়ি, পরিবারপরিজন ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এই পাহাড় সরানোর মহাযজ্ঞে।

কিছু আত্মশ্লাঘাপ্রিয় মানুষ বাদ দিয়ে এ কথা আজ সবাই স্বীকার করে নেবেন যে, নকশালবাড়ির মহান সংগ্রামের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন এই মানুষটিই। তাঁর লেখা ঐতিহাসিক আটটি দলিলেই তিনি ভারত রাষ্ট্রের শ্রেণীচরিত্র, ভারতীয় বিপ্লবের স্তর নির্ণয়, বিপ্লবের শত্রুমিত্র চিহ্নিত করে ভারতীয় বিপ্লবের রাজনৈতিক এবং সামরিক রণনীতি, সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে দেশীয় এবং আন্তর্জাস্তিক স্তরে কঠোর সংগ্রাম চালানোর রূপরেখা, অর্থনীতিবাদ থেকে মুক্ত হয়ে গণসংগঠনগণসংগ্রামের বিপ্লবী দিশা কি হবেইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোকপাত করেছিলেন। পাশাপাশি জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে গড়ে ওঠা সংগ্রামগুলোকে বিছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ সমর্থন করেছিলেনএক কথায় এ দেশের বিপ্লবের রূপরেখাটিকে তিনিই প্রথম পূর্ণাঙ্গভাবে সামনে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।

নকশালবড়ির সংগ্রাম ঘটে যাওয়ার আগেই ১৯৬৫ সালের ২৮ জানুয়ারি থেকে ১৯৬৭ সালের এপ্রিল অবধি ঐতিহাসিক আটটি দলিলে ই বিষয়গুলোকে তিনি সামনে এনে ফেলেছিলেন। বস্তুত তাঁর দেখানো এই বাস্তব অবস্থার মূর্ত বিশ্লেষণই নকশালবাড়ির জন্ম দিয়েছিল। তারপরও তিনি অনেক লেখালেখি করেছেন। সেই সব লেখাপত্রের তাত্ত্বিক দিকগুলো নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, আজ চলছে। আমার এ লেখা তা নিয়ে আলোচনার জন্য নয়। পরবর্তী প্রজন্মের একজন শিক্ষানবিশ হিসেবে আমি খুঁজতে চাইছি তাঁর লেখার সাহিত্যের দিকটাকে। কি ছিল তাঁর এসব লেখনীতে, যা কিনা হাজার হাজার মানুষকে, বিশেষত ছাত্রযুবদের টেনে এনেছিল বিপ্লবী আন্দোলনের ময়দানে?

প্রথমেই বলে রাখা দরকার, শিল্পসাহিত্য নিয়ে কোনো কেতাবি আলোচনা করার অভিপ্রায় আমার নেই। সেই সাধ্যও আমার নেই। আমি শুধু এক্ষেত্রে আমার যা যা চোখে পড়েছে সেটুকুকেই বলতে পারি মাত্র।

তাঁর লেখা যে রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সত্যকে প্রতিনিধিত্ব করেছে, এ নিয়ে আমার কোনো সংশয় নেই। কিন্তু এ লেখায় সে সম্পর্কে আমি আলোচনাও করছি না। তাঁর লেখাগুলোর সাহিত্যমূল্যের ক্ষেত্রে কিছু বৈশিষ্ট্য চোখে পড়েছে। আমার মনে হয়েছে, এই বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে দৃষ্টি না দিলে তাঁকে মূল্যায়নের একটা বিশেষ দিককে অবহেলা করা হবে।

তাঁর লেখার প্রথম বৈশিষ্ট্য হলোসহজ, প্রাঞ্জল ভাষায় অত্যন্ত অল্প কিছু শব্দ এবং বাক্য খরচ করে তিনি সার কথাটিকে খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপনা করতে পারতেন। সাধারণভাবে দলিল লেখার কথা শুনলেই দিস্তা দিস্তা পাতা খরচ করে লেখাপত্তরের কথা আমাদের মাথায় আসে। কিন্তু খুবজোর ২০ পাতার মধ্যে তিনি লিখে ফেলেছিলেন ঐতিহাসিক আটটি দলিল। একেকটি দলিল ২ পাতা, ৩ পাতা বড় জোর ৪ পাতা। অথচ তাঁর মধ্যে যেমন ছিল দিনদুনিয়ার হালহকিকতের বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা। তেমনি ছিল বিপ্লবের দিশা। পার্টি, গণসংগ্রাম সংক্রান্ত একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ কর্মনীতি। ছিল মতাদর্শগত স্পষ্ট এবং সঠিক অবস্থানের সোচ্চার ঘোষণা। রাজনৈতিক যুক্তির ধারালো সওয়ালের সাথে মিশেছিল আবেগ। এই যুক্তি আর আবেগের মেলবন্ধন ছিল তাঁর লেখার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, তাঁর ঐতিহাসিক আটটি দলিলের দ্বিতীয় দলিলে আমরা দেখছি পূর্বেকার ঐতিহাসিক কৃষক সংগ্রামগুলোকে সারসংকলন করতে গিয়ে তিনি লিখছেন– “আমি দেখেছি সামান্য একটা চিরকুটে ১০ মাইল দূরের লোককে পাগলের মতো ছুটে আসতে। অপরদিকে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে এও আমি দেখেছি যে, নববিবাহিতা মুসলমান যুবতীর উপর শ্রেণীশত্রুর পৈশাচিক বর্বর অত্যাচার। আমি দেখেছি, সেই নিরস্ত্র স্বামীর কাতরমিনতি, “কমরেড বদলা নিতে পারবি না?” পরমুহূর্তে দেখেছি শোষকের প্রতি শোষিতের তীব্র ঘৃণা। দেখেছি নির্বিকার চিত্তে জীবন্ত মানুষের ঘাড় মটকে মেরে ফেলার সেই ভয়াবহ দৃশ্য। কমরেড, উপরের দৃশ্যগুলো আমাদের কাছে কতকগুলো বিশ্লেষণ দাবী করে

প্রথমত, কোন ঐতিহাসিক কারণ থাকার ফলে সেদিন সেই আন্দোলনের বিশাল রূপ ও শ্রেণীশত্রুর প্রতি তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি করতে পেরেছিল?

দ্বিতীয়ত, কিইবা সেই কারণগুলো, যা সেদিনকার সেই বিশাল আন্দোলনকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করেছিল?”

তারপর তিনি ব্যাখ্যা করছেন যে, একদিকে কৃষকের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বিপ্লবী নেতৃত্বের এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের রাজনীতিকে উপলব্ধি না করতে পারার অভাব, এই দুইর দ্বন্দ্ব তথা স্ববিরোধ কি করে কার্যকারণ সম্পর্ক হয়ে উক্ত দুটি বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে!

তাঁর লেখনীর তৃতীয় বৈশিষ্ট্য ছিল আশাবাদ। যার সাথে যুক্ত হয়েছিল তাঁর লেখনীর চতুর্থ বৈশিষ্ট্যটি তা হলো মতাদর্শগতভাবে অনুপ্রেরণার উপাদান।

তাঁর লেখার ছত্রে ছত্রে আমরা পাব সেই আশাবাদের প্রতিফলন। ১৯৬৭ সালেই তিনি লিখেছেন, “অন্ধকার দেখে ভয় পেয়ো না, বিচ্ছিন্নতা দেখে সাহস হারিয়ো না, কান পেতে শোনো মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মহান নেতা চেয়ারম্যানের অভয় বাণী– ‘সত্য প্রায়শই অল্প সংখ্যক লোকের মধ্যে নিহিত থাকে।’ বুঝতে চেষ্টা করো, চেয়ারম্যানের মহান উপলব্ধি– ‘জনগণ বিপ্লব চান।’ তোমাদের কোন প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হবে না। পাহাড়ের গায়ে বরফের টুকরোটাকে সরাতে গেলে অনেক ব্যর্থ আঘাতের পরই সে হঠাৎ এক আঘাতে সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ে; কঠিন ও কঠোর প্রচেষ্টা ছাড়া কোনো কাজ সফল হয় না।” [চারু মজুমদার রচনাবলী, ইস্তেহার প্রকাশনী]

কিংবা লিখেছেন, “কোনো কোনো সময় আমাদের মনে হবে যে, আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি, জনগণ আমাদের কথায় কান দিচ্ছে না; তা দেখে ভয় পেলে ভুল হবে; বিপ্লবের বিকাশের নিয়মই হলো তা। অন্ধকারের মধ্যে যিনি আলোর নিশানা দেখাতে পারেন, তিনিই হলেন প্রকৃত বিপ্লবী; আর এখানেই হলো পার্টির সচেতন ভূমিকা।” []

শ্রীকাকুলাম কি ভারতের ইয়েনান হতে চলেছে!” শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি শ্রীকাকুলামের কমরেডদের সাথে মিটিং করে ফিরে আসার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে লিখছেন, “বিদায় নেবার সময় মনটা হঠাৎ খারাপ লাগলো। এই কমরেডদের সঙ্গে আবার দেখা হবে কিনা কে জানে? হীদের মন্ত্রে দীক্ষিত এই বিপ্লবী কমরেডরা লড়াইয়ের ময়দানে গিয়ে নামবেনকে বেঁচে থাকবেন, কে থাকবেন না জানি না; কিন্তু এটা জানিএদের নাম ভারতবর্ষ কোনোদিন ভুলবে না।

হঠাৎ চোখের সামনে দেখলাম অন্ধকার ভারতবর্ষ যেন দূর হয়ে গেল, উজ্জ্বল সূর্যালোকে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে আমার দেশ ভারতবর্ষ, জনগণতান্ত্রিক ভারতবর্ষ, সমাজতান্ত্রিক ভারতবর্ষ। শ্রীকাকুলাম লড়ছে, সারা অন্ধ্র কাল লড়বে, তারই প্রতিশ্রুতি পেলাম যেদিন ফিরে আসছি সেদিনের খবরের কাগজে: একজন শ্রেণীশত্রু কৃষক গেরিলাদের আক্রমণের শিকার হয়েছে। শ্রীকাকুলাম এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে।”

আশাবাদ যদিও মানুষের অনুপ্রেরণার অন্যতম উপাদান, কিন্তু একমাত্র উপাদান নয়। সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করতে প্রয়োজন মতাদর্শের তাগিদও। সম্ভবত তিনিই এ দেশের প্রথম বিপ্লবী, যিনি মতাদর্শগতভাবে বিপ্লবের প্রশ্নে আত্মত্যাগের, আত্মস্বার্থ ত্যাগের বিষয়টিকে জোরের সাথে সামনে এনেছিলেন? বলাবাহুল্য fight against selfআত্মস্বার্থের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করো’ লাল চীনের মহান সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লবের শিক্ষার অনুপ্রেরণা থেকেই তিনি এক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তাই, “প্রকৃত কমিউনিস্ট হবার তাৎপর্য কী?” তা বোঝাতে গিয়ে ১৯৬৯ এর ১২ মার্চের একটি ছোট্ট লেখায় তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারাটাই কমিউনিস্ট হবার একমাত্র মাপকাঠি নয়। কে প্রকৃত কমিউনিস্ট? যিনি জনগণের জন্য আত্মত্যাগ করতে পারেন এবং এই আত্মত্যাগ কোনো বিনিময়ের প্রত্যাশা করে নয়। দুটো পথহয় আত্মত্যাগ, নয় আত্মস্বার্থ। মাঝামাঝি কোনো রাস্তা নেই।প্রকৃত কমিউনিস্ট হতে গেলে এই আত্মত্যাগ আয়ত্ব করতে হবে।তাই বিপ্লব মানে শুধু বৈষয়িক লাভ নয়। বিপ্লব মানে এই রূপান্তরউপলব্ধির, আদর্শের, চিন্তাধারার রুপান্তর। বিপ্লব মানে চেতনার আমূল রূপান্তর। কী সেই চেতনা? জনগণকে সেবা করার চেতনা, আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হওয়ার চেতনা, জনগণকে ভালবাসার চেতনা। বিপ্লব মানেই এই রূপান্তরকি সমাজের, কি ব্যক্তির।”

১৯৬৯ সালের ১৩ মার্চ একটি চিঠিতে তিনি লেখেন, “বিপ্লব করতে হলে বিপ্লবী কর্মীকে ত্যাগ স্বীকার করতে শিখতে হবে, ত্যাগ করতে হবে সম্পত্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য, ত্যাগ করতে হবে পুরোনো অভ্যাস এবং নামের আকাঙ্ক্ষা, ত্যাগ করতে হবে মৃত্যুভয় এবং সহজ পথে চলার চিন্তা; তবেই আমরা বিপ্লবীদের শ্রমসাধ্য দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করতে পারবো; তবেই আমরা জনতাকে উদ্বুদ্ধ করতে পারবো মহত্তর ত্যাগে, যার আঘাতে সাম্রাজ্যবাদ, সংশোধনবাদ এবং ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ধ্বংস হবে এবং বিপ্লব সফল হবে।”

পার্টির লাইনের উপর সংশোধনবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে” প্রবন্ধে তিনি সংশোধনবাদের আত্মসমপর্ণবাদী লাইনের সাথে প্রকৃত বিপ্লবী লাইনের বিভাজন রেখা টানতে গিয়ে বিষয়টা আর স্পষ্ট করলেন। লিখলেন, “সংশোধনবাদের সঙ্গে বিপ্লবের প্রধান ভেদটা হচ্ছে এখানে যে, সংশোধনবাদীরা সংগ্রাম করার পূর্ব শর্ত হিসাবে জয়লাভের গ্যারান্টি দাবি করে থাকে, আর বিপ্লবীরা লড়াই করতে সাহসী হয়, বিজয় অর্জনে সাহসী হয়। বিপ্লবীরা পরাজয়কে ভয় পায় না। চেয়ারম্যান আমাদের শিখিয়েছেন, ‘লড়ো, ব্যর্থ হলে আবার লড়ো, আবার ব্যর্থ হলে আবার লড়োযতক্ষণ না জয়লাভ করতে পারো’।এটি হচ্ছে আরেকটি মার্কসবাদী নিয়ম।”

কেশপুরে জোতদার খতম করে ফেরার পথে তিনজন কমিউনিস্ট বিপ্লবী গুরুদাস, সুদেব, শশী শহীদ হ। ঘটনায় অনুতপ্ত হয়ে বাংলাবিহারওড়িষ্যা সীমান্ত আঞ্চলিক কমিটির ভারপ্রাপ্ত কমরেড (অসীম চ্যাটার্জী) চারু মজুমদারকে চিঠিতে তাঁর অনুশোচনা ব্যক্ত করলে, তাঁর এই মধ্যবিত্ত দোলাচলকে কাটিয়ে তুলতে চারু মজুমদার যে চিঠিটা দেন, তাতে এই আত্মত্যাগের বিষয়টা তাঁর লেখনীতে যেন আর উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আবেগ আর আদর্শবোধের এ যেন এক আশ্চর্য মেলবন্ধন। তিনি লেখেন, “কমরেড, রক্ত ঝরা পথই তো একমাত্র বিপ্লবের পথ। মানুষের মুক্তির জন্য মূল্য দেব না এ তো হতে পারে না। আমাদের উপর প্রত্যেকটি আঘাতই বেদনাদায়ক এবং বেদনা থেকেই জন্ম নেয় মহত্তর ত্যাগের দৃঢ়তা এবং শত্রুর প্রতি তীব্রতম ঘৃণাএ দুটো জিনিস যখন চেয়ারম্যানের চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখনই সৃষ্টি হয় সেই নতুন মানুষযে মানুষের জন্মের দিকে তাকিয়ে আছে সারা ভারতের অত্যাচারিত, নিপীড়িত মানুষ, দেশের কোটি কোটি দরিদ্র ভূমিহীন কৃষক, এই দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষক যেদিন জন্ম দেবে সেই নতুন মানুষকে তাদের নিজেদের মধ্যে, সেদিন সমস্ত চোখের জল মুছে সারা ভারতবর্ষের মানুষ হেসে উঠবে, সে কী প্রবল প্রাণবন্যা বয়ে যাবে সারা ভারতবর্ষে, উজ্জ্বল তারার মতো জ্বলে উঠবে আমাদের দেশসারা পৃথিবীকে করবে আলোকিত। সেই আমাদের স্বপ্নের ভারতবর্ষ বাস্তব রূপ পাবে কতো মানুষের আত্মদানের মধ্য দিয়ে। এই প্রত্যেকটি মৃত্যু যে পাহাড়ের মতো ভারী, কারণ তাঁরা যে আমাদের চাইতে অনেক বড় মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেছিল, তাই তাঁদের মৃত্যু লক্ষ লক্ষ জীবন সৃষ্টি করবে। তাই তো এ পথের ধুলো চোখের জলেই ভেজাতে হয়, রক্ত দিয়েই দৃঢ় করতে হয়।” [৬ জুলাই, ১৯৭০]

তাঁর লেখাগুলোর আরেকটা দিক হচ্ছে তিনি সব সময় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করতেন। তাই দক্ষিপন্থী সুবিধাবাদী বিভিন্ন রূপগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি লেখাতেই নৈরাজ্যবাদী কিংবা সংকীর্ণতাবাদী ঝোঁকগুলো সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তাঁর লেখায় আবেগ যথেষ্ট মাত্রায় থাকলেও যুক্তিকে তিনি প্রাধান্যে রাখতেন। “সংগ্রামসমালোচনারূপান্তর প্রসঙ্গে” লেখায় তাই তিনি অত্যন্ত সঠিকভাবেই লিখেছেন, “একটা মানুষের দুটি দিক আছে, একটা পজিটিভ (ইতিবাচক) দিক আছে, একটা নেগেটিভ (নেতিবাচক) দিক আছে, …এই Two aspect (দুই দিক) –এর মধ্যে পজিটিউভ দিকটা যার বেশি থাকে, তাঁকে আমরা ভালো লোক বলবো। আর নেগেটিভ দিক যার বেশি স্বভাবতই আমরা তাঁকে খারাপ লোক বলবো। এই দুটো aspect (দুই দিক) আমাদের যাচাই করে দেখতে হবে। এটাই হচ্ছে দ্বান্দ্বিক নিয়ম। ৬০৪০ শতাংশ যদি হয়, তবে ৬০ শতাংশকেই নেবো। ব্যক্তিগত দেখাশোনা (individual care)প্রত্যেকটি ব্যক্তিকে ধরে তার ইতিবাচক দিক বিকাশ করার চেষ্টা করবো। ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে পার্টি গঠনের কথা বলা যে হয়, তার উদ্দেশ্য হলোতার জীবন্ত ধারণা (living idea)কে ধরতে হবে। সংগ্রামসমালোচনারূপান্তর। সংগ্রাম যেমন করবো সমালোচনাও করবো এবং রূপান্তর করবো। এবং এই রূপান্তরটা করানো যায়।”

সংক্ষেপে বলতে গেলে তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল শব্দের মারপ্যাঁচ দিয়ে, বাক্যজাল বোনার দীর্ঘ লেখার বদলে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং প্রাঞ্জল ভাষা; যুক্তিনির্ভর কিন্তু আবেগদীপ্ত প্রকাশ; লক্ষ্যে স্থির এবং অবিচল; রাজনৈতিকভাবে সঠিক এবং স্পষ্ট একটা অবস্থান; মতাদর্শগতভাবে প্রেরণাদায়ক, জীবন্ত, বস্তুনিষ্ট এবং দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিমূলক। এবং অবশ্যই বাহুল্য বর্জিত। ভারতবর্ষে অনেক তাত্ত্বিক নেতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রবন্ধ লিখে গেছেন, কিন্তু তাঁর মতো অনুপ্রেরণা সৃষ্টিকারী এবং আলোক সম্পন্ন লেখা ক’জন লিখতে পেরেছেন, তা আমার খুব একটা জানা নেই। আর তাই আমরা দেখি এই লেখাগুলো মেহনতি জনগণের মধ্যে এবং ছাত্রযুবদের মধ্যে ব্যাপক বিপ্লবী অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। আজ যে অনুপ্রেরণা ব্যাপক মেহনতি মানুষের হৃদয়ে বহমান।

এই লেখা লিখতে লিখতে চোখে ভেসে আসছে একটা চোয়াল ভাঙা শীর্ণকায় মুখ। সদা হাস্যময়। উজ্জ্বল দু’টো চোখ। সেই মানুষযার কথা শুনে পরিবারপরিজন ছেড়ে বেড়িয়ে আসা যায়; ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দকে ত্যাগ করা যায়; পুরনো অভ্যাসগুলোকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করা যায়; প্রাণ পর্যন্ত দিয়ে দেয়া যায় জনতার স্বার্থে। সেই মানুষযাকে ভালোবাসা যায়; সমালোচনা করা যায়; যার উপর রাগঅভিমান করা যায়; এমনকি মাথায় পলায়নবাদী চিন্তা এলে তাঁর ঘাড়ে যাবতীয় দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে পালিয়েও বাঁচা যায়। মানুষটি তবু সদাহাস্যময়ই থাকেন। কখনো কারোর উপর রাগ করেন না। আবার স্থির সংকল্প থেকে সরেও আসেন না। এসব পলায়নবাদী বিচ্যুতি দেখে বড়জোর বলতে পারেন, “মধ্যবিত্ত ক্যাডারদের বিপদ এখানেই। তারা দ্রুত জাতীয়আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিত (National International perspective) হারিয়ে ফেলেত্যাগ (Sacrifice) ব্যাপারটা কোনো নির্দিষ্ট (Particular) ব্যাপার নয়। সেটা দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা।”

কিন্তু মুখে তাঁর হাসিটি লেগেই থাকে। উজ্জ্বল চোখে থাকে স্বপ্নের ঘোর। সেই মানুষ, যে আমাদের প্রতিদিনকার স্বপ্নে, যাপনে, পাহাড় সরানোর সংগ্রামে, বধ্যভূমিতে কিংবা জেলখানার অন্ধ কুঠুরির দুঃসহ দিনগুলোতেও আশার আলোকবর্তিকা হয়ে জাগ্রত থাকেন। তিনি আর কেউ নন, আমাদের প্রিয় নেতা কমরেড চারু মজুমদার। আমাদের বোকাবুড়ো।।

১৩ জুলাই ২০১৭

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.