লিখেছেন: শাহীন রহমান

ভূমিকা

সাধারণ অর্থে একটি উন্নত দেশ কর্তৃক অপর একটি বা একাধিক অনুন্নত দেশের উপর আধিপত্য বা সাম্রাজ্য বিস্তারকে সাম্রাজ্যবাদ বলা হয়। পররাজ্য গ্রাস ও লুণ্ঠন করে পদানত রাখার ব্যবস্থা হলো সাম্রাজ্যবাদ। উন্নত একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও সেই রাষ্ট্রের পুঁজিপতি বা বুর্জোয়াদের দ্বারা অন্য একটি দেশ ও তার জনগণের উপর শোষণশাসন কায়েম করাই সাম্রাজ্যবাদ। পুঁজিবাদের বিকাশের গোড়ার দিকে কতিপয় পুঁজিবাদী দেশ এই ধরনের সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তারা অনুন্নত ও প্রাক পুঁজিবাদী বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক তথা সামরিক অভিযান চালিয়ে তাদের পদানত ও পরাধীন করে। সেইসব দেশের ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও কাঁচামাল নিজেদের দখলে নেয়। এমনকি পরাধীন দেশগুলিকে নিজেদের প্রত্যক্ষ শাসনের অধীনে নিয়ে আসে দখলকারী দেশগুলি। পুঁজিবাদের উদ্ভবের পরে কতিপয় উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের এই পররাজ্য দখল ইতিহাসে উপনিবেশবাদ রূপে পরিচিত। এই উপনিবেশিক কর্মনীতি দ্বারা বিভিন্ন অনুন্নত, পশ্চাদপদ দেশগুলি উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির। বিভিন্ন উন্নত পুঁজিবাদী দেশের পুঁজিবাদের বিকাশে এই উপনিবেশিক শোষণশাসন লুণ্ঠনের বিশেষ ভূমিকা ছিল। এভাবে সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদকে (colonialism) এক করে দেখা হলেও এদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। উপনিবেশবাদের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক তথা সামরিক অভিযানের ভূমিকাই মুখ্য।

সেজন্য অতীত যুগের সাম্রাজ্য বা উপনিবেশ আর বর্তমানকালের সাম্রাজ্যবাদ এক নয়। কেননা প্রাকপুঁজিবাদী বিশ্বে বড় বড় সাম্রাজ্য বা উপনিবেশিক সাম্রাজ্য ছিল। প্রাচীন যুগেও পররাজ্য গ্রাস করে সাম্রাজ্য বিস্তার করা হতো। যেমন রোম সাম্রাজ্য, যা দাস ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। আবার প্রাচীনকালে যে সামরিক শক্তি প্রয়োগে লুণ্ঠন, হত্যা, কর আদায় চললেও এসব সাম্রাজ্যে পুঁজিবাদী কায়দায় শোষণ ছিল না। উল্লেখ্য যে, সুদূর অতীতে জনমানবহীন অঞ্চলে বা অন্য জায়গা থেকে মানুষ জন এসে বসবাস শুরু করতো, তাকেও বলা হতো কলোনি বা উপনিবেশ, যা পররাজ্য গ্রাস করা বা শোষণমূলক ছিল না। পুঁজিবাদের শৈশবকালে বিভিন্ন দেশের উদীয়মান পুঁজিপতিরা তাদের রাষ্ট্রশক্তির দ্বারা অন্যদেশ দখল করে শোষণশাসন চালাতো। পুঁজিপতিদের স্বার্থে অন্যদেশে বিদেশি বণিকরা বাণিজ্য করতে এসে বণিক থেকে শোষকশাসকে পরিণত হলো এভাবে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কর্তৃক এই উপনিবেশ সৃষ্টিকে বলা হয় উপনিবেশবাদ। তাই ইতিহাসে পুঁজিবাদের আগেও আমরা পরদেশ দখল, লুণ্ঠন ও পদানত করে সাম্রাজ্য বিস্তারকারী উপনিবেশ বা উপনিবেশবাদের উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করি। যেমন বৃটেনে পুঁজিবাদ বিকাশের পূর্বেই বৃটিশ উপনিবেশবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

উল্লেখ্য যে, ল্যাটিন কলোনিয়াম শব্দটি থেকে উপনিবেশ কথাটির ইংরেজি প্রতিশব্দ কলোনি শব্দটি উদ্ভব। এই কলোনিয়াম এর অর্থ হলো চাষযোগ্য অঞ্চল। তাই উপনিবেশবাদ বলতে সাধারণ অর্থে বোঝায় কোনো দেশ বা রাষ্ট্র সরাসরি দখল করে সেখানে প্রত্যক্ষভাবে নিজেদের শোষণশাসনআধিপত্যনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। সার্বভৌমত্ব স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে পরাধীন করা। আর এর লক্ষ্য হলো অধীন দেশগুলি কাঁচামাল প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাজার দখল। এভাবে উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটতো। তাই পুঁজিবাদের সূচনাপর্বে বিভিন্ন দেশের সম্পদ ও বাজার দখলের জন্য সেইসব দেশ দখল করে সাম্রাজ্য বিস্তার হলো উপনিবেশবাদ। উপনিবেশিক শোষকশাসকপ্রভূরা নিজেরাই পরাধীন দেশে বসতি স্থাপন করে সেখানে সরাসরি শোষণশাসন চালাতো। মোটা দাগে বলা যায় যে, ১৫০০ সাল নাগাদ উপনিবেশবাদের যাত্রা শুরু। উল্লেখ্য যে, রুশ বিপ্লবের অনুপ্রেরণা এবং পরবর্তীকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতায় ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ১২০টি দেশ উপনিবেশবাদের খপ্পর থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনসার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে মাথা তুলে দাঁড়ায়। গোটা ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম কয়েক দশক পর্যন্ত আমরা উপনিবেশবাদের আধিপত্য দেখতে পাই। যেমন বাংলাদেশ আমাদের এই উপমহাদেশ ছিল বৃটিশ উপনিবেশবাদের অধীন।

এক কথায় উদ্ভব ও বিকাশকালীন প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদের একটি রূপ হলো উপনিবেশবাদ। আর পুঁজিবাদের বিকশিত রূপ হিসেবে একচেটিয়া পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় সাম্রাজ্যবাদ রূপে পরিচিত। একচেটিয়া পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের প্রকাশ ঘটে সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে।

সাম্রাজ্যবাদ কোনো দেশ বা রাষ্ট্র দখল করে সেখানে সরাসরি উপস্থিত থেকে তাদের শোষণশাসন চালায় না। তারা পরোক্ষভাবে তাদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে বিভিন্ন দেশে। সাম্রাজ্যবাদের ইংরেজি প্রতিশব্দ ইম্পেরিয়ালিজম শব্দটির উদ্ভব হয়েছে ল্যাটিন ইম্পোরিয়াম শব্দটি থেকে। যার অর্থ হলো আদেশনির্দেশ বা নিয়ন্ত্রণ। ১৯০০ সালের শুরু থেকে একচেটিয়া পুঁজিবাদ থেকে সাম্রাজ্যবাদ পরিপূর্ণভাবে আত্মপ্রকাশ করে।

লেনিনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তরই হলো সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু খেয়াল রাখা দরকার যে, পুঁজিবাদ থেকে সাম্রাজ্যবাদ কোনো ভিন্নতর নতুন আর্থসামাজিক ব্যবস্থা নয়। বরং সাম্রাজ্যবাদ একেবারেই মূলগতভাবে পুঁজিবাদ এবং তা পুঁজিবাদেরই সকল মৌলিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। তাই পুঁজিসহ উৎপাদন সম্পদে পুঁজিবাদী ব্যক্তিগত মালিকানা, পুঁজি কর্তৃক শ্রম শোষণ ও উদ্বৃত্ত আত্মসাৎ ইত্যাদি পুঁজিবাদের এই মৌলিক নিয়মগুলি সাম্রাজ্যবাদের মধ্যেও ক্রিয়াশীল।

উল্লেখ্য যে, লেনিনের পূর্বে ১৯০২ সালে বৃটিশ অর্থনীতিবিদ জন হবসন তার বিখ্যাত সাম্রাজ্যবাদ গ্রন্থে এবং ১৯১০ সালে অস্ট্রীয় মার্কবাদী তাত্ত্বিক হিলফারডিংএর ফিনান্স ক্যাপিটাল বা লগ্নিপুঁজি গ্রন্থে প্রথম সাম্রাাজ্যবাদকে সংজ্ঞায়িত করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। প্রায় সমসাময়িক পোলিশ কমিউনিস্ট নেত্রী রোজা লুক্সেমবার্গ সাম্রাজ্যবাদকে তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করার প্রয়াস চালান। তবে সামাজ্যবাদকে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও তথ্য নির্ভর সূত্রায়িত করার কৃতিত্ব লেনিনেরই। তিনি এক বছরেরও অধিককাল গভীর অধ্যয়ন শেষে ১৯১৬ সালের মাঝামাঝি সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদকে যথাযথভাবে সংজ্ঞায়িত করেন।

পুঁজিবাদ থেকে সাম্রাজ্যবাদ

দাস সামন্ত তথা প্রাক পুঁজিবাদী স্বাভাবিক অর্থনীতির গর্ভ থেকে উদ্ভূত শ্রম বিভাজন, বিনিময়, বাজার, মুদ্রার প্রচলন, বর্ধিত পুনরুৎপাদন ইত্যাদির বিকাশ পণ্য অর্থনীতির অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে। আর পণ্য অর্থনীতির এই অপ্রতিরোধ্য বিকাশ প্রায় সমস্বত্তা বিশিষ্ট উৎপাদকের মধ্যে তীব্র মেরুকরণ ঘটায়। খোদ উৎপাদকরা বিভাজিত হয়ে পড়ে। অধিকাংশ উৎপাদকরা উৎপাদন সম্পদ হারায়, যা গুটিকতক উদ্যোক্তার হাতে পুঞ্জিভূত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের নিঃস্বায়ন এবং ক্ষুদ্র অংশের সমৃদ্ধায়নের ধারায় দুটি মূল বৈরী বিপরীত শ্রেণীর আত্মপ্রকাশ করে পুঁজিপতি ও শ্রমিক। এই উৎপাদন পদ্ধতি ইতিহাসে পুঁজিবাদ নামে পরিচিত। পণ্য উৎপাদনের সার্বজনীনতা এবং শ্রমশক্তির পণ্যে রূপান্তর হলো এই পুঁজিবাদের দুটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। পণ্য থেকে যাত্রা শুরু করে বণিক পুঁজি, তারপর হস্তশিল্প গিল্ড থেকে সরল ম্যানুফ্যাকচারিং পর্ব পার হয়ে পুঁজিবাদ পৌঁছায় কলকারখানা ভিত্তিক শিল্প পুঁজিবাদে। নিজ অস্তিত্বের স্বার্থে সরল পুনরুৎপাদন থেকে বর্ধিত পুনরুৎপাদনের দিকে ছুটে চলে পুঁজিবাদ। এই বিকাশের ধারায় টিকে থাকা এবং আরও মুনাফা ও আরো ফুলে ফেঁপে উঠার জন্য পুঁজিপতিদের মধ্যে অনিবার্যভাবে সৃষ্টি হয় প্রতিযোগিতা। আর এই অবস্থা প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদকে ঠেলে দেয় একচেটিয়া পুঁজিবাদের অবশ্যম্ভাবীকতায়। এ ধরনের বিভিন্ন উন্নত ও শক্তিশালী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের ভেতরে ব্যাংক ও শিল্প পুঁজির মিলনে গড়ে ওঠে বিপুল পরিমাণ লগ্নিপুঁজি, যার মালিক ও নিয়ন্ত্রক বনে যায় মুষ্টিমেয় একচেটিয়া পুঁজিপতি গোষ্ঠী। আর এই লগ্নিপুঁজির লাভজনক বিনিয়োগ ক্ষেত্র খুঁজে দেবার জন্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চালায় রাষ্ট্র। কেননা অতি উৎপাদন সংকট এড়ানোর জন্য লগ্নিপুঁজি রপ্তানির প্রয়োজন দেখা দেয়। রাষ্ট্রীয় লালনপালন ও আশ্রয়প্রশ্রয়ে বৃহৎ একচেটিয়া লগ্নিপুঁজির মালিক গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র আকার ধারণ করে। তারা কাঁচা মালের উৎস, পণ্য বিক্রির বাজার ও লগ্নিপুঁজি রপ্তানির স্থল হিসাবে বিভিন্ন দেশকে দখলে আনে। অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বিদের হঠিয়ে নিজ দখলে রাখার মরিয়া প্রচেষ্টা চালায়। রাষ্ট্র নিজ নিজ একচেটিয়া লগ্নিপুঁজির স্বার্থে স্বীয় ভূখন্ডের বাইরে অন্য দেশে রাজনৈতিক প্রয়োজনে সামরিক হস্তক্ষেপের দ্বারা একাজটি সমাধা করে। তাই লেনিনের ব্যাখ্যায় পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তরই হলো সাম্রাজ্যবাদ। অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদ মর্মগতভাবে একচেটিয়া পুঁজিবাদ, যা উৎপাদন ও পুঁজির কেন্দ্রীভবন থেকে ইচ্ছা নিরপেক্ষ অনিবার্যতায় উদ্ভূত, কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন ও আকস্মিক কোনো কিছু নয়, বরং তা পুঁজিবাদের বুনিয়াদী সংকট ও দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে। লেনিনের যথার্থ সংজ্ঞায় তাই সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদী বিকাশের সেই স্তর, যেখানে একচেটিয়া কারবার ও ফিন্যান্স পুঁজির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত, যেখানে পুঁজি রপ্তানি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক ট্রাস্টগুলির মধ্যে বিশ্বে ভাগবাটোয়ারা শুরু হয়েছে এবং বৃহত্তম পুঁজিবাদী শক্তিগুলির মধ্যে ভূগোলকের সমস্ত অঞ্চলে বাটোয়ারা সমাপ্ত হয়েছে। তাই সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের কোনো নীতিমালা নয়, বরং পুঁজিবাদেরই বিকশিত রূপ একচেটিয়া পুঁজিবাদের পরিণতি। একচেটিয়া পুঁজিবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদ অবিচ্ছেদ্য। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের তৎকালীন অন্যতম প্রতিনিধি সিসিল রোডসএর উক্তি এক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদকে আরো ভালোভাবে সংজ্ঞায়িত করে, সাম্রাজ্য হচ্ছে পাকস্থলীর প্রশ্ন; গৃহযুদ্ধ না চাইলে সাম্রাজ্যবাদী হতেই হবে। বিশ শতকের শুরুতে গোটা দুনিয়াটা মাত্র কয়েকটা দেশের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। আফ্রিকার ৯০ শতাংশেরও বেশি এবং এশিয়ার অর্ধেকেরও বেশি ভূখণ্ড ছিলো সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির সরাসরি দখলে। সেই সঙ্গে আধাউপনিবেশ ও আশ্রিত রাজ্য মারফৎ সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বজায় রাখা হতো অনেক দেশে।

মার্কসএঙ্গেলস পুঁজিবাদী অর্থনীতির স্বরূপ উন্মোচনের ধারায় তার সাম্রাজ্যবাদে উন্নীত হবার প্রবণতা চিহ্নিত করেন এবং লেনিন সাম্রাজ্যবাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। এই বৈশিষ্ট্যগুলি হলো: () উৎপাদন ও পুঁজির কেন্দ্রীভবন এবং একচেটিয়া কারবার () একচেটিয়া শিল্পপুঁজি ও ব্যাংক পুঁজির মিলন এবং ব্যাংকের নতুন ভূমিকা () লগ্নি বা ফিন্যান্স পুঁজি এবং ফিন্যান্স চক্রতন্ত্র () পুঁজির রপ্তানি () পুঁজিপতি সংঘগুলির দ্বারা বিশ্বের ভাগ বাটোয়ারা () বৃহৎ শক্তিগুলির মধ্যে বিশ্বের ভাগ বাটোয়ারা।

উৎপাদন ও পুঁজির কেন্দ্রীভবন এবং একচেটিয়া কারবার

পুঁজিবাদী অর্থনীতি উৎপাদন তথা শিল্প কলকারখানার বিপুল বৃদ্ধি ঘটায়। বৃহৎ বৃহৎ পুঁজিবাদী শিল্প উদ্যোগগুলির মধ্যে উৎপাদনের কেন্দ্রীভবনের প্রক্রিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পায়। উচ্চ মুনাফা নিশ্চিতকরণ, যান্ত্রিক অগ্রগতি সাধন, মন্দা ও সংকট মোকাবেলা ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ইত্যাদির জন্য উৎপাদনের সংযুক্তিকরণ ঘটে। একটিমাত্র শিল্প উদ্যোগের ভেতরে শিল্পের বিভিন্ন শাখা একত্রিত হয়। অর্থাৎ একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই একটি পণ্যের পুরো উৎপাদন সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলে। ফলে সংযুক্ত হওয়া শিল্প উদ্যোগগুলি বিপুল পরিমাণ মুনাফা অর্জন করে। ছোটখাট, মাঝারি শিল্পগুলিকে এই প্রতিযোগিতা ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। এভাবে বৃহৎ বৃহৎ কয়েকটি পুঁজিবাদী উদ্যোগ একত্রিত হয়ে শিল্প উৎপাদনের সিংহভাগ তাদের দখলে নিয়ে আসে। এই একজোটবদ্ধতার দরুন বাজারও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। অন্যান্য প্রতিযোগীদের হটিয়ে বাজার দখলে এনে উৎপাদিত পণ্যের মূল্যকে তারা ইচ্ছামতো নির্ধারণ করে। এভাবে অবাধ প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদের বদলে আসে উৎপাদন ও পুঁজির কেন্দ্রীভবন এবং তারপর একচেটিয়া কারবার। শেষ পর্যন্ত গোটা বাজারকে এই একচেটিয়া পুঁজিবাদী উদ্যোগগুলি ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। একচেটিয়া বলতে বোঝায় বড় বড় পুঁজিবাদী কোম্পানি/সংস্থা/প্রতিষ্ঠানের একত্রে সম্পর্কিত বা সংযুক্ত হওয়া, যাতে করে তারা পণ্য উৎপাদন, পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, বাজারে প্রাধান্য বিস্তার এবং সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করতে পারে। অর্থাৎ একচেটিয়া হলো সমিতিবদ্ধ পুঁজিপতিদের সংস্থা; যাদের হাতে পণ্য উৎপাদন ও বাজার কেন্দ্রীভূত হয়। এই একচেটিয়ার বিভিন্ন রূপ হতে পারে। যেমন কার্টেল, সিন্ডিকেট, ট্রাস্ট, কনসার্ন, কনগ্লমারেট ইত্যাদি। আমেরিকা, বৃটেন, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, জাপান ইত্যাদি দেশে একচেটিয়া পুঁজিবাদের এই রূপগুলি দেখতে পাওয়া যায়। একচেটিয়ার ফলে অবাধ প্রতিযোগিতা বা বর্তমানের তথাকথিত মুক্তবাজার কাগুজে হয়ে পড়ে; মূলত তা হয় বশ্যতা, নতি স্বীকার। এটা কৃষি ও শিল্পের অসংগতি সৃষ্টি করে।

ব্যাংক ও তাদের নতুন ভূমিকা

টাকা লেনদেনের অতীত নিরীহ ভূমিকা ছাপিয়ে আধুনিক ব্যাংক সর্বশক্তিমান একচেটিয়া কারবারিতে পরিণত হওয়ার মধ্য দিয়ে কর্তৃত্বের অবস্থানে উন্নীত হয়। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা খণ্ড খণ্ড অর্থনৈতিক উদ্যোগকে একটিমাত্র পুঁজিবাদী জাতীয় অর্থনীতিতে এবং তারপর বিশ্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করে। অবাধ প্রতিযোগিতার যুগের পুঁজিবাদে বুর্জোয়ারা মজুরদের কায়িক শ্রম বহির্ভূত অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের ১০ ভাগের ৯ ভাগ নিজেরাই করতো; আজকাল মস্তিষ্কগত অর্থনৈতিক কাজের ১০ ভাগের ৯ ভাগ করে ‘আমলারা’। আর এই ক্রমবিকাশের পুরোভাগে রয়েছে ব্যাংকিং। শিল্পের মতো ব্যাংকিং ক্ষেত্রেও মূলধনের একচেটিয়া ও কেন্দ্রীভবন ছোট ছোট ব্যাংকগুলিকে গ্রাস করে এবং তাদের অধীন করে ফেলে। সঞ্চয়ের জন্য গচ্ছিত হাজার হাজার কোটি কোটি টাকার বিলিব্যবস্থা ছাড়াও ব্যাংক পুঁজির মালিকরা পুঁজিপতিদের দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করে। ব্যাংকের মাধ্যমে নানান ধরনের অর্থনৈতিক লেনদেনের ফলে পুঁজিপতিদের ভেতরকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কেও ব্যাংক অবগত হয়। এই তথ্য প্রাপ্তির সুবিধা ব্যাংকগুলিকে পুঁজিপতিদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা প্রদান করে। ফলে তারা শিল্প বাণিজ্যিক উদ্যোগগুলোর অন্যতম তত্ত্বাবধায়কের অবস্থানে উন্নীত হয়। অন্যদিকে তা ব্যাংক পরিচালনা ক্রয় ক্ষেত্রেও শিল্প বাণিজ্যিক পুঁজিপতিদের অনুপ্রবেশ ঘটায়।

ফিন্যান্স পুঁজি ও ফিন্যান্স চক্রতন্ত্র

ব্যাংকে জমাকৃত বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগহীনভাবে পরে থাকলে তা মুনাফা সৃষ্টি করে না। তাই নিজের পুঁজির ক্রমবর্ধমান অংশকেও শিল্পে খাটাতে বাধ্য হয় ব্যাংকগুলো। এইভাবে ব্যাংক পুঁজি ক্রমবর্ধমানভাবে শিল্পপুঁজিতে পরিণত হয়। এই ব্যাংক পুঁজি অর্থাৎ, মুদ্রা বা টাকারূপী পুঁজির এই শিল্পপুঁজিতে রূপান্তর, এটাই হচ্ছে ফিন্যান্স বা লগ্নিপুঁজি। অর্থাৎ ফিন্যান্স বা লগ্নিপুঁজি হচ্ছে ব্যাংকের হস্তস্থিত এবং শিল্পপতিদের দ্বারা ব্যবহৃত পুঁজি। টিকে থাকার জন্য মুদ্রারূপী ব্যাংক পুঁজি তার ক্রমবর্ধমান অংশকে শিল্পপুঁজিতে রূপান্তর করতে বাধ্য হয়। এই প্রক্রিয়ায় লগ্নিপুঁজি উৎপাদনশীল শিল্পপুঁজি এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের থেকে আলাদা হয়ে পড়ে। ফলে লগ্নিপুঁজি থেকে বিচ্ছিন্ন মুনাফাখোরদের আধিপত্যের উদ্ভব ঘটে। অন্য সমস্ত রাষ্ট্র থেকে ফিন্যান্স পুঁজির মালিকরাই মহাশক্তিধর হয়ে রাষ্ট্রের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক হয়ে পড়ে। এরা মূলত পরগাছাপরজীবী স্রেফ কুপন কেটে যারা খায়। মোটকথা, উৎপাদনের কেন্দ্রীভবন, তা থেকে উদ্ভূত একচেটিয়া এবং শিল্পের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মিলন অথবা অঙ্গীভবন এই হলো ফিন্যান্স পুঁজি।

পুঁজি রপ্তানি

পণ্য রপ্তানি ও অবাধ প্রতিযোগিতা পুরোনো পুঁজিবাদের এই বৈশিষ্ট্যের বদলে পুঁজি রপ্তানি হয়ে উঠে সাম্রাজ্যবাদী স্তরে উন্নীত পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্য। অসম পুঁজিবাদী বিকাশের ফলে শীর্ষ গুটিকতক পুঁজিবাদী দেশের হাতে বিপুল পরিমাণ পুঁজির পাহাড় জমে এবং নিজ দেশে এই পুঁজির লাভজনক বিনিয়োগ ক্ষেত্রের অভাব ঘটে। এই সংকটেরই অবশ্যম্ভাবী পরিণাম হচ্ছে পুঁজি রপ্তানি। বিকাশের গতিধারায় স্পষ্টতভাবেই পশ্চাৎপদ, অনুন্নত বিশ্বের অপরাপর পুঁজিবাদী দেশে পুঁজির ঘাটতি, সস্তা জমিশ্রমকাঁচামালের প্রাচুর্য ইত্যাদি শর্তগুলি লগ্নিপুঁজিকে ঐ সমস্ত দেশে দারুনভাবে আকৃষ্ট করে। লক্ষণীয় যে, পুঁজি রপ্তানিকারক এবং গ্রহণকারী উভয়ের ক্ষেত্রেই এই সম্পর্ক হচ্ছে দ্বান্দ্বিক উভয় দেশেরই বাস্তব প্রয়োজনের শর্তাধীন। রপ্তানিকারী ও গ্রহণকারী দেশের মধ্যকার এই বিনিময় সম্পর্ক কেবল গ্রহণকারী দেশের নতজানুকে প্রকাশ করে না। সেই সঙ্গে তা বিপরীতভাবে পুঁজি রপ্তানিকারী দেশগুলির পারস্পরিক প্রতিযোগিতাও সেই প্রভুত্বকে খর্ব করে। ভুলে গেলে চলবে না যে, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতে উদ্বৃত্ত পুঁজি জমাট বেঁধেছে অনুন্নত দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়বার জন্য আর এটা ঘটেছে সাম্রাজ্যবাদের অস্তিত্বের পূর্বশর্ত হিসেবে নিছক তৃতীয় বিশ্বের ভিক্ষাবৃত্তির দরুন নয় সাম্রাজ্যবাদের নিজস্ব তাগিদেই।

পুঁজিপতি সংঘগুলোর মধ্যে দুনিয়ার ভাগ বাটোয়ারা

বিভিন্ন দেশে পুঁজি রপ্তানিকারী ফিন্যান্স পুঁজির মালিক বড় বড় পুঁজিবাদী কোম্পানিগুলি প্রথমে নিজেদের দেশের অর্থনীতি তথা বাজার ভাগ বাটোয়ারা করে নেয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে হাত বাড়ায়। পুঁজির রপ্তানির ভিত্তিতে তারা গড়ে তোলে আন্তর্জাতিক একচেটিয়া সংঘ। আজকের যুগে এই আন্তর্জাতিক একচেটিয়ার রূপ হলো বহুজাতিক কোম্পানি বা মাল্টিন্যাশনাল/ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানি। প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে অনেক সুবিধাজনক অবস্থায় থাকায় তারা আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের একচেটিয়া প্রাধান্য বা আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করে। এভাবে পুঁজিবাদী একচেটিয়া সংঘগুলির মধ্যে দুনিয়ার ভাগ বাটোয়ারা সম্পন্ন হয়। তবে ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তথা সংগ্রাম হ্রাস পায় না। বরং তা নানা রূপে তীব্র হয়ে উঠে। সাম্রাজ্যবাদে উন্নীত পুঁজিবাদী দেশগুলির দ্বারা গোটা দুনিয়ার এই ভাগ বাটোয়ারা সম্পন্ন হয় পুঁজির অনুপাতে শক্তির অনুপাতে।

বৃহৎ শক্তিগুলির মধ্যে বিশ্বের ভাগ বাটোয়ারা

উৎপাদন ও পুঁজির কেন্দ্রীভবনের মাধ্যমে যে একচেটিয়া পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে, পরে তা ব্যাংক পুঁজির মিলনে গড়ে তোলে ফিন্যান্স ক্যাপিটাল, লগ্নি বা মহাজনি পুঁজি। এই ফিন্যান্স পুঁজির রপ্তানি আবার আন্তর্জাতিক স্তরে একচেটিয়া অনিবার্য করে তোলে। আন্তর্জাতিক একচেটিয়া পুঁজিবাদী সংঘগুলি শক্তিশালী হয়ে উঠে বিশ্ববাজারটাকে নিজেদের মধ্যে শক্তি অনুসারে ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়। আর এই প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ হয় বড় বড় পুঁজিবাদী দেশগুলি কর্তৃক বিশ্বের সমস্ত অঞ্চল ভাগাভাগি করে দখল করার মধ্য দিয়ে। তাই আমরা দেখতে পাই, ১৮৭৬ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে আমেরিকা, বৃটেন, ফ্রান্স সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির দখলে ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ বর্গ মাইল এলাকা। আন্তর্জাতিক একচেটিয়া পুঁজি সংঘগুলি কর্তৃক বিশ্ব বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য এভাবে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের প্রয়োজন দেখা দেয়। অন্য দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও কাঁচামাল দখল, উৎপাদিত পণ্যের বিক্রির জন্য বাজার দখল, পুঁজির লাভজনক বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলি দখল এসব কারণে গুটিকতক সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির তাই যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠে। আর সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল ভাগ দখল নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি হয়।

লেনিন উত্তর সাম্রাজ্যবাদ

প্রায় শতবর্ষ আগে ‘সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’ গ্রন্থে লেনিন সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ তুলে ধরেন। তখন ছিল পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের বিকাশের যুগ। আর এখন পুঁজিবাদী সাম্রাাজ্যবাদী বিশ্বায়নের কাল পর্বে আমরা বসবাস করছি। তাই লেনিন যুগের সাম্রাজ্যবাদ এবং লেনিন উত্তর যুগের সাম্রাজ্যবাদ হুবহু একই চেহারার নয়। আজকের সাম্রাজ্যবাদ পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে আছে। পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় রূপে সাম্রাজ্যবাদ তার মুমূর্ষু, পঁচনশীল, ক্ষয়িষ্ণু চরিত্র নিয়ে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়নি। সাম্রাজ্যবাদ বহাল তবিয়তে রয়েছে। বরং আরও শক্তিশালী, আগ্রাসী ও মরিয়া হয়েছে। তাই লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কিত তত্ত্বায়ন নিয়ে আবার নতুন করে বির্তক উঠেছে। পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতির কথা বলে সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে লেনিনের শিক্ষাকে সেকেলে, অকেজো ও বাতিল ঘোষণা করেছেন অনেকে। এদের মধ্যে পুঁজিবাদের অনুসারী তাত্ত্বিক থেকে শুরু করে নয়ামার্কসবাদী, পোষ্টমডার্নিস্ট বুদ্ধিজীবী অনেকেই রয়েছেন।

সাম্রাজ্যবাদ মানেই যুদ্ধ। বাজার দখল এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যে দ্বন্দ্বসংঘাত যুদ্ধে রূপ নিতে বাধ্য। এটাই ছিল সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে লেনিনের অন্যতম শিক্ষা। পুঁজিবাদীসাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে তাই স্থায়ী শান্তি অসম্ভব। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তার প্রমাণ। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবতা এবং বিশেষ করে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে লেনিনের এই শিক্ষা এখন আক্রমণের সম্মুখীন। এক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের অনিবার্যতার প্রশ্নে কাউটস্কির তৎকালীন লেনিনবিরোধী কুখ্যাত তত্ত্ব নতুনভাবে হাজির হয়েছে এখন। যেমন কাউটস্কি ভেবেছিলেন সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির লগ্নিপুঁজি পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে ঐক্য স্থাপনের মাধ্যমে অতি সাম্রাজ্যবাদ বা উগ্র সাম্রাজ্যবাদএর রূপ নেবে এবং এর ফলে সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব সংঘাত যুদ্ধ ডেকে না এনে বিশ্বশান্তির সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে।

তেমনিভাবে সাম্প্রতিককালে এটা বলার চেষ্টা চলছে যে, বর্তমানে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ববিরোধ থেকে যুদ্ধের সম্ভাবনা লোপ পেয়েছে। তাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠেছে। আর তা সম্ভব হয়েছে লগ্নিপুঁজির অতিকেন্দ্রীভবন এবং বিশ্বায়নের ফলে। গোটা দুনিয়াকে ঐক্যবদ্ধভাবে শোষণ লুণ্ঠন করার জন্য দ্বন্দ্বসংঘাতলড়াই নয় বরং সমঝোতা আজ তাদের কাম্য।

অন্যদিকে, লেনিন কর্তৃক সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক সূত্রায়ন বর্তমানে অপ্রাসঙ্গিক বলে দাবি করেছেন অনেক উত্তরআধুনিক চিন্তকরা। যেমন ইতালির আন্তোনিও নেগ্রী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাইকেল হার্টএর ম অনুযায়ী, সাম্রাজ্যবাদ বলে আজ আর কিছু নেই। আমরা এখন উত্তর সাম্রাজ্যবাদী (post imperialism) যুগে বাস করছি। তাই তারা সাম্রাজ্যবাদের বদলে সাম্রাজ্যএর ধারণা তুলে ধরেছেন, যা সাম্রাজ্যবাদ থেকে আলাদা। তাদের মতে, এই সাম্রাজ্য হলো বিশ্বায়নের ফলে গড়ে ওঠা নতুন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা। কারণ সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র ভিত্তিক সাম্রাজ্যবাদের রূপান্তর ঘটেছে এবং উদ্ভব হয়েছে এক সার্বভৌম সাম্রাজ্যের। এ সাম্রাজ্য কোনো পররাজ্য গ্রাস করে না। শক্তি প্রয়োগ নয়, নিয়ন্ত্রণ এর মুল শক্তি। জৈব রাজনৈতিক ক্ষমতা (bio-political power) এই সাম্রাজ্যের ভিত্তি। সমগ্র সমাজ, এমনকি মানুষের মনোজগতকেও তা নিজের নিয়ন্ত্রণে আনে। মানুষ স্বেচ্ছায় এই গণতান্ত্রিক সাম্রাজ্যের অধিকার মেনে নেয়। সর্বব্যাপী ক্ষমতার জালিকা বিন্যাস গড়ে তোলে এই সাম্রাজ্য। সুতরাং আধুনিক প্রলেতারিয়েত নয়, বিশ্বজনতার স্বতঃস্ফূর্ত সংগঠনহীন ও নেতৃত্ববিহীন সৃজনশীল বহুমূখী সংগ্রাম এই সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে নতুন প্রতিসাম্রাজ্য (counter empire) গঠন করতে সক্ষম। যেমন নারীবাদী আন্দোলন, পরিবেশ আন্দোলন, মানবাধিকার আন্দোলন, আদিবাসীদের সংগ্রাম, নানা ধরনের নাগরিক উদ্যোগ ইত্যাদি।

আবার এরই ধারায় অনেকে বিশ্বায়নের ধাক্কায় রাষ্ট্র উবে যাওয়ার আভাস দিয়েছেন। যেমন কেনেচি ওহমে বলেছেন, রাষ্ট্রের অধীনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দিন শেষ। জাতিরাষ্ট্র এখন দ্রুততার সাথে তার প্রকৃতিগত সত্তা হারাচ্ছে, হয়ে উঠেছে অকার্যকররাষ্ট্র এখন এক মৃত্যু পথযাত্রী ডাইনোসর। তাই এ থেকে কেউ কেউ মনে করছেন সাম্রাজ্যবাদের আজ আর কোনো রাষ্ট্রীয় পরিচয় (যেমন মার্কিন বা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ) নেই।

সে জন্য রাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজনও ফুরিয়েছে সাম্রাজ্যবাদের। বহুজাতিক কোম্পানি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও তার নীতিমালা, বিধিবিধান, চুক্তি এবং বিজ্ঞানপ্রযুক্তি এখন সাম্রাজ্যবাদের যুৎসই হাতিয়ার। অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদ আগে ব্যবহার করতো কামানবন্দুক আর এখন সে কাজটি করে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা।

সাম্রাজ্যবাদের লেনিনীয় তত্ত্বায়নের ক্ষেত্রে পুঁজি রপ্তানির বিষয়টি নিয়েও সমালোচনা উত্থাপিত হয়েছে। কারণ লেনিন তার সমসাময়িক বাস্তবতার পর্যবেক্ষণ থেকে বলেছিলেন যে, সাম্রাজ্যবাদ তার নিজের পুঁজিবাদী অর্থনীতির সংকট মোকাবেলায় দেশের বাইরে পুঁজি রপ্তানি করতে বাধ্য। ফলে লাভজনক বিনিয়োগের জন্য সাম্রাজ্যবাদী দেশের লগ্নিপুঁজি পশ্চাদপদ, নির্ভরশীল ও উপনিবেশের অধীন অনুন্নত দেশগুলির দিকে ধাবিত হবে। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা গেল পুঁজি রপ্তানির সিংহ ভাগই ঘটেছে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলিতে।

আজকের জাতীয়আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে মূল্যায়নকে বিচার বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে শুরুতেই কতোগুলি বিষয় বিবেচনা করা দরকার। একটি বিশেষ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে উদ্ভূত তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক সংকট মোকাবেলায় লেনিনকে সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কিত তত্ত্বায়ন করতে হয়েছিল। মার্কসএঙ্গেলস উত্তর পুঁজিবাদের বিকাশ এবং বিপ্লবের ভরকেন্দ্র উন্নত পুঁজিবাদী দেশ থেকে পশ্চাৎপদ অনুন্নত দেশে সরে আসায় দুটি ঘটনা ঘটে। প্রথমত, বার্নস্টাইন মারফৎ সংশোধনবাদের জন্ম হয়। এই সংশোধনবাদ সমাজ বিপ্লবের পথ পরিহার করে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার মধ্যেই শান্তিপূর্ণ পথে শ্রমজীবী জনগণের আশাআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন সম্ভব বলে ভ্রান্তি ছড়ায়। দ্বিতীয়ত, একচেটিয়া পুঁজিবাদের বিকাশের যুগে বিপ্লবের তাত্ত্বিক শূন্যতা দেখা দেয়। এই দ্বিবিধ সংকট মোকাবেলার দায়িত্ব তাই লেনিনকে নিতে হয়। একদিকে তিনি সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে তীব্র তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক সংগ্রামের মাধ্যমে মার্কসবাদের মৌলিকত্বকে রক্ষা করেন। মাকর্সবাদের তাত্ত্বিক পুনর্গঠনের দ্বারা সাম্রাজ্যবাদের একটি রূপরেখা তুলে ধরেন। অন্যদিকে, সাম্রাজ্যবাদের যুগে বিপ্লবের রণনীতিরণকৌশল কী হবে সেই দিশা দেন। আর একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সাম্রাজ্যবাদকে সূত্রায়িত করা ক্ষেত্রে লেনিন মূলত এর অর্থনৈতিক দিকগুলোর উপর জোর দিয়েছেন। অর্থনীতি বহির্ভূত অন্যান্য রাজনৈতিক মতাদর্শিক সাংস্কৃতিক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারেননি। আলোচ্য গ্রন্থের ভূমিকায় এ প্রসঙ্গে লেনিনের মন্তব্য তাই স্মরণযোগ্য আমরা সাম্রাজ্যবাদের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সংক্ষেপে এবং যতোদূর সম্ভব সহজে তুলে ধরার চেষ্টা করব। অর্থনৈতিক দিকগুলি ছাড়া অন্যান্য দিকগুলি সম্পর্কে আলোচনা যতো প্রয়োজন থাক না কেন, আমরা সেগুলি সম্পর্কে আলোচনা করতে অপারগ। সেই সঙ্গে আর একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা দরকার যে, সাম্রাজ্যবাদকে লেনিন পুঁজিবাদের নিছক সম্প্রসারণ বা কোনো নীতিমালারূপে দেখেননি। কতিপয় উন্নত অগ্রসর পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কীভাবে সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়, সেটাই লেনিন তুলে ধরেছেন।

তবে এটা ঠিক যে, আজকের সাম্রাজ্যবাদ লেনিন যুগের মৌলিক বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করলেও তার পরিমাণ ও গুণগত নানা পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইকে সঠিক ধারায় প্রবাহিত করার ক্ষেত্রে সমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদের নয়া বৈশিষ্ট্যগুলি শনাক্ত হওয়া প্রয়োজন।

লেনিনের যুগে লগ্নিপুঁজির জমাট বাধা কেন্দ্রীভবন ঘটতো বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এবং সাম্রাজ্যবাদী দেশের গর্ভে জন্ম নেয়া লগ্নিপুঁজির বিকাশ ঘটতো নিজ নিজ রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ আশ্রয়প্রশ্রয় মদতে। তখন এই পুঁজির আকার কম থাকায় স্বীয় রাষ্ট্রের ভেতরে লাভজনক বিনিয়োগ সম্ভব হতো। তাই কেবলমাত্র বাড়তি বা উদ্বৃত্ত লগ্নিপুঁজি রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে অধীনস্থ অন্য দেশে বিনিয়োগ করতো সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলি। আর বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা হয়ে যাওয়ায় নিজস্ব আধিপত্যের বাইরে অন্য সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের অধীন কোনো দেশে লাভজনক বিনিয়োগের জন্য পুঁজি রপ্তানি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে করতে পারতো না কেউই। নিজ নিজ দেশেই লাভজনক বিনিয়োগ ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো লগ্নিপুঁজির বিচরণ। ফলে লগ্নিপুঁজির নির্দিষ্ট দেশ বা রাষ্ট্রীয় পরিচয় ভিত্তিক স্বাতন্ত্রতা ও কর্তৃত্ব প্রবল ছিল। কিন্তু লেনিন উত্তর সাম্রাজ্যবাদের লগ্নিপুঁজি বর্তমানে কতোগুলি নতুন বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।

আজকের লগ্নিপুঁজির উৎস কোনো রাষ্ট্র বা দেশ হলেও তা সেই দেশের নিয়ন্ত্রণের ধার ধারে না এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি তার কোনো দায়বদ্ধতা নেই। আজকের লগ্নিপুঁজির গায়ে তাই কোনো রাষ্ট্রীয় ছাপ নেই। বরং তা আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির রূপ নিয়েছে। কোনো একটি দেশের লগ্নিপুঁজি এক বা একাধিক দেশে ঢুকে মুনাফা লুণ্ঠনের বদলে এখন অনেকগুলি দেশের লগ্নিপুঁজি একত্রিত হয়ে একাজটি করছে।

লগ্নিপুঁজির পরিমাণের অবিশ্বাস্য বিপুল স্ফীতি ঘটেছে। যেমন ২০০০ সনের তথ্য মতে, গোটা দুনিয়ায় প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ দ্বারা লগ্নিপুঁজির বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১১ লক্ষ ৬৭ হাজার ৯৮৭ মিলিয়ন ডলার, যা গত এক দশকের চাইতে ৪৮৪ শতাংশ বেশি। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে ১৯৯৮ সালে নীট বেসরকারি পুঁজি রপ্তানি হয়েছিল ২ ক্ষ ৬৭ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ডলার ৯০ সালে যার পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৬০৬ মিলিয়ন ডলার।

এই বিপুল পরিমাণ লগ্নিপুঁজির পরিমাণও বর্তমানে অভূতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাত্র কয়েক হাজার দানবাকৃতির বহুজাতিক কোম্পানি এই লগ্নিপুঁজির প্রকৃত নিয়ন্ত্রক। উদাহরণ স্বরূপ ৯০ দশকের শুরুতে প্রায় ৩৭ হাজার বহুজাতিক কোম্পানির ১ লক্ষ ৭০ হাজার শাখার মাধ্যমে ২ হাজার বিলিয়ন ডলার লগ্নিপুঁজির বিনিয়োগ করেছে এবং বছরে এদের ব্যবসায়ের পরিমাণ ছিল ৫.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। আর বর্তমানে এসব দানবীয় বহুজাতিক সংস্থার ৮০ ভাগের মালিক মাত্র ১৫টি উন্নত দেশ এবং এসব দেশেই প্রায় সবগুলির হেডকোয়ার্টার অবস্থিত। ১৫ বছর আগেই মাত্র ১৫টি সর্ববৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানির সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪২১২ বিলিয়ন ডলার, যা ১৪০টি অনুন্নত দেশের মোট জাতীয় আয়ের সমান।

অন্যদিকে, লেনিন ব্যাংক পুঁজি এবং শিল্প পুঁজির মিলনে সৃষ্ট যে লগ্নিপুঁজিকে চিহ্নিত করেছিলেন, তার চরিত্রও বর্তমানে বদলে গেছে। এই লগ্নিপুঁজি এখন আর উৎপাদনশীল নয়। শিল্পে বিনিয়োগের দ্বারা শ্রমিক শোষণমূলক মুনাফা লুণ্ঠনের চাইতে ফাটকাবাজারী ভিত্তিক চটজলদি মুনাফা হাসিলে তা আগ্রহী। দ্বিতীয়ত, লগ্নিপুঁজির এই জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক রূপ ধারণ, এর বিপুল আয়তন ও তার কেন্দ্রীভবন এমন স্তরে উন্নীত হয়েছে যে, নিজ দেশের সীমানার ভিতর আর লাভজনক বিনিয়োগের ক্ষেত্র মিলছে না। তাই কেবল উদ্বৃত্ত নয়, গোটা লগ্নিপুঁজিই মুনাফার লোভে হণ্যে হয়ে ছুটছে গোটা বিশ্বে। ফলে ঘটেছে লগ্নিপুঁজির বিশ্বায়ন।

এভাবে আজ বিশ্বায়নের কালপর্বে সারাবিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে লগ্নিপুঁজির একনায়কত্ব। আর এটা লগ্নিপুঁজির বিশ্বায়নেরই পরিণতি। উল্লেখ্য যে, ৭০এর দশকে ডলার পূর্ণ রূপান্তরযোগ্য মুদ্রায় পরিণত হওয়ায় আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির বিশ্ব দখলের পথ সুগম হয়।

আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির এই বিপুল আয়তন এবং এর কেন্দ্রীভবন ও বিশ্বায়ন সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ববিরোধসংঘাতকে বর্তমানে অনেকখানি হ্রাস করেছে। কেননা আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বসংঘাত বিদ্যমান থাকলে বিশ্বব্যাপী লগ্নিপুঁজির অবাধ বিচরণ বাধাগ্রস্ত হবে। তাই আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির মাধ্যমে সারা দুনিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির যৌথ শোষণশাসনলুণ্ঠনের রাজত্ব কায়েমের জন্য নিজেদের মধ্যে ঐক্য জরুরি। এতোদিন লগ্নিপুঁজির জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় চরিত্র বজায় থাকায় আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ববিরোধ প্রবল ছিল। কিন্তু আজ জাতীয় পরিচয়ের বদলে লগ্নিপুঁজির বিশ্বায়িত রূপ আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী বৈরিতা নয়, বরং মুনাফার স্বার্থে তাদের ঐক্যের প্রেক্ষাপট রচনা করেছে। তবে এ থেকে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, এই মুনাফার লোভে সাময়িক ঐক্যের ফলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যকার দ্বন্দ্ববিরোধের অবসান ঘটেছে। কিংবা তাদের দ্বন্দ্বসংঘাত থেকে যুদ্ধের সম্ভাবনা লোপ পেয়েছে। আসলে যা ঘটেছে তা হলো সারা বিশ্বের লগ্নিপুঁজির শোষণশাসন বিস্তৃত করার স্বার্থে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব আপোষরফার মাধ্যমে এখন নিয়ন্ত্রিত। ফলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যকার দ্বন্দ্বসংঘাত আজ যুদ্ধের উৎস হয়ে ওঠেনি এখনও। বরং নানা দেশকে ঐক্যবদ্ধ লগ্নিপুঁজির অধীনে নিয়ে আসার জন্য ইরাক, আফগানিস্তান, যুগোশ্লোভাকিয়া, সিরিয়া, লিবিয়া, মিশর ও আফ্রিকায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি।

সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ও বিকাশের কালপর্বে লগ্নিপুঁজি মূলত বিনিয়োগ হতো নিজ নিজ দেশে এবং স্বীয় উপনিবেশসহ অনুকূল বিনিয়োগ ক্ষেত্র সমৃদ্ধ দেশে উদ্বৃত্ত লগ্নিপুঁজি রপ্তানি করত। উপনিবেশিক শোষণশাসন অবসানের পর স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলিতে লগ্নিপুঁজি রপ্তানির কারণে একসময় প্রাতিষ্ঠানিক বাধার সম্মুখীন হয়। আবার এতোদিন আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব বিরোধের কারণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির অভ্যন্তরে এই লগ্নিপুঁজির বিনিয়োগ সম্ভব ছিল না। কিন্তু লগ্নিপুঁজি ক্রমশ আন্তর্জাতিক রূপ ধারণ করায় এবং তার বিশ্বায়ন ঘটায় মুনাফার যৌথ স্বার্থে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হ্রাস পায়। বিষয়টি আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির যৌথ শোষণশাসন কায়েমের জন্য সাম্রাজ্যাবাদী শক্তিগুলির মধ্যে আপাত ঐক্য স্থাপিত হয়।

এই প্রেক্ষাপট সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যে পুঁজির অবাধ চলাচল সম্ভব করে তোলে। তাছাড়া এসব উন্নত দেশে পুঁজি বিনিয়োগ শর্তাবলী অনেক অনুকূল থাকায় তা লগ্নিপুঁজিকে আকৃষ্ট করছে। তাই দেখা গেল তৃতীয় বিশ্বের বদলে লগ্নিপুঁজি এখন সাম্রাজ্যবাদী ও উন্নত দেশগুলির দিকে ছুটছে। ২০০০ সালে বিশ্বব্যাপী প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগে ১১ লক্ষ ৬৭ হাজার ৯৮৭ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে অনুন্নত/ উন্নয়নশীল দেশে গেছে মাত্র ৯৫৬২ মিলিয়ন ডলার। বাকি প্রায় সবটাই অর্থাৎ ১০ লক্ষ ১২৯৬ মিলিয়ন ডলার উচ্চ আয়ের উন্নত দেশগুলিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন এখন কেন্দ্র থেকে প্রান্ত, গোটা দুনিয়াটাকে পুঁজিবাদী অর্থনীতির মধ্যে একীভূত করে দিয়েছে। প্রতিটি দেশের জাতীয় অর্থনীতি মিশে গিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির সমুদ্রে। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির বহুজাতিক কোম্পানি ও লগ্নিপুঁজির মালিক আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি এই বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। জাতীয়ভাবে একটি রাষ্ট্র তার অর্থনৈতিকরাজনৈতিক নীতি নির্ধারণে এখন অক্ষম হয়ে পড়েছে। এভাবে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলি নানাভাবে ক্ষমতাহীন হওয়ায় তারা সাম্রাজ্যবাদী নীতিকৌশল প্রতিরোধ করতে পারছে না। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী চাপে এসব রাষ্ট্রই আবার নানা গণবিরোধী পদক্ষেপ, নীতিমালা ও আইন বলবৎ করতে তৎপর। ফলে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলি দ্বিমুখী বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। একদিকে, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বসহ জাতীয় স্বার্থরক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা দুর্বল হচ্ছে। অন্যদিকে, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের স্বার্থে রাষ্ট্রের জাতীয় ও জনস্বার্থবিরোধী নিপীড়নমূলক ভূমিকা প্রবল হয়ে উঠছে। পাশাপাশি লগ্নিপুঁজির রাজনৈতিক লাঠিয়াল রূপে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলি আরও অনেক বেশি ক্ষমতাবান ও শক্তিশালী। এক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করছে তাদেরই নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক আইএমএফ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এসব বৈশ্বিক সংস্থাগুলিকে। আর সব ব্যর্থ হলে সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ। সেই সঙ্গে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির পণ্য, পরিষেবা খাতকে মুক্ত বাজারের নামে সাম্রাজ্যবাদের কাছে উন্মুক্ত করার জন্য এইসব সংস্থাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে দেশের সম্পদ ও প্রতিষ্ঠা বহুজাতিক কোম্পানির, তথা সাম্রাজ্যবাদের দখলে চলে যাচ্ছে। তাই সাম্রাজ্যবাদের অস্তিত্ব আরো মরিয়া, আরো অগ্রগামী, আরো বেপরোয়া রূপে উপস্থিত। প্রত্যক্ষ উপনিবেশ না থাকায় সরাসরি রাজনৈতিক বা সামরিক হস্তক্ষেপ এখন নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু নানা প্রাতিষ্ঠানিক কায়দায় তৃতীয় বিশ্বের উপর সাম্রাজ্যবাদী শোষণশাসনআধিপত্য এখন আগের চাইতে আরো সর্বগ্রাসী। উপনিবেশিক আমলে এসব থেকে সাম্রাজ্যবাদ যতো সম্পদ লুট করে আনতো তার পরিমাণ এখন শতগু বেশি। এজন্যই ঘানার রাষ্ট্রপতি কামে নক্রুমা ১৯৬৫ সালে সাম্রাজ্যবাদের এই নয়া রূপের নামকরণ করেছেন নয়া উপনিবেশবাদ

সাম্রাজ্যবাদের ভবিষ্যৎ

পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় হলো সাম্রাজ্যবাদ। এই সাম্রাজ্যবাদ তাই কেন্দ্রীভবন ও একচেটিয়া, ফিন্যান্স পুঁজিতন্ত্র ও পুঁজি রপ্তানি, বিশ্ব বাজার ও ভৌগলিক অঞ্চল দখল ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। তেমনি আবার সাম্রাজ্যবাদের কতোগুলি প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। এগুলি হলো সাম্রাজ্যবাদের পরগাছাবৃত্তি, সাম্রাজ্যবাদের পচনশীলতা ও মুমূর্ষু দশা। সাম্রাজ্যবাদ একচেটিয়া পুঁজিবাদের মধ্য দিয়ে তার পরগাছা চরিত্রকে ক্রমশ উন্মোচন করে। কারণ দেখা যায় একচেটিয়া ও লগ্নিপুঁজির মালিক সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া শ্রেণীর অধিকাংশই উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা উৎপাদন প্রক্রিয়াতে আর যুক্ত থাকে না এবং উৎপাদনের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ঘুঁচে যায়। কোম্পানির শেয়ার, বন্ড, ঋণপত্র, সিকিউরিটি বন্ড, লগ্নিপত্র ইত্যাদির মাধ্যমে তারা উৎপাদন থেকে সৃষ্ট বিপুল মুনাফা বা লভ্যাংশের মালিক হয়। এগুলিই তাদের আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা লগ্নিপুঁজির সুদ তাদের উপার্জন বাড়ায়। অর্থাৎ এরা স্রেফ কুপন কেটে টাকা বানায়। আর তাদের হয়ে উৎপাদনসহ অন্যান্য কাজকারবার চালায় বেতনভুক্ত বা ভাড়া করা বিশেষজ্ঞ বা ম্যানেজাররা। এভাবে লক্ষ কোটি মানুষের শ্রমের ফসল আত্মসাৎ করে মুষ্টিমেয় সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়ারা। সেই সঙ্গে অবিশ্বাস্য মুনাফা তাদেরকে সীমাহীন ভোগবিলাস, জালিয়াতি, ঠগবাজী, ব্যভিচারঅনাচারের দিকে ঠেলে দেয়। শুধু তাই নয়, রাজনীতিবিদ, শিল্পসাহিত্যিকবুদ্ধিজীবী, আমলাতন্ত্র, সংবাদপত্র সবকিছুকেই তারা সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির ভাড়াটে রক্ষকে পরিণত করে। পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদ নিজ দেশে ও অন্যত্র গণতন্ত্রের বিকাশকে রূদ্ধ করার মরিয়া অপচেষ্টা চালায়। অন্যদিকে, আবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা লগ্নিপুঁজির লাভের কিছুটা শ্রমিকদের অভিজাত অংশ বা উচ্চস্তরকে ঘুষ দেয় সাম্রাজ্যবাদ। শ্রমিকদের এই আত্মবিক্রিত সুবিধাবাদী অংশ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থরক্ষাকারী দালাল ট্রেড ইউনিয়নের উদ্ভব ঘটায় এবং শ্রমিক আন্দোলনকে বিপথগামী ও ঐক্যহীন করে। সাম্রাজ্যবাদ উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে, তারা বিজ্ঞানপ্রযুক্তিকারিগরি অগ্রগতিকে কেবল মুনাফার স্বার্থে কুক্ষিগত করে রাখে। অন্যদিকে, একচেটিয়া দখলস্বত্ব বিপন্ন হবার আশঙ্কায় বৈজ্ঞানিককারিগরি উদ্ভাবনগুলিকে উৎপাদনে ব্যবহার করতে ভয় পায়। কেবল সামরিক ক্ষেত্রে মারণাস্ত্র উৎপাদনে বিজ্ঞানপ্রযুক্তিকে কাজে লাগায়। ফলে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ব্যাহত হয়।

কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ আবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথও প্রশস্ত করার মাধ্যমে তার ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করে। কেননা সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলে আবদ্ধ সারা বিশ্বের শোষিতবঞ্চিতনিপীড়িত জনগণের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্বসংঘাত ক্রমশ তীব্র হয়। শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য সংগ্রামে রূপ নেয়। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে উঠে এবং শ্রমজীবী জনগণ ক্রমে বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যে বিশ্ববাজার দখল নিয়ে অন্তর্বিরোধও চরমে ঠে। ফলে তারা পরস্পরকে দুর্বল করে তোলে। এভাবে সাম্রাজ্যবাদ তার পচনশীল মুমূর্ষু ও ক্ষয়িষ্ণু চরিত্র নিয়ে আত্মধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু স্মরণ রাখা দরকার সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংস স্তুপ থেকে সমাজতন্ত্রের উদ্ভব আপনাআপনি, স্বয়ংক্রিয় বা যান্ত্রিকভাবে ঘটবে না। এর জন্য প্রয়োজন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং সমাজতন্ত্র অভিমুখী লাগাতার সংগ্রাম। অন্যদিকে, সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় এই লেনিনীয় সূত্রায়নকে যান্ত্রিক ও সংকীর্ণ অর্থে বিবেচনা করলে চলবে না। সর্বোচ্চ পর্যায় মানে এই নয় যে, এরপর আর সাম্রাজ্যবাদের অধীনে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটবে না। কেননা বিজ্ঞানপ্রযুক্তিগত বিপ্লবের সুফল, সমাজতান্ত্রিক বিপর্যয় পরবর্তী আদর্শগত নিরাশা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে কমিউনিস্ট আন্দোলনের দুর্বলতা, শ্রমিক আন্দোলনে সুবিধাবাদদালালি, ব্যক্তিসর্বস্ব ভোগবাদী সংস্কৃতির আগ্রাসন ইত্যাদিকে কাজে লাগিয়ে সাম্রাজ্যবাদ তার অস্তিত্বকে দীর্ঘ করতে সক্ষম।

যেসব গ্রন্থ থেকে অকুণ্ঠ সাহায্য নেয়া হয়েছে

সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়, ভি আই লেনিন, ন্যাশনাল বুক এজেন্সী, মার্চ ২০০৮, কলকাতা এবং প্রভাত পট্টনায়ক কর্তৃক এই গ্রন্থের ভূমিকা / একুশ শতকের সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্য ও যুদ্ধ একটি লেনিনবাদী মূল্যায়ন, রতন খাসনবিশ, অগ্রণী, ১ জুলাই ২০০৩, ঢাকা / সাম্রাজ্যবাদের রাজনীতি ও অর্থনীতি, পল সুইজির নির্বাচিত প্রবন্ধসংকলন, সম্পাদনা দীপংকর চক্রবর্তী, পিপলস বুক সোসাইটি, ২০০৭, কলকাতা / প্রতিরোধের বিশ্বময়তা, সম্পাদনা, সামির আমিন ও ফ্রাঁসোয়া উতার, ন্যাশনাল বুক এজেন্সী, ২০০৪, কলকাতা / বিশ্বায়ন ভাবনাদুর্ভাবনা, প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, ন্যাশনাল বুক এজেন্সী, মার্চ ২০০৮, কলকাতা / বিশ্বায়ন কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন, কাভালজিৎ সিং, নারী প্রগতি সংঘ ও ইউপিএল, ২০০৫, ঢাকা / ধনতন্ত্র বিশ্লেষণ মার্ক্স, কেইনস এবং শুমপিটার, হীরেন্দ্রনাথ রায়, পশ্চিমবঙ্গ, বাংলা আকাদেমী, ২০০০, কলকাতা / উত্তর আধুনিক রাজনীতি ও মার্কসবাদ, প্রদীপ বসু, পুস্তকবিপনী, ২০০৫, কলকাতা

————————————————————

শাহীন রহমান :: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি )

প্রথম প্রকাশ: মঙ্গলধ্বনির সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৫

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.