লিখেছেন: আব্দুল্লাহ আল শামছ্ বিল্লাহ

উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

রাফায়েল ল্যামকিন। এই ভদ্রলোকের বাড়ি ছিল পোল্যান্ডে। পেশায় ছিলেন আইনজীবী। এই ভদ্রলোক প্রথম genocide বা গণহত্যা শব্দটির প্রবর্তন করেন। সময়টা ছিল ১৯৪৪ সাল। উল্লেখ্য তখন পর্যন্ত গণহত্যা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় নি। তিনি দুটি শব্দ থেকে এই শব্দটি তৈরি করেন। একটি হলো গ্রিক শব্দ genos যার অর্থ পরিবার বা গোত্র বা দল। আরেকটি শব্দ হলো ল্যাটিন শব্দ cide যার অর্থ মেরে ফেলা। এই শব্দটি তিনি তার লেখা বই Axis Rule in Occupied Europe: Laws of Occupation – Analysis of Government – Proposals for Redress অন্তর্ভুক্ত করেন। এই শব্দটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন যে, সাধারণত গণহত্যা বলতে কোনো জাতিকে পুরোপুরি মেরে ফেলা বা ধ্বংস করা নয় বরং সেই জাতির কোনো অংশকে মেরে ফেলা বা মেরে ফেলতে চাওয়াকেই বোঝায়। এটার উদ্দেশ্য হতে হবে বিভিন্ন জাতির নিজস্বতা, জীবনধারা ধ্বংস করার বা ঐ নির্দিষ্ট জাতিকে মুছে ফেলার একটা সুনির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি। এটা হতে পারে কোনো জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, জাতীয়তাবোধ, ধর্ম ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে; রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে পার্থক্য সৃষ্টি করা বা ঐ জাতির কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, স্বাস্থ্য, আত্মমর্যাদা, এমনকি ঐ নির্দিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব জীবনধারা পর্যন্ত ধ্বংস করা।

সময় ১৯৪৫৪৬। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ। সারা পৃথিবীর মানুষ উন্মুখ হয়ে ছিল অক্ষশক্তির উপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য। সেই সময় আমেরিকান বিচারক রবার্ট এইচ. জ্যাকসনএর প্রায় একক প্রচেষ্টায় নুরেমবার্গ মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল গড়ে ওঠে, যাকে সংক্ষেপে আমরা নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল বলে জানি। এই ট্রাইব্যুনালে বিচার্য অপরাধসমূহ ঠিক করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি সময় ও শ্রম গিয়েছে। কিন্তু এই ট্রাইব্যুনাল গণহত্যাকে অপরাধ হিসেবে গ্রহণ করে নি। মনে রাখতে হবে তখন পর্যন্ত গণহত্যা ধারণাটা মাত্র প্রকাশ পেয়েছে, এবং ল্যামকিন সাহেব তখনও নবি মাত্র। যাই হোক কিন্তু বিচার চলাকালীন সময়ে দেখা গেল যে, বারবার গণহত্যা সামনে চলে আসছে। সেই প্রেক্ষিতে, “Count 3 of the indictment of the 24 Nazi leaders at the Nuremberg Trials” ঘোষণা দেয় তারা (বিবাদীরা) ইচ্ছাকৃতভাবে ও সুনির্দিষ্ট উপায়ে গণহত্যা ঘটিয়েছে যেমন, জাতিগত ও গোষ্ঠীগত উচ্ছেদ করেছে, দখলকৃত এলাকায় বেসামরিক জনগণের মধ্যে নির্দিষ্ট শ্রেণী ও পেশা এবং জাতিগত, গোষ্ঠীগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিশেষ করে ইহুদি, পোলিশ, জিপসী এবং অন্যদের ধ্বংস করেছে।

নুরেমবার্গ মিলিটারি ট্রাইব্যুনালএরতো টোকিও ট্রাইব্যুনাল বা ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ফর দি ফার ইস্টএর আইনেও গণহত্যা ছিল না। কিন্তু বারবার এখানেও একই কথা উচ্চারিত হয়েছে। এই সমস্যার সমাধানের জন্য তখন অনেকেই চিন্তাভাবনা শুরু করেন। ১৯৪৬ সালে ল্যামকিন সাহেব Genocide, American Scholar, Volume 15, no. 2তে উল্লেখ করেন যে, কোনো জাতীয়, ধর্মীয় বা জাতিগত গোষ্ঠীকে নির্মূল করার ষড়যন্ত্রকেও গণহত্যার অপরাধ হিসেবে ধরা উচিত। এই ষড়যন্ত্র হতে পারে প্রকাশ্যে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কোনো জীবন, স্বাধীনতা বা সম্পত্তির উপর আক্রমণ; হয়তো ঐ ব্যক্তির সাথে ঐ নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর খুব কমই যোগসূত্র ছিল। এই অপরাধ সংগঠিত হতে পারে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যখন কোনো জাতীয়, গোষ্ঠীগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার জন্য ষড়যন্ত্র করে; ঐ গোষ্ঠীসমূহের উপর আক্রমণ করে তখন সে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী গণহত্যার অপরাধে অপরাধী।

এর পরে জাতিসংঘ এই ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু করে। ১৯৪৬ সালের ১১ ডিসেম্বর রেজুলেশন নম্বর ৯৬() দ্বারা এর স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সাধারণ পরিষদের কাছে ড্রাফট কপি চেয়ে পাঠানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর CONVENTION ON THE PREVENTION AND PUNISHMENT OF THE CRIME OF GENOCIDE” নামের একটি রেজুলেশন পাশ করে। এটি নিয়েও জল কম ঘোলা হয়নি। যা হোক, ১৯৫১ সালের ১২ জানুয়ারি এটা কার্যকর হয়। এর আর্টিকেল আছে সে সমস্ত অপরাধ গণহত্যা হিসেবে গণ্য হবে; যদি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে কোনো জাতি, জাতিসত্তা, বর্ণ বা ধর্মগত গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার ইচ্ছা থাকে

১। কোনো গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা করা;

মারাত্মক শারীরিক বা মানসিক ক্ষতিসাধন করা;

৩। এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা, যাতে তারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়;

৪। এমন পরিবেশ তৈরি করা, যাতে জন্মপ্রতিরোধ হয়ে যায়;

৫। একটি জাতি বা গোষ্ঠী শিশু সদস্যদের জোর করে অন্য স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া;

অর্থাৎ এই convention অনুযায়ী সুস্পষ্টভাবে ৫টি কাজকে গণহত্যা অপরাধের আওতায় আনা যায়। আবার এই অপরাধগুলো সম্পূর্ণরূপে হতে হবে তারও কোনো যৌক্তিকতা নেই, আংশিক হলেও অপরাধ হবে। মূলত এই কাজের মাধ্যমে ইচ্ছা প্রমাণ হলেই চলবে।

লক্ষ্য করুন, এখানে বেশ কয়েকবার গোষ্ঠী শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে। এই গোষ্ঠীর সংজ্ঞা দেওয়া আছে এখানে যেখানে ৪টি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কথা বলা হচ্ছে। সেগুলো হলো . জাতিগত গোষ্ঠী; . জাতিসত্তাগত গোষ্ঠী; . বর্ণগত গোষ্ঠী; . ধর্মগত গোষ্ঠী। অর্থাৎ গোষ্ঠীগত বিচারে অপরাধীকে এই নির্দিষ্ট ৪টি গোষ্ঠীর সাথে অপরাধ সংঘটিত করতে হবে।

এখন কথা হচ্ছে, কেউ কি সরাসরি এই কাজগুলোর সাথে যুক্ত হলেই কেবল গণহত্যার অপরাধে অপরাধী হবে? উত্তর হলো না। এই convention এর ৩ নম্বর আর্টিকেলে বলা হয়েছে নিচের কাজগুলো শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে

১। গণহত্যা চালানো; ২। গণহত্যা চালানোর ষড়যন্ত্র/পরিকল্পনা করা; ৩। প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে গণহত্যা উস্কে দেয়া; ৪। গণহত্যা চালানোর চেষ্টা করা; ৫। গণহত্যায় যে কোনো প্রকারে সহযোগী হওয়া ও সমর্থন করা।

অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি এই পাঁচ ধরনের কাজের সাথে যুক্ত থাকলে সে অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবে। এখন আরেকটি প্রশ্ন থেকে যায় কোনো ব্যক্তি কি এই আইনের ঊর্ধ্বে থেকে যাবে? এর উত্তর পাওয়া যায় আর্টিকেল । এখানে বলা আছে উপরোক্ত যে কোনো একটি অপরাধেই, অপরাধী যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবে তা সে সাংবিধানিক সরকার, সরকারের কর্মচারী, কোনো দল, কিংবা একক কোনো ব্যক্তিই হোক।

এখন আসি এই convention এর পরের বিচারগুলোতে। International Criminal Tribunal for the former Yugoslavia বা যুগোস্লাভ ট্রাইব্যুনাল উপরের আইনগুলো অপরিবর্তিত অবস্থায় গ্রহণ করেছে। শুধু আর্টিকেল নাম্বারের এদিক ওদিক আছে। International Criminal Tribunal for Rwanda বা রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রেও একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি হয়েছে।

উপরোল্লিখিত সবগুলো আদালতই অস্থায়ী; শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সময়ের অপরাধের জন্য গঠিত আদালত। আন্তর্জাতিক অপরাধী আদালত, যা স্থায়ী আদালত; সেখানেও উপরের আইনগুলো অপিরবর্তিত অবস্থায় গ্রহণ করা হয়েছে।

এখন দেখি আমাদের দেশের ট্রাইব্যুনাল কি বলছে? আমাদের দেশের ট্রাইব্যুনাল বা বিডি ট্রাইব্যুনাল উপরোক্ত convention-এর আইনগুলো প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় গ্রহণ করেছে। প্রায় অপরিবর্তিত বলছি এই কারণে যে, এখন পর্যন্ত

আর্টিকেল ২ এর শেষে convention যেটা as such করেছে বিডি ট্রাইব্যুনাল আইনে সেটা such as করা হয়েছে;

এখানে গোষ্ঠীর বর্ণনা করতে গিয়ে political group বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই লপয়েন্টে আমাদের আইনটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আধুনিক। রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কথা ল্যামকিন সাহেবও তার বিভিন্ন লেখায় বলেছেন; জাতিসংঘে বহুবার আলোচিত হয়েছে, কিন্তু এটাকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। এই প্রথম আমাদের আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমার কাছে মনে হয় রাজনৈতিক গোষ্ঠীটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠী। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি হয়েছে এবং হয়েই চলেছে এখনও পর্যন্ত বিশেষ করে বাঙলাদেশে। তাই এই সংযোজন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

উপরেবর্নিত convention এর অপরাধগুলোর দিকে আরেকবার তাকানো যাক। যে ৫ ধরনের অপরাধের কথা বলা হয়েছে তার ৩ ও ৪ নম্বরে আছে পর্যায়ক্রমে ৩। এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা, যাতে তারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়; এবং ৪। এমন পরিবেশ তৈরি করা, যাতে জন্মপ্রতিরোধ হয়ে যায়। আর বাকি ৩ টা অপরাধ সুস্পষ্ট। এই দুইটার কথা বলতে গেলে, এর সীমা কতোদূর যায়? ধরু, কেউ আপনাকে সরাসরি মারলো না, কিন্তু আপনাকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে আপনার বাড়ির চারপাশে বিশাল বিশাল দেয়াল তুলে দিল। উল্ল্যেখ্য আপনার বাড়ির আশেপাশের সব জমি ঐ ব্যক্তির। আপনি না খেয়ে মারা গেলেন। এটা হত্যার অপরাধের সংজ্ঞায় পড়বে। তেমনই কোনো দেশ যদি কোনো দেশের বিপক্ষে অবরোধ করে ঐ দেশের মানুষ মারে, তবে সেটা গণহত্যার আওতায় পড়তে বাধ্য। আবার ধরুন, আপনি গোষ্ঠীবদ্ধভাবে কোনো গোষ্ঠীর নারীদের ধর্ষ করলেন; যেন আগামী ১০ মাস ঐ মেয়ে নিজের গোষ্ঠীর কারও দ্বারা আর গর্ভবতী হতে না পারে। অর্থাৎ পরিকল্পিতভাবে আপনি ঐ নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্মপ্রতিরোধে ভূমিকা রাখছেন। এইটাও গণহত্যা হতে বাধ্য।

এখন আসি কোন সময়ের অপরাধ এই আদালতগুলো বিচার করতে পারবে। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল বিচার করতে পারতো শুধুমাত্র জার্মানিনাৎসি অপরাধীদের। টোকিও ট্রাইব্যুনাল বিচার করতে পারতো শুধু জাপানের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের অপারাধীদের। যুগোস্লাভ ট্রাইব্যুনাল বিচার করতে পারতো শুধু পূর্বের যুগোস্লাভএর যুদ্ধের সময়কার অপরাধীদের। রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল বিচার করতে পারে রুয়ান্ডায় সংঘঠিত অপরাধ ও এর আশেপাশের দেশের অপরাধের যেখানে অপরাধের সাথে রুয়ান্ডার নাগরিকযুক্ত আছে। এই দিক থেকে বিডি ট্রাইব্যুনালর আইনটি অনেক বেশি এগিয়ে। সেকশন লা হয়েছে যে, যে কোনো দেশের নাগরিক যদি বাঙলাদেশের ভৌগলিক সীমারেখায় এই আইন তৈরি হওয়ার আগে বা পরে যখনই পরাধ করে থাকে, তখনই এই আইন দ্বারা তার বিচার করা যাবে। অর্থাৎ স্পষ্টত দুই শ্রেণীর অপরাধীকে এই আইনের আওতায় বিচার করা যাবে। ০১. বাঙলাদেশের নাগরিক এবং ০২. অন্য যে কোনো দেশের নাগরিক; যদি সে বাঙলাদেশের পরিসীমায় অপরাধ করে থাকে। এবং এই আইনের রেট্রস্পেক্টিভ ইফেক্ট আছে। অর্থাৎ বাঙলাদেশ নামক রাষ্ট্র যতোদিন ছিল, থাকবে বা আছে; সবসময়ের অপরাধের জন্যই এই আইন ব্যবহার করা যাবে।

৭১ সালের পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের সমমনা সহযোগী অপরাধীদের বিচার চলছে। এবার হয়তো জাতির মুক্তিযুদ্ধের সমকার অপরাধের দায়মুক্তি ঘটতে পারে। কিন্তু সাথে সাথে আমি আরও কয়েকটি বিষয়ে সবার মনোযোগ আকর্ষ করছি। সেটা হলো ৭২৭৮ সাল পর্যন্ত রক্ষীবাহিনী দ্বারা (পড়ুন: শান্তি সেন রচনা সমগ্র) ও ২০০৪২০০৮ পর্যন্ত র‍্যাব দ্বারা সংগঠিত হত্যাকাণ্ড (পড়ুন: ক্রসফায়ার রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড); পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে সেটেলার ও সেনাবাহিনী দ্বারা সংগঠিত হত্যাকাণ্ড ও আধুনিক সময়ে বিভিন্ন কলকারখানার (বিশেষ করে গার্মেন্ট সেক্টরে) পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এগুলোকে যদি দায়মুক্তি দেওয়া হয়, বা বিচারের আওতায় না আনা হয়; তবে বাঙলাদেশ রাষ্ট্র ও তার বিচার বিভাগ কোনোদিনই প্রশ্নের বাইরে থাকতে পারবে না।

বর্তমান পরিপ্রেক্ষিত

গণহত্যা এমন একটি শব্দ, যা আজ এই ২১ শতকে আর কারও কাছে অপরিচিত নয়। কিন্তু আমরা এই শব্দটি বলতে কি বুঝি? ৯৯ ভাগ মানুষ বোঝে ১৯৭১ সালে পাকজামাত সৃষ্ট হত্যাকাণ্ডকে। যেখানে পাকজামাত এদেশের নির্দিষ্ট গোষ্ঠীসমূহের উপর পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। পাকজামাত এদেশের নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের উপর ঠাণ্ডা মাথায় এই হত্যাকাণ্ড চালায়। এর বাইরে তাকালে দেখা যায় ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার গণহত্যাকেসেখানে গৃহযুদ্ধে হুতু ও তুতসি উভয়ই পরস্পরের হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে।

আমরা রাষ্ট্রঘোষিত বিখ্যাত গণহত্যাগুলো মনে রাখি মনে রাখি মৃতদের মনে রাখি ঘাতকদের। জাদুঘরে এসবের জন্য জায়গা বরাদ্দ দিই। বছর বছর পত্রিকার পাতা ভর্তি করি। এইসব বিখ্যাত গণহত্যাগুলোর বিচার বা পর্যালোচনা হচ্ছে বিশেষ কিছু কারণে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই ঘাতকেরা হয় পরাজিত। বর্তমানে এমনকি বেশিরভাগ সময়ে গণহত্যা ক্ষমতায় যাওয়ার, ক্ষমতা পাওয়ার বা পোক্ত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। ঘাতকদের ক্ষমতা থাকে, তাই তারা যা ইচ্ছা তাই করে। কেউই রুখে দাড়াতে সাহস করে না। আরও ভয়ের ব্যাপার হলো তারা তাদের অপরাধ থেকে বাচতে এইসব গণহত্যা চালায়।

চলচ্চিত্র নির্মাতা জোসেফ ওফেনহেইমার ১৯৬০ সালে ইন্দোনেশিয়ায় ঘটে যাওয়া গণহত্যার সাথে যুক্ত থাকা কয়েকজন ঘাতকের সাথে দেখা করেন ও কথা বলেন। ওফেনহেইমারের এক প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, গণহত্যা কাকে বলে আর কাকে বলে না তা নির্ভর করে কারা জিতলো তার উপর। আমরা এখানে বিজয়ী এবং আমরাই সিদ্ধান্ত নেব ওদেরকে কিভাবে মারবো। হা হা হা এই্ চিত্রগুলো নিয়ে তিনি একটি সিনেমা বানান যার নাম the act of killing এখানে দেখা যায়, কি পরিমা কৌতুক করে ও হাসিঠাট্টা করা হয়েছে ঐ সময়ে সংঘটিত এইসব রাজনৈতিক গণহত্যায়।

হিটলার নিশ্চিতভাবে আমেরিকার আদিবাসীদের তাড়ানো দেখে ইউরোপে গণহত্যা চালানোর সাহস পেয়েছিল। যদি আমেরিকার এই গণহত্যা পাপ না হয়, তবে জার্মানির হবে কেন? এখন বিভিন্ন বইপত্রে, সিনেমায়, জাদুঘরে দেখা যায় কিভাবে আমেরিকা তা ব্যাখ্যা রছে; যেমন ইন্দোনেশিয়ায় তারা বলেছিল কোনটা অপরাধ আর কোনটা নয়, তা আমরা ঠিক করি। এই ২১ শতকে এসেও তা বন্ধ হয়নি; বরং তা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, গণতন্ত্র রক্ষার যুদ্ধের নামে বৈধকরণ হচ্ছে।

মাহিন্দা রাজাপাকসে তামিলদের হত্যা করেছিল তামিল টাইগারদের হাত থেকে দেশকে বাঁচানো জন্য। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় শ্রীলংকান সেনাদের ট্রফি ফুটেজে কিভাবে তামিলদের অমানবিকভাবে হত্যা করা হয়েছে; এমনকি এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শ্রীলংকার পক্ষ থেকে ঘোষিত নো ফায়ার জোনএ কিভাবে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

ইসরায়েল আজ এইসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি করছে নতুনভাবে। আমাদের দেশের পরিসীমায় তা প্রকাশিত হয় অপরেশন ক্লিনহার্ট বা ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টারে; অথবা পার্বত্য চট্টগ্রামের সামরিকায়ন, সেটেলারকরণের মাধ্যমে।

গণহত্যা নিয়ে ভাবতে গেলে এর বাইরে সাধারণত আর আমাদের ভাবনা এগোয় না। ১৯৭১ সালে এদেশের আপামর জনসাধারণ যে আশা নিয়ে মরণপণ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল, তার ফল এই ভূখণ্ড। কিন্তু সেই জনসাধারণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এই স্বাধীন দেশে ঘটেনি। লক্ষ্য করুন, মুক্তিযোদ্ধাদের বেশিরভাগ কারা ছিল? কারা বেশি জুলুমনির্যাতনের শিকার হয়েছিল? কারা এক কথায় কচুকাটা হয়েছিল? আর এখন সেই লোকগুলোর অবস্থা কেমন? এর উত্তর আশা করি আমাদের অজানা নয়। অথচ আমরা নাকি মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেতে যাচ্ছি। অথচ এখানে এখনও শ্রমজীবী জনগণ গণহত্যার শিকার হয়। কিন্তু ভুলে যেতে বলা হয় ঐসব বিশেষ কিছু গণহত্যার কথা। আমাদের তা ভুলিয়ে দেয়া হয় বিশেষ কোনো কারণে। তানোর গণহত্যা, গার্মেন্ট শ্রমিকদের গণহত্যা, পাহাড়ের গণহত্যা, ক্রসফায়ারের গণহত্যা এগুলো যেন মূল্যহীন; এর নাম নিতেও যেন মানা!

আমাদের বোঝা দরকার পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যে গণহত্যা চলছে তার আসল উদ্দেশ্যগুলো কি কি? ৭১এ পাকিস্তানি শাসকেরা বা নাৎসি হিটলার সচেতনভাবেই এই গণহত্যা চালিয়েছে। তারা কখনও অস্বীকার করেনি এগুলো। আজ কী সেই মানসিকতা নিঃশেষ হয়েছে? তা কেবল ইতিহাস নিয়ে খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করেই বলা সম্ভব এমনটা হয়নি; রূপ পাল্টেছে মাত্র

সামাজিক পরিকাঠামো পাল্টানোর সাথে সাথে যুদ্ধের গতিপথ পাল্টায়। উপনিবেশ যুগ শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন আর আগের ঐ রূপে এক দেশ আরেক দেশ দখল বা আক্রমণ করতে পারে না। তাই দরকার নতুন নতুন তত্ত্ব। যার ফল আমরা পায় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, বন্ধুর স্বার্থে যুদ্ধ বা গণতন্ত্র রক্ষার যুদ্ধ। কিন্তু কোন নিরিখে এগুলোর বিচার বিশ্লেষণ করা হয় তা আমরা জানতে পারি না পায় না। এই আগ্রাসন ও সংঘাতের যে গণহত্যা চরম পর্যায়ে পৌঁছে তা দৃষ্টান্ত দেখানোয় দাঁড়িয়ে গেছে।

ভ্লাদিমির দেদিজা তার বই অন মিলিটারি কনভেনশনস দেখিয়েছেন, তার চরিত্র কিভাবে স্পষ্ট হয়। এখানে তিনি মোটামুটি ৬টি কারণ বিশ্লেষণ করেছেন

০১. নতুনতর বাজারের জন্য শিল্পে উন্নত দেশগুলোর লড়া ও প্রতিযোগিতা জন্ম দিল এক স্থায়ী বৈরিতার বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ নামে পরিচিত মতাদর্শ ও তার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে যা প্রকট হয়।

০২. এই বৈরিতার উৎস যে শিল্প তার বিকাশ আরও বেশি বেশি মারণাস্ত্র উৎপাদনের মধ্য দিয়ে কোনো এক প্রতিযোগীকে সুবিধাজনক অবস্থানে উঠে আসার রসদ যোগায়। কিন্তু এই উন্নতির ফল হলো এই যে, রণাঙ্গনের সঙ্গে গৃহস্থের প্রাঙ্গণ, সৈনিকের সাথে সাধারণ নাগরিকের তফাৎ করাটা ক্রমে দুরূহ হয়ে দাঁড়ালো

০৩. একই সময়ে নতুন এই সামরিক অভীষ্টে কারখানাগুলোও গড়ে উঠলো শহরের কাছাকাছি। আর সেসব যখন সেনাবাহিনীর জন্য সরাসরি কোনো জিনিস বানায় না, তখনও অন্তত খানিক দূর পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক শক্তিকে ধরে রাখে। আর এ হলো নির্দিষ্ট সেই শক্তি; শত্রুরা যা ধ্বংস করতে চায়। একই সঙ্গে তা যুদ্ধের লক্ষ্য এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর উপায়।

০৪. এর ফল হয় এই যে, যুদ্ধের সঙ্গে কার্যত যুক্ত হয়ে পড়ে সকলেই। কৃষক লড়ে ফ্রন্টে, শ্রমিক লড়ে তার পিছনে, আর কৃষক মেয়েদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের স্বামীদের জন্য। জাতির বিরুদ্ধে জাতির বা দেশের বিরুদ্ধে দেশের এই সর্বাত্মক লড়াই শ্রমিককেও পরিত করে সৈনিকে; যেহেতু শেষ বিচারে অর্থনৈতিক শক্তি যার বেশি, জেতার সম্ভাবনাও তার বেশি।

০৫. বুর্জোয়া রাষ্ট্রের আপাত গণতান্ত্রিক রূপ এবং শ্রমিকশ্রেণীর বন্ধনমুক্তি ক্রমে সাধারণ মানুষকেও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে। সরকারি সিদ্ধান্তে যদিও সাধারণ মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণই থাকে না, তবুও মধ্যশ্রেণী ভাবতে থাকে যে, ভোট দিয়ে তারা অন্তত একজাতীয় দূর নিয়ন্ত্রকের ভূমিকাই পালন করছে। আর প্রতিরক্ষার জন্য যুদ্ধের সময় ছাড়া অন্য সময়ে শ্রমিকশ্রেণী শান্তির জন্য তাদের আকাঙ্ক্ষা এবং তাদের মধ্যে সঞ্চায়িত জাতীয়তাবাদ নিয়ে গভীর দোলাচলে পড়ে। এ ভাবযুদ্ধ এক নতুন আলোয় প্রতিভাত এবং প্রচারে প্রচারে বিকৃত হয়ে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে এক নৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটি যুদ্ধরত জাতির সমস্ত নাগরিক অন্য দেশের সম্পদ ও নাগরিকের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। আর তখন যুদ্ধ হয়ে ওঠে সর্বাত্মক।

০৬. এই একই সমাজ তাদের প্রযুক্তিগত উন্নতি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি যোগাযোগ বৃদ্ধি রাখার মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার সুযোগ প্রসারিত করতে থাকে। মার্কিনিদের বিখ্যাত এ বিশ্বনীতি উনিশ শতকের শেষেও ছিল যখন আর্জেন্টিনার গম ইংল্যান্ডের কৃষিতে চুড়ান্ত আঘাত হানে। সর্বাত্মক যুদ্ধ আজ আর কেবলমাত্র যুদ্ধরত এক জাতিগোষ্ঠীর সকল সদস্যের সঙ্গে অন্য জাতির সকল সদস্যের নয় এ যুদ্ধ সর্বাত্মক, কারণ খুব সম্ভবতঃ তা গোটা বিশ্বেই আগুন ছড়াবে।

আমরা যাদের শাসক বলতে বুঝি, তাদের কাছে এটা পরিষ্কার এই সর্বাত্মক যুদ্ধ ছাড়া আর তাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। আবার আগের আলোচিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর ক্ষমতা তারা রাখে। তাই আমরা এই গণহত্যা দেখে শুধু চুপ থাকতেই বাধ্য হচ্ছি না; বরং নির্বোধের মতো চেচিয়ে একে মানবিক করে তোলার চেষ্টা করছি। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সবচেয়ে টাটকা নিদর্শন হিসেবে দুটো দৃষ্টান্ত আমরা বলতে পারি

. নুরেমবার্গ ট্রায়ালের কিছুদিন পর ৪৫,০০০ আলজেরিয়কে হত্যা করা হয়েছিল, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট শ্রেণীকে চুপ করানোর জন্য, আরও সুনির্দিষ্ট করে বলা যেতে পারে ঐ সময়ের কমিউনিস্ট উত্থানকে ঠেকানোর জন্য।

. ৭২ সালে তানোরে আত্মসমর্প করার পর সাম্যবাদী দলের কর্মীদের হত্যা করা হয়, শুধু উদাহরণ সৃষ্টি করার জন্য; যাতে আর কেউ কখনও মুজিব সরকারের কথার বাইরে গিয়ে কোনো কথা না বলে।

অবশ্য এই ধরনের ঘটনা এই সময়েতোই সাধারণ হয়ে পড়েছে যে, এই ঘটনাগুলো আজ আর কেউ বলার প্রয়োজন মনে করেন না। আবার বিদ্রোহী হয় ওঠে শুধুমাত্র তারা, যারা সবকিছু হারিয়েছে। তারা কখনও ধনিকশ্রেণী নয়। সে ৭১ হোক আর আমাদের স্বাধীন বাঙলাদেশই হোক।

এখন প্রশ্ন হলো এই গণহত্যা বা যুদ্ধের নতুন রূপের দরকার হলো কেন? বিদ্রোহী বা মুক্তিকামী মানুষের সাথে নিপীড়িত অবহেলিত মানুষের সাথে থাকে আত্মার সংযোগ। আর এর থেকে জন্ম নেয় সেই বিখ্যাত অনন্যজীবীতা। ফলে মুক্তিকামী যোদ্ধারা এই সকল নিপীড়িত মানুষদের দিশা দেখায়, দেখায় মানুষ হিসেবে বাঁচার মন্ত্র আর শ্রমজীবী শ্রেণীর মানুষেরা এগিয়ে আসে মুক্তিকামী যোদ্ধাদের দল বাড়াতে বা শূন্যস্থান পূরণ করতে।

একটা ঘটনা আমরা দেখতে পারি। এতো শক্তিশালী অবৈধ রাষ্ট্র ইরায়েল ফিলিস্তিন দখল করতে হিমশিম খাচ্ছে। তার একমাত্র কারণ তাদের প্রচলিত যুদ্ধের রীতিকে এই প্রতিরোধযুদ্ধ দূর করে দিয়েছে। এ্‌ রীতি আর কোনো কাজে লাগছে না। তাই তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে পাইকারি হারে মারছে। কারণ ইজরায়েল খুব ভালোভাবে বুঝেছে এই যুদ্ধের মেরুদণ্ড ঐ আপোষকামী ফাত্তাহ বা ফিলিস্তিনি এলিটরা নয়; বরং ঐ নির্বোধ ফিলিস্তিনি সাধারণ জনগণ।

নয়াউপনিবেশবাদের নামে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তা এরকম যে, কোনো স্বাধীন দেশে শাসকদের নিজেদের মতো এক সরকার বসিয়ে দাও। তারাই তার স্বার্থে ঐ শাসকের সকল আবদার, তা যতোই অন্যায় হোক, তা পূরণ করবে। একথা কেউই অস্বীকার করবে না যে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনের পর থেকে আমাদের দেশের শাসকশ্রেণী তা বারবারই পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছে। আর তাদের টিকে থাকার সমস্ত রসদ অর্থস্ত্র সবই যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদীরা জোগান দিয়ে যাচ্ছে। ফলে আমাদের এই দেশে যতোই আমরা গণতন্ত্রগণতন্ত্র বলে চেঁচাই না কেন; তার ক্ষমতা কেবল ঐ গুটিকয়েক সুযোগসন্ধানী শ্রেণী বা বৈদেশিক পুঁজির হাতে থেকে গেছে। এদেশের নিপীড়িত মানুষের হাতে সেই ক্ষমতা আসেনি।

গণহত্যার আরেকটি দিক হলো অর্থনৈতিক। ১৯৭১ সালে যেমন টিক্কা খান ঘোষণা করেছিল পূর্বপাকিস্তানের মানুষ নয়, মাটি চাই। এ কথায় পরিষ্কারভাবেই তার মর্মকথা উদ্ধার করা যায়। আদমজী গংএরতো এলিটদের স্বার্থরক্ষাই ছিল তাদের কাছে বড় এদেশের নিপীড়িত মানুষদের কোনো দামই তাদের কাছে নেই। ঠিক তেমনি স্বাধীন বাঙলাদেশে মুজিবের তোরা সব বাঙালি হয়ে যা কথাটির উদ্দেশ্য যে কতোটা বাস্তবিক; তা আমরা টের পায় পরবর্তী সময়কালে পাহাড়ে সংগঠিত গণহত্যাগুলো মধ্য দিয়ে

আইনগত দিক দিয়ে এই গণহত্যা থেকে আমাদের শাসকগোষ্ঠী কোনোভাবেই পার পেতে পারে না। বাঙলাদেশের আইন মতেই তারা দোষী প্রমাণিত হয়৭১ পরবর্তী প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ড; তা বিশেষ অভিযানেই হোক, বা ক্রসফায়ারেই হোক তা গণহত্যা। প্রাপ্ত তথ্যউপাত্ত থেকে আমরা দেখতে পাই যে, কি পরিমা নির্যাতন আমাদের এখানে চলেছে এবং চলছে। সেগুলো সবই আবার পরিকল্পিত। আর তা না হলে অন্তত দায়মুক্তির আইনের প্রয়োজন হতো না।

যারা এখনও ভাবেন সরাসরি হত্যা না হলে গণহত্যা হয় না; তাদের কাছে প্রশ্ন অন্য কি বিকল্প ছিল ঐসব মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে? হয় দালাল হওয়া, না হয় শোষিত হওয়া। বিবিধ উপাত্তগুলো থেকে আমরা কি পায়? অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিকসামাজিক সম্পর্ক ভাঙা হচ্ছে, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের সমস্ত কিছু কেড়ে রাখা হচ্ছে। পরিবারের একমাত্র ঐ কায়িক শ্রম বেচা মানুষটি মারা পড়লে এ পথ সমাজই করে দেয়।

এই সকল গণহত্যা তা যার বিরুদ্ধেই হোক না কেন, সময়ের প্রয়োজনেই আমাদের জানতে হবে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। তা না জানলে মুক্তমনের মানুষ তো দূরের কথা, নিজেদের মানুষ বলে দাবি করার যোগ্যতাও আমাদের থাকবে না মানুষের স্বাভাবিক ধর্মই হচ্ছে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। আর যারা ভাবেন যে, ও বিষয় আমার নয়, তাদের জন্য একটা কবিতা

তারা যখন কমিউনিস্টদের ধরে নিয়ে যেতে এলো,

আমি নীরব ছিলাম,

কারণ আমি কমিউনিস্ট নই।

তারা যখন শ্রমিক ইউনিয়নের লোকগুলোকে ধরে নিয়ে গেল,

আমি কথা বলিনি,

তারপর তারা ফিরে এলো ইহুদিদের ধরে নিয়ে যেতে,

কারণ আমি শ্রমিক নই।

আমি চুপ করে ছিলাম,

কারণ আমি ইহুদি নই।

এবার তারা ফিরে এলো ক্যাথলিকদের ধরে নিয়ে যেতে,

আমি কোনো কথা বলিনি,

কারণ আমি ক্যাথলিক নই।

শেষবার তারা ফিরে এলো আমাকে ধরে নিয়ে যেতে।

কেউ আমার পক্ষে কথা বলল না, কারণ তখন আর কেউ বেঁচে ছিল না।

(মার্টিন নেমলার)

————————————————–

প্রথম প্রকাশ: মঙ্গলধ্বনির সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৫

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.