পাঠ প্রতিক্রিয়া :: বাধন অধিকারীর ‘প্রেম আর প্রতিরোধ’

Posted: জুন 19, 2018 in সাহিত্য-সংস্কৃতি
ট্যাগসমূহ:, , , ,

শব্দমালার বিন্যস্ত স্রোতধারায় আন্দোলিত মনোভূমি

লিখেছেন: নীরা নাজ তারিন

কোনো বই পড়তে গিয়ে কখনো কি আপনার মনে হয়েছে, আপনার জন্যই এটি লেখা হয়েছে? অথবা কখনো কি মনে হয়েছে, আপনাকে নিয়েই রচিত হয়েছে বইটির কোনো কোনো অংশ? আমার সাম্প্রতিক পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি আপনাদের, কখনও কখনও লেখক তার শব্দমালায় সুরধারা সৃষ্টিতে সক্ষম হন। পাঠককে টেনে নিতে সক্ষম হন এক আন্দোলিত মগ্নতার অচেতন বাস্তবতায়। সমস্ত হৃদয়জুড়ে তার শব্দের সুরধারা অবিরাম ঢেউ খেলে যেতে পারে। পড়ে শেষ করার আগ পর্যন্ত ছেড়ে উঠতে কোনোভাবেই মন সায় না দিতে পারে। পড়তে শুরু করতেই বইটি আপনাকে টেনে নিয়ে যেতে পারে এক মোহাবেশে। এমনকি দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় কিংবা অসংখ্য পাঠেও একে আপনার গানের মতো লাগতে পারে, যা আপনি শুনে যেতে পারেন বিরক্তিহীন নিরন্তর।

তো যে বইয়ের কথা বলছি, চূড়ান্ত অর্থে তা যেন জীবনের দালিলিক উপস্থাপনা। সেই বইতে জীবন আছে, মানুষ আছে, প্রকৃতি আছে, আছে রাষ্ট্রের বিধিব্যবস্থা আর একুশ শতকের প্রযুক্তি। আছে অভিজ্ঞতার প্রেরণায় চিনে নেওয়া পরিবর্তনের নিশানা। আমাদের সচেতন মন কিংবা গহীন অবচেতন, আমাদের জীবনমননমৃত্যু, সর্বোপরি আমাদের দৈনন্দিন যাপন; সবই যেন মিশে আছে ওই বইয়ের শব্দমালায়। লেখক তার শব্দমালায় সুরধারা সৃষ্টি করেছে, গানটা তাই গল্প হয়ে গেছে। গল্পটা যেন আমারই কোনো বিগত স্মৃতি। বিগত সেই স্মৃতি আমাকে সংযুক্ত করে সপ্রশ্ন জীবনের সংলগ্নতায়। এখানেই শিল্প আর জীবন সম্মিলিত হয়। শিল্প সেখানে আমার কথা বলে, আপনার কথা বলে, তাদের কথা বলে, সবার কথা বলে।

হয়তো একটা আনন্দময় আবহ থেকে বইটার সূচনা। সমাপ্তিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেখানে দেখা মেলে সেই সব মনের কথা; যা বলা হয়নি কিংবা যা বলতে মানা। সেখানে পাওয়া যা প্রেমের স্রোতস্বীনি, দাউদাউ জ্বলতে থাকা ঘৃণার আগুন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, কান্নাভেজা মন, ক্ষরণের প্রলঙ্করী ঝড়আরও অনেক কিছু। সে বইয়ের প্রতিটি শব্দেই যেন এক নিখাঁ জীবনবোধে চিহ্ন। প্রথম পাঠেই লেখক গেঁথে যান হৃদয়ভূমিতে। এবং যতবার পুনর্পাঠ করা হয়, ততোবারই দৃশপটে হাজির হয় পাঠকের অন্তর্জাত স্বত্তা। যেন প্রতিবিম্বে নিজেরই ছায়া। বইয়ের বিভিন্ন চরিত্র যেন পাঠকের অন্তরাত্মার প্রতিফলন। আমার সমস্ত বিক্ষিপ্ত চিন্তাধারা যেন সুবিন্যিস্ত সুরধারার মতো করে হাজির করা হয়েছে আমার চোখের সামনে, সেই গানের সুরে যেন আমার কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি।

পাতায় পাতায় বিন্যস্ত শব্দমালা যেন লেখকের আঙ্গুলের ডগা, যা আমার হৃদয়ভূমিতে আলতো পরশ বুলিয়ে যায়। পাঠ না করে কোনোভাবেই স্বস্তি মেলে না। বেদনাহত হৃদয়ে আঙ্গুল ছুঁয়ে দিয়ে লেখক যেন আমার জীবনগাঁথার সুরধ্বনি সৃষ্টি করেন। শব্দেই যেন বাসা বাঁধে তার সমগ্র জীবনের আলেখ্য, আর আমি জড়িয়ে পড়ি অত্যাবশ্যক বন্ধনে। সবমিলে তার শব্দমালার নরম পরশে আস্তে আস্তে আমাকে মৃত্যুপথে টেনে নিয়ে যায়; রবার্ট ফ্লেকের সেই গানের মতোন: ‘তার গানের আলতো পরশে আমার মরণ’। আমাকে তিনি নেশাতুর করে তোলেন, প্রতিদিনপ্রতিরাত আমি অত্যাবশ্যক বন্ধনে বাঁধা পড়ে যাই তার রচনার সঙ্গে। তারপরও আমার ভাবনা ফুরোতে চায় না, কিছুতেই না।

শেষপর্যন্ত কেবল একজন গ্রন্থকীট হয়ে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না আমার জন্য। কেবল বইপ্রেমী নয়, আমাকে তার থেকেও বেশি কিছু হতে বাধ্য করেন তিনি। লেখকপাঠক সম্পর্কের সীমাবদ্ধ ছক অতিক্রম করে জীবনবোধসহ নানান ধারার সমিলের মধ্য দিয়ে লেখক আমাকে নিয়ে যান তার সন্নিকটে। লেখকপাঠক ব্যবধান ঘুচতে থাকে, অতিক্রান্ত হতে থাকে দূরত্ব। একটা সময় এসে মনে হয়, যেন হারিয়ে যাওয়া জীবনের কোনো খণ্ডিত অংশ তিনি আমার কাছে হাজির করেছেন। যেন হাতড়াতে থাকা বহু অজানা প্রশ্নের উত্তর মিলেছে। না বোঝা যতো জীবনজিজ্ঞাসা, সে সবের মীমাংসা হয়ে গেছে। আমার তৃষ্ণার্ত হৃদয় যেন তার ছাপা বইয়ের পাতায় হাজির হওয়া ভাবনা থেকে জীবনসুধা পান করতে সমর্থ হয়েছে।

লেখকের ভূমিকা এমনই হওয়া উচিত। তার সঙ্গে, তার রচনার সঙ্গে এবং আরও দূরবর্তী বাস্তবতায় তার রচনার নেপথ্য বাস্তবতার সঙ্গে আপনাকে সংযুক্ত করতে পারা। লেখক সেটা পারলেই কেবল তার রচনা পাঠের মধ্য দিয়ে আপনার ভাবনাবিশ্বের সঙ্গে অপরাপর মানুষের ঐক্যকে আপনি ধরে ফেলতে পারেন। এর কোনো চূড়ান্ত সীমা নেই। এবং সবশেষে মূল কথা হলো, লেখকের কিংবা আপনার কিংবা তার কিংবা আমার কিংবা সবার একই ছাতার তলায় দাঁড়ানো। একজন যথার্থ লেখক পাঠককে তার বিন্যস্ত শব্দের প্লাবনে ডুবিয়ে ফেলতে চান না; বরং তার রচনা আপনার বেদনাবোধ উপশমের হাতিয়ার হয়, আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এক অজানা আনন্দের ভূবনে।।

Advertisements
মন্তব্য
  1. wasifa27 বলেছেন:

    Excellently written! I just have to quote from the article for proper appreciation:
    “একজন যথার্থ লেখক পাঠককে তার বিন্যস্ত শব্দের প্লাবনে ডুবিয়ে ফেলতে চান না; বরং তার রচনা আপনার বেদনাবোধ উপশমের হাতিয়ার হয়, আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এক অজানা আনন্দের ভূবনে।।”

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.