সিপিবি-র ৮ম কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাব প্রসঙ্গে

Posted: জুন 9, 2018 in দেশ, মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , ,

লিখেছেন: হাসিবুর রহমান

…“উঠিয়ে দাও শ্রেণী সংগ্রাম, তাহলে বুর্জোয়া ও ‘সমস্ত স্বাধীন লোক’ ‘প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে এগিয়ে যেতে আর ভয় পাবে না’। তবে ঠকবে ঠিক ঐ প্রলেতারিয়েত।”

বেবেল, লিবক্লেখত, ব্রাকে প্রমুখের প্রতি মার্কস ও এঙ্গেলস (‘সার্কুলার পত্র’) ১৭১৮ই সেপ্টেম্বর, ১৮৭৯

এ বছরের (২০০৩) ৬ থেকে ৯ই মে ৪ দিন ধরে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র ৮ম কংগ্রেসে উপস্থাপনের জন্য প্রণীত রাজনৈতিক প্রস্তাবের খসড়া এবং কংগ্রেসে সংশোধনের পর গৃহীত চূড়ান্ত প্রস্তাবের ছাপানো কপি আমাদের হাতে এসেছে।

খসড়া প্রস্তাবে নাম্বার যুক্ত মোট ৪৫টি প্রস্তাব আছে, যা ২০০২ সালের ১৯ ও ২০শে ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে অনুমোদিত হয়। কংগ্রেসে সংশোধনের পর প্রস্তাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬।

যে কোন রাজনৈতিক দল কর্তৃক গৃহীত রাজনৈতিক প্রস্তাব সেই সংগঠনের জন্য রাজনৈতিক দিকনির্দেশক। যে কোন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ সংস্থা হলো পার্টি কংগ্রেস। কংগ্রেস পার্টির রণনীতি, রণকৌশল ও কর্মসূচি নির্ধারণ করে দেয়। কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক প্রস্তাব রণনীতি, রণকৌশল ও কর্মসূচির আলোকে সমগ্র পার্টি, সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণকে কমিউনিস্ট রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলে। রাজনৈতিক প্রস্তাবে তাই অস্পষ্টতার কোন সুযোগ নাই, বা তা নানা ইঙ্গিতে পরিপূর্ণ হতে পারে না। রাজনৈতিক প্রস্তাবে থাকবে বাস্তব পরিস্থিতির বাস্তব বিশ্লেষণ। সিপিবির ৮ম কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক প্রস্তাবকে সেইভাবে গুরুত্ব সহকারে আমরা বিবেচনা করি।

রাজনৈতিক প্রস্তাবের বাংলাদেশ বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশলের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত অংশ আমরা এখানে পর্যালোচনা করবো।

প্রস্তাব শুরু হয়েছে ২০০১ সালের ১লা অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে মন্তব্য দিয়ে।

২ নং প্রস্তাব:

গত ১৯৯৬ সালের জুন মাসে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়যুক্ত হয়ে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরে আসাটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও সাধারণ মানুষ অনেকেই আশা করেছিল আওয়ামী লীগ তার অতীত ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অন্তত কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে পরিস্থিতির উন্নতি সাধন করবে। আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে দেশ মূলত আগের ধারাতেই চলতে থাকে। ….”

২১ বছর পর সরকার গঠন আওয়ামী লীগের জন্য নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, কিন্তু সিপিবির জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ কেন? বাহ্যিকভাবে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মধ্যে পার্থক্য যাই থাকুক মর্মবস্তুর দিক থেকে তাদের রাজনীতি একই, একই শাসক শ্রেণীর ভিন্ন ভিন্ন ঝোঁক সম্পন্ন দল তারা। জাতীয় পার্টির পর বিএনপি বা বিএনপির পর আওয়ামী লীগের সরকার গঠনে জনগণ অনেক কিছুই আশা করতে পারেন, আর আশা করতে পারে তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলি।

প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামল ছিল বাংলাদেশের বর্তমান লুন্ঠনজীবী শাসক শ্রেণীর গঠনকাল। “আওয়ামী লীগ তার অতীত ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে” এই আশা করবার অর্থ বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর লুন্ঠনজীবী ও দালাল চরিত্র নিছক ভুল নীতির ব্যাপার বলে মনে করা। কিন্তু শাসক শ্রেণীর শ্রেণী চরিত্র অর্থাৎ কোন পদ্ধতিতে তারা উদ্বৃত্ত আত্মসাৎ করবে তা কতকগুলি নীতি দ্বারা নির্ধারিত হয় না, বরং ঠিক তার উল্টো, শাসক শ্রেণীর নীতিসমূহ তার শ্রেণী চরিত্র দ্বারা নির্ধারিত হয়। যে কারণে সিপিবির আশা সত্ত্বেও ‘আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে দেশ মূলত আগের ধারাতেই চলতে থাকে’কেননা ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের সরকার গঠন শাসক শ্রেণীর চরিত্র বদলে দিতে পারে না। এ ধরনের আশাবাদ হলো রাজনৈতিক নির্বুদ্ধিতা।

আওয়ামী লীগ অতীতে “ভুল” করেছিলআওয়ামী লীগের হয়ে ক্ষমা চাইছে কেন সিপিবি? মার্কসবাদের সাধারণ নিয়মাবলী পরিত্যাগকারী সিপিবির রাজনীতি তার পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে নেই।

১০ নং প্রস্তাব:

এনজিও সম্পর্কিত এই পয়েন্টটি কংগ্রেস আমূল পরিবর্তন করে। কেন্দ্রীয় কমিটির প্রস্তাব কংগ্রেস বাতিল করে দিয়ে নতুন প্রস্তাব তৈরী করে।

সামগ্রিক বিচারে এনজিওদের প্রসঙ্গে আমাদের নীতি সুনির্দিষ্ট পরিপ্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ হওয়া উচিত’খসড়া প্রস্তাবের এনজিও সম্পর্কিত এই সুবিধাবাদী নীতি কংগ্রেস বাতিল করে দিয়েছে। কোন কোন এনজিও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চারএই বক্তব্যও কংগ্রেস প্রত্যাখান করেছে।

সাম্রাজ্যবাদের চাপিয়ে দেয়া নীতির ফলে সৃষ্ট গণদারিদ্র, বৈষম্য, বেকারত্ব ও সামাজিক অসন্তোষ প্রশমনের লক্ষ্যে মূলত নিরাপত্তা জাল (Safety net) স্বরূপ উন্নয়নশীল দেশে বিদেশী সাহায্যপুষ্ট এনজিও আন্দোলনের উদ্ভব।”

এই বক্তব্য খসড়ায় ছিল না, কংগ্রেসে এটা গৃহীত হয়। নিরাপত্তা জাল হিসাবে এনজিওর ভূমিকা সম্পর্কে এই বক্তব্য সঠিক, কিন্তু এটাই এনজিওর মূল ভূমিকা নয়। এনজিওর মূল ভূমিকা রাজনৈতিক। প্রথমদিকে এনজিওদের এই রাজনৈতিক কাজ হতো প্রধানতঃ চারভাগে। ১. বামপন্থী বা প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের তরুন ও সক্রিয় কর্মীদের নিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক কাজের ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে এনে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামের বিপরীত কর্মে নিযুক্ত করা। ২. টার্গেট গ্রুপের জন্য কিছু কিছু আর্থিক সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করে জনগণের মধ্যে অর্থনীতিবাদী চিন্তার বিকাশ ও বিস্তার ঘটানো। এর মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাজে অসুবিধা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি। ৩. সাম্রাজ্যবাদের জন্য এক ধরনের গোয়ান্দাগিরি। গ্রামাঞ্চলের জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থা, রাজনৈতিক চিন্তাধারা, বিভিন্ন সংগঠনের অবস্থান ইত্যাদি সম্পর্কে নিয়মিত রিপোর্ট এনজিওগুলি ‘দাতা’ সংস্থাগুলির কাছে পাঠায়। ৪. গ্রামাঞ্চলের ভূমিহীন ক্ষেত ও দিন মজুর এবং গরীব কৃষকদের শত শত সংস্থায় সাংগঠনিক দিক দিয়ে বিভক্ত করে রাখা। (বদরুদ্দীন উমর, ‘সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম ও সাম্রাজ্যবাদী সাহায্য সংস্থা’, সংস্কৃতি, অগাস্ট ১৯৮৬)

তবে অল্প দিন পরেই তারা আরো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ঋণ প্রদানের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদে উৎপাদকদের জিয়ল মাছের মতো টিকিয়ে রাখা, এর মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশে খুবই বড়ো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি। প্রকৃত বিপ্লবী রাজনীতির পক্ষ থেকে এনজিও সম্পর্কে এসব বিশ্লেষণ গত দুই দশক ধরেই করা হচ্ছে, যার সঠিকতা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে।

কেন্দ্রীয় কমিটির খসড়া প্রস্তাবে এনজিওদের কাজের চরিত্র ‘কখনো ইতিবাচক কখনো নেতিবাচক’, ‘কোনো কোনো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আন্দোলনেও সোচ্চার’ ইত্যাদি বলবার পর পরই ‘এনজিওদের প্রসঙ্গে আমাদের নীতি সুনির্দিষ্ট পরিপ্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ হওয়া উচিত’ এই নীতি প্রস্তাব করা হয়েছিল। কংগ্রেসে আগত প্রতিনিধিরা এনজিও সম্পর্কে কেন্দ্রীয় কমিটি প্রস্তাবিত এই সুবিধাবাদী নীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, কিন্তু কোন সঙ্গতিশীল ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব তৈরী করতে তারা সক্ষম হননি ।

১১ নং প্রস্তাব:

এটি মূলতঃ কৃষি কর্মসূচি সম্পর্কিত প্রস্তাব, যা দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশে কৃষিখাতে মূল সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে, দ্বিতীয় অংশে গ্রামীণ দারিদ্র সম্পর্কে বলা হয়েছে।

প্রস্তাবের প্রথম অংশে বলা হয়েছে:

আমাদের দেশের জাতীয় উৎপাদনে কৃষির অবদান প্রায় ২৫%। কৃষি খাত আমাদের দেশের বৃহত্তম ব্যক্তিখাত। ব্যক্তিখাতের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে উচ্চকন্ঠ পুঁজিবাদী অভিভাবকদের পরামর্শক্রমে সরকার গ্রাম ও কৃষিখাতকে বাজেট ও ঋণের ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করে এবং বাজারের ওপর দেশীবিদেশী লুটেরা ধনিক শ্রেণীর কর্তৃত্ব কায়েম করে কৃষি খাতের সুষম বিকাশ ব্যাহত করছে এবং কৃষককে ধ্বংস করছে। সার, বীজ, কীটনাশক, বিদ্যুৎ, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি ও এসবের ওপর বহুজাতিক কোম্পানির ধনিক গোষ্ঠির নিয়ন্ত্রণ এবং ইদানীং পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে হাইব্রিড ও বন্ধ্যা বা টার্মিনেটর বীজের বাজারে অনুপ্রবেশ কৃষি ও কৃষককে বহুজাতিক কোম্পানির অবাধ শোষণের কাছে ক্রমেই জিম্মি করে ফেলছে।”

সিপিবির এই বক্তব্য অনুসারে বাংলাদেশে কৃষি খাতের মূল সমস্যা হলো বাজারী শোষণ। কৃষি সরবরাহ বা input (যেমন সার, বীজ, কীটনাশক, বিদ্যুৎ, ডিজেল) এর মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে বহুজাতিক কোম্পানি কৃষককে শোষণ করছে। উৎপাদিত ফসল বাজারজাতকরণের সময় কৃষক শোষিত হন এটা নির্দিষ্টভাবে বলা না হলেও একথা মাথায় রেখেই সম্ভবত ‘বাজারের ওপর দেশীবিদেশী লুটেরা ধনিক শ্রেণীর কর্তৃত্ব কৃষি খাতের সুষম বিকাশ ব্যাহত করছে এবং কৃষককে ধ্বংস করছে’একথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাবে জমি সম্পর্কে কোন বক্তব্য ও কর্মসূচি নেই। ‘দেশীবিদেশী লুটেরা ধনিক শ্রেণী’র কথা বলা হয়েছেযা এক ধরনের সাধারণীকরণ, কৃষকের শত্রু হিসাবে শ্রেণীগত সুনির্দিষ্টতাবিহীন। গ্রামীণ সম্পত্তি মালিক শ্রেণী ও গ্রামীণ রাজনৈতিক কাঠামো (ইউনিয়ন পরিষদ, থানা প্রশাসন, রাজনৈতিক দল) সম্পর্কে কোন বক্তব্য নেই। সোজা কথায় কৃষকের শত্রুকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত তো করাই হয়নি উল্টো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এক এক করে দেখা যাক।

সাধারণভাবে সার, বীজ, কীটনাশক, বিদ্যুৎ বা ডিজেল বিক্রেতা কেউই কৃষকের মুনাফায় ভাগ বসায় না, কেননা এসবের জন্য ফসল উৎপাদনের পূর্বেই কৃষক দাম পরিশোধ করেন, যদি না এসব সামগ্রী তিনি ঋণ আকারে নিয়ে থাকেন এবং সে জন্য সুদ দিতে হয় অথবা বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কৃষকের কাছ থেকে অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্য আদায় করা হয় বা নির্দিষ্ট উপকরণের ওপর কোন কোম্পানীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বা মনোপলি থাকে। সার, বীজ, কীটনাশক ইত্যাদির দাম কমানোর যে দাবী বিভিন্ন সংগঠন করে থাকে তা দিয়ে স্থায়ীভাবে কৃষকের স্বার্থ রক্ষিত হবার নয়। কেননা এসব কৃষি উপকরণের দাম কমানো হলে ফসলের দামও ২/১ মৌসুমের মধ্যে আবশ্যিকভাবে কমে যেতে বাধ্য। কৃষি উপকরণের মাধ্যমে যেটুকু বাজারী শোষণ হয় তার দরুন কৃষক জমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন না বা সিপিবির ভাষায় ‘কৃষক ধ্বংস’ হচ্ছেন না।

বাংলাদেশে সাধারণভাবে কৃষি উৎপাদন এবং বিশেষভাবে শস্য উৎপাদন হয় চাহিদার তুলনায় কম। এরকম অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই ফসলের দাম নির্ধারিত হওয়ার কথা সব চাইতে কম লাভজনক জমিতে ফসল উৎপাদনের শর্ত সমূহ দ্বারা এবং কৃষি কাজ কৃষকের জন্য লাভজনক হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে তা হচ্ছে না। এর কারণ নিহিত আছে প্রথমতঃ ফসল ক্রয় বিক্রয়ে বণিক পুঁজির আধিপত্যে এবং দ্বিতীয়তঃ কৃষি জমির মালিকানা ব্যবস্থায়।

কৃষি পণ্য বাজারজাতকরণে বণিক পুঁজির আধিপত্য স্থাপিত হওয়ার ফলে কৃষিজাত পণ্যের বাজার দরের কোন নিশ্চয়তা নাই এবং প্রতি বছরই কোন না কোন ফসল নিয়ে ফটকাবাজারী হচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারী কৃষকের জীবন হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত এবং তারা দ্রুত ভূমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন।

বাংলাদেশে কৃষি জমির প্রাপ্যতার তুলনায় কৃষকের সংখ্যা বিপুল। আবাদী জমির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা রয়েছে, লাভজনক না হওয়া সত্ত্বেও নিছক বেঁচে থাকার জন্য কৃষক খন্ড খন্ড জমি বর্গা নিতে বাধ্য হচ্ছেন বা নিজের ক্ষুদ্র জোতে চাষ করছেন। জমির মালিকের জন্যও জমিতে পুঁজি বিনিয়োগ করে উৎপাদন করার চাইতে খন্ড খন্ড করে জমি বর্গা দেয়া সুবিধাজনক ও অধিক লাভজনক।

বাংলাদেশের কৃষকের বিপুল অধিকাংশই হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষক। নিজের জমিতে বা বর্গা নেয়া জমিতে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের শ্রমশক্তি নিযুক্ত করেই উৎপাদন করেন তারা। অর্থাৎ এক্ষেত্রে একই ব্যক্তির মধ্যে নিয়োগকর্তা ও কৃষি মজুর উভয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। কিন্তু এইভাবে উৎপাদনে নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও কৃষক মুনাফা করতে পারছেন না। কৃষকের মুনাফা আত্মসাৎ করছে জমির মালিক যার কাছ থেকে কৃষক জমি বর্গা নিয়েছেন, ঋণদানকারী ব্যাংক বা মহাজনসুদ আকারে, উৎপাদিত ফসল ক্রয়কারী ফড়িয়া ও বড় ব্যবসায়ী এবং সবশেষে বাংলাদেশে কৃষি পণ্য রপ্তানীকারী বিদেশী পুঁজিপতিঅধিকতর উৎপাদনশীলতা ও পুঁজির উচ্চ জৈবিক সংবিন্যাস (organic composition) সূত্রে। কৃষি সরবরাহে ভর্তুকী দেয়া হলে কৃষকের ঋণ চাহিদা কমবে, ফলে কৃষকের মুনাফার যে অংশ সুদ হিসাবে প্রদান করতে হয় তার পরিমাণ হ্রাস পাবে এবং ক্ষেত্র বিশেষে ফড়িয়ার হাত থেকে কৃষক আত্মরক্ষার কিছু সুযোগ পেতে পারেন। তা সত্ত্বেও মুনাফা হস্তান্তরের যে প্রক্রিয়ার কথা একটু আগেই বলা হলো তা ঠিকই জারী থাকবে, বিশেষ করে জমির মালিক কর্তৃক মুনাফা আত্মসাৎ এর দ্বারা হ্রাস পাবে না। এভাবে কৃষককে নিয়োগকর্তা হিসাবে তার প্রাপ্য মুনাফা হস্তান্তর করতে হয়, এরপর মজুর হিসাবে তার মজুরীর একাংশ আত্মসাৎ হয়। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক বাস্তবতঃ যতটা না নিয়োগকর্তাউৎপাদক তার চাইতে অনেক বেশি কৃষিমজুর। মজুর হিসাবে যে সামান্য মজুরী তিনি পান, গোটা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সেটিই তার একমাত্র প্রাপ্তি। এইভাবে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত মূল্য জমির মালিকানা, পুঁজির মালিকানা ও বাজারের সূত্রে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে বন্টন হচ্ছে। কৃষিতে যে উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি হচ্ছে তা অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে এবং কৃষি উৎপাদনে স্থায়ীভাবে পুঁজির ঘাটতি থাকছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে সরকারিভাবে ১৯৯০১৯৯১ অর্থবছরে কৃষি ঋণ বিতরণ করা হয় ৫৯৬ কোটি টাকা, এক দশক পর ২০০০২০০১ অর্থ বছরে (মার্চ ২০০১ পর্যন্ত) এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২১৮৮ কোটি টাকা। এক দশকে সরকারি ঋণ সরবরাহ বেড়েছে ৩৬৭%-রও বেশি। বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনের স্থিতিশীলতা ও বৃদ্ধি এই বিপুল পরিমাণ ঋণের যোগানের ওপর নির্ভরশীল। পুঁজির এই ঘাটতির সুযোগে এনজিও ও সুদী কারবারীরা চড়া সুদে গ্রামাঞ্চলে ঋণ দিচ্ছে যা আবার কৃষিতে পুঁজির ঘাটতি বজায় রাখতে সহায়তা করছে। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ার অধীনে ক্ষুদ্র ও মাঝারী কৃষক জমি হারিয়ে ক্রমেই ভূমিহীনে পরিণত হচ্ছেন, যোগ দিচ্ছেন গ্রামীণ মজুর শ্রেণীতে।

ভোগের উপকরণ সমূহের যে বন্টনই হোক না কেন তা আসলে উৎপাদনের শর্ত সমূহের বন্টনের ফলাফল মাত্র। শেষের এই বন্টনটি আবার খোদ উৎপাদন সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য সূচক। উদাহরণ স্বরূপ, পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের ভিত্তিটা হলো এই যে, উৎপাদনের বস্তুগত শর্তাবলী পুঁজি ও ভূমি সম্পত্তির আকারে অশ্রমিকদের হাতে রয়েছে, আর জনগণের মালিকানায় কেবল উৎপাদনের ব্যক্তিগত শর্তটি, শ্রমশক্তি। উৎপাদন উপকরণ সমূহের এই যদি হয় বন্টন, তাহলে ভোগের উপকরণ সমূহের বন্টনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্তমানকার চোহারা নেবে।” (মার্কস, ‘গোথা কর্মসূচির সমালোচনা’)

কৃষকের হাতে জমি ও পুঁজি কোনটাই নেই। জমির ওপর অধিকারহীন কৃষক শ্রেণীর হাতে উৎপাদিত ফসলের বাজারের ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা নয়। “উৎপাদন উপকরণ সমূহের এই যদি হয় বন্টন, তাহলে ভোগের উপকরণ সমূহের বন্টনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্তমানকার চোহারা নেবে।” সুতরাং বাজারের মাধ্যমে কৃষি মুনাফার যে বন্টন হচ্ছে তাতে কৃষক শোষিত হবেন এটাই স্বাভাবিক এবং সেকারণেই বাজারী শোষণের প্রশ্নটি জমির প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন করে উপস্থিত করার কোন সুযোগ নেই।

সিপিবির প্রস্তাবে কিন্তু জমির প্রশ্ন পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, কৃষি সমস্যাকে হাজির করা হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে শুধুই বাজারের সমস্যা হিসাবে। জমির প্রশ্ন এড়ানোর জন্যই তারা কৃষকের ধ্বংসের কথা বলছেন, জমি থেকে কৃষকের উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার কথা বলছেন না। সোজা কথায় তারা গ্রামাঞ্চলে জমির মালিকানা ব্যবস্থা সম্পর্কে কোন ধরনের বক্তব্য দেয়াটা সতর্কভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন। আর এটাই সিপিবির কৃষি কর্মসূচির শ্রেণী চরিত্র পুরোপুরি উন্মোচন করে দিয়েছে।

গ্রামাঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠির হাতে কৃষি জমি প্রায় কিছুই নাই, এবং জমির আকাংখা তাদের প্রবল। কৃষকের হাতে সমবায়ের মাধ্যমে জমি তুলে দেওয়াই হতে হবে বাংলাদেশ বিপ্লবের কৃষি কর্মসূচি। তবে কৃষকের হাতে জমি তুলে দেওয়াটাই বিপ্লবের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, এ তার আশু লক্ষ্য মাত্র। এই আশু লক্ষ্য অর্জিত হলে তা গ্রামাঞ্চলে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বস্তুগত ও চেতনাগত বিকাশ ঘটাবে।

বাংলাদেশে কৃষকের হাতে জমি তুলে দেয়ার অর্থ হলো অনুপস্থিত ভূমি মালিকানার পরিপূর্ণ উচ্ছেদ সাধন। আর ঠিক এই কর্মসূচি গ্রহণেই সিপিবি সম্পূর্ণ অপারগ। জমির প্রশ্নটি, অনুপস্থিত ভূমি মালিকানার প্রশ্নটি এড়িয়ে যায় কোন শ্রেণী? প্রথমতঃ মধ্যস্বত্বভোগী সেই স্তরটি যারা জমির মালিকানা সূত্রে উৎপাদনের সাথে সম্পর্কহীন থেকেও উদ্বৃত্ত মূল্যের একাংশ আত্মসাৎ করছে, যারা শাসক শ্রেণীর গ্রামীণ সহযোগী শ্রেণী। দ্বিতীয়তঃ শাসক শ্রেণী ও সাম্রাজ্যবাদ, যারা অনুপস্থিত ভূমি মালিকানা উচ্ছেদের মাধ্যমে ভূমি সংস্কারের মধ্যে দেখে গ্রামাঞ্চলে এতদিন চাপা পড়া এক সুবিপুল মজুর শ্রেণীর রাজনৈতিক জাগরণ, এর ফলে শ্রেণী সংগ্রামের অনিয়ন্ত্রিত বিকাশ।

অনুপস্থিত ভূমি মালিকানা উচ্ছেদের কর্মসূচি গ্রহণে সিপিবির এই অপারগতা এটাই প্রমাণ করে যে তারা ক্ষুদ্র ও মাঝারী কৃষক ও গ্রামীণ মজুর শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায় অক্ষম এবং কার্যক্ষেত্রে অনুপস্থিত ভূমি মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করছে। একাজ তারা করছে শাসক শ্রেণীর অংশ হিসাবে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার ভবিষ্যৎ কোন সম্ভাবনা যাতে কোনভাবে নষ্ট না হয় সেই বিবেচনা থেকে। বামপন্থী ক্ষুদে বুর্জোয়া হিসাবেই তারা এই নীতি গ্রহণ করেছে।

আলোচ্য প্রস্তাবের দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে গ্রামীণ দারিদ্র সম্পর্কে বক্তব্য। এতে বলা হয়েছে:

আশির দশকের শেষে এবং নব্বই দশকের অধিকাংশ সময়ে গ্রামাঞ্চলে চরম দারিদ্র হ্রাসের একটি প্রবণতা দেখা দিয়েছিল। সম্ভবত পর পর কয়েক বছর কৃষি খাতে সফল প্রবৃদ্ধি, চালের দাম স্থিতিশীল থাকা এবং অকৃষি খাতে নানা ধরনের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগের ফলেই এটি সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি গ্রামাঞ্চলে চরম দারিদ্র পুনরায় প্রকটাকার ধারণ করছে। বস্তুত শহরে শাসক শ্রেণীর দরিদ্রবিরোধী নীতির কারণে গ্রামেই এখন চরম দরিদ্রদের ভিড় বাড়ছে। শহরের বস্তিবাসী, হকার ও রিকশাচালকদের একাংশ শহর থেকে উচ্ছেদ হয়ে পুনরায় গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।”

বোঝার কোন উপায় আছে গ্রামাঞ্চলের দারিদ্র সম্পর্কে এই বক্তব্য একটি কমিউনিস্ট পার্টি প্রদান করেছে?

বুর্জোয়ারা শ্রেণী বৈষম্যকে দারিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে শ্রেণী নিরপেক্ষ বিষয়ে পরিণত করার চেষ্টা করে। দারিদ্রকে তারা পরিমাপ করে জনগণের ভোগের পরিমাণ মেপে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, জ্বালানী প্রাপ্তির মাত্রা অথবা প্রত্যক্ষ ক্যালোরি গ্রহণের মাত্রার দ্বারা বুর্জোয়ারা জ নগণের দারিদ্র পরিমাপ করে। দারিদ্র হ্রাস বা দূরীকরণের সাথে তাই শোষণের হার হ্রাস বা বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর উচ্ছেদের কোন সম্পর্ক নাই। জাতীয় উৎপাদের বিতরণটা অধিকতর ন্যায় সঙ্গত করা গেলে বা মোট জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করা গেলে সামগ্রিকভাবে জনগণের ভোগের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে এবং দারিদ্র হ্রাস পাবেএই হলো তাদের নীতি। এক্ষেত্রে বুর্জোয়া রাজনীতির দক্ষিণপন্থী অংশ জোর দেয় জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর আর বুর্জোয়াদের বামপন্থী অংশ জোর দেয় বিতরণ ব্যবস্থাটা ন্যায় সঙ্গত করবার ওপর। তবে তারা উভয়েই বুর্জোয়া সম্পত্তি মালিকানাটা অটুট রাখার প্রশ্নে একমত। বুর্জোয়া দারিদ্র দূরীকরণ কর্মসূচির লক্ষ্য হলো পুঁজিপতিও থাকবে, শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী জনগণও থাকবে কিন্তু দারিদ্র থাকবে না। জনগণের জন্য তাদের অন্যতম রাজনৈতিক কর্মসূচি তাই দারিদ্র দূরীকরণ কর্মসূচি। সিপিবি বুর্জোয়াদের এই ‘শ্রেণী বিহীন’ কাঠামোকেই গ্রহণ করেছে, এর ওপরে দাঁড়িয়েই তারা রাজনৈতিক কর্মসূচি হাজির করছে।

সমাজ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শ্রমিক শ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গীর অনুপস্থিতির দরুন শহরের বস্তিবাসী, হকার ও রিকশাচালকদের ওপর শ্রেণীগত আক্রমণ সিপিবির কাছে সরকারের দরিদ্রবিরোধী নীতি। কমিউনিস্ট রাজনীতি বলছে শাসক শ্রেণীর এই শ্রেণীগত আক্রমণ শ্রমজীবী জনগণের শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে রুখে দাঁড়ানোই কর্তব্য। যে ব্যবস্থা বস্তিবাসী ও হকার সৃষ্টি করে আবার তাদের শহর থেকে উচ্ছেদ করে, খোদ সেই ব্যবস্থা উচ্ছেদ হতে হবে সকল আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। কাজেই হকার রিকশাচালক বস্তিবাসীর ওপর শাসক শ্রেণীর শ্রেণীগত আক্রমণকে দরিদ্রবিরোধী নীতি হিসাবে চিহ্নিত করলে কর্তব্য দাঁড়ায় নিছক সরকারী নীতির বিরোধিতা করা। শাসক শ্রেণীর নীতিসমূহ তার শ্রেণী চরিত্র দ্বারা নির্ধারিত হয়, কিন্তু শ্রেণী প্রশ্ন টেনে আনতে সিপিবি একেবারেই নারাজ। বস্তুত এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে যে সাংগঠনিক লাইন দাঁড়ায় তা এই যে, ‘আমাদের সংগঠন রয়েছে প্রতিবাদের জন্য, ক্ষমতার জন্য আছে বুর্জোয়ারা।’ কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওর (কাপ) এর মত এনজিও সংগঠন তখন দাঁড়ায় শহরের শ্রমজীবী জনগণের রাজনৈতিক মিত্রে।

বস্তুত শহরে শাসক শ্রেণীর দরিদ্রবিরোধী নীতির কারণে গ্রামেই এখন চরম দরিদ্রদের ভিড় বাড়ছে।”

গ্রামে গরীব মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিকে শহর থেকে গ্রামে দারিদ্র ঠেলে দেয়ার সরকারী নীতির ফলাফল হিসাবে ব্যাখ্যার এই নীতি সিপিবির কৃষি কর্মসূচির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

দারিদ্র সম্পর্কে এই দৃষ্টিভঙ্গী সিপিবির রণনীতি ও রণকৌশলে প্রতিফলিত হয়েছে। সিপিবির এই দৃষ্টিভঙ্গী তাকে সংস্কারবাদী আন্দোলনে ঠেলে দিতে বাধ্য এবং বাস্তবতঃ ঘটছেও তাই। এর নমুনা আমরা দেখেছি বছর কয়েক পূর্বে বস্তি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে। বস্তি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে ঢাকার বস্তিবাসীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে সিপিবি সহ বামফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ বস্তির সমাবেশগুলিতে সে সময় বারবার একটি কথাই বলতে থাকেন যে, বড়লোকদের তো অনেক ভোট দিলেন এই বার আমাদের ভোট দিন, বস্তি উচ্ছেদ হবে না। শ্রেণী সংগ্রাম ও রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল অর্থাৎ বিপ্লবের প্রশ্ন তাঁরা যথারীতি এড়িয়ে যান।

২৩ নং প্রস্তাব: সাম্রাজ্যবাদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে বলা হয়েছে ২৩ নং প্রস্তাবে।

সারা বিশ্বে ব্যবসাবাণিজ্য, অর্থনীতি, মুদ্রা ব্যবস্থা, সামরিকসহ সকল ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া প্রভূত্ব প্রতিষ্ঠার আগ্রাসী তৎপরতার ফলে পুঁজিবাদী দেশগুলোর মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব অব্যাহত আছে। ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন গঠন ও তার বিকাশ ও সংহতি সাধন, মার্কিন ডলারের একচেটিয়া কর্তৃত্ব হ্রাসের জন্য ইউরো ডলারের প্রবর্তন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক জোট গঠনের মধ্য দিয়ে মার্কিন একচেটিয়া কর্তৃত্ব মোকাবেলার প্রচেষ্টা লক্ষণীয়।”

পুঁজিবাদী দেশগুলোর মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব অব্যাহত আছে”সাম্রাজ্যবাদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সম্পর্কে এর চাইতে কাঁচা মন্তব্য আর কি হতে পারে?

ইরাকে আগ্রাসনকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব যে বিপুল রাজনৈতিক শিক্ষা উপকরণ হাজির করেছে তার কিছুই সিপিবি নেতৃত্ব কংগ্রেসে পেশ করেন নি।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের মধ্যে বিশ্বকে নতুন করে ভাগ করে নেবার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের নেট বৈদেশিক ঋণ, ২০০২ সালে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের চলতি হিসাব ঘাটতি, কেবল ২০০২ সালেই ৪৩৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি এবং এসবের সাথে সম্পর্কিতভাবে প্রতিদিন বাইরে থেকে আসা গড়ে ২ বিলিয়ন ডলার আর্থিক বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধরেছে সামরিক বল প্রয়োগ ও প্রত্যক্ষ উপনিবেশ স্থাপনের পথ। অপর দিকে নবীন ও একক ইউরোপীয়ান মুদ্রা ইউরো নিয়ে ফ্রান্সজার্মানী ধরেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলার আধিপত্য খর্ব করবার মাধ্যমে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যে ভাগ বসাবার পথ। দুই পক্ষের দুই ভিন্ন পথ অবলম্বনের কারণ স্পষ্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কিন্তু তার অর্থনীতি ডলারের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে অক্ষম, সামরিক বল প্রয়োগ ছাড়া তাই তার অন্য কোন পথ নেই। রাজনীতি ও কূটনীতির পথ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সংকুচিত হয়ে এসেছে, খোলা আছে কেবল বল প্রয়োগের পথ। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তির জোরে ডলার আধিপত্য রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে, সামরিক শক্তিকে তারা রূপান্তরিত করছে অর্থনৈতিক শক্তিতে। অপরদিকে ফ্রান্সজার্মানী সামরিক দিক থেকে অনেক পিছিয়ে কিন্তু তাদের হাতে আছে নবীন মুদ্রা ইউরো যার পেছনে তারা জড়ো করতে সক্ষম হয়েছে ইউরোপের ডজনখানেক দেশকে, লাইনে দাঁড়িয়ে আছে আরো প্রায় এক ডজন। তারা তাই লড়াই চালাচ্ছে বিশ্বব্যাপী ইউরোর আধিপত্য প্রতিষ্ঠায়। তাদের জন্য রাজনীতি ও কূটনীতির পথ এখনো খোলা, সে পথেই তারা আরো কিছুদিন হাঁটবে। ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক আধিপত্যকে বজায় রাখার জন্য তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পথ ধরতে হবে।

নিরাপত্তা পরিষদে ফ্রান্সজার্মানীর কূটনৈতিকঅ্যামবুশের শিকার যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই ইরাকে আগ্রাসন চালায়। আর জাতিসংঘের অনুমোদন না থাকায় বাংলাদেশসহ দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদের দালাল সরকারগুলি বেকায়দায় পড়ে যায়। সাম্রাজ্যবাদের আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব বিপদে ফেলেছে দেশে দেশে দালাল ও তাবেদার সরকারগুলিকে। এই বিপদ তাদের ভবিষ্যতে আরো বৃদ্ধি পাবে। সাম্রাজ্যবাদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব উদ্ভূত সরকারের এই সংকটকে শাসক শ্রেণীর রাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দেয়াই হলো এ পরিস্থিতিতে দেশে দেশে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের উপযুক্ত রণকৌশল।

সাম্রাজ্যবাদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এটাই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করলো যে, যুদ্ধ হলো অন্য উপায়ে রাজনীতি চালিয়ে যাওয়াWar is the continuation of politics by other means। মার্কস, এঙ্গেল, লেনিন, মাও সেতুঙ এই তত্ত্বগত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বিভিন্ন যুদ্ধের তাৎপর্য্য বিশ্লেষণ করেছেন।

সমাজতন্ত্রীরা চিরকালই জাতিসমূহের মধ্যে যুদ্ধকে বর্বর ও নৃশংস বলে নিন্দা জানিয়ে এসেছে। তবে যুদ্ধ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী বুর্জোয়া শান্তিবাদী (শান্তির সমর্থক ও প্রবক্তা) ও নৈরাজ্যবাদীদের থেকে মৌলিকভাবেই ভিন্ন। শেষোক্তদের সাথে আমাদের ভিন্ন মত এই যে, একটি দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ ও শ্রেণী সংগ্রামের অনিবার্য সম্পর্ক আমরা উপলব্ধি করি; আমরা জানি যে শ্রেণী সমূহের উচ্ছেদ ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না হলে যুদ্ধও লোপ পাবে না; আমাদের এখানেও পার্থক্য যে আমরা গৃহযুদ্ধ, অর্থাৎ নির্যাতক শ্রেণীর বিরুদ্ধে নির্যাতিত শ্রেণীর যুদ্ধ, দাসমালিকদের বিরুদ্ধে দাসদের, ভূমিমালিকদের বিরুদ্ধে ভূমিদাসদের, এবং বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে মজুরী শ্রমিকদের যুদ্ধকে ন্যায়সঙ্গত, প্রগতিশীল ও প্রয়োজনীয় বলে মনে করি।” (লেনিন, সমাজতন্ত্র ও যুদ্ধ)

সামগ্রিকভাবে এই মার্কসবাদী বুনিয়াদটিই সিপিবি পরিত্যাগ করেছে। রাজনৈতিক প্রস্তাবে ইরাকে মার্কিনব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে একটিও প্রস্তাব নেই। একটিও না! এ প্রশ্নে নিশ্চুপ থাকাই হলো তাদের রণকৌশল।

জনগণ যখন ইরাকে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে বিক্ষুব্ধ, জনগণ যখন এই প্রশ্নের সূত্র ধরে রাজনৈতিক শিক্ষা গ্রহণে অনেক বেশি প্রস্তুত তখন জনগণকে বিপ্লবী রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত না করা, ক্ষমতা দখলের লক্ষ্য জনগণের সামনে উপস্থিত না করা বিপ্লবের প্রতি বেঈমানীর সামিল। যখন সাম্রাজ্যবাদী অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে ন্যায় যুদ্ধ গড়ে তোলা এবং সাম্রাজ্যবাদের দালাল সরকার ও শাসক শ্রেণীকে উচ্ছেদ করে শ্রমিক কৃষক মধ্যবিত্ত মেহনতি জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য জনগণের সামনে হাজির করা প্রয়োজন তখন সিপিবি জনগণের সামনে হাজির করেছে ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’ এই বুর্জোয়া শান্তিবাদী ধ্বনি। এই সময়ে সরকারের জন্য এর চাইতে মধুর ধ্বনি আর কিই বা হতে পারতো? তারাও সাগ্রহে নিজেদের কন্ঠে একই ধ্বনি তুলে নিয়েছে। ৬ই মার্চ পল্টন ময়দানে সরকারি সমাবেশ থেকে আওয়াজ তোলা হয়েছে ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’। যুদ্ধ সম্পর্কে মার্কসবাদী তত্ত্বগত ভিত্তি পরিত্যাগ করবার এই হলো ফলাফল।

যুক্তরাষ্ট্র বা বৃটেনের জনগণ যখন ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’ এই আওয়াজ তোলেন তখন তারা নিজ শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধেই দাঁড়ান। একই শ্লোগান আমাদের দেশে কোনভাবেই কার্যকরী শ্লোগান হতে পারে না। সাম্রাজ্যবাদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফলে সৃষ্ট নিজ দেশের সরকারের সংকটকে শাসক শ্রেণীর রাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে না দিয়ে তাদের সাথে মিলিতভাবে ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’ এই এজমালি শ্লোগান তুলে সিপিবি বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

এইই হলো সুবিধাবাদ। এইই হলো শ্রেণী সহযোগিতা।

….সুবিধাবাদ হলো শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনে বুর্জোয়া নীতির প্রকাশ, এ হলো প্রলেতারীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে, নির্যাতিত জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে পেটি বুর্জোয়াজী ও শ্রমিকদের মধ্য থেকে বুর্জোয়া বনে যাওয়া অতি ক্ষুদ্র অংশের সাথে তাদের ‘নিজেদের’ বুর্জোয়াদের জোটগত স্বার্থের প্রকাশ।”

সুবিধাবাদ ও সামাজিকজাত্যাভিমানের রাজনৈতিকআদর্শগত মর্মটা একইশ্রেণী সংগ্রামের বদলে শ্রেণী সহযোগিতা, সংগ্রামের বিপ্লবী পদ্ধতি পরিত্যাগ করা, সরকারের অস্বস্তিকর মুহূর্তের সুযোগ গ্রহণ করে বিপ্লবকে অগ্রসর করবার বদলে ‘নিজ’ সরকারকে সহায়তা প্রদান।” (লেনিন, সমাজতন্ত্র ও যুদ্ধ)

সাম্রাজ্যবাদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের গম্ভীর বিশ্লেষণ বাংলাদেশ বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণের জন্য অপরিহার্য। এই কাজকে গুরুত্বহীন করা বা হেলাফেলার সাথে করবার অর্থ হলো বিপ্লবের প্রশ্নটি কার্যত বাতিল করে দেয়া। পেটি বুর্জোয়াজী ও শ্রমিকদের মধ্য থেকে বুর্জোয়া বনে যাওয়া অতি ক্ষুদ্র অংশের রাজনৈতিক দল সিপিবি এক্ষেত্রে পুরানো পাপী, তাদের জন্য পাপের বোঝা এবারে আরো খানিক বাড়লো এর বেশি কিছু নয়।

২৪ নং প্রস্তাব:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে, শেয়ার বাজারের সঙ্কট, বড় বড় কোম্পানীর দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ঘটনা, অর্থনৈতিক মন্দা, বেকার, দরিদ্র এবং গৃহহীনদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাঁদা খেলাপি হওয়া প্রভৃতির ফলে সঙ্কট যতই ঘনীভূত হচ্ছে মার্কিন ধনকুবের শাসক শ্রেণী ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছে।….”

এখানে সংকট কিভাবে আরো ঘনীভূত হচ্ছে তা বলা হয়েছে, কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সংকট কি এবং কেন তার কোন ব্যাখ্যা নাই। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সংকট কেন সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থারই সংকট তাও বলা হয় নি। অথচ বলা দরকার ছিল ঠিক সেটাই। কংগ্রেসে বসে সাম্রাজ্যবাদের সংকট ব্যাখ্যায় অসমর্থ সিপিবি বিপ্লবের প্রশ্নটি মীমাংসা করতে যে ব্যর্থ হবে তা বলাই বাহুল্য। শ্রেণীগতভাবে বিপ্লবের প্রশ্নটি মীমাংসা করতে সক্ষম একমাত্র সর্বহারা শ্রেণী, পেটিবুর্জোয়া শ্রেণী নয়।

৩২ নং প্রস্তাব বলা হয়েছে:

বাংলাদেশভারতপাকিস্তানসহ এই অঞ্চলের সকল দেশের কমিউনিস্ট বামগণতান্ত্রিক ও শান্তিকামী শক্তি ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আজ সব ধরনের সাম্প্রদায়িক, উগ্রবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে মোকাবেলা করতে হবে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন প্রতিহত করে স্বাধীন জাতীয় বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে।”

৩৩ নং প্রস্তাব বলা হয়েছে:

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীন জাতীয় বিকাশের প্রধান শত্রু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।”

বাংলাদেশের স্বাধীন জাতীয় বিকাশের প্রধান শত্রু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’- এই হলো সিপিবির রাজনৈতিক কর্মসূচির নির্যাস।

বাংলাদেশের স্বাধীন জাতীয় বিকাশের ধ্বনি তুলতে পারে সাধারণভাবে ক্ষুদে বুর্জোয়া বা পেটিবুর্জোয়া শ্রেণী বিশেষ করে পেটিবুর্জোয়াদের সেই অংশটি যাদের মধ্যে বড়পুঁজির মালিক হবার আকাংখা রয়েছে, যারা একই সাথে লক্ষ্য করছে সাম্রাজ্যবাদের সাথে সম্পর্ক না থাকলে বড় পুঁজির মালিক হওয়া সম্ভব নয় এবং তেমন সম্পর্ক স্থাপনের মত জায়গা তাদের জন্য আর নাই, কেননা সেই ধরনের সম্পর্ক ১৯৭১ সালের পরই বাংলাদেশের বর্তমান শাসক শ্রেণী স্থাপন করেছে। এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েই পেটি বুর্জোয়াদের উপরোক্ত অংশটি এক ধরনের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। তাদের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান উপরে উল্লিখিত বঞ্চণার দরুন। তাই সুুযোগ পাওয়া মাত্র এদের একাংশ, বিশেষ করে নেতৃত্ব সাম্রাজ্যবাদের সাথে রফা করতে প্রস্তুত। পেটি বুর্জোয়াদের এই অংশ মূলত বামপন্থী। বাংলাদেশের দক্ষিণপন্থী পেটি বুর্জোয়াদের একাংশের দেখা পাওয়া যাবে ধর্ম কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলে; ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্য জোট ইত্যাদি স্বাধীন জাতীয় বিকাশের বদলে তারা চায় ‘খেলাফত রাষ্ট্র’।

উপরে উল্লিখিত বাম পেটি বুর্জোয়াদের দেখা পাওয়া যাবে গ্যাস রপ্তানী বিরোধী আন্দোলনে, শিল্পকৃষি রক্ষার আন্দোলনে। তাদের এসব ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের কেন্দ্রে রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসাবে পাওয়া যাবে ‘স্বাধীন জাতীয় বিকাশের’ কর্মসূচি। রাজনীতি ক্ষেত্রে স্বাধীন ভূমিকা পালনে তাদের আকাংখায় কোন খাদ নাই, কিন্তু শ্রেণীগতভাবে স্বাধীন ভূমিকা পালনে ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা তাদেরকে বাধ্য করে বুর্জোয়াদের কোন না কোন অংশের সাথে হাত মেলাতে, অধীনতা মেনে নিতে।

পেটি বুর্জোয়াদের এই ‘স্বাধীন জাতীয় বিকাশের’ কর্মসূচি তাই কোন চক্রান্তের ফসল নয়। তাদের শ্রেণীগত আকাংখা আর ইতিহাস নির্দিষ্ট ভূমিকার অসঙ্গতির ফসল।

কিন্তু বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণী এই কর্মসূচির জন্য কেন লড়াই করবেন?

বাংলাদেশের শ্রমিকশ্রেণীর প্রয়োজন ‘স্বাধীন জাতীয় বিকাশ’ নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক গণতন্ত্র। মজুরী শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর হাতপা বাঁধা, চোখে ঠুলি, মুখে কুলুপ। বাংলাদেশের শ্রমিকরা সংগঠিত হবার, মিছিলসমাবেশ, ধর্মঘটঅবরোধ করবার গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে কার্যতঃ বঞ্চিত। এই অধিকার ছাড়া সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম কিভাবে সম্ভব? এই অধিকার ছাড়া মজুরী শোষণ উচ্ছেদের সংগ্রাম কিভাবে সম্ভব? মজুরী শোষণ উচ্ছেদে উপযুক্ত অস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার জন্যই আজ বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক গণতন্ত্র, শ্রমিক শ্রেণীর জন্য রাজনৈতিক গণতন্ত্র মানে জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (People’s Democratic Republic)। বর্তমান বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রকে (Republic) প্রতিস্থাপিত করবে এই জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। এই হলো বাংলাদেশ বিপ্লবের রাজনৈতিক কর্মসূচি। যে বিপ্লব কৃষকের হাতে তুলে দেবে জমি আর শ্রমিক শ্রেণীর জন্য নিশ্চিত করবে শ্রেণী সংগ্রামকে অবাধে বিকশিত করবার, স্পষ্টতর ও তীব্রতর করে তুলবার সর্ববিধ সুযোগ। শুধুমাত্র এই পথেই বাংলাদেশে শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে।

এটাই হলো মার্কসবাদের শিক্ষা।

যে কথাটায় কোনোই সন্দেহ নেই সেটা এই যে, আমাদের পার্টি এবং শ্রমিক শ্রেণী প্রভুত্বে যেতে পারে কেবল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের মতো রাজনৈতিক আধারে। এই শেষ জিনিসটাই হলো প্রলেতারীয় একনায়কত্বের বিশেষ রূপ, যা মহান ফরাসী বিপ্লবে দেখা গেছে…”(এঙ্গেলস, ‘১৮৯১ সালের খসড়া সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কর্মসূচির সমালোচনা প্রসঙ্গে’)

স্বাধীন জাতীয় বিকাশের’ কর্মসূচি গ্রহণের অর্থ শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে পেটি বুর্জোয়া কর্মসূচির হাতে সমর্পণ করা। এর অর্থ বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীকে উচ্ছেদের শ্রমিক শ্রেণীর কর্মসূচিকে বাতিল করে দেয়া, বা যা একই কথা, অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা।

শ্রমিক শ্রেণীকে ক্ষমতা দখল করতে হবে’ এই যাদুকরী কথাটা পেটি বুর্জোয়া পার্টিতে অধঃপতিত সিপিবিই যে প্রথম বর্জন করেছে তা নয়, তারা এই উপমহাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম জমানার ঐতিহ্যই এখনো বহন করে চলেছে।

বাংলাদেশ বিপ্লবের রণনীতি ও রণকৌশল সম্পর্কিত সাম্প্রতিককালের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধে এ সম্পর্কে কমরেড বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন, “ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম থেকে ১৯৪৭ সাল, অর্থাৎ ভারতে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত কোন সময়েই বৃটিশ শাসন উচ্ছেদ করে সরাসরি ক্ষমতা দখলের কোন লক্ষ্য নির্দ্দিষ্ট করে নি, কোন কর্মসূচি জনগণের সামনে উপস্থিত করে নি। কংগ্রেস অখন্ড ভারত এবং মুসলিম লীগ পাকিস্তানের কথা বললেও ভারতবর্ষে শ্রমিকদের রাষ্ট্র কায়েম করার কোন বাস্তব কর্মসূচি কমিউনিস্ট পার্টির ছিল না। রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সংগ্রামের ক্ষেত্রে এই রণনৈতিক (strategic) শূন্যতা ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে কোন সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করে নি। তাঁরা জনগণের ওপর সাধারণভাবে শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে বলেছেন, কৃষকের ওপর জমিদার মহাজনের শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে বলেছেন, বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বলেছেন এবং এ সবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। তাঁরা এই সংগ্রামের সময় শ্রেণী চেতনার কথা বলেছেন এবং সংগ্রামকে শ্রেণী সংগ্রাম হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু শুধু শ্রেণী চেতনার উন্মেষ ঘটালে এবং শ্রেণী সংগ্রাম করলেই তার পরিণতিতে শ্রমিকের শাসন প্রতিষ্ঠার মত সংগ্রাম গড়ে ওঠে না। তার জন্য স্পষ্টভাবে নির্দেশ করা দরকার ক্ষমতা দখলের লক্ষ্য। তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কংগ্রেস লীগের সাথে পাল্লা দিয়ে, তার বিপরীতে ক্ষমতা দখলের কোন রণনৈতিক লক্ষ্য ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ছিল না। এ কারণে ১৯৪৭ সালে তাঁদের অবস্থান দাঁড়িয়েছিল রাজনৈতিক আত্মসমর্পণের।” (বদরুদ্দীন উমর, ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লবী সংগ্রামের যোগ বিয়োগ’, সংস্কৃতি, জানুয়ারি ২০০২। বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য এই প্রবন্ধ অবশ্য পাঠ্য। বারবার তা পাঠ করতে হবে।)

৩৩ নং প্রস্তাবে আরো রয়েছে:

রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনের সর্বত্র যে পচন ও অবক্ষয় দেখা দিয়েছে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে একটি বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে সেই বিপর্যয় রোধ করা যাবে না।”

৩৫ নং পয়েন্ট শুরু হয়েছে এই বাক্য দিয়ে :

বর্তমান সঙ্কট থেকে পরিত্রাণের জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সাধন করতে হবে।”

আমরা ‘স্বাধীন জাতীয় বিকাশের’ কর্মসূচিকে বলেছি বামপন্থী পেটি বুর্জোয়াদের কর্মসূচি। এই কর্মসূচি বর্তমান বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রকে (Republic) প্রতিস্থাপন করবে ‘বিপ্লবী গণতন্ত্র’ (Revolutionary Democracy) দিয়ে। সিপিবির ৮ম কংগ্রেস তার রাজনৈতিক প্রস্তাবের ৩৩ ও ৩৫ নং পয়েন্টে পার্টির সামনে এই কর্তব্যই হাজির করেছে।

বিপ্লবী গণতন্ত্র হলো পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রেরই এক বিশেষ রূপ, যার ভিত্তি হলো শান্তিপূর্ণঅপুঁজিবাদী পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের মার্কসবাদলেনিনবাদ বিরোধী ক্রুশ্চেভীয় সংশোধনবাদী তত্ত্ব।

অধিকাংশের কাছে অল্পাংশের আজ্ঞাধীনতা আর গণতন্ত্র এক নয়। গণতন্ত্র হচ্ছে অধিকাংশের কাছে অল্পাংশের আজ্ঞাধীনতামানা রাষ্ট্র, অর্থাৎ এক শ্রেণী কর্তৃক অপর শ্রেণীর, জনগণের একাংশ কর্তৃক অপরাংশের উপর নিয়মিত বলপ্রয়োগের সংগঠন।” (লেনিন, রাষ্ট্র ও বিপ্লব) অর্থাৎ গণতন্ত্র হলো রাষ্ট্রের এক বিশেষ রূপ। সিপিবির ‘বিপ্লবী গণতন্ত্র’ হলো বাংলাদেশের বামপন্থী পেটিবুর্জোয়াদের Shangri-la, পেটিবুর্জোয়া স্বর্গরাজ্য।

বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক কর্মসূচি হলো বিদ্যমান বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্র (Republic) উচ্ছেদ করে একটি জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (People’s Democratic Republic) প্রতিষ্ঠা।

বামপন্থী পেটি বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক কর্মসূচি হলো বিদ্যমান বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রের (Republic) স্থলে ‘বিপ্লবী গণতন্ত্র’ (Revolutionary Democracy) প্রতিষ্ঠা।

চরম দক্ষিণপন্থী পেটি বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক কর্মসূচি হলো বিদ্যমান বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রের (Republic) স্থলে ‘খেলাফত রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করা।

সাম্রাজ্যবাদ ও বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর সাথে সম্পর্কের দিক থেকে এইই হলো আজকের বাংলাদেশে শ্রেণী সমূহের অবস্থান। এইই হলো আজকের দিনের রাজনৈতিক সত্য।

কংগ্রেস রাজনৈতিক প্রস্তাবের খসড়াটিতে সব চাইতে বড় পরিবর্তন ঘটিয়েছে এই ৩৫ ও ৩৬ নং প্রস্তাবে।

খসড়ায় ৩৫নং প্রস্তাব শেষ হয়েছে রণকৌশল সম্পর্কিত এই বাক্য দিয়ে :

নানা চড়াই উৎড়াই পার হয়ে আঁকাবাঁকা পথে বিপ্লবকে অগ্রসর করার সাথে সাথে ক্ষমতা ভারসাম্যের সুবিধাজনক পরিবর্তনের যে কোনো সুযোগ প্রয়োজনমতো কাজে লাগাতে হবে।”

পরবর্তী বাক্যটিই, খসড়ায় ৩৬নং পয়েন্টের প্রথম বাক্য :

উপযুক্ত বামগণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি গড়ে ওঠার আগে ক্ষমতার ভারসাম্যের সুবিধাজনক পরির্বতন অথবা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি বিধান করতে প্রয়োজনমতো উদারনৈতিক গণতন্ত্রীসহ বৃহত্তর শক্তিসমাবেশ ঘটানোর চেষ্টা করতে হবে।”

ক্ষমতা ভারসাম্যের পরিবর্তনএর দুই ধরনের অর্থ হতে পারে। ১. বুর্জোয়াদের নিজেদের বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠির মধ্যে ক্ষমতা ভারসাম্যের পরিবর্তন এবং ২. বুর্জোয়া ও প্রলেতারীয়েতের মধ্যে ক্ষমতা ভারসাম্যের পরিবর্তন।

দ্বিতীয় ধরনের ভারসাম্যের পরিবর্তনের অর্থ হলো রাজনীতি ক্ষেত্রে শাসক শ্রেণীর আধিপত্যের অবসান ও শ্রমিক শ্রেণীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। বিপ্লবের পূর্বে এই ধরনের ভারসাম্যের পরিবর্তন ঘটবে। কেবল একটি কমিউনিস্ট পার্টিই ক্ষমতা ভারসাম্যের এই পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিতে পারে। সুতরাং সিপিবি এই ধরনের কোন পরিবর্তনের সুযোগ গ্রহণের কথা বলতে পারে না, কমিউনিস্ট পার্টি হিসাবে নিজেকে পরিচয়দানকারী একটি পার্টির জন্য তা স্ববিরোধী।

পরিস্কারভাবেই সিপিবি এখানে বুর্জোয়াদের আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা ভারসাম্যের পরিবর্তনের কথা বলছে। এই প্রথম ধরনের ভারসাম্য পরিবর্তন ঘটে শাসক শ্রেণীর আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। শাসক শ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলির পারস্পরিক মিত্রতা ও শত্রুতা নিজেদের মধ্যকার নানা দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে পরিবর্তিত হয়। এসব দ্বন্দ্ব অবৈরী বলে শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যকার মিত্রতা ও শত্রুতা কৌশলগত, নীতিগত নয়। যেমন, ১৯৯২৯৩ সালে নির্মূল কমিটির আন্দোলনের ফলে বেকায়দায় পড়া জামাতে ইসলামীকে নিয়ে ১৯৯৪৯৬ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে আন্দোলনে আওয়ামী লীগের কোন অসুবিধা হয় নাই। এভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিজের জন্য সুবিধাজনক এবং বিএনপির জন্য অসুবিধাজনক করতে সক্ষম হয়েছিল তারা।

৩৫ নং প্রস্তাব যেখানে ক্ষমতা ভারসাম্যের সুবিধাজনক পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে, ৩৬ প্রস্তাবে এই কৌশলটিই কর্তব্য হিসাবে হাজির করা হয়েছেক্ষমতা ভারসাম্যের সুবিধাজনক পরিবর্তন সাধনের কর্তব্য পার্টির সামনে হাজির করা হয়েছে। বুর্জোয়াদের মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা এবং সেই সুযোগে তাদের পাশে একটুখানি জায়গা করে নেয়া এই হলো সিপিবি নেতৃবৃন্দের স্বপ্ন। সরকারি মন্ত্রী ও ঢাকার মেয়র, বিএনপির ‘উদারপন্থী’ গ্রুপের নেতা সাদেক হোসেন খোকা এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলকে কংগ্রেসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চ পাশে বসানো হয় এই স্বপ্ন পূরণের আশায়।

কংগ্রেসের প্রতিনিধিরা এই খোলাখুলি সুবিধাবাদী নীতি গ্রহণে যে সম্মত হননি সেটা বোঝা যায় চূড়ান্ত প্রস্তাব থেকে। ‘ক্ষমতা ভারসাম্যের সুবিধাজনক পরিবর্তন’ কথাটাই তুলে দেয়া হয়েছে। তবে ঘুরিয়ে একই জিনিস গ্রহণ করিয়েছেন সিপিবি নেতৃত্ব।

আগামীতে অতীতের মতোইনীতিতে নিষ্ঠাবান ও কৌশলে নমনীয় থেকে নানা চড়াইউৎরাই পার হয়ে আঁকাবাঁকা পথে বিপ্লবকে অগ্রসর করতে হবে।”

এভাবে পুনঃলিখন করা হয়েছে ৩৫ নং প্রস্তাবের শেষ বাক্যটি। পাঠকদের সুবিধার জন্য সিপিবির অতীত নীতিনিষ্ঠা ও নমনীয় কৌশলের কিছু উদাহরণ: ১৯৬৮ সালে আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচনে অংশগ্রহণ; ১৯৭৩ সালের ১লা জানুয়ারী ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী মিছিলে সিপিবির দুই জন কর্মী নিহত হবার পর ‘উচ্ছৃংখল’ আচরণের জন্য আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে জোট গঠন, ১৯৭৫ সালে পার্টি বিলুপ্ত করে বাকশালে যোগদান; জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচিতে প্রগতিশীলতার উপাদান দেখতে পেয়ে খালকাটা, গণভোট, সংসদ নির্বাচন কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ; ১৯৮৬ সালে এরশাদের হুমকির মুখে পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সামরিক শাসনকে বৈধতাদানে ভূমিকা পালন ইত্যাদি।

এখন যেটাকে বলা হচ্ছে ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ অতীতে সেটাকেই বলা হতো ‘শক্তির ভারসাম্য’এসব তাদের পুরানো কাজ।

৩৬ নং প্রস্তাব:

উপযুক্ত বামগণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ার কাজকে অগ্রসর করার মৌলিক কর্তব্যের সাথে সংগতি রেখে, দ্বিদলীয় মেরুকরণের বাইরে প্রয়োজন মতো উদারনৈতিক গণতন্ত্রীসহ বৃহত্তর শক্তি সমাবেশ ঘটানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। বর্তমান ১১ দলীয় ধারার শক্তি সমাবেশকে উন্নত ও কার্যকর পর্যায়ে পুনর্গঠনের প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে।”

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ১১ দলীয় ধারায় বৃহত্তর ঐক্যের অর্থ হলো আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সাথে নির্বাচনী ঐক্য। এর বাইরে এই প্রস্তাবের আর কোন অর্থ আমাদের কাছে নেই। এই হলো সিপিবির ফ্রন্ট সম্পর্কিত রণকৌশল। ফ্রন্ট সম্পর্কে আরো কয়েকটি প্রস্তাব থাকলেও, সেগুলির বিস্তারিত আলোচনা এ পর্যায়ে আর প্রয়োজন নাই।

মার্কসএঙ্গেলস ও লেনিনের উদ্ধৃতি দিয়ে আমরা সিপিবির ৮ম কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাবের ওপর এই পর্যালোচনা শেষ করবো।

১৮৪৮ সালে যাঁরা বুর্জোয়া গণতন্ত্রী বলে নিজেদের প্রচার করেছিলেন, আজ তাঁরা আনায়াসেই নিজেদের সোশ্যালডেমোক্রাট বলে ঘোষণা করতে পারেন: প্রথমোক্তদের কাছে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র যেমন দুর্লভ সুদুরের বস্তু ছিল, শেষোক্তদের কাছে পুঁজিবাদের উচ্ছেদও ঠিক তেমনই, অতএব, বর্তমান রাজনীতিতে তার মোটেই কোন গুরুত্ব নেই, যতখুশি আপোস, মীমাংসা ও জনহিতৈষা চালানো যায়। প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়ার মধ্যে শ্রেণীসংগ্রামের বেলাতেও ঠিক একই ব্যাপার। এই সংগ্রামকে কাগজেপত্রে স্বীকার করা হচ্ছে, কারণ এর অস্তিত্ব আর অস্বীকার করার উপায় নেই; কিন্তু কার্যক্ষেত্রে একে চেপে যাওয়া হচ্ছে, জোলো করে দেওয়া হচ্ছে, পাতলা করে দেয়া হচ্ছে। সোশ্যালডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি হওয়া চলবে না, বুর্জোয়াদের অথবা অন্য কারও ঘৃণা অর্জন করা তার চলবে না; তার কাজ হবে সর্বোপরি বুর্জোয়াদের মধ্যে জোরালো প্রচার কাজ চালানো। যে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যগুলি দেখে বুর্জোয়ারা ভয় পায় এবং যেগুলি হাজার হোক আমাদের জীবদ্দশায় তো আর লাভ করা যাবে না, সেগুলির ওপর জোর না দিয়ে বরং জোর দেওয়া উচিত পেটি বুর্জোয়া জোড়াতালি সংস্কারের উপর, যা পুরাতন সমাজব্যবস্থার পেছনে নতুন ঠেকা দিয়ে হয়তো অন্তিম চূড়ান্ত বিপর্যয়কে ক্রমে ক্রমে একটু একটু করে যথাসম্ভব শান্তিপূর্ণ অবলুপ্তির পদ্ধতিতে পরিণত করতে পারবে।” (মার্কস ও এঙ্গেলস, বেবেল, লিবক্লেখত, ব্রাকে প্রমুখের প্রতি ‘সার্কুলার পত্র’, ১৮৭৯)

পুঁজিবাদের উচ্ছেদ দুর্লভ সুদূরের বস্তু, সুতরাং সেই চূড়ান্ত লক্ষ্যের জন্য অপেক্ষা করে কি লাভ, সে কাজের ভার নিক ইতিহাস, আমরা বরং বর্তমানে কি পাওয়া যেতে পারে সে চেষ্টাই করিএই হলো সিপিবির রণনীতিগত অবস্থান। মুখে ঘোষণা করছেন না বটে কিন্তু কার্যতঃ তাদের রণনীতিগত শ্লোগান হলো ‘মূল লক্ষ্য কিছুই নয়, আন্দোলনটাই সব’।

“‘আন্দোলনটাই সব, চূড়ান্ত লক্ষ্য কিছু নয়’বের্নস্তাইনের এই বাঁধাবুলিতে অনেক দীর্ঘ বিচার বিশ্লেষণের চেয়েও ভালভাবেই সংশোধনবাদের মর্ম প্রকাশিত হয়েছে। উপলক্ষ্যে উপলক্ষ্যে নিজের আচরণ বদলানো, দৈনন্দিন ঘটনাবলীর সঙ্গে এবং সংকীর্ণ রাজনীতির ক্রমাগত পরিবর্তশীলতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, প্রলেতারিয়েতের মূল স্বার্থগুলি এবং সমগ্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থার, সমস্ত পুঁজিবাদী বিবর্তনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি বিস্মৃত হওয়া, ক্ষণিকের বাস্তবিক কিংবা কল্পিত সুবিধার খাতিরে মূল স্বার্থ বলি দেওয়াএইই হল সংশোধনবাদের কর্মনীতি।”  (লেনিন, মার্কসবাদ ও সংশোধনবাদ)

সিপিবি অবশ্য যথেষ্ট যোগ্যতার সাথে এই সংশোধনবাদী কর্মনীতি অনুসরণে অক্ষম, আন্দোলনের জন্য তাদের তাই শাসক শ্রেণীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।।

প্রথম প্রকাশ: সংস্কৃতি, জুলাই ২০০৩

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.