লিখেছেন: আনু মুহাম্মদ

[এই লেখাটি ১৯৮৬ সালে ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে তা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে মঙ্গলধ্বনি’তে প্রকাশ করা হলো। লেখাটি মঙ্গলধ্বনি’র কাছে পাঠাতে সহযোগিতা করেছেন মাসুদ রানা ও আসাদুজ্জামান আল মুন্না।সম্পাদক]

পুঁজিবাদের উদ্ভব এবং বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণীর উদ্ভব এবং বিকাশ ঘটে। আবার তা থেকে জন্ম নেয় শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক মতাদর্শ, জন্ম হয় তার হাতিয়ার শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির। ১৮৪৮ সালে যখন ইউরোপে পুঁজিবাদ দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত; শ্রমিকশ্রেণীও একইভাবে যখন একটি শক্তি হিসেবে উদ্ভূত সেই সময়ই কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস কমিউনিস্টি ইশতেহারের মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক আন্দোলন করে মজুরী বৃদ্ধি করাই শ্রমিকশ্রেণীর ঐতিহাসিক দায়িত্ব নয়, তার মুক্তির পথ নয়। সমাজ বিকাশের ধারায় অগ্রসর মতাদর্শ ধারণ করে তাকে শোষণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থাই উৎখাত করতে হবে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার পত্তন ঘটানোর দায়িত্ব তাঁদেরই। তাঁদের এবং মানব জাতির এটাই হচ্ছে মুক্তির পথ। এ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সমাজ বিপ্লব ঘটাতে প্রয়োজন হবে তাঁদেরই একটি সুসংগঠিত পার্টির।

মার্কস এঙ্গেলস জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল শাখায় এযাবৎকালের সকল বিকাশ ধারা অনুসন্ধান করেন এবং ক্ল্যাসিকাল বুর্জোয়া অর্থনীতি; ফরাসী ইউরোপীয় সমাজতন্ত্র এবং জার্মান দ্বান্দ্বিকভাববাদী দর্শনের সর্বোচ্চ বিকাশকে সঠিক বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন এবং তার অধিকতর বিকাশ ঘটান। তাঁদের দর্শন মানব ইচ্ছা নিরপেক্ষ প্রাকৃতিক নিয়মকে পরিষ্কার করে তোলে এবং দেখায় যে, পুঁজিবাদ শ্বাশত কোন ব্যবস্থা নয়। এটি মানব বিকাশের ধারায় একটি পর্যায় মাত্র। দ্বান্দ্বিকনিয়মেই এর মধ্যে এর বিনাশের শর্তসমূহ প্রস্তুত হয়। তবে এই বিনাশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে না। এর জন্য প্রয়োজন হয় সুসংগঠিত একটি রাজনৈতিক শক্তির।

রাষ্ট্র হচ্ছেশ্রেণী বিভক্ত সমাজে এক শ্রেণীর উপর অন্য শ্রেণীর নিপীড়নের যন্ত্র। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় রাষ্ট্র হচ্ছে বুর্জোয়াশ্রেণীর শোষণনিপীড়নের যন্ত্র, তাদের একনায়কত্বের ঘনীভূত প্রকাশ।

কোন ধরনের সংস্কার বা সদিচ্ছা দ্বারা এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত চরিত্রকে পরিবর্তন বা দূর করা সম্ভব নয়। পুঁজিবাদের বিনাশ এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও একে শ্রেণীহীন সমাজ ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাবার অপরিহার্য পূর্বশর্ত হচ্ছে এই রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎখাত এবং নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা যেখানে শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্বের ঘনীভূত প্রকাশ ঘটে। আবার এই কাজটি সুসম্পন্ন করবার অপরিহার্য পূর্বশর্ত হচ্ছে বিপ্লবী তত্ত্বে সজ্জিত একটি সুসংগঠিত শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির।

ঘটনার শুরু আরও পেছনে

ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশ হিসেবেই বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। ইতিহাস পর্যলোচনা করলে আমরা দেখি, আমাদের কমিউনিস্ট আন্দোলন এমন কিছু প্রবণতা দ্বারা বারবার আক্রান্ত হয়েছে যেগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে মার্কস এঙ্গেলস দ্বান্দ্বিক ভাববাদ ও যান্ত্রিক বস্তুবাদ থেকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এবং ইউটোপীয় সমাজতন্ত্র থেকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারণাকে আলাদা করেছিলেন এবং লেনিন বিভিন্ন রকমের সংস্কারবাদী লেজুড়বাদীবিলোপবাদী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে বিপ্লবী আন্দোলনকে ভিন্ন করেছিলেন এবং তাকে বিকশিত করেছিলেন। মার্কসএঙ্গেলসলেনিন যেসব দৃষ্টিভঙ্গী ও প্রবণতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন সেসব দৃষ্টিভঙ্গী ও প্রবণতাই এখানে মার্কস লেনিনের নামে বিভিন্ন সময়ে প্রচলিত হয়েছে। এর একটি বস্তুগত উৎস নিশ্চয়ই এ দেশের সমাজচেতনার বাস্তব ভিত্তির মধ্যে আছে। এর ধারাবাহিকতা এখন পর্যন্ত যথেষ্ট শক্তিশালীভাবে বিদ্যমান।

৬০ দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত একক কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেই এসব প্রবণতাদৃষ্টিভঙ্গী কার্যকর ছিল; এ সময় আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে দ্বিধা বিভক্তির কারণে পার্টি দ্বিধা বিভক্ত হয়, পরে দ্রুত এসব প্রবণতা বিভিন্ন খণ্ডের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। একথাটি অবশ্য ঠিক নয় যে, সন্ত্রাসবাদ এবং সংস্কারবাদের মাধ্যমে প্রকাশিত এসব প্রবণতা একচেটিয়াভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনের উপর প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। এর বিরুদ্ধে পার্টির ভেতরেবাইরে মতাদর্শগত ও সাংগঠনিক সংগ্রাম ঠিকই হয়েছে কিন্তু এই সংগ্রাম কখনোই সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারেনি। সন্ত্রাসবাদ বা সংস্কারবাদের মাধ্যমে সংশোধনবাদী চিন্তাভাবনাই প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছে। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভিন্ন ঘাতপ্রতিঘাতের মাধ্যমে মার্কসবাদীলেনিনবাদী সাহিত্যর প্রচার ও প্রসার, বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্তি বৃদ্ধি, বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সংকটের ঘনীভবন ইত্যাদি কারণে সামাজিকভাবে বর্তমানে সমাজতন্ত্রের ধারণা ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে কিন্তু রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির কার্যকর নেতৃত্ব গড়ে উঠেনি।

পুরো ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে একবার সন্ত্রাসবাদী চিন্তাচেতনার প্রাধ্যান্য, একবার সংস্কারবাদী চিন্তাচেতনার প্রাধান্য সৃষ্টি হয়েছে।

কমিউনিস্ট আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতা এখনও অক্ষুণ্ন রয়েছে এবং সন্দেহাতীতভাবে বর্তমানে এ ক্ষেত্রে নিকৃষ্ট সংস্কারবাদী ধ্যানধারণাই প্রধান ভূমিকা পালন করছে।

মতাদর্শগত ও সাংগঠনিকভাবে এই সংশোধনবাদী ধ্যানধারণায়, কর্মপদ্ধতি ও আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের গুরুদায়িত্ব এখন যে সংগঠনটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছে সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবি। তাই সিপিবির মতাদর্শগত অবস্থান, সাংগঠনিক কর্মসূচি, আন্দোলন ও রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশগ্রহণ ইত্যাদি সম্পর্কিত আলোচনা অতি আবশ্যিকভাবে সংশোধনবাদ সংক্রান্ত আলোচনার সমার্থক হয়ে পড়ে।

কিন্তু যে অবস্থানেই থাকুক সিপিবি, ক্ষমতাসীনদের সহযোগী বা প্রকাশ্যে বিরোধী, আপাতঃদৃষ্টিতে তার বক্তব্য অবস্থানে কিছু পার্থক্য সাদা চোখে ধরা পড়বে কিন্তু এর মধ্যে অন্তর্নিহিত সংশোধনবাদী অবস্থান অভিন্নভাবে কাজ করে এবং এটিকে পরিষ্কার করে তোলার জন্য প্রয়োজন হয় বিশ্লেষকের দৃষ্টিভঙ্গী।

খুবই সঠিক নীতি ছিল কিন্তু কিঞ্চিৎ ভুল হয়েছিল

আমরা শুরু করতে পারি সিপিবি’র কিছু কর্মসূচী দিয়ে। সময়সীমা ধরা যেতে পারে, ’৬০ দশকের মাঝামাঝির পর থেকে কেননা, সে সময়ই পার্টি বিভক্তির পর বর্তমান সিপিবি’র জন্ম হয় এবং তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে এ সংগঠন কাজ করছে।

বিভক্তির পর পরই সিপিবি (তৎকালীন ইপিসিপি) যে উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি নেয় সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ক্ষমতার ভিত্তিকে পাকাপোক্ত করবার জন্য আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচনে অংশগ্রহণ। ’৬৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম কংগ্রেসে তারা এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, অন্য একটি সিদ্ধান্তও তাদের এ ধরণের সিদ্ধান্তের সঙ্গে খুবই সম্পর্কিতভাবে গৃহীত হয়, সেটি হচ্ছে অপুঁজিবাদী পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের সোভিয়েত ততত্ত্ব।

উল্লেখ্য যে, সে সময় বামপন্থীদের অন্যান্য অংশ ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পূর্ব প্রস্তুতিতে সক্রিয়ভাবে নিয়োজিত।

মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন হচ্ছে “সেই সময় ১৯৬৮ সালে পরিস্থিতি বিবেচনা করে পার্টি মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচন বর্জনের সম্ভাবনা দেখে নাই, তাই নির্বাচনকে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনার নীতি গ্রহণ করেছিল।” ‘ক্ষমতাসীনদের কোন কর্মসূচী বর্জনের সম্ভাবনা দেখা’ সিপিবি’র ইতিহাসে খুবই বিরল। তবে এটাও তাদের ক্ষেত্রে সবসময় ঘটেছে যে, পরবর্তীতে তারা যখন তাদের এই আন্দোলনের হাতিয়ারকে ভগ্ন বিধ্বস্ত হিসেবে আবিষ্কার করেছেন তখন তারা একে ‘ভুল হয়েছিল’ বলে বর্ণনা করেছেন কিন্তু এতে তাদের মৌলিক তত্ত্বগত অবস্থানের কোন পরিবর্তন হয়নি।

বুর্জোয়াদের সুসংগঠিত শক্তিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে বিবেচনা করা এবং ‘শক্তির ভারসাম্য’ রক্ষার জন্য তাদেরকে সহযোগিতা করবার নীতি এবং তাদেরকে প্রগতিশীলে রূপান্তরিত করা তাঁরা বরাবরই ফরজ কাজ হিসেবে ধরে থাকেন। সে হিসেবেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁরা বরাবর ভাল সম্পর্ক রাখতে চেয়েছেন, আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের অশ্লীল গালিগালাজ, উপেক্ষা, অশ্রদ্ধা তাদের এই “বিপ্লবী” উদ্দীপনাকে কোনভাবেই নিরস্ত্র করতে পারেনি।

১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রাম শুরু হলে তাদের প্রধান ভুমিকা ছিল ভারতে গিয়ে অবস্থান নেয়া ও সোভিয়েত নীতি অনুযায়ী ভূমিকা গ্রহণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন ৭১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অখন্ড পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার ফলে সিপিবি’র কেন্দ্রীয় ভূমিকাও সেভাবে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। অবশ্য অন্যান্য বামপন্থী সংগঠনগুলোর মতো এ সংগঠনেরও অনেক কর্মী আওয়ামী লীগের বাধা এড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। তবে অক্টোবরে ভারতের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের মৈত্রী চুক্তি এবং সেই সঙ্গে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন সিপিবি’র গুরুত্ব বর্ধন করে এবং তাকে উপদেষ্টার মর্যাদায় আসীন করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সিপিবি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে ‘প্রগতিশীল নীতি অনুসরণকারী দল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকালে আদিম পুঁজি পুঞ্জিভবন, বণিক পুঁজির ব্যাপক ও বিস্তৃত আগ্রাসন, নতুন রাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক পুঁজির নতুনভাবে ভিত্তি স্থাপনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যে ব্যাপক ত্রাস, দূর্নীতি, নৈরাজ্য, উৎপাদন বিরোধী কার্যক্রমের বিস্তার ঘটেছিল তাকেও যৌক্তিক করা এবং এর সমালোচকদের বিরুদ্ধে নির্যাতনে নৈতিক সমর্থন দান ও জনমত গঠন তাদের অন্যতম দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭২ সালের সংবিধানকে উল্লাসের সঙ্গে তাঁরা গ্রহণ করেন এবং সংকট আইনসহ একের পর এক কালাকানুন যোগ হয়, সংশোধনী যুক্ত হতে থাকে তখন তাকেও তাঁরা সমর্থন করতে থাকেন ‘রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে’। ১৯৭৪ সালে জরুরী অবস্থা এবং ১৯৭৫ সালে একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাঁদের নৈতিক সমর্থন এবং সক্রিয় উদ্যোগের সম্পর্ক ছিল। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিকে বিন্দুমাত্র আঘাত না করে পরিত্যক্ত সম্পত্তি জাতীয়করণ তাঁদের চোখে ছিল বৃহৎ পুঁজিকে খর্ব করার এবং সমাজতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপনের এক মহান উদ্যোগ। বৃহৎ পুঁজি ‘খর্ব করার’ আওয়ামী প্রক্রিয়ায় পুঁজির যে পুঞ্জিভবন ঘটে তারই প্রতিক্রিয়ায় একই আমলে পুঁজির সিলিং দ্রুত উঠতে থাকে। সাম্রাজ্যবাদী বিনিয়োগ, সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি, প্রশাসনে “দালাল দক্ষ” প্রশাসকদের পুনর্বহাল, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি ইত্যাদি সব ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগকে আরও বিপ্লবী করে তোলার জন্য তাদের অব্যাহতভাবে কদমবুসি করে যাওয়ার নীতিতে সিপিবি কোন কুণ্ঠা দেখায়নি। ১৯৭৩ এর ১লা জানুয়ারী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মিছিল পুলিশের গুলিতে সিপিবি’র দু’জন কর্মী নিহত হবার পর তাদের এই ভক্তি ও নীতি আরও দৃঢ় হয়।

এখন তাদের চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী তারা তাদের তৎকালীন ভূমিকাকে ভুল বলছে। তাদের এখনকার বক্তব্য হচ্ছে; ‘আমরা উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের ধারাকে সমর্থন করতে চাই না।’ তাদের নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে স্বীকারোক্তিও আছে, ‘স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা শাসক দল আওয়ামী লীগের সাথে ঐক্যের উপর জোর দিয়েছি বেশি। দেশপ্রেমিক শক্তি হিসেবে আওয়মী লীগ, ন্যাপ ও আমাদের পার্টির মধ্যে ঐক্য গড়ার উপর জোর দেয়া খুবই সঠিক নীতি ছল, কিন্তু ঐক্যের সঙ্গে মিত্র দলগুলির নেতিবাচক দিকগুলির বিরুদ্ধে সংগ্রামেরও যে গুরুত্ব আছে সেক্ষেত্রে বিবেচনার ঘাটতি ছিল। এই দুর্বলতা গোড়া থেকেই চলে আসছিল। তাই লক্ষ্য করা যাবে যে, দ্বিতীয় কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাবে মিত্র দলগুলোর সাথে ঐক্যের কথা আছে, কিন্তু সংগ্রামের কথা কোথাও নেই। তাছাড়া মধ্যস্তরের পার্টিগুলিকে যে বিকাশের দ্বান্দ্বিক ধারার মধ্যেই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন সে দৃষ্টিভঙ্গীও আমাদের আচ্ছন্ন ছিল।’ এই আচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গীর স্বীকারোক্তি আচ্ছন্নতার মৌলিক ততত্ত্বকে যে পরিবর্তন করেছে এমন কোন লক্ষণ দেখা যায় না। অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে সিপিবি সেই পুরনো ঐক্যজোটেই একইভাবে ফিরে এসেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও দলের ভাঙনের সময়ে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তারা জনগণ ও কর্মীদের বোঝানোর জন্যই যে এসব কথা বলেছে তা তাদের পরবর্তী অভিন্ন কার্যক্রম থেকেই স্পষ্ট হয়। জিয়াউর রহমান সরকারের ১৯ দফা কর্মসূচিতেও তারা এ সরকারের প্রগতিশীলতার উপাদান দেখে এবং এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে খালকাটা, গণভোট, সংবাদ নির্বাচন কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। ‘শক্তির ভারসাম্য’ তাদের সব কাজের মহান যুক্তি। এ কাজেও তাদের এ যুক্তির অভাব হয়নি। তাদের ‘শক্তির ভারসাম্য’ এবং ‘বাস্তব আন্দোলনগত’ অবস্থা দিয়ে এরপরও এই সংগঠন এরশাদের সামরিক শাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের গণআন্দলনকে বিচার করে এবং একভাবে ২১শে মে’র চুক্তির ভয়ানক বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে শ্রমিকশ্রেণীর জাগরণকে পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করে। এবং ব্যাপক গণআন্দোলনকে ৫ দফার আন্দোলন অর্থাৎ বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্বের অধীনস্ত রাখায় সবচাইতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তারা এরশাদের হুমকির মুখে পার্লামেন্টের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সামরিক শাসনকে বৈধ করার সহায়তা করে এবং সামরিক সরকারের হাতে অধিকাংশ আসন প্রদানের জাল নির্বাচন সমাপ্ত হবার পর ‘অর্জিত বিজয় সংহত করার জন্য’ বারবার আহ্বান জানাতে থাকে। ৫ দফার স্বাভাবিক এই পরিণতিকে ৫ দফা ও জনগণের বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করায় তাদের কোন কুণ্ঠা হয়নি। কয়েক বছর পর সম্ভবতঃ তারা একে ‘অতিরিক্ত আশাবাদ’ ‘কিছুটা ভুল’ ইত্যাদি বলে নিজেদের গা বাঁচানোর চেষ্টা করবে। একথা বলা ভুল যে, সিপিবি’র কথার সঙ্গে কাজের মিল নেই বা তারা নীতিহীন কাজ করে। বরঞ্চ, উল্টোদিকে এই সংগঠনটি অন্যান্য আরও অনেক সংগঠনের চাইতে অধিক নীতিনিষ্ঠতা ও ধারাবাহিকতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের এযাবতকালের সকল কর্মসূচির সঙ্গে তাদের মৌলিক নীতি বা ততত্ত্বগত ভিত্তি সুসমঞ্জস্য। আমাদের দেখা দরকার তাদের কার্যক্রমের তত্ত্বগত ভিত্তিটা কি?

শেকড় কোথায়

সিপিবি বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠা, জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশের জন্য সব সময় অত্যন্ত সতর্ক, সংবেদনশীল ও সক্রিয় থাকার পরও সোভিয়েত ইউনিয়নকে অনুসরণের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে আন্তর্জাতিক।

৬০ দশকের মাঝামাঝি সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্টি, রাষ্ট্র ও তার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যে মৌলিক পরিবর্তন সূচিত হয়, তাকে কেন্দ্র করে অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও কমিউনিস্ট পার্টি পিকিংপন্থী ও মস্কোপন্থী হিসেবে দ্বিধাবিভক্ত হয়। পিকিংকে অনুসরণ করা পিকিংপন্থীদের সকলের জন্য খুব সহজ ও সুবিধাজনক ছিল না, কেননা পিকিং এদের ব্যাপারে তেমন দায়দায়িত্ব বোধ করতো বলে মনে হয় না। সেকারণে তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্নে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। তাঁরা খুব সহজেই বহু দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্য দলটির পৃষ্ঠপোষকতায় বরাবরই সচেতন ছিল বলে মনে হয়েছে। মস্কোপন্থী হিসেবে ইপিসিপি, পরবর্তীতে সিপিবি, একনিষ্ঠতার সঙ্গে তার লাইন বজায় রাখে। পার্টির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোন মতাদর্শগত সংগ্রামের প্রতিফলন পাওয়া মুশকিল। অতীতের ভুলের জন্য যা কিছু হয় তা ‘কিছু ভুল হয়েছিল’ এই স্বীকারোক্তি দিয়ে শেষ হয়।ক্রুশ্চেভ নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্টি যেসব মতাদর্শগত পরিবর্তন সূচিত করে, মার্কসবাদলেনিনবাদের যে ‘সৃজনশীল’ পরিবর্তন সংঘটিত করে তার মধ্যে বিভিন্ন দেশে বিপ্লবের নতুন নিয়মনীতি বিন্যাসও ছিল। সিপিবি এসব নিয়মনীতি অনুযায়ীই আন্তরিকভাবে এ পর্যন্ত কাজ করে এসেছে। এর বিরুদ্ধে কোন সংগ্রাম হয়নি তা নয়, তবে পার্টিতে এ সম্পর্কে বেশি প্রশ্ন তোলা মার্কসবাদলেনিনবাদ বিরোধিতার সমার্থক এবং বহিষ্কারযোগ্য অপরাধ।১০

কাজেই সিপিবি’র বর্তমান মতাদর্শগত অবস্থানের উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের সোভিয়েত ইউনিয়নের বর্তমান পার্টির মতাদর্শগত অবস্থান ও প্রেসপিক্রপশন অনুসন্ধান করতে হয়। প্রাথমিক উপাদান হিসেবে ধরলেও, যে দু’টি দিক এখানে বিবেচনা করতেই হবে সেগুলো হচ্ছে; () রাষ্ট্র ও সর্বহারার একনায়কত্ব সম্পর্কে তত্ত্ব এবং () অধনবাদী পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের ততত্ত্ব। উৎস খুঁজতে হবে সিপিবির শ্রেণী চরিত্রের মধ্যেও যা তাদেরকে এই তত্ত্ব গ্রহণ ও অনুসরণে বাধ্য করেছে।

বুর্জোয়া রাষ্ট্রও থাকবে, সমাজতন্ত্রও হবে

১৮৫২ সালে মার্কস তাঁর একটি চিঠিতে এ সত্য উচ্চারণ করেছিলেন যে, ‘আধুনিক সমাজে শ্রেণীর অস্তিত্ব কিংবা শ্রেণীসমূহের মধ্যেকার দ্ব›দ্ব আবিস্কারে আমার কোন কৃতিত্ব নেই। আমার বহু আগে বুর্জোয়া ঐতিহাসিকেরা শ্রেণীসংগ্রামের ঐতিহাসিক বিকাশ এবং বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদরা শ্রেণীসমূহের অর্থনৈতিক ব্যবচ্ছেদ করেছেন। আমি নতুন যা করেছি তা হচ্ছে প্রমাণ করা যে, () শ্রেণীসমূহের অস্তিত্ব উৎপাদন বিকাশের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পর্যায় দ্বারা নির্ধারিত (বাউন্ড আপ) () শ্রেণীসংগ্রামের অতি আবশ্যিক পরিণতি হচ্ছে সর্বহারার একনায়কত্ব () এই একনায়কত্ব শ্রেণীহীন সমাজ এবং সকল শ্রেণীর অবলুপ্তির এক অন্তবর্তীকাল মাত্র।’১১

মার্কসের এই নতুন অবদানই মার্কসবাদের অঙ্গ। কিন্তু নতুন অবদান বাদ দিয়ে মার্কস যার যার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন সেগুলোই এখন সোভিয়েত পার্টি ও সিপিবি’র মত মার্কসবাদীদের প্রধান তত্ত্বগত অবলম্বন।

বিপ্লবী তত্ত্ব বিকাশের প্রক্রিয়ার লেনিন রাষ্ট্র এবং সম্পর্কিতভাবে সর্বহারা একনায়কত্বের তত্ত্বকে আরও বিকশিত করেছেন। রাষ্ট্র সম্পর্কে মার্কস এঙ্গেলস লেনিন সকলকেই অনেক তত্ত্বগত সংগ্রাম করতে হয়েছে। কেননা প্রলেতারিয়েত বিপ্লব ও ভাঁওতাবাজ সংশোধনবাদীদের বিপ্লবের অন্যতম পার্থক্যকীকরণ রেখা হচ্ছে রাষ্ট্র সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গী। লেনিন বলছেন, ‘বুর্জোয়া বিশেষত পেটি বুর্জোয়া তাত্ত্বিকরা মার্কসকে সংশোধন করে এভাবে বিষয়টিকে উপস্থাপন করে যাতে রাষ্ট্র শ্রেণীসমূহের আপোষ মীমাংসার যন্ত্র হিসেবে উপস্থিত হয়। কিন্তু মার্কসের মতে, রাষ্ট্র এ কাজের জন্য উদ্ভুতও হয়নি কিংবা এ কাজ করা তার পক্ষে সম্ভবও নয়। বরঞ্চ রাষ্ট্র হচ্ছে শ্রেণী বিরোধের অমীমাংসেয়তার ফল এবং বহিঃপ্রকাশ।১২

যেহেতু রাষ্ট্র শ্রেণীসমূহের আপোষ মীমাংসার যন্ত্র নয় বা এটি আপোষ মীমাংসা করতে অক্ষম সেহেতু ‘শোষিতশ্রেণীর মুক্তি একটি সহিংস বিপ্লব শুধু নয়, শাসকশ্রেণীর রাষ্ট্রযন্ত্রের ধ্বংস করা ছাড়া অসম্ভব।১৩ লেনিনের এই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা কাউটস্কী থেকে শুরু করে এযাবতকালের ছদ্ম মার্কসবাদীদের পক্ষে অসম্ভব। সে কারণে তারা রাষ্ট্র সম্পর্কিত আলোচনা এড়িয়ে যায়, বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার কর্মসূচিকে সযত্নে বাদ দেয়, সর্বহারার একনায়কত্ব বিষয়টি তাদের কাছে অবান্তর মনে হয়, রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ত্রুটিমুক্ত করার জন্য তারা কর্মসূচি দেয় এবং এগুলো যুক্তিযুক্ত করার জন্য মার্কসের নাম ব্যবহার করেই তারা রাষ্ট্রকে আপোষ মীমাংসার যন্ত্র হিসেবে উপস্থিত করে।

রাষ্ট্র তাদের কাছে আপোষ মীমাংসার যন্ত্র বলেই শাসকশ্রেণীর ‘প্রগতিশীল উপাদান’ আবিষ্কার করে তাকে বিকশিত করার জন্যে এসব “বিপ্লবীরা” শাসকশ্রেণীকে সর্বাত্মক সহযোগিতার কর্মসূচি নেয় এবং তাতে সমবেত হবার জন্য শ্রমিকশ্রেণী ও শ্রমজীবী জনগণকে আহ্বন জানায়।

কিন্তু মাকর্স লেনিন এ ধরণের মতবাদকে সরাসরি বাতিল করে স্পষ্টতই শ্রমিকশ্রেণীর বিজয়ের জন্য সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বের অপরিহার্যতাকে তুলে ধরছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবের প্রথম পদক্ষেপই হচ্ছে নিজেকে শাসকশ্রেণীর অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করা।’১৪ কিংবা “বুর্জোয়া রাষ্ট্রের বিভিন্ন রূপ আছে, কিন্তু এগুলোর সারবস্তু একই; এই সব রাষ্ট্রই তাদের যে রূপই থাকুক না কেন, চূড়ান্ত বিশ্লেষণে সেগুলো হচ্ছে বুর্জোয়াদের একনায়কত্ব। পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদে বিভিন্ন রাজনৈতিক রূপ থাকলেও সারবস্তু অপরিহার্যভাবে হবে একটাই : সর্বহারার একনায়কত্ব।”১৫

লেনিন “রাষ্ট্র ও বিপ্লব” গ্রন্থে এ সম্পর্কে মার্কসীয় মতবাদ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যার মতবাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করা বেশী প্রয়োজনীয় মনে করেছিলেন তিনি হচ্ছেন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রথম সারির নেতা প্রাক্তন মার্কসবাদী কার্ল কাউটঙ্কি। কার্ল কাউটস্কি শ্রেণীসংগ্রাম স্বীকার করতেন কিন্তু তাকে সর্বহারার একনায়কত্ব পর্যন্ত নিয়ে যেতে স্বীকৃত ছিলেন না। বুর্জোয়া রাষ্ট্র ধ্বংসে তাঁর দ্বিধা বা আপত্তির প্রকট বহিঃপ্রকাশ ঘটে প্রথম মহাযুদ্ধে ‘পিতৃভূমিকে রক্ষার জন্য’ তাঁর গৃহীত লাইনে।

কার্ল কাউটস্কি একজন ব্যক্তি হলেও তাঁর মতবাদ তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তার সঙ্গে সঙ্গে শেষও হয়নি। তার ধারাবাহিকতা স্ট্যালিন পরবর্তী সোভিয়েত পার্টি এবং বিভিন্ন দেশের সংশোধবাদীদের মধ্যে বেশ সার্থকভাবেই অব্যাহত আছে এবং তা আরও বিকশিত হয়েছে।

সে কারণে সিপিবির কোন দলিলপত্রেই রাষ্ট্র সম্পর্কে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন নেই। প্রতিফলন আছে কাউটস্কির। তারা শ্রেণীসংগ্রামের কথা বলে, কিন্তু বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংসের আহবান জানায় না, তার জন্য কোন কর্মসূচীও নেই। সর্বহারার একনায়কত্ব তাদের দলিলপত্রে প্রায় নিষিদ্ধ শব্দ। উল্টো তারা বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শাসকশ্রেণীর দ্বারা ‘প্রগতির সূচনা’ লক্ষ্য করে; শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন অংশে “বিভিন্ন রূপের বুর্জোয়া একনায়কত্ব” সুলভ কার্যক্রম তাদের কাছে কখনো বেশি প্রগতিশীলতা কখনও দূর্বলতা, ভুলভ্রান্তি, কখনও ‘কতক ক্ষতিকর কার্যকলাপ’ হিসেবে প্রতিভাত হয়। শাসকশ্রেণীর ‘সমাজতন্ত্র অভিমুখীনতাকে বিকশিত করাবার জন্য তারা সহযোগিতার লাইন গ্রহণ করে, শক্তির ভারসাম্য রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের স্থিতাবস্থা বজায় রাখা কর্তব্য মনে করে।১৬

মার্কস এঙ্গেলস লেনিনের পরিষ্কার এবং অত্যন্ত মৌলিক সূত্রায়নকে অস্বীকার করেও তারা মার্কসবাদী হিসেবে নিজেদের উপস্থিত করে, করতে পারে একই লাইনের বৃহৎ ‘সমাজতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রের তত্ত্বগত ও বস্তুগত পৃষ্ঠপোষকতার কারণে। এ শক্তি তাদের গৃহীত লাইনের ব্যাপারে মার্কসবাদী সমালোচনাকারীদের সম্পর্কে বলছে, ‘এ মতবাদের (মার্কসবাদের) কয়েকটি সাধারণ প্রতিজ্ঞা অবলম্বন করে ও অতীতের ইতিহাস সম্পর্কে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি মূর্ত নির্দিষ্ট উক্তিকে পরম করে তুলে এঁরা কার্যত বিগত দশকগুলিতে বিপুল ঐতিহাসিক পরিবর্তন, বিশেষতঃ বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভবের কথা ভুলে যান।’১৭

মার্কস যাকে তাঁর নতুন অবদান বলছেন সেটিই এখানে দাঁড়ায় ‘বিচ্ছিন্ন কয়েকটি মূর্ত নির্দিষ্ট উক্তিতে। কেননা, উপরোক্ত আলোচনায় বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার সবল উচ্ছেদ ছাড়াই বুর্জোয়া প্রগতিশীলদের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্রমূখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে যৌক্তিক করা হয়।

বিপুল ঐতিহাসিক পরিবর্তন’এর কথা আমরা ভুলিনি। অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তা আমরা মনে রাখি এবং তার সঙ্গে এই তত্ত্বগত অবস্থানের সম্পর্ক স্থাপন করি। এই ‘বিপুল ঐতিহাসিক পরিবর্তন’ সংঘটিত হয় ক্রুশ্চভের ক্ষমতা দখলের পর। মার্কসীয় তত্ত্ব বিসর্জিত হয়, খাপ খাওয়ানোর নামে আবির্ভূত হয় নতুন তত্ত্ব। শক্তির ভারসাম্য, খাপ খাইয়ে নেওয়া, প্রগতির ধারা সূচনাকারী বিপ্লবী গণতন্ত্রী, ‘গণতন্ত্রীদের সমাজতন্ত্রাভিমুখীনতা ইত্যাদি শব্দবন্ধ ব্যবহৃত হয়। (সিপিবির দলিলগুলোতে এসব শব্দবন্ধের ব্যবহার মুহুর্মূহু ঘটে থাকে)

ক্রুশ্চভের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক পরিবর্তনগুলোর মূল দিক শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক ক্ষমতাকে খর্ব করা এবং মার্কস এঙ্গেলস লেনিন কর্তৃক পরিত্যক্ত সামাজতন্ত্রে উত্তরণের তত্ত্বকে নতুন মোড়কে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা।

বিসর্জিত লেনিন, গৃহীত ক্রুশ্চভ

ক্ষমতা সংহত হবার সময়কাল সোভিয়েত ইউনিয়নের নব উদ্ভূত সুবিধাভোগীশ্রেণীর আন্তরিক প্রতিনিধি ক্রুশ্চভ চক্র ১৯৫৬ সালে পার্টির প্রতিষ্ঠিত লাইনের বিরুদ্ধে গিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, শান্তিপূর্ণ সহযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার তিনটি তত্ত্ব প্রদান করেন। ক্ষমতা পরিপূর্ণভাবে সংহত হবার পর এটি পার্টির লাইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ‘সমাজতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ উত্তরণের তত্ত্ব’। এবং পরিশেষে ১৯৬১ সালে সর্বশেষ আক্রমণটি পরিচালিত হয়। ঘোষণা করা হয় যে, সোভিয়েত সমাজে যেহেতু আর শ্রেণীসংগ্রামের অস্তিত্ব নেই সেহেতু শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব আর অব্যাহত রাখবার প্রয়োজন নেই। সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন জনগণের রাষ্ট্র।১৮ রাষ্ট্র থাকা মানেই মার্কসীয় সূত্রায়ন অনুযায়ী শ্রেণীর অস্তিত্ব থাকা। শ্রেণী থাকে বলেই শ্রেণীর নিপীড়নের যন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রের প্রয়োজন থাকে। শ্রেণী আছে অথচ শ্রেণীসংগ্রাম নেই এবং রাষ্ট্র আছে অথচ একনায়কত্ব নেই কিংবা রাষ্ট্র আছে অথচ শ্রেণীই নেই এ ধরণের তত্ত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই মার্কস লেনিন রাষ্ট্র সম্পর্কিত সূত্রায়ন দাঁড় করিয়েছিলেন। মার্কসীয় এই সূত্রায়নে বারবার বলা হয়েছে যে, পুঁজিবাদ থেকে কমিউনিজমে উত্তরণকাল অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের সময়ে শ্রেণীর অস্তিত্ব থাকবে, রাষ্ট্র থাকবে এবং সেখানে অবশ্যই সর্বহারার একনায়কত্ব থাকতে হবে। সর্বহারার এই রাষ্ট্র সব ধরণের রাষ্ট্রের শেষ পর্যায় এবং রাষ্ট্র শুকিয়ে মরবে কেবল মাত্র কমিউনিজমের উদ্ভবের পর। কিন্তু সোভিয়েত পার্টি একে সংশোধন করে যে তত্ত্ব দিচ্ছে তার প্রতিধ্বনি করে সিপিবি নেতা বলছেন, “শ্রমিক একনায়কত্ব হলো মূলগতভাবেই নতুন ধরণের রাষ্ট্র। ধনতন্ত্র থেকে সমাজন্ত্রে উত্তরণ পর্বে এ ধরণের রাষ্ট্র হলো প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সংগঠন।১৯ এখানে শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্বের রাষ্ট্রকে ধনতন্ত্র থেকে কমিউনিজমে উত্তরণেকালে থাকবে শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্বমূলক রাষ্ট্র। কিন্তু কমিউনিজমে উত্তরণকে কাঁট ছাঁট করে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ পর্ব হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে এবং আরও গোঁজামিল দিয়ে বলা হয় যে “রাষ্ট্র ‘শুকিয়ে মরে’ কিন্তু বিলুপ্ত হয় না। সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বের বদলে সমস্ত জনগণের রাষ্ট্র নামে ‘রাষ্ট্র’ বিকাশের নতুন পর্বের উদ্ভব হয়।”২০ নতুন কাউটস্কিদের প্রয়োজনে ও নেতৃত্বেই যে এই ‘উদ্ভব হয়’ তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এটি যে মার্কবাদ বিরোধী এ সত্যটি ঢেকে রাখার জন্য তাদের নানারকম গোঁজামিলের আশ্রয় নিতে হয়। ‘রাষ্ট্র’ সম্পর্কিত এই নতুন উদ্ভাবন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে কি ভূমিকা পালন করছে সে সম্পর্কিত আলোচনা ভিন্ন। আমরা এখানে শুধু দেখতে চাই ক্রুশভ এর নেতৃত্বে অধঃপতিত কমিউনিস্ট, উদীয়মান এবং পুরনো বুর্জোয়াশ্রেণীর এই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তার অনুগামী বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ বাংলাদেশের ‘সিপিবি’র কর্মসূচিকে তা কিভাবে নির্ধারণ করছে।

বিকশিত সমাজতন্ত্রের এক স্তরে গমনের পর’ সোভিয়েত রাষ্ট্রে সকল শ্রেণী ও শ্রেণীসংগ্রামের বিলোপ ঘটেছে বলে সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব বাতিল করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু পতন একটি জায়গায় থেমে থাকে না, তা ক্রমশঃ নিম্নগামী হতে থাকে। আমরা দেখি, তাদের যুক্তি অনুযায়ী অন্ততঃপক্ষে পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ পর্ব পর্যন্তই শুধুমাত্র সর্বহারার একনায়কত্ব থাকতে হবে। তার মানে, এই তত্ত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন পুঁজিবাদী, আধা পুঁজিবাদী দেশের ‘বিপ্লবী আন্দোলনে রত’ কমিউনিস্ট পার্টিগুলির অবশ্যই সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার কর্মসূচী থাকা উচিত। কিন্তু সিপিবিসহ এসব পার্টিগুলির তা নেই। শ্রেণী বিশ্লেষণ, শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গী সোভিয়েত ইউনিয়নে বাতিল হল ‘বিকশিত সমাজতন্ত্রে’ আসার পর। কিন্তু উপরোক্ত সোভিয়েত তত্ত্ব অনুযায়ী বর্তমান বাংলাদেশে তা কেন হবে?

আসলে আন্তর্জাতিকভাবেই এই গোষ্ঠীটি সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা আর সহাবস্থানই করছে না, বুর্জোয়াশ্রেণীর সঙ্গে একেবারে মিশে গেছে। সে কারণে সর্বক্ষেত্র থেকেই তাদের শ্রেণী বিশ্লেষণ ও শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গী এবং বিশেষতঃ সর্বহারার একনায়কত্বের কথাটা উঠে গেছে। বুর্জোয়াদের ‘প্রগতিশীল’ ভূমিকা কাজে লাগানোর এবং তাদের লেজুড়বৃত্তি করাকে যুক্তিযুক্ত করবার জন্যই তাদের এটা করতে হয়েছে।

অনুন্নত দেশগুলোর এই ‘শ্রেণীহীন’ সমাজতন্ত্রীদের কার্যক্রমকে যৌক্তিক করার জন্য আরেক ধরণের তত্ত্ব উপস্থিত করা হচ্ছে। সেটি হচ্ছে অধনবাদী বিকাশের তত্ত্ব। এই তত্ত্ব তাদের ঘোষিত তথাকথিত ‘পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণকালের সর্বহারার এক নায়কত্ব’ কেও বাতিল করেছে।

পুঁজিবাদ এড়িয়ে সমাজতন্ত্র

সংশোধনবাদীরা তাদের সকল প্রকার বেশ্যাবৃত্তিকেই মার্কসীয় লেনিনীয় বলেই পরিচালনা করে। এক্ষেত্রেও তারা ব্যতিক্রম হয়নি। তারা এই তত্ত্ব কেও লেনিনীয় তত্ত্ব বলে অভিহিত করে।

হ্যাঁ, একথা ঠিক যে লেনিন অবিকশিত পুঁজিবাদী দেশে অধনবাদী বিকাশের কথা বলেছিলেন। কিন্তু কিভাবে বলেছিলেন? ১৯২০ সালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেস তিনি বলেছেন, ‘যদি তাদের (পশ্চাদপদ দেশের জনগণ) মধ্যে বিজয়ী বিপ্লবী সর্বহারা ধারাবাহিক প্রচারণা পরিচালনা করে এবং সোভিয়েত সরকারসমূহ সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসে সে সময় এটা ধরা ভুল হবে যে, পশ্চাৎপদ জনগণকে অবশ্যই পুঁজিবাদী উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যেতে হবে। আমাদেরকে উপনিবেশ ও পশ্চাৎপদ রাষ্ট্রসমূহে সংগ্রাম এবং পার্টি সংগঠনসমূহ গড়ে তুলতে হবে। প্রাক পুঁজিবাদী শর্তাবলী অনুযায়ী কৃষকদের সোভিয়েত গড়ে তোলার জন্য প্রচারণা পরিচালনা করতে হবে এবং কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিককে অবশ্যই এই সূত্রায়ন প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে, উপযোগী তত্ত্বগত ভিত্তির উপর উন্নত দেশগুলোর সর্বহারাশ্রেণীর সহযোগিতা নিয়ে অনুন্নত দেশগুলো পুঁজিবাদী স্তর পার না হয়েও সোভিয়েত ব্যবস্থায় এবং কিছু নির্দিষ্ট উন্নয়ন স্তরের মধ্য দিয়ে সাম্যবাদে যেতে পারে।২১ অপুঁজিবাদী বিকাশের জন্য এখানে লক্ষণীয় শর্তাবলী হচ্ছে, () বিজয়ী বিপ্লবী সর্বহারা () সোভিয়েত সরকারসমূহের সর্বোচ্চ সহযোগিতা () কৃষকদের সোভিয়েত () উপযোগী তত্ত্বগত ভিত্তি।

ক্রুশ্চেভীয় তত্ত্বে লেনিনের এই শর্তাবলীর কোন অবস্থান নেই, এ বিষয়টি একটু পরেই আরও পরিষ্কার হবে।

একই বিষয় নিয়ে মঙ্গোলীয় গণ প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তিনি আলোচনা করেন। তিনি তাদের সঙ্গে অপুঁজিবাদী বিকাশের পথ সম্পর্কে আলোচনা করেন যার প্রধান শর্ত হিসেবে তিনি সোভিয়েত শ্রমিক কৃষকদের সহযোগিতা, পিপলস রেভলিউশনারী পার্টি এবং সরকারের কঠোর পরিশ্রম, বহুসংখ্যক সমবায়ের বিকাশ, নতুন ধরণের অর্থনৈতিক তৎপরতা ও নতুন ধরণের জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশের গুরুত্ব তুলে ধরেন।২২

মঙ্গোলিয়ার ভৌগলিক অবস্থান ও সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্রের ভূমিকা এই দু’টি দিকও এখানে আমাদের স্মরণ রাখতে হবে।

এ প্রসঙ্গে অনুন্নত দেশের অবস্থান খেয়াল করা দরকার। এ শতকের শুরু থেকেই বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বিকাশ এবং সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের বিস্তারের ফলে বিভিন্ন অনুন্নতশ্রেণীর মতাদর্শ ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে। দেখা যায়, পুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদে উত্তরণের কারণে উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোতে বিপ্লব হচ্ছে না। অন্যদিকে বিপ্লবী পরিস্থিতি পরিপক্ক হচ্ছে সেই দেশসমূহে যেখানে পুঁজিবাদী বিকাশ সম্পূর্ণ হয় নি। পুঁজিবাদী বিকাশ সম্পূর্ণ না হলে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ অসুবিধাজনক। কেননা পুঁজিবাদী বিকাশ মানে হচ্ছে উৎপাদনের শ্রমিক রূপান্তর, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত বিকাশ, চিন্তা চেতনার প্রয়োজনীয় বিকাশ ইত্যাদি। এই বিকাশ ছাড়াই আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিশেষ অবস্থার কারণে কোন দেশে যদি সাম্রাজ্যবাদের শৃক্সখল দুর্বল হয় এবং শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি ব্যাপক জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে তবে সেখানে বিপ্লব সম্ভব। লেনিনীয় সূত্রায়ন অনুযায়ী সাম্রাজ্যবাদের সকল শৃক্সখল থেকে মুক্তি এবং পুঁজিবাদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করবার জন্যই সেখানে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আগে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের বা জাতীয় মুক্তি বিপ্লবের স্তর পার হয়ে যেতে হয়। শ্রমিকশ্রেণীর কঠোর সতর্ক নেতৃত্ব বজায় রেখে সেখানে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দিতে হয়। রাশিয়ার নয়া অর্থনৈতিক নীতি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। লেনিনীয় পদ্ধতিতে পুঁজিবাদকে এড়িয়ে এভাবেই সমাজতন্ত্রের ভিত্তি প্রস্তুত হয় এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির মাধ্যমে শ্রমিকশ্রেণীর কঠোর ও সতর্ক নেতৃত্ব।

কিন্তু সিপিবি এখানে পরিষ্কারভাবে বলে, ‘নেতৃত্বের প্রশ্নটি পূর্ব নির্ধারিত বলে সিপিবি মনে করে না।’২৩ কিন্তু নেতৃত্বের প্রশ্নটি তাঁরা আবার অনুল্লিখিতও রাখেন না। তাঁরা বলেন ‘দ্বিতীয়টি (জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব) ঘটে শ্রমিক ক্ষেতমজুর কৃষক প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ছাত্র যুবক এবং মধ্যস্তরের জনগণের বিপ্লবী শক্তির নেতৃত্বে।’২৪ আবার বলেন, ‘দেশের জনগণের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে প্রথম থেকেই সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্ব থাকতে হবে এমন কোন কথা নেই। এবং এমনও কোন যুক্তি নেই যে, প্রথম থেকেই তাকে বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে পরিচালিত হতে হবে। ….শক্তির ভারসাম্য যদি এমন হয় যে, দেশের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সমাবেশে সর্বহারাশ্রেণীর প্রাধান্য নেই, সেক্ষেত্রে কি সে এই সমাবেশে যোগ দেবে না? নাকি সে এক্ষুণি নেতৃত্বে নেই বলে সেই সমাবেশ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখবে? এবং এইভাবে নিজের রাজনৈতিক অপমৃত্যু ডেকে আনবে।’২৫ তাঁরা আরও বলেন, ‘১৯৮৪তে এসে এখন যে চলতি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও ব্যাপক ঐক্য আমরা লক্ষ্য করছি তা উপরোক্ত বক্তব্যের সঠিক তাৎপর্যকেই নতুন তুলে ধরছে।‘২৬

এ বক্তব্যে পরিষ্কারভাবে ধরে নেয়া হচ্ছে যে, () বর্তমান বিশ্ব পুঁজিবাদী কাঠামোয় শ্রমিক শ্রণী ছাড়া অন্য কোন শ্রেণী, মানে নির্ঘাত বুর্জোয়াশ্রেণী, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে পারে এবং () কমিউনিস্টদের প্রথম থেকেই বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করবার দরকার নেই।২৭

প্রথমত, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম যদি বুর্জোয়াশ্রেণীর নেতৃত্বে সম্ভব হয় তাহলে খুবই আনন্দের কথা। কিন্তু তার মানে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব বর্তমান যুগেও বুর্জোয়াশ্রেণীর নেতৃত্বেও হতে পারে; যা লেনিন বহু আগেই বাতিল করেছিলেন। বুর্জোয়াদের লেজুরবৃত্তি করবার জন্য এই তত্ত্বগত লাইন সিপিবি’র জন্য খুবই দরকার। আর এ লাইন থেকেই সিপিবি ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অধনবাদী পথে সমাজতন্ত্রে যাত্রা শুরু হয়েছে বলে প্রচার করছিল। তাদের তখন শ্লোগান ছিল, ‘এবারের সংগ্রাম সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম।’২৮

দ্বিতীয়ত, বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামের বস্তুগত তাগিদ থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির উদ্ভব। প্রথম থেকে সংগ্রামের কথা শুধু নয় একটি সঠিক পার্টির উদ্ভবই হচ্ছে বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামের শক্তিশালী ইঙ্গিত। এর থেকে দূরে অবস্থান করে তারাই যারা এই রাষ্ট্রব্যবস্থার উচ্ছেদ করতে অনিচ্ছুক।

বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনার বিপরীতে সব কাজই সিপিবি অনুমোদন করে। ‘প্রথম থেকেই’ শুধু নয়, কখনোই তারা বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে রাজী নয়। এ রকম কোন বক্তব্য কিংবা কর্মসূচী তাদের নেই। পার্লামেন্টে আওয়ামী লীগের আসন প্রাপ্তিই ‘তাদের কাছে বিরাট বিজয়’, সমাজতন্ত্রের পথে এক ‘দৃঢ় পদক্ষেপ’।

সৎলোকের অভাব পূরণের কর্মসূচী

তাদের ঘোষণা ও কর্মসূচিতে রাষ্ট্র সম্পর্কে মার্কসীয় সূত্রায়ন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বরঞ্চ বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মসূচিতে এই ধারণাই প্রতিষ্ঠিত হয় যে, বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থা তাদেরই রাষ্ট্র ব্যবস্থা। এর কিছু ভুলত্রুটি আছে। দুর্নীতি আছে। স্বার্থন্বেষী মহলের কিছু চক্রান্ত আছে। এগুলো ঠিকঠাক করাই কর্তব্য। আমরা এখানে সিপিবি’র ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচি (১৯৮০) থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিতে পারি :

মুক্তিযুদ্ধের জোয়ার এবং সেই সঙ্গে স্বাধীনতা উত্তরকাল আওয়ামী লীগ সরকারের উল্লিখিত ধরণের নীতিসমূহের ফলে দেশে এক প্রগতির ধারা সূচিত হইয়াছিল।’ (পৃ১৬)

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে আমাদের পার্টি প্রগতির ধারায় দেশকে পুনর্গঠনের কর্তব্য গ্রহণ করিয়াছিল।’ (পৃ১৭)

……. দেশ পরিচালনায় নানারূপ ভুলভ্রান্তি, ব্যর্থতা ও কতক ক্ষতিকর কার্যকলাপ এবং দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি প্রভৃতির ফলে প্রগতির ধারা দেশে মূল ধারা হিসাবে স্থায়ী হইতে পারে নাই।’ (পৃ১৭)

বর্তমানে আমাদের দেশে বিরাজমান প্রশাসন যন্ত্রে গণবিরোধী, অবাধ ধনবাদের সমর্থক ও ঔপনিবেশিক মনোভাবাপন্ন লোকজন আছে। প্রশাসন যন্ত্রে এবং সমাজে ঘুষদুর্নীতি মারাত্মকভাবে বাড়িয়া চলিয়াছে। আমাদের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদের সমর্থক তথা জাতীয় স্বার্থ বিরোধী লোকজনও রহিয়া গিয়াছে। স্বাধীনতাউত্তর সমাজ ও দেশের প্রয়োজনের সহিত বর্তমান প্রশাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ।’ (পৃ১৫)

ইহারা আমাদের দেশবাসীর ধর্মপ্রাণ মনোভাবের সুযোগ লইয়া ধর্মের জনকল্যাণমূখী ও ইসলামের সাম্য ভ্রাতৃত্বের বাণী গোপন রাখিয়া গোঁড়ামি প্রচারে ও ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহার করে।’ (পৃ১৫)

কায়েমী স্বার্থবাদী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীগুলির হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা থাকিলে তাহারা রাষ্ট্র যন্ত্রকে বিপ্লবের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য মরিয়া হইয়া চেষ্টা করিবে।’ (পৃ২৬)

আমাদের দেশেও শ্রমিকশ্রেণী সচেতন হইয়া উঠলে বিপ্লবে সবচাইতে দৃঢ় ও অটল ভূমিকা গ্রহণ করিবে।’ (পৃ২৭)

….. এইরূপ শক্তি সমাবেশ ও বিপ্লবী গণআন্দোলনের মধ্য দিয়া বিপ্লবী শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হইবে।’’ (পৃ২৭)

ওহী অখণ্ডনীয়, অভ্রান্ত

বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার ভুলত্রুটি দূর করা এবং এমনকি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মের প্রগতিশীল বাণী ব্যবহার করে বুর্জোয়াদের বিপ্লবী অংশের (এদেশে আওয়ামী লীগ) মাধ্যমে, অধনবাদী বিকাশের মাধ্যমে, সমাজতন্ত্রে উত্তরণের সিপিবি’র তত্ত্ব পূর্ব নির্ধারিত এবং প্রদত্ত। এই তত্ত্ব নির্মাণে সিপিবি’র নেতাদের বিন্দুমাত্র অবদান নেই। এমনকি বিদ্যমান উৎপাদন পদ্ধতির বিশ্লেষণ, শত্ত্রুমিত্র বিশ্লেষণ সবই তাদের প্রাপ্ত। সংশোধনবাদী বা বুর্জোয়া তত্ত্বের উদ্ভাবনের কৃতিত্ব সিপিবি নেতাদের কেউ দিতে পারে না। তাদের ভূমিকা আন্তর্জাতিক সংহতির নামে সংশোধনবাদী তাত্তি¡কদের পুরোপুরি অনুগমন করা, প্রদত্ত বক্তব্যকে নিজেদের নামে উপস্থাপন করা। সেজন্যে দেখা যায়, তাদের সকল বক্তব্য সোভিয়েত প্রকাশনীর বক্তব্যের অনুলিপি মাত্র। অধনবাদী বিকাশ সম্পর্কে সোভিয়েত ব্যাখ্যার কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করা যায়।

নেতৃত্বের প্রশ্নের সমাধান হয় কে নেতা, বা কার নেতা হওয়া উচিত তার ঘোষণা দিয়ে নয়, পার্টিদের বাস্তব অবস্থা, প্রভাব, জনগণের উপর নির্ভর করতে পারার কৃতিত্ব, তাদের আস্থার যোগ্য হতে পারার ক্ষমতা দিয়ে।’২৯

আস্থার যোগ্য’ হতে পারার কারণে আইয়ুব খান, শেখ মুজিব, জিয়াউর রহমান, এরশাদের নেতৃত্ব সিপিবিকে স্বীকার করে নিতে হয়। নেতা ভিন্নতায় এ স্বীকৃতির পার্থক্য পরিমাণগত, গণগত নয়। এখানে একই সঙ্গে একটি সত্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হচ্ছে; ‘সঠিক হবে এই কথা বললে যে, সোভিয়েত বা জনগণতান্ত্রিক পথ থেকে বিকাশের অপুঁজিবাদী পথের পার্থক্যের প্রধান লক্ষণটা সামাজিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। সমাজতন্ত্রে উৎক্রমণের পূর্ববিদিত রূপ থেকে সমাজতন্ত্রমুখিনতার পার্থক্য প্রধানত এই যে, তার নেতৃত্বে করছে প্রলেতারীয় অগ্রবাহিনী নয়, বিপ্লবী গণতন্ত্র অর্থাৎ পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রের নাম অংশ।’৩০ (বাংলাদেশে নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগ!) অর্থাৎ সিপিবি’র নেতা যে বললেন ‘নেতৃত্বপূর্ব নির্ধারিত নয়’ তাতে তিনি সত্য গোপন করেছেন। এটি পূর্ব নির্ধারিত এবং তা স্পষ্টভাবেই প্রলেতারিয়েতের পার্টির হাতে নয়। এই বিপ্লবী গণতন্ত্রীদের সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা দেয়া হচ্ছে এখানে, ‘…… রাজনৈতিক দিক থেকে বিকাশের অপুঁজিবাদী পথের অর্থ ক্ষমতায় বিপ্লবীগণতান্ত্রিক শক্তির প্রতিষ্ঠা যারা পুঁজিবাদ প্রত্যাখ্যান করছে, সমাজতন্ত্রের দিকে মুখ ফিরিয়েছে, যারা প্রতিফলিত করছে জনগণের মেহনতী স্তরের মূল স্বার্থ।’৩১ আর বর্তমানকালে শ্রমিকশ্রেণীর মতাদর্শ ও পার্টি ছাড়া কারও পক্ষে মেহনতী স্তরের মূল স্বার্থ প্রতিফলন সম্ভব এ “সত্যটিও” আমাদের শিখতে হচ্ছে, অবশ্য আগে মার্কস থেকে লেনিনকে ভুলতে হবে। যাই হোক মেহনতী স্তরের মূল স্বার্থ যারা প্রতিফলিত করবে তাদের নেতৃত্বে সমবেত হওয়া সিপিবিদের আবশ্যিক দায়িত্ব। সেজন্যেই এদের সঙ্গে ‘শ্রেণীভিত্তিপ্রসূত শত্রুতা দিয়ে নয়, তাই আপষের, এমনকি পাকাপোক্ত মৈত্রীর বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতে দৃষ্টিচ্যুত করা অনুচিত। …. শেষ খতিয়ানে প্রধান তাৎপর্য ধরে কার্যকর ঐক্য ও সহযোগিতা।’৩২ সিপিবি সেজন্যেই গণঐক্য জোট করে ঐক্য জোরদার করে ও যাবতীয় অপকর্মের আন্তরিক সহযোগি হয়, বিটিম খেতাব মাথা পেতে নেয় এবং অবশেষে কেন্দ্রীয় কমিটিতে ১ জন সদস্যের পদ নিয়ে খুশি মনে বাকশালের মধ্যে নিজেদের পার্টিকে বিলুপ্ত করে কার্যকর ঐক্যের তত্ত্বের সফল বাস্তবায়ন ঘটায়। পরে অবশ্য বলে, ‘কিঞ্চিৎ ভুল হয়েছিল।’

সোভিয়েত পুস্তিকা সঠিকভাবে বলেছে, ‘পঞ্চাশ ও ষাট দশকের মাঝামাঝি আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন অপুঁজিবাদী বিকাশের প্রশ্নটা তোলে।’৩৩ কেননা, লেনিনের অপুঁজিবাদী বিকাশের ধারণার সঙ্গে এর দূরত্বসর্বহারা মতাদর্শের সঙ্গে বুর্জোয়া মতাদর্শের তত্ত্বের সমান। ৫০ ও ৬০ দশকের মাঝামাঝি ক্রুশ্চেভ চক্রের এই দ্বিতীয় ধারার তত্ত্বই মার্কসবাদী মোড়কে আত্মপ্রকাশ করে এবং সিপিবি’র মতো সংগঠনগুলোর অন্তর্নিহিত সুবিধাবাদিতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও বুর্জোয়া সেবাদাসত্বের ঘাড়ে চড়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।৩৪

অবাক হওয়া অন্যায়

তাই সিপিবি যখন () ধর্মকে প্রতিক্রিয়াশীলদের হাত থেকে রক্ষা করে নিজে তা ব্যবহার করে ভোট নিশ্চিত করতে চায়, () যখন শাসকশ্রেণীকে শুধু (ক্ষমতাসীন দল নয়) বৈধতার এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চেষ্টা করে, () জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠে, () শান্তিপূর্ণ পথে ‘সমাজতন্ত্র’ কায়েমের তত্ত্ব উপস্থিত করে, () “বঙ্গবন্ধু” ও আওয়ামী লীগকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তি হিসেবে উপস্থিত করে, () কোটি কোটি জনগণের উপর নির্যাতন নিপীড়ন ও শোষণ পরিচালনার পুরোহিত ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুতে শোকে বিহ্বাল হয়ে পড়ে, () সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতার কাছে যখন বহুজাতিক কোম্পানীর চাকুরি অপরিহার্য হয়ে থাকে, () সিপিবি’র বুদ্ধিজীবী যখন সামরিক জান্তা প্রধানের কাছে মাথা নত করে পদক গ্রহণ করে, () সরকারী কর্মকর্তাদের প্রধান অতিথি করে যখন সিপিবি’র সংগঠন অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করে, (১০) সিপিবি’র অনেক নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবী বা প্রভাবশালী সমর্থকেরা যখন সাম্রাজ্যবাদী অর্থ ও পরিকল্পনা অনুযায়ী গবেষণাকার্যে লিপ্ত থাকে, (১১) সিপিবি’র অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি যখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্কে অংশ নেয়, (১২) তাদের অনেক প্রকাশনা যখন সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠানের অর্থানুক‚ল্যে হয়, (১৩) সিপিবি’র বহু কর্মী যখন সাহায্য সংস্থার মাধ্যমে নিজেদের খোরাকি অর্জন করে, (১৪) শ্রেণীসংগ্রাম যখন স্থগিত রাখার পরামর্শ দেয়৩৫তখন তা মোটেই বিস্ময়কর মনে হয় না। এসবই তাদের মৌলিক তত্ত্বগত অবস্থানের একেকটি প্রতিফলন।

বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, রাজনৈতিক আন্দোলনে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অব্যাহতভাবে সচেষ্ট থাকা, পুরো পার্টিকে সেভাবে যোগ্য করে তোলার চেষ্টা করা, সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করবার জন্য প্রস্তুত হওয়ার কর্মসূচী সেজন্য সিপিবি’র কর্মসূচীর সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ শুধু নয়, সম্পূর্ণ বিরোধী বটে।

সিপিবি’র মুখ্য ভূমিকা হচ্ছে, তথাকথিত ‘বিপ্লবী’ গণতন্ত্রীদের শক্তি, মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। আর প্রকৃতপক্ষে তাদের কাছে বিপ্লবী গণতন্ত্রী হচ্ছে বুর্জোয়াশ্রেণীর সেই অংশ যাদের সামাজিক ভিত্তি আছে, কায়িক শক্তি বেশি এবং যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে গ্রহণযোগ্য। আওয়ামী লীগ হচ্ছে তাদের সেই শক্তি। সমাজতন্ত্রের অধিকতর সশব্দ উচ্চারণ করে, সিপিবি’র বহু দিনের প্রচেষ্টায় আওয়ামী লীগের “প্রগতিশীল” অংশ বলে পরিচিতরা বাকশাল গঠন করেন। কিন্তু কম শক্তির কারণে তারা সিপিবি’র কাছে সেই মর্যাদা পায়নি। সঠিকভাবে বললে, সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে তারা সেই মর্যাদা পায়নি। “শক্তির ভারসাম্য”, “আস্থার যোগ্যতা” বোধহয় এর কারণ। সোভিয়েত ইউনিয়নের পেছনে সিপিবি’র এই অন্ধ অনুগমনের উৎস তাদের শ্রেণীগত ভিত্তি এবং চেতনাগত সুবিধাবাদিতা। মতাদর্শগত শক্তির বিকল্প হিসেবে তাদের সামনে উপস্থিত থাকে দেশের অভ্যন্তরে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি, আওয়ামী লীগ (বিপ্লবী গণতন্ত্রী হিসাবে নাম দিয়ে যাদের পেছনে দাঁড়ানোর যুক্তি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়) এবং আন্তর্জাতিকভাবে থাকে একটি বৃহৎ শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা। এই বৃহৎ শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা নেতৃত্বের জীবনযাত্রার মানকেও উন্নত করে; বিদেশ সফর, স্কলারশীপ ইত্যাদির মোহ কর্মীদের অনেককে অন্ধ রাখে; রাষ্ট্রীয়ভাবে দরকষাকষির শক্তি বৃদ্ধি করে; এখানে কমিশন এজেন্সীর মাধ্যমে বিত্তবান সমর্থক সংগ্রহ সহজ হয়; মতাদর্শগত বিকাশের প্রয়োজনীয়তা তাদের সামনে থেকে লুপ্ত হয়।

বুর্জোয়াদের লেজুড়বৃত্তির চেতনা তাদেরকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বর্তমান নেতৃত্বের অন্ধ অনুগমনে প্ররোচিত করে। এবং অন্ধ অনুগমন তাদের বিকৃত তত্ত্বে সজ্জিত করে অধিকতর লেজুড়বাদীতে পরিণত করে। শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির স্বাধীন বিকাশ, বিপ্লবী মতাদর্শের ব্যাপক বিস্তার, আন্দোলনে আগত শ্রমিক কৃষক ছাত্র যুবক বুদ্ধিজীবীদের বিপ্লবী মতাদর্শে শিক্ষিত করে তোলা ও বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামকে ক্রমগতভাবে শক্তিশালী করে তোলার প্রশ্ন সিপিবি’র কাছে তাই কৌতুককর ও অপ্রয়োজনীয়।

এ অবস্থায় সিপিবি’র পক্ষে কি কার্যকরভাবে কোন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামও গড়ে তোলা সম্ভব? তারা অবশ্য মর্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী কিন্তু ঠিক ততটুকু পরিমাণেই যতটুকু সোভিয়েত ইউনিয়ন তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থে বিরোধী। তাছাড়া সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির ক্রিয়ার সংগে সিপিবিও জড়িয়ে পড়ে কেননা তাদের ‘বিপ্লবী গণতন্ত্রীরা’ প্রকৃতপক্ষে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির সংগে সম্পর্কিত এ দেশীয় বুর্জোয়া। নির্দিষ্টভাবে বললে, মুৎসুদ্দী বুর্জোয়া। সিপিবির দৃষ্টিতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনায় যাদের ‘কতক দুর্বলতা ছিল’ এবং এরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর উদ্যোগ না নিয়েও ‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তি’। আর এদেরই নেতৃত্বে বর্তমান ৫ দফার ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলন’ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কোন কর্মসূচী না থাকলে তা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন।৩৫

অনেক কিছুই আছে আসলটাই নেই

সিপিবি’র কৃষকশ্রমিকছাত্র সংগঠন আছে। সেগুলোর কায়িক শক্তি নেহায়েত কম নয়। সিপিবি এগুলোর মাধ্যমে কৃষক ছাত্র যুব আন্দোলন গড়ে তোলে, তাদের অর্থনৈতিক দাবীদাওয়ার আন্দোলন করে, সমাজতন্ত্রের কথাও বলে কিন্তু কখনোই এভাবে অর্জিত শক্তিকে শ্রমিকশ্রেণীর মতাদর্শ ও পার্টি বিকাশের কাজে লাগায় না, বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তার চিন্তা চেতনা মতাদর্শ ও সংগ্রামকে পরিচালনা করে না। বরঞ্চ এভাবে অর্জিত শক্তি যাতে কোনভাবেই “বিপ্লবী গণতন্ত্রী”দের নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায় সে জন্যে সর্বদা সচেষ্ট থাকে।৩৬ এ ভূমিকার জন্য পার্টিকে যেভাবে জোলো প্রক্রিয়ায় গড়ে তোলা দরকার তারা তাই করছে। এবং সে কারণেই সোভিয়েত প্রচারিত তত্ত্ব ছাড়া মার্কসীয়লেনিনীয় গ্রন্থ অধ্যয়ন, এ নিয়ে মতাদর্শগত শিক্ষা ও বিকাশের প্রক্রিয়া, এ নিয়ে পার্টির মধ্যে প্রশ্ন উত্থাপন সাংঘাতিকভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়।৩৭

অথচ লেনিনীয় নীতিই হচ্ছে সকল আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির শক্তি বৃদ্ধি করা এবং সকল শক্তিকে বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পরিচালিত করা।

সিপিবি’র মূল ভূমিকা সেজন্যেই দাঁড়ায় শ্রমিক কৃষক সহ শ্রমজীবী জনগণের মধ্যে শ্রেণীসংগ্রামের কথা বলে তাদেরকে অর্থনৈতিক দাবীদাওয়ার আন্দোলনে সমবেত করে তাদের অন্তর্নিহিত শ্রেণীগত শক্তিকে বুর্জোয়ার্দের ক্ষমতা ভাগাভাগির কাজে বলি দেয়া। এর ফলাফল অবশ্যম্ভাবীরূপে দাঁড়ায় সেই শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর, হতাশা এবং সমাজতন্ত্রের আন্দোলনের প্রতি অনীহা। এভাবেই সিপিবি রেডফ্ল্যাগ দিয়ে রেডফ্ল্যাগের বিকাশকে রুদ্ধ করার সংগ্রাম করে।

পাদটীকা ও তথ্য নির্দেশ

. আব্দুল কাইউম মুকুল, ওয়ার্কার্স পার্টির বাংলাদেশী মার্কসবাদ, ভিন্নমত প্রকাশনী, জুন ১৯৮১, পৃ

. দেখুন, মঈদুল হাসান, মূলধারা ’৭১, ঢাকা, ফেব্রুয়ারী ১৯৮৬

. প্রমাণ্য বিবরণের জন্য দেখুন, রেজোয়ান সিদ্দিকী, কথামালার রাজনীতি, ঢকা, ১৯৮২

. কিছুদিন আগে বর্তমান সামরিক জান্তা এই প্রেস এ্যান্ড পাবলিকেশন্স এ্যাক্টের নাম করেই সিপিবি’র ‘একতা’ নিষিদ্ধ করে।

. বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, তৃতীয় কংগ্রেসের রিপোর্ট, ১৯৮০

.

.

. ২১ মের চুক্তির পূর্বে এবং পরে বাংলাদেশের শ্রমিক কর্মচারীদের আন্দোলন ও শক্তির অবস্থার সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঐ চুক্তির পূর্বে বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারীদের যে ব্যাপক ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রকাশ ঘটে তা প্রায় অভূতপূর্ব। কিন্তু এই চুক্তি সরকারী বেসরকারী শ্রমিক বিভক্তিকরণ, মজুরী বাঁচার মত মজুরীর অনেক নীচে নির্ধারণ ইত্যাদিভাবে চুক্তি সম্পন্ন হয়। এই চুক্তির ফলে পরবর্তীতে যে ভাঙন, বিভক্তি সৃষ্টি হয় তা দু’বছরেও আর কাটেনি। শক্তির এই বিরাট পতনের ফলে এখন আন্দোলন করতে হচ্ছে ঐ চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। এই চুক্তি প্রকৃতপক্ষে এদেশের শাসকশ্রেণীর জন্য ছিল বিরাট স্বস্তিকর এক দলিল যা শ্রমিক কর্মচারীদের উত্থানকে সাময়িকভাবে রোধ করেছে। এরপর এই চুক্তির প্রধান স্থপতি সিপিবি’র ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নেতা সাইফউদ্দীন মানিক বলছেন, ‘এই চুক্তি ছিল শ্রমিক কর্মচারীদের এক ঐতিহাসিক বিজয়।’ (কেন্দ্রীয় কমিটির রিপোর্ট, টিইউসি, ১৯৮৪, পৃ৪১)

. ৫ দফার এই আন্দোলন প্রকৃত চরিত্র সম্পর্কে আলোচনার জন্য দেখুন, বদরুদ্দীন উমর, বুর্জোয়া আন্দোলনের বিষাক্ত বৃত্ত ও আমাদের করণীয়, সংস্কৃতি, ফেব্রæয়ারী, ১৯৮৬ এবং আনু মুহাম্মদ, ছাত্র সমাজ, ছাত্র আন্দোলন ও বিপ্লবী রাজনীতি, সংস্কৃতি, ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৫

১০. কিছুদিন আগেই সিপিবি এই অপরাধে তার কয়েকজন সদস্যকে বহিষ্কার করেছে। বহিস্কৃত সদস্যরা এর কারণ বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছেন। তাঁরা শুরুতেই বহিস্কারের কারণ উল্লেখ করে বলেছেন, ‘সিপিবি নেতৃত্ব আমাদের উত্থাপিত বক্তব্যের কোন সুষ্ঠু জবাব দিতে ব্যর্থ হয়ে নানা ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ, সংগঠনের কর্মীদের কাছ থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করবার চক্রান্তে লিপ্ত হয়। কিন্তু তাদের সব চক্রান্তমূলক কার্যকলাপ তাদের নিজেদের জন্যই মারাত্মক হয়ে উঠল। কর্মীদের মধ্যে বাস্তব আন্দোলনের চাপ, পার্টির ভ্রান্ত মতাবস্থান ও নেতৃত্বের গোঁজামিল দেওয়া কথাসব মিলিয়ে আমাদের পক্ষের মত দিন দিন প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছিল।’ দেখুন, ‘আমরা কেন সিপিবিতে নেই?’ ঢাকা, এপ্রিল ১৯৮৬

১১. উদ্ধিতি : লেনিন, কালেক্টেড ওয়ার্কস, ২৫ খণ্ড, প্রগতি প্রকাশনী পৃ৪১৬

১২. ঐ পৃ৩৯২

১৩. ঐ পৃ৩৯৩

১৪. মার্কসএঙ্গেলস, কমিউনিস্ট ইশতেহার। প্যারী কমিউনের পর মার্কস এই ধারণাকেই আরও পরিষ্কারভাবে ‘সর্বহারা একনায়কত্ব’ বলে উপস্থিত করেছেন।

১৫. লেনিন, কালেক্টেড ওয়ার্কস, খণ্ড ২৫, পৃ৪১৮

১৬. তৃতীয় কংগ্রেস রিপোর্টে তাঁরা বলছেন শক্তির ভারসাম্যের জন্য মুজিব সরকার উৎখাতের নীতি ছিল ভুল।

১৭. প্রশ্নোত্তরে কমিউনিজম, প্রগতি প্রকাশনা, ১৯৭৬, পৃ৭৪

১৮. এ সম্পর্কে আরো আলোচনার জন্য, আনু মুহাম্মদ, সোভিয়েত অর্থনীতির রূপান্তর ও সমাজতন্ত্র, ঢকা ১৯৮২

১৯. রতন সেন, মার্কসবাদীদের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র, একতা, ২৩শে নভেম্বর ১৯৮২। এই প্রবন্ধের একটি ভাল সমালোচনা দেখুন, রিয়াজুর রহমা : “রাষ্ট্র সম্পর্কিত মার্কসবাদী শিক্ষার বিকৃতি ঘটানোর একটি সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত প্রসঙ্গে”, বিতর্ক ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৮৪

২০. রতন সেন, পূর্বোক্ত।

২১. লেনিন, কালেক্টেড ওয়ার্কস, ৩১ খণ্ড, পৃ১৪৪

২২. লেনিন, কালেক্টেড ওয়ার্কস, ৪২ খণ্ড, পৃ৩৬১

২৩. আবদুল কাইউম মুকুল, ওয়ার্কার্স পার্টির বাংলাদেশী মার্কসবাদ, ভিন্নমত, জুন ১৯৮১, পৃ৩৬

২৪. একতা, ১লা এপ্রিল ১৯৮৩

২৫. নজরুল ইসলাম, জাসদের রাজনীতি, উদ্ধৃতি : এম.এম. আকাশ, বাংলাদেশের শ্রমিকশ্রেণী, হাতিয়ার, বৈশাখআশ্বিন, ১৩৯১

২৬. এম.এম. আকাশ, পূর্বোক্ত

২৭. আলোচনার জন্য দেখুন, ‘আমরা কেন সিপিবিতে নেই?’ পৃ১১

২৮. আলোচনার জন্য দেখুন, ‘আমরা কেন সিপিবিতে নেই?’

পৃ২৩২৪

২৯. পুঁজিবাদ এড়িয়ে সমাজতন্ত্র, প্রশ্নোত্তর কমিউনিজম, প্রগতি প্রকাশন, ১৯৭৬, পৃ৯৮

৩০. , পৃ৮৩

৩১. , পৃ৮২

৩২. , পৃ৯৬, ৮৯

৩৩. , পৃ৭০

৩৪. সিপিবি’র ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ ও ‘শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্র’ সম্পর্কে অধিকতর আলোচনার জন্য দেখুন, ‘আমরা কেন সিপিবিতে নেই?’

৩৫. সিপিবি সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদ বলেছেন, ‘কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের আজ একই শত্রুর বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। মালিক শ্রমিক সম্পর্কের লড়াই এখন নয়’, একতা, ২১শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৬। শ্রেণীসংগ্রাম বাদ দিয়ে যে ঐক্য তা কি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হতে পারে? মালিকশ্রেণী কি নিজে থেকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভূমিকা নিতে পারে? সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার নামে মালিকশ্রেণীকে খালি মাঠ দেবার কৌশল ছাড়া আর কি বলা যায়?

৩৬. ২১শে মে’র চুক্তি, বুর্জোয়া সংসদকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ও বৈধ এবং বিরাট বিজয়ের স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা, চক্রান্তমূলক আপোষের জন্য নৈতিক চাপ ও সমর্থন ইত্যাদি এর উদাহরণ।

৩৭. সিপিবির মধ্যে এককালে খুবই সক্রিয় থাকার পর অধ্যয়ন ও সচেতনতা দ্বারা যারা এর মূল চরিত্র ধরতে পেরেছিলেন, অধ্যায়ন ও মতাদর্শগত বিরোধের ব্যাপারে যাদের চেপে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল তারা উচ্চতর কমিটির কাছে দাবী উপস্থাপন করেছিলেন। তাদের ১টি দাবী ছিল ‘মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিনের বই পড়া ও অন্যকে পড়ানোর উপর সমস্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে নিতে হবে।’ পরে তাদের বহিস্কার করা হয়। দেখুন; ‘আমরা কেন সিপিবিতে নেই?’ পৃ৩৭

(সংস্কৃতি, পঞ্চদশ সংখ্যা, শ্রাবণ ১৩৯৩, আগস্ট ১৯৮৬)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.