লিখেছেন: মেহেদী হাসান

প্রতিটি খাদ্যকণার জন্য আমরা কৃষকের কাছে ঋণী। তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমাদের জন্য ফসল ফলায়। অথচ মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ফসলের নায্য দাম পায় না কৃষক। যার ফলে তাকে সবসময় অভাবঅনটনের মধ্যে থাকতে হয়। ‘কৃষক’ শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের মনে উস্কখুস্ক চুল, কোটরের ভেতরে ঢুকে যাওয়া ঘোলাটে চোখ, ভাঙা চোয়াল ও কঙ্কালসার দেহের অবয়ব ভেসে উঠে। সমস্ত জাতির খাদ্য উৎপাদনের দায়িত্ব যাদের কাঁধে তারা কোনরকমে ধুঁকেধুঁকে বেঁচেবর্তে থাকে।

তবে সময়ে ঘাটাইলের পাকুটিয়া গ্রামের সেই কঙ্কালসার দেহ ও ঘোলাটে চোখের স্বত্বাধিকারী কৃষকের বাঁচার উপায়টুকুও যেন আর থাকছে না! বিদ্যুতখাতের কতিপয় দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি ও গ্রামের কিছু অসৎ লোকের যোগসাজশে ইরি ধানের মৌসুমে চরাক্ষেতগুলো পরিণত হয় কৃষকের মৃত্যুফাঁদে।

গ্রামের দুর্নীতিপরায়ণ কিছু লোক বিদ্যুৎ সরবরাহের নাম করে প্রতিটা পরিবারের কাছ থেকে তিনচার হাজার করে টাকা উঠায়। আর সেচ প্রকল্পের মালিকদের কাছ থেকে নেয়া হয় আটদশ হাজার করে টাকা। তারপর সেই টাকা গ্রামের কতিপয় দুর্নীতিপরায় ব্যক্তি, স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসের কিছু অসৎ কর্মকর্তা, বিদ্যুতের কন্ট্রাকটর আর গুটিকয়েক দালালশ্রেণীর লোক নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়।

বিদ্যুৎ সরবরাহের নাম করে গ্রামের কৃষকমজুরদের কাছ থেকে টাকা তোলার এই প্রক্রিয়া পুরোপুরি অবৈধ। এভাবে টাকা তোলার কোনো আইন বা নিয়ম নেই। তবে কোনো উপায়ান্তর না দেখে বিদ্যুৎ সরবরাহের নামে টাকা তোলার এই অবৈধ প্রক্রিয়া গ্রামের মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছে। তারা শুধু চায় বিদ্যুৎ সরবরাহ হবে উন্নতমানের এবং নিরাপদ।

গ্রামবাসীদের কাছ থেকে শুধু যে একবারই টাকা তোলা হয়, তা নয়। কয়েক বছর অন্তর অন্তর গ্রামের বিদ্যুৎ সরবরাহে সামান্য বিপত্তি দেখা দিলেই নতুন ট্রান্সফরমার আনা এবং নতুন করে বিদ্যুৎ সরবরাহের নামে পুনরায় টাকা তোলা হয়। টাকা তোলার সময় গ্রামবাসীদেরকে বলা হয় প্লাস্টিকের আবরণযুক্ত বৈদ্যুতিক তার এবং সিমেন্টের খুটির মাধ্যমে নিরাপদ ও উন্নতমানের বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হবে। তবে নতুন করে যখন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় তখন দেখা যায়, পুরাতন ট্রান্সফরমার, বাঁশের খুঁটি আর প্লাস্টিকের আবরণহীন নিম্নমানের বৈদ্যুতিক তার দিয়েই বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজটা করা হয়। কাঁদা ক্ষেতের মধ্যে গেড়ে রাখা হালকা বাঁশের খুঁটির মাথায় কোনোরকমে লাগিয়ে রাখা হাইভোল্টেজের বৈদ্যুতিক তারে পুরো চরাক্ষেত ছেয়ে যায়। আর যে সামান্য কয়েকটা সিমেন্টের খুঁটি থাকে সেগুলোতেও প্লাস্টিকের আবরনহীন নিম্নমানের বৈদ্যুতিক তার খুব হালকাভাবে লাগানো থাকে।

কাল বৈশাখী ঝড়ের সময়ে সামান্য বাতাসের ঝাপটাতেই নড়বড়ে বাঁশের খুঁটি প্লাস্টিকের আবরণহীন হাইভোল্টেজের বৈদ্যুতিক তার সহ নীচে পড়ে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। শুধু তাই নয় সিমেন্টের খুঁটিতে কোন রকমে কড়িহীন লাগিয়ে রাখা প্লাস্টিকের আবরণহীন হাইভোল্টেজের বৈদ্যুতিক তারও ছিড়ে নীচে পড়ে যায় খুব সহজেই। ইতিমধ্যেই খানিকটা উঁচু হয়ে উঠা ধান গাছের ভেতরে বিষাক্ত সাপের মতো ঘাপটি মেরে থাকা হাইভোল্টেজের বৈদ্যুতিক তার মেরামত করার উদ্যোগ নেয় না কেউ। স্থানীয় বিদ্যুঅফিস ও গ্রামের সেই অসৎ ব্যক্তিরা (যারা টাকা তুলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে) এই ব্যাপারে থাকে পুরোপুরি উদাসীন। এসব কিছুর ফলে পুরো চরাক্ষেত পরিণত হয় কৃষকমজুরদের মৃত্যুফাঁদে।

হালকা বাতাসের ঝাঁপটায় চরাক্ষেতে পড়ে থাকা হাইভোল্টেজের বৈদ্যুতিক তারে স্পৃষ্ট হয়ে নিজের ক্ষেতের আলে মুখথুবড়ে পড়ে থাকে কৃষকের নিথর দেহ! যতক্ষণ পর্যন্ত না খোঁজ মেলে, লাশের ভেতর দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে প্রবাহিত হয় হাইভোল্টেজের বিদ্যুৎ।

উপরে যে চিত্র বর্ণিত হলোতা বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্রামের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে বা কিছু না কিছু অংশ মিলে যায় বলেই আমার ধারণা। তবে চিত্রটি পুরোপুরি মিলে যায় টাংগাইল জেলার ঘাটাইল থানার ৭ নং দিগড় ইউনিয়নের পাকুটিয়া নামক একটা ছোট্ট ঠাসবুনট গ্রামের সঙ্গে

গোলাম মোস্তফা আর আজমত আলী ওরফে পাঙ্গাশ পরস্পরের চাচাত ভাই এই দুই দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তির নেতৃত্বে এবার ইরি ধানের চারা রোপণ শুরু হওয়ার বেশ কিছুদিন আগে নতুনভাবে বিদ্যুসরবরাহের নামে গ্রামের প্রত্যেক পরিবারের কাছ থেকে তিন হাজার করে টাকা তোলা হয়। আর সেচ প্রকল্পের মালিকদের কাছ থেকে নেয়া হয় সাতআট হাজার করে টাকা। সবাইকে বলা হয়, এবার বিদ্যুৎ সরবরাহ হবে সিমেন্টের খুঁটি আর প্লাস্টিকের আবরণ যুক্ত তারের সাহায্যে। তবে নতুন করে বিদ্যুৎ সরবরাহের পর দেখা যায়, সমান্য কয়েকটা সিমেন্টের খুঁটি আর সামান্য কয়েক জায়গায় প্লাস্টিকের আবরণযুক্ত তার বাদে চরাক্ষেতের সর্বত্র বাঁশের খুঁটিতে লাগানো হাইভোল্টেজের প্লাস্টিকের আবরণহীন পুরাতন নিম্নমানের নানান জায়গায় জোড়াতালি দেয়া পুরাতন বৈদ্যুতিক তার। সিমেন্টের খুঁটির সাথে মূল বৈদ্যুতিক তার যেখানে যুক্ত করা হয়, সেখানে নিরাপত্তার স্বার্থে প্রায় সর্বত্রই চিনামাটির গোল মতো একটা জিনিসের (আমাদের এলাকায় যেটাকে কড়ি বলে) সাথে যুক্ত করা হয়। মাত্র কয়েক জায়গায় সেই কড়ি দিয়ে সিমেন্টের খুঁটির সাথে বৈদ্যুতিক তার সংযুক্ত করা হলেও অধিকাংশ জায়গাতেই কড়ি ছাড়াই বৈদ্যুতিক তার সংযুক্ত করা হয়। যা খুবই অনিরাপদ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। কার এক্ষেত্রে প্লাস্টিকের আবরহীন হাইভোল্টেজের বৈদ্যুতিক তার সংযুক্ত থাকে স্টিলের আংটার সাথে হালকা বাতাসে স্টিলের আংটার সাথে ঘর্ষণে বৈদ্যুতিক তারটি কেটে গিয়ে ছিড়ে নীচে পড়ে যায়। আরো ভয়ানক ব্যাপার হলো চরাক্ষেতের মাঝখানে কিছু কিছু জায়গায় এমনকি বাঁশের খুঁটিও নয় গাছের (সম্ভবত ইউক্যালিপ্টাসের হালকা ডাল) হালকা ডাল ইরিক্ষেতে পুতে রেখে তার সাথে প্লাস্টিকের আবরহীন হাইভোল্টেজের বৈদ্যুতিক তার কোনোরকমে লাগিয়ে রাখা হয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় বাঁশের খুঁটি ইতিমধ্যে ৪৫ ডিগ্রী কোণে হেলে পড়েছে সামান্য একটা বাতাসের ঝাপটাহাইভোল্টেজের বৈদ্যুতিক তারসহ বাঁশটি মাটিতে আছড়ে পড়বে। যা কেড়ে নিতে পারে কৃষকের প্রাণ। বাঁশের খুঁটিতে লাগানো প্লাস্টিকের আবরহীন তার দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ শুধুমাত্র সেচ প্রকল্পগুলোতেই যায়নি চরাক্ষেতের মাঝখান দিয়ে অন্য পাড়া বা মহল্লায় এমনকি চরাক্ষেতের অপর পাশের গ্রামেও চলে গিয়েছে।

যাই হোক, অবৈধভাবে একবার তো টাকা নেওয়া হয়েছেসেই কথা উপরে উল্লেখ করেছি। সেচ প্রকল্পের মালিক অথবা অন্য কেউ মূল গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে কোনো পাড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সিমেন্টের খুঁটি দাবি করলে প্রত্যেক খুঁটি বাবদ অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা করে চাওয়া হয়। যার ফলে সকলেই তাদের দাবি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।

এখন মূল কথায় আসি

প্লাস্টিকের আবরণহীন হাইভোল্টেজের বৈদ্যুতিক তার বহুদিনের পুরাতন আর নিম্নমানের, নানা জায়গায় জোড়াতালি দেওয়া এবং কড়িহীন আলতোভাবে সংযুক্ত থাকার কারণে ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে সামান্য বাতাসে তা শফিকুল ইসলাম শফির সেচ প্রকল্পের (মেশিন ঘর) নিকটে ছিড়ে নিচে পড়ে যায়। স্থানীয় (ওয়াপদা) বিদ্যুৎ অফিস, গ্রামের দুই অসাধু ব্যক্তি গোলাম মোস্তফা আর আজমত আলী ওরফে পাঙ্গাশতারা সকলেই ছিড়ে পড়ে থাকা তারের প্রতি থাকে পুরোপুরি উদাসীন। কোনো পক্ষ থেকেই মেরামতের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। যদিও গ্রামের বেশ কয়েকজন শঙ্কিত হয়ে শফিকুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা এবং আজমত আলী ওরফে পাঙ্গাশকে ছিড়ে পড়ে থাকা তার মেরামত করার তাগাদা দেয়। তারটি এমনকি দুই দিন পরও যদি মেরামত করা হতো তাহলে নিচে যে ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দেবো, তা ঘটতো না।

২৫ মার্চ রাতের ঝড়ে বৈদ্যুতিক তার ছিড়ে পড়ার তিনদিন পর ২৮ মার্চ সকাল দশটা ফুলজান বেগম (বয়স আনুমানিক ৪৫ বছর) তাদের নিজেদের ধান ক্ষেত দেখতে চরাক্ষেতের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হ। ধান গাছ বেশ উঁচু হয়ে উঠায় ছিড়ে পড়া হাইভোল্টেজের বৈদ্যুতিক তারটি কোথায় লুকিয়ে আছে বা তারটি মাটি স্পর্শ করার জায়গা থেকে কতটুকু পর্যন্ত বিস্তৃত, তা জানা সেই গ্রাম্য কিষাণীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। দুই সন্তানের জননী ফুলজান বেগম আর পায়ে হেঁটে নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেনি। নিজেদের ধান ক্ষেতের অত্যন্ত সরু আল দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বৈদ্যুতিক তারটি প্রথমে পায়ে লাগলে প্রচণ্ড শক খেয়ে তিনি তারের উপরেই হুমড়ি খেয়ে পড়েন। আনুমানিক সারে দশটা থেকে এগারটার মধ্যে তার মৃত্যু হয় বলে গ্রামের মানুষের ধারণা। পুরো শরীর ঝলসে যাওয়া লাশ খুঁজে পাওয়া যায় বিকেল তিনটার দিকে। মৃত্যুর স্বাদ সবাইকে নিতে হবে একদিন। তবে ফুলজান বেগমের মতো এমন ভয়াবহ মৃত্যু খুব কমই হয়। এই মৃত্যুফাঁদের হাত থেকে এমনকি তার লাশও রেহাই পায়নি। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ধরে বিরামহীনভাবে তার লাশের ভেতর দিয়ে হাইভোল্টেজের বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়েছে। সহজেই কল্পনা করা যায় কেমন হয়েছিল তার লাশের অবস্থা! শরীরে যে সমস্ত জায়গায় বৈদ্যুতিক তারের সরাসরি স্পর্শ ছিল সে সমস্ত জায়গার মাংশ পুড়ে হাড় বের হয়ে যায়।

প্লাস্টিকের আবরণহীন যে তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ফুলজান বেগম মারা যা সে তারটি ছিল আরথিং এর তার। নিয়ম অনুযায়ী তারটির এক প্রান্ত মাটিতে পুতে রাখার কথা থাকলেও তা মাটিতে পোতা ছিল না এবং স্টিলের লম্বা আংটার সাথে তারটি কড়িহীন সরাসরি সংযুক্ত ছিল। ফলে আরথিং তারে উপরের তিনটি লাইনের বিদ্যুৎ চলে আসে বলেই ধারণা। এটা নিশ্চিতভাবে বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি। এরই ভয়াবহ পরিণতি বহন করতে হয় কৃষানী ফুলজান বেগমকে ভয়ানক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

স্থানীয় ওয়াপদা অফিস (কালিহাতী, টাঙ্গাইল) বিদ্যুতের কন্ট্রাক্টর রুহুল আমিন এবং গ্রামের দুই অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি গোলাম মোস্তফা আর আজমত আলী ওরফে পাঙ্গাশের দুর্নীতি, অবহেলা আর গাফিলতি কারণে এই মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছে। এটাকে শুধু মৃত্যু বললে ভুল বলা হবেএটা দুর্নীতি, অবহেলা আর গাফিলতি জনিত হত্যাকাণ্ড

এখানেই শেষ নয়। গোলাম মোস্তফা, আজমত আলী ও তাদের গুটিকতক সাঙ্গপাঙ্গ মিলে গ্রামের কয়েকজন চেতনাসম্পন্ন শিক্ষিত তরুণদের কয়েকদিন ঘর থেকে বের হতে দেয়নি, পাছে তারা এই অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে মুখ খোলে। বাড়িতে এসে পর্যন্ত তাদেরকে শাসিয়ে যাওয়া হয়েছে এই বলে যে, এই বিষয় নিয়ে কোনো কথা বললে তাদেরকে পেটানো হবে। গ্রামের এক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে এই ঘটনায় শোক ও নিহতের ছেলে সুমনের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সামান্য প্রতিবাদের সুরে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে ঐ ছেলের পরিবারকে হুমকি দিয়ে সেই স্ট্যাটাস মুছে ফেলতে বাধ্য করা হয়। গ্রামের সেই অসাধু ব্যক্তিদ্বয় নিহতের পরিবারকেও দিয়ে চলেছে নানা রকম হুমকিধামকি, যাতে এই ঘটনা নিয়ে কোনো মামলা না হয়। “আপনাদের অবহেলার কারনেই তো আমার মা মারা গেছে” এই কথা বলায় তাদের বাড়িতেই শত শত মানুষের সামনে নিহতের মেয়ে খাদিজা আক্তারের (বয়স আনুমানিক ২৮ বছর) দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে তেড়ে আসে আজমত আলী ওরফে পাঙ্গাশ। একই ধরনের কথা বলাতে নিহতের ছেলে সুমনের (বয়স আনুমানিক ২৫ বছর) দিকেও গ্রামের পাশে নদীর পাড়ে মারমুখী ভঙ্গিতে তেড়ে আসে পাঙ্গাশ। ওদের ভয়ে গ্রামের সাধার মানুষ এই বিষয়ে একটা কথা পর্যন্ত উচ্চারণ করছে না। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরাপদ করা তো দূরের কথা (সুমনের আম্মার মৃত্যুর পরও) বিদ্যুৎ নিয়ে আলোচনা করা হবে এই বলে গ্রামের নিরীহ সাধারণ এবং শান্তি প্রিয় মানুষদের ডেকে এনে বিদ্যুতের জন্য টাকা চাওয়া হচ্ছে এবং এই বিষয়ে মুখ খুললে পেটানো হবে বলে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়া হচ্ছে। নিহতের পরিবার ও এই ব্যাপারে গ্রামের যারা সামান্য হলেও মুখ খুলেছে, তাদের নামে নানা ধরনের কুৎসা রটানো হচ্ছে। যে কয়েকজন যুবক মোস্তফা আর আজমত ও তাদের গুটিকতক সাঙ্গপাঙ্গের ভয়ে মুখ খুলছে না, তবে যে কোনো সময় বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারে বলে ওরা আশঙ্কা করে, তাদের একজনের প্রবাসে থাকা বাবার কাছে ফোন দিয়ে ঐ যুবকের নামে নানা ধরনের কুৎসা রটায় গোলাম মোস্তফা।

মানুষের বিদ্যুৎ দরকার হয় ইলেকট্রিক বাতি, পাখা, রেফ্রিজারেটর, কম্পিউটার, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন এবং বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ইরি মৌসুমের সময় সেচ মেশিন চালানোর জন্য। প্লাস্টিকের আবরহীন হাইভোল্টেজের খোলা তারে স্পৃষ্ট হয়ে নিজের ধান ক্ষেতের আলে মুখ থুবড়ে মরে পড়ে থাকার জন্য নয়।

এখন প্রশ্ন হলো

কৃষক কেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিজের ক্ষেতের আলে মুখ থুবড়ে মরে পড়ে থাকবে?

যাদের দুর্নীতি, গাফিলতি আর অবহেলার কারনে চরাক্ষেত পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে তাদেরকে কেন আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে না?

আমরা জানি না, আর কতজন কৃষকমজুর মৃত্যুর লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা এও জানি না, আর কতটি লাশের বিনিময়ে এই মৃত্যুফাঁদ সরানো হবে; বা আদৌ কোনোদিন সরানো হবে কিনা! বছর কয়েক আগে একই গ্রামের খাজা নামের এক কৃষক এবং পাশের গ্রামের এক তরুণী মেয়ে চরাক্ষেতে বাঁশের খুঁটি থেকে পড়ে যাওয়া প্লাস্টিকের আবরণহীন হাইভোল্টেজের বৈদ্যুতিক তারে স্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.