মূল: অ্যালান এডগার

অনুবাদ: কামরুল ইসলাম ঝড়ো

আমি সেই সময়টায় জনবসতি থেকে বহুদূর স্কটিশ হাইল্যান্ডের কেয়ার্নগর্ম পাহাড়ী এলাকার মাঝামাঝি স্থানে ঘোরাঘুরি করছিলাম। দেখলাম একদল মানুষরূপী প্রাণী আমার দিকে এগিয়ে আসছে। বুঝতে পারলাম ওরা ভিন গ্রহের। ওদের প্রত্যেকেরই কান স্টার ট্রেকের মি. স্পকের মতো খাড়া খাড়া। ওরা যখন আমার সামনে এসে পড়ল, তখন তাদের একজন বলে উঠল, “শুভেচ্ছা, আর্থলিং!” পৃথিবীর বাসিন্দাদেরকে ওরা ‘আর্থলিং’ বলে। আরেকটা বিষয় হলো, কোনো সাধারণ মানুষ তাদের মতো করে কথা বলে না। “আমরা মহাকাশ থেকে তোমাদের জন্য অভিবাদন নিয়ে এসেছি!’’ সৌভাগ্যবশত আমি প্রতিটি কথাই বুঝতে পারলাম, কারণ পৃথবীতে যে ছয় হাজার ভাষায় কথা বলা হয়, তারা তার একটা ভাষাই শিখেছে আর সেটাই আমি জানি।

তোমাদের ইন্টারনেটে আমরা খবরটা দেখেছি”, এলিয়েন দলের মুখপাত্র বলতে থাকল। “তোমাদের মন্দা দেখে আমারা দুঃখিত। শ স্কুল পুনঃর্নির্মাণ করার কথা ছিল। কিন্তু এখন মাত্র কয়েকটার হচ্ছে। এটা বড়ই লজ্জাকর!” সে তার মাথা নেড়ে জানতে চাইল, “তাহলে সবগুলো পুনঃর্নির্মাণের জন্য কি তোমাদের কোনো লোক নেই?”

হ্যা, আছে তো।” আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম, “দেশে প্রচুর নির্মাতা, রাজমিস্ত্রি, পাইপ মিস্ত্রি, বিদ্যুৎ মিস্ত্রি ও অন্যান্য মিস্ত্রিসহ ত্রিশ লাখ বেকার। আরও অনেক কর্মহীন লোক বেশ কিছু বিষয়ে দ্রুত দক্ষতা অর্জনও করতে পারবে।” “তাই!” এলিয়েন বলল। “তাহলে ইট, সিমেন্ট, পাইপ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ইত্যাদির ঘাটতি আছে?”

একটুও না! মন্দার পর থেকে সারা দেশে নির্মাতা ও ব্যবসায়ীদের সব প্রতিষ্ঠান মালামাল দিয়ে বোঝাই।”

তাহলে কর্তৃপক্ষরা কি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ কাজের জন্য এসব মালামাল মজুদ করে রাখছে? পরে যাতে কাঁচামালের ঘাটতি না পড়ে।”

না, না, ওরকম কিছু না। সব কাঁচামালই আছেইটের জন্য মাটি, পাইপের ধাতু ও তার, ছবির জন্য রঙ। যে পরিমাণ দরকার, তারচেয়ে অনেক বেশিই আছে।” এলিয়েন ও তার বন্ধুরা মনে হলো স্তম্ভিত হয়ে গেল। একটু পরেই তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

আহ, জানি, তা তো থাকবেই। সবই যেহেতু আছে তাহলে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পৌঁছাতে পারছো না কেন?” তাহলে কি পরিবহনের সমস্যা?

আমি জোর দিয়ে বললাম, “ না, নাএকদম না।” আমাদের পশ্চাৎপদতা তাকে টের পেতে দিতে চাইনি। বললাম, “আমাদের বিশাল বিশাল ট্রাকের বহর আছে। মন্দার কারণে প্রায় সবগুলোই এখন বসে আছে। আমাদের রাস্তাগুলোও পিচঢালা, চমৎকার। কাজেই ওইসব মালমশলা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্রিটেনের যে কোনো স্থানে পৌঁছানো সম্ভব।”

এলিয়েনরা শলাপরামর্শের জন্য গোল হয়ে নিজেদের ভাষায় কী কী যেন হড়বড় করে বলল। তারপর মুখপাত্র এলিয়েন আবার কথা বলা শুরু করল।

কিছু মনে করো না। নিজেকে খুব বোকা বোকা লাগছে। ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। সোজা করে বুঝাও তো দেখি। তোমরা এখানকার ব্রিটেনের লোকেরা সবাই চাও স্কুলগুলো নির্মিত বা সংস্কার করা হোক। তোমাদের প্রচুর বেকার লোক । অলসভাবে ঘুরে বেড়ায়। তারা সবাই কাজ পছন্দ করে। কাজ চায়ও। ছেলেমেয়েদের স্কুলের যদি ঘাটতি থাকে, অথবা ওগুলো যদি নিম্নমানের হয়, সেখানে যদি প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব থাকে, তাহলে তো তোমাদের সব মালামাল ওইসব পরিবহন দিয়ে সেখানে পৌঁছে দেওয়া দরকার। কিন্তু তোমরা সেটা করছো না কেন?”

আসলে আমাদের টাকা নেই।”

নীরব নিস্তব্ধ হয়ে যায় সবাই অনেকক্ষণ।

স্তব্ধতা ভাঙার পর মুখপাত্র বলল, “আরে, ‘টাকা’ এটা আবার কী?”

আমি হেসে ফেললাম। কেউ টাকা চিনবে নাতা কী করে হয়?

টাকা, পয়সা, অর্থ বা মুদ্রা তুমি চেন না! টাকা হলো কয়েনএক টুকরো ধাতুর চাকতি, আজকাল বেশিরভাগই অবশ্য কাগজের তৈরি। উচ্চমানের কাগজ, সুন্দর সুন্দর নকশা করারংচং মাখানোও থাকে তাতে।”

অবাক চোখে তাকাল এলিয়েন, “এই কাগজ দিয়ে কী হয়? তোমরা কি এটা ইটের পরিবর্তে ব্যাবহার করো, অথবা ঘরের চালের কাজে?”

না, না, মোটেও তা না!” আমি নিশ্চিত ছিলাম, মহাকাশযাত্রীরা যারা কোটি কোটি মাইল অতিক্রম করে এখানে আসতে পেরেছে তারা এরকম একটা সহজ বিষয় বুঝতে পারবে নাতা হয় না। আমি তাদের বুঝাতে চেষ্টা করলাম। “এক মানুষ আরেকজনের হাতে এই টাকা দেয়, আরেক জন অন্য জনের হাতে। স্বচ্ছলেরা এই ধরনের কিছু কাগজ সরকারের হাতে দেয়। তারপর কোনো একজন সেখান থেকে কিছু কাগজ কারো কারো কাছে পৌঁছায়, যারা ইট বানায় অথবা ট্রাকে বহন করে নিয়ে যায়। প্রকৃত নির্মাতা, পাইপস্থাপনকারী ও অন্যান্য মিস্ত্রিরা প্রতি শুক্রবারে ওই কাগজগুলোর সামান্য কিছু পায়।”

এলিয়েনদের মধ্যে প্রচণ্ড বিষ্ময় লক্ষ্য করা গেল।

তোমরা যে বলছো এই কাগজউচ্চ মানের রং মাখানো, নকশা করাতো, এগুলো দিয়ে কি ঘরবাড়ি বানানো যায়? এগুলো কি ঝড়বৃষ্টি ঠেকাতে পারে? এগুলোতে করে কি ভবনে পানি বা বিদ্যুত সরবরাহ দেওয়া যায়?”

হেসে উত্তর দিলাম, “না, না অবশ্যই না। এর ওপর দাগ দিলেই এটা নষ্ট হয়ে যাবে। এতে পানি রাখলে তা গড়িয়ে পড়ে যাবে। এ দিয়ে বৈদ্যুতিক তার বানানোর চেষ্টা করলে সম্ভবত তাতে আগুন ধরে যাবে।”

এলিয়েন বলল, “যদিও এই রঙিন কাগজগুলো দুর্বল ও অকেজো, কিন্তু তোমাদের যদি এগুলো না থাকে, তাহলে তোমরা স্কুল পুনঃর্নির্মাণ অথবা অন্য কোনো কাজ করিয়ে নিতে পারবে না?”

আমি বললাম, “এইবার ঠিক বুঝতে পেরেছো। এটা কাগজের টুকরা ছাড়া কিছুই হবে না। তৈরি হবে না কোনো খাবার। কাপড়চোপড়ও বানানো যাবে না। কোনো ঘরবাড়ি হবে না। কিচ্ছু হবে না। এই কাগজের টুকরাগুলো সবার হাতে হাতে ঘুরছে। না ঘুরলে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাবে, থেমে যাবে সব। আসলে কিন্তু আমাদের এই পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এই টাকা নাড়াচাড়ার পেছনে সময় ব্যয় করছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অনেক লোক এইসব কাগজ নিয়ে সারা দিন অঙ্ক কষতে কষতে বরবাদ করে দিচ্ছে জীবন। সত্যি, বড় বড় কিছু ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানব্যাংকবীমা, ক্রেডিট কার্ড কোম্পানি, রাজস্ব ও করের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা আর কিছুই করে নাএই কাগজের খেলা খেলে শেষ করে দিচ্ছে জীবন।”

এলিয়েনেরা একেঅপরের দিকে তাকাল। দেখলাম তাদের মধ্যে কয়েকজন মুখভঙ্গি করতে করতে নিজেদের কপালের দিকে বৃত্তাকারে আঙ্গুল ঘোরালো। বুঝিনি এ দিয়ে এলিয়েনভাষায় তারা কী বোঝায়।

আরও কিছুক্ষণ অবোধ্য কথাবার্তার পর মুখপাত্র জানাল, তাদের উড়ন্ত সসারে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যাবার সময় সে মনে হয় বলল, “আমাদেরকে বোধ করি ধারণা দেওয়া হয়েছিলএই গ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণী আছে!’’ আমি হয়তো ভুলও শুনে থাকতে পারি।।

[এটি অ্যালান এডগারের ‘এলিয়েন’ গল্পের অনুবাদ]

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.