লিখেছেন: নীলিম বসু

মহারাষ্ট্রের গড়চিরোলিতে ৩৯ জন মাওবাদী বিপ্লবীকে হত্যা করেছে ভারতের রাষ্ট্রীয় বাহিনী। এ ঘটনাকে ‘এনকাউন্টার’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি একটি পরিকল্পিত গণহত্যা। গণহত্যাকে এখানে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এ আক্রমণটা হয়েছে লাল ঝাণ্ডার ওপর। লেনিন মূর্তি ভাঙা যেমন ছিলো, তারই হিংস্র এক রূপ। ওই সময় যেভাবে লাল ঝাণ্ডা আঁকড়ে ধরা প্রত্যেকে রাস্তায় নেমে আক্রমণের জবাব দিয়েছিলো, এবার তার চেয়েও জোরদার প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। এই প্রয়োজনীয়তা অনেকেই বুঝতে পারছেন। যারা নকশালপন্থী/মাওবাদী রাজনীতির সাথে মতপার্থক্য রাখেন, এমন অনেকেও এই গণহত্যার প্রতিবাদ হিসেবে ‘নকশালবাড়ী লাল সেলাম’ স্লোগান তুলছেন।

তবে তাঁরাই সব নয়। এখনো অনেকে মাওবাদী রাজনীতিকে ‘বাম বিচ্যুতি’, ‘আত্মধ্বংসের পথ’ বলে চলেছেন। তারা বোধহয় খুশিই হচ্ছেন এই ভেবে যে, তাদের ‘সৌখিন’ বামপন্থাকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলা সিপিআই (মাওয়িস্ট)-কে ভারত রাষ্ট্র শেষ করে দিতে চলেছে! সমালোচনার ‘ডিসকোর্স’ আর নিজেদের অস্তিত্বের সংকটমুক্তির মোহে দাঁড়িয়ে যা ইচ্ছে হয় তারা ভাবুক। আসলে তাদের, জনগণকে আর মাওবাদী বিপ্লবীদেরকেও এটাই ভাবাতে চায় রাষ্ট্র। প্রথম অংশের কাছে তাদের রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক না হয়ে যাওয়ার মোহ হিসেবে, বাকি দুই অংশের কাছে ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’র কৌশল হিসেবে। সত্যিই কি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধ শেষ হতে চলেছে জনগণের পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে?

অপারেশন গ্রিন হান্ট’ ঘোষিত হয়েছে বছর দশেক আগে। কিন্তু বিপ্লবীদের নেতৃত্বে চলা গণসংগ্রামের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো ১৯৬৭ সালের ২৫ মে। ৫১ বছর হতে চললো! কখনো বাংলায়, কখনো অন্ধ্রে, কখনো বা অন্য কোনো রাজ্যে, রাষ্ট্র বারবার অহংকারের সাথে ঘোষণা করেছে ‘নকশালপন্থীরা শেষ’। কিছুটা বিরতি নিয়ে আবার নকশালপন্থীরা ফিরে এসেছে আরো দৃঢ়তার সাথে, আরো সংগঠিত হয়ে। ‘ফিনিক্স পাখি’র রূপকথাকে মাটিতে নামিয়ে এনেছে বারবার। ভারতীয় রাজনীতির এটি একমাত্র ধারা, যেখানে শহীদ হয়েছেন পার্টির উচ্চতম আর নিম্নতর স্তরের কমরেডরা, একসাথে। এ দেশের যে অঞ্চলটিকে প্রশাসন ‘পাকিস্তান’ বলে ডাকে, যেখানে ভারত রাষ্ট্রের নয় শাসন চলে বিপ্লবী জনতার। সেখানে ৩৭ বছরের বিপ্লবী অনুশীলন নিপীড়িত জনগণের শ্রমজীবী অংশকেই আন্দোলনের নেতৃত্ব হিসেবে গড়ে তুলেছে। শুধু এলাকার নিরিখে নয় সর্বভারতীয় স্তরেও। রাষ্ট্রের সঙ্গে লড়তে লড়তেই নিপীড়িত শ্রমজীবী জনতার ক্ষমতায়ন ঘটেছে। আর ঠিক সে কারণেই তাঁরা ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যে সবচেয়ে বড় বিপদ’। ‘অপারেশন গ্রিন হান্ট’ শুরু হওয়ার সময় তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম বলেছিলেন, ২০১২সালের মধ্যে মাওবাদী আন্দোলনকে নির্মূল করা হবে। যদিও চিদাম্বরমের সেই স্বপ্ন সত্যি হয়নি। ক্ষমতায় আসার পর ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ডেটলাইন তৈরি করেন ২০১৭ সাল। সেই ডেটলাইনকেও বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এগিয়ে চলেছে মাওবাদী আন্দোলন। এবার ঘোষণা করা হয়েছে ‘প্রজেক্ট সমাধান’, ২০২২ সালের মধ্যে নাকি গড়ে তোলা হবে ‘মাওবাদী মুক্ত হিন্দু রাষ্ট্র’।

২০১২ সালের মধ্যেও হয়নি, ২০১৭ সালও পেরিয়ে গেছে। ২০২২ সালেও হবে না। হতে পারে না। হতে পারে না, কারণ এই দেশের নিপীড়িত জনতার মধ্যে মাওবাদী আন্দোলন শুধু অনেক গভীর অবধি শিকড়ই নামায়নি, তাদের মধ্যে থেকেই গড়ে উঠে এ আন্দোলন। উঠে এসেছে তাঁদের প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। ‘স্যান্ডুইচ থিওরি’ বা নিপীড়িত জনতার ওপর ‘ওরিয়েন্টালিস্ট হেজিমনি’ চাপিয়ে দেওয়ার তত্ত্ব এক্ষেত্রে যে নিখাদ মিথ্যাচার, তা এ দেশে মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। বস্তারের জনতার বীরত্বপূর্ণ ‘ভূমকাল বিদ্রোহ’র ইতিহাসকে খুঁজে বের করতে সবচেয়ে বড় সহায়কের ভূমিকা নিয়েছে মাওবাদী আন্দোলন। সেখানকার শিল্পসংস্কৃতিকেও আগাছামুক্ত করে খুঁড়ে বের করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে মাওবাদী আন্দোলন। বস্তারমালকানগিরিগড়চিরোলিসহ মধ্য ভারতে চলমান মাওবাদী আন্দোলনের সর্বস্তরে আদিবাসী জনতার উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, এই আন্দোলন আদিবাসী জনতার মাউথপিস হয়ে ওঠেনি, বরং তাঁরাই ভাষা হয়ে উঠেছেন ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের। কমরেড হিদমার মতো একজন নিপীড়িত জনতার প্রতিনিধিকে আন্দোলনের সর্বোচ্চ স্তরে এর আগে কখনো দেখা যায়নি। পরমুখাপেক্ষিতা আর পাইয়ে দেওয়ার ‘হেজিমনি’কে ভেঙে জনতন সরকারের স্বনির্ভর ও শ্রমনির্ভর রাজনৈতিক অর্থনীতি থেকে পার্টি সংগঠন, নিপীড়িত জনতার ক্ষমতায়নের একটি প্রতর্ক নির্মাণ হয়েছে এখানে। রাষ্ট্রের সঙ্গে লড়তে লড়তেই উচ্চকণ্ঠের উচ্চারণ শুনিয়েছে আর শোনাচ্ছেও ‘সভ্যতা’র চোখে কণ্ঠহীনরা। ঠিক এ কারণেই এই আন্দোলনকে শেষ করা সম্ভব নয় ভারতরাষ্ট্রের পক্ষে। অনেক ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করতে হতে পারে, সাময়িকভাবে এলাকা ছেড়েও চলে যেতে হতে পারে। কিন্তু শিকড় উপড়ে ফেলা যাবে না।

এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠবেই যে এই সাফল্য মাওবাদী আন্দোলন মধ্যভারতের বাইরে দেখাতে পারছে না কেন। এটাই ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের সামনে চ্যালেঞ্জ। যে অনুশীলন মধ্যভারতে বিপ্লবী আন্দোলনকে সুদৃঢ় জায়গায় নিয়ে এসেছে, সেই অনুশীলনের শিক্ষাকে যথাযথভাবে ভারতজুড়ে প্রয়োগ করার চ্যালেঞ্জ। শ্রেণীলাইনকে আঁকড়ে ধরে মূর্ত অবস্থার মূর্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সৃজনশীলতার সঙ্গে গণলাইনকে নির্মাণ করার চ্যালেঞ্জ। সেটা যে করা সম্ভব, তাও মাওবাদী আন্দোলনের যাত্রাপথেই প্রমাণিত, তেলেঙ্গানার ‘সিঙ্গারেনি’ শ্রমিক আন্দোলন, ছাত্রছাত্রীদের বিপ্লবী সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ঝাড়খণ্ডের খনি শ্রমিকদের সংগ্রামের মতো আন্দোলনগুলির মধ্যে দিয়ে। চ্যালেঞ্জটিকে এই সময়ের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে স্বীকার করা ও তাকে অতিক্রম করাই হবে গড়চিরোলির শহীদদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধার্ঘ।

এক কমরেডের কথা ধার করেই এই সময়ের শপথ হোক

We shall heal our wounds,

collect our dead,

and continue fighting.”

#Gadchiroli_genocide

#We_bleed_RESISTANCE

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.