ভালোবাসা, সম্পর্ক, যৌনতা, আমিত্ব, আত্মকেন্দ্রিকতা সম্পর্কে প্রাথমিক খসড়া

Posted: ফেব্রুয়ারি 28, 2018 in মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

[এই লেখাটি ক্রমাগত সমৃদ্ধ হচ্ছে। আর এর পেছনে কয়েকজন কমরেডের সম্মিলিত উদ্যোগ রয়েছে। নিজেদের মধ্যকার বিতর্কআলোচনাসমালোচনাআত্মসমালোচনাপর্যালোচনায় অনেক তীর্যক অনুসন্ধান বেরিয়ে আসছে। যা আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি। নামোল্লেখ না করেই কমরেডদের ধন্যবাদ জানাই। আর এতে সব কমরেডদের মতামত জানানোর আহ্বান জানাই।]

ভালোবাসা শব্দটার ব্যাপ্তি বেশ বড়। প্রেম তো আরো গভীর বিষয়। প্রেমের মানে নিবিষ্ট, একাগ্র আবেগযেখানে ব্যক্তিসত্তা অপর সত্তার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। তবে প্রেমের সংজ্ঞাটা অনেকটা অসংজ্ঞায়িতযার মানেতাকে অনেকভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়, কিন্তু তা পরিপূর্ণ নয় এখানে পছন্দের ক্ষেত্রে যেমন শ্রেণীগত অবস্থান ক্রিয়াশীল থাকে, তেমনি জীনগত রসায়নও তাতে ক্রিয়াশীল। অর্থাৎ শরীর এবং মন বা চিন্তা; উভয়টিই পছন্দের ক্ষেত্রে কার্যকর থাকে

ব্যক্তির চেতনাযাতে ব্যক্তির চিন্তাগত এবং শারীরবৃত্তীয় রসায়ন, উভয়টির প্রতিফলন ঘটে, তার নৈকট্য বোধের আবেগের মাধ্যমেই ব্যক্তিসমূহের মাঝে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠতে পারে এই আবেগ বাঁধভাঙা হতে পারে না, কারণ তাতে ওই সম্পর্কটাও ভেসে যাবে। আবেগ অবশ্যই থাকতে হবে, তবে তা হতে হবে নিয়ন্ত্রিত। আবেগ নিয়ন্ত্রণে না রাখলে মুক্তির পথে এগোনো তো দূরের কথা, মানুষ হারাতে পারে তার মানবিকতা। তা বোঝার জন্য একটা উদাহরণ দিই। মনে করুন, কোনো ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তাকে দেখে অপর ব্যক্তির যৌনানুভূতি জাগ্রত হলো, হাসি, কান্না, দুঃখ, সুখ, কষ্ট, আনন্দ, বিরহের মতো এটাও আবেগ। এখন ওই ব্যক্তি কি অপর ব্যক্তির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে তার যৌনানুভূতিকে নিবৃত্ত করতে? আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না হলে তো তিনি অপরের চিন্তা বা মতামতকে কোনো তোয়াক্কা না করে সেটা করতেই পারেন। কিন্তু মানবিকতা আমাদের তা করা থেকে বিরত রাখে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। এমনি করে সম্পর্কে পারস্পরিক রাগারাগি হতে পারে, মতভিন্নতা হতে পারে। কিন্তু তখন আবেগ নিয়ন্ত্রণ না করে অপরকে আঘাত করা, বা জোর করে নিজের চিন্তাটা চাপিয়ে দেয়া হলে সেই সম্পর্কটা কী আর টিকে থাকতে পারে?? আবার প্রেমিকপ্রেমিকার মধ্যে কোনো একজনের আকাঙ্ক্ষা হলো অপরের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়ানোর; এ ক্ষেত্রে অপরপক্ষ তাতে সম্মতি না জানালেও কী আবেগের বশবর্তী হয়ে তা কার্যকর করতে হবে? এটা কী আধিপত্যবাদী চেতনারই বহিঃপ্রকাশ নয়? বস্তুত আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে বাস্তবতার বিচারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার জন্যই মানুষ চিন্তাশীল প্রাণী। আর এটাই মানবিকতার সৃষ্টিশীলতা।

এখানে সম্পর্কে আদানপ্রদানের বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাদী কাঠামো যেখানে সব সম্পর্কেই আর্থিক বা বৈষয়িক আদানপ্রদানের ভিত্তিতে গড়ে তোলে, বা তুলতে চায়; সেখানে মানবিকতার সম্পর্কে আদানপ্রদান হয় পারস্পরিক চিন্তা, সহযোগিতা ও সর্বোপরি ভালোবাসার। আবার একই শ্রেণী চেতনার ব্যক্তির সঙ্গেও ভালোবাসার গভীরতা যেমন একইরকম হয় না; আবার সেই সম্পর্ক ভেঙেও যেতে পারে। আর তা বাস্তবতা বিচারে গ্রহণ করার মানসিকতাটাও ধারণ করা খুবই জরুরি।

এখন এই সম্পর্ককে প্রেম বলা হোক, বা অন্য কিছু; তাকে একটা সম্পর্ক হিসেবেই দেখা যেতে পারে আর তাতে ভালোবাসা থাকবেই। সব বোঝাপড়ার মাঝেই থাকে ভালোবাসা। সম্পর্ক ভেদে বাস্তব প্রেক্ষাপটে সেই ভালোবাসার গভীরতায় তারতম্য ঘটে।

ভালোবাসার বহুরূপ

কে দেখেছে কতোদূর

আমরা কেন অপরকে ভালোবাসি?

এই ভালোবাসাটা একেবারেই নিজের তাগিদে। আমরা নিজেকে ভালোবাসি বলেই অপরকে ভালোবাসি। আর নিজে ভালো থাকতে চাই বলেই অপরকে ভালো রাখতে চাই। এখানে নিঃস্বার্থ বলে কিছু নেই। যখন আমরা চাইছি, কাছের মানুষটি, বা মানুষগুলো ভালো থাকুক, তার জন্য সম্ভাব্য সবই আমরা করতে প্রস্তুত হয়ে পড়ি।

কেন আমাদের কাছে কাছের মানুষদের ভালো থাকাটা জরুরি? কারণ, আমরা তাদের ভালোবাসি। তারা আমাদের জীবনে মূল্যবান। আর তাই নিজের জন্যই কিন্তু আমরা তাদের ভালো রাখতে চাই। এটাই আমিত্ব। যেখানে ব্যক্তি অপরকে আপন করে নিচ্ছে, অথবা নিজেকে অপররের মাঝে তুলে ধরছে। এখন যখন কমিউনিস্টরা পুরো সমাজটাকেই বদলে দিতে চাইছে, বা পুরো বিশ্বকে মুক্ত করতে সংগ্রামে নামছে, তখন তারা কার্যত পুরো সমাজ বা বিশ্বকে আপন করে নিচ্ছে। এটাই আমিত্ব। আত্মকে সমষ্টিতে, সমষ্টিকে আত্মে পরিণত করা। আর এ চিন্তা থেকেই সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন পার্টি গঠনকালে কমরেড চারু মজুমদার বলেছিলেন, আই অ্যাম দ্য পার্টি। অথবা কমরেড মাও সেতুঙ মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় শ্রমিকশ্রেণীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, সদর দফতরে কামান দাগাও। এটাই আমিত্ব। যেখানে ওই মহান বিপ্লবীরা জনগণকে নিজের মধ্যে ধারণ করছেন, গণবিরোধীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিপরীতে।

আর এই আমিত্বের বিপরীতে আছে আত্মকেন্দ্রিকতা। যেখানে ভোগবাদিতাকে ব্যক্তি আপন করে নেয়। ব্যক্তি যখন পারিপার্শ্বিক, সামষ্টিক বা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকে তার ভোগের জন্য ব্যবহার করে বা করতে চায়, তখন সেটা আমিত্ব থাকে না। সেটা হয় আত্মকেন্দ্রিকতা। আর এই আত্মকেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামটা কিন্তু রাজনৈতিক ও শ্রেণী সংগ্রামেরই এক প্রকাশ্য রূপ।

কমরেড কার্ল মার্ক্স জার্মান ভাবাদর্শ গ্রন্থে এ দার্শনিক বোঝাপড়াটা স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। যেখানে তিনি দেখাচ্ছেন, এই আমির সত্তা সবসময় একইরকম থাকে না। তা বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে পরিবর্তনশীল। মার্ক্সের মতে, মানুষ এখনো তার প্রাকইতিহাসে বাস করছে। সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ যখন বৈষম্য থেকে মুক্ত হবে, তখনই মানুষের ইতিহাস শুরু হবে। যেখানে একই মানুষ দিনভর এক কাজে নিয়োজিত থাকবে না। তিনি একটা সময়ে কারখানায় কাজ করবেন, একটা সময়ে ঘুরে বেড়াবেন, মাছ ধরবেন, গান গাইবেন, স্বাধীনভাবে চিন্তা করবেন। সেই আমির চিন্তা কাঠামোটাও কিন্তু সমাজ বিকাশের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হবে।

আমিত্ব ত্যাগ করার মানেই যান্ত্রিকতা, নিজ সত্তাকে অস্বীকার করা। মার্ক্সবাদ পীরবাদ, গুরুবাদ বা ভাববাদ নয়; বরং তার বিপরীত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। যা ত্যাগ করার কথা মার্ক্সবাদ বলে, তা হলোআত্মকেন্দ্রিকতা। আত্মকেন্দ্রিকতা ব্যক্তির ভোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অপরদিকে, আমিত্ব ব্যক্তির সত্তার সঙ্গে যুক্ত। আমিত্ব না থাকলে আমির সত্তার মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আসবে কী করে? আর আমির মুক্তির সঙ্গে জড়িত আমির সত্তার পারিপার্শ্বিকতা বা সামষ্টিক মুক্তি।

আবার ব্যক্তির ওই আমির মাঝে একাধিক সত্তা ক্রিয়াশীল। বিপ্লবী সত্তা যখন শক্তিশালী থাকে, তখন তা আমিকে বিপ্লবের, তথা মুক্তির পথে ধাবিত করে। আর নিজ মুক্তির জন্যই অপর সত্তার মুক্তির পক্ষে দাঁড়ায় আমি। অপরদিকে, ভোগবাদী সত্তা আত্মকেন্দ্রিকতার উল্লম্ফন ঘটায়। সে অপরকে মুক্তির উৎস নয়, ভোগের মাধ্যম বলে বিচার করে থাকে। সেই সত্তা যখন ক্রিয়াশীল থাকে, তখন আমির সত্তা ভোগের পথে চালিত হয়। যে কারণে আমরা দেখি একসময়ের তুখোড় বিপ্লবী সময়ের আবর্তে হয়ে উঠে সংশোধনবাদী, এমনকি ফ্যাসিবাদী। আবার পুঁজিবাদীশ্রেণীতে বেড়ে উঠা কেউ হয়ে উঠেন বিপ্লবের কাণ্ডারী।

দুই.

কারো প্রথম প্রেম হতে পারে রাজনীতি, মানবিক সমাজ গড়ার রাজনীতি। সেখানে ব্যক্তি সত্তা সেই রাজনীতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। সেখানে ব্যক্তির পারিবারিকসামাজিকআর্থিক সকল ক্ষেত্রে ওই রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকে।

পলিটিক্স ইন কমান্ডকথাটা ধারণ করা প্রত্যেক কমরেডের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কমরেডরা যতোবার বাধাগ্রস্ত হবেন, ততোবার তা যোগাবে শক্তি। রাজনীতিই নির্ধারকযে কোনো প্রকারের ভালোবাসা এর আলোকে মূল্যায়ন করাটা জরুরি। উল্লেখ্য, এখানে রাজনীতি বলতে মানবমুক্তির লক্ষ্যে বিপ্লবী মতাদর্শিক রাজনীতি, বা মার্ক্সবাদী রাজনীতির কথাই বলা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, আমার কাছে কমরেডশিপটাই সবচেয়ে কাছের সম্পর্ক। অর্থাৎ, যে সহযোদ্ধা জীবনসংগ্রামের সাথী। প্রেমিকপ্রেমিকার সম্পর্কও কমরেডশিপেরই সম্পর্ক। আর সেক্ষেত্রেও শর্ত প্রযোজ্যপারস্পরিক বোঝাপড়া ও শ্রদ্ধাবোধ।

সম বা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি প্রেমযৌনতার বিষয়টা পারস্পরিক মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়ার বিষয়। কেউ যদি বিপরীত বা সমলিঙ্গের প্রতি কোনো যৌন আকর্ষণ অনুভব না করেন, তাহলে তিনি হয় অসুস্থ, অতিমানব, অথবা ভণ্ড। অসুস্থদের কথা এখানে আলোচ্য নয়, আর অতিমানবের অস্তিত্ব অনাবিষ্কৃত। তবে এমন অনেক ভণ্ড এ সমাজে খুঁজে পাওয়া যায়, যারা নৈতিকতার নামে নিজেকে কামমুক্ত বলে উল্লেখ করে থাকে।

যৌনানুভূতি আছে বলেই কেউ অপরের সান্নিধ্য বা তাকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বোধ করেন। এটা এমন নয় যে, অপরদিক থেকে একই অনুভূতি হতে হবে। অপরদিক থেকে একই অনুভূতি পেলে সেই প্রেমযৌনতার সম্পর্ক আরো খানিকটা এগিয়ে যেতে পারে। তবে এই আকাঙ্ক্ষাও কিন্তু চিরস্থায়ী নয়। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের নিয়মে আমরা জানি, বস্তু পরিবর্তনশীল। ভালোবাসাও রূপ বদলায়। তা একই অবস্থায় থাকে না।

এখন কথা হলো, কোনো নারী বা পুরুষের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করাটা কী অস্বাভাবিক? তা কখনোই নয়। তবে হ্যাঁ, অপরপক্ষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পর্কে অগ্রসর হওয়াটা আধিপত্যবাদী চিন্তাকেই নির্দেশ করে। আবার রাজনৈতিক কারণে হয়তো ভালোলাগার কাউকে মনের কথাটা জানানো থেকেও বিরত থাকতে হয়। এজন্যই ভালোবাসার বহুরূপ।

এ ভালোবাসায় শরীর বলতে আমরা বুঝি ব্যক্তির বাস্তব অস্তিত্ব। এক্ষেত্রে ব্যক্তির অস্তিত্ব আবশ্যক। কিন্তু ভালোবাসার জন্য শারীরিক সম্পর্ক বা যৌনতাও আবশ্যক নয়। যৌনতা ব্যক্তি এবং তার অপর পক্ষের আকাঙ্ক্ষার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু শারীরিক দূরত্ব থাকলেও চিন্তার নৈকট্যে গভীর ভালোবাসা থাকতে পারে। ভালোবাসাটা মূলত চিন্তা কাঠামোয় হয়। যৌনতানির্ভর সম্পর্কে ভালোবাসাটাও থাকে ক্ষণস্থায়ী। সেখানে যৌন আকাঙ্ক্ষা না থাকলে ভালোবাসাটাও বাষ্পীভূত হয়। আবার কারো চিন্তা বা স্মৃতির প্রতি ভালোবাসায় যৌনতা ছাড়াও তীব্র ভালোবাসা থাকতে পারে। যৌনতা ভালোবাসার একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, তা সমগ্র নয়। সব ভালোবাসায় যৌনতা আবশ্যক নয়।

প্রেমযৌনতার সম্পর্কে স্থায়িত্ব নির্ভর করছে মূলত পারস্পরিক বোঝাপড়া, সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থান এবং যৌন আকাঙ্ক্ষার ওপর। শ্রেণীগত অবস্থান ভিন্ন হলে সম্পর্কের স্থায়িত্ব বহুলাংশে কমে আসে। এখানে শুধু একটি বা একাধিক উপাদানের কারণে সম্পর্কে বিচ্ছেদ আসতে পারে।

আবার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তির একাধিক যৌন সম্পর্ক বা বহুগামিতা। কমিউনিজম বহুগামিতার বিরুদ্ধে নয়। তবে কপটতার বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক এবং সম্পর্কের স্বচ্ছতা বজায় রেখে কেউ একাধিক সম্পর্কে জড়াতে পারেন। কিন্তু একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে যৌন সম্পর্ক তৈরি করা, বা অথবা পার্টনারের সঙ্গে আলোচনা বা বোঝাপড়া ছাড়াই কপটতার আশ্রয় নিয়ে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের দোহাই দিয়ে আত্মকেন্দ্রিক ভোগের জন্য বহুজনের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করে বেড়ালে, সেক্ষেত্রে বিষয়টা কতোটুকু গ্রহণযোগ্য হতে পারে? এটাও কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক চেতনারই বাইপ্রডাক্ট। সম্পর্কে স্বচ্ছতা খুবই জরুরি। আর যে সম্পর্কে স্বচ্ছতার অভাব দেখা যায়, তা ভেঙে ফেলাটাই অধিক যৌক্তিক।

প্রেমযৌনতার বিষয়টাআমাদের মতো সাম্রাজ্যবাদসম্প্রসারণবাদপীড়িত, নয়াঔপনিবেশিক কাঠামো, যেখানে সামন্ত অবশেষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ তীব্রভাবে কার্যকরসেখানে খুবই জটিল অবস্থায় থাকে, আর তা সঠিকভাবে না বুঝে উঠতে পারলে ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, সামাজিক বহুবিধ সমস্যা সামনে আসবে নিশ্চিতভাবেই। আর এজন্য শ্রেণী রাজনীতির অবস্থান থেকেই আমাদের এ বিষয়টা বোঝা জরুরি।

আমরা অবশ্যই যৌনতা নিয়ে কোনো ছুৎমার্গের পক্ষে নই। কে, কার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলবে, তা পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিষয়। সংগঠকদের ক্ষেত্রে বলছি, ব্যক্তিগত প্রেমযৌনতার সম্পর্ক যতক্ষণ পর্যন্ত সাংগঠনিক কাজকে বাধাগ্রস্ত করে না, ততোক্ষণ পর্যন্ত এ নিয়ে সংগঠন কাউকে সমালোচনাও করে না, বা তাতে হস্তক্ষেপ করে না। তবে যদি তার বিপরীত ঘটে, তাহলে সাংগঠনিকভাবে তাদের সঠিক পথ দেখানো, বা তাদের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করাটা খুবই জরুরি। নেতৃস্থানীয়দের অবশ্যই এ সম্পর্কে আরো বেশি সচেতন হওয়া দরকার। এটা এক অবৈরি সংগ্রাম। যেখানে ঐক্যটাই দ্বন্দ্বের প্রধান দিক।

কমরেডদের সমালোচনার প্রশ্নে মাও সেতুঙ বিপরীতের ঐক্যের নীতিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সমালোচনার দুটি উদ্দেশ্যএক) ভুলটাকে চিহ্নিত করা এবং দুই) ভুলটাকে শোধরানো। এক্ষেত্রে তিনি ‘রোগ সারাও রোগীকে বাঁচাও’এ পদ্ধতি অবলম্বন করতে বলেছেন। কোনো বন্ধুকে সমালোচনার ক্ষেত্রে সংগ্রাম এবং সাহয্য এই দুই পদ্ধতি নিতে হবে। যে কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিপরীতের নিয়ম মেনে তিনি দেখালেন ঐক্য ও সংগ্রাম এই বিপরীতের নিয়ম মেনে তা চলবে। বন্ধুদের ক্ষেত্রে ঐক্য প্রধান অবস্থানে থাকবে, সংগ্রাম অপ্রধান অবস্থানে থাকবে। ঐক্যসংগ্রামউন্নততর ঐক্য এই পদ্ধতি মেনে নীতিগত ঐক্যকে আরো সুদৃঢ় করার লক্ষ্য নিয়ে সংগ্রাম করতে হবে।

এখন আসছি সম্পর্কেনৈতিকতার প্রশ্নে। কেউ যদি এমন কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান, যিনি তার থেকে বয়সে অনেক ছোট বা বড়; অথবা তাদের কোনো একজন বা উভয়েই কোনো একটি সম্পর্কে থাকা অবস্থায় নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট হলেনএটিকে ভুল, বা দুর্ঘটনাবশত বলার মানেই হলো সমাজের কথিত নৈতিকতার নামে মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্নতা; যা সর্বোপরি একটি যান্ত্রিক চিন্তা।

ওই কথিত সামাজিক নৈতিকতা আদতে আমাদের ওপর সম্পর্ক, পরিবার, সামাজিকতা সম্পর্কে এক কথিত নৈতিকতার বোঝা চাপিয়ে দেয়। সম্পর্ক, তা যে কোনো মানুষ বা প্রাণীর সঙ্গেই হোক, যে কোনো পর্যায়ের, তা যখন চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে ভালোবাসাটাই উবে যায়। দুজন মানুষের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন হতেই পারে। তারা বিচ্ছিন্নও হয়ে যেতে পারেন। অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে তাকে বলা হচ্ছে প্রতারণা, কথিত নৈতিকতার নামে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পর্কে থাকাটাও কী প্রতারণা নয়?

মানুষের চিন্তা কাঠামো সমাজ বিচ্ছিন্ন, পারিপার্শ্বিক বা বাস্তবতা থেকে মুক্ত নয়। আর তাই আমরা দেখতে পাই, সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা কাঠামোও পরিবর্তিত হয়। আবার যারা অগ্রসর চিন্তা ধারণ করেন, তারাই সমাজ পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাই সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করা মানুষদের সমাজের এই কথিত নৈতিকতা সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা রচনা করাটা জরুরি বলে মনে করি।

তিন.

প্রেমযৌনতার ক্ষেত্রে অপরপক্ষকে যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে মনে করা হয়, এর পেছনে আছে বস্তুগত ভিত্তি। দাস যুগেও নারী ও অপরাপর সত্তাকে সম্পত্তি বলে গণ্য হতো, যার পূর্ণ মালিকানা ছিলো দাস মালিকের হাতে। আবার সামন্ততন্ত্রেও এই প্রেমযৌনতার ধারণায় পুরুষই একমাত্র ক্রিয়াশীল সত্তা। সমাজে বিরাজমান, নারী বা অপরাপর সত্তার যৌনাকাঙ্ক্ষা সেখানে অগুরুত্বপূর্ণ। আবার পুঁজিবাদী সমাজে নারী যৌনতা উপভোগের আংশিক অধিকার পেলেও সেই যৌনতাকেও এসময়ের কর্পোরেট পুঁজিবাদ পণ্যে পরিণত করেছে।

এখন আমাদের মতো নয়াঔপনিবেশিক দেশের ক্ষেত্রে বিষয়টা কেমন হবে?

সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে নয়াউপনিবেশবাদের রয়েছে দ্বৈতনীতি। একদিকে, নয়াউপনিবেশবাদ সামন্তব্যবস্থাকে নিজের স্বার্থ অনুযায়ী উচ্ছেদ করে। আবার তা ততোটুকুই, যতোটুকু সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী নয়াউপনিবেশবাদ সামন্তব্যবস্থাকে আংশিক সংরক্ষণও করে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটিই চলে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থানুযায়ী। অর্থাৎ, নয়াঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় পূর্ণমাত্রায় সামন্তবাদ উপস্থিত না থাকলেও সামন্তঅবশেষ বিদ্যমান থাকে। আর তা খুব স্বাভাবিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদের পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে।

এখানে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ একদিকে সামন্তবাদ উচ্ছেদ করেছে, আবার তা রক্ষাও করেছে নিজস্বার্থে। আর তাই অর্থনৈতিক ভিত্তিতে সামন্ততন্ত্র অনেকাংশেই কার্যকর না থাকলেও উপরিকাঠামোয় সামন্তীয় চেতনা বেশ ভালোমতোই বিরাজমান। বাংলাদেশ, ভারতের মতো সব নয়াঔপনিবেশিক দেশের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। আর এর ফলে এখানকার প্রেমযৌনতার চিন্তায় যেমন সামন্তীয় রক্ষণশীল মানসিকতা বিরাজমান, তেমনি পুঁজিবাদ প্রদর্শিত যৌনতার পণ্যায়নও বিদ্যমান।

বুর্জোয়াশ্রেণীর প্রেমযৌনতার সম্পর্ক নিয়ে বলতে গেলে আমাদের পুঁজিবাদী দেশগুলোর দিকেই তাকাতে হবে। আমাদের সমাজের দিকে তাকিয়ে বুর্জোয়া কাঠামোকে ব্যাখ্যা করা যায় না। এখানে সেই অর্থে বুর্জোয়া নেই, আছে কমপ্র্যাডর বা দালাল বুর্জোয়া। এ দুটো মৌলিকভাবে ভিন্ন। দালাল বুর্জোয়ারা বহুজাতিক বা অধিজাতিক কর্পোরেট পুঁজিরই এ দেশীয় এজেন্ট। আর এ উপমহাদেশে জাতীয় বুর্জোয়া বিকশিত না হওয়ায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবও অসম্পূর্ণ। যা সম্পন্ন করার দায়িত্বও আছে বিপ্লবী কমিউনিস্টদেরই কাঁধে। আর এই আর্থসামাজিক কাঠামোর কারণেই এখানকার দালাল বুর্জোয়া চেতনায় সামন্তীয় মানসিকতা তীব্রভাবে বিরাজমান।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশ বা ভারতে ঘোষণা দিয়ে লিভ ইন রিলেশন চিন্তাও করা যায় না। এমনকি কোনো নারী একা বাসা ভাড়া নিতেও বেশ বেগ পেতে হয়। বাসায় পুরুষ বন্ধু আসার ক্ষেত্রেও শত প্রশ্ন। নারী সম্পর্কে বিচ্ছেদ টানবে, সেটা এই সমাজ মেনে নিতে রাজি নয়। আর এসবই ওই সামন্তীয় মানসিকতার বহির্প্রকাশ। যা বুর্জোয়া সমাজে অবর্তমান। আবার বুর্জোয়া সমাজে নারীকে পণ্যায়িত করা হয়। মানুষের যৌনতাকে পণ্যায়িত করা হয়। সবকিছুই বুর্জোয়া ব্যবস্থায় পণ্যায়িত, এমনকি ভালোবাসাটুকুও। আমাদের সমাজে সামন্তীয় মানসিকতা এবং নারী সত্তার পণ্যায়নদুটোই একসঙ্গে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়।

বুর্জোয়া ব্যবস্থায় যৌনতা নিয়ে রাখঢাক থাকে না। আবার বুর্জোয়া সমাজে বিয়ে বা প্রেমযৌনতার সম্পর্ক ভাঙতে কোনো বাধা থাকে না। সমঝোতার মধ্য দিয়ে যে সম্পর্ক গড়ে বা ভাঙে, সেখানে প্রধান মানদণ্ড থাকে বৈষয়িক বিষয়াদি। এমনকি বুর্জোয়া চেতনা মানুষের সংগ্রামী অর্জনগুলোকেও অস্বীকার করে সবকিছুকে পরিবর্তন করে তার ছাঁচে ঢেলে সাজাতে চায়। সবকিছুকে পণ্যায়ন বা কমোডিটাইজ করাটাই এখানে মুখ্য।

অপরদিকে, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের আলোকে বিপ্লবী চিন্তায় ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে যে সম্পর্ক গড়ে উঠে, তার মৌলিক পার্থক্যের জায়গাটা হলো কমরেডশিপ। যেখানে পরস্পর জীবন সংগ্রামের সাথী। পারস্পরিক সমঝোতা বুর্জোয়াশ্রেণীর প্রেমযৌনতার মাঝেও উপস্থিত থাকতে পারে। কিন্তু সেখানে আর্থিক বিষয়টি মুখ্য, কিন্তু বিপ্লবী চিন্তার ভালোবাসায় পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং শ্রদ্ধাবোধটাই থাকে মুখ্য।

এখন প্রশ্ন হলো, একই শ্রেণী, এমনকি একই মতাদর্শ ধারণ করেও যে সম্পর্ক ভাঙছে, তাতে কী মনে কোনো দুঃখবোধ হওয়া উচিত নয়?

এই দুঃখবোধে শারীরবৃত্তীয় রসায়নটাই প্রধান নয়। বরং এখানে মনস্তাত্ত্বিক জায়গাটাই মুখ্য। আর তার মূলে রয়েছে পুরাতনকে আঁকড়ে ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা, অভ্যস্ততা। প্রাথমিকভাবে পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে না পারা। এটাকেও যান্ত্রিকভাবে দেখার উপায় নেই। দেখতে হবে দ্বান্দ্বিকভাবে। যেমন কাছের কেউ মারা গেলে আমাদের চোখে জল আসে কেন? জানি, একদিন সবকিছুরই শেষ আছে, তবু আমরা তা চাই না। হারানোর বেদনা থেকে আমরা নিজেকে বাস্তব অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি, ধীরে ধীরে মানিয়ে নিই। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বললে, কমরেড কিষেনজী শহীদ হওয়ার পর দুদিন খেতে পর্যন্ত পারছিলাম না, তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহের ছবি চোখের সামনে ফুটে উঠছিলো। আর তা থেকেও কিন্তু আমরা সামনে চলার রাস্তাটা ঠিক বের করে নিতে পেরেছি।

প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের নিয়মে আমরা বলছি যে, পরম গতি বা পরম স্থিতি বলে কিছু নেয়। তবে স্থিতি থেকে গতি, বা গতি থেকে স্থিতিতে গেলে তার অবস্থানের যে পরিবর্তনটা ঘটে, তাতে বস্তুর মধ্যকার পরিবর্তন আসে, আর তা ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই। আবার সব ক্রিয়ারই সমান বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়াও থাকে। এই দুঃখবোধটাও সেখান থেকেই আসে।

হয়তো দুজন মানুষ, এখন আর নিজেদের সেভাবে ভালোও বাসে না যে, একসঙ্গে থাকতে পারে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন হতে গিয়ে তীব্র দুঃখবোধ হচ্ছে। তার মানে কী তারা লোক দেখানো কষ্ট প্রদর্শন করছে, বা তারা ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? না, এ দুঃখানুভূতি খুবই স্বাভাবিক, আবার শুধু এজন্য একটা মৃত সম্পর্ককে বয়ে বেড়ানোটাও ওই দুজন মানুষ ও তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না?

যখন সম্পর্কে প্রত্যাখ্যান বা সে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টা একপক্ষ সামনে আনে, তখন অপর পক্ষের জন্য তা রীতিমতো ধাক্কাই বলতে হবে। তিনি তা মেনে নিতে চান না প্রাথমিকভাবে। তখন নিজের অবস্থানের পক্ষে যুক্তিও উপস্থাপিত হয়। সেখানে ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ায় কোনো এক পক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগও তুলে ধরতে পারেন। আবার তিনি পরবর্তীতে সে অবস্থা থেকে সরেও আসতে পারেন। সাংগঠনিক কোনো কমরেডের সঙ্গে প্রেমযৌনতার সম্পর্কে এমন বিচ্ছেদের ঘটনা সামনে আসলে, তা নেতৃস্থানীয়রা সহমর্মিতা সহকারে আলোচনাসমালোচনাপর্যালোচনায় সঠিক দিকনির্দেশনা দেবেন বলেই প্রত্যাশা করি।

উল্লেখ্য, ভালোবাসা বা বিয়ের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা দুজন ব্যক্তির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা বজায় আছে, এমন মানুষের সংখ্যা বস্তুত মাইক্রোস্কোপিক। আমার পরিচিতদের মধ্যে সাকুল্যে দুয়েকজনকে খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকেই সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে শুধু উল্লেখ করেননি, তারা সে ভিত্তিতেই পরিচালিত হয়েছেনও। আর তারাই আসলে মানবিকতার সম্পর্কটা অনুধাবন করতে পেরেছেন বলে মনে করি।

চার.

শ্রেণীবিভক্ত সমাজে সকল সম্পর্কই শর্তযুক্ত

আগেই উল্লেখ করেছি, যৌনতা প্রেমের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মুখ্য বা প্রধান উপাদান নয়। যেমন, কোনো নারীকে দেখলে (যেহেতু আমি স্ট্রেইট) তার শ্রেণী, মতাদর্শ না জেনেও আমার যৌনানুভূতি হতে পারে; এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু তার সঙ্গে প্রেমভালোবাসার সম্পর্কে আমি যেতে পারি কিনা, সেখানে আরো অনেক শর্ত রয়েছে। যেমন শ্রেণীগত নৈকট্য না থাকলে বোঝাপড়ায় সমস্যা হবে, আবার পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধটাও হতে পারে প্রশ্নবিদ্ধ। তবে এর মানে এ নয় যে, ভিন্ন শ্রেণীভুক্ত দুজন মানুষের মধ্যে প্রেমযৌনতার সম্পর্ক হতে পারে না। তবে এক্ষেত্রে পরস্পরের সামাজিকপারিপার্শ্বিক অবস্থা বুঝে বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে এ সম্পর্ক হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে কোনো একজনের শ্রেণীচ্যুতি ঘটার সম্ভাবনাই বেশি। দ্বন্দ্বের নিয়মেই বিষয়টা খুবই স্বাভাবিক। মোদ্দা কথা, শ্রেণীবিভক্ত সমাজে কোনো রকম ভালোবাসা, প্রেম বা সম্পর্কই শর্তনিরপেক্ষ নয়।

এখানে কেউ প্রশ্ন করতে পারেনশ্রেণীবিভক্ত সমাজে তো সম্পর্ক শর্তযুক্ত। তাহলে শ্রেণীহীন সাম্যবাদে কী কোনো শর্ত থাকবে? মার্ক্সের মতে, মানুষ এখনো তার প্রাকইতিহাস পর্যায়ে আছে। শ্রেণীহীন সমাজ বা সাম্যবাদে যখন মানুষ সব বৈষম্য থেকে মুক্ত হবে, তখন মানুষের ইতিহাস শুরু হবে। কারণ তখন তার অর্থনৈতিক ভিত্তিই শুধু নয়, চিন্তাচেতনাও সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবে। আর সেসময়ের চিন্তা কাঠামোর পরিবর্তনে এটুকু তো বোঝা যায় যে, তা এ সময়ের শর্তে আবদ্ধ হবে না। মুক্ত মানুষের শর্তও হতে পারে মানবিক পছন্দের শর্ত। তবে যেহেতু আমরা একটি শ্রেণীবিভক্ত সমাজের মানুষ, সেহেতু শ্রেণীহীন সমাজের মানুষের চেতনা কেমন হতে পারে, তার পূর্ণাঙ্গ ধারণা তুলে ধরাটা রীতিমতো অসাধ্য।

যৌনতা, যৌনানুভূতি, যৌন সম্পর্ক

সাধারণভাবে বলা যায়, ব্যক্তি সম বা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যে আকর্ষণ অনুভব করে, সেটাই যৌনতা। যে কোনো সুস্থ মানুষের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রকাশযৌনতা। এর মানে এ নয় যে, ব্যক্তি এই যৌনতা সবার সামনে একইভাবে প্রকাশ করবে, বা করে। আবার এর সঙ্গে জড়িত পছন্দের (চয়েজ) বিষয়টি। এই পছন্দ আবার বস্তুনিরপেক্ষ নয়। তা নির্ভর করে ব্যক্তির আর্থসামাজিকরাজনৈতিকসাংস্কৃতিক ও শ্রেণীগত অবস্থানের ওপর। তা অনেকাংশেই নির্ধারণ করেব্যক্তির যৌনতা কার প্রতি, কোন পরিস্থিতিতে, কোন মাত্রায় প্রকাশ পাবে। আর মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে কর্পোরেট সংস্কৃতি ব্যক্তির যৌনতাকেই তার কর্পোরেট পুঁজির ধাঁচে গড়ে তুলতে চাইছে, আর তাতে সফলতাটুকুও কম কিছু তো নয়। পরের অংশে এ নিয়ে কিছু কথা বলা আছে।

যৌনানুভূতি হলেই কারো সঙ্গে যৌন সম্পর্ক হবে, বা হতে হবে, এমনটা নয়। আবার এমনটা হওয়া অস্বাভবিকও নয়। কারো প্রতি আকর্ষণ অনুভব হতে পারে, এ অনুভবেরও গভীরতায় তারতম্য হতে পারে। কারো প্রতি যৌন আকর্ষণ তীব্র হতে পারে, আবার কারো ক্ষেত্রে তা হতে পারে লঘু। অনেক যৌন আকর্ষণের বিষয়টি হয়তো বাস্তবতার প্রেক্ষিতে কখনো প্রকাশই করা যায় না, বা প্রকাশ করা হয় না। কিন্তু যৌন আকর্ষণটা কিন্তু মিথ্যে নয়। যেমনহয়তো কোনো সিনেমার অভিনেতাঅভিনেত্রী, বা শিক্ষকশিক্ষিকার প্রতি যে ভালোলাগা, সেখানেও আছে যৌনতা। তার প্রকাশটা হয়তো বাইরে হয় না, থেকে যেতে পারে ব্যক্তির বা তার গণ্ডির মাঝেই। আবার হয়তো কারো প্রতি তীব্র যৌন আকর্ষণ অনুভব করা সত্ত্বেও বাস্তব পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় তা থেকে যেতে পারে অপ্রকাশ্য। এটা অবদমন নয়। বরং এই নিয়ন্ত্রণই মানবিকতার পরিচায়ক। চিন্তাশীল প্রাণী বলেই মানুষ অপরের ভালোমন্দের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে ভাবতে পারে। মানুষের এই ক্ষমতাই তার আমিত্ব। অপরদিকে, ব্যক্তির চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা এবং পরিস্থিতি অনুকূলে থাকা সত্ত্বেও যখন নিজের যৌনতাকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়, সেটাই অবদমন। এখানে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে এক ধরণের কথিত নৈতিকতা কাজ করে। যা ব্যক্তির সামন্তীয় চেতনারই অংশ।

যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক বোঝাপড়ায় কোনো কপটতার আশ্রয় নেওয়াকে মার্ক্সবাদ সমর্থন করে না। আবার যৌন সম্পর্কের কারণে কারো সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যাওয়ার কথিত সামন্তীয় নৈতিকতাকেও আমরা অস্বীকার করি। কে, কার সঙ্গে, কেমন সম্পর্কে জড়াবেসেটা নির্ভর করে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও চিন্তার নৈকট্যের ওপর। আবার এই যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পারস্পরিক চাহিদা, আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত পারিপার্শ্বিক, সামাজিক প্রেক্ষাপট। যেমনকোনো যুগল একান্তে সময় কাটানোর মানেই যৌন সম্পর্ক নয়, তাতে নিশ্চিতভাবেই যৌনতা রয়েছে। আবার কখনো পারস্পরিক আকাঙ্ক্ষা থাকলেও যৌন সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত হতে পারে পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে।

পাঁচ.

এবার আশা যাক, সৌন্দর্য ও পছন্দের প্রশ্নে

বুর্জোয়া গণতন্ত্র ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলে নারীকে কিছু কিছু অধিকার দিয়ে থাকলেও নারীর ব্যক্তিসত্তার পূর্ণ বিকাশ সেই কর্পোরেট সোসাইটিতে সম্ভব নয়সেখানে আজ নারী পণ্যায়িত; বেনিয়া কর্পোরেট সংস্কৃতি একটা সেভিং ফোমের বিজ্ঞাপনেও নারীকে নিয়ে আসে তার শরীর প্রদর্শনের জন্য, যা পুরুষতান্ত্রিক চেতনারই বহির্প্রকাশ।

এই সংস্কৃতিই আবার আদর্শ নারী বলতে বোঝায় টিভি সিরিয়ালের বউ আর সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার নামে মানবসত্তার অবমাননা করে এক সৌন্দর্য চিন্তা উপস্থাপন করে। কর্পোরেট সংস্কৃতি, তার কর্পোরেট মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষের চিন্তাচেতনা, এমনকি চিন্তার বিষয়বস্তু পর্যন্ত নির্ধারণ করে দিচ্ছে। এই কর্পোরেট সংস্কৃতির যুগে মিডিয়া শেখাচ্ছে সৌন্দর্যের মানে হলো ৩৬২৪৩৬, সাইজ জিরো আর সিক্স প্যাক, এইট প্যাক বডি শেইপ। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে শ্রেণীর প্রশ্ন আর পণ্যের বাণিজ্য। এখন মিডিয়া প্রদর্শিত সেক্সি ধারণায় যৌনানুভূতিও নিয়ন্ত্রিত হয় সেই কর্পোরেট চেতনায়! এর সঙ্গে জড়িত কথিত সৌন্দর্য প্রসাধনী আর যৌন বাণিজ্যের বিশাল পসরা।

যুদ্ধ বাণিজ্যের মতোই সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির অন্যতম ক্ষেত্র হলো যৌন বাণিজ্য। সেই দাস যুগ থেকে নারীর শরীরকে দখল করে আছে পুরুষতন্ত্র। সে সময় থেকেই শুরু যৌন বাণিজ্যের, যেখানে নারীকে ভোগ্য পণ্য হিসেবে গণ্য করা হয়। আর এই কথিত সভ্য সমাজ এই সংস্কৃতিকে আজও লালন করে চলেছে। তাকে নাম দেওয়া হয়েছে যৌন শিল্প। অর্থাৎ যৌনতা, যা মানুষের জৈবিক আচারের অংশ, সেটাও তাদের মুনাফার মাধ্যম। আর তা গড়ে উঠেছে বিভিন্ন দেশ থেকে মানব পাচার ও নারীর নারীত্ব, আত্মসম্মান ভূলুণ্ঠিত করে, যৌন নিপীড়নের কেন্দ্র হিসেবে। উল্লেখ্য, আমরা স্পষ্ট করেই বলি, যৌনতা বিক্রির জিনিস নয়, বেশ্যাবৃত্তি কোনো পেশা নয়; এটি নিখাদ শোষণ।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)এর তথ্য মতে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ২১ মিলিয়ন মানুষ জোরপূর্বক যৌন বাণিজ্যসহ অন্যান্য দাসত্বে আবদ্ধ। ৪.৫ মিলিয়ন নারী ও শিশু জোরপূর্বক যৌন ব্যবসায় জড়িত। প্রতিবছর ২ মিলিয়ন নারী ও মেয়ে শিশুকে যৌন ব্যবসায় পণ্যায়িত করা হয়। ২০০৭ সালের মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এক রিপোর্টে বলা হয়, প্রতিবছর মানব পাচারে ৩২ বিলিয়ন ডলার অর্জিত হয়, তার মধ্যে ১৫.৫ বিলিয়ন আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পুঁজিবাদী দেশ হতে, .৭ বিলিয়ন আসে এশিয়া থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও জাতিসংঘের সম্প্রতি কয়েকটি রিপোর্টে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ৯.৫ বিলিয়ন ডলার আসে যৌনব্যবসা হতে। যুক্তরাষ্ট্রে তিন লক্ষাধিক শিশু যৌনব্যবসার সাথে জড়িত, এই শিশুদের বেশির ভাগই ১৩১৪ বছর বয়স থেকে এ দাসত্বে আবদ্ধ। এই শিশুদের ২০ থেকে ৪৮ বার পর্যন্ত যৌনকাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হয়। ঘরছাড়া টিন এজারদের এক তৃতীয়াংশই ৪৮ ঘন্টার মধ্যে যৌনব্যবসার শিকারে পরিণত হয়।

উপরের তথ্যগুলো শুধুমাত্র রাষ্ট্র স্বীকৃত যৌনব্যবসার। এর বাইরেও রয়েছে যৌন বাণিজ্যের বিশাল বাজার। কোথাও তা কল গার্ল নামে পরিচিত, কোথাও ম্যাসাজ পার্লার, আবার কোথাও এসকর্ট নামে। যেখানে যৌনব্যবসার কথা না উল্লেখ করেও তা দেদারসে চলছে।

এই যৌনব্যবসা কিন্তু কথিত পর্যটন শিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ পর্যটন এখন আর কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অবলোকনের মাঝেই সীমাবদ্ধ নাই, তার সাথে জড়িত যৌনব্যবসা। কর্পোরেশনগুলোর অর্থে বিভিন্ন কথিত সৌন্দর্য্য প্রতিযোগিতা আয়োজনের একটা অন্তর্নিহিত অর্থ কিন্তু এই যৌনব্যবসাকেই প্রণোদনা দেওয়া। শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে এখন আর ধনিকশ্রেণী সন্তুষ্ট হতে পারে না, তাদের বাড়তি চাহিদা পূরণে যৌনব্যবসা টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রযন্ত্র সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ, ভারতের মতো নয়াঔপনিবেশিক দেশগুলোতে পর্যটন শিল্প বিকাশের নামে যে লম্ফঝম্ফ লক্ষ্য করা যায়, এর পেছনেও এই কারণটি রয়েছে। যৌনপল্লী ভেঙে দিয়ে কর্পোরেশনের অধীনে যৌনব্যবসা চালনা করাটা অনেক বেশি লাভজনক রাষ্ট্রের জন্য। সম্প্রতিসেক্স টুরিজমএর কথা জোরেশোরে প্রচারণায় আসছে। সেক্স টুরিজমে বিশ্বে এক নাম্বার দেশ হলো থাইল্যান্ড; তারপর ব্রাজিল এবং ফিলিপিন্স; ভারতও এতে পিছিয়ে নেই। ২০০৭ সালে সরকারি হিসেব মতে, ভারতে ৩০ লাখ যৌনকর্মী ছিল; যা নিশ্চিতভাবেই এখন জ্যামিতিকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এদের এক তৃতীয়াংশের বয়সই ১৮ বছরের নিচে। ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এইডস আক্রান্ত দেশ। বাঙলাদেশে সাম্প্রতিককালে বেশকিছু পর্যটনকেন্দ্র চালু হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পর্যটন নগরী গড়ে তোলার পাঁয়তারা চলছে; এর সাথেও সরাসরি সম্পৃক্ত সেক্স টুরিজমএর রমরমা বাণিজ্য। আর এই পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগকারীদের সংখ্যাও কম নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে যৌন বাণিজ্যে ব্যবহার করা হবে পাহাড়ি জাতিসত্তার নারীদের, যা জাতিগত নির্মূলীকরণেরও একটা বিশেষ কৌশল; আর এই বাণিজ্য নিরাপদ রাখতে সদা সচেষ্ট থাকছে কর্পোরেট সেনাবাহিনী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ধনিকশ্রেণীর হাজার হাজার খদ্দের ছুটে আসবে যৌনতার লোভে। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডেও চলছে রমরমা যৌন বাণিজ্য। অস্ট্রেলিয়ায় দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ ও তৃতীয় ঘনবসতিপূর্ণ এ রাজ্য বিদেশি পর্যটকদের কাছে এক আকর্ষণীয় স্থান; আর এর মূলে রয়েছে যৌন বাণিজ্য। মূলত এশিয়া ও ইউরোপের নারীরাই সেখানে যৌনপণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশেদেশে আধুনিকতার নামে, অধিকারের নামে নারী নিপীড়নের হাতিয়ার যৌনব্যবসাকে শিল্প হিসেবে তুলে ধরেছে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ।

ছয়.

এখন প্রশ্ন হলো, যে কর্পোরেট সংস্কৃতি পুরো সমাজে বিরাজমান, তার প্রভাব কী আমরা সে সমাজ থেকে সর্বহারাশ্রেণীর মতাদর্শ ধারণ করলেই রাতারাতি কাটিয়ে উঠতে পারি?

না, এ সংস্কৃতির প্রভাব মুহূর্তেই কাটবে না। বরং এজন্য প্রতিনিয়ত ব্যক্তির একাধিক সত্তার দ্বন্দ্বকে বিকশিত করা দরকার তত্ত্ব ও অনুশীলনের সৃজনশীল বিকাশের মধ্য দিয়ে। কর্পোরেট সংস্কৃতির প্রভাবেই আমাদের মাঝে তাদের প্রদর্শিত সৌন্দর্য ধারণা সৃষ্টি হয়। আর তার আদলে যৌনানুভূতিও প্রকাশ পায়। সর্বহারাশ্রেণীর মতাদর্শকে ধারণ করলেও স্বাভাবিক প্রেক্ষাপটে, মধ্যশ্রেণী থেকে আসা শ্রেণীচ্যুত কমরেডরা শ্রমজীবী শ্রেণী থেকে আসা কোনো কমরেডের চেয়ে বেশি আকৃষ্ট হন মধ্যশ্রেণী থেকে আসা কমরেডদের প্রতি। আমাদের এই কঠোর সত্য স্বীকার করার মানসিকতা থাকা দরকার। কারণ, সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করতে না পারলে তা কাটিয়ে উঠাও সম্ভব হয় না। এই সমস্যার মূলে রয়েছে চিন্তাকাঠামোর বিষয়টি। এখানে যেমন শ্রেণীগত সৌন্দর্যের ধারণা বিদ্যমান, তেমনি চিন্তাগত বা মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একই শ্রেণী কাঠামো থেকে আগতদের চিন্তাকাঠামোর যে নৈকট্য থাকে, তা অনস্বীকার্য। সর্বহারা মতাদর্শের তত্ত্ব ও তার প্রয়োগের বাস্তব অনুশীলনের মধ্য দিয়েই পারস্পরিক চিন্তাকাঠামোর পার্থক্য কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে এ বিষয়টিকে যান্ত্রিকভাবে দেখারও অবকাশ নেই। আমাদের মতো একটি তীব্র শ্রেণীবৈষম্যপূর্ণ সমাজে বিপ্লবের আগে এমন সমস্যাগুলো পূর্ণভাবে মীমাংসা হওয়াটা খুবই কষ্টকর। তবে রাজনৈতিক উত্তরণ ঘটার সঙ্গে সঙ্গে চর্চার মধ্য দিয়েই এই সংগ্রামও সামনে এগোবে বলে প্রত্যাশা করছি।।

ডিসেম্বর ২০১৭

[লেখাটি কলকাতার ‘আজাদী’ পত্রিকা এবং ঢাকার ‘পোস্টকার্ড’ লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।]

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s