মূল: হেদার বল

অনুবাদ: কামরুল ইসলাম ঝড়ো

[হেদার বল একজন অত্যন্ত সমাজসচেতন লেখিকা। তিনি ১৯৩৩ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বড় হন। প্রায় ১৭ বছর আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এটি তাঁর বিখ্যাত ‘ম্যাডনেস’ গল্পের অনুবাদ]

—————————————

সম্প্রতি আমার এক ডাক্তারকে দেখাতে গিয়েছিলাম। তিনি তার অভ্যর্থনা ডেস্কেই বসলেন। তার পাশে রাখা চেয়ারটায় আমি বসলাম। আমার আগেকার স্বাস্থ্যসম্পর্কিত পরীক্ষার রিপোর্ট ও ব্যবস্থাপত্রগুলো তাঁর সামনেই ছিল। ডাক্তারের এক চোখ আমার দিকে এবং অন্যটি ওই কাগজপত্রের ওপর।

আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তা বলুন, এখন কী সমস্যা?”

বললাম, “আমি মনে হয় পাগল হয়ে যাচ্ছি।”

তিনি একটা পাতা উল্টালেন। বোধ হলো তিনি খুঁজছেন আমার আগে কখনও পাগল হবার ইতিহাস আছে কিনা। “তাই,” তিনি তাঁর আসনটার পেছন দিকে সরে বসলেন। জানতে চাইলেন, “কী কারণে আপনার এরকম মনে হচ্ছে? পৃথিবীর কোন জিনিসটা আপনাকে পাগল বানাচ্ছে?” আমি তাকে বললাম যে, পৃথিবীর সব কিছুর জন্যই আমার এরকম মনে হচ্ছে। তিনি অস্বস্তিবোধ নিয়ে ডেস্ক থেকে উঠে তার চেয়ারে গিয়ে বসলেন। “একটু নির্দিষ্ট করে বলবেন কি?”

হ্যাঁ,” আমি বললাম, “মানুষ মানুষকে মারছে, একভাবে না হয় অন্যভাবে, দূষণ, অপুষ্টি…”

ডাক্তার আমার দিকে ভুরু কোঁচকালেন, “আপনি ওই ব্যাপারে কিছুই করতে পারবেন না, এটাই পৃথিবীর নিয়ম এবং এভাবেই পৃথিবীটা চলে আসছে।”

শোষণ,” আমি বলতে থাকলাম, “নিপীড়ন আর ধ্বংসের লক্ষ্যে অস্ত্র উৎপাদন, অস্ত্র মজুদ, বেশি বেশি মজুদএবং…” ডাক্তার তার মাথা নাড়লেন।

কিন্তু এ নিয়ে নিশ্চয়ই আপনার ভেঙে পড়ার কিছু নেই ।”

এটা লটারি, এখানে, ওখানে, সবখানে লাখ লাখ টাকা দেওয়া হয় একজনকে আর মানুষ ভিক্ষে করে বেড়ায় রাস্তায় রাস্তায় আর…”

তিনি কলমটা তুলে নিয়ে কিছু একটা লিখলেন।

ধনীরা আছে কয়েকটা করে বাড়ি নিয়ে আর অন্যদের কোনো ঘর নেই থাকার। কাজ নেই অর্থ উপার্জনের…”

তিনি চশমার ওপর দিয়ে খুব কড়া নজরে আমার দিকে তাকালেন। “এসব নিয়ে চিন্তা করা কেবলই সময়ের অপচয়। বড় কথা হলো, এটা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য খুব ক্ষতিকর। যেসব জিনিস আপনি বদলাতে পারবেন না, সেসব নিয়ে নিজেকে ধ্বংস করবেন না।”

কিন্তু ওগুলো পরিবর্তন করা যেতে পারেযদি মুনাফা, বেশি বেশি মুনাফার দিকে হাত না বাড়িয়ে কেবল ব্যবহারের জন্য পণ্য উৎপাদন করা হয়।”

ডাক্তারের কঠিন দৃষ্টি অনেকক্ষণ আমাকে বিদ্ধ করে রাখলো– “অনেক জ্ঞানীগুণী চিন্তাশীলেরা আছেন, যাদের কাজ হলো এসব নিশ্চিত করা। আপনাকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, এমনও লোকজন আছে যারা সমাজে উপযুক্ত নয়, যারা পছন্দ করে…”

তার কথাটা আমিই শেষ করলাম, “যারা শীতে রাস্তায় খারাপ অবস্থায় পড়ে থাকতে পছন্দ করে। আপনি কি বিশ্বাস করেন তারা এরকমভাবে থাকাটাই পছন্দ করে?”

তার সারা মুখে একটা বিরক্তির ভাব ঘোরাঘুরি করছিল। “আমি সেটা বলিনি যে, তারা তা ‘পছন্দ করে’ কিন্তু কাজ না থাকলে তারাকরতে পারে।” তিনি তার ঘড়ির দিকে তাকালেন। “থাক, এখন আমাকে অন্যান্য রোগী দেখতে হবে, তাই ভাবছি আপনার জন্য কী করা যায়। আচ্ছা, কয়েকটা ওষুধ লিখে দিচ্ছি, যেগুলো আপনাকে উদ্বিগ্ন হওয়া থেকে সরিয়ে রাখবে। আমরা সবাই যদি এরকম দুশ্চিন্তায় ডুবে থাকতাম, তাহলে কি আমরা সবাই শেষ হয়ে যেতাম না?”

আমি তার কাছ থেকে একটা ন্যায়ানুগ সমাজব্যবস্থার কথা আশা করছিলাম। কিন্তু তিনি তা গুঁড়িয়ে দিয়ে আমার জন্য একটা ব্যবস্থাপত্র তৈরি করলেন। বললেন, “এগুলির দুটো করে পানির সাথে দিনে তিন বেলা খাবেন। তবে সতর্ক করে দেই, এই ওষুধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। আপনার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে পারে, শ্রবণশক্তির ক্ষতি হতে পারে, চেতনা কিছুটা ভোঁতা হয়ে যেতে পারে এবং অনুভূতিও হারিয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু আমি মনে করি, আপনি নিয়মিতভাবে ওষুধগুলো খেলে দেখবেন দারিদ্র, অন্যায়অবিচার, নানা প্রকার দূষণ, যুদ্ধ এগুলো আর আপনাকে এতটা চিন্তায় ফেলবে না।” তারপর ডাক্তার প্রফুল্ল চিত্তে বলে উঠলেন, “দেখবেন, আমরা আপনাকে খুব শীঘ্রই সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনবো।”

ধন্যবাদ ডাক্তার,” আমি বললাম, “কিন্তু আমি যে আরও বেশি পাগল হয়ে যাবো।”

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.