নয়া-ঔপনিবেশিক আগ্রাসনে সংস্কৃতি – শিক্ষা এবং আমাদের করণীয়

Posted: ফেব্রুয়ারি 18, 2018 in দেশ, মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

সহযোগিতায়: আবিদুল ইসলাম

কোনো সমাজের উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে তার শিক্ষাব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তা সমাজের মেরুদণ্ড স্বরূপ। সমাজ বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সেই সমাজের শিক্ষাব্যবস্থাও বিকশিত হয়। উৎপাদনব্যবস্থা যদি গণমুখী হয়, তবে শিক্ষাব্যবস্থাও হবে গণমুখী। অপরদিকে, যদি এই উৎপাদনব্যবস্থা গণমুখী না হয়, তবে শিক্ষাব্যবস্থাও হবে তার অনুরূপ। কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদপীড়িত বাংলাদেশের উৎপাদনব্যবস্থা নয়াঔপনিবেশিক হওয়ায়, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাও ক্রমেই কর্পোরেট পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতি স্বীকার করেছে ও করছে। যার মূল উদ্দেশ্য কেবলই মুনাফা অর্জন, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ আর কর্পোরেট দাস উৎপাদন। এই ব্যবস্থা ক্রমেই মানুষকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলে, যা শাসকশ্রেণী এবং কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। এর সঙ্গে মিশেছে কর্পোরেট সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিকৃতি। এই শিক্ষাব্যবস্থার ফলে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে। এই শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় পাশ করতেই শেখাচ্ছে, নৈতিক গুণাবলী বৃদ্ধিতে যার ভূমিকা প্রায় শূন্যের কোঠায়। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে দিনদিন আত্মকেন্দ্রিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যাদের মামাটিমানুষ নিয়ে ভাবনার চেতনাটুকুও অবশিষ্ট থাকে খুব সামান্যই। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নয়া কর্পোরেট মোড়কে গ্রাস করেছে ও করছে আমাদের সংস্কৃতিকে।

কর্পোরেট সংস্কৃতি হলো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ কর্তৃক সন্ত্রাসের মাধ্যমে তাদের নিজস্ব আদলে দুনিয়াকে ঢেলে সাজানোরই প্রয়াস। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সামনে আসে ভাষার সাম্রাজ্যবাদ। আমরা জানি, প্রতিটা ভাষার দুটো দিক থাকে। একটা হলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামকালে একেঅপরের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে। অপরটি হলো সেই ইতিহাস ও সংস্কৃতির বাহক হিসেবে ভাষার ভূমিকা; যা দীর্ঘকালব্যাপী নিজ জনগোষ্ঠী এবং অপরাপর ভাষা ও ভাষাভাষীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও আদানপ্রদানের প্রক্রিয়ায় নির্মিত হয়। বিভিন্ন দেশ যখন স্বতন্ত্রতা এবং সমানতার শর্তে পরস্পরের নৈকট্যে আসে, তখন সেসব দেশের ভাষাও একেঅপরের সঙ্গে গণতান্ত্রিক উপায়ে মিলিত ও বিকশিত হতে পারে। অপরদিকে, উপনিবেশিত অঞ্চলে ঔপনিবেশিক ভাষা যখন উপনিবেশিত ভাষাসমূহের নৈকট্যে আসে, তখন তার এই সম্মুখীনতা স্বতন্ত্রতা ও সমানতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয় না। বরং তাতে থাকে ঔপনিবেশিক ভাষা ও সংস্কৃতির উদগ্র দম্ভ। আর এই প্রক্রিয়ায় উপনিবেশিত অঞ্চলের ইতিহাসঐতিহ্যভাষাসংস্কৃতিকে হীন এবং ঔপনিবেশিক ভাষাসংস্কৃতিইতিহাসঐতিহ্যকে মহান বলে প্রচার করা হয়। মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব তৈরি করতে স্থানীয়দের সংস্কৃতিহীনইতিহাসহীন বলে প্রচার করার মাধ্যমে তাদের মাঝে হীনমন্যতা তৈরি করা হয় এবং এর মধ্য দিয়ে কথিত উন্নত ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির একাধিপত্য তৈরি করা হয়।

এখানে উল্লেখ্য যে, উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদ এক কথা নয়। উপনিবেশ সাম্রাজ্যবাদের পূর্বেও ছিল; তবে সাম্রাজ্যবাদের যুগে উপনিবেশ হলো সাম্রাজ্যবাদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আবার সরাসরি উপনিবেশ কায়েম না করেও সাম্রাজ্যবাদ কোনো ভূখণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। রাজনৈতিক, আইনী, বা সামরিক দখলদারিত্বের মাধ্যমেও সাম্রাজ্যবাদ এই নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পারে। অর্থাৎ, উপনিবেশ স্থাপন ছাড়াও সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। উপনিবেশ বা নয়াউপনিবেশ তৈরির মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ তার টিকে থাকার রসদ যোগাতে সক্ষম হয়। সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। তা এমন একটি মতাদর্শ, যা পুঁজিপতি বুর্জোয়াদের পুরো বিশ্বে রাজনৈতিকঅর্থনৈতিকমনস্তাত্ত্বিকসামাজিকসাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য তৈরির বৈধতা প্রদান করে।

দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে উপনিবেশবাদই ছিল সাম্রাজ্যবাদের প্রধান স্বরূপ। যুদ্ধের ফলে পুরনো সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দেশে দেশে জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম তীব্রতর হতে থাকলে সাম্রাজ্যবাদীরা নয়াউপনিবেশবাদের আবরণে সামনে আসে আর ক্রমেই তার নিপীড়ক মুখাবয়ব প্রকট হয়ে উঠে। নয়াউপনিবেশবাদের মূল কথা হলো উপনিবেশিত দেশের জনগণের একাংশকে সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতিশিক্ষায় গড়ে তোলা এবং এই সাম্রাজ্যবাদপুষ্ট দালালবুর্জোয়া শ্রেণীকে সেই কথিত স্বাধীন দেশের শাসক হিসেবে ক্ষমতাসীন করা। অর্থাৎ, শাসকশ্রেণীর দাসত্ব নিশ্চিত করে দালালবুর্জোয়াদের দ্বারা পরোক্ষ ঔপনিবেশিক শাসন বজায় রাখা যেখানে অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি সবই সাম্রাজ্যবাদের সেবায় নিয়োজিত থাকে।

বর্তমান কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদকেও দেশে দেশে গড়ে তুলতে হয়েছে তাদের পুষ্ট নয়াঔপনিবেশিক রাজনীতির দোসর আমলামুৎসুদ্দি ও স্থানীয় দালালবুর্জোয়াশ্রেণী। এখানে উল্লেখ্য যে, নয়াউপনিবেশবাদের সঙ্গে সামন্ততন্ত্রের রয়েছে দ্বৈতনীতি। একদিকে, নয়াউপনিবেশবাদ সামন্তব্যবস্থাকে নিজের স্বার্থ অনুযায়ী উচ্ছেদ করে। আবার তা ততোটুকুই যতোটুকু সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী নয়াউপনিবেশবাদ সামন্তব্যবস্থাকে আংশিক সংরক্ষণও করে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটিই চলে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থানুযায়ী। অর্থাৎ, নয়াঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় পূর্ণমাত্রায় সামন্তবাদ উপস্থিত না থাকলেও সামন্তঅবশেষ বিদ্যমান থাকে। আর তা খুব স্বাভাবিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদের পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে।

বৃহৎ কর্পোরেশনগুলোই এখন অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রশাসন, নিরাপত্তা, সেনাবাহিনী, সংস্কৃতি; এমনকি সাধারণের চিন্তাচেতনা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছে। মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক সুসান লীনএর মতে, শিশুদের এখন নিউক্লিয়ার বোমার মতোই মুনাফার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শিশুরা যেন মাবাবাদের কাছে কর্পোরেটদের পণ্য খরিদ করার জন্য বায়না ধরে, সেটাই তাদের মূল লক্ষ্য। ১৯৯৮ সালে এই বিষয়ে এক গবেষণা চালানো হয়। আর তা কিন্তু কর্পোরেশনগুলোই চালিয়েছে। এই গবেষণা চালানো উদ্দেশ্য কিভাবে শিশুদের বায়না ধরানোটা আরো শক্তিশালী করা যায়, যেন তারা মাবাবাদের পণ্য কিনতে বাধ্য করে। কোমলমতি শিশুদের প্রভাবিত করার জন্য কর্পোরেশগনগুলো তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপনে শিশুদেরই ব্যবহার করে থাকে। আর এই শিশুরাই কিন্তু আগামীদিনের গ্রাহক। তাই কর্পোরেশনের সঙ্গে সম্পর্কের শুরুটাই হবে জোরালোভাবে, শিশুকাল থেকেই। আর তাতে ব্যবহৃত হয় কর্পোরেট মিডিয়া। কর্পোরেশনগুলো এক্ষেত্রে পণ্য উৎপাদন থেকেও বেশি জোর দিচ্ছে ক্রেতা উৎপাদনে।

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের নয়াঔপনিবেশিক প্রক্রিয়াকে সহযোগিতা করে সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো। আবার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে অনিবার্যভাবেই গড়ে উঠে সাংস্কৃতিক প্রভুত্ব যা এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও সুদৃঢ় করতে সহায়তা করে। শিক্ষা, ভাষা, ভাষার ব্যবহার, সাহিত্য, ধর্ম, প্রচার মাধ্যম পুরো প্রক্রিয়ার ব্যবস্থাপনার ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ সর্বদাই মতাদর্শ, মূল্যপ্রণালী, বিশ্ববীক্ষা, সমাজচিন্তার ওপর তার নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। এভাবে সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ এমন এক অবস্থা সুনিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়, যাতে গোলাম ব্যক্তিবর্গ এটা স্বীকার করে নেয় যে, গোলাম হওয়াটা একটা সাধারণ মানবীয় অবস্থা। এই প্রক্রিয়ায় সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা প্রভাবিত ও পুরোপুরি ওতপ্রোত উঠতি পুঁজিপতিদের এমন এক শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটে যে, কথিত স্বাধীন ভূখণ্ডে যখন এই শ্রেণীটি ক্ষমতাসীন হয়, তখনও নয়াউপনিবেশের আদলে ঔপনিবেশিক শাসনটাই পোক্ত হয়। এই দেশীয় দালালবুর্জোয়া শ্রেণীটি একই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করে। শোষিতনিপীড়িত মানুষও যদি বিশ্বে নিজের অবস্থানকে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ববীক্ষার আদলে দেখতে শুরু করে, তাহলে নিপীড়িত শ্রেণীসমূহের সঙ্গে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের কোনো বৈরী দ্বন্দ্বই আর দৃশ্যমান থাকবে না! আর এক্ষেত্রে নয়াউপনিবেশবাদের অন্তর্গত সাম্রাজ্যবাদের সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকটি আরো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে সামনে আসে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও দেশেদেশে নিপীড়িত মানুষজনের লড়াইসংগ্রাম বন্ধ হয়ে যায়নি। নানান টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও এই সংগ্রাম আজও চলমান। এসময়ে আমরা দেখতে পাই যে, কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের কর্পোরেট ধ্যানধারণার প্রচলন চালিয়ে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে কর্পোরেট স্বার্থে বিদেশে মেধা পাচারের কাজটিও তারা উন্নয়নের লেবাসে সামনে তুলে এনেছে। তাদের এই প্রক্রিয়ায় প্রচার মাধ্যমের ভূমিকাও অনস্বীকার্য।

দুই.

এ ভূখণ্ডের সংস্কৃতি নিয়ে বলতে গেলে খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই আসে বাংলা ভাষার উপনিবেশায়নের প্রশ্নটি। ব্রিটিশ উপনিবেশকালের জন্মলগ্ন থেকেই শুরু হয় বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনাবিন্দু যেহেতু বাংলা, তাই বাংলা ভাষাকে হয়ে উঠতে হয়েছিল সাম্রাজ্য বিস্তারের বাহন। বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ায় দুইটি বিষয় সামনে আসে এক. সংস্কৃতায়ন; দুই. ইংরেজির প্রভাব। বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়ন একটি পুরনো এবং অব্যাহত প্রক্রিয়া। প্রাকৃতের সময়কালেও সংস্কৃত থেকে অনেক শব্দ বাংলায় এসেছে। কিন্তু উপনিবেশপর্বে মূলত সংস্কৃতকে মানদণ্ড হিসেবে সামনে রেখে বাংলা ভাষার শুদ্ধতা যাচাই করার প্রক্রিয়া শুরু হয়; যার মাধ্যমে জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষাকে পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়।

[বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন সম্পর্কিত আলোচনার ক্ষেত্রে (বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণের উপনিবেশায়ন মোহাম্মদ আজম) এই লিখিত বক্তৃতা থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে।]

উপনিবেশপূর্ব সময়কালেও বাংলা গদ্য সাহিত্যে সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার ছিল; কিন্তু তা আরোপিত ছিল না। অথচ উপনিবেশ পর্বে ইংরেজদের হাতে বাংলা ব্যাকরণ তৈরির পর রচিত বাংলা গদ্য সাহিত্যে সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার বাড়ে মাত্রাতিরিক্ত। উপনিবেশপূর্ব বাংলা সাহিত্যে সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার বুঝতে আরো কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় দেখান যে, চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে অন্তত বানানের দিক থেকে তৎসমের সংখ্যা শতকরা ১২.৫ ভাগ। মধ্যযুগের কোনো কোনো কাব্যে সংস্কৃত শব্দের পরিমাণ মোট শব্দের প্রায় এক তৃতীয়াংশ। এর মধ্যে রয়েছে বহু নামশব্দ, আছে হিন্দুধর্মের অনুশাসন আর পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে যুক্ত শব্দ। শব্দগুলোর উচ্চারণ প্রায়শই পরিবর্তিত হয়েছে, কোথাও কোথাও বানানও। অর্থাৎ, সংস্কৃতের শুদ্ধতার বিষয়টি এখানে ছিল না। মানুষের জীবনযাপন আর চর্চার সঙ্গে যুক্ত হয়ে শব্দগুলো ব্যাপকভাবে মুখের ভাষায় যুক্ত হয়েছে, বা অন্তত বোধগম্যতার সীমানায় এসেছে। যার অধিকাংশই সরল আর ছোট আকারের শব্দ। আর এ কারণেই জনপ্রিয় লোকগাথায় ৩৩.২ ভাগ সংস্কৃত শব্দ থাকতে পারত না। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, আলাওল, কাশীরাম দাস বা ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরএর মতো কবিদের জনপ্রিয়তাই এটা প্রমাণ করে যে, বাংলা ভাষার প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খেয়ে যাওয়া অঙ্গীভূত সংস্কৃত শব্দগুলো সাধারণের বোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল; আর সেই পরিমাণটুকু নগণ্য ছিল না। কিন্তু উপনিবেশায়নপ্রক্রিয়ার সংস্কৃতায়ন এ থেকে একেবারেই ভিন্ন জিনিস। পূর্ববর্তী প্রায় তিনশ বছরের চর্চায় বাংলা শব্দভাণ্ডার ও বাগভঙ্গির যে ধারা গড়ে উঠেছিল, অশুদ্ধ, অমার্জিত অভিধায় সেগুলো বাতিল করে দেওয়াটা ছিল এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আগের গদ্য কমবেশি মুখের ভাষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। কিন্তু নতুন উপনিবেশিত ধারায় ছিল খোদ মুখের ভাষাকেই বদলে ফেলার প্রস্তাব। অচলিত সংস্কৃত আমদানির পরিমাণ ছিল অসহ্যরকমের বেশি। ছিল বানান, শব্দগঠন, ব্যাকরণচিহ্ন, বড় যৌগিক শব্দ এবং দীর্ঘ বাক্যের জটিলতা।

বাংলায় ঠিক কতোটা সংস্কৃত শব্দ ব্যবহৃত হলে তাকে মাত্রাতিরিক্ত বলা যাবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিশিরকুমার দাশ বলেন যে, বাঙালি পাঠক যখন কিছু পড়তে গিয়ে বোধ করে যে, সে বাংলা পড়ছে না, সংস্কৃত পড়ছে, তখন তাকে অতিরিক্ত বলতেই হবে। উনিশ শতকের প্রথমার্ধের বহু বইয়ের ক্ষেত্রে এরকমটাই ঘটেছে। হিতোপদেশ গোলকনাথ শর্মা অনুবাদ করেছিলেন ১৮০১ সালে, আর মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার ১৮০৮ সালে। দুজনের বইয়ের দুই অনুচ্ছেদ করে বিশ্লেষণ করে শিশিরকুমার দাশ দেখিয়েছেন, তাতে সংস্কৃত শব্দের পরিমাণ যথাক্রমে ৬৪ ও ৭৫ শতাংশ। বাকি শব্দ তদ্ভব। কোনো আরবিফারসি শব্দ এ অংশে ব্যবহৃত হয়নি। হরপ্রসাদ রায়ের পুরুষপরীক্ষা গ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠায় সংস্কৃত শব্দের সংখ্যা শতকরা ৮৮ ভাগ, যার খুব সামান্য অংশই বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হয়। প্রবোধচন্দ্রিকায় এই হার আরো বেশি শিশিরকুমার দাশ এর একটি অংশের হিসেব করে পেয়েছেন শতকরা ৯২ ভাগ। গদ্যপদ্য নিবির্শেষে পুরোনো বাংলার একতৃতীয়াংশের তুলনায় এই সংখ্যা বিপজ্জনকভাবে বেশি। পুরোনো বাংলায় যেখানে বাংলা ভাষায় আত্মীকৃত শব্দ হিসাবে দরকারি সংস্কৃত শব্দ ব্যবহৃত হত, নতুন রীতিতে সেখানে অচলিত সংস্কৃত শব্দের পরিমাণই বেশি।

সংস্কৃতায়নের ঐ যুগে সংস্কৃত কেবল শব্দ আকারে অভিধানে যুক্তই হয়নি; বাক্যগঠন, উচ্চারণ, ব্যাকরণিক চিহ্নের ক্ষেত্রেও এসেছিল বিরাট পরিবর্তন। গোলাম মুরশিদ বজর্নগ্রহণের একটি লম্বা তালিকা দিয়ে লিখেছেন, মোট কথা, তদ্ভব, দেশি এবং আরবিফারসি ক্রিয়াপদের জায়গা নিল সংস্কৃত ক্রিয়াপদ। প্রমথ চৌধুরী বলেন, শুধু অসংখ্য কথা যে বেরিয়ে গেল তাই নয়, ভাষার কলকব্জাও সব বদলে গেল। দ্বারা, সহিত, কর্তৃক, পরন্তু, অপিচ, যদ্যপি, সাৎ প্রভৃতির সাহায্য ছাড়া উক্ত সাধুভাষায় পদ আর বাক্য হতে পারত না।প্রবোধচন্দ্রিকার সংস্কৃতায়িত বাংলায় দেখা যায় লম্বা লম্বা বাক্য কোনো কোনোটি প্রায় আধপৃষ্ঠা পর্যন্ত লম্বা।

ব্রিটিশ উপনিবেশপূর্ব সময়কালে বাংলা ভাষায় বহু সাহিত্য রচিত হলেও বাংলা ভাষার পূর্ণাঙ্গ অভিধান বা ব্যাকরণ তখনও পর্যন্ত লিপিবদ্ধ হয়নি। প্রথম যুগের গুরুত্বপূর্ণ অভিধান ও ব্যাকরণ প্রণেতাদের সকলেই ছিলেন ইংরেজ। তাঁদের কাজগুলো বেরিয়েছিল ছাপার হরফে। তাদের চাপিয়ে দেওয়া ব্যাকরণে মুদ্রণসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোম্পানির শাসনামলে নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড প্রথম এই উদ্যোগ হাতে নেন। বাংলা ভাষায় হ্যালহেডের দক্ষতা ছিল সীমিত। তাঁর পক্ষে বাংলা ব্যাকরণ লিপিবদ্ধ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তিনি একটা পন্থা অবলম্বন করলেন। তা হলো সংস্কৃতের ছাঁচে বাংলা ব্যাকরণকে লিপিবদ্ধ করে বাংলা ভাষাকে বিশুদ্ধ করে তোলা। আর এ ক্ষেত্রে তিনি ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের উপর নির্ভর করেছিলেন। পরবর্তীতে, উইলিয়াম কেরি ব্যাকরণ রচনার দায়িত্ব পান। তিনি ১৮০৫ সালে এই ব্যাকরণের দ্বিতীয় সংস্করণে চলতি উপাদানসমূহকে তিরোহিত করে সংস্কৃত ব্যাকরণের ছাঁচে ফেলে এই ব্যাকরণকে a new work” হিসেবে জাহির করেন। হ্যালহেড বা কেরি বা আরো যারা ইংরেজদের পক্ষে দরকারি এক বাংলার জন্ম দিয়েছিলেন, তারা মূলত বাংলা ভাষাটাকেই বদলে দিয়েছিলেন। এক সরল নিয়মে তারা বাংলা ভাষাকে শিখতে গিয়ে যে ব্যাকরণ গড়ে তুললেন, তাতে বাংলা ভাষা সংস্কৃতের চেহারায়, সংস্কৃতের ব্যাকরণে নতুন রূপ লাভ করে। সাধারণের কথ্য ভাষার সঙ্গে যার বিস্তর ফারাক। প্রমথ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন যে, ভাষার কাজ হলো মুখ থেকে কলমে আসা, এর উল্টোটা হলে মুখে কালি আসে।

বাংলাভাষীদের কাছে ইংরেজি হলো প্রতাপশালী সাম্রাজ্যের ভাষা। তাই ইংরেজিশিক্ষিত বাঙালির রচনায় ইংরেজির নানারকম প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বাংলার ক্ষেত্রে এ প্রভাব আরো দ্রুততর হয়েছে দুটো কারণে। এক. ইংরেজ লেখকদের বাংলা গদ্যচর্চা; দুই. অন্তত উনিশ শতকের তিন দশক পর্যন্ত গদ্যচর্চার প্রধান ক্ষেত্রগুলোতে ইংরেজদের প্রত্যক্ষ কর্তৃত্ব। ধর্মপুস্তকই হোক আর পাঠ্যপুস্তকই হোক ইংরেজরচিত গদ্যের বড় অংশ ছিল ইংরেজি থেকে অনুবাদ বা ইংরেজি গদ্যের অনুসরণে লেখা। তাদের বাংলাবিদ্যা যথেষ্ট পাকা না হওয়ায় এসব রচনায় স্বভাবতই ইংরেজির ভাবস্বভাব রক্ষিত হয়েছে। ফলে বাংলার বিশিষ্টতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। (বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণের উপনিবেশায়ন মোহাম্মদ আজম)

সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অধীনে, তার ক্ষমতা পোক্ত করার প্রয়োজনে তখন সংস্কৃত ও ইংরেজির প্রভাবে রচিত ব্যাকরণের আদলে নতুন গদ্য তৈরি হয়েছিল। ইংরেজ লেখকদের এই ব্যাকরণ সম্পর্কে দেবেশ রায় বলেন, তাঁরা যতটা না বাংলা ভাষা বুঝতে শিখতে চাইছিলেন, তার চাইতে বেশি চাইছিলেন বাংলা ভাষাটাকে নিজেদের মতো করে বোঝাতেশিখাতে।

বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে ইংরেজদের তৎপরতাকে আরো ভালোভাবে বোঝা যায় তার আধিপত্য বা হেজিমনি দিয়ে জ্ঞানতাত্ত্বিক আধিপত্য, মুদ্রণসংস্কৃতির প্রতাপ, প্রণীত বিধির প্রভাব আর কাঠামোগত কেন্দ্রত্ব সেই আধিপত্য বা হেজিমনির উৎস।

বাংলা ব্যাকরণের ক্ষেত্রে কোনো চলতি বা আদর্শ ভাষার ভিত্তিতে ব্যাকরণপ্রণয়নের ব্যাপারটা ঘটেনি। সংস্কৃত ও ইংরেজির ছাঁচে এক কল্পিত আদর্শের বরাতে ব্যাকরণ রচিত হয়েছে। সংস্কৃতপণ্ডিতেরা বাংলা ভাষার একচ্ছত্র অভিভাবক হয়ে উঠার পেছনে যে প্রচারণা কাজ করেছে তা হলো বাংলা একটি অনুন্নতঅমার্জিত ভাষা, আর কেবল সংস্কৃতায়নের মাধ্যমেই বাংলার বিশুদ্ধরূপ পাওয়া সম্ভব।

সাহেবপণ্ডিত যৌথতায় গড়ে ওঠা এই তত্ত্ব পরবর্তী পর্যায়ে প্রায় হুবহু পুনরাবৃত্ত হতে থাকে পুরো উনিশ শতক জুড়ে। শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায়এর আগে এ ধারণাকে কার্যকরভাবে কেউ চ্যালেঞ্জ করেননি। শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায় ১৮৭৭ সালে ক্যালকাটা রিভিয়্যু পত্রিকায় Bengali, Spoken and Written” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। এ প্রবন্ধকে বলা যায় বাংলা ভাষার উপনিবেশায়নের বিপরীতে প্রথম বিস্তারিত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। যার মূল কথা বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণের স্বাধিকারস্বায়ত্তশাসন। এ ধারায় পরবর্তীতে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রমুখরা যুক্ত হন। হুমায়ুন আজাদ যাঁদের চিহ্নিত করেছেন নবব্যাকরণবিদ এবং বাংলাপন্থী হিসাবে। কিন্তু বিশ শতকের তৃতীয় দশকে নতুন সাংস্কৃতিকরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রগতিশীল ধারাটিও রুদ্ধ হয়ে পড়ে। সংস্কৃতায়ন আর ইংরেজির প্রভাবে গড়ে ওঠা বাংলা ব্যাকরণের ঔপনিবেশিক মডেল আবার রাজত্ব করতে থাকে। এমনকি আজও, ব্যাকরণের ক্ষেত্রে, কিছু সংযোজনবিয়োজনসহ বাংলা ভাষাব্যাখ্যার ওই মূল ছাঁচ অক্ষুণ্ন থেকে যায়।

যে ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্ব এই সমাজে ক্রিয়াশীল রয়েছে, তার শিকড় অনেক গভীরে। যা নয়াঔপনিবেশিক চেতনার সেবা করে যাচ্ছে, তার টিকে থাকার ভিত্তিকে মজবুত করছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশের মতো নয়াঔপনিবেশিক দেশে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাটিই গড়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক মডেলে, যা এ সময়ে কর্পোরেট সংস্কৃতির গুণকীর্তনে ব্যস্ত।

তিন.

বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত কোনো একক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এমনকি প্রাথমিক শিক্ষাটুকুও কোনো সাধারণ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। যে কারণে চিন্তা কাঠামোর বিভাজনটাও শুরু হয় শিশুকাল থেকেই। এখানে বাংলা মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে একই সিলেবাসে রয়েছে ইংরেজি ভার্সন, আরো আছে ইংরেজি মাধ্যম বা ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাব্যবস্থা এবং দুই ধরনের মাদ্রাসা শিক্ষা কওমী মাদ্রাসা এবং আলিয়া মাদ্রাসা। আরও রয়েছে কারিগরি শিক্ষার নামে আরেক প্রহসন। যেখানে সমসাময়িক কারিগরি শিক্ষার ন্যূনতম অবকাঠামোটুকুও গড়ে তোলা হয়নি। বহুধা বিভক্ত এই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে এই সমাজের শ্রেণীগত বিভাজনটাও ভীষণভাবে স্পষ্ট। বাংলা মাধ্যম (ইংরেজি ভার্সন সহ) শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা প্রধানত এখানকার মধ্যশ্রেণীর (মিডল ক্লাস) পরিবার থেকে আগত। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়ারা প্রধানত উচ্চশ্রেণী (আপার ক্লাস) বা উচ্চমধ্যশ্রেণী (আপারমিডল ক্লাস) থেকে আগত। কারিগরি শিক্ষা ও আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা প্রধানত মধ্যশ্রেণী ও নিম্নমধ্যশ্রেণী (লোয়ার মিডল ক্লাস) থেকে আগত। অপরদিকে, প্রধানতঃ সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ঠাঁই হয় কওমী মাদ্রাসায়।

ইংলিশ মিডিয়াম নামক শিক্ষাব্যবস্থাটি হলো কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও মেধা পাচারের অন্যতম ক্ষেত্র। সেখানে ব্রিটিশ সংস্কৃতি পড়ানো হয়, মার্কিন সংস্কৃতি পড়ানো হয়, কখনো বা অস্ট্রেলিয়া বা ইরানের ইতিহাসঐতিহ্যসংস্কৃতি তাদের সিলেবাসে স্থান পায়, কিন্তু সেখানে শিক্ষার্থীদের এ ভূখণ্ডের ইতিহাসঐতিহ্যসংস্কৃতি সম্পর্কে পড়ানো হয় খুব সামান্যই। এদের পাঠক্রমের ওপর এদেশের শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কারো কোনো নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত নাই। এমনকি মাতৃভাষার চর্চার সুযোগটাও দিবসকেন্দ্রিক, যেমন কোনো কর্পোরেট কোম্পানির সৌজন্যে পালিত একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গান গাওয়া, যদিও সেই দিবসের ইতিহাস আর তাৎপর্যটুকুও তাদের শতকরা ৯৯ ভাগেরই অজানা। ইংলিশ মিডিয়ামের পাঠক্রমে মাতৃভাষার শিক্ষা চরমভাবে বর্জিত। আর নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, সর্বোপরি সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ব্যক্তির বিকাশ যে পূর্ণতা পায় না, তা বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রমাণিত সত্য। সমাজের সবচেয়ে বেশি সুযোগপ্রাপ্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একাংশকে স্বীয় ইতিহাসঐতিহ্যসংস্কৃতি থেকে দূরে রেখে, আধুনিকতার ছাঁচে ফেলে ভোগবাদী সংস্কৃতির ধারক হিসেবে গড়ে তোলাটাই কর্পোরেট সংস্কৃতির মূল উদ্দেশ্য। তাদের অধিকাংশেরই ভবিষ্যৎ পরিণতি হয় তারা কর্পোরেট দালালে পরিণত হয়, অথবা বিদেশে পাড়ি জমিয়ে আত্মকেন্দ্রিক ভোগবাদে নিমজ্জিত হয়। আর সাম্রাজ্যবাদের ধারক কথিত সুশীল সমাজ একেই উন্নতি হিসেবে জাহির করে বগল বাজাতে থাকে। সেই সঙ্গে ইংরেজী ভার্সন বলে পরিচিত যে শিক্ষাব্যবস্থা শুরু হয়েছে, তা হলো এক জগাখিচুরী ব্যবস্থা। পাঠক্রম, শিক্ষক, পাঠ্যবই সকলক্ষেত্রেই এক অব্যবস্থা বিরাজমান। সরকারের তরফ থেকে কেবলই নাম কামানোর জন্য এই অব্যবস্থার জন্ম দেওয়া হয়েছে।

মাদ্রাসা সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই বিভিন্ন রকমের ধ্যানধারণা রয়েছে। তাই এ সম্পর্কে কিছু কথা বলা দরকার। যেখানে আমাদের মোট শিক্ষার্থীদের ৭০ শতাংশেরও বেশি ওই মাদ্রাসাগুলোতেই পড়ছে। আর তাদের কথা বাইরে রেখে কোনো আলোচনাই সম্পূর্ণতা পেতে পারে না।

মাদ্রাসা একটি আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ অধ্যয়ন। অর্থাৎ, মাদ্রাসা মানে অধ্যয়ন করার স্থান। ইসলামের বিকাশমান সময়কালে কোরআন, হাদিসসহ, আইনশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র, ভাষাতত্ত্ব, বংশশাস্ত্র, অশ্ব চালনা, যুদ্ধবিদ্যা, হস্তলিপিবিদ্যা, শরীরচর্চা, জ্যোতির্বিদ্যা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিচর্চাও সেখানে অধ্যয়ন ও গবেষণার অংশ ছিল। এই জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা স্পেনে চারশো বছর মুসলিম শাসনের সময়কালে বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করে। ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশ উপনিবেশের পূর্বেও এই জ্ঞানচর্চা আংশিক বজায় ছিল। তখনও পর্যন্ত মাদ্রাসার পাঠক্রমে ছিল আরবি, ফার্সি, বাগবিধি, রূপতত্ত্ব, অলঙ্কারশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, জ্ঞানতত্ত্ব, অতিন্দ্রীয়বাদ, সাহিত্য, আইনশাস্ত্র, দর্শন ইত্যাদি। ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে তারা মাদ্রাসার ওয়াক্‌ফকৃত (অনুদান হিসেবে পাওয়া) জমি বাজেয়াপ্ত করলে মাদ্রাসাগুলো ঠিকানাহীন হয়ে পড়ে। মুসলমানদের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার হতে থাকে। কলকাতার কয়েকজন মুসলমান এই বাজেয়াপ্তকৃত জমির বিপরীতে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির তত্ত্বাবধানে কলকাতায় একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার আবেদন জানায়। এর প্রেক্ষিতে তৎকালীন গভর্নর ওয়ারেন হেষ্টিংস ১৭৮১ সালে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এটাই উপমহাদেশের সর্বপ্রথম আলিয়া মাদ্রাসা, যা প্রতিষ্ঠা করার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের ক্ষোভ প্রশমিত করা, বিভেদের বীজ প্রোথিত করা এবং ইংরেজ শাসন পোক্ত করা। কোম্পানি তার স্বার্থ অনুযায়ী সেই মাদ্রাসার পাঠক্রম নির্ধারণ করে আরবি ও ফারসি ভাষা, কোরআন, হাদিস ও মুসলিম আইনশাস্ত্র। পরবর্তীকালে, তাতে কাজ চালানোর মতো কিছু ইংরেজি, গণিত এবং বিজ্ঞান যোগ করা হয়। এ সবই করা হয় সাম্রাজ্যবাদের কেরানী তৈরির নিমিত্তে, যা আজও চলমান। এই আলিয়া মাদ্রাসা সর্বদাই শাসকশ্রেণীর সরকার দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। তাই তাতে তাদের স্বার্থের প্রতিফলনটুকুই দেখা গেছে।

অপরদিকে, যারা এই সরকারি মাদ্রাসার (আলিয়া মাদ্রাসা) বিরোধী ছিলেন, তারা ইংরেজদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়, কিন্তু সুসজ্জিত বাহিনীর সামনে তারা পেরে উঠতে পারেননি। এ সময়ে প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাদের অনেকেই বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প, সাহিত্য চর্চাকে পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দেয়। ফলে কওমী মাদ্রাসা হয়ে ওঠে কোরআন, হাদিস সহ অন্যান্য কিতাব মুখস্থ করার কেন্দ্র। কওমি মাদ্রাসা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন থাকেনি। সেখানে মূলত অসহায় সুবিধাবঞ্চিতদেরই স্থান হয়েছে, যারা রাষ্ট্রের নিকট অনেকাংশেই অবাঞ্ছিত। তাদের অর্থের যোগান আসে মূলত জনগণের দান করা অর্থের মাধ্যমে। সেই সঙ্গে বড় বড় দাতারা নিজেদের স্বার্থেও তাদের পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু এই মানব সন্তানদের যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, তা কোনোভাবেই তাদের ধর্মের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সেখানে তাদের শিক্ষকেরা তাদের যে শিক্ষা দান করছেন, তা তাদের ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানকেও অস্বীকার করতে শেখায়। অর্থাৎ, এই ব্যবস্থায় তারা কেবল কিছু সংখ্যক কিতাব মুখস্থ করাটাকেই শিক্ষা বলে প্রচার করছেন। কিন্তু মুখস্থ করা আর জ্ঞান আহরণ করা যে এক জিনিস নয়, সে পার্থক্য করার ক্ষমতাটুকুও ঐ শিক্ষার্থীদের যেন অর্জিত না হয়, সেদিকেও ঐ মাদ্রাসার ধারকেরা সদা সচেষ্ট থাকেন। কারণ, তা না হলে তো আর তারা ওই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দাসসুলভ ব্যবহার করতে পারবেন না, আবার নিজেদের হীন স্বার্থ সিদ্ধির জন্যও এদের ব্যবহার করতে পারবেন না।

বিগত কয়েক দশক ধরে মাদ্রাসার ছাত্রদের ধর্ম রক্ষার নামে ধোঁকা দিয়ে শাসকশ্রেণীর হীন রাজনৈতিক পুতুল হিসেবে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ এ ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে উল্লেখ্য। কর্পোরেটদের যুদ্ধ, সামরিকায়ন ও এতদসংক্রান্ত রাজনীতিঅর্থনীতি এক্ষেত্রে ভীষণভাবে ক্রিয়াশীল। দেশেদেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে তাদের ক্ষমতা পোক্ত করাই এর মূল লক্ষ্য। এ নিয়ে বিশদ আলোচনা এখানে সম্ভব নয়; তবে আমরা যে এক নয়াঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় বাস করছি, তা হলো এক কঠিন বাস্তব।

উল্লেখ্য, ধর্মের নামে, পরকালের নামে যারা মাদ্রাসা শিক্ষার পক্ষে বড় বড় বুলি ছোড়েন, তাদের নিকটাত্মীয়, বা সন্তানদের কিন্তু সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে দেখা যায় না। তারা দেশবিদেশের নামীদামী স্কুলকলেজবিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। তারা তাদের বিলাসবহুল জীবনে এটা অনুভবও করতে অক্ষম যে, কী নিদারুণ ক্ষুধা নিয়ে কোনো মাদ্রাসার শিক্ষার্থী গ্রামের পর গ্রাম হেটে হেটে অনুদান সংগ্রহ করে থাকেন। আর তারাই মাদ্রাসার পক্ষে বুলি আওড়ান, সুবিধাবঞ্চিতদের দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করে। অথচ মাদ্রাসাশিক্ষার উন্নয়নে, তার ব্যবহারিক চর্চার ক্ষেত্রে কখনো তারা কোনো অবদান রাখেনি। আর এই প্রক্রিয়া সাম্রাজ্যবাদের পক্ষাবলম্বনেরই নামান্তর। বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থাকে একমুখী করা অসম্ভব নয়। তবে তা বাস্তবে রূপদান করা সম্ভব হবে তখনই, যখন কওমী মাদ্রাসায় পড়া হতদরিদ্র মানুষগুলোর জন্য শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে, যখন গণতান্ত্রিক শিক্ষানীতির প্রবর্তন সম্ভব হবে। তবে এই ব্যবস্থায় তা শাসকশ্রেণীর কোনো অংশই হতে দিবে না। কারণ, তাতে ওই সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা নিজেরাই নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়বে।

চার.

বাংলাদেশে প্রধানত ১৯৯০ পরবর্তী সময়ে কথিত সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকারের সময়কাল থেকেই উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের শুরু। এ সময়কাল থেকেই উদ্যোগ নেওয়া হতে থাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিমালিকানাধীনকরণের (প্রাইভেটাইজেশন)। ব্যক্তিমালিকানাধীন (প্রাইভেট) বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসার শুরুটাও এই সময়েই। শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কৃতিতে ইংলিশ মিডিয়াম নামক আগ্রাসনটাও এ সময়েই ছড়িয়ে পড়তে থাকে। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত, সর্বত্র প্রাইভেট শিক্ষাকেন্দ্রের প্রসার ঘটতে থাকে। শিক্ষা পরিণত হতে থাকে বাণিজ্যে।

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, আইডিবি, তথা দাতা সংস্থা ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহ বরাবরই অন্যান্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মতোই এখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ইউরোপআমেরিকার কর্পোরেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আদলে গড়ে তোলার উপদেশ দিয়ে যাচ্ছিল। উল্লেখ্য, ইউরোপআমেরিকায় ১৯৭০ এবং ১৯৮০এর দশকেই শিক্ষাব্যবস্থার কর্পোরেটকরণ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। ৯০ পরবর্তী সময়কালে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বেশকিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়। এসময়ে দেশে দেশে বিশ্বায়নের নামে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের অবাধ অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। আইন করে শিক্ষার পণ্যায়নকে নিশ্চিত করা হয়। সেই সঙ্গে এনজিও এবং কর্পোরেটদের স্বার্থে তাদের পোষ্য শিক্ষাবিদদের দ্বারা শিক্ষার কর্পোরেটকরণকে উন্নয়ন হিসেবে উপস্থাপন করা হতে থাকে। এ সময়ে শিক্ষার মান নিম্নগামী হতে থাকে আর বাড়তে থাকে ব্যক্তিমালিকানাধীন স্কুলকলেজের সংখ্যা। ১৯৯২ সালে যেখানে প্রায় ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী সরকারি মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজগুলোতে পড়তো, সেখানে ২০১০ সালে তা কমে গিয়ে ৬৫ শতাংশে দাঁড়ায়। প্রাথমিক স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে তা ৯২ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়ায় ৭০ শতাংশে। কথিত গণতান্ত্রিক শাসনের নামে নয়াঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় উচ্চশিক্ষা ও স্কুল স্তর দুই ক্ষেত্রেই শিক্ষার সার্বিকমান পূর্বের তুলনায় নিম্নগামী হলেও, বিত্তশালীদের জন্য তাদের মানদণ্ডে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে ব্যক্তিমালিকানাধীনকরণ, বা শিক্ষার পণ্যায়নের মাধ্যমে।

শাসকশ্রেণীর পক্ষ হতে যে বারবার বিভিন্ন মুখে আলোড়িত হচ্ছে উচ্চশিক্ষা সবার জন্য নয়; তা কিন্তু তাদের শোষণতন্ত্রেরই অংশ, তাদের শ্রেণীচরিত্রের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ মাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াটা এখন শ্রমিক বা কৃষক পরিবারের সন্তানের জন্য খুবই কষ্টসাধ্য। নিকট ভবিষ্যতে সেখানে মধ্যশ্রেণীর আগমনটুকুও তিরোহিত হতে যাচ্ছে। আর এ লক্ষ্যেই তাদের প্রক্রিয়াগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে মেধা কোনো বড় বিষয় নয়, যার অর্থ আছে, সেই কেবল শিক্ষা বা সার্টিফিকেট কেনার যোগ্য।

কোনো ব্যবস্থায় কোন বিষয়ে কতোজন শিক্ষার্থী স্নাতক বা স্নাতকোত্তর বা অন্য কোনো ডিগ্রী নিতে যাচ্ছেন, তাদের কর্মক্ষমতা কোন কোন ক্ষেত্রে কাজে লাগানো হবে, বা তাদের সবার কর্মসংস্থানের বিষয়টি কিভাবে সুরাহা করা হবে এর ওপরই নির্ভর করে জাতীয় উন্নতি, সক্ষমতা অর্জন এবং বেকারত্ব নিরসনের বিষয়টি। অথচ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সমন্বিত শিক্ষানীতি গড়ে ওঠেনি। কারণ, এর মূলে রয়েছে গণতান্ত্রিকতার প্রশ্ন, রাজনৈতিকতার প্রশ্ন। শিক্ষানীতির নামে যা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, তা হলো লুটপাটতন্ত্রের বৈধকরণ, শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নের নামে কর্পোরেট দালালী, যা এদেশের শাসকশ্রেণীর শ্রেণীগত অবস্থান। যেহেতু বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, তার অর্থনীতি নয়াঔপনিবেশিক; যেখানে ক্ষমতাসীন দালালবুর্জোয়াশ্রেণী এবং সামরিকবেসামরিক আমলাতন্ত্র ও তাদের লুণ্ঠনতন্ত্র। তাই শিক্ষাব্যবস্থাও অব্যবস্থাপনা, লুটপাট ও কর্পোরেটকরণের মধ্য দিয়েই এগিয়েছে।

এ ভূখণ্ডের জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এখানকার ছাত্র আন্দোলন। ৫২এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ৭১এর অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, ৮০র দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, অথবা ২০০৭এর ছাত্র আন্দোলন সকল জাতীয় আন্দোলনগুলোতেই ছাত্র সংগঠনগুলোর সরব উপস্থিতি এবং নেতৃত্ব সেই গর্বিত ইতিহাসের জানান দেয়। কিন্তু অতীতের মতো সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে ছাত্র আন্দোলনের যোগাযোগটা খুবই সামান্য। আর এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তা সাম্রাজ্যবাদী ক্রিয়াকৌশলেরই অংশ, যে উন্নয়নের তরিকা তারা এখানকার শাসকশ্রেণীর মাধ্যমে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

স্বায়ত্তশাসিত বলা হলেও ঢাকা, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনানুসারে তা কতোটা স্বায়ত্তশাসিত, এটি প্রশ্নবিদ্ধ। শিক্ষকদের প্রশাসনের কাছ থেকে খানিক মুক্তি মিললেও প্রশাসন পুরোপুরিই সরকারের কাছে জিম্মি। শর্তসাপেক্ষে ছাত্রদের অংশগ্রহণের যে সামান্য সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তাও এখন লুপ্ত, যেহেতু এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদে কয়েক যুগ যাবৎ নির্বাচনও হয় না। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন কর্তৃক ঘোষণা দিয়ে রাজনীতি নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। আর তাতে বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিটাই প্রসারিত হয়েছে আরেক দফা।

সব বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো আইন নিয়ে বিশ্লেষণ করাটা এই লেখায় সম্ভব নয়। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩এর কিছু কিছু বিষয় উল্লেখ করছি, যা থেকে সামগ্রিকভাবে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সম্পর্কেও ধারণা পেতে সহায়ক হতে পারে। এই আইনে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, সিনেট কর্তৃক প্রেরিত তিন জনের তালিকা থেকে চ্যান্সেলর ভিসি নিযুক্ত করবেন। সিনেট গঠিত হবে ভিসি, প্রোভিসি, ট্রেজারার, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত পাঁচ জন সরকারি কর্মকর্তা, স্পিকার কর্তৃক নির্ধারিত পাঁচ জন সংসদ সদস্য, চ্যান্সেলর কর্তৃক নির্ধারিত পাঁচ জন শিক্ষাবিদ, সিন্ডিকেট কর্তৃক নির্ধারিত গবেষণার কাজে জড়িত পাঁচ জন, একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক নির্ধারিত বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজসমূহের পাঁচজন অধ্যক্ষ, একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক নির্ধারিত বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজসমূহের দশজন শিক্ষক, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের নির্বাচিত পঁচিশজন স্নাতক, বিশ্ববিদ্যালয়ের পঁয়ত্রিশজন নির্বাচিত শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের পাঁচজন নির্বাচিত প্রতিনিধির সমন্বয়ে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের চলমান ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্ধারণ যেমন জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার মর্জির ওপর নির্ভরশীল, তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগের বিষয়টিও একইরূপে দলীয় ইচ্ছাধীন। সেই সঙ্গে যেখানে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টাও নিয়োগ কমিটির সদস্যদের দলীয় চেতনার অধীন, সেখানে এই বিষয়টা বোঝার বাকি থাকে না যে, নির্বাচিত শিক্ষকদের মান কোন পর্যায়ের। এখানকার শিক্ষকরাও পুরোদস্তুর শাসকশ্রেণীর দলগুলোর মাঝেই সমাহিত। শিক্ষকদের খুবই ক্ষুদ্র একটা অংশই বর্তমানে এই শাসকশ্রেণীর দালালী, বা কর্পোরেটকরণের বাইরে রয়েছেন যে সংখ্যালঘু অংশটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাবরই কোণঠাসা। বছরের পর বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ, কিন্তু তাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাফাই গাওয়ার সীমা নাই, তারা সর্বদাই বিরাজনীতিকরণের পক্ষে হাজারটা উদাহরণ দেখান, কিন্তু নিজেরা নগ্নভাবে দলীয় ও কর্পোরেট দালালী করে বেড়ান সর্বত্র। তারা বিশ্ববিদ্যালয় বলতে বোঝেন ও বোঝান এক দালাল তৈরির মেশিন। সিন্ডিকেট বা একাডেমিক কাউন্সিলের গঠনটুকুও একইরূপে অগণতান্ত্রিক, আমলাতান্ত্রিক। উল্লেখ্য, সিনেট হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সভা, সিন্ডিকেট হলো নির্বাহী কমিটি আর একাডেমিক কাউন্সিল হলো অধ্যয়ন বিষয়ক কমিটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রতিষ্ঠানগুলো সেই আমলাতন্ত্রেরই অংশ। এটি কি করে স্বায়ত্তশাসন হতে পারে, তা অন্তত আমার বোধগম্য হয় না। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই আমলারা যে তাদের কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের সেবায় নিযুক্ত থাকবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। যা তারা করছে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, বিরাজনীতিকরণ, আর কর্পোরেটকরণের মাধ্যমে।

সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে, ১৯৭৩ সালের উক্ত আইনটিও বাতিল করে আরও কর্পোরেটবান্ধব আইন করা হবে! অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা এর থেকেও শোচনীয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির কথাটা মুখে আনাটাও গর্হিত অপরাধ। ছাত্র আন্দোলন বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সদাপ্রস্তুত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ পোষা হচ্ছে স্থায়ীভাবে, সেই সঙ্গে রয়েছে প্রশাসনের পোষ্য সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের গুণ্ডাবাহিনী। গণমুখী রাজনীতিকে এদের যতো ভয়; যে কারণে তা বন্ধে তারা চালিয়ে যাচ্ছে বিরাজনীতিকরণের রাজনীতি। আর এর পক্ষে সাফাই গাওয়ার সময় বলা হয় শাসকশ্রেণীর ছাত্র সংগঠনগুলো কর্তৃক হানাহানির কথা। যদিও যে সরকারি দলের ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের দখলে রেখে অব্যবস্থা, ছাত্র নিপীড়ন, নারী নির্যাতনের সাম্রাজ্য কায়েম করে; তারা আবার আশ্রয়প্রশ্রয় পায় কিন্তু ওই কথিত প্রগতিশীল শিক্ষকদের কাছ থেকেই, যারা ওই সরকারি দল দ্বারা পরিচালিত, পরিবেশিত।

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৯২এর দ্বারা উচ্চশিক্ষার বাণিজ্য এদেশে প্রাতিষ্ঠানিক খুঁটি লাভ করে। পরবর্তীতে, ২০১০ সালে পূর্বের আইন রহিত ঘোষণা করে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুমোদিত হয়। বেসরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার এই আইনে সিনেট গঠনের কোনো বিধান রাখা হয়নি। তাতে বলা হয়েছে, সিন্ডিকেট বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী কমিটির হাতেই থাকবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার মূল ক্ষমতা। এর ওপর থাকবে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ, যার কাজ হলো অর্থনৈতিক ও নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়াদি তদারকি করা, অর্থাৎ এরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লভ্যাংশভোগী, বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিককুল। সিন্ডিকেট গঠিত হবে ভাইসচ্যান্সেলর, যিনি তার সভাপতি হবেন, প্রোভাইস চ্যান্সেলর, ট্রেজারার, ভাইসচ্যান্সেলর কর্তৃক মনোনীত একাডেমিক কাউন্সিলের একজন সদস্য, একজন ডীন ও একজন বিভাগীয় প্রধান, সরকার কর্তৃক মনোনীত একজন শিক্ষাবিদ, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ কর্তৃক মনোনীত তার একজন সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক মনোনীত একজন প্রতিনিধি, রেজিস্ট্রার, যিনি সিন্ডিকেটের সচিবও হবেন। অর্থাৎ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর গঠন প্রক্রিয়ার দিকে তাকালেই দেখা যায় এটি মূলত আমলামুৎসুদ্দি পুঁজিপতিদের কমিটি ভিন্ন কিছু নয়। যাতে শিক্ষকশিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের ন্যূনতম সুযোগটুকুও নাই। সেই সঙ্গে একটা জোরদার প্রচারণা শুনতে পাওয়া যায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস নাকি অরাজনৈতিক, বা এখানে রাজনীতি নিষিদ্ধ, বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধিতেও তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যা বিরাজনীতিকরণের সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির দালালী ভিন্ন কিছু নয়।

শিক্ষার্থীদের ফি সম্পর্কে উক্ত আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় উহার প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করিবার নিমিত্তে শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার মানদণ্ডে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি শিক্ষার্থী ফি কাঠামো প্রস্তুত করিয়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অনুমোদন গ্রহণ করিবে। প্রশ্ন হলো ওই আইনপ্রণেতাদের মতে আর্থসামাজিক অবস্থার মানদণ্ডে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষার্থী ফি কতো হতে পারে, যেখানে এখনও দেশের ৫০ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমা বা তার নিচে বাস করে? চার মাসের এক সেমিস্টারে কতোজনের পক্ষে পঞ্চাশ হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকা খরচ করা সম্ভব? এই ফিকে যদি বলা হয় আর্থসামাজিক অবস্থার মানদণ্ডে নির্ধারিত, তা কতোটা যৌক্তিক, সে বিচারের দায়িত্ব আপনাদের ওপরেই ন্যাস্ত থাকলো। বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যাচ্ছেতাইভাবে শিক্ষার্থীদের অনেকটা জিম্মি করেই সেখানে ফি বাড়ানো হয়ে থাকে, আর তাতে নাজেহাল হচ্ছে শিক্ষার্থী ও তার পরিবার। আর অবাধ লুটের সুযোগ দিয়ে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।

বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরই এখনও নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই। ভাড়া করা বাসাবাড়িতে চলে তাদের শিক্ষার বাণিজ্য। আর যাদের নিজস্ব ক্যাম্পাস আছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেই ক্যাম্পাসও কতোটা বিশ্ববিদ্যালয় বলার যোগ্য, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। সেই ক্যাম্পাসে নাগরিক অনেক সুযোগসুবিধা থাকলেও, তাতে নেই কোনো খোলা মাঠ, নেই মানবিক বিকাশের অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ। এক যান্ত্রিক পরিবেশে ইটপাথরের খাঁচায় পুরে কর্পোরেট বুলি শেখানোর নাম কী করে বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে??

টিআইবির গবেষণায় বলা হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী প্রায় ২৯.৬ শতাংশ, শিক্ষাবিদ ২২.৫ শতাংশ এবং রাজনীতিবিদ ৮.৫ শতাংশ। তবে টিআইবি এই বিষয়টা এড়িয়ে গেছে যে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সকলেই কিন্তু শিল্পপতিতে পরিণত হয়েছেন। এছাড়া ভিসি, প্রোভিসি, ট্রেজারার নিয়োগসহ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বিষয় ও অনুষদ অনুমোদনের বিভিন্ন পর্যায়ে অবৈধ লেনদেন এবং কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থের বিনিময়ে ভুয়া সার্টিফিকেট প্রাপ্তির কথা টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদেশের দালালবুর্জোয়াদের ব্যবসাবাণিজ্যে যেমন হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির কথা আমরা শুনে থাকি, আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করাটাও যেহেতু তাদের বাণিজ্যেরই অংশ; তাই এখানে খুব স্বাভাবিক নিয়মেই দুর্নীতিঅনিয়ম থাকবে।

ভোগান্তি আর বিভ্রান্তি কমাতে অনেককে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিংএর কথা বলতে শোনা যায়। হ্যাঁ, তাতে হয়তো ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরই এখনও নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই। ভাড়া করা বাসাবাড়িতে চলে তাদের শিক্ষার বাণিজ্য। আর যাদের নিজস্ব ক্যাম্পাস আছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সেই ক্যাম্পাসও কতোটা বিশ্ববিদ্যালয় বলার যোগ্য, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। সেই ক্যাম্পাসে নাগরিক অনেক সুযোগসুবিধা থাকলেও, তাতে নেই কোনো খোলা মাঠ, নেই মানবিক বিকাশের অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ। এক যান্ত্রিক পরিবেশে ইটপাথরের খাঁচায় পুরে কর্পোরেট বুলি শেখানোর নাম কী করে বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে??

টিআইবির গবেষণায় বলা হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী প্রায় ২৯.৬ শতাংশ, শিক্ষাবিদ ২২.৫ শতাংশ এবং রাজনীতিবিদ ৮.৫ শতাংশ। তবে টিআইবি এই বিষয়টা এড়িয়ে গেছে যে, এই বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সকলেই কিন্তু শিল্পপতিতে পরিণত হয়েছেন। এছাড়া ভিসি, প্রোভিসি, ট্রেজারার নিয়োগসহ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বিষয় ও অনুষদ অনুমোদনের বিভিন্ন পর্যায়ে অবৈধ লেনদেন এবং কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থের বিনিময়ে ভুয়া সার্টিফিকেট প্রাপ্তির কথা টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদেশের দালালবুর্জোয়াদের ব্যবসাবাণিজ্যে যেমন হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির কথা আমরা শুনে থাকি, আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করাটাও যেহেতু তাদের বাণিজ্যেরই অংশ; তাই এখানে খুব স্বাভাবিক নিয়মেই দুর্নীতিঅনিয়ম থাকবে।

ভোগান্তি আর বিভ্রান্তি কমাতে অনেককে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিংএর কথা বলতে শোনা যায়। হ্যাঁ, তাতে হয়তো ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি খানিক কমবে; কিন্তু এর মাধ্যমে শিক্ষার মান নয়, বরং যাচাই হবে কোন বিশ্ববিদ্যালয় কতোটা ব্যবসা সফল, আর তাতে কতো ভালোভাবে কর্পোরেট শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে, আর তাতে কতো মানসম্পন্ন কর্পোরেট দাস উৎপাদন হচ্ছে। আর এর মানদণ্ডটুকুও প্রদান করবে কর্পোরেশন, এনজিও আর বিশ্বব্যাংক।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৯ দফা নির্দেশনা প্রদান করেন। এতেও শিক্ষার কর্পোরেটকরণের বিষয়টিই ছিল মুখ্য। নির্দেশনাগুলো হলো ) প্রত্যেক জেলায় বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন; ) প্রযুক্তি, বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণার ওপর গুরুত্ব প্রদান; ) রাঙ্গামাটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন ও পার্বত্য অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের নকশা প্রকৃতিবান্ধব করা; ) বিদেশে চাকরির সুযোগ রয়েছে এমন শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর জোর দেয়া ও ক্যাটারিংয়ের ওপর উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম গ্রহণ; ) জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন সরকারি কলেজগুলোকে সংশ্লিষ্ট এলাকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অধিভুক্ত করা; ) টেলিভিশনে মানসম্পন্ন ক্লাস সম্প্রচার কার্যক্রম বৃদ্ধি; ) চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন; ) ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ঢাকায় বা আশপাশে জমি পাওয়া না গেলে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে মাওয়ার দিকে জমি ক্রয় ও অসুস্থতার কারণে বর্তমান ভিসিকে বাদ দিয়ে আরেকজন নতুন ভিসি নিয়োগ এবং ৯) সমুদ্র সম্পদের ওপরজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম নিয়ে কিছু কথা বলাটা অতীব জরুরী। যেখানে শিক্ষার্থীসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের বড় ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রয়েছে। দেশের উচ্চশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশেষ গুরুত্ববহ। ১৯৯২ সালে অ্যাফিলিয়েটিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইংল্যান্ডের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশেষ গুরুত্ববহ। ১৯৯২ সালে অ্যাফিলিয়েটিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইংল্যান্ডের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গঠিত হলেও তা কখনোই প্রশাসনের লুটপাট, অনিয়ম, দুর্নীতি, সেশনজট, শিক্ষার নিম্নমানের বাইরে অবস্থান করেনি। উল্লেখ্য, ১৮৩৬ সালে গঠিত লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজসংখ্যা ১৯টি। প্রতিটি কলেজ নিজস্ব স্বায়ত্তশাসনে পরিচালিত, শিক্ষার্থীসংখ্যা এক লাখ ২০ হাজার। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির আরও ১০টি বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রায় ২ হাজার ৭০০ কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি কলেজ রয়েছে ২৭৯টি। এসব কলেজে ১৫ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী শিক্ষাগ্রহণ করছে। এতোসংখ্যক শিক্ষার্থীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। যথাসময়ে পরীক্ষা নিতে পারছে না। আবার পরীক্ষা নেওয়ার পর যথাসময়ে পরীক্ষার ফল প্রকাশ করতেও পারছে না গাজীপুরে অবস্থিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে সেশনজটে বয়স পার হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে সেশনজটের ভয়াবহতা এতটাই জটিল যে, প্রতি শিক্ষাবর্ষেই ২ বছরের বেশি সেশনজট। সেশনজটের কারণে ৪ বছরের স্নাতক ও ১ বছরের স্নাতকোত্তর শেষ করতে তাদের লাগছে ৮ বছরেরও বেশি। এতে শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছেন। অথচ দেশের স্নাতক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর ৪৮ শতাংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোয় পড়াশোনা করছেন।

শুরু থেকেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিবিধ সমস্যায় আবদ্ধ থেকেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সরকারি কলেজগুলো পরিচালনা নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ দেয় সংস্থাপন মন্ত্রণালয়। শিক্ষকদের বেতন দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এদের বদলি, পদোন্নতি পদায়ন, পুরস্কারতিরস্কারও করে এই মন্ত্রণালয়। কিন্তু এসব কলেজের শিক্ষাক্রম ও পাঠক্রম প্রণয়ন করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কলেজগুলোর সার্বিক কার্যক্রম একই স্থান থেকে পরিচালিত না হওয়ায় এক ধরনের জগাখিচুড়ি অবস্থা বিরাজ করছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র আড়াই মাসের মাথায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। এ লক্ষ্যে ওই বছরের ২৫ মার্চ একটি কমিটি গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলামকে প্রধান করে ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন ও কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেশ করতে বলা হয়। কিন্তু কমিটি ৪ মাস পর রিপোর্ট পেশ করে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে না দিয়ে ছয়টি আঞ্চলিক কেন্দ্রের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনাসহ মোট ১৬ দফা সুপারিশ করা হয়। ওই সব সুপারিশের আলোকেই পরে কোটি কোটি টাকা গচ্চা দিয়ে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে আঞ্চলিক কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু যে সেশনজট খুলতে এতো খরচা, তাতে কোনো প্রকার ভাটা পড়েনি আজও। যা হয়েছে ও হচ্ছে, তা হলো কোটি কোটি টাকার শ্রাদ্ধ।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমের সার্বিক অবস্থার মান চরম উদ্বেগজনক। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য কলেজগুলোর একাডেমিক মনিটরিং প্রয়োজন বলে মনে করে ইউজিসি। উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমের সার্বিক অবস্থায় ইউজিসির উদ্বেগের কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ কলেজে একাদশ শ্রেণী থেকে মাস্টার্স পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কেবল স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কারিকুলাম প্রণয়ন এবং পরীক্ষার ব্যবস্থা করে। এ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ, এক কলেজ থেকে অন্য কলেজে পোস্টিং অর্থাৎ বদলিসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ভূমিকা নেই। এর ফলে শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

উল্লেখ্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে নিজস্ব আয় থেকে। ছাত্র ভর্তি থেকে শুরু করে ডিগ্রি প্রদান পর্যন্ত সব কার্যক্রমের জন্য নির্ধারিত হারে ফি আদায় করা হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩১৪ অর্থবছরের বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে, আয় ১২৮ কোটি ৩৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকা এবং ব্যয় ১২৩ কোটি ৪৯ লাখ ৯১ হাজার টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজার্ভ ফান্ডে রয়েছে, ৭০০ কোটি টাকারও বেশি। এ ফান্ড থেকেও প্রতি অর্থবছরে বিপুল আয় হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের। ফলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ব্যয়ের চেয়ে আয়ের পরিমাণ বেশি হওয়ায় ১৯৯৭৯৮ অর্থবছর থেকে কমিশন অনুন্নয়ন খাতে কোনো অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় না। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ্রেণীর কর্মকর্তা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে নানারকম অনিয়ম, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

এদিকে, নতুন সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অধিভুক্ত সরকারি কলেজগুলো বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে যাবে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এ জন্য সারা দেশে ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

সূত্রমতে, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজসহ ঢাকার কলেজগুলো যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। বরিশাল বিএম কলেজসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর কলেজ যাবে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। এভাবে সংশ্লিষ্ট জেলা ও বিভাগের কলেজগুলো পার্শ্ববর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যাবে।

সেশনজটের ছুঁতোয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে ভেঙে তার অধিভুক্ত কলেজগুলোকে নিকটস্থ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার মানে হলো, ওই পাবলিক নামের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাস পরিবর্ধনমাত্র। যেখানে পড়তে শিক্ষার্থীদের গুণতে হবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি অর্থ। অর্থাৎ, ধুমসে চলবে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, কর্পোরেটকরণ। তা এখন শহর ছাপিয়ে গ্রামেও হানা দিবে। আর দালালেরা গলা চড়িয়ে বলবে উচ্চশিক্ষা সবার জন্য নয়

প্রতিজেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কর্পোরেটবান্ধব সরকারের স্ট্যান্টবাজী চলছে, অথচ দেশব্যাপী বিস্তৃত কলেজগুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের আওতায় এনে গণতান্ত্রিক প্রশাসন স্থাপনটাই হতে পারতো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাসমূহের প্রকৃষ্ট সমাধান। এতে সেশনজট নিরসন হতো, সঙ্গে সব শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। সমাজের চাহিদা উপযোগী গতিশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে গণতান্ত্রিক আঙ্গিকে ঢেলে সাজানো ছাড়া সমস্যাসঙ্কুল অবস্থা থেকে পরিত্রাণের অন্য কোনো উপায় বা পথ খোলা নেই।

পাঁচ.

বর্তমানে এ দেশের উচ্চশিক্ষা যেদিকে এগুচ্ছে, তাতে পাবলিক আর প্রাইভেট বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্য প্রায় শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার কর্পোরেটকরণ চরমভাবেই সফল হয়েছে! এটাকে আবার উন্নতি হিসেবে জাহিরও করা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। তারা যুক্তি দেখান যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নাকি কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে! অর্থাৎ, যারা বিদেশে পড়তে যেতে পারতেন, তারা নাকি এখন দেশেই ওই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ছেন। এটা এক নির্জলা ভাওতাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রতি বছর যে হাজারে হাজারে শিক্ষার্থীরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, তারা তাহলে এখানে পড়ছে না কেন? মূল কথা হলো পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে ও হচ্ছে, যেন শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ শতভাগ সফল হতে পারে। এসএসসি, এইচএসসিতে শিক্ষার্থীদের গণহারে পাশ করানোটা কেবল সরকারের বাহবা কামানোর জন্য হয়নি। এর পেছনের কারণটা হলো শিক্ষার পণ্যায়ন। এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় পাশ করার পর কোনো শিক্ষার্থী কলেজে না পড়ে তো থাকতে পারে না! সরকারি কলেজের সিট সংখ্যা সীমিত, তাই চাপ পড়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন বা বেসরকারি কলেজে। অখ্যাত কলেজেও এখন আর শিক্ষার্থীরূপী ক্লায়েন্টের অভাব হয় না। একই ঘটনা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এইচএসসিতে গণপাশের পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বা মেডিক্যাল কলেজগুলোতে সুযোগ না পাওয়ারাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লায়েন্ট। এই ব্যবসা আরও বিকশিত করার জন্য দ্বিতীয়বার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগটুকুও উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেই সঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ভর্তুকি উঠিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত ফি চাপানো হচ্ছে। এসবই করা হচ্ছে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাটাকে ব্যক্তিমালিকানাধীনকরণ, কর্পোরেটকরণ করার নিমিত্তে। উল্লেখ্য, আমার এই বক্তব্যের মানে এই নয় যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কম জানে, বা তাদের মেধা কম। বরং এই বক্তব্যের মানে হলো, প্রাইভেট বা পাবলিক, উভয় বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, বিরাজনীতিকরণের ফলে শিক্ষার্থীরা সেটাই শিখছেন; যা তাদের শেখানোর জন্য আদেশ দিয়ে রেখেছে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদীরা। আর কর্পোরেট দাস তৈরির এই কারখানাগুলো চালানোর জন্য তারা উল্টো বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হচ্ছে। এ এমন এক ব্যবস্থা যেখানে কর্পোরেট দাস হওয়ার জন্য ক্লায়েন্টরা কর্পোরেট শিক্ষা খরিদ করে থাকে!

২০০৬ সালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন শিক্ষার্থী ছিল ৫৫.২২ শতাংশ এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ৪৪.৭৪ শতাংশ। কিন্তু ২০১২ সালে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তা কমে ৩৮.৫৩ শতাংশে দাড়ালেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তা বেড়ে ৬১.৪৬ শতাংশে দাড়িয়েছে। ২০১২ সালের তথ্যানুযায়ী, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩,১৪,৬৪০ জন। (উল্লিখিত পরিসংখ্যানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।) টিআইবি গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক বিষয়েই শিক্ষা প্রদান করা হয়। মৌলিক বিষয়, যেমন পর্দাথ, রসায়ন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান বা হিসাববিজ্ঞানের মতো বিষয়ে পড়ার সুযোগ সেখানে নেই। বিভাগ ও অনুষদ অনুযায়ী শিক্ষার্থীর হার (২০১২) পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যবসায় প্রশাসনে ৪২.৩৩ শতাংশ, চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি বিজ্ঞান ও ফার্মেসিতে ৩৩.৭৭ শতাংশ এবং কলা, সামাজিক বিজ্ঞান, শিক্ষা ও আইনে মাত্র ২৩.৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। ৭৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটিতেও এমফিল ও পিএইচডি করার কোনো সুযোগ নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেমন গবেষণাকার্যে বরাদ্দ ভীষণভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, ঠিক তেমনি বেসরকারি বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও গবেষণাকার্যে বরাদ্দ প্রায় শূন্যের কোঠায়। নয়াঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় গবেষণার কাজটাও হতে হবে কর্পোরেট স্বার্থে, নতুবা সেই গবেষণায় কোনো সহযোগিতা দেওয়া হবে না, আর সেই গবেষণা সফল হলেও তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না। ২০০৬ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার জন্য কৌশলপত্র (২০০৬২০২৬) হলো এই বাণিজ্যিকীকরণের নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্র। এই কৌশলপত্রের আলোকেই নির্ধারিত হচ্ছে উচ্চশিক্ষার মানদণ্ড।

কৌশলপত্র অনুযায়ী, আগামী ২০২৬ সালের মধ্যে সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে বলা হয়েছে। শিক্ষাখাতে আকস্মিকভাবে সব ভর্তুকি না উঠিয়ে ধাপে ধাপে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে; হঠাৎ করে ভর্তুকি বন্ধ করে দিলে তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া হতে পারে। আর যদিও একে ভর্তুকি বলা হচ্ছে, অথচ তা কিন্তু রাষ্ট্রের বিনিয়োগ; যেখানে রাষ্ট্র উৎপাদনক্ষম নাগরিক হয়ে ওঠার জন্য তা বিনিয়োগ করে। আবার যে অর্থ ভর্তুকির নামে মানব সম্পদ উন্নয়নে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাও কিন্তু এই জনগণেরই অর্থ।

কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব সম্পদ/সম্পত্তি নিজেরাই তৈরি করতে হবে।...” পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় প্রাথমিক পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ৫০ শতাংশ হ্রাস করা হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে বাকি ৫০ শতাংশ খরচ বহন করতে হবে। পরবর্তীতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পুরোপুরি নিজস্ব অর্থায়নেই চলতে হবে। টিউশন ফি এবং অন্যান্য ফি বাবদ আয় এবং বিল্ডিং, ভূমি, ক্যাফেটেরিয়া, দোকান ইজারা দান/ভাড়া প্রদান এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কনসালটেন্সি, গ্র্যাজুয়েট ট্যাক্স, ছাত্রবীমা, সান্ধ্যকালীন কোর্স এবং অ্যালামনাই এসোসিয়েশন থেকেই এই অভ্যন্তরীণ ফান্ড তৈরি হবে। এরই ফলশ্রুতিতে, টিউশন ফি এবং অন্যান্য ফি ব্যাপকহারে বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং হচ্ছে। অ্যালামনাই এসোসিয়েশন পরিণত হয়েছে ব্যবসায়িক ক্লাবে। শিক্ষানীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রেও এই কৌশলপত্রকেই ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। কৌশলপত্রে অনেকগুলো নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে যেখানে সরকার অবকাঠামো তৈরি করবে কিন্তু অভ্যন্তরীণ আয় দিয়েই এসব প্রতিষ্ঠান চলবে। অর্থাৎ, সরকারি তত্ত্বাবধানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবনাটাও সেখানে তিরোহিত।

কৌশলপত্রের প্রস্তাব অনুসারে, ইতোমধ্যেই দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমবর্ধমান হারে বেতন ফি বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চবেতনে সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা পরিণত হচ্ছে উচ্চমূল্যের পণ্যে। আর এই পণ্য কেবল বিত্তশালীরাই কিনতে সক্ষম। তা সমাজের সাধারণ মেহনতি মানুষের কাছে থেকে যাচ্ছে অধরা। যার ফলে মেধাসম্পন্ন অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, যদি উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে দেশীয় এবং বিদেশী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানার চাহিদা অনুযায়ী গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা না যায় তাহলে উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্যই পূরণ হবে না। অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেটদের বাজার অর্থনীতির ধারণা ও চাহিদামাফিক নির্ধারিত হতে হবে শিক্ষাব্যবস্থা। কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিক ও বিজ্ঞান শাখা থেকে বের হওয়া স্নাতকের বর্তমান চাকরির বাজারে ও বাস্তব জীবনে তেমন কোনো মূল্য নেই; তথ্য ও প্রযুক্তিবিদ্যা, ব্যবসা ও শিল্প বিষয়ে উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে গেছে। কিন্তু এই নতুন শিক্ষা খাতের তুলনায় মানবিক শাখার কোনো ভবিষ্যতই নেই। কৌশলপত্রে মৌলিক বিজ্ঞান, কৃষি, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শনের মত আবশ্যক বিষয়গুলোকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং কর্পোরেট ও এনজিওদের চাহিদামাফিক বাজারকেন্দ্রিক বিষয়গুলোকে উচ্চশিক্ষায় নিরঙ্কুশ গুরুত্বদান করা হয়েছে।

অপরদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, আইসিটি, শান্তি ও সংঘর্ষ, পপুলেশন সায়েন্সেস, টেলিভিশন এন্ড ফিল্ম স্টাডিজ, ট্যুরিজম এন্ড হোটেল ম্যানেজমেন্ট, এমবিএ সহ কর্পোরেট ও এনজিওদের চাহিদা অনুযায়ী বিষয়গুলোকে অত্যধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, মৌলিক বিজ্ঞান পড়ার দরকার নেই, কারণ যা কিছু আবিষ্কার করতে হয়, তা হতে হবে কর্পোরেটদের স্বার্থে, তাদের চাহিদানুসারে, তাদের নির্দেশে। তাদের ব্যাপকহারে কর্পোরেট করণিক আবশ্যক, তাই তাদের চাহিদানুযায়ী তৈরি হতে হবে পাঠক্রম। এখানে মৌলিক চিন্তাচেতনার কোনো স্থান নাই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক জ্ঞান উৎপাদন অথবা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনী গবেষণার বিষয়টি ক্রমশ দূরীভুত হচ্ছে।

এ কৌশলপত্রে শিক্ষার্থীদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্বক্ষণিক পুলিশ রাখার কথা বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের সুপারিশ করা হয়েছে। এই বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিটা হলো কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম হাতিয়ার। আর এ ক্ষেত্রে তারা কিছু কথিত সুশীল শিক্ষকদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। তারা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু কর্পোরেটদের স্বার্থে মানবতার লেবাস ধরে থাকেন।

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও কর্পোরেটসমূহ বাংলাদেশের মতো নয়াঔপনিবেশিক দেশগুলোর সেবাখাতকে সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিমালিকানাধীনকরণ বা বাণিজ্যিকীকরণ করতে চাইছে। যেখানে তারা তাদের ইচ্ছানুযায়ী দক্ষ শ্রমিক পেতে পারে। যে শ্রমিক আবার এসি রুমে বসে নিজে এটাও উপলব্ধি করবে না যে, তিনি নিজেও একজন মানসিক শ্রমিক! নিজেকে মালিকশ্রেণীর অন্তর্গত ভেবে তারা ক্রমাগত কর্পোরেশনের পক্ষে সাফাই গাইতে থাকে।

প্রথম থেকেই এই কৌশলপত্র ও বাণিজ্যিকীকরণের বিরোধিতা করে আসছে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো। বিভিন্ন সময়ে তারা ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বও দিয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে দেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে। তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে না পারা সত্ত্বেও এই আন্দোলন বিশেষ গুরুত্ববহ। এই আন্দোলনগুলোর মাঝে বিশেষভাবে উল্লেখ্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন। এই তিন বিশ্ববিদ্যালয়েই ব্যাপকভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে সামিল হন। তারা সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের সন্ত্রাসী এবং পুলিশ কর্তৃক হামলার শিকার হন। কিন্তু তা সত্ত্বেও আন্দোলন চলমান থাকে। এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। আর সেই সঙ্গে প্রশাসনসরকারের কথিত আশ্বাসের নামে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে এটাই যেন এসময়ের ছাত্র আন্দোলনের অবধারিত নিয়তি!

ছয়.

এক সময় ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষকদের একটা বড় অংশ যুক্ত হতে দেখা যেত। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর থেকে কথিত বিশ্বায়নের নামে কর্পোরেটদের অবাধ আগমন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে এখন শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই শিক্ষক কোন চিন্তাধারার ধারক, তার ওপর। সেই সঙ্গে এই শিক্ষকরাও কিন্তু এই নয়াউপনিবেশবাদী ব্যবস্থাতেই বেড়ে উঠেছেন, অনেকে আবার এক সময়কার প্রগতিশীলতা ঝেড়ে ফেলে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েছেন। আর তাদের চিন্তাকাঠামোটিও কিন্তু সেভাবেই গড়ে ওঠেছে। যে কারণে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনগুলোতে নগণ্য সংখ্যক শিক্ষককেই শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে।

দীর্ঘদিন যাবৎ স্বৈরশাসন, দলীয়করণের ফলে শিক্ষকদের মান ক্রমান্বয়ে নিম্নগামী। মেরুদণ্ডহীন দলীয় লেজুড় শিক্ষকদের আধিক্যে শিক্ষার মান তলানিতে এসে ঠেকেছে। এ থেকে উন্নয়নের নামে যে প্রক্রিয়া সামনে আনা হয়েছে, তা হলো Higher Education Quality Enhancement Project (HEQEP) বা উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প। যার মানে, শিক্ষকরা এখন আর শিক্ষক থাকবেন না, তাদের এখন সূচারূ পাঠদানকারী হিসেবে আবির্ভূত হতে হবে। অর্থাৎ, কর্পোরেট আর এনজিওগুলো যেসব বিষয় পড়াতে বলবে, শিক্ষকদের কাজ হবে সেই সিলেবাস শিক্ষার্থীদের গলাধকরণ করানো। অর্থাৎ, শিক্ষকরা হবেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাস্টমার ম্যানেজার আর শিক্ষার্থীরা ভ্যাল্যুয়েবল ক্লায়েন্টস

HEQEP ওয়েবসাইট থেকেই জানা যায় যে, “Higher Education Quality Enhancement Project (HEQEP) বা উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প হলো বিশ্বয়ায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের একটি প্রকল্প। এই প্রকল্পের এক দলিলে বিশ্ববিদ্যালয়কে শিল্প হিসেবে দেখিয়ে তাতে বিনিয়োগের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রকল্পের অধীন শিক্ষকদের কর্পোরেট পাঠদান কর্মসূচি পরিচালিত হবে।

বিশ্বায়ন, সাম্রাজ্যবাদ ও কর্পোরেশনের সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। সাম্রাজ্যবাদের প্রাথমিক পর্যায়েই পুঁজির বিশ্বায়ন এবং কর্পোরেশনের বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই উপস্থিত ছিল। কিন্তু তার বিকশিত চরিত্র লক্ষ্য করা গেছে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে, অর্থাৎ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের মাঝে।

পুঁজি তার নিজ নিয়মেই প্রতিনিয়ত বিস্তৃত হতে চায়। তার স্বাভাবিক প্রবণতা হলো বিনিয়োগ এবং পুনর্বিনিয়োগ। আর এ ক্ষেত্রে পুঁজি ও উৎপাদনের উচ্চমাত্রার ঘনীভবন ও কেন্দ্রীভবনের ফলে তার পক্ষে আর জাতীয় পরিকাঠামোয় আবদ্ধ থাকা সম্ভব হয় না। ফলে, পুঁজিবাদী দেশগুলোতে বৃহৎ একচেটিয়া পুঁজিপতিদের আবির্ভাব ঘটে। তাদের হাতে থাকা বিশাল উদ্বৃত্ত পুঁজি তারা বহির্বিশ্বে বিনিয়োগের জন্য ব্যবহার করে। উপনিবেশ, আধাউপনিবেশ, নয়াউপনিবেশগুলোতে তারা তা বিনিয়োগ করে। কিন্তু তাতে আশানুরূপ ফলাফল লাভ হয়নি, কারণ সেসব দেশের সামন্ততান্ত্রিক বা অপুঁজিবাদী সমাজ কাঠামোর কারণে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ছিল না। ফলে দরকার হয় সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির বিকাশের অনুকূল পরিস্থিতি নির্মাণের। অর্থাৎ, এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যাতে উপনিবেশ, আধাউপনিবেশ বা নয়াউপনিবেশগুলোর জনগণ সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির সঙ্গে তাল মেলাতে সক্ষম হয়, আবার নিজেদের জাতীয় পুঁজির বিকাশ না ঘটাতে পারে। পুঁজির বিশ্বায়ন হলো সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির বৈশ্বিক আগ্রাসন। পুঁজিবাদের বিশ্বায়নের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো উৎপাদনের আন্তর্জাতিকীকরণ। এরই ফলশ্রুতিতে, গড়ে উঠেছে বিবিধ কর্পোরেশন, ব্যাংক, অর্থনৈতিক সংস্থা।

কমরেড লেনিন সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় গ্রন্থে বলেন, সাম্রাজ্যবাদ হলো পুঁজিবাদের বিকাশের সর্বোচ্চ পর্যায়; আর বিংশ শতকেই পুঁজিবাদ এখানে পৌঁছেছে। যে সকল জাতীয় রাষ্ট্রগুলির গঠন ছাড়া সামন্তবাদকে ছুঁড়ে ফেলা সম্ভব ছিল না, সেই পুরনো রাষ্ট্রীয় সীমাগুলিই এখন পুঁজিবাদের বিকাশের পক্ষে সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। পুঁজিবাদ পুঁজির কেন্দ্রীভবনকে এমন এক মাত্রায় নিয়ে গেছে যে, শিল্পের এক একটা সমগ্র শাখাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ধনকুবের পুঁজিপতিদের দ্বারা গঠিত সিন্ডিকেট, ট্রাস্ট ও সমিতিগুলোর দ্বারা এবং কোথাও উপনিবেশরূপে, কোথাও অন্য দেশগুলোকে লগ্নিপুঁজির হাজারো বন্ধনের দ্বারা শৃংখলিত করে, প্রায় সমস্ত দুনিয়াটাই ভাগ হয়ে গেছে পুঁজির প্রভুদের মধ্যে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বলতে আমরা আদতে যা বুঝি, বর্তমানে তা কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ ভিন্ন কিছু নয়। আমেরিকার গণতন্ত্র সম্পর্কে অনেক মিথও চালু রয়েছে। আসলেই তা মিথ, কারণ বাস্তবতা ভিন্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল প্রজাতন্ত্র (Republic) হিসেবে, সেখানে মার্কিন জনগণের হাতে ক্ষমতা ছিল নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা শাসিত হওয়ার। সাধারণ জনগণের গণতন্ত্র (Democracy) সেখানে গড়ে ওঠেনি, তবে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের উপস্থিতি ছিল একটা সময় পর্যন্ত। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা হলো সেখানে গণতন্ত্রও নাই, প্রজাতন্ত্রও নাই। সেখানে রয়েছে কর্পোরেটোক্রেসি বৃহৎ কর্পোরেশনসমূহ, সম্পদশালী ধনিকশ্রেণী এবং কর্পোরেটদালাল সরকারব্যবস্থার মিলিত শক্তি। অর্থাৎ, তা এমন এক ব্যবস্থা যা নিয়ন্ত্রিত ও শাসিত হয় কর্পোরেটদের দ্বারা।

এসব কর্পোরেশনের সিইও কতোটা ক্ষমতাধর, তা হয়তো অনেকের কল্পনারও অতীত। কর্পোরেট গোয়েন্দা মার্ক ব্যারি বলেন, আমাকে ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ)-এর এক হাইপ্রোফাইল মিটিঙে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমি রুমে দাঁড়িয়েছিলাম, সেখানে একদিকে ছিল সিআইএ, এনএসএ, এফবিআই, কাস্টমস, সিক্রেট সার্ভিস ইত্যাদি; অপরদিকে ছিল কোকাকোলা, মবিল অয়েল, জিটিই, কোডাক ইত্যাদি বৃহৎ কর্পোরেশন। আর আমি ইন্টেলিজেন্স ইন্ডাস্ট্রির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। তাদের মধ্যে ন্যূনতম পৃথকীকরণের রেখাটাও এখন আর অবশিষ্ট নাই। আর এ থেকে বোঝা যায় সরকার আর কর্পোরেশন কিভাবে একসঙ্গে কাজ করে।

১৯৮০র দশক থেকেই পুঁজিবাদী বিশ্বের বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আঙ্গিকে নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের জন্য সাম্রাজ্যবাদী সরকারগুলো চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। এ ধরনের প্রশাসন হলো এক রকম নয়াব্যবস্থাপনাবাদ, যা একচেটিয়া কর্পোরেট পুঁজির বিনিয়োগ নিশ্চিত করে আর সে লক্ষ্যেই বিধিবিধান প্রণয়ন করে। এই প্রশাসন ব্যক্তিমালিকানাধীনকরণ ও আউটসোর্সিংএর মাধ্যমে বাজার অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিল্প আকারে হাজির করে। পরবর্তী সময়ে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের কর্পোরেশন আকারে আত্মপ্রকাশ করে। এ রকম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইসচ্যান্সেলরের পদবীটি আসলে পরিণত হয় চিফ এক্সিকিউটিভ বা প্রধান নির্বাহীর পদে।

যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক বলেন, বিশ্বায়নের তোড়ে আজ যখন বিশ্বের বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন আমরা আসলে শ্রেণী বৈষম্যকেই এড়িয়ে যাচ্ছি। যা ব্রিটিশ এবং আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদেরই তৈরি করা ছকে নিজেকে মানসম্পন্ন হিসেবে জাহির করে পয়সা কামাতে সাহায্য করছে। এটা শ্রেণী বৈষম্যকে নিরুপদ্রব ও জিইয়ে রেখে চকচকে অবয়বে প্রকাশ করারই নামান্তর।

এই একই কৌশলে কর্পোরেশনগুলো প্রতিনিয়ত বিশ্বব্যাপী আগ্রাসন চালাচ্ছে। তারা এখন কেবল অস্ত্র হাতেই আক্রমণ করছে না। বরং এর থেকে বড় আঘাতটা তারা হানছে মনস্তাত্ত্বিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে। যার আঘাতে সামাজিক মানুষের চিন্তাধারাটুকুও তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হচ্ছে। মানুষ বাঁচে তার চিন্তার মাঝে। আর যখন সেই চিন্তাটাকেই মেরে ফেলা যায়, অথবা দিকভ্রান্ত করে দেওয়া সম্ভব হয়, তখন আর যাই হোক, তা আর সেই মানুষ থাকে না। অর্থাৎ, বস্তুর গুণগত পরিবর্তন সাধনের পর তা আর পূর্ববর্তী বস্তু থাকে না, সৃষ্টি হয় এক নতুন বস্তুর। এমন আমূল পরিবর্তন যখন কর্পোরেশনের স্বার্থে সংঘটিত হয়, তখন তা কর্পোরেট নয়াউপনিবেশবাদের জন্ম দিয়ে থাকে। আবার যখন তা মানব মুক্তির উদ্দেশ্যে বৈপ্লবিক চেতনায় সংঘটিত হয়, তখন তা সর্বহারা বিপ্লবের সূচনা করে।

ঐতিহাসিক হাওয়ার্ড জিন বলেন, একটি অতিউন্নত সমাজে, ব্যবস্থাপনা (establishment) কোটি কোটি জনগণের বাধ্যতা ও আনুগত্য ছাড়া টিকে থাকতে পারে না, যাদের ছোট ছোট অবদানে এই ব্যবস্থা জিইয়ে থাকে সেনা আর পুলিশ, শিক্ষক আর মন্ত্রী, প্রশাসক আর সমাজকর্মী, কারিগর আর উৎপাদক শ্রমিক, ডাক্তার, আইনজীবীতারা এই ব্যবস্থার রক্ষকে পরিণত হয়েছেন, যারা উচ্চ ও নিম্নশ্রেণীর মাঝের সংযোগকারী। তারা বাধ্য না থাকলে এই ব্যবস্থাও খসে পড়বে।

কর্পোরেশনগুলো জনসমর্থন অর্জনের উদ্দেশ্যে শিক্ষকশিক্ষার্থী, বিভিন্ন পেশাজীবী, এমনকি শ্রমিকদের মাঝে, সমাজের প্রতিটা স্তরে তার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে নিজেদের প্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে। আর এতে তারা অনেকাংশেই সফল হয়েছে। কারণ চারিদিক থেকে নিপীড়িত জনগণ যখন নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে, প্রতিবাদ যখন বিদ্রোহে রূপ নিতে ব্যর্থ হয়, তখন সাম্রাজ্যবাদীদের সফলই বলা চলে। সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র আন্দোলনগুলো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে না পারার পেছনে এটা অন্যতম প্রধান কারণ।

আন্দোলনগুলো লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারার পেছনে আরো কিছু মৌলিক কারণ রয়েছে। এই আন্দোলন মূলত বেতন, ফি বাড়ানোর প্রতিবাদেই গড়ে ওঠে। পরে নাইটকোর্স বন্ধের দাবি যুক্ত হয়েছে, কিন্তু এই দাবিটি যে খুব জোরালোভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, বা তার পক্ষে যে জোরালো সমর্থন অর্জন করা সম্ভব হয়েছে, এমনটিও নয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের পড়ার বিষয়বস্তু, পাঠক্রম যা এনজিও আর কর্পোরেটদের স্বার্থে নির্ধারিত, এর বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রতিরোধই গড়ে তোলা যায়নি। এমতাবস্থায় গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের দাবি তো বহুদূরের কথা। যে গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিটি বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। আর এক্ষেত্রে আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় অংশ এই বিষয়টি হয় অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে, অথবা তা তারা সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা দরকার। রাজনৈতিক ব্যানার ব্যবহার না করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে ব্যানার ব্যবহার করাটা ছিল ওই বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর আরেকটি বড় ব্যর্থতা। অনেকেই সাফাই দিচ্ছেন যে, রাজনৈতিক সংগঠনের নামে ব্যানার ব্যবহার করা হলে শিক্ষার্থীরা আসবেন না, কিন্তু তা কখনোই সঠিক চিন্তা নয়। পৃথিবীর সবকিছুতেই যেখানে রয়েছে রাজনৈতিকতা, সেখানে এই আন্দোলন অরাজনৈতিক থাকে কিভাবে? আর তাকে অরাজনৈতিক বলার মানে হলো বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিকে সমর্থন করা। শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। শিক্ষাব্যবস্থা যেমন পুরো সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত; তেমনি তার বিপ্লবী গণতান্ত্রিক বিকাশও সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। আর এক্ষেত্রে সমাজের নিপীড়িত জনগণের অন্যান্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়াটা ছাত্র আন্দোলনের বিকাশের জন্য অপরিহার্য। ঠিক তেমনি ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সমাজের ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের সম্পৃক্ততা গড়ে তোলাটা জরুরী। আর তার অবর্তমানে আন্দোলন ব্যর্থ হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর সেক্ষেত্রে আন্দোলনগুলি অর্থনৈতিক আন্দোলনেই আবদ্ধ থাকে। শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক সময়ের দাবিদাওয়ার আন্দোলনগুলি বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে সক্ষম না হওয়ার কারণে, তা অর্থনীতিবাদী আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়েছে। আর তাই এই আন্দোলনগুলি একটি ধাপ পেরিয়েই থমকে যেতে দেখা গেছে।

সাত.

এখানে সামরিকীকরণের প্রশ্নটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মতো শিক্ষাক্ষেত্রেও প্রতিনিয়ত কর্পোরেটকরণের সঙ্গে সঙ্গে চলছে সামরিকীকরণ। চা বোর্ড, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান, বিমান, হাসপাতাল, কৃষি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পানি, বিদ্যুৎ ইত্যাদি খাতের পরিচালক পদে আসীন করা হয় সামরিক বাহিনীর পদাধিকারী কর্মকর্তাদের। একইভাবে, সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত স্কুলকলেজ ছাড়াও, বিভিন্ন সরকারিবেসরকারি স্কুলকলেজেও সামরিক কর্মকর্তাদের সংখ্যা দিনদিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

উল্লেখ্য, বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং তুরস্কের সেনাবাহিনী কর্পোরেট সেনাবাহিনী হিসাবে খ্যাত। যেমনি তাদের কাঠামোগত বাণিজ্যের দিক থেকে, তেমনি কর্পোরেট সংস্থার স্বার্থ সংরক্ষণের দিক থেকেও এই তিনটি দেশের সেনাবাহিনী সর্বদাই ক্রিয়াশীল।

তেলগ্যাসখনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎবন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সারা দুনিয়াতেই বহুজাতিক সংস্থার এখন পণ্যের মান উন্নয়ন, নিরাপদ কর্ম পরিবেশ, প্রযুক্তি বিকাশে যত অর্থ ব্যয় হয় তার চাইতে বেশি ব্যয় হয় পিআর বা পাবলিক রিলেশনস তৎপরতায়। এর সহজ অর্থ বিষময় প্রকল্প পাস বা পণ্য বাজার তৈরিতে সরকারি নীতি ও জনমত পক্ষে আনা। পুঁজির জাল, বিদ্যাচর্চা দখলের মধ্য দিয়ে তৈরি করে নাটবল্টু, তাদের নাম বা পরিচয় হতে পারে কর্পোরেট সেনাবাহিনী। যে বাহিনীর সদস্যদের ক্যারিয়ার সাফল্য নির্ভর করে আনুগত্য, পুঁজির ফুলে ফেঁপে উঠায় দক্ষ ভূমিকা পালন, কোম্পানির স্বার্থকে স্বপ্নে জাগরণে নিজের স্বার্থ বলে ভাবতে শেখা, আর কর্পোরেট মস্তিষ্কের ছাঁচে নিজের মস্তিষ্ক তথা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে ক্ষমতার চাইতেও বেশি সচল রাখার উপর। কর্পোরেট সেনাবাহিনী বলতে শুধু সিইও থেকে নিম্ন বেতনের কর্মী পর্যন্ত বোঝায় না। আনুষ্ঠানিক কর্মচারী না হয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আমলা, মন্ত্রী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, এনজিও কর্মকর্তা যে কনসালট্যান্ট, মিডিয়া পার্টনার আর লবিস্টদের বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, বিশ্বব্যাপীই যা বিস্তৃত, সেটাও এই কর্পোরেট সেনাবাহিনীর অংশ। বাংলাদেশের সমুদ্র এখন দখল নিচ্ছে মার্কিন তেল কোম্পানি আর তাদের সামরিক বাহিনী। ১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যে যুক্তরাষ্ট্র সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল তারাই এখন বঙ্গোপসাগরের কর্তৃত্ব পাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি বলে কথিত সরকারের কাছ থেকে। লুণ্ঠন ও দখলের ভাগ বসানো ছাড়া সরকার এবং তার নানা বাহিনীর আর কোন ভূমিকা খুঁজে পাওয়া কঠিন! ভূমি আর ভূমির নিচের সম্পদও ক্রমান্বয়ে এসব বহুজাতিক পুঁজির দখলে নেবার চেষ্টায় প্রাণান্ত করছে কর্পোরেট সেনাবাহিনী। (ঈশ্বর, পুঁজি ও মানুষ আনু মুহাম্মদ)

প্রতিনিয়ত নতুন নতুন স্কুলকলেজবিশ্ববিদ্যালয় তৈরির জন্য এই সেনাবাহিনী ব্যস্ত রয়েছে। সংবাদপত্রসূত্রে জানা যায়, নতুন তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পাচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। তিনটিই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সবুজসংকেত পেয়ে এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এ জন্য প্রক্রিয়াও শুরু করেছে ইউজিসি। প্রস্তাবিত তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, কুমিল্লা; বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, কাদেরাবাদনাটোর এবং বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, সৈয়দপুর। উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সাল থেকেই মিলিটারি ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) নামক একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছে সেনাবাহিনী। সেই সঙ্গে আরও কয়েকটি ক্যাডেট ও সামরিকবাহিনী নিয়ন্ত্রিত স্কুলকলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

শিক্ষার সামরিকায়নের মাধ্যমে শুধু যে শিক্ষার কর্পোরেটকরণবাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে তাই নয়; বরং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে সামরিকবাহিনীর সকল কর্মের তা ভূমি অধিগ্রহণের নামে দখলীকরণই হোক, অথবা কর্পোরেট বাণিজ্য, অথবা সাম্রাজ্যবাদের সাহচার্য তার বৈধতার বিধানটিও ওই পাঠক্রমে জুড়ে দেওয়া থাকে সুকৌশলে; যা সামরিকায়নের গণভিত্তি তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

এখানেও কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ চালিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই সামরিকীকরণের অন্যতম পথপ্রদর্শক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাবলিক স্কুলগুলো পরিচালনার জন্য সামরিকবাহিনীর জেনারেলদের ভাড়া করা হচ্ছে; সেই সঙ্গে মেটাল ডিটেক্টর, চিপযুক্ত আইডি, ইন্টারনেটনির্ভর গোয়েন্দা নজরদারী সহ নিরাপত্তার নামে বিভিন্নখাতে প্রচুর বিনিয়োগ করা হচ্ছে স্কুল ইউনিফর্ম, নিরাপত্তা পরামর্শদাতা নিয়োগ, আকস্মিক অনুসন্ধান, ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক পুলিশি উপস্থিতি। অর্থাৎ, পাবলিক স্কুলগুলোকে কারাগারে পরিণত করা হয়েছে ও হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যেন সব ভয়ঙ্কর অপরাধী! সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার ২৬টি স্কুলের পুলিশ বিভাগে ট্যাংক, উচ্চপ্রযুক্তির আগ্নেয়াস্ত্র সহ বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র পাঠিয়েছে। ডেট্রয়েটের পাবলিক স্কুলের পুলিশ বিভাগের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, তারা ৪১.৭ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ পেয়েছে পুরো জেলার পাবলিক স্কুলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নয়নে; যার মধ্যে রয়েছে মেটাল ডিটেক্টর, চিপযুক্ত আইডি, আগন্তুকদের সম্পর্কে তথ্য যাচাই। মাবাবাদের সন্তানের সঙ্গে দেখা করা বা শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করাটাও যেন এক বিশাল অপরাধের সামিল!

যুক্তরাষ্ট্রে জুনিয়র রিজার্ভ অফিসার ট্রেনিং কর্পস প্রোগ্রামের মাধ্যমে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের মাঝে সামরিকায়নের বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। সেখানে দুটো লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই প্রোগ্রাম চালানো হয় . গণবিক্ষোভ দমনে জিরো টলারেন্স, জনকল্যাণের স্থলে শাস্তিমূলক কার্যক্রম; . বলপ্রয়োগই শিক্ষা এই নীতির আলোকে পরিচালিত সামরিকায়নের শিক্ষা শিক্ষার্থীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মার্কিন অধিজাতিক (Transnational) কর্পোরেশন ও বিশ্বায়নের নামে বিশ্বব্যাপী কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের পক্ষে সমর্থন ও জনমত গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষার সামরিকীকরণকে আমাদের বৈশ্বিক কর্পোরেটদের বাজার দখলের সঙ্গে সম্পর্কিত করেই বুঝতে হবে। তা না হলে শিক্ষার সামরিকায়নের অনেকটাই অধরা থেকে যাবে। সামরিকায়নের অন্তর্নিহিত ভিত্তি আভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি; সংস্কৃতি থেকে ভাষা পর্যন্ত পরিব্যপ্ত।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান প্রথমবার ক্ষমতায় এসেই যুক্তরাষ্ট্র শিক্ষা বিভাগ ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন এবং বাজারভিত্তিক শিক্ষার প্রচলন চালু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শিক্ষকদের ইউনিয়নের প্রবল বিরোধ এবং জনমত সঙ্গে না থাকায় সে যাত্রায় তা সফল হয়নি। এর মূল কারণ হলো তখনও পর্যন্ত কর্পোরেটদের অর্থে নয়াউদারনৈতিক চেতনার দালালেরা প্রচারণায় নামেনি। কিন্তু রিগ্যানএর পরবর্তী মেয়াদে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি হয়নি। এ যাত্রায় তিনি তাঁর কাজে শতভাগ সফল হন। জনগণকে বোঝানো হয় পাবলিক শিক্ষাটাও এক ধরণের পণ্য, যা তাকে কিনে নিতে হবে।

অধ্যাপক কেনেথ জে সল্টম্যান বলেন, বিশ্বায়নের প্রায়োগিক দিকগুলো হলো . ব্যক্তিমালিকানাধীনকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ; . মানসম্পন্ন ও জবাবদিহিতামূলক পরিকল্পনা; যেখানে যাচাইবাছাইয়ের মাধ্যমে একটি অভিন্ন পাঠক্রমের ওপর জোর দেওয়া হবে; . মূল্যায়ন, স্বীকৃতি ও পাঠক্রম নির্ধারিত হবে বাজার মান অনুসারে এবং শাসকশ্রেণীর সংস্কৃতির আদলে; কখনোই মানবিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দ্বারা নয়। পাঠক্রম এমনভাবে গঠিত হবে, যাতে ক্ষমতা ও জ্ঞান উৎপাদনের মধ্যকার সম্পর্ক, কর্তৃত্ব, রাজনীতি, ইতিহাস এবং নৈতিকতা সম্পর্কিত সমালোচনামূলক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হয়। (Education as Enforcement : Militarization and Corporatization of Schools – Kenneth J. Saltman)

একদিকে, বৈশ্বিক কর্পোরেট পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দারিদ্রের পুনঃউৎপাদন করছে; অপরদিকে, সাম্রাজ্যবাদের সামরিকায়ন যুদ্ধের পুনঃউৎপাদন করছে; যার সঙ্গে জড়িত সামরিক শিল্পের অর্থনীতি অর্থাৎ এই সামরিকায়ন কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদেরই অংশ। একইভাবে, শিক্ষার সামরিকায়ন আর শিক্ষার কর্পোরেটকরণ ভিন্ন কোনো বিষয় নয়; বরং পরস্পর সংযুক্ত। উভয় ক্ষেত্রে কর্পোরেশনের স্বার্থটাই তাদের নিকট মূল উপজীব্য। শিক্ষাবিদগণের প্রধান কর্তব্য হতে হবে তা উপলব্ধিপূর্বক জনগণকে সংগঠিত করে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তির পক্ষে দাঁড়াতে শিক্ষাকে অবলম্বন করা; যা বাজারপ্রসূত শিক্ষা নয়।

আট.

গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে

গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আলোচনার শুরুতেই আমাদের এটা নির্ধারণ করতে হবে যে, আমরা কেন গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিকে সামনে নিয়ে আসব? সমাজ গঠনেই বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান কী? বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারক শক্তিই বা কে হবে, যার প্রতিফলনই ঘটবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কর্মকাণ্ডে?

কর্পোরেট প্রশাসনের ভিত্তি হলো নয়াউদারনৈতিক অর্থনীতি, যা শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে সামনে তুলে ধরে। তাতে শিক্ষার বৃহৎ সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং গণমুখী চিন্তা থাকে অচ্ছুৎ। কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হলো তাতে গণতান্ত্রিক সমাজের চেতনাকে ধারণ করা, গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে অবদান রাখা। অর্থাৎ, আজ যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তারাই আগামীদিনে সমাজ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে, তারা সমাজের বুদ্ধিজীবী শ্রেণী। যদি তারা গণতান্ত্রিক চেতনা ধারণ করে থাকেন, তবে ভবিষ্যতে এক গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে তারা বিপ্লবী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন। পাবলিক শব্দটির অর্থ হলো সর্বজনীন, সরকারি নয়; অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হতে হবে পাবলিক, আর তার নির্ধারক শক্তি থাকতে হবে সমাজের বুদ্ধিজীবী ও উৎপাদকশ্রেণীর হাতে, ব্যবসায়ীদের হাতে নয়। আর আমরা যদি এ বিষয়ে একমত হই যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটি শ্রেয়তর সমাজ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারে; তবে আমাদের এটাও অনুধাবন করতে হবে যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অবশ্যই গণতান্ত্রিক প্রশাসনের চর্চা থাকতে হবে। যার মানে হলো শিক্ষার্থীশিক্ষকসহ সমাজের সকল পেশা, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গের মেহনতি মানুষদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী সভায়। এই নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হবে।

গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ সভা হলো সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষ। সাধারণ সভা গঠিত হবে ভিসি, যিনি পদাধিকার বলে এই সভার সভাপতি, প্রোভিসি, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার, প্রত্যেক বিভাগীয় প্রধান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের থেকে ৫০ জন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের ২০ জন প্রাক্তন শিক্ষার্থী (স্নাতক/স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী), শিক্ষক ইউনিয়নের নির্বাচিত সদস্যদের থেকে ৩০ জন, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন থেকে ১৫ জন, কৃষক সংগঠন থেকে ১৫ জন, অন্যান্য পেশাজীবীদের ইউনিয়ন থেকে ১৫ জন, সরকারি কর্মকর্তা ২ জন, পার্লামেন্ট সদস্য ৫ জন, প্রত্যেক সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের থেকে ২ জন করে, ৫ জন শিক্ষাবিদ/গবেষক, ১০ জন নারী প্রতিনিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্টাফ ইউনিয়নের ১৫ জন প্রতিনিধির সমন্বয়ে। এই সভা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সবাইকে যার যার নির্ধারিত কাজকর্ম বুঝিয়ে দেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধি নির্ধারিত ও ঘোষিত হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাধারণ সভা থেকেই। এই সভার অনুমোদনক্রমেই কার্যনির্বাহী কমিটি ও একাডেমিক কাউন্সিল গঠিত হবে। উল্লেখ্য, ভিসি, প্রোভিসি, রেজিস্ট্রার বা ট্রেজারারের পদ শূন্য হলে তাও নির্ধারিত হবে সাধারণ সভার প্রতিনিধিদের দ্বারা, তাতে কোনোরূপ নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। সভার সিদ্ধান্ত মতে, কেউ ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বপ্রাপ্তও হতে পারেন। ভিসি, যিনি পদাধিকারবলে এই সভার সভাপতি, তিনি সহ এই সাধারণ সভার সকল সদস্যই সভার প্রতি দায়বদ্ধ থাকবেন এবং সাধারণ সভার নিকট জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন। সকল নিয়োগ প্রক্রিয়াও এই সভা থেকে অনুমোদনকরিয়ে নিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে লিঙ্গীয় বৈষম্য দূর করার জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে। যেহেতু আমরা এক পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বাস করছি নারী শিক্ষক অথবা নারী শিক্ষার্থী, উভয়ের ক্ষেত্রেই বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে, যেন তারা বৈষম্যের শিকার না হন। নারী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্টাফদের সমন্বয়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কমিটি, উপকমিটিতে নারী প্রতিনিধিদের সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। একাডেমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাঝে প্রচলিত যৌন বিষয়ক এবং অভিজাত নিয়ম ও চর্চাগুলো আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করতে হবে। সেই সঙ্গে পূর্বতন প্রশাসনের কর্পোরেট ও অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনাসমূহকেও ছেঁটে ফেলতে হবে। শিক্ষার্থীদের ফি নির্ধারিত হবে দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট সাপেক্ষে, যা সাধারণ সভায় নির্ধারিত হবে। সেই সঙ্গে সাধারণ সভার অনুমোদনক্রমে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কমিটি সরকারের নিকট পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের জন্য অর্থ বরাদ্দের সুপারিশ পাঠাবে।

গণমূল্যবোধ তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ ভূমিকা রাখবে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের উদ্যোগে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক কাজ, যেমন বয়স্ক শিক্ষা, নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, কৃষি সচেতনতা ও সহযোগিতা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, প্রযুক্তি শিক্ষা, আইনী সচেতনতা, এমনি অনেক কাজে যুক্ত হবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। যা তাদের ভেতরকার পূর্ববর্তী আত্মকেন্দ্রিক কর্পোরেট চেতনা ভেঙে গণমুখী সামাজিক চেতনা গড়তে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পৃথক কমিটি করা হবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে। কোনো ফৌজদারি অপরাধ না সংঘটিত হলে ক্যাম্পাসে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রবেশ করবে না।

গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যনির্বাহী কমিটি, একাডেমিক কাউন্সিল, ছাত্র সংসদ, শিক্ষক সংসদ এবং অ্যালামনাই এসোসিয়েশন সাধারণ সভা হতে নির্দেশনা গ্রহণ করবে এবং সধারণ সভাকে সুপারিশমালা প্রদান করবে। উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কার্যনির্বাহের জন্য উপকমিটি গঠন করতে পারবে, তবে তা পরবর্তীতে সাধারণ সভা হতে অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। যে কোনো অসামঞ্জস্য কার্মকাণ্ডের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠানসমূহকে সাধারণ সভার নিকট জবাবদিহি করতে হবে।

কর্পোরেট প্রশাসন আর গণতান্ত্রিক প্রশাসনের প্রধান পার্থক্যগুলো নিম্নে ছকের সাহায্যে তুলে ধরা হলো

 

কর্পোরেট প্রশাসন

গণতান্ত্রিক প্রশাসন

নীতিনির্ধারণী সভা

ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে একটি ক্ষুদ্র কাউন্সিল, বা ট্রাস্টি বোর্ডে, যেখানে ভিসি প্রধান নির্বাহীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, রেজিস্ট্রার এবং প্রোভিসির কাজের পরিধি বৃদ্ধি পায়।

ভীষণরকম অসঙ্কোচ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সাধারণ সভার সদস্যদের বহুমুখী কাজ, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষদের সন্নিবেশ, যা প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।

নির্বাহী কমিটি

সিনেট বা সিন্ডিকেট নির্বাহী ক্ষমতা ভোগ করলেও কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না, তা নাম সর্বস্ব কমিটিতে পরিণত হয়।

কার্যনির্বাহী কমিটি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্টাফদের সঙ্গে মিলে একটা সমন্বিত পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ

সীমিত আকারে কিছু কাস্টমার সদৃশ শিক্ষার্থীকে সিনেটে স্থান দেওয়া হয় কাস্টমারের পূর্বের রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে, ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধ, বিরাজনীতিকরণের রাজনীতি চলমান থাকে।

শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য পূরণে ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীরা অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করে।

একাডেমিক কাউন্সিল

প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা, কঠোর কর্মক্ষম ব্যবস্থাপনা এবং বাজারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মান নিশ্চিত করতে জোর দেওয়া হয়, কর্পোরেট পুঁজির বিকাশে যে দক্ষতা প্রয়োজন হয়, তা পরিবেশন করা হয়।

শিক্ষা হলো পরিবর্তনের শক্তি, বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তব দুনিয়ার সমস্যাসমূহের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সবার জন্য সমান সুযোগ ও সামাজিক সংযোগ নিশ্চিত করে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের গণতান্ত্রিক কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়।

সাধারণ সভা কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব সাপেক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যাবলী, সংস্থাসমূহ এবং সম্পত্তির উপর সাধারণ ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব থাকবে কার্যনির্বাহী কমিটির ওপর। কার্যনির্বাহী কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও কার্যধারা সম্পর্কে নীতিমালা প্রণয়নে সাধারণ সভাকে সুপারিশ প্রদান করবে এবং অর্পিত দায়িত্ব অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক প্রয়োজন নিরূপণ, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করবে; বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন, বার্ষিক হিসাব ও বার্ষিক সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রস্তাব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়া বাজেট তৈরি ও অনুমোদনের জন্য সাধারণ সভায় পেশ করবে; সাধারণ সভার নির্দেশনা সাপেক্ষে অর্থ সংক্রান্ত ও সাধারণ বা বিশেষ উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রদত্ত সকল তহবিল পরিচালনা করবে; বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সীলমোহরের আকার ও প্রকৃতি নির্ধারণের জন্য সুপারিশ প্রণয়ন করবে; বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন বাবদ প্রকল্প গ্রহণ এবং সরকারের নিকট অর্থ বরাদ্দের সুপারিশ করবে; ভাইসচ্যান্সেলর, প্রো ভাইসচ্যান্সেলর, রেজিস্ট্রার এবং ট্রেজারার ব্যতীত বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ, তাদের দায়িত্ব নির্ধারণ এবং সংবিধি অনুযায়ী চাকরীর শর্তাবলী স্থির ও তাদের কাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিবে; কোনো পদ স্থায়ীভাবে শূন্য হলে সেই পদ পূরণে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে; বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে উইল, দান এবং অন্যবিধভাবে হস্তান্তরকৃত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি গ্রহণ করবে; শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের গুণগত মানোন্নয়নের জন্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক বিকাশের জন্য সাধারণ সভা সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নিকট সুপারিশ এবং সাধারণ সভায় কার্যনির্বাহী কমিটির বার্ষিক রিপোর্ট পেশ করবে। কার্যনির্বাহী কমিটি সাধারণ সভার অনুমোদনক্রমে অর্থ কমিটি, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা কমিটি, নিয়োগ কমিটি, ছাত্র কল্যাণ কমিটি, শিক্ষক কল্যাণ কমিটি, কর্মকর্তাকর্মচারী কল্যাণ কমিটি ইত্যাদি উপকমিটি গঠন করতে পারবে।

গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল সাধারণ সভার নির্দেশনা সাপেক্ষে নতুন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, পাঠক্রম, সামাজিক শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আদানপ্রদান, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রম চালু, বন্ধ বা বর্ধিতকরণকল্পে সুপারিশ কার্যনির্বাহী কমিটি ও সাধারণ সভায় সুপারিশ প্রদান করবে; সাধারণ সভার নির্দেশনা ও সংবিধি সাপেক্ষে শিক্ষাক্রম (curriculum) ও পাঠক্রম (syllabus) এবং শিক্ষাদান, গবেষণা ও পরীক্ষার সঠিক মান নির্ধারণের জন্য প্রবিধান প্রণয়ন করতে পারবে; বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠান এবং তার ফলাফল প্রকাশের ব্যবস্থা করবে; বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের ব্যবস্থা করবে এবং তদনুযায়ী সাধারণ সভায় রিপোর্ট প্রদান করবে; সংবিধি অনুসারে এবং বাজেট বরাদ্দ সাপেক্ষে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক এবং অন্যান্য শিক্ষক ও গবেষকের পদসৃষ্টি, বিলোপ বা সাময়িকভাবে স্থগিত করবে এবং সাধারণ সভায় তার রিপোর্ট প্রেরণ করবে; বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক অথবা স্কলারকে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য মেধা ও মনীষার স্বীকৃতি হিসাবে ডিগ্রী, সার্টিফিকেট, ডিপ্লোমা, বৃত্তি, ফেলোশীপ, স্কলারশীপ, স্টাইপেন্ড, পুরস্কার, পদক ইত্যাদি প্রদানের উদ্দেশ্যে বিধান প্রণয়ন এবং উপযুক্ত ব্যক্তিকে তাহা প্রদানের জন্য সাধারণ সভার নিকট সুপারিশ করবে; শিক্ষকের প্রশিক্ষণ ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণী বিষয়ে সাধারণ সভা ও কার্যনির্বাহী কমিটির নিকট প্রস্তাব পেশ এবং প্রশিক্ষণ ও ফেলোশীপ প্রদানের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করবে; সংশ্লিষ্ট কমিটিসমূহের সুপারিশক্রমে কোর্স ও সিলেবাস নির্ধারণ, প্রত্যেক কোর্সের জন্য পরীক্ষক প্যানেল অনুমোদন, গবেষণা ডিগ্রীর জন্য গবেষণার প্রতিটি বিষয়ের প্রস্তাব অনুমোদন এবং এইরূপ প্রত্যেক বিষয়ে পরীক্ষা গ্রহণের জন্য পরীক্ষক নিয়োগ করবে; কোনো শিক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থীকে কোনো কোর্স মওকুফ (exemption) করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে; বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও অনুষদের গুণগত উৎকর্ষ বৃদ্ধি ও তা সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে প্রবিধান প্রণয়ন এবং দেশ বিদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসূত্র বা যৌথ কার্যক্রম গ্রহণ করার বিষয়ে সাধারণ সভায় সুপারিশ প্রদান করবে; বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা, ভর্তির যোগ্যতা ও শর্তাবলী নির্ধারণ এবং তদুদ্দেশ্যে পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করবে; শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের গুণগত মানোন্নয়নের জন্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক বিকাশের জন্য সাধারণ সভা সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নিকট সুপারিশ এবং সাধারণ সভায় একাডেমিক কাউন্সিলের বার্ষিক রিপোর্ট পেশ করবে। গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পরিচালনার জন্য সাধারণ সভার অনুমোদনক্রমে পাঠক্রম ও শিক্ষাক্রম বিষয়ক কমিটি, পরীক্ষা বিষয়ক কমিটি, গবেষণা কমিটি, ইত্যাদি উপকমিটি গঠন করতে পারবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ সাধারণ সভার নির্দেশনা ও সংবিধি অনুযায়ী সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভোটে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে; বিভিন্ন শিক্ষা বিষয়ক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে; বিভিন্ন জনকল্যাণকর বিষয়ে কর্মসূচি গ্রহণ করবে; স্থানীয় জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে সামাজিক শিক্ষার ব্যবস্থা করবে এবং তাতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রচারকার্য পরিচালনা করবে; শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের গুণগত মানোন্নয়নের জন্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক বিকাশের জন্য সাধারণ সভা সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নিকট সুপারিশ এবং সাধারণ সভায় ছাত্র সংসদের বার্ষিক রিপোর্ট পেশ করবে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংসদ সাধারণ সভার নির্দেশনা ও সংবিধি অনুযায়ী সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভোটে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে; বিভিন্ন শিক্ষা বিষয়ক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে এবং শিক্ষার্থীদের এইরূপ কার্যে সহযোগিতা করবে; শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য, তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক বিকাশের জন্য সাধারণ সভা সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নিকট সুপারিশ এবং সাধারণ সভায় শিক্ষক সংসদের বার্ষিক রিপোর্ট পেশ করবে।

বিশ্ববিদ্যালয় স্টাফ ইউনিয়ন সাধারণ সভার নির্দেশনা ও সংবিধি অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাকর্মচারীদের ভোটে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে; নির্বাচিত স্টাফ কমিটিতে শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের ৩০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব থাকতে পারবে; বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাকর্মচারীদের কল্যাণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক বিকাশের জন্য সাধারণ সভাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নিকট সুপারিশ এবং সাধারণ সভায় স্টাফ ইউনিয়নের বার্ষিক রিপোর্ট পেশ করবে।


[গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ধারণা তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো। আশা করি, তা বিজ্ঞজনদের দ্বারা আরও বিকশিত হবে।]

উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিন্তু পরিচালিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক। তাই গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের সঙ্গে সঙ্গে মঞ্জুরী কমিশনেরও গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সাধিত হতে বাধ্য। আর তা যেহেতু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, তাই তার পরিবর্তন সূচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রব্যবস্থারও বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হতে হবে। আর এ কারণেই গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিটি কেবল অর্থনৈতিক দাবি নয়, বরং তা বৈপ্লবিক চৈতন্যের বহির্প্রকাশ।

বেসরকারি বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মনে করতে পারেন, এ তো কেবল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলছি; তবে কি আপনারা, যারা উচ্চশিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ, আমি কি আপনাদের হিসেবের বাইরে রেখে কথা বলছি? না, তা কখনোই নয়। আমি পাবলিক বা প্রাইভেট পৃথক করে আমার আলোচনা তুলে ধরিনি। বরং যে গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিটি সকল উচ্চশিক্ষার্থীর প্রধান দাবি হওয়া উচিৎ, সেটাকেই বিশ্লেষণ করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। শিক্ষা আপনার মানবিক অধিকার। তাকে পণ্যায়িত করে বাজারীকরণ করা হচ্ছে। আর এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোটা আপনারআমার নৈতিক কর্তব্য বলেই মনে করি। নয়াঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় পণ্যায়িত শিক্ষা কিনতে বাধ্য হলেও, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শিক্ষা অর্জন করাটা এখন সময়ের দাবি।

নয়.

শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সংস্কৃতি জড়িত, আর সংস্কৃতি হলো রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রতিফলন। শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে এই শিক্ষাব্যবস্থার সম্পর্কও অবিচ্ছেদ্য। সংস্কৃতি বলতে কেবলমাত্র নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক ইত্যাদির মাধ্যমে বিনোদনকেই বোঝায় না। বরং মানুষের সকল চিন্তাচেতনা, যৌক্তিক জ্ঞান, অনুশীলন, উৎপাদন ও সৃষ্টিই তার সংস্কৃতির পরিচায়ক। বৈজ্ঞানিক গবেষণা, শিক্ষা, দর্শন, ঐতিহাসিক জ্ঞান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিন্তাসহ সমাজের মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের সকল চিন্তাভাবনা ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় ব্যক্তির ও তার শ্রেণীর সংস্কৃতি। শ্রেণী বিভক্ত সমাজে সকল মানুষই স্ব স্ব শ্রেণীর অধীনে বসবাস করে, আর সংস্কৃতিও শ্রেণী নিরপেক্ষ নয়, শ্রেণী চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতিও পরিবর্তনশীল।

উল্লেখ্য, কোনো জাতিসত্তার জাতীয়তাবোধের সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে সভ্যতা, ভাষা, শিল্পসাহিত্য, শিক্ষা, ধর্ম, সমষ্টিগত মানসিকতা, ঐতিহ্য ও ইতিহাস, জাতীয় মনস্তত্ত্ব, আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি। এই উপাদানগুলো সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ ছাড়া সেই জাতিসত্তার জাতীয় পরিচয় অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। বাংলাদেশের মতো বহুজাতিক দেশের ক্ষেত্রে জাতিসত্তাসমূহের সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোর বিশ্লেষণের মধ্য থেকেই গড়ে উঠতে পারে জাতীয় সংস্কৃতি। মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহণের অধিকার, যে কোনো জাতিসত্তার গণতান্ত্রিক অধিকার। অথচ এই শিক্ষাব্যবস্থায় মাতৃভাষায় অন্তত প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাগ্রহণের ব্যবস্থাটুকুও নেওয়া হয়নি। আমরা জানি, শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্যই প্রয়োজন সুস্থ সাংস্কৃতিকসামাজিক পরিবেশ আর সেই সঙ্গে মাতৃভাষায় পাঠদানের চর্চা। মাতৃভাষায় শিক্ষার মাধ্যমেই শিশুদের মানসিক বিকাশ সমৃদ্ধ হতে পারে। উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য জাতিসত্তাসমূহের শিশুদের এখানে শিক্ষার প্রথম পাঠ নিতে হচ্ছে বাংলায়, যা তাদের মাতৃভাষা নয়। আর অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেন এই বিষয়ে কথা বলারও কেউ আর এই দেশে অবশিষ্ট নাই!

কমরেড মাও সেতুঙ বলেন, কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতি (মতাদর্শগত রূপ হিসেবে) নির্দিষ্ট সমাজের রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রতিফলন। সেই সংস্কৃতি আবার সেই নির্দিষ্ট সমাজের রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর বিপুল প্রভাব বিস্তার করে এবং সেগুলির মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে; আর অর্থনীতি হচ্ছে ভিত্তি, এবং রাজনীতি হচ্ছে অর্থনীতিরই ঘনীভূত প্রকাশ। সংস্কৃতির সঙ্গে রাজনীতি ও অর্থনীতির সম্পর্ক এবং রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারে এটাই আমাদের মূল দৃষ্টিকোণ।

নির্দিষ্ট সমাজের অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর তার সাংস্কৃতিক রূপ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। অর্থনীতি হলো সমাজের ভিত্তি স্বরূপ। তার ওপরই গড়ে ওঠে রাজনীতিদর্শনসংস্কৃতি, সকল বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল বিষয়াবলী, যা সে সমাজের উপরিকাঠামো। আর তাই সাংস্কৃতিক আন্দোলন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অধীন, অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতিফলনই দেখা যায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে যখন অরাজনৈতিক মোড়কে বন্দী করা হয়, তখনও তাতে রাজনীতি বিদ্যমান থাকে। আর তা হলো বিরাজনীতিকরণের রাজনীতি।

কমিউনিস্ট ইশতেহারএর ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত জার্মান সংস্করণের ভূমিকায় কমরেড ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস বলেন, প্রতিটি ঐতিহাসিক যুগের অর্থনৈতিক উৎপাদন ও তা থেকে আবশ্যিকভাবে সমাজের যে কাঠামো উদ্ভূত হয় সেটাই গঠন করে সেই যুগের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের ভিত; ফলস্বরূপ (জমির উপর আদিম গোষ্ঠীগত মালিকানার অবলুপ্তির পর থেকে) সমগ্র ইতিহাসই হচ্ছে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস, সমাজ বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে শোষিত ও শোষকদের মধ্যেকার, আধিপত্যহীন ও অধিপতি শ্রেণীসমূহের মধ্যেকার সংগ্রামের ইতিহাস; এই সংগ্রাম বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যেখানে শোষণ, পীড়ন ও শ্রেণী সংগ্রাম থেকে একইসঙ্গে ও চিরকালের মতো সমগ্র সমাজকে মুক্ত না করে, শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণীটি (সর্বহারা শ্রেণী) তাকে শোষণ ও পীড়ন করছে যে শ্রেণীটি (বুর্জোয়া শ্রেণী) তার কবল থেকে নিজেকে আর মুক্ত করতে পারে না।

বিশ্বব্যাপী কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতির বিপরীতে রয়েছে সর্বহারা শ্রেণী এবং অন্যান্য নিপীড়িত শ্রেণী ও জাতিসমূহের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংস্কৃতি। এদেশের বর্তমান সংস্কৃতি হলো নয়াঔপনিবেশিক বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল শাসকশ্রেণীর শাসনের প্রতিফলন কর্পোরেট সংস্কৃতি। পুঁজিবাদসাম্রাজ্যবাদনয়াউপনিবেশবাদ এবং তার মধ্যস্বত্ব ও সুবিধাভোগীদের অবহেলার শিকার হচ্ছে আমাদের লালিত সম্ভাবনাগুলো, ফলে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের নিপীড়িত জনগণের লড়াইসংগ্রামের ইতিহাসঐতিহ্য এবং সর্বোপরি আমাদের সংগ্রামী সংস্কৃতি। সেখানে আমাদের সংস্কৃতি বলে যা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা হলো পোষাকী আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু সংস্কৃতির মানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, পুরো জীবনাচার ধরে তার ব্যাপ্তি।

এ সময়ে আমরা দেখতে পাই যে, পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারির মতো দিবসগুলোও দখল করে চলেছে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদীরা। সেসব দিবসের তাৎপর্য কেবল দিবসকেন্দ্রিক নয়; মেহনতিসংগ্রামী মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে তা যুক্ত। অথচ এখানকার শাসকশ্রেণী এই চেতনাকে ছাপিয়ে কর্পোরেটদের স্বার্থানুযায়ী এসব দিবসকে নতুন রূপে সামনে তুলে ধরছে। এখানে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে ১৪ ফেব্রুয়ারি, ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসএর কথা। ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩, তৎকালীন স্বৈরপ্রশাসনের লেলিয়ে দেওয়া পুলিশ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর বিনা উস্কানিতে গুলি চালিয়ে হত্যা করে জয়নাল, দিপালীদের। বাংলাদেশে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ছাত্রজনতা ১৪ ফেব্রুয়ারিকে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবেই পালন করতো। কিন্তু এর পরেই তৎকালীন বহুল পঠিত একটি মিডিয়ার কাঁধে সওয়ার হয়ে আসে ভালোবাসা দিবস, আর এর পিছনে ভালোবাসা ছিল না, ছিল টাকার খেলা। কিন্তু প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারণায় এই কনসেপ্ট গেলানো হলো। এরপর আসলো বন্ধু দিবস, থার্টিফার্স্ট নাইট, হে ফেস্টিভাল, হ্যালোইনএর মতো কর্পোরেট সংস্কৃতির আরো বহু আরোপিত উপাদান। আর এই বাজারকেন্দ্রিক কর্পোরেট সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গে বাজার দখলে নামে বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল ও ট্রান্সন্যাশনাল কর্পোরেশন। সুতরাং এই কথা স্পষ্ট করে বলা যায় যে, ভালবাসা বা বন্ধুতা নয়; এক্ষেত্রে বাজার দখল করাটাই কর্পোরেটদের মূল উপজীব্য কর্পোরেট সংস্কৃতি যার সেবায় নিয়োজিত।

নয়াঔপনিবেশিক বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদ ও তার দেশীয় শোষকরা জনগণের ওপর যে নিপীড়ন চাপিয়ে দিয়েছে, তাতে করে এখানকার সংস্কৃতি ভীষণভাবে আক্রান্ত হয়েছে। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এবং সংস্কৃতিকর্মীবৃন্দ ও বিভিন্ন পেশাজীবীরাই বিশেষ করে দুর্ভোগে ভুগছেন। সাম্রাজ্যবাদী ও শোষকশ্রেণীর নিপীড়ন থেকে মুক্ত নয়াগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের জন্য দরকার বিরাট সংখ্যক শিক্ষক, নিবেদিতপ্রাণ বৈজ্ঞানিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রযুক্তিবিদ, সাংবাদিক, লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পী ও অজস্র সংস্কৃতিকর্মী। তাদের জনগণের সেবায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে এবং কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। বুদ্ধিজীবীদের সমস্যাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘকাল যাবৎ ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীনে থাকা ও এখানকার উঠতি বুর্জোয়ারা ব্রিটিশের সাম্রাজ্যবাদীদের দালালে পরিণত হয়ে দালাল বুর্জোয়াশ্রেণী গড়ে ওঠার কারণে এখানকার বুদ্ধিজীবীদের প্রধানাংশ ব্রিটিশ আমল থেকেই সাম্রাজ্যবাদের সাফাই গেয়ে যাচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদী নয়াঔপনিবেশিক শাসনশোষণে নিষ্পেষিত হতে হতে আমাদের দেশের মধ্যশ্রেণীর জনগণের বৃহদাংশের চিন্তাচেতনায় আপোষকামিতা, আত্মসমর্পণবাদিতা, আত্মসর্বস্ব ভোগবাদী ভাবধারা প্রবলভাবে আধিপত্য করছে। ফলে শাসনশোষণ নির্যাতনের মাত্রা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। আমাদের দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ভুলিয়ে দিতে প্রতিনিয়ত কর্পোরেট সংস্কৃতির চর্চা করা হচ্ছে। গণঅধিকার সচেতনতাকে আচ্ছন্ন করে রাখা হচ্ছে আত্মকেন্দ্রিক ভোগবাদী চর্চার মাধ্যমে। শ্রেণী চেতনাকে ভোঁতা করতে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় ও জাতিগত সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। রাষ্ট্র ধর্ম আর উগ্রবাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে শাসকশ্রেণীর ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি।

এখানে বুদ্ধিজীবীর নির্মাণ, প্রশিক্ষণ, এমনকি কোন পেশায় কোথায় নিয়োগ করা হবে, সেটাও নির্ধারণ করে দিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো। এদের মধ্যে অনেক বুদ্ধিজীবী এমন প্রশিক্ষণ পায়, যাতে তারা কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজন মোতাবেক, বিশ্বের ছবি তুলে ধরতে পারে। বই এবং পত্রপত্রিকা প্রকাশনা ও বিতরণ এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণও রয়েছে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের হাতে; যার মাধ্যমে নয়াউপনিবেশগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়। আর এর মাধ্যমে সমাজে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ববীক্ষায় দীক্ষিত এক ভাবধারা গড়ে ওঠে।

এতদসত্ত্বেও বুদ্ধিজীবীদের একাংশ সর্বদাই জনগণের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছেন। এদের উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন এবং ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিশ্চিত করাটা জরুরী। সকল দাসত্বমূলক মনোভাবসম্পন্ন সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট ও ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি ও শিক্ষাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য উপযুক্ত ও দৃঢ় বিকল্প শিক্ষাদানের সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। যে সংগঠন সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে জনগণকে শিক্ষিত করে তুলবে।

বাংলাদেশের জনগণের সংস্কৃতি ও শিক্ষা হবে নয়াগণতান্ত্রিক। বিদেশী সংস্কৃতিকে দূরে সরিয়ে রাখাটাও সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং বিদেশী সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ না করে, তার প্রগতিশীল অংশটুকু অবশ্যই গ্রহণ করে নতুন সংস্কৃতির বিকাশে ব্যবহার করতে হবে। সেই সঙ্গে দেশীয় সংস্কৃতিকেও ঢালাওভাবে খারিজ বা অনুকরণ না করে বিচারসাপেক্ষে পশ্চাদপদ অংশকে নতুন সংস্কৃতি থেকে ছেঁটে ফেলে বাকিটুকু গ্রহণ করে নতুন সংস্কৃতির বিকাশে কাজে লাগাতে হবে। এখানকার দেশীয় সংস্কৃতিতে শত শত বছর ধরে চলমান রয়েছে নারীর জন্য অবমাননাকর পুরুষতান্ত্রিক উপাদান, যা নতুন সংস্কৃতিতে স্থান পেতে পারে না। নয়াসংস্কৃতিতে নারীর ক্ষমতায়ন, তার সক্ষমতা অর্জনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদ বা তার স্থানীয় দোসররা নারীর ক্ষমতায়নের নামে নারীর যে পণ্যায়ন পরিচালিত করে, তা হবে এর থেকে ভিন্ন। নারীর সমান সুযোগ সৃষ্টি ও সমাজ থেকে পুরুষতান্ত্রিক চেতনা দূর করাটাই মূল কাজ। সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতা বজায় রেখে নারীর পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। নয়াসংস্কৃতির অবস্থান হবে সকল প্রকার পুরুষতান্ত্রিক উপাদানের বিরুদ্ধে।

ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষেত্রে সমাজের কিছু বিষয় স্থায়ীকরণ করা হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে, যেমন পুরুষতন্ত্রের নতুন কাঠামো, ধর্মীয় ও জাতিগত সাম্প্রদায়িকতা, প্রকৃতির উপনিবেশকরণ, উন্নয়নের নামে দখলীকরণ ইত্যাদি। যা পরবর্তীতে আরও বিকশিত হয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হাতে। এই প্রাতিষ্ঠানিক পুরুষতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও যে সমধিক ক্রিয়াশীল রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

নারীর ব্যক্তি পরিচয় তার গণতান্ত্রিক অধিকার, বুর্জোয়া গণতন্ত্র সে ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলে নারীকে কিছু কিছু অধিকার দিয়ে থাকলেও নারীর ব্যক্তি পরিচয়ের পূর্ণ বিকাশ সেই বুর্জোয়া সমাজ নিশ্চিত করতে পারে না। সেখানে আজো নারী পণ্যায়িত। কর্পোরেট সংস্কৃতি একটা সেভিং ফোমের বিজ্ঞাপনেও নারীকে নিয়ে আসে তার শরীর প্রদর্শনের জন্য, যা পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতিরই নামান্তর।

নারীপুরুষের মধ্যকার স্বাভাবিক সম্পর্ক, যা পুরোপুরি মানবিক সম্পর্ক; তা যৌনতার আলোকে দেখাটাই পুরুষতন্ত্রের মূলমন্ত্র। আবার প্রজাতিগত সত্তার অবস্থান থেকে নারীপুরুষকে এক করে ফেলাটা বোকামী ভিন্ন কিছু নয়। প্রজাতিগত ভিন্নতা আছে বলেই আমরা একে মানব সমাজ বলি, যান্ত্রিক বা কৃত্রিমতায় আর যাই হোক, মানবিকতা থাকতে পারে না। নারী দৈহিকভাবেই পুরুষের থেকে পৃথকসত্তা, অর্থাৎ নারী পুনরুৎপাদনক্ষম। অথচ পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারীর এই অবদানকে স্বীকৃতি না দিয়ে নারীকে দেখা হয় সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে। যদিও পুরুষের করা সকল সামাজিক কাজই নারী করতে পারে, তবুও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে অবদমিত রাখা হয় কখনো যৌনতার নামে, কখনো সামাজিকতার নামে, কখনো সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র বানিয়ে, কখনো বা ধর্মের দোহাই দিয়ে। এসবই পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য। রাজনৈতিকভাবে বুর্জোয়া বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে ঈশ্বরের সার্বভৌম কর্তৃত্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ব্যক্তির সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি বুর্জোয়ারা সামনে নিয়ে আসলেও উপনিবেশগুলোতে তা একই রকম ক্রিয়াশীল ছিল না। সেসব অঞ্চলে বুর্জোয়া বিকাশ হাত মিলিয়েছে ধর্মীয় ও জাতিগত সাম্প্রদায়িকতা, সামন্তবাদ ও রাজতন্ত্রের সঙ্গে। নয়াউপনিবেশের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। সেই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ তাদের নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী নারীর ব্যক্তিসত্তার স্বীকৃতি দিয়ে থাকলেও তার প্রজননসত্তা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অনেক দেশেই অমীমাংসিত রয়েছে। অর্থাৎ, নারীর পূর্ণ বিকাশের জন্য যে মুক্ত সমাজের দরকার, তা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, সমাজতন্ত্রেও পূর্ণাঙ্গভাবে শোষণহীন সমাজ আশা করা যায় না, কারণ সেখানেও বিদ্যমান থাকে শ্রেণী ও শ্রেণীসংগ্রাম, যদিও সেখানে থাকে সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব, সেই সঙ্গে নিশ্চিত হয় সম্পদের সামাজিকীকরণ। সেই সমাজেও পুরুষতন্ত্র ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় টিকে থাকতে পারে, তবে তা থাকে ক্রমাগত বিলুপ্ত হওয়ার পথে।

দশ.

এ দেশে চলমান কর্পোরেট সংস্কৃতি রোধের জন্য প্রয়োজন নয়াসাংস্কৃতিক আন্দোলন, যা মুক্তচিন্তার বিকাশে, চেতনাগত মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। কর্পোরেট সংস্কৃতি, উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, পুরুষতন্ত্র, ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডুকতা, পশ্চাদপদ চিন্তাচেতনার বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম করে যেতে হবে। শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি জনগণের সংস্কৃতিকে লালন করে তাকে বিস্তৃত করতে হবে। আমাদের বিস্মৃতপ্রায় লোকজ শিল্পসাহিত্যসংস্কৃতি, যা জনগণের লড়াই সংগ্রামের স্মারক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে, তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে, তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। শাসকশ্রেণীর চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতির বিপরীতে জনগণের সাংস্কৃতিক আন্দোলনই আমাদের সাহসী ভূমিকা নিতে সহায়ক হতে পারে। আমাদের মানস গঠনে সংস্কৃতি চর্চার কোনো বিকল্প নাই। আমাদের অতীত ইতিহাস সেই শিক্ষাই দিয়ে থাকে।

কর্পোরেট সংস্কৃতি নিজেকে “উন্নত” বলে প্রকাশ করলেও তা ব্যাপক জনগণের জীবনযাত্রার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। আর তা মার্ক্সবাদী বৈজ্ঞানিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী সম্পন্ন গণমুখী সংস্কৃতির সঙ্গে মোকাবেলা করতে অসমর্থ। তাই মার্ক্সবাদী বিপ্লবী সংস্কৃতির উত্থানে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতি পরাস্ত হতে বাধ্য। এই বৈজ্ঞানিক ও বিপ্লবী নতুন সংস্কৃতিই নয়াগণতন্ত্রের সংস্কৃতি।

এই নতুন সংস্কৃতি হলো শ্রমিক, কৃষক, মধ্যশ্রেণী সহ ব্যাপক মেহনতি জনগণ ও জাতিসত্তাসমূহের সাংস্কৃতিক ঐক্যের নিদর্শন। তা এভূখণ্ডের সকল জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক বিকাশকেই নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।

এক্ষেত্রে একটি কথা মনে রাখাটা জরুরী। সর্বহারাশ্রেণী হলো ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ববাদী ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী; ঐতিহাসিক ভাববাদ ও যান্ত্রিক বস্তুবাদের বিরোধী। বাস্তবিক অবস্থায়বাস্তবিক সিদ্ধান্তগ্রহণই যার মূল কর্মনীতি। যে কোনো মতবাদ, একেবারে সর্বোৎকৃষ্ট মতবাদ, এমনকি মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সংযুক্ত না হলে, বাস্তবিক অবস্থার নিরিখে তা চাহিদা পূরণ না করতে পারলে এবং জনগণ কর্তৃক তা আয়ত্ত করা সম্ভব না হলে, তা অকেজোই থেকে যায়। অর্থাৎ, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রণকৌশল নির্ধারণ করতে সক্ষম না হলে কোনো মতবাদই কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।

আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বইতিহাসে এখানকার মেহনতি জনগণের সংস্কৃতিকে হেয় ও পশ্চাদপদ জ্ঞান করা হয়, এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীর বিরুদ্ধেই নতুন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংস্কৃতির অবস্থান। এই সংস্কৃতি তার বিকাশের পথ তৈরি করবে জনগণের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক চেতনার উন্মেষের মাধ্যমে। এই নয়াসংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে শোষকশ্রেণীর মনোবল নিম্নগামী হতে থাকবে, অপরদিকে সর্বহারাশ্রেণী সহ নিপীড়িত শ্রেণীসমূহের মনোবল হয়ে ওঠবে আকাশচুম্বী।

আমাদের সাধারণ জনগণ এখনও নানাবিধ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। এইগুলি হলো মানুষের ভেতরের শত্রু। অনেক সময় দেখা যায় সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে লড়াইয়ের চেয়েও জনগণের মনের ভেতরকার এই শত্রুর সঙ্গে লড়াই করাটা বেশি কঠিন। জনগণের কাছে গিয়ে আমাদেরকেই বলতে হবে তাদের নিরক্ষরতা, কুসংস্কার ও অস্বাস্থ্যকর বদভ্যাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য। এই সংগ্রামের জন্য একটা ব্যাপক যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলা অপরিহার্য।

সাংস্কৃতিক কাজকর্মে যুক্তফ্রন্টের দুটিই মূলনীতি রয়েছে প্রথমটি হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সমালোচনা করা, শিক্ষা দেওয়া ও রূপান্তরিত করে তোলা। যুক্তফ্রন্টে আত্মসমর্পণ করা ভুল হবে এবং তেমনি নিজেদের বিশিষ্টতা বোধ থেকে ও অন্যদের প্রতি অবজ্ঞার ভাব থেকে সংকীর্ণতাবাদও ভুল হবে। মার্ক্সবাদী বিপ্লবীদের কর্তব্য হলো সকল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও পেশাজীবীদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, তাদের সাহায্য করা, তাদের সপক্ষে নিয়ে আসা এবং রূপান্তরিত করে তোলা। তাদের রূপান্তরিত করে তোলার জন্য প্রথমেই তাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

এই নয়াসংস্কৃতি হচ্ছে জনগণের সংস্কৃতি। এদেশের পুরাতন সংস্কৃতির মধ্যে যে প্রতিক্রিয়াশীল অংশকে বর্জন করতে হবে, তা সেই পুরনো রাজনীতি ও পুরনো অর্থনীতি থেকে অবিচ্ছেদ্য। ঠিক তেমনি নয়াসংস্কৃতি, নতুন রাজনীতি ও নতুন অর্থনীতি থেকে অবিচ্ছেদ্য। এই নতুন রাজনীতি হলো নয়াগণতন্ত্রের রাজনীতি, নতুন অর্থনীতি হলো নয়াগণতন্ত্রের অর্থনীতি। আর নতুন সংস্কৃতি হলো নয়াগণতন্ত্রের সংস্কৃতি। এটা হলো এখানকার বিপ্লবের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য। এই বিপ্লব দুটি পর্বে বিভক্ত নয়াগণতান্ত্রিক এবং সমাজতান্ত্রিক। প্রথম পর্ব হলো নয়াঔপনিবেশিক ও ফ্যাসিবাদী শোষণ থেকে মুক্ত স্বাধীন ও নয়াগণতান্ত্রিক সমাজমেনে নিলে গঠন; আর দ্বিতীয় পর্ব হলো এই বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক সমাজে রূপান্তর। আর বিপ্লবী কাজে নিযুক্ত রাজনৈতিক পার্টি, গ্রুপ বা ব্যক্তি, এই ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলে তারা ক্রমেই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন।

এই নতুন সংস্কৃতিকর্মীদের জনগণের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন সংস্কৃতির বিকাশ ও বিস্তার সম্ভব নয়। জনগণের প্রয়োজন, চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কাজ করতে হবে, ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছানুযায়ী নয়। কমরেড মাও সেতুঙ বলেন, প্রায়ই দেখা যায় বাস্তব দিক থেকে জনসাধারণের একটা পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু ভাবনার দিক থেকে তারা (জনগণ) তখনো ঐ প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেনি। এরকম ক্ষেত্রে, আমাদের ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। যতোক্ষণ আমাদের কাজের মধ্য দিয়ে জনসাধারণের অধিকাংশ এই পরিবর্তনের প্রয়োজন সম্পর্কে ইচ্ছুক হয়ে উঠছে বা ঐ পরিবর্তন সাধনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠছে, ততোক্ষণ ঐ পরিবর্তন নিয়ে আসা আমাদের দিক থেকে উচিৎ হবে না। অন্যথায় আমরা জনগণ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলব। আমাদের উগ্র হলে চলবে না; উগ্রতা পরিণামে শুধু ব্যর্থতাই ডেকে আনবে। যে কোনো কাজের ক্ষেত্রেই কথাটা সত্য এবং বিশেষ করে যে সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত কাজকর্মের লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের চিন্তাধারায় রূপান্তর নিয়ে আসা, সেক্ষেত্রে আরও বেশি করে সত্য।

সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতির প্রভাবে এখানে যে দালাল বুর্জোয়া শ্রেণীর উদ্ভব ঘটেছে, তারা কর্পোরেট স্বার্থে প্রতিনিয়ত ভূমি কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে কৃষক জনগণকে দেউলিয়াতে পরিণত করছে। এতে তাদের আরেকটা ফায়দা হলো সহজ ও অধিকহারে নিম্নমজুরীর শ্রমিক উৎপাদন। উল্লেখ্য যে, এই বিপুলহারে শ্রমিক সৃষ্টি হলেও তা কিন্তু শক্তিশালী শ্রেণীরূপে গড়ে ওঠেনি। তবে তা শক্তিশালী শ্রমিকশ্রেণীতে কখনো পরিণত হবে না, এমনটিও নয়। আর এভাবে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ, এদেশে দুই ধরনের লোকজনের সৃষ্টি করছে সাম্রাজ্যবাদের অনুসরণকারী ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু একটা অংশ, দালাল বুর্জোয়াশ্রেণী; এবং এমন এক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, যারা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, যার অন্তর্ভুক্ত শ্রমিকশ্রেণী, কৃষক জনগণ, শহুরে মধ্যশ্রেণী, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং এইসব শ্রেণীসমূহ থেকে আগত বুদ্ধিজীবীশ্রেণী। সংখ্যাগরিষ্ঠদের মধ্যকার সকলেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের মিত্রশক্তি, তাদের মধ্য থেকেই সূত্রপাত হবে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের।

ছাত্র আন্দোলন যদি শ্রমিককৃষকমেহনতি জনগণের আন্দোলন সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তবেই তা বিপ্লবী রাজনীতির পক্ষে পরিচালিত হওয়া সম্ভব। অপরদিকে, যখন তা কেবল শিক্ষার্থীদের বেতনভাতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলনেই আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন সে আন্দোলন যে অল্প সময়েই নেতিয়ে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য। তখন সেই আন্দোলন অর্থনীতিবাদের বাইরে যেতে পারে না। বাম ছাত্র সংগঠনগুলো শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে, আন্দোলনে তারা যুক্ত রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ সংগঠনই এ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলন পরিচালনা করার পথে ধাবিত হচ্ছে না। আর তাই শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতামূলক প্রচারণাটাও খুবই ক্ষীণ।

মার্ক্সবাদীদের কর্তব্য হলো সেই দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনের সূচনা করা। তা যতো স্বল্প শক্তি দিয়েই হোক না কেন আন্দোলনের গতিপথ যতোক্ষণ থাকে বিপ্লবী, ততোক্ষণ সেই স্বল্পশক্তিকেই ভয় সাম্রাজ্যবাদীদের। গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনের সূচনা করাটাই একান্ত কাম্য। এই গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি কেবল অর্থনীতিবাদী আন্দোলনে থেমে যাওয়া সম্ভব নয়, কারণ বর্তমান শাসন কাঠামো তা পূরণ হতে পারে না। এই কাঠামোটি একটি অগণতান্ত্রিক, নয়াঔপনিবেশিক, ফ্যাসিবাদী কাঠামো। বিভিন্ন দাবি আদায়ের আন্দোলন অবশ্যই করবে শিক্ষার্থীরা, তাতে মার্ক্সবাদীদের কেবল সামিল নয়, নেতৃত্বও দিতে হবে সামনে দাঁড়িয়ে, রাজনৈতিকভাবে। কিন্তু এটি অর্থনৈতিক আন্দোলন, অর্থাৎ ইস্যুভিত্তিক, আর তাই এই ধরনের আন্দোলনেই বারবার ঘুরপাক খেতে থাকলে তা যেমন সাংগঠনিক শক্তির ক্ষয়সাধন করবে, তেমনি তা নিমজ্জিত হবে অর্থনীতিবাদী আন্দোলনে। অর্থাৎ, যে আন্দোলনের কোনো দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক লক্ষ্য থাকে না। অথচ অর্থনৈতিক আন্দোলনকে থাকতে হয়, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক আন্দোলনের অধীন। অর্থাৎ, বন্ধুর পথে বৃহৎ লক্ষ্যের দিকে এগোতে থাকলে পথে অনেক চড়াইউৎড়াই পার হতে হবে খুব স্বাভাবিকভাবেই, আর এগুলোই অর্থনৈতিক আন্দোলন। কিন্তু ওই চড়াইউৎড়াইএর গোলক ধাঁধাঁয় আবদ্ধ হয়ে পড়লে বৃহৎ লক্ষ্যটা কখনোই কাছে আসবে না। আর এটাই অর্থনীতিবাদী আন্দোলনের সারকথা। গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যে পরিবর্তনসমূহ করা দরকার, তা বৈপ্লবিক আমূল পরিবর্তন ছাড়া সম্ভব নয়।

বিপ্লবী রাজনৈতিক চেতনাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে শুধু শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নয়; বরং শাসকশ্রেণীর প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত, গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের আন্দোলনকে সর্বোপরি সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে বিপ্লবী শ্রেণীসমূহের গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে পারলেই শিক্ষাব্যবস্থায় কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহকে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। আমরা এগিয়ে যেতে পারব এক নয়াগণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথে সমাজতন্ত্রসাম্যবাদের লক্ষ্যে। আর এভাবে এই বৈপ্লবিক ছাত্র আন্দোলন ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বাংলাদেশের নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবে।।

এপ্রিল ২০১৫

[এখানে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ করা হয়েছে মেডিক্যাল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোই এর অন্তর্ভুক্ত]


সহায়ক প্রকাশনাসমূহ

১। কমিউনিস্ট ইশতেহার কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস

২। সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন

৩। নয়াগণতন্ত্র সম্পর্কে মাও সেতুঙ

৪। ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মুক্তি নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো

৫। বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণের উপনিবেশায়ন মোহাম্মদ আজম

৬। জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে শাহেরীন আরাফাত

৭। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন

৮। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন

৯। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার জন্য কৌশলপত্র (২০০৬২০২৬)

১০। টিআইবি গবেষণাপত্র

১১। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের প্রতিবেদন

১২। Higher Education Quality Enhancement Project (HEQEP) সহ বিভিন্ন ওয়েবসাইট

১৩। বিভিন্ন শিক্ষা বিষয়ক জার্নাল

১৪। বিবিধ

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.