‘প্রকৃত শিক্ষিত’ লোকের অভাব নয়, কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিপর্যয়ের কারণ অন্যখানে

Posted: জানুয়ারি 4, 2018 in দেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , ,

লিখেছেন: আহ্‌নাফ আতিফ অনিক

শ্রদ্ধেয় বদরুদ্দীন উমর তার সম্পাদিত সংস্কৃতি পত্রিকার অক্টোবরনভেম্বর মহান অক্টোবর বিপ্লবের শত বার্ষিকী বিশেষ সংখ্যায়, ‘সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের পথ’ শিরোনামে কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূল্যায়নধর্মী একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। ই প্রবন্ধে তিনি তার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে দেখেছেন। তার এই লেখাটি ছোট হলেও এটিই তার বর্তমান অবস্থানকে নির্দেশ করছে। তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সফলতাব্যর্থতাকে কিভাবে দেখছেন, তা এই লেখায় স্বল্প পরিসরে হলেও সামগ্রিকভাবেই এসেছে। কিন্তু ই লেখায় তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনকে মূল্যায়ন করেছেন এক যান্ত্রিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক মূল্যায়নের দ্বারা। নিঃসন্দেহে বদরুদ্দীন উমর এদেশের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। আর জন্যই তার অসা যুক্তির লেখাটিকে সংগ্রাম করাকে বিপ্লবী কর্তব্য বলেই মনে করি।

বদরুদ্দীন উমর তার লেখার শুরুর দিকেই বলেছেন, “১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মার্ক্সবাদলেনিনবাদের তত্ত্বচর্চা কিছুই ছিলো না, আর এই চর্চা না থাকার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, “প্রকৃত শিক্ষিত লোকের অভাব”। বাস্তব বিশ্লেষণে দ্যাখা যায়, এই কথাটি সঠিক নয়। বাস্তবতাকে দ্বান্দ্বিক পদ্ধিতিতে না দেখার ফল হিসেবেই এমনটা তিনি এমন মূল্যায়ন টেনেছেন। এটা হলো বিপ্লবী আন্দোলনকে বিপ্লবী লাইনের মাধ্যমে মূল্যায়ন না করে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক মূল্যায়ন। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে বহু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত ব্যক্তি এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্বে এসেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনআব্দুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, সুখেন্দু দস্তিদার, কাজী জাফর, আব্দুল মতিন প্রমুখ। তাঁরা প্রত্যেকেই বড় বড় প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন, মার্ক্সবাদলেনিনবাদ অধ্যয়ন করেছেন। অন্যদিকে, বদরুদ্দীন উমর নিজেও একজন ‘প্রকৃত শিক্ষিত’ ব্যক্তি। আফসোসের বিষয়, এতো শিক্ষিত ব্যক্তিকে বদরুদ্দীন উমর দেখতে পেলেন না। যদিও ‘প্রকৃত শিক্ষিত’ বলতে তিনি কি বুঝিয়েছেন, তাও ভালোভাবে পরিষ্কার করেননি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে বহু ত্যাগী ও ‘প্রকৃত শিক্ষিত’ ব্যক্তি আসলেও, সঠিক লাইন নির্মাণে ব্যর্থ হওয়ায় তারা এদেশে বিপ্লবী আন্দোলন অগ্রসর করতে ব্যর্থ হয়েছেন ও শেষে অধঃপতিত হয়েছেন। তাই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে ব্যর্থতার প্রধান কারণ ‘প্রকৃত শিক্ষিত’ লোকের অভাব নয়, অভাব সঠিক বিপ্লবী লাইনের, মতাদর্শের। যে লাইন মানুষকে আক্ষরিক অর্থে ‘প্রকৃত শিক্ষিত’ করে তুলবে। সমাজ বিপ্লবের প্রায়োগিক ক্ষেত্রে বিকাশ ঘটাবে।

রাশিয়ায় লেনিনসহ বহু বুদ্ধিজীবী সেখানে তত্ত্বচর্চা করেছিলেন, শুধু কারণেই যেন রাশিয়ায় বিপ্লব হয়েছিলোবদরুদ্দীন উমর ওই লেখাটি পড়লে পাঠকের এমনটাই বোঝার অবকাশ রয়েছে। লেনিন রাশিয়ায় শুধু তত্ত্ব চর্চা করেননি। তিনি তত্ত্ব ও প্রয়োগের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে খুব ভালোভাবেই বুঝেছিলেন। লেনিন একদিকে নতুন তত্ত্ব নির্মা করেছেন, অন্যদিকে সেই তত্ত্বকে বিপ্লবী সর্বহারা আন্দোলনের মাধ্যমে পরীক্ষা করে নিয়েছেন। এভাবেই লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় তত্ত্ব নির্মা হয়েছে ও সেই তত্ত্বের প্রয়োগের ফলে বহু নতুন তাত্ত্বিক গড়ে উঠেছেন। তাত্ত্বিকরা আকাশ থেকে পড়ে না। একজন তাত্ত্বিক গড়ে উঠেন বাস্তব সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

লেনিনবাদ একইসঙ্গে মার্ক্সবাদের বিকাশ, আবার তা মার্ক্সবাদের থেকে বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। মার্ক্সবাদলেনিনবাদ এক অখণ্ড সত্তা। ঠিক সেই কারণেই মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদ হলো মার্ক্সবাদলেনিনবাদের বিকাশ। আবার মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদ এক অখণ্ড সত্তা। মার্ক্সবাদ বা লেনিনবাদকে বাদ দিয়ে মাওবাদ হয় না। আর মাওবাদ শুধুমাত্র মাও সেতুঙএর মতবাদএভাবে যদি দেখা হয় তাহলে লেনিনবাদকেও মার্ক্সবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে হয়। বদরুদ্দীন উমর মাও সেতুঙএর অবদানকে মতবাদ হিসেবে দেখতে রাজি নন। এমনটা তিনি দাবি করতেই পারেন! কিন্তু তা বলে মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদ খারিজ হয়ে যায় না। বদরুদ্দীন উমর তার লেখার একটি অংশে বলছেন, “মাওবাদীরা মার্ক্সলেনিনকে বাদ দিয়েই মাওবাদের কথা বলেন।” এই কথাটি বলার মধ্য দিয়ে তিনি মার্ক্সবাদলেনিনবাদের অবস্থানও ধরে রাখতে পারেননি। মতবাদকে সঠিকভাবে ধারণ না করার ফলেই তিনি এমনটা বলেছেন। কারণ মাওবাদ মার্ক্সবাদলেনিনবাদ বিরুদ্ধ কিছু নয়, বরং তার বিকশিত রূপ।

বদরুদ্দীন উমর বিজয় দিয়েই সমস্ত সফলতাকে দেখার ভুলে আবদ্ধ হয়েছেন। মাওবাদীরা কেন কোনো দেশেই বিপ্লব করতে পারলো না, সে জন্য তত্ত্বটিই ভুল হয়ে গেলোমন খেলো যুক্তি কোনোভাবেই মার্ক্সবাদসম্মত হতে পারে না। কিন্তু তিনি তার লেখায় এই যুক্তিটিই হাজির করেছেন। মাওবাদীদের নেতৃত্বে নেপালে বড় ধরনের গণযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। পেরুতে গণযুদ্ধের বিকাশ ঘটেছিলো। ভারত, ফিলিপাইনে মাওবাদীদের নেতৃত্বে বৃহৎ সংগ্রাম চলছে। তারপরেও শ্রদ্ধেয় বদরুদ্দীন উমরের চোখে মাওবাদীদের বিকাশ ধরা পছে না!

তাহলে প্রশ্ন করা যেতে পারে ৭০ দশকের পরে মার্ক্সবাদীলেনিনবাদী দাবিদাররাও তো কোনো দেশে বিপ্লব করতে পারেনি। তবে কি মার্ক্সবাদলেনিনবাদ ভুল হয়ে যায়? তত্ত্বকে বাস্তব প্রয়োগ থেকে দূরে রাখার ফলেই বদরুদ্দীন উমর এসর খেলো যুক্তি দিয়ে থাকতে পারেন।

এক জায়গায় বদরুদ্দীন উমর উল্লেখ করছেন, “মাও সেতুঙএর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি চীন বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া এবং চীনের বিপ্লব সাধন করা।” এক্ষেত্রেও ব্যাপারটি এরকম নয়। প্রতিনিয়ত, অব্যাহত নতুনভাবে বিকশিত হয়ে বিপ্লব এগিয়ে চলে। প্যারি কমিউন থেকে শিক্ষা নিয়ে লেনিন যে বিপ্লব করেছেন তা অবশ্যই প্যারি কমিউন থেকে অগ্রসর। ঠিক তেমনি চীন বিপ্লবের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের সমস্যাবলী থেকে শিক্ষা নিয়ে মাও সেতুঙ চীনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব সংঘটিত করেছেন। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মধ্য দিয়েই আবিষ্কৃত হয়েছে কিভাবে সমাজতান্ত্রিক সমাজ থেকে কমিউনিজমে পৌঁছানো যায় তার মূর্ত রূপ। সমাজতান্ত্রিক সমাজে শ্রেণী সংগ্রামের মূর্ত রূপ সাংস্কৃতিক বিপ্লবই হলো মাও সেতুঙএর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান। তাই মাওএর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হিসেবে শুধুমাত্র চীন বিপ্লব সাধনকে উল্লেখ করা যায় না।

বদরুদ্দীন উমর ওই লেখায় আরো উল্লেখ করেছেন, তিনটি কারণে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন এগিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই তিন কারণের মধ্যে প্রথম কারণ হিসেবে বলেছেন, “ভারতের কমিউনিস্ট নেতৃত্ব ও সদস্যদের মধ্যে মধ্যশ্রেণীর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা। পার্টি সদস্যদের মধ্যে আশি নব্বই শতাংশই ছিলেন মধ্যশ্রেণীভুক্ত।” প্রথমে ঠিক করা দরকার যে, ব্যক্তি নির্ধারক নাকি রাজনৈতিক লাইন। একজন কমরেড কোন শ্রেণী থেকে আসলেন, সেটা মোদ্দা কথা, নাকি সঠিক লাইনে নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারাটাই মূল কথা?

ব্যক্তিকে রাজনৈতিক লাইন পরিচালিত করে। তাই কোনো ব্যক্তির দ্বারা লাইনকে দেখা মানে হলোউল্টো দিক দিয়ে দেখা। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে মধ্যশ্রেণী থেকে আগত কমরেডদের প্রাধান্য থাকাটা সমস্যা ছিলো না, সমস্যা ছিলো সঠিক লাইনের। কারণ একটি সঠিক বিপ্লবী লাইনই মধ্যশ্রেণী থেকে আসা কমরেডদের শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিপ্লবী পরিবর্তন ঘটায়। কিন্তু লাইন সঠিক না হলে, সর্বহারা শ্রেণী থেকে উঠে আসলেও সেই নেতৃত্ব ব্যর্থ হতে বাধ্য। কারণ অবিপ্লবী লাইন কোনো কমরেডকে বিপ্লবী বানাতে পারে না। বরং বিপ্লবী রাজনৈতিক লাইন অবিপ্লবীকে বিপ্লবী বানাতে সক্ষম। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি লাইনগতভাবে ১৯৬৭ সালের আগে বিপ্লবী ক্ষমতা দখলের লাইন হাজির করতে পারেনি। কারণেই এতো বড় বড় কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলন গড়ে ওঠা সত্ত্বেও ভারতে বিপ্লব হয়নি।

ভারতের বিপ্লব না হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বদরুদ্দীন উমর উল্লেখ করেছেন, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে ব্যাপক পরিমাণে ‘সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদীদের যোগ দেয়া ও সশস্ত্র সংগ্রামকে’। ‘সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদীরা’ পার্টিতে যোগ দেয়ার ফলেই নাকি পার্টি জনবিচ্ছিন্ন হয়েছে। অথচ ইতিহাস বলছে, ভারতের পার্টি দিন দিন জনবিচ্ছিন্ন হয়েছে সঠিক বিপ্লবী লাইন নির্মা করতে না পারার কারণে।

তিন নম্বর কারণ হিসেবে বদরুদ্দীন উমর বলেছেন, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নির্বাচনের ফাঁদে পড়া। এই কারণটিও অর্ধসত্য। কারণ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি নির্বাচনে গিয়েছিলো তাদের লাইনের কারণে। এতে ফাঁদে পড়ার কিছু নেই। বরং স্তালিনের মৃত্যুর পর, ১৯৫৬ সালে ক্রুশ্চেভ চক্র ক্ষমতা দখল করে সংশোধনবাদী তত্ত্ব ফেরি করতে শুরু করলে ভারতের পার্টি তা ভালোভাবেই রপ্ত করে। তাই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সেই সময় থেকেই একটি বুর্জোয়া পার্টিতে পরিণত হয়। সেজন্য এরা ৩৪ বছর ক্ষমতায় থেকেছে বুর্জোয়া পার্টি হিসেবেই। এই পার্টির নেতৃত্বে বিন্দুমাত্র বিপ্লবী উপাদান আর অবশিষ্ট ছিলো না।

১৯৭১ পরবর্তী কমিউনিস্ট আন্দোলনকে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে বদরুদ্দীন উমর বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে মাথায় না নিয়ে এক তরফাভাবে বলেছেন, “কমিউনিস্টদের দেউলিয়াপনার কারণেই বাংলাদেশের তরুরা বিপ্লবে অংশ নিচ্ছে না।” সাম্রাজ্যবাদ ও তার দেশীয় দালাল শাসকশ্রেণী সৃষ্ট সমস্যাবলী এক্ষেত্রে তার চোখে প্রধান হয়ে উঠলো না! বাস্তবে ১৯৭১ সালের পরেও প্রচুর ছাত্রযুবা বিপ্লবী রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন, কিন্তু সঠিক লাইন ও তার যথাযথ প্রয়োগ না থাকায়, বিপ্লব সফল হয়নি। বার বার পিছিয়ে পড়েছে

লেখার শেষে তিনি বলছেন, “কিন্তু আমাদের মতো দেশে কৃষক ও শ্রমিকের শিক্ষার অভাবে মধ্যশ্রেণীর শিক্ষিত লোকের সাহায্য ছাড়া কৃষক শ্রমিকের মধ্যে সংগঠন গড়া ও তাকে যুদ্ধের জন্য শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের শিক্ষিতদের মধ্যে এ ধরনের নেতাকর্মীর অভাবই এখনো পর্যন্ত বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সব থেকে বড় প্রতিবন্ধক।”

একই লেখার প্রথমদিকে যেখানে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ব্যর্থতার জন্য মধ্যশ্রেণী থেকে আসা কমরেডদের উপর দোষ চাপালেন। আবার ওই লেখার শেষে বলছেন, মধ্যশ্রেণী থেকে ব্যক্তিরা না আসাকে বিপ্লবের প্রধান প্রতিবন্ধক বলছেন। এর মাধ্যমে ওই লেখায় তাঁর স্ববিরোধিতাই আরো প্রকটভাবে স্পষ্ট হয়েছে

মূলত তিনটি ক্ষেত্রে সঠিক উপলব্ধি না আসার ফলেই বদরুদ্দীন উমর এমন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিকশিত মতাদর্শ মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদ গ্রহণ করেননি। একটি বিপ্লবী পার্টি গঠন করতে পারেননি, বিপ্লবী পার্টি গঠনের লক্ষ্যে শ্রমিককৃষককে সজ্জিত করতে পারেননি। তিনি সর্বহারা শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন।

মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদ হলো আজকের দিনের মার্ক্সবাদবিপ্লবের বিজ্ঞান। এই মতাদর্শ গ্রহণ না করলে সঠিক বিপ্লবী অবস্থানকে আঁকড়ে ধরে থাকাটাও সম্ভব হয় না। ইতিহাস আমাদের দেখায়, অতীতে যারা মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাও সেতুঙ চিন্তাধারা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বা মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাও সেতুঙ চিন্তাধারা বর্জন করেছে, তারা প্রত্যেকেই বিপ্লব থেকে বিচ্যূত হয়েছে, তবে যারা যারা গ্রহণ করেছিলেন, তারা প্রত্যেকেই কমবেশি শ্রমিককৃষকের মাঝে অবস্থান নিয়েছিলো। কিন্তু আজকের দিনে যারা মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদের আদর্শে নিজেদের পরিচালনা করে না, তারা কেউই শ্রেণী প্রশ্নকে কঠোরভাবে আঁকড়ে ধরে না। তারা শ্রমিককৃষক থেকে বিচ্যুত, কার্যত শহুরে মধ্যশ্রেণীর মধ্যেই ঘুরপাক খায়। বিপ্লবী যুদ্ধের মাধ্যমে ক্ষমতাদখল বিপ্লবের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মালেমা আমাদের শেখায়, কিভাবে একটি যুদ্ধ গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যেখানে সাম্রাজ্যবাদের নিচু মাত্রার যুদ্ধ চলছে, সেখানে যুদ্ধকে কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হিসেবেই আনতে হবে। বদরুদ্দীন উমর এই প্রশ্নে কখনোই সঠিক অবস্থান নিতে পারেননি। ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে বিপ্লবকে পরিচালনার জন্য মালেমা ছাড়া আর কোনো মতাদর্শ আজকের দিনে সঠিক অবস্থান নিতে পারে না। আমাদের পাশের দেশ ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মাওবাদী) তাদের সংগ্রামকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভারতের কোনো পার্টিই তাদের মতো শ্রমিককৃষকআদিবাসীদের মধ্যে কাজ গড়ে তুলতে পারেনি। পারেনি ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে সকল সংগ্রামকে ঐক্যবদ্ধভাবে পরিচালনা করতে। মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদ আমাদের শেখায়, বিপ্লবের জন্য শ্রেণীচ্যুত হতে হয়অর্থাৎ, শ্রেণীবিভক্ত সমাজের অন্যান্য শ্রেণী থেকে আগত কমরেডরা শ্রেণীচ্যূত হয়ে সর্বহারা শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবে। লক্ষ্যে সর্বহারা উৎপাদন সংগ্রামে অংশ নিতে হয়। ছাত্রযুবাদের শ্রমিক ও কৃষকের মাঝে যেতে হয়।

একটি দেশে বিপ্লব করতে হলে প্রয়োজন হয় একটি সঠিক তত্ত্বে সজ্জিত বিপ্লবী পার্টি। বাংলাদেশে আজকের দিনের কমিউনিস্ট আন্দোলনে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলোএকটি সঠিক তত্ত্বে সজ্জিত বিপ্লবী পার্টি গড়ে না ওঠা। এর বাইরে বাকি সব সমস্যায় গৌণ। কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সামগ্রিকভাবে না দেখে ভাসাভাসা বা আংশিকভাবে দেখলে, হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। বদরুদ্দীন উমর জীবনভর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানে থাকলেও, সঠিক বিপ্লবী পার্টি ও সঠিক তত্ত্ব নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারেননি। কারণ বিপ্লবী পার্টি গড়ে তুলতে হলে ও বিপ্লব করতে হলে সর্বহারা শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি আয়ত্ব করতে হয়, শ্রেণীচ্যুত হতে হয়। আবদরুদ্দীন উমর তাঁর তত্ত্বচর্চা থেকে কখনোই বেরোতে পারেননি। যে তত্ত্বচর্চা আজীবন বন্দি বইয়ের কালো অক্ষরে।।

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.