‘ক্যাপিটাল’ প্রকাশনার ১৫০তম বার্ষিকী ও তার বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা

Posted: জানুয়ারি 3, 2018 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: অজয় রায়

১৮৬৭ সালের সেপ্টেম্বরে বার্লিনে প্রকাশিত হয় কার্ল মার্ক্সের পুঁজি: রাজনৈতিক অর্থনীতির এক সমালোচনা (ক্যাপিটাল)-এর প্রথম খণ্ড।[] যেখানে পুঁজিবাদী সমাজের গতিশীলতার বিধি উদ্ঘাটন করা হয়। এই বইয়ের প্রকাশনা রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সমাজ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য রূপান্তরের সন্ধিক্ষণ হিসাবে চিহ্নিত। কারণ, বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি শোষণকারী দেশে পুঁজিবাদী বিকাশের প্রণালী বোঝার জন্য বস্তুবাদী দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির এটাই ছিল প্রথম সফল প্রয়োগ। মার্ক্সের মৃত্যুর পরে তাঁর আজীবনের সহকর্মী ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের সম্পাদনায় ক্যাপিটালএর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় খণ্ডও প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৮৮৫ ও ১৮৯৪ সালে। আর এই বই বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়।

ক্রমে ক্রমে ‘‘শ্রমিক শ্রেণীর বাইবেল’’ হয়ে ওঠে ক্যাপিটাল। যেখানে মার্ক্স তাঁর ধারণাগুলিকে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। আর এর মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণীকে সমাজতন্ত্র অভিমুখী বিপ্লবী সংগ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক হাতিয়ারে সজ্জিত করেন। তাছাড়া মার্ক্সের এই লেখার অসাধারণ সাহিত্যমূল্যও চিরকালই টানে। ‘দ্বান্দ্বিকতার কবি’ হিসাবে যে সৃষ্টিতে তিনি ‘‘শৈল্পিক সম্পূর্ণতা’’ অর্জনে জোর দিয়েছেন।

মার্ক্স মূলত দুটি বিষয় আবিষ্কার করেন যা পুঁজিবাদের হৃদয়ে আঘাত হানে। প্রথমত, পুঁজিবাদ স্বাভাবিক বা শাশ্বত নয়। আর দ্বিতীয়ত, পুঁজিবাদের ‘বিশেষ বিধি’ উদঘাটন করেন তিনি। ক্যাপিটালএর প্রথম খণ্ডে দ্বিতীয় আবিষ্কারটির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে; আর প্রথমটি অবলম্বনে তা করা হয়েছে। এই প্রথম খণ্ডটির বিষয়বস্তুই হল পুঁজির উৎপাদন প্রক্রিয়া। আর দ্বিতীয় খণ্ডে পুঁজির সঞ্চালন প্রণালীতে আলোকপাত করেছেন মার্ক্স। তৃতীয় খণ্ডে সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাদী উৎপাদন ও বন্টনের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

উনিশ শতকের উত্তরপশ্চিম ইউরোপের আর্থসামাজিক বাস্তবতার বর্ণনা মেলে ক্যাপিটালে। বর্তমানে অবশ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তবে পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির মূলগত চরিত্রের তারতম্য ঘটেনি। যেটা লক্ষণীয়, মূল্য, উদ্বৃত্ত মূল্য, শোষণের হার (অথবা উদ্বৃত্ত মূল্যের হার), পুঁজির জৈব গঠন, মুনাফার হার, তুলনামূলক উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা (বা শিল্পজাত শ্রমের মজুতবাহিনী), ইত্যাদি সংক্রান্ত তাঁর ধারণাগুলিকে হাতিয়ার করে মার্ক্স পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকাশ প্রক্রিয়ার মধ্যে এক গুচ্ছ দ্বন্দ্ব আবিষ্কার করেন। যেখানে ঐতিহাসিক শক্তিগুলি পরিবর্তনে উৎসাহ দেয়। পাশাপাশি, ব্যবস্থাগত শক্তিগুলি স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চায়। আর তাদের মধ্যে চলে সংঘাত।

মার্ক্স দেখান পুঁজি কেবলমাত্র কোন সম্পদ বা উৎপাদনের উপাদান নয়, বরং উৎপাদনের নির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্কগুলির এক অভিব্যক্তি। আর পণ্যের (বিনিময়ের জন্য উৎপাদিত পণ্যদ্রব্য ও পরিষেবা) মধ্যে রয়েছে বিপরীতের ঐক্য: ব্যবহার মূল্য (মানুষের প্রয়োজন বা চাহিদা পূরণ করে) এবং বিনিময় মূল্য (অন্যকিছুর বিনিময়ে লেনদেন করা যায় এমন কোন জিনিস হিসাবে)। সেই সঙ্গে মার্ক্স পণ্য বস্তুকামের (কমোডিটি ফেটিশিজম) ধারণাও দেন। যা ব্যাখ্যা করা যায় এইভাবে যে, পণ্যসামগ্রীর দুনিয়ায় ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলি বাস্তবে পরিণত হয় জিনিসপত্রের মধ্যেকার সম্পর্ক হিসাবে।

মার্ক্স পুঁজিবাদের তিনটি মূল বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করেন। প্রথমত, মুষ্টিমেয়র হাতে উৎপাদনের উপকরণের কেন্দ্রীভবন ঘটে পুঁজিবাদে। দ্বিতীয়ত, শ্রমকে সংগঠিত করা হয় সামাজিক শ্রমে। আর তৃতীয়ত, বিশ্ব বাজার তৈরি হয়। এদিকে, পুঁজির মৌলিক গতি ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধি করে। সেই সঙ্গে মেহনতি মানুষের দারিদ্র বাড়িয়ে তোলে। ফলে শ্রেণীসংগ্রামের সৃষ্টি হয়। আর তা শ্রেণীগুলির অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাতেরও জন্ম দেয়। এইভাবে পুঁজিবাদ নিজস্ব বিকাশের মধ্য দিয়েই সামাজিক শক্তি রূপে সৃষ্টি করে শ্রমিক শ্রেণীকে; যা পুঁজিবাদের ঐতিহাসিক কবর খননকারী।

মার্ক্স উদ্ঘাটন করেন পুঁজির আদিম সঞ্চয় মারফত পুঁজিপতিদের হাতে উৎপাদনের উপকরণের কেন্দ্রীভবনের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটিও। যাতে উৎপাদনের উপকরণের পূর্ববর্তী মালিকদের ব্যাপকহারে উচ্ছেদ করা হয়। এটা বহুলাংশেই হিংসাত্মক প্রক্রিয়া। আর তিনি দেখান, পুঁজিবাদী উৎপাদনের প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিহিত আছে শোষণ। শ্রমিকদেরকে কর্মক্ষম রাখতে যেটুকু মূল্য দরকার তার বাইরে উদ্বৃত্ত তৈরি করিয়ে সেই মূল্য আত্মসাৎ করে পুঁজিপতিরা। সেজন্যই মার্ক্স লিখেছেন, “পুঁজি হচ্ছে মৃত শ্রম, যা রক্তচোষা বাদুড়ের মতো জীবিত শ্রমকে শুষে বেঁচে থাকে।”[]

মার্ক্স দেখান, ধনবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার মৌলিক দ্বন্দ্ব হচ্ছে উৎপাদনের সামাজিক চরিত্র বনাম ব্যক্তিগত মালিকানার দ্বন্দ্ব। তিনি উদ্বৃত্ত মূল্যের রহস্য উদ্ঘাটন করেন। তা থেকে আবিষ্কার করেন, পণ্য উৎপাদন ও মজুরিশ্রম ভিত্তিক সামাজিক সম্পর্কের ব্যবস্থা এবং উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের মধ্যেকার সহজাত দ্বন্দ্ব আর সঙ্কটের অনিবার্যতার বিষয়টি। যা প্রতিফলিত হয় মুনাফার হার হ্রাসের প্রবণতায়।

স্পষ্টতই, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা শ্রমিককে যন্ত্রের দাসে পরিণত করে। ধনবাদীরা নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়। ব্যয় হ্রাস করতে তারা শ্রমের বিকল্প হিসাবে আরও প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চায়। অধিক মুনাফার জন্য শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর এই প্রচেষ্টার পরিণতিতে কিন্তু মুনাফার হার কমতে থাকে। যা বিশ্বব্যাপী উৎপাদনের সঙ্কট সৃষ্টি করে। পুঁজি নিজেই নিজের বিপর্যয় ডেকে আনে।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অপর এক মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিচ্ছিন্নতা। এটা সমাজ বা জনগোষ্ঠীর থেকে কোন স্বতন্ত্র ব্যক্তির বিচ্ছেদের অনুভূতির বিশেষ অভিজ্ঞতা নয়, বরং ব্যাপক অংশের মজুরি শ্রমিকদের এক সাধারণ অবস্থা নির্দেশ করে। এছাড়াও যেটা মার্ক্স দেখান, মানব শ্রম ও প্রকৃতির শোষণ থেকেই সম্পদের উৎপত্তি হয়। পরিবেশগত প্রশ্নে মার্ক্সের উদ্বেগও লক্ষণীয়।

স্পষ্টতই, মার্ক্সবাদের আদর্শ পৃথিবীর দেশে দেশে বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত করেছে। আর বিংশ শতাব্দীতে রাশিয়া, চীনসহ নানা দেশে শ্রমিক শ্রেণী ক্যাপিটালের শিক্ষা সফলভাবে প্রয়োগ করে। এপথে শাসক শ্রেণীর রাজনৈতিক ক্ষমতা ধ্বংস করে।

লক্ষণীয় যেটা, সমসাময়িক পুঁজিবাদ বোঝার জন্যও ধারণা কাঠামো জোগায় মার্ক্সের ক্যাপিটাল। যখন ২০০৮ সালে সমগ্র দুনিয়ার পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে গ্রাস করে আর্থিক সঙ্কট। যার থেকে বিশ্বায়িত পুঁজিবাদী অর্থনীতি এখনও মুক্ত হতে পারেনি। এদিকে, নয়াউদারবাদী অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে উৎপাদনের উপকরণের মালিকানার আরও কেন্দ্রীভবন ঘটে চলেছে। আর বিশ্বে শত শত কোটি শ্রমজীবী তৈরি হয়েছেন। শ্রমিকদের ব্যাপকমাত্রায় শোষণও চলছে। মেহনতি মানুষের অধিকারের উপর আক্রমণ বাড়ছে। আর সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির দুনিয়াজোড়া তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। পুঁজির ‘‘আদিম সঞ্চয়’’এরও প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। মনুষ্য শ্রম এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অবাধে লুঠপাট চলছে। সেই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে দারিদ্র, অসাম্য ও বেকারত্ব। ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ। এর মধ্যেই মার্ক্সের ক্যাপিটালএর প্রাসঙ্গিকতা উপলব্ধি করা যাচ্ছে।

৩০/১২/২০১৭

তথ্যসূত্র

[] Das Kapital”, Encyclopædia Britannica

[] Karl Marx, ‘‘Capital: A Critique of Political Economy’’, Volume I, Chapter 10, Section 1, (Progress Publishers, Moscow, USSR), p. 163

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s