(নেসার আহমেদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক গ্রন্থ ক্রসফায়ার রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড থেকে)

জামিলা আক্তার

নেসার : আপনার নামটা আগে বলুন।

জামিলা : জামিলা আক্তার। আমার বড় ভাই ছিলেন। আমরা দাদা বলতাম। উনি আমাদের পরিবারের সবাইকে ভীষণ আদর করতেন।

নেসার : আপনার বড় ভাইয়ের নামটা বলুন?

জামিলা : উনার আসল নাম আমি ঠিক বলতে পারব না। সমিরদা নামে ডাকতাম। একদিন উনি আমার বাসায় বাচ্চাদের জন্য কিছু খাবারদাবার আনছেন। তখন আমি বলছি যে, দাদা এগুলার দরকার কী? উনি বলছেন যে, এগুলা তোমার জন্য না। এগুলা আমার ভাতিজিভাতিজার জন্য। তিনি আমাদের পরিবারের লগে এমন আপন ছিলেন যে। তাছাড়া, খুব তাড়াতাড়ি আপন করে নিতে পারতেন তিনি। তার মধ্যে আন্তরিকতা ছিল খুব বেশি।

নেসার : আপনার সাথে রাজনীতি নিয়ে কথা হতো কি তার?

জামিলা : না। আমি সময়ও পাইতাম না। ব্যস্ত থাকতাম সব সময়।

নেসার : আপনার সাথে তার পরিচয় হয়েছিল ঠিক কোন সময়?

জামিলা : বিয়ার পরতি দেখা হইত। কথা বলতাম। ভালো ভালো উপদেশমূলক কথা বলতেন।

নেসার : কতসালে বিয়ে হয়েছিল আপনার?

জামিলা : ’৯০ সালে।

নেসার : উনি কি করতেন, কোন দল করতেনএটা কি আপনি জানতেন?

জামিলা : না। উনি আমার এক আত্মীয়র সাথে আসতেন। আমার ওই আত্মীয় দল করে এটা জানতাম।

নেসার : উনি মারা যাওয়ার সংবাদ কবে পেয়েছিলেন?

জামিলা : মারা যাওয়ার পরের দিন।

নেসার : তারপর?

জামিলা : তারপর তো খারাপ লাগছে। একজন ভালো মানুষ, জ্ঞানীবুদ্ধিমান, এরকম একজন ভালো মানুষকে মেরে ফেলায় আমাদের খুব খারাপ লাগছে। আমরা বড় ভাই হিসেবে মানতাম না শুধু, তাই আমাদের আপন বড় ভাই। এজন্য খুব খারাপ লাগছে। তাছাড়া, তার আচারব্যবহারের মধ্যে কোনো দিন খারাপ কিছু দেখিনি। খুব ভালো মানুষ মনে হইত। আর দেখতেও তো খুব সুন্দর ছিল, লম্বায়চওড়ায়। বাড়িতে আসলে মনে হতো আপন কেউ আসছে। তাকে মারবে বা তাকে এভাবে মারা হবে এটা কোনো দিন চিন্তাও করি নাই। কারণ ভালো মানুষকে এভাবে মেরে ফেলা এটা জাতির জন্য খারাপ জিনিস। তারপরে বিচার আছে। আইন আছে, আদালত আছে। আইনেই যা প্রাপ্য তাই হওয়া উচিত ছিল। এভাবে হঠাৎ করে মেরে ফেলা তো মনে হয়না ভালো কাজ হইছে।

২৭শে এপ্রিল, ২০০৭ সময় ২টা ২১মি.

আছিয়া

নেসার : আপনার নামটা আগে বলুন।

আছিয়া : আমার নাম আছিয়া।

নেসার : আপনাদের বাড়ি কোন গ্রামে?

আছিয়া : নিজামপুর।

নেসার : আপনি কি মোফাখ্খার চৌধুরীকে চিনতেন?

আছিয়া : জি।

নেসার : কীভাবে চিনতেন?

আছিয়া : উনি তো আমাদের পাশের বাড়িরই। মোফাখ্খার চাচা। আমরা উনাকে ছোট চাচা বলে ডাকতাম। আমরা তো ছোটই ছিলাম। উনি খুব আদর করতেন। ঢাকা থিকা যখন আসতেন, আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। আমরাও ওই বাড়িতে যাইতাম। সব সময় আমাদেরকে ভালোবাসতেন। ডাইকা আনি, পাশে নিয়ে মাথায় হাত বুলুইয়া অনেক কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। তারপরে স্কুলে যাচ্ছিনি। পড়াশুনা করছিনি। ভাইয়ে কী রকম আদর করে, সোব কিছু আরকি খবর রাখতেন।

নেসার : আর।

আছিয়া : তারপরে উনি তো খুব ভালোই ছিলেন। কুনুদিনও আমরা শুনি নাই উনি খারাপ। এরকম কিছু শুনছি না। আর যখন বুঝ হইছে, তখন তো উনারে বাড়িতে দেখছি না। মাঝেমধ্যে আসতেন। আসার পরে আমরাও গিয়া দেখতাম। সবাই বলত যে, উনি আসছেন। এরপরে আমরা যাইয়া দেখতাম। আমার ভাই আইয়া কইছে উনি আসছেন।

নেসার : আপনি কি উনার দলের নাম জানেন?

আছিয়া : হু। পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল)

নেসার : উনার রাজনীতি সম্পর্কে কি আপনি কিছু জানেন?

আছিয়া : অত কিছু জানতাম না। এটার নাম শুনছি। এরপরে উনার লিফলেট আসত। এগুলোও দেখতাম। পড়তামও ওগুলো।

নেসার : ওসব পড়ে কি কিছু বুঝতেন?

আছিয়া : জি, বুঝতাম যে, উনারা গরিবদের খুব ভালোবাসতেন। গরিব লোকদের নিয়েই উনাদের সংগঠন।

নেসার : উনার মারা যাওয়ার খবর টিভিতে দেখছিলেন, না, লোকমুখে শুনছিলেন?

আছিয়া : টিভিতে দেখি নাই। আমার স্বামী আসছিল আমার বাপের বাড়িতে। এইখান থিকে যাইয়া আমারে বলছে। এরপরে যেদিন প্রথমে লাশ আসার কথা ছিল ওইদিন আসে নাই। তারপর আমি আসতে চাইছি। আমার স্বামী বলে যে, লাশ আসবে কি না আসবে, এটাসেটা নানান কথাবার্তা বলেছে। তারপর আমাকে নিয়ে আসে নাই। আমি অনেক কান্নাকাটি করছি আসার জন্য। তারপর ভাই বিদেশ থিকা মাস দুয়েক পরে দেশে আসলে ভাইরে জিগায়ছি, আপনি দেখচুননি। ছোট চাচা যে মারা গেছে। ভাই কয় আমরা ডিশে দেখছি। আমি বললাম, আপনি ডিশে দেখছেন? আমাদের তো আর ডিশ নাই। আমি লাশও দেখতাম পারছি না। আমারে নিয়াও গিছে না।

আমি জিগায়লাম আপনার কেমন লাগছে? ভাইয়ে বলল যে, আমার এত্ত খারাপ লাগছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যাইত না। আমারও খুব খারাপ লাগছে। আমার বাবার মতো আদর করতেন কিন্তু আমাদেরকে।

নেসার : সর্বশেষ আপনার সাথে উনার কবে দেখা হয়েছিল?

আছিয়া : কত সাল ছিল যেন আমার আইডিয়া নাই। কোরবানির ঈদের পরের দিন বাড়িতে আসছিলেন উনি। রাত্রের প্রায় দশটার দিকে। আসার আগে আমাদের গ্রামের লোকজন বলছেন উনি আসবেন বা আসতাছে। তারপরে আমরা রাত্রে বাড়ির পুষ্করণীর পরে পাহারা দিছি যে, উনি তো আসবেন। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। তারপর দেখলাম উনি আসছেন। লাইটটর্স নিয়া। তারপর গিয়া দেখা করছি। প্রায় তিন থিকা চার বৎসর হয়ি যায়। আর দেখা হইছে না উনার সাথে।

তখন কথা বলছি। আমাদের ডাইকা নিয়া পাশে বসাইছেন। আমরা সালাম করছি প্রথমে দেখি। তারপর উনি পাশে বসায়া, মাথাত হাত বুলায়া অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করছে। পড়াশুনার কথা জিজ্ঞাসা করছে। ভাইয়ে কী রকম? টাকাপয়সা দেয়নি? ভাবি কী রকম? সব কিছু জিজ্ঞাসা করছে। তিনি তো আগে পান খাইতেন। এদিন দেখছি পান খায় না। উনার বাড়ির উনার ভাতিজি একজন আছে। উনার সাথে আমি বেশি চলাফিরা করতাম। আমি চাচার সামনেও আপারে জিগায়ছিআমার চাচা পান খান নাই? চাচায় কইছে নাগো মায়, আমি পান খানি ছাড়ি দিছি।

এছাড়া, চাচা একবার আসল বাড়িতে। আমি তখন ক্লাস টেনে ছিলাম। আমি প্রিটেস্ট পরীক্ষা দিছি। আমার ভাইয়ে আসল বিদেশ থিকা। আইসা আমারে বিয়া দিয়ে দিছে। এটা শুনে আমার আম্মারেভাইরে অনেক কথা বলেছে চাচা। বলে, মেয়েটার পড়াশুনা নষ্ট করলা কিতার লাগি? পড়থো। আর ছয়খান মাস পরে পরীক্ষা দিত। নিজেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারত। এগুলো বলছে। আমাদের যখন বুঝ হইছে, তখন চাচারে তেমন দেখছি না। মাঝে দুই বৎসর, চার বৎসর পরে উনি আইছে।

নেসার : কারা আপনার চাচাকে মেরেছে এটা কি জানেন?

আছিয়া : ওই যে র‌্যাব বাহিনী মারছে।

নেসার : ওরা আপনার চাচাকে যেভাবে মারল, এ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

আছিয়া : এটার সম্বন্ধে মন্তব্য, উনাদের এটা বোঝা উচিত ছিল বা এটা করা উচিত ছিল উনাকে দুষি হিসেবে চিহ্নিত করা। উনি তো খুনি না। নিজে হাতে তো খুন করে নাই। গরিবের লাগি তো নিঃস্বার্থভাবে উনি কাজ করে গেছে। উনারে যদি বিচার আদালত করত, তারপরেও একটা সান্ত্বনা থাকত। কয়টা দিন রাখিয়াও যদি বিচারের মাধ্যমে সোয়ালের মাধ্যমে উনারে মারত ; তারপরেও আমরা নিজ থাকি একটা বুঝ দিতে পাইরতাম। হুট কইরা, হুট কইরা মারি ফেলাইল আরকি ! এর লাগি খুব খারাপ লাগে। কষ্ট হয়।

২৬শে মে, ২০০৭

আহম্মদ সোহেল

নেসার : আপনার নাম?

সোহেল : আমার নাম আহম্মদ সোহেল।

নেসার : বাড়ি?

সোহেল : সিলেট শহরে।

নেসার : আপনি উনাকে কীভাবে চিনতেন?

সোহেল : সিলেট শহরের একটা বাসায় উনার সাথে আমার পরিচয় হয়। আমার এক বন্ধু পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, উনি রাজনীতি করেন। তবে ডিটেইল আকারে না। বলেছিলেন রাজনীতি করেন। আর উনার নামটা বলছিলেন। আর আমিও ছোটখাটো সংগঠন করতাম। ফলে তাদের রাজনীতি সম্পর্কে কিছু জানাবোঝা ছিল।

নেসার : ছোট সংগঠন মানে?

সোহেল : তেলগ্যাস রপ্তানি বিরোধী আন্দোলনের সাথে ছিলাম। যার জন্য দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মতোই উনার নামও জানতাম। বা আমার যে পড়াশোনা সেই স্টাডির মধ্যেও নাম পাওয়া গেছে। সেই হিসেবে দেখছি উনাকে। আসা এবং যাওয়াই বা উনার সিলেটে অবস্থানকালীন ওই বাসায় যাওয়ায় আমার সাথে দেখা হইছে। কেমন আছেন না আছেন এতটুকুই আলাপ হইছে। তো তিনি যে এত বড় মাপের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং অনেক বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা চালায়রাফ, ভয়ংকরএরকম? সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে প্রথম যেদিন আলাপ হয়, মনে হলো খুবই প্রাণবন্ত মানুষ। মানুষকে কেমন আছেন না আছেন এই কুশলাদি জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়েই আকৃষ্ট করে ফেলতে পারতেন। এরকমই মনে হয়েছে। এর বাইরে খুব একটা আলাপ হয়নি।

এক পর্যায়ে আরো একবার দেখা হইছিল। আমি তখন শুনেছি, উনি আমার ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহবোধ করেন। আমার সাথে আলাপ করার চেষ্টাও ছিল উনার। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের মধ্যে ওরকম সময়সুযোগ হয়ে ওঠেনি।

তারপর উনি যখন মারা গেলেন খবরটা পাওয়ার পরে আমি এবং আমার এক বন্ধু ; মানে একজন শ্রমিক, বাড়ি যশোর থাকেন সিলেটে। সে আর আমি মিলে ফেঞ্চুগঞ্জে গেলাম। এবং জানাজা হওয়া পর্যন্ত ওখানে ছিলাম। ওখানে দেখলাম পুলিশ কর্ডন দিয়ে পুরা এলাকা ঘেরাও করে রাখছে। ফলে উনার অনেক সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীর অনেকেই ভয়েই ওখানে যায়নি। এটা অনেকে আলোচনা করছে শুনলাম।

আর আমি তাকে দেখতে গেছি খুবই দুঃখবোধ থেকে, যে এরকম একজন মানুষ, তিনি রাজনীতি করেন। তাদের রাজনীতির একটা স্ট্রং লজিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। এবং একটা গণভিত্তি ছাড়া তারা কিছু করতেও পারেনা। তারপরেও যদি তাদের রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন থাকে, তাহলে, এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে, দেশের আইন অনুযায়ী যে ধরনের বিচার হওয়া উনার উচিত ছিল তার কোন কিছুই হয়নি। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে গ্রেফতার করে, মানুষ হিসেবে তার ন্যূনতম মর্যাদা না দিয়ে পশুর মতো মেরে ফেলাএটাকে কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমিও মেনে নিতে পারিনি।

২৭শে এপ্রিল, ২০০৭, সময় ২টা ২৫ মি.

সাগর

নেসার : আপনার নামটা বলুন।

সাগর : সাগর।

নেসার : বাড়ি,

সাগর : সিলেট শহরে।

নেসার : আপনি তো মোফাখ্খার চৌধুরীকে চিনতেন?

সাগর : এই নামে চিনতাম না। পত্রিকার পাতা থেকে পরে নামটা জেনেছি। উনাকে আমি সমিরদা নামে চিনতাম।

নেসার : আপনি তাকে প্রথম কবে দেখেছিলেন?

সাগর : সে আমি ক্লাস থ্রিফোরে যখন পড়ি, সেই সময় থেকে।

নেসার : কোন সাল?

সাগর : ’৭৩ সাল।

নেসার : আর তার মৃত্যুর পূর্বে যতবার সিলেটে এসেছেন, ততবারই তো আপনার সাথে দেখা হয়েছে।

সাগর : হ্যাঁ, তা হয়েছে। উনি আসলে আমার সাথে দেখা হতো। তাছাড়া, আমি যখন চিটাগাং ভার্সিটিতে পড়াশোনা করি, তখনো উনি আমার ওখানে গিয়েছেন। দেখাসাক্ষাৎ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্যারের সাথে তিনিই আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

নেসার : যাক আপনি তো তাকে দীর্ঘ সময় থেকে চিনতেন। তার ব্যক্তিগত নানান দিক সর্ম্পকে কি সংক্ষেপে কিছু বলবেন?

সাগর : আমি ব্যক্তি মানুষ হিসেবে উনাকে যতখানি বুঝতে পেরেছি, উনার রাজনীতি সম্পর্কে আমি বিস্তারিত কিছু জানি না। তবে ব্যক্তি সমিরদাকে আমি যতটা জানি, তিনি একজন অমায়িকভদ্রআধুনিক ও বিজ্ঞান মনস্ক মানুষ ছিলেন। তার মতো মানুষকে আমাদের সমাজে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সেদিন একজন বিজ্ঞ মানুষ বলছিলেন, আমাদের দেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার।

তবে দেশে যে দুইচারজন প্রকৃত মানুষ খুজে পাওয়া যাবে। তারমধ্যে সমিরদা ছিলেন অন্যতম। সমিরদা আধুনিক দর্শন বিশ্বাস করতেন। ফলে মনের দিক থেকে খুবই উদার ছিলেন।

যাক আমি তো ক্লাস থ্রিফোর থেকে তাকে চিনতাম। তারপর এসএসসি পাস করি। পাস করি এইচ এস সি বাবার মৃত্যু। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি। এইভাবে সব সময়ে দেখছি উনি আমাদের পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলিতে আসছেন। আমাদের দেখাশোনা করছেন। উনাকে নিয়ে অনেক জায়গায় ঘুরতে গেছি। কিন্তু কখনো সেভাবে বুঝতে পারিনি উনার রাজনৈতিক জীবনটা। রাজনৈতিক জীবন মানে, আমার সাথে কয়েক দফা আলোচনা করছেন। কিন্তু আমি অন্য একটা দলের সাথে যুক্ত ছিলাম। ফলে জোর করে তিনি তার দলের আদর্শ আমার উপরে চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করেননি। বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।

এছাড়া, উনার খেলাধুলা দেখার প্রতি ঝোঁক ছিল। বিশেষত ক্রিকেট। আর দল হিসাব খুব সফট কর্নার ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর পাকিস্তানের উপর। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেই মার্শাল, ভিব রির্চাড, ওদের খেলার কথা উঠলেই উনি অনেক স্মৃতিচারণ করতে পারতেন।

উনার আর একটা বিশেষ গুণ ছিল। হাতের আঙুলের কর গুনে গুনে উনি দুইশো থেকে আড়াইশো টেলিফোন নাম্বার দ্রুত বলে দিতে পারতেন। মানে এটা অমুকের নাম্বার। ওটা অমুকের নাম্বার। মানে সমিরদার মেমরি ছিল খুব সার্প। তাছাড়া, আমাদের ফিজিক্সের অংকগুলো তিনি বুঝিয়ে দিতেন ও করে দিতেন।

আর যতবার আমাদের বাসায় এসেছেন, দেখেছি রান্না করেই যাচ্ছেন। আর আমাদের সিলেটের ভাষায় বলে সাতকড়া, এই ফলটার প্রতি উনার বিশেষ দুর্বলতা ছিল। উনি সিলেটে আসলেই বলত ওটা নিয়ে এস। সিলেটের দুই একজন লোক ছিল, যারা ওটা বিক্রি করে। ওরা সমিরদাকে একজন সাতকড়া পাগল হিসেবে চিনত।

পাশাপাশি তার কোনো সহযোদ্ধা বা কোনো ওয়েল উইসারের বিপদের কথা যদি শুনতেন, তাহলে যতটুকু সম্ভব মানে কাছ থেকে না হলে দূর থেকে, দূর থেকে না পারলে তৃতীয় একজনকে লাগিয়ে তার বিপদে সহযোগিতা করার চেষ্টা করতেন। অর্থাৎ তিনি ছিলেন অত্যন্ত মাইডিয়ার। মাইডিয়ার মানে কী? একটা ফ্যামেলিতে ঢুকলে, ওই ফ্যামেলিটা হয়ে যেত উনার। তার নিজের হয়ে যেত। উনি বাচ্চাদের মানসিকভাবে বিকশিত করার জন বিভিন্ন শিক্ষামূলক বই প্রতিনিয়ত উপহার দিতেন। জোরপূর্বক বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাজনৈতিক কোনো বই হাতে তুলে দিতেন না। উনি বলতেন, জানবোঝপড়, তারপর সিদ্ধান্ত নেও রাজনীতি করবা কি না এবং কী রাজনীতি করবা। এজন্য কাউকে প্রেসারাইজ করতেন না। বুঝ, চিন্তা কর। আজকের বাস্তবতা এই। সমাজব্যবস্থা এই।

পরিশেষে আমার কথা হলো এই, এ মানুষটাকে হত্যা করে আমাদের প্রিভিয়াস সরকার যা করেছে, তা হলো, বাংলাদেশে সমস্ত প্রগতিশীল মানুষের মুখে ঝাটা মারছে। মরণোত্তর হলেও ওই খালেদা জিয়া ও লুৎফুজ্জামান বাবরের বিচার একদিন এদেশের জনগণ করবে। এর চেয়ে বেশি আমি দাদা সম্পর্কে কিছু বলতে পারব না। দাদা ছিলেন একজন মহানমহান মানুষ। উনার রাজনীতি সম্পর্কে আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু উনাকে হত্যা করার জন্য একদিন কবর থেকে তুলে হলেও ওই খুনিদের বিচার করা হবে। আমি একজন সাধারণ শিক্ষক হিসেবে আমার ছাত্রদের এই শিক্ষাটা দিব।

নেসার : আপনারা তার মৃত্যু সংবাদটা পেয়েছিলেন কীভাবে?

সাগর : দাদা মারা যাওয়ার পরপরই একজন টেলিফোন করে সংবাদটা জানান। দাদার মৃত্যু সংবাদ শোনার পর আমি কষ্ট পেলেও কিছুটা ঠিক ছিলাম। কিন্তু আমার এই ছোট্ট ভাগনিটা ; ওর বয়স ১১১২ বছর। সে নিজেকে কোনোভাবেই সংবরণ করতে পারে নাই। শুধু কাঁদছে আর কাঁদছে। এক সপ্তাহ ধরে। সে জানতও না উনার কী রাজনীতি বা কী করতেন। কিন্তু এইভাবে একজন মানুষকে হত্যা করে রাত্রে যখন টিভিতে দেখায়ছে, বিভিন্নভাবে বদমাইশ প্রচার মাধ্যমগুলো অপপ্রচার করছেমুফা, এইসেই, তখন এই বাচ্চারাই বলেছে যে, তারা টিভিটাই ভেঙে ফেলবে। এইসব বদমাইশরা কী বলছে। এই ছোট বাচ্চা শুধু কাঁদছে আর বলছে জেঠুকে তো আর দেখতে পারব না। ও সমিরদাকে জেঠু ডাকত।

নেসার : আপনি কি তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন?

সাগর : না, আমি যেতে পারিনি। তবে আমাদের সিলেট থেকে অনেকে গিয়েছিলেন। তারা এসে বললেন হাজার হাজার লোক হয়েছিল। তাছাড়া, এনএসআই, ডিএসপি, ডিজিএফআইসহ আরো আরো গোয়েন্দা বিভাগের লোক অনুষ্ঠানের ভিডিও করেছে।

২৭শে এপ্রিল২০০৭, সময় ৩টা ০৫মি.

সায়মন

নেসার : আপনার নাম?

সায়মন : নামটা মামারই রাখা। এটা আমার সাংগঠনিক নাম। সিলেটে যে আমাদের কমিটি ছিল। তার প্রথম বৈঠকে মামাই নামটা রাখেন।

মামাকে আমি দেখি ছোট বেলা থেকেই। ’৮৬-’৮৭ সালের দিকে মামাকে প্রথম দেখছি। তখন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিনতাম না। ওই সময় উনি যখন সিলেট আসতেন, তখন গুরু বলেই সবাই মানত। দাদা বলেই ডাকত। ’৮৬ সালে প্রথম মামার সাথে দেখা হইছে। কিন্তু কী করত ওটা জানতাম না। উনি আসলে পোস্টার লিখা হতো। হাতে লিখা হতো তখন। তো মামার সাথে রাজনৈতিকভাবে জড়িয়ে পড়ি ’৯৬ সাল থেকে। তবে প্রথম মামাকে ভালো লাগত। তারপর রাজনীতিতে আসি। অবশ্য আমি রাজনীতিতে তেমন সক্রিয় ছিলাম না। তারপরেও মামা মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত ছিলাম পার্টির সাথে। আমাদেরকে নিয়ে কমিটি হইছিল সিলেটে। অবশ্য ওই কমিটির অনেকে আজ দেশের বাইরে চলে গেছে।

যাক আমার জানা মতে মামা যদি এই রাজনীতি না করতেন, তাহলে, ব্যক্তিগত ভোগের জন্য তিনি অনেক কিছু করতে পারতেন। অর্থাৎ তিনি যদি এই আদর্শ গ্রহণ না করতেন, তাহলে মন্ত্রীও হতে পারতেন। এই পথে মৃত্যুর প্রয়োজন হতো না।

আজ আমার দুটো ঘটনা মনে পড়ছে। আমরা ছোট ছোট তিনভাইবোনসহ আমাদের বাসায় লোক পাঁচজন। মামা আমাদের জন্য আইসক্রিম আনতে গেছে। উনি আইসক্রিম নিছেন ছয়টা। আমি বলছি মামা পাঁচটা নিলেই তো হয়। তো মামা বললেন কেন অঞ্জু আছে না? আমাদের বাসায় কাজ করত তখন, ছোট্ট মেয়ে, ওর নাম ছিল অঞ্জু। তো মামা বললেন, ও ও তো বাচ্চা, তাই না? আর তোমরা তো সব সময়ই খাও। ও তো খেতে পারবে না। আর সব সময় এটা খেয়াল রাখবা, বড় যারা আছে তাদের খাওয়ানোর তেমন প্রয়োজন নাই। আর যারা গরিব ও ছোট তাদেরই খাওয়াতে হবে। যেমন ধর অঞ্জু যদি দেখে সবাই খাচ্ছে ; তখন কিন্তু আমার প্রতিও অন্যরকমের দৃষ্টি হবে ওর। এই একটা ঘটনা।

আর একদিন আমাদের একটা বৈঠক ছিল। এক বাসায়, দুপুরবেলা। ওখানে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হইছে। আমরা ছয়জন ছিলাম। কমিটির। তো আমাদেরকে বিছানার উপরে খাবার দেয়া হইছে। আর উনাকে টেবিলের উপরে। তাছাড়া, উনার জন্য কিছু স্পেশাল আইটেম করা হইছে। তখন মামা আমাদের সবাইকে বললেন, দেখ তোমরা ভবিষ্যতে আর কোনো দিন এরকম ব্যবস্থা করবা না। আমার জন্য কখনো আলাদা আইটেম করবা না। এই দুটো ঘটনা আমার মনে খুব দাগ কেটেছিল।

এছাড়া,’৯৬এ রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পরে মামার সাথে সিলেটের অনেক অনেক জায়গায় আমি গিয়েছি। ফলে আমার দেখা মতে মামা ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। কমিউনিস্ট রাজনীতি আমি এখনো পুরাপুরি বুঝি না। তারপরেও মামা ছিলেন একজন ভিন্ন মানুষ। যেমন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল)-এর অনেক কেন্দ্রীয় নেতাকে আমি দেখেছি। কিন্তু তাদের মধ্যে মামা ছিলেন ব্যতিক্রম। বিশেষত মানবিকতা, আন্তরিকতা, অপরের প্রতি শ্রদ্ধাএক কথায় অসাধারণ ছিলেন এসব ক্ষেত্রে। তো মামার সাথে ঘোরার সময় মামা বলতেন, কোনো বাড়িতে যদি যাও তুমি বেড়াতে ওই বাড়িতে যদি ছোট বাচ্চা থাকে ওই বাড়িতে তুমি যাওয়ার সময় বাচ্চাদের জন্য হাতে করে কিছু নিয়ে যেয়ো। নাহলে, কী হবে, ওই বাচ্চাগুলো তোমার কাছে আসবে না। ওরা প্রথমেই দেখবে তাদের জন্য কী আনল। আমার জন্য কী আনল? তুমি যদি তাদের জন্য কিছু নাও, তাহলে তোমার সাথে তারা মিশবে। নাহলে তোমাকে রূঢ় ভাববে। তোমার প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে।

আর মামা মারা যাওয়ার আগে একদিন সিলেটে আসছিলেন। ওই সময় আমার ছোট ভাইয়ের জ্বর হইছিল। এটা শুনে উনি আসছিলেন বাসায়।

এছাড়া, সিলেট শহরে আমাদের কার্যক্রম নিয়ে উনার সাথে আমার আলাপ হতো সব সময়। ওই সময় দলের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে সমস্যা হচ্ছিল। কিন্তু আমার সাথে আলাপ হতো সব বিষয় নিয়ে।

মামাকে হত্যা করার ১ মাস আগে উনি সিলেটে আসছিলেন। তখন আমাকে বলছিলেন, বাবারে মনে হয় আর বেশিদিন বাঁচব না [কান্না]। কেন যে কথাটা বলেছিলেন। কিছু টাকা পয়সা মানুষ পাবে। যদি বেঁচে থাকি, তাহলে ঋণগুলো শোধ করে যাব। কিন্তু যেভাবে দেশজুড়ে কমিউনিস্টদের হত্যা করা হচ্ছে তাতে মনে হয় না ওরা আমাকে বাঁচায় রাখবে। এখন যদি ঋণগ্রস্ত হয়ে মারা যাই, তাহলে আমাকে না হলেও পার্টিকে তারা বেইমান বলবে। ফলে শেষ জীবনে উনি ঋণ শোধ করার জোর চেষ্টা করছেন। এবং আমার জানা মতে উনি উত্তরাধিকারসূত্রে যে সম্পত্তি পেয়েছিলেন তার পুরাটা তিনি বিক্রি করে দেন। ওই টাকা দিয়ে পার্টির ঋণ শোধ করেন। আর উনি ওইবার সিলেট আসছিলেন ওই ঋণ শোধ করবার জন্য। তো আমি সব শুনে বললাম, মামা সাবধানে থাকবেন। মামা বললেন, বিপ্লব করতে আসলে এভাবে মৃত্যু তো হবেই একদিন। সব মৃত্যু তো আর বৃথা যায় না। আমি মারা যাব। কিন্তু এদেশের হাজার হাজার বিপ্লবীরা তো বেঁচে থাকবে। তারা সবাই মিলে আমাদের আগামী দিনের স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করবে। আদর্শকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে। আমাদের তো এভাবেই মৃত্যু হবে। ওরা আমাদেরকে কোনোভাবেই বাঁচিয়ে রাখবে না। তবে শেষে জীবনে প্রচণ্ড টাকাপয়সার সংকট গেছে মামার। তার মধ্যে একবার তিনটা চাদর কিনতে দিছে আমাকে [কান্নায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন]। চাদর, মানে মণিপুরি চাদর। চাদর কেনার পর তিনশো টাকা রইছে আমার কাছে। রাস্তায় গিয়ে মামাকে বললাম, মামা চাদর কেনার পর তিনশো টাকা বেঁচেছে। আমি মামার সাথে অনেক কেনাকাটা করেছি। মামা কখনো টাকা ফেরত নেননি। ওই দিন মামা বললেন, ভালো হইছে বাবা। ওই তিনশো টাকা নিয়ে বাসায় চলে যেতে পারব। বাসায় পৌঁছালে টাকার জোগাড় হবে। এই তো। আমার দেখা মতো, আমার জীবনে একজন মানুষকেই আমি পেয়েছিলাম। তিনি হচ্ছেন মামা। যাকে আপনারা মোফাখ্খার চৌধুরী হিসেবে চেনেন। তার মুখে আমি কোনো দিন একটা গালি শুনি নাই। আচারআচরণ ছিল একদম শিশুদের মতো। উনি একাই এককভাবে যে কোনো জটিল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। তারপরেও উনি সবার মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন। সব সময় উনি চাইতেন আমি অন্যের কাছ থেকে বুঝি। তারপরে আমি আমার মতামতটা দেব।

মামা মারা গেলেন। আমি আমাদের বাসায় বসা। এরকম সময় একটা ফোন আসল যে, দাদাকে হত্যা করা হইছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র মামাকে খুন করছে। তারপরেও রাষ্ট্র পক্ষ থেকে এটা সম্ভব হতো না, যদি না আমাদের দলের মধ্য থেকে তাকে ধরিয়ে দেয়া হতো। দলের মধ্যেই কেউ না কেউ বিট্রে করছে। এ ধরনের বিট্রে হতে পারে মামা কিন্তু এটা জানত। তাছাড়া, কমরেড তাপুকে যখন হত্যা করা হলো। সেই সংবাদটা যে প্রথমে আমাদের জানায়। মামার খবরটাও সেই আমাদেরকে প্রথম জানায়। তখন কিন্তু দলের মধ্যে কেউই সিওর হয়নি। কিন্তু সে সিওর হয়ে খবরটা জানায়। পরের দিন সকালে আমরা টিভি চ্যানেলে খবরটা জানলাম।

পরিশেষে আমার কথা হলো এই, দেশে বিপ্লব হবেই। কারণ মোফাখ্খার চৌধুরীরা জীবন দিয়ে বিপ্লবের যাত্রা পথের সূচনা করে গেছেন। কিন্তু মোফাখ্খার চৌধুরীর শূন্যস্থান সম্ভবত পূরণ হবে না। প্রকৃত অর্থে তার মতো আদর্শবান মানুষ সাধারণত হয় না। তিনি বারবার আমাদেরকে বলতেন, মানুষ হিসেবে তোমার জন্ম যেহেতু হয়েছে, ফলে তোমার মৃত্যু অবধারিত। সুতরাং জীবনটাকে কাজে লাগাবার চেষ্টা করবা। আর তার কাছে কাজ বলতে বিপ্লব বোঝাত। মামা মৃত্যুর আগে আমাদের কাছে অমিত চক্রবর্তী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আর এই মানুষটি আমাকে অসাম্প্রদায়িক মানুষ হিসেবে বড় হতে শিক্ষা দিয়েছেন।

২৮শে এপ্রিল২০০৭ সাল। সময় ১১টা ২৫মি.

মানিক চৌধুরী

নেসার : আপনার নামটা বলুন।

মানিক : আমার নাম হইল মানিক চৌধুরী।

নেসার : আপনার বাড়ি?

মানিক : এই গ্রামের নাম নিজামপুর।

নেসার : থানা?

মানিক : থানা ফেঞ্চুগঞ্জ।

নেসার : মোফাখ্খার চৌধুরীকে তো আপনি চিনতেন !

মানিক : চিনতাম মানে, চিনার কথা। ছোটবেলা থেকে চিনি।

নেসার : বয়সে কে বড়?

মানিক : আমিই বড়। এবং বড় ভাইর মতোই শ্রদ্ধা করত।

মোফাখ্খার চৌধুরীর পরিবারের সাথে আমাদের এক আত্মীয়তা আছিল। আমার বাবার সাথে তার চাচা সিভিল সার্জেন মনোয়ার উল ইসলাম হকএর বন্ধুত্ব ছিল। সুতরাং এই পরিবারের প্রতিটি মানুষের সাথে আমার সম্পর্ক রইয়া গিছিল। সেই সুবাদে মোফাখ্খার চৌধুরীরও দেখছি। ছোটবেলা থেকে দেখছি। ছোটবেলায় যখন সে পাঠশালাতে পড়ত, তখন ও আমার তিন ক্লাস নিচে ছিল। এরপরে পাঠশালা থেকে সে গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে চলে গেল। সেইখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করছিল। তারপরে এমসি কলেজে ভর্তি হইছিল। কিছুদিন পড়ছিল। ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষার সময় পড়াশোনা করে নাই। পাশ করতে পারছে না। পড়াশোনা করছে না আরকি। কিন্তু মেরিটুরিয়াস স্টুডেন্টস আছিল সে। নো ডাউট। তবে ক্রিকেট খেলা আর সিনেমা দেইখা কাটাত তখন।

এরপর এই সময়ে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে তার দুই নম্বর ভাই মইবুল ইসলাম চৌধুরী প্রফেসর ছিলেন। কমার্সের। তো মইবুল ইসলাম চৌধুরী শেষে তারে এডওয়ার্ড কলেজে নিয়া এডমিশন দিছিল। এরপর থাকি যে তো দূরে চলি গেল। এই সময় আমি শুনছি পাবনা এডওর্য়াড কলেজে ছাত্র নেতা হইছে। ছাত্র ইউনিয়ন করত। সেখান থেকে আইএসসি পাস করছে। তারপরে অনার্সে ভর্তি হয়। তার ভাইয়ের মুখে শুনছি, সেকেন্ড ইয়ারে সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা দিতে হয়। কিন্তু সে খুব তার রাজনীতি নিয়া ব্যস্ত। সুতরাং পড়াশোনা হয়ত সেই পরিমাণ হইছে না। তার ভাইর কথায় বুঝছি আরকি। মইবুল ইসলামকে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে সবাই শ্রদ্ধা করত। এর মধ্যে কলেজের ইনচায়ো থাকে ; উনি তারে কইছেন যে, আমি যদি কিছু শিখাই দেই তুমি সেভাবে আনসার দিও। সে বলল যেনা, আমি এরকম কোনো বেনিফিট নিতে চাই না। এই খবরটা তখন পাইছিলাম আরকি।

ছোটবেলায় সে বাড়িতে আসলে খেলাধুলা কইরা বেড়াত। ফুটবল খেলা, হক্কি খেলা, হক্কি বোঝেন?

নেসার : না।

মানিক : হাডুডু। নন্দাইল খেলা। তো আমরাও থাকতাম। তখন দেখছি সে খেলাধুলাতে বেশ উৎসাহী আছিল। এক কথায় বলা যায় সে মেরেটুরিয়াস ছেলে ছিল। তার মেরিড আছিল। বুদ্ধি আছিল। খেলাধুলায় ছোট থাকিলেও তার একটু দক্ষতা ছিল।

যাক আমি তো বলছি সে ছাত্র ইউনিয়নে ঢুকছিল। পরবর্তীকালে আপনারা জানেন ছাত্র ইউনিয়নে একটা ডিভিশন দেখা দেয়। এই ডিভিশনে সে মেনন গ্র“পে চলে গেল। রাজনীতিতে যাওয়ার পরে বাড়িতে ওকেশনালি আইত। হয়ত বছরে একবার। কিংবা দুই বৎসরে একবার।

এর পরবর্তীকালের ঘটনা হইল, ১৯৭১ সালে যখন লিবারেশন মুভমেন্ট আরম্ভ হয়, তখন তার প্রথম দিকে সে ছিল না। কয়েকদিন পরে সে এখানে আসল। পাবনা থেকে আসল। আসার সময় দেশে এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হইছে যে, মানুষে ভয় পাইতেছে। তখন সে পরিচিত প্রত্যেকরে একটা থবুত দেয়ার চেষ্টা করছিল। তখন এখানে পার্টির প্রশ্ন নাই। সবাই চাইতেছে যে পাকিস্তানের হাত থিকে কীভাবে রক্ষা পাওয়া যায়। এটার জন্য অন্যান্য জায়গার মতো ফেঞ্চুগঞ্জেও একটা কমিটি, বিশেষ করে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি গঠন করা হয়। এই শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটিতে সে ছিল।

আর হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে যে দেশত্যাগ আরম্ভ হলো এদের মধ্যে সে যতদূর সম্ভব সাহস দেয়ার চেষ্টা করছে। তাদের বলছে, দেশত্যাগ করছ ; কিন্তু ভয় পাইও না। এইভাবে একটা অসাম্প্রদায়িক মনোভাবে তখন তার মধ্যে পরিলক্ষিত হইছে। এবং আমার দেখা ও জানা মতে একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিল সে, শেষ পর্যন্ত।

তারপরে আমার মনে হয়, বঙ্গবন্ধু তখন তো প্রধানমন্ত্রী। এই সময় দেখা গেল তার নীতির সাথে, তার চিন্তার সাথে ওই সময়ের অবস্থা খাপ খাইল না। এই মনোভাব প্রকাশ পাইল আরকি। তারপর তো সে রাজনীতিতে নামল। এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই দলে ছিল। মাঝে আবার জেল খাটল।

নেসার : তিনি কি পাবনাতে গিয়েই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন?

মানিক : না। আমার জানামতে এমসি কলেজে পড়ার সময়ই ছাত্র ইউনিয়নে ছিল। তখন তো মেধাবী সব ছাত্রই ছাত্র ইউনিয়ন করত।

নেসার : সর্বশেষ আপনার সাথে তার দেখা হয়েছিল কবে?

মানিক : ঢাকার পৈত্রিক বাড়ি বিক্রি করার দায়িত্ব আমার উপরে পড়ে। মোফাখ্খার ওই সময় আমাকে বলে সব ঠিকঠাক মতো করে দেন। ভাইয়ের টাকার দরকার। আমি বাড়ি বিক্রি করার ব্যবস্থা করি।

নেসার : আর এই বিনা বিচারের মৃত্যুকে আপনি কীভাবে দেখেন?

মানিক : এটা তো সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যাপার। তবে আমার মনে হয় বিচার পাওয়ার অধিকার সবারই আছে। বিচার করে মারলে মনে কষ্ট কম হয়।

২৬ শে মে, ২০০৭

মুহিত চৌধুরীর

নেসার : আপনার নামটা বলুন?

মুহিত : আমার নামটা হলো আব্দুল মুহিত চৌধুরী।

নেসার : আপনার গ্রামের নাম?

মুহিত : এটা নিজামপুর।

নেসার : ইউনিয়ন, থানা?

মুহিত : ২নং মাইজগাও ইউনিয়ন আর থানা ফেঞ্চুগঞ্জ।

নেসার : আর জেলা সিলেট।

মুহিত : হ্যাঁ, জেলা সিলেট।

নেসার : মোফাখ্খার চৌধুরী সম্পর্কে আপনার কী হতেন?

মুহিত : আমার চাচাত ভাই। সমবয়সী হিসেবে আমরা একসাথে খেলাধুলা করচি।

নেসার : উনার বাবার নাম?

মুহিত : ইলিয়াস আলি চৌধুরী।

নেসার : আর উনার মায়ের নাম?

মুহিত : জমিলা খাতুন।

নেসার : ক’জন ভাইবোন ছিলেন উনার?

মুহিত : উনারা চার ভাই। বোন আছিল ছয়জন। তার মধ্যে দুই বোন মারা গেছে। আর চার বোন আছিল।

নেসার : আপনার বাবার নাম?

মুহিত : আমার বাবার নাম আব্দুল গফ্ফার চৌধুরী।

নেসার : মায়ের নাম?

মুহিত : নূরুননেছা।

নেসার : আপনাদের কি একই বাড়ি?

মুহিত : ওই তো পাশের বাড়ি, একই বাড়ি। সম্পত্তি এক। ইজমাল ছিল।

নেসার : মোফাখ্খার চৌধুরীর জন্ম কত সালে এটা বলতে পারবেন?

মুহিত : কত সালে এটা ঠিক বলতে পারব না। তবে মনে হয় ১৯৪১৪২ সালে হবে। আমার থিকে বড় ছিল দুই মাসের। আমার বয়স বর্তমানে আটষট্টি বছর চলে।

নেসার : এবার বলেন, আপনি ছোটবেলায় তাকে কতটাকীভাবে দেখেছেন? আর তিনি কোন স্কুলে প্রথম লেখাপড়া শেখেন?

মুহিত : আমাদের এখানে একটা পাঠশালা ছিল। ছোটবেলায় ওই পাঠশালায় পড়ত।

নেসার : সেই পাঠশালার নাম?

মুহিত : হরিপুর মডেল প্রাইমারি স্কুল। এরপরে উনি চলি গেছে অন্য ডিস্ট্রিকে। তার ছোট চাচা ছিলেন ডাক্তার। সিভিল সার্জন, সরকারি ডাক্তার। উনার বাসায় লেখাপড়া করছে আরকি।

নেসার : উনার ছোট চাচা থাকতেন কোথায়?

মুহিত : অনেক জায়গায়। খুলনায় ছিল। ইন্ডিয়ায় ছিল। ইন্ডিয়ার গোহাটিতে আছিল অনেক দিন। এরপরে খুলনায় কুষ্টিয়ায় মানে বিভিন্ন ডিস্ট্রিকে দুই বছর, চার বছর করি আছিল। আর লাস্টে গিয়া যখন পেনসন হইল, তখন সিলেটে বাসা কইরা বাসায় আছিল। এই চাচার সাথে অনেক দিন আছিল।

নেসার : উনি তো পাবনায় এক ভাইয়ের কাছেও ছিলেন?

মুহিত : হ্যাঁ, পাবনায়ও ছিলেন। পাবনায় ধরেন ওই মেট্রিক পাস করার পর গিছে।

নেসার : আপনারা কি একই ক্লাসে পড়তেন?

মুহিত : হ্যাঁ, ক্লাশে পড়তাম।

নেসার : কোন ক্লাস পর্যন্ত একসাথে পড়েছেন?

মুহিত : পাঠশালায় তো ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত থাকে। উনি আবার ফাইভে ওঠার আগেই গিছে। ক্লাস থ্রিতে থাকতে চলে গিছে। তারপরে বাড়ি আসত মাঝে মাঝে। স্কুল বন্ধ হলে আসত। বছরে একবারদুইবার আসত। লম্বা বন্ধ হইলে আসতেন আরকি। আগের দিনে তো স্কুলে লম্বা বন্ধ হইছে। ওই সময় আসতেন। খুবই ভালো লোক ছিলেন উনি। ন্যায়নীতির লোক ছিলেন। অন্য ডিস্ট্রিকে থাকলেও বাড়িতে আসলে একসাথে খেলাধুলা করছি।

নেসার : উনি কোন দল করতেন এটা কি বলতে পারবেন?

মুহিত : আগে ছিলেন উনি ইয়েতে, ভাসানি ন্যাপ করতেন। পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে কমরেড ছিলেন।

নেসার : দল করা কালীন তিনি যখন বাড়িতে আসতেন, তখন কি আপনার সাথে রাজনৈতিক আলোচনা করতেন?

মুহিত : বলতেন। আমি তার নীতিতে সাপোর্ট করতাম। মানে উনাদের নীতি বা উনাদের ন্যায় বিচার এটা আমি সমর্থন করি। তাছাড়া, উনি বাড়ি আসলে আমার উপরে নির্ভরশীল ছিলেন। বিশ্বাস করতেন। আমার কাছে উনার অনেক গোপন কথা বলতেন। মানুষ হিসেবে ভালো আছিলেন।

নেসার : তিনি কি বিয়ে করেছিলেন?

মুহিত : বিয়া করেন নাই। আমরা চেষ্টা করছি বিয়া করাইবার কিন্তু করেন নাই।

নেসার : কী বলতেন?

মুহিত : না, আমার বিয়া করার কোনো ইয়া না। ইচ্ছা নাই।

নেসার : উনি মারা গেছেন কত তারিখে এটা বলতে পারবেন?

মুহিত : তারিখ জানা নাই।

নেসার : কাদের হাতে মারা গেছেন?

মুহিত : মারছে তো ওই র‌্যাবে মারছে। শুনছি আরকি।

নেসার : এখন ধরুন দেশে আইনআদালত, কোর্টকাচারি থাকতে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের এভাবে বিনা বিচারে হত্যা করাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

মুহিত : এটা তো খারাপ, কোনো ন্যায়নীতির ব্যাপার নয়। খুব অন্যায়। বিচার করিয়া শাস্তি দিলে হয়ত উনি শাস্তি ভোগ করতেন। যদি উনার শাস্তি হতো। অন্যায় করলে তো শাস্তি হবেই। কিন্তু বিনা বিচারে ওনাকেও তো মারি ফেলায়ছে। অনেক লোক মারি ফেলায়ছে। জেল হাজতে দিলে তো কিছু দিন পর ছাড়ি দিব। আর মারি ফেলাইলে তো শেষ একবারে। এই উদ্দেশেই মারছে আরকি। ধরছিল উনাকে আগে দুইতিনবার। জেল খাটার পর ছাড়ি দিছে। কিন্তু এইবার আর কাউকেই ছাড়ে নাই। বড় বড় নেতা যারে ধরছে, সব মারি ফেলায়ছে। এখন পর্যন্তও তো মারছে। মাইরা বলে ক্রসফায়ারে মারা গেছে। মিথ্যা। কিয়ের ক্রসফায়ার?

নেসার : মোফাখ্খার চৌধুরী মারা যাওয়ার পর আপনাদের পরিবারের দিক থেকে কোনো মামলা করেছেন কি?

মুহিত : মামলা তো করে নাই কেউ। কারা করবে? যারা করবে, তাদেরও ধরি ফেলাইবে। এটা একটা সমস্যা আছে। মামলা যারা করবে তাদেরও মারি ফেলাইবে।

নেসার : আর উনার ছোটবেলার কোনো স্মৃতি কি আপনার মনে পড়ে?

মুহিত : মনে পড়ে। এমনিতেই উনি ভালো লোক ছিলেন। পাবলিকের সাথে সব সময় চলাফিরা করত। যখন স্কুলে পড়ত, তখন থেকেই মিলেমিশে চলত আরকি। রাজনীতিতে উনি তো গিছে উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার পরে। তার আগেও এলাকার জনগণের সাথে চলাফিরা করত।

নেসার : রাজনীতিতে যাওয়ার পরে কি আপনাদের সাথে যোগাযোগ ছিল?

মুহিত : যোগাযোগ ছিল সব সময়।

নেসার : উনার সাথে সর্বশেষ আপনার কবে দেখা হয়েছে?

মুহিত : সর্বশেষ দেখা হয় মৃত্যুর একদেড় মাস আগে। উনি সিলেটে আসছিলেন। উনি খবর দিছিলেন, আমি আসছি। আমি সিলেটে গিছিলাম।

নেসার : আরকি কিছু বলবেন?

মুহিত : আর তো কিছু বলার নাই। মনেও নাই সব কিছু।

নেসার : অন্যসব ভাই বোনের সাথে সম্পর্ক কেমন ছিল?

মুহিত : বাবামা, ভাইবোনের সাথে সম্পর্ক ভালোই ছিল?

নেসার : চাচার ওখানে যখন পড়তে যান, তার পূর্বে কি উনার বাবা মারা গিয়েছিলেন?

মুহিত : অনেক পরেই উনার বাবা মারা গেছেন। উনি লেখাপড়া শেষ করার পরেই বাবা মারা গেছেন।

নেসার : উনার বাবা কী করতেন?

মুহিত : উনি বাড়িতেই থাকতেন। অনেক সম্পত্তি আছিল। মিরাসতারি ছিল।

নেসার : কী ছিল?

মুহিত : মিরাসতারি আছিল?

নেসার : মিস্ত্রি?

মুহিত : মিরাসতারি। মিরাসতারি। মিরাসতারি মানে জমিদার ছিলেন। উনি বাইরে গিয়া বিচারআচার করতেন আরকি বিভিন্ন জায়গায়। নিজ পরগনায় অথবা থানায় বড় বড় বিচারে উনারে ডাকত। সবাই মানত আরকি।

নেসার : উনার কবর দেয়া হয়েছে কোথায়?

মুহিত : আমাদের পারিবারিক গোরস্থানে।

নেসার : তার জানাজার লোক সমাগম হয়েছিল কেমন?

মুহিত : অনেক লোক হইছে। বিশ হাজারের কম না।

নেসার : ওই সময় পুলিশ প্রসাশনের অবস্থা কোন ধরনের ছিল?

মুহিত : খুবই স্ট্রোং আছিল। উনি মারা যাওয়ার পরে বাড়িটা চতুরদিক দিয়ে ঘেরাও করে রাখছিল। তারপরে যখন আমরা চাইলাম মাইকিং করাইতে, তখন উনারা বললেন যে, না মাইকিং করাইতে পারবা না। শেষ পর্যন্ত পারমিশন দিছে। দিলে ওই যে, কীভাবে উনি মারা গেছে এইটা বলতে পারবেন না। শুধু এই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে উনি এইটা বলবেন। সেটাই বলা হইছে বাইরে গিয়া। আর তাদের সাথে ক্যামেরা ছিল অবশ্য।

নেসার : কতদিন বাড়িতে পাহারা রাখা হয়েছিল?

মুহিত : বোধহয় পনেরোবিশ দিন খুব কড়া নজর রাখছে উরা।

নেসার : উনি কি ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন?

মুহিত : না, উনার ছোট আরো আছে। ভাই আর ছোট নাই। বোন আছে ছোট। দুইজন।

২৬শে মে, ২০০৭

নমিতা ভট্টাচার্য

নেসার : আপনার নাম?

নমিতা : আমার নাম নমিতা ভট্টাচার্য।

নেসার : আপনার স্বামীর নাম?

নমিতা : ষোড়শি মোহন ভট্টাচার্য।

নেসার : আপনাদের গ্রামের নাম?

নমিতা : বটপাতন।

নেসার : থানা, জেলা?

নমিতা : থানা বালগজ। জেলা সিলেট।

নেসার : আপনার এখন বয়স কত?

নমিতা : ৮২৮৩ বছর।

নেসার : আপনি তো এখন অন্ধ।

নমিতা : হ্যাঁ। চার বছর হলো।

নেসার : আপনার স্বামী তো নানকর বিদ্রোহে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন?

নমিতা : হ্যাঁ।

নেসার : যাক আপনি তো মোফাখ্খার চৌধুরীকে চিনতেন। আমি তার সম্পর্কে কিছু জানতে এসেছি। আপনি তো তাকে চিনতেন।

নমিতা : হ্যাঁ। [কান্না] বাবারে হ্যাও আমার পরিবারের সদস্য আছিল। তার কথা কইয়া লাভ নাই। যে নাই তার কথা আর কেডা কইতে কয় [কান্না]। আজ আমি বিছনাত পড়ি। সে যদি থাকত, তাহলে, অতদিনে আমার কতবার দেখত। অন্তরের যুক্তি দিয়া, কইয়া । ধর আমার পরিবারের গার্জিয়ান হিসেবে সে চলছে। তার মতো আমি তো মনে করি যে, ভালো মানুষ মানে হয় পৃথিবীত জন্মিছেই না। বিনা অপরাধে আমার এই পোতারে মাইরলা। সবার বিচার আছে। ইটার আর বিচার নাই বাবা।

নেসার : আপনি কোন বছর তাকে প্রথম দেখেন?

নমিতা : ও বাবা, তারে দেখছি কত বছর? বাংলাদেশ হওয়ার পরে তা কি না? ইয়ন তো মনে থাকে না। স্মৃতিই লোপ হই গেছে আমার। ওই চুয়াত্তর সালে।

নেসার : তারপর কি প্রায় আসত আপনার বাড়ি?

নমিতা : কিছুদিন পরপর। প্রায় না। সিলেট আইলে আইত ।

নেসার : আপনার সাথে তখন আলাপআলোচনা করত?

নমিতা : হ। আমারে তো হে তার ট্যেবুরে মা না, তার নিজের মার মতো দেখত। ও আইলে কমলা আনে। ডিম আনে। আমি না করি। ও বলে, না করিয়েন না। মা গোখাও। আমরা চলতাম পারি না। তুমি চলবা ক্যামনে? খাও । তো আমি তখন তাকায়তাম পারি।

আঙুর আনে। কমলা আনে। আপেলগুলো খাইতাম পারি না তো। দাঁত নাই। ও খুব একটা আদরের জিনিস আছিল। ওই যে তা, আমার ওই যে ছোট নাতি পরীক্ষার লাগি একি পর্যন্ত তার কইছান। যেদিন বাদ তার রেজাল্ট আউট হইছে, হে আমরারে কইত আপনার নাতি বলে কান্দে? তারে জিগায়ছে তার মাসি আরকি? হেই কান্দস কির লাগি? বলে, আমার আজকে রেজাল্ট আউট হইছে গো। আমি ভালো রেজাল্ট করছি। কিন্তু আজ আমরার যে উদ্য আছিল ; যে আমরার প্রেরণা দিছিল সে তো আর দুনিয়াত নাই ।

নেসার : তাহলে, উনি যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন আপনার খোঁজ খবর নেয়া এবং সিলেটে আসলে আপনাকে দেখে যেত।

নমিতা : হয়। দেখে যাইত।

নেসার : তার নামে কোনো কেস ছিল না।

নমিতা : হয়। বিনা বিচারে তারে মাইরা ফেলায় দিছে [কান্না]

নেসার : আপনি কতদিন পরে তার মৃত্যুর খবর পেয়েছেন?

নমিতা : মনে কয় দুইতিন দিন পরে বাপ। লাশ নিয়ে আসার পরের দিন সকালে। মনে থাকে না বাবা।

নেসার : আপনি কি তার কোনো খারাপ আচরণ দেখেছেন?

নমিতা : কিছু জানি না বাবা। আমি কইতা পারতাম না। আমি কোনো দিন তার সম্পর্কে খারাপ, কেউ কইছে বা আমার দেখার মাঝে হইছে? কিচ্ছু না।

নেসার : আর অন্য কোনো স্মৃতি কি মনে পড়ে?

নমিতা : কী তারে বাবা স্মৃতি। আইছে, বইছে। হাসিতামশা করছে। আমার বউরে ডাকি কইছে রান্ধিবার চায়। খাই যামু। বউ কইছে দাদা খাইয়া যাইতে হইব। আমি রানমু। আমি ডালভাত রানমু খাইয়া যাতি হইব। আচ্ছা তুই রান্দি দিলা আমি খাইয়া যামু। ওরে খুব স্নেহ করত আরকি।

নেসার : আপনি অসুস্থ হওয়ার পরে কি দেখা হয়েছিল?

নমিতা : হয়। অসুস্থ হওয়ার পর ওই যে কোমর ভাঙার আগে, আমি তো তিনবার অ্যাক্সিডেন্ট করি কোমর ভাঙছি। এর আগে দেখা হইছে। তখন আমি চলাফেরা করতাম পারি। চোখে কম দেখি আরকি। তখন দেখা হইছে। তখন এক ঝুড়ি কমলা আইনা, ও মামি মা খাওচাই। আমি বলি বাবা অত তো আমরা খাইতাম পারি না। তোমরা খাও। তো কইন সবটায় তোমার খাওয়া লাগব একাইএকাই।

সময় ১২টা ২০ মিঃ ২৭ মে, ২০০৭ সাল

সুরাতুন নেছা

নেসার : আপনার নামটা আগে বলুন।

সুরাতুন : আমার নাম সুরাতুন নেছা।

নেসার : আপনার স্বামীর নাম?

সুরতুন : স্বামীর নাম আমানুল্লাহ।

নেসার : আপনাদের গ্রামের নাম?

সুরাতুন : নিজামপুর।

নেসার : মোফাখ্খার চৌধুরীকে আপনি চিনতেন?

সুরাতুন : চিনতাম।

নেসার : কত বছর বয়স থেকে চিনতেন?

সুরাতুন : চিনতাম মনে করগা দশএগার বছর থাকি।

নেসার : ওই সময় আপনার বয়স কত ছিল?

সুরাতুন : হই সময়? হই সময় মনে করেন আমার দশবারো বছর আছিল।

নেসার : আপনাদের দুইজনের বয়সই তাহলে, সমান?

সুরাতুন : জি হিতাই এ লগেরই রুয়াব মনে করোন। তুয়াতুয়ি বেশ কম।

নেসার : উনি লোক কেমন ছিলেন?

সুরাতুন : খুব ভালা আছিল। ছোটবেলা থিকা খুব ভালা আছিল।

নেসার : উনি পড়াশোনা করেছেন কোথায়?

সুরাতুন : উনি ওই খুলনাত পড়ছে, ঢাহাত পড়ছে, উনার চাচার সাথে থাইকা। এরপর তো আর কইতাম পারি না। বাইরাত থাকছে। ওগুলা আমরা জানি না। কইতাম পারি না সঠিক।

নেসার : [এই সময় আমি আরো কয়েকটা প্রশ্ন করি, উনি আমার বাংলা বুঝতে পারেন না। ফলে আমার এক বন্ধু তাকে জিজ্ঞাসা করেন] তুমি এহন কওচান, তারে তো দেখছ, ছোটবেলা থাইন ভালা কাম কিতা করছে? আর খারাপ কাম কিতা করছে?

সুরাতুন : খারাপ, তাইন দেশো রইল না, খারাপ আর ভালা। ইতা আমি জানি না, খুনো খারাপ রেকর্ড তার নাই।

প্রশ্ন : ভালাকাম কিতা করছে?

সুরাতুন : ভালা কাম করছুল মনে করো আইজই গরিব মানুষ হান্দিয়া তাইন কাছে গিছে, হেইন যতটুকু পারেন উপকার করছুইন।

প্রশ্ন : তাইন কিতা পার্টি করত এইটা জানেনি?

সুরাতুন : জানি।

প্রশ্ন : পার্টির নাম কিতা জানোনি?

সুরাতুন : পার্টির নাম হুনছি যে, পূর্ববাংলা এমএল।

নেসার : উনি মারা গেছেন কাদের হাতে বলতে পারবেন।

সুরাতুন : জি না, ইতান আমি জানি না।

প্রশ্ন : হ্যারে মারছে কারা?

সুরাতুন : হ্যারে মারছে কারা? শুনছি যে, কিতা বাহিনী বারইছে হ্যারা মারছে।

নেসার : তার লাশ তো এখানে নিয়ে এসেছিল?

সুরাতুন : জি আনছিল। উনার লাশ যেদিন আইস, ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ওসি আসছে বাড়িত। তখন মুফতি চৌধুরীর লড়ে খুব র্তকাতর্কি করছে। উনের লাশ এখানে। লাশ আইনা কিতা করছে? এই কুন জায়গায় মাটি দিবা? আমিও উসুন্দির [দিঘির] পাড়ে গিয়া উবায়ছি [উঠেছি]। দ্যাখলাম মুফতি চৌধুরী মাতামাতি [কথা কাটাকাটি] করে। এরপরে আমি ওসির লগে মাতি ছিলাম। ওসির লগে আমি মাতিছি। আপনারা ই কুন ধরনের মাত মাতেন [কথা বলেন]। উনারে [মোফাখ্খার চৌধুরীকে] ইখানে আনত না। প্রথম আইসা কান্দে উনারে জীবনেও দেখছে না। দেখলেও নামে মানসে মানুষ চিনে না। উনারে দিনোমুক্তি ফোর না আনি ; উনার বাড়িঘর ভাঙি ফেলাব। আপনি এ কোন ধরনের কথা বলেন।

[ওসি] না এখানে আনলে সাথে সাথে রাইত মাটিতে লইত হইব। রাত্রিত আইনুন।

আমি কইছ না, রাত্রিরে মাটি হইব কি লাইগা বা। দূরের দূরের মানুষ আইব। যে হুনব, সে আইব। এর পরে ওসিও ফোন করছে, আরো কুন জাগাত। করিয়া মাতিছে। ওই রকম একজন বুড়া মহিলা মানুষ সুপারিশ করে যে, দিনে আনলে কুনো অসুবিদে হইত না। উনারে আনা হোক। এরপরে মুক্তি চৌধুরীর লাগি মাতিয়া আনা হইছে। তো মুক্তি চৌধুরীর জিগাইছে কুন জায়গায় মাটি হইব? তো পয়লা কইছে পুষ্কনদির পাড়ে হইতে পারে নাই নয়া দিঘির পাড়েও হইতে পারে। অতটুকু আমি জানি।

প্রশ্ন : ইতা কোনহানে গুলি লাগছে, দেখছ ?

সুরাতুন : গুল্লিটুল্লি দেখছি না। তার এতখানি উতলাইয়া, খালি মুখখান আমরারে দেখাইছে। আমরা মুখ দেখছি। কাইন্দাকাটি আসছি যে, অমনটা মানুষ। অতটুকু যে দেখলাম, আমরা সন্তুষ্ট হইছি দেখি। আর আমি কিচ্ছু কইতাম পারব না। তয় জানাজায় বহুত মানুষ হইছে। একবারে মুন্সি বাজার ধইরা, ফেঞ্চুগঞ্জ ধইরা, সারা বাড়ির থাকি লাইন ধরছুন পিডিএম স্কুলের মাঠ পর্যন্ত। ফেঞ্চু বাজারে মাইক দিয়া অ্যালাউন্স করছুন। পিডিএম স্কুলের মাঠে জানাজা হইবো। ইহনে মসজিদে জায়গা হইত না। হনে যাবার লাগি। হন থিকা জানাজা করি আনিয়া, ওখানে মাটি দিছে। সবার লাস্টে পুলিশ আইছে পিছে। এর আর এর আগে লাইনভার মানুষ উত্থান থিকে ওখান গিছে। বাচ্চা হইতে, বুড়া হইতে, কেউ বাকি নাই। বেটি, হিন্দু, মুসলমান যে হুনছে মুফাখ্খর চৌধুরীর নাম, হেই বার আইছে। আইয়্যা দেখি গিছে।

আর আমার কওয়ার মতো কিছু নাই। তাইন জীবনে আমি যতটুকু দেখছি, তার কাছ থিকা কুনদিন খারাপ আমি নিজেও পাইছি না।

মুফতির মার মরণের সময় তার লগে দেখা হইছে। ওই শেষ দেখা আমার, সিলেটে। তো আমার পরিবার সম্বন্ধে উনি জানেইন। আমারে কইছুন, বশিরের মা দুইতিন দিন আগে বশিরের লগে আমার মাত হইছে। ইম মাতিছি বশিরের লগে।

ওই আমি তারে শেষ দেখা দেখছি।

প্রশ্ন : আচ্ছা। অথা ভালা মানুষটার যে সরকার মারল ? ই সরকার কি ভালায়?

সুরাতুন : সরকার ভালা হইব কিলার? ই মানুষরে বিচার লাগি মারুক। বিচার লাগি মারো?

প্রশ্ন : এর লাগি মানুষ যে এখন আরো আছুন। এরার যে ধরি ধরি বিনা বিচারে মারি ফেলায়, একাম ভালা কইবানি?

সুরাতুন : ভালা কিলায় কম? নিরপরাধী, নির্দুষী মানুষ। জনগণর সেবা কইরা বিচারার জিন্দেগানি গেচে। রাস্তাত পাইচুন, যে কোনো জায়গাত পাইচুন, কইচুন বশিরের মা, আমি কোন জায়গত মরি জামু তার কোনো নিশ্চয়তা নাই। এরপর প্রথম জীবনভোর সুপারিশ করচুন, তানরি বিয়া করার লাগি। মায়বাপে, অন্য মানুষ ধরাইয়া মা চায়চুন। কইছে যে, আমি বিয়া করমু ঠিক আছে, যে আমার লাখান হইব, তারে যদি পাই। আমরা তো ভাই বউ আছিলাম। বড় ভাইর বউ সম্পর্কে। আমরা আলাপানে পাইযে, বিয়া করমু? নাইলে বিয়া করতাম নারে বোইনো। একজন মহিলার লাইফ কেন নষ্ট কোরমু। আমি কোন জায়গাত কোন সময় মরি, আমি কইতাম পারতাম না। লাস্টে ও বাড়ির তান চাচি, চাচিও অনেক সুপারিশ করছেন। কইচুন না, আমি বিয়া এরকম করতাম না। এখন কোনো মহিলা যদি সাধিয়া চায়? যে আমি তোমারে বিয়া করুম? বুঝলাম যে তার মরণে মানিয়া নিল। আমার কারণে মরতে পারে। আর আমারত কোন জায়গাত গুলি হইব, কোন জায়গাত মরমু, আমার মরণের নিশ্চয়তা নাই। ও কথা তাইন সব সময় কইতান। এরপরে কইত আমার যে লগে তোমার দেখা হইছে, তুমি যেন কারু কাছে কইও না। তো এমন ভালা মানষের কথা কইয়া আর লাভ আছে? কতদিন আমরার বাড়িতে রইচুন, থাকচুন, ঘুমায়চুন। কইচুন হাক থাক, হুকহুক, যখন থাকুন, যেকা থাকুক, ওতা দিয়ে আমরারে দিয়ো। আমরা খাইব। আমরা হাঁক দিয়াও খাই। হইতা পারো আমি একজন আইলাম যে, কিতাদি ভাত দিতা? তুমি যেতা দিয়া ভাত খায়ো, ওতা দিত। খাইমু আমি। খাইছুন। শাকসবজি বিচড়ার থিকিয়া তুলিয়া রানছি। কইছে দিও আমারে। এতা আমি আরো ভালা খাই। খাইমু। খাইছুন। এমন মানুষ আছিল। এর থাকিয়া আরকিচ্ছু আমার কওয়ার নাই।

২৬শে মে, ২০০৭

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.