ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধে গ্রামসির প্রয়োগ

Posted: ডিসেম্বর 10, 2017 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , ,

লিখেছেন: নীলিম বসু

মননের দিক দিয়ে আমি হতাশাগ্রস্ত,

আর ইচ্ছার জোরে আশাবাদী।আন্তোনি গ্রামসি

আকস্মিক ধাক্কা অনেকটা প্রশমিত এখন। রাগ আর যন্ত্রণা কমা উচিত নয়, কমেওনি আশা করি। প্রাথমিক ধাক্কায় অনেকেই আমরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘকে (আরএসএস) সরাসরি আক্রমণ করা দরকার বলে গলা ফাটিয়েছি। যথেষ্ট যৌক্তিকতা আছে তার। কিন্তু যারা মাঠে নেমে কাজ করার চেষ্টা করেন, তারা জানেন যে, বিষয়টা কতোটা কঠিন। আরএসএস রণবীর সেনা নয়, যে তাকে প্রত্যক্ষ আক্রমণ জনসমর্থন পাবে।

একটা উদাহরণ নেওয়া যাক। কোনো এক মফস্বল অঞ্চলে যে মানুষটি সবার প্রতিদিনের প্রয়োজনে এগিয়ে আসেন, সৎ মানুষ হিসেবে সবার কাছে প্রিয়। তার সাথে একটু গভীরভাবে মেলামেশায় জানা গেলো তিনি আরএসএস কর্মী! সমস্যাটা এই জায়গায়। আরএসএসএর সামাজিক ভিত্তি এক সময়ের কমিউনিস্ট কর্মীদের মতো! আরো সমস্যা হলো বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে এবং ভারতজুড়ে বেশিরভাগ জায়গাতেই কমিউনিস্ট কর্মীদের সামাজিক ভিত্তি খুব কমে গেছে, বা নেই; যার ওপর দাঁড়িয়ে আরএসএসকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া সম্ভব। সেটা না থাকলে আরএসএসকে প্রত্যক্ষ আক্রমণ করতে গেলে বিষয়টা ব্যাকফায়ার করার সম্ভাবনা থাকছে বিশালভাবে। কিছু তথ্য দেওয়া যাক, আরএসএসএর সামাজিক ভিত্তি নির্মাণের কাজগুলো নিয়ে। এইবার বন্যার সময় আরএসএসএর ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) রিলিফ ক্যাম্পের জোয়ারে ভাসিয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা, বিভিন্ন নামে আরএসএস রক্তদান শিবির থেকে ফ্রি হেলথ ক্যাম্প চালিয়ে চলেছে প্রতি মাসেই, সান্ধ্য স্কুল, স্পোর্টসও রয়েছে নিয়মিত কাজের মধ্যে। আর এসবের সাথেই মিশে রয়েছে সোস্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। এই সমস্ত সামাজিক কাজকর্মের মধ্য দিয়েই প্রচার করা হচ্ছে প্রধানত কয়েকটি বিষয়, ) রামের পুরুষোত্তমত্ত্ব; ) ব্রাক্ষণ্যবাদী চতুর্বর্ণ ব্যবস্থা; ) অহিন্দু, মূলত ইসলাম বিদ্বেষ; ) মোদি হিস্টিরিয়া। আর এই প্রচার বাঁধা থাকছে আদর্শ ভারতীয়ত্বের ন্যারেটিভে।

বিপরীতে কমিউনিস্টদের সামাজিক ভিত কতোটা? গণসংগঠন কতোটা শক্তিশালী? কতোটাই বা গণভিত্তি? সামাজিক বামপন্থার বহুদিনের অনুপস্থিতি কমিউনিস্টদের গণভিত্তিটাকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে। কার ওপর দাঁড়িয়ে কাউন্টার ন্যারেটিভকে তুলে ধরে আঘাত করা যাবে হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদের এই সামাজিক ভিত্তিকে? গ্রামসি যাকে প্যাসিভ রেভলিউশন বলেছেন তার সফল প্রয়োগ করে চলেছে আরএসএস হেজিমনির প্রতিরোধে কাউন্টার হেজিমনি খাড়া করতে অনেক পিছিয়ে কমিউনিস্টরা। এই গ্রামসিই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের কমিউনিস্টরা গ্রামসিকে বহুদিন অবহেলা করেছে। ফলে হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদের সামাজিক ভিতটিকেও দেখতে পায়নি। আজ তার পরিণতি চোখের সামনে।

প্রশ্ন এখন রাস্তাটি কী? চোখের সামনে মর্মান্তিক অনেক কিছুই ঘটবে, মনে হবে কেশব ভবন পুড়িয়ে দেওয়াটাও যথেষ্ট নয়। কিন্তু রাতারাতি এই বুলডোজার থামানো সম্ভব নয়। এটাই বাস্তবতা। বাস্তবতাকে না মেনে নিলে তাকে পাল্টানোর পথ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, এটা লেনিনের শিক্ষা। এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই একে পাল্টানোর পথ খুঁজতে হবে। আর সেক্ষেত্রে হয়তো একটি পথ হলো গ্রামসির তত্ত্বায়ন অনুযায়ী কাউন্টার হেজিমনি নির্মাণ। আর সেটা করার জন্যে সামাজিক বামপন্থাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। ঘটনার প্রতিক্রিয়া যেমন জানাতে থাকতে হবে বিভিন্নভাবে, তেমনই সামাজিক বামপন্থার নির্মাণের কাজকে অন্যতম প্রধান কাজ হিসেবে দেখতে হবে। তার জন্যে অনেক অনেক নিচে নেমে আসতে হবে। এমন অনেক বিষয় নিয়ে কাজ করতে থাকতে হবে, যার সাথে সমাজ পরিবর্তনের দাবির কোনো যোগাযোগই নেই। এর মাধ্যমেই সামাজিক ভিত্তি, গণভিত্তিসহ গণসংগঠন, কাউন্টার হেজিমনি ও তার মাধ্যমে কাউন্টার ন্যারেটিভকে দাঁড় করানো সম্ভব।

তবে হয়তো সমগ্র ভাবনাটির আরো একটি দিক আছে। সামাজিক বামপন্থাসঙ্গে রাজনৈতিক বামপন্থাউপস্থিতি পরিপূরকভাবে থাকা দরকার। না হলে সামাজিক বামপন্থা শুধুমাত্র সোসাল ওয়ার্কএর স্তরে আটকে যাবে, আর শেষত আশ্রয় নেবে এনজিও মতাদর্শের কোলে। সামাজিক বামপন্থা অনেক সময়েই ভাববাদী রাজনৈতিক শুদ্ধতার কবলে পড়ে অবস্থা পরিবর্তনের জন্যে বাস্তব শ্লোগান ও কর্মসূচী থেকে বিচ্যুত হয়, এক বিশুদ্ধতাবাদকে আঁকড়ে ধরতে চায়। রাজনৈতিক বামপন্থাকে গড়ে তোলা ও শক্তিশালী করার জন্যেই সামাজিক বামপন্থা, এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দরকার। আর রাজনৈতিক বামপন্থামধ্যে শ্রেণী রাজনীতি, অর্থাৎ কৃষক সভা, শ্রমিক সংগঠন, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের দাবির উপস্থিতিকে শক্তভাবেই অনুশীলন করে যেতে হবে। ক্ষেত্র বিশেষে হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদকে প্রত্যক্ষ আক্রমণকে হঠকারিতা ভাবলেও ভুলই করা হবে। গ্রামসির তত্ত্বায়ন অনুযায়ীও কিন্তু রাষ্ট্র হেজিমনি দিয়ে নয়, বলপ্রয়োগ দ্বারাই শাসন বজায় রাখে শেষত। ভারতের মতো দেশের আধা সামন্ততান্ত্রিকআধা ঔপনিবেশিক চরিত্রের জন্যেই গ্রামসির ভাবনার সঙ্গে মাওবাদী জনযুদ্ধের ভাবনার মেলবন্ধন প্রয়োজনীয়। একটু গভীরে গিয়ে দেখলে দেখা যায়, গণসংগঠন তৈরি করার দিশা হিসেবে লেনিন যা যা বলেছেন, তার সঙ্গে গ্রামসিকাউন্টার হেজিমনি নির্মাণের কোনো বিরোধ নেই। বরং লেনিনের ভাবনারই আরো বিস্তারিত পথ নির্দেশ দিয়েছেন গ্রামসি

ধৈর্য ধরে, আবার বিচক্ষনতার সঙ্গে

এগিয়ে চলাই সৃজনশীলতা,

সেই সৃজনশীলতাই প্রতিকূল পরিস্থিতিকে

অনুকূলে নিয়ে আসবে।মাও সেতুঙ

[সমস্ত ভাবনাটি কমরেডদের সাথে আলোচনা, আর যেটুকু কাজ করার চেষ্টা করতে পেরেছি, তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা। লেখক]

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.