আমরা বিচার চাই না, আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে অবিচার নির্মূল করতে চাই

Posted: ডিসেম্বর 4, 2017 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

শ্রেয়সী দাশ

২০১৭ সালে গণতন্ত্রের এপিটাফে যোগ হলো আরো এক প্রস্তর খণ্ড। কেন গণতন্ত্রের এপিটাফ বললাম, সে কথা পরের আলোচনায় থাকছে ডিসেম্বর জি.ডি. বিরলা নামে এক কর্পোরেট স্কুলে বছরের শিশু কন্যাকে ধর্ষ করলো দুজন শিক্ষক। ভারতেধুনিক শিক্ষার ইতিহাসে তা এক লজ্জাজনক ঘটনা। ভারতীয় নাগরিক এবং সর্বোপরি একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এ লজ্জা রাখার জায়গা নেই। এ যেন ২০১২ সালে দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ডেরই পুনরাবৃত্তি।

এদিকে, একইদিনে ডিসেম্বর ঝাড়খণ্ডের সাত বছরের একটি বাচ্চাকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এক মায়ের নিজস্বার্থ চরিতার্থ করতে শিশু কন্যার প্রতি যৌন নিপীড়ন। এমনি প্রতিদিন কতো ঘটনায় উত্তাল হচ্ছে নগরবাসী। কয়েকঘণ্টা, কিছুদিন, তারপর? তারপর? তারপর কি হলো? কোথায় গেলো প্রতিবাদ? প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত এমন কতো ঘটনা চাপা পড়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে শিশুমন, ধ্বংস হচ্ছে শিশুসমাজ। বিশ্বব্যপী নারী নির্যাতনের নামে এ সন্ত্রাস ভয়াবহভাবে বেড়েই চলেছে। যতটুকু ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হচ্ছে, তাও ঘটে চলা নৃশংশতার এক অতিক্ষুদ্র অংশ মাত্র। ২০০২ সালে প্রকাশিত নিবন্ধ বলছে, উন্নয়নশীল দেশে ধর্ষণের ঘটনা যতোটা ঘটে, তার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ঘটনা জনসমক্ষে আসে। পরিবার, পরিজন, রাস্তায়, বাসে, ট্রামে, স্কুলে, কলেজে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে মেয়েরা নিপীড়নের স্বীকার, এ নিয়ে নতুন করে আর কীই বা বলার আছে!

ধর্ষণের উৎস

বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় গবেষকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটাকে ইম্পালসিভ ক্রাইম বা আবেগতাড়িত অপরাধের অংশ বলে উল্লেখ করেন। তাছাড়া পুরু.ষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বেশিরভাগ পুরুষের মধ্যে নারী সম্পর্কে যে ধারণা কাজ করে, তা হলো তারা নারীকে যৌনবস্তু হিসেবে দেখে। ধর্ষ এবং নারী নির্যাতনের কারণ হিসেবে বারবার দায়ী করা হয়েছে নারীর পোশাককে অথচ ২০১৪ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ভারতে মোট ৭০৭টি ধর্ষণের ঘটনাছয় বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে ৩৫ জন, ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী আক্রান্ত ৯৯ জন ২০১৫ সালে ৮৪৬টি ধর্ষনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে ১৬৩ জনই ছিল ৭ থেকে ১২ বছরের শিশু এবং ৫৩ জনের বয়স ছিল ছয়ের নিচে। ২০১৬ সালে ৭২৪টি র্ষণের ঘটনার মধ্যে ৬২ জন ছিল ছয় বছরের নিচে এবং ১৭৮ জন ছিল ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে।

২০০৮ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় জানা যায়, র্ষণের স্বীকার নারীদের ৩১ শতাংশই ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী। যেখানে ধর্ষণে আক্রান্তদের মধ্যে বাচ্চাদের সংখ্যাটাই অধিক, সেখানে কাপড় চোপড় সংক্রান্ত ধারণাটা পুরোপুরি বাতিল হয়ে যায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে ব্যবস্থার ধারক পুরুষ চিরকাল তার পদদলিতই দেখতে চেয়েছে, ধর্ষণএকটা সংক্রামক মানসিকতা এমন সমাজে। তাই এই ধর্ষকামী মনোভাবকে সমূলে বিনাশ করতে হলে আমাদের উচিত আগে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। অপরাধ একদিনে সংঘবদ্ধ হয় না। ধীরে ধীরে তার বীজ বপন শুরু হয়, হু বহু বছরে তা এ রূপ ধারণ করেছেউল্লেখ্য, একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ধারক যেমন হতে পারেন কোনো নারী; তেমনি একজন পুরুষও হতে পারেন এ পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দৃঢ়, সোচ্চার। তাই পুরুষ আর পুরুষতন্ত্রকে এক করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

বিচার চাইবো কার কাছে?

বহু আগেই বপন করা নারী নির্যাতনের বীজ, আজ পরিণত হচ্ছে মহীরুহে। আমরা নারী নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটা ঘটনা অভিযুক্তের শাস্তি চাই, হ্যাঁ চাই, কিন্তু এ বিচারটা করবে কে? কে দেবে শাস্তি? যেখানে রাষ্ট্র স্বয়ং চালাচ্ছে নারী নির্যাতনের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, তারা কী করে করবে নারীর প্রতি অত্যাচারের বিচার? যেখানে রাষ্ট্র স্বয়ং পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহক, সে দেশের বিচারব্যবস্থা এর থেকে আর কতো উন্নত হবে? এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে সোনি সোরি, কাশ্মীর, সেভেন সিস্টারস, থাঙজম মনোরমা, স্তারের আদিবাসী নারীদের প্রতি যৌন নির্যাতনের কথা।

ইরম কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিলেন না। তথাপি তিনি মনিপুরের জনগণের আন্দোলন সংগ্রামের অনস্বীকার্য প্রতিনিধিতে পরিণত হন। অথচ কর্পোরেট মিডিয়ার প্রচারণায় না থাকায় তার অব্যাহত নীরব আন্দোলন থেকে গেছে অনেকটাই পর্দার আড়ালে। তার দাবি ছিল একটাই, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটা গণবিরোধী আইন বন্ধের দাবী (আফসপা আইন)টানা তের বছর ধরে অনশন করে তিনি হার মানেন, কিন্তু মণিপুরের জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন আজও চলমান। ২০০০ সালে মালোমা হত্যাকাণ্ড।

২০০৪ সালে ১১ জুলাই মধ্যরাতে থাঙজম মনোরমা কে ১৭ নং আসাম রাইফেলস এর জওয়ানরা সংঘবদ্ধর্ষণ করে এবং বিভৎসভাবে হত্যা করে। তার বাড়ির দরজা ভেঙ্গে মা ও দুই ভাইকে আহত করে। মনোরমা কে বিছানা থেকে টেনে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে চোখ বেঁধে তার উপর নিপীড়ন করে কয়েক ঘন্টা যাবৎ। তার সারা শরীরে চালানো হয় বেয়নেট ও ছুরি। একসময় তাকে হত্যা করার পর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসীরা চলে যায়। এর প্রতিবাদে কালা দুর্গের সিংহ দুয়ারে বারোজন আন্দোলনকারী কর্মী বিবস্ত্র হয়ে প্রতিবাদ জানান ইন্ডিয়ান আর্মি রেপ আস

ছত্তিশগড়েরস্তারে নারীদের ওপর চালানো অকথ্য অত্যাচারের কথা মাঝে মাঝেই কানে আসে। ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন মহামারী আকার ধারণ করেছে সেখানে, যার নেতৃত্বে রয়েছে সেনা জওয়ানরা। নারীদের স্তন টিপে পরীক্ষা করা হয় তারা নকশাল কিনা, মিথ্যে অভিযোগে জেলে ঢুকিয়ে রাতের পর রাত চলে অকথ্য অত্যাচার, কোন আইনে ভরসা রাখবো আমরা? সোনি সোরির যৌনাঙ্গে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় পাথরকুচি। আর অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা পায় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা।

প্রায় ছাব্বিশ বছর আগে কাশ্মীরের কুনান ও পেশপোরা গ্রামে ৩০ জনেরও বেশি নারীকে ভারতীয় সেনারা ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ ওঠে। ওই আক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া নারীরা আজও লড়ে যাচ্ছেন ন্যায় বিচারের আশায়। কাশ্মীরে ভারতের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে চলমান এক সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের জন্য ভারতীয় সেনা বাহিনীর বড় আকারে অভিযান চলার সময় বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হতো পুরুষকে। সন্দেহভাজন বলে ধরে নিয়ে নারীদের উপর চলত সংঘবদ্ধ ধর্ষণ। তারা আজও ন্যায় বিচার পানি। তাদের সেনাভীতি আজও রয়েছে ভীষণভাবে

এনসিআরবি২০১৬ সালেপ্রতিবেদনে বলা হয়, নারী নির্যাতনের শীর্ষে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, আর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। ব্রিটেনের ওয়েবসাইট দ্য নিউ ইকোনমি ডট কমের সমীক্ষায় দেখা গেছে, নারী নির্যাতনে ৪ নম্বরে আছে ভারত।

রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ধার করছে যারা, তারা যদি নারী নির্যাতনের এমন ভয়াবহ সন্ত্রাসেআবহ সৃষ্টি করে, আমরা বিচার চাইবো কার কাছে? ভরসা রাখবো কাদের উপর? নারী এখানে যৌনবস্তু ভিন্ন অন্যকিছু হতে পারে কী! আর এ খবর যাতে মিডিয়াতে না আসে তাতে শাসকশ্রেণী থাকে সদা সচেষ্ট। কারণ তাদের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের ভেঁকটা যে খসে পড়বে।

করণীয় কী?

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, উত্তাল কলকাতার নাগরিকরা চাইছে অভিযুক্তের ফাঁসি। কিন্তু গুটিকয়েকের ফাঁসিতে কী সমাজ থেকে ধর্ষকামী চেতনা নির্মূল হয়ে যাবে? দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ডের পর তো দোষীদের ফাঁসি হয়েছিলো, কিন্তু এতে কী দিল্লি থেকে নারী নির্যাতন কোনো অংশে কমেছে সামান্যতমও? না, ধর্ষকামী চেতনা বিদ্যমান রেখে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান নিশ্চিত করে জনগণের কোনো ফায়দা হয়নি, হবেও না। বরং ফাঁসিতে ঝোলানো দরকার এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে, যা প্রতিনিয়ত নতুন আরেকটি ধর্ষকের জন্ম দিচ্ছে। কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে যে কোনো অপরাধের উপযুক্ত বিচার কাম্য। কিন্তু যখন সমাজটাই হয় তীব্রভাবে শ্রেণীগত বৈষম্যপূর্ণ, যেখানে নারী বিদ্বেষ প্রকটসেখানে এই অগণতান্ত্রিক, পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে আওয়াজ তোলাটাই হতে পারে একান্ত কর্তব্য।

নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠুক সমাজের সকল স্তর থেকে, সামাজিক বৈষম্যের ঊর্ধ্বে উঠে। আওয়াজ উঠুক, বস্তার থেকে দিল্লি, কাশ্মীর থেকে কলকাতা, অন্ধ্র থেকে আগরতলাসমাজের সর্বস্তরের নারী নির্যাতন ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে।

প্রতিবাদীদের শ্লোগান হোকআমরা বিচার চাই না, আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে অবিচার নির্মূল করতে চাই

We don’t want justice, we just want to be united and abolish injustice”

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s