মহান রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও তার বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা

Posted: নভেম্বর 7, 2017 in মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , ,

লিখেছেন: অজয় রায়

আগামী ৭ই নভেম্বর মহান রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ পূর্তী হবে। শোষণহীন মানব সমাজ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল এই নভেম্বর বিপ্লব (জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী অক্টোবর)। সোভিয়েত জনগণের দ্বারা সম্পন্ন এই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বিশ্বের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে। পৃথিবীর ভূভাগের একষষ্ঠাংশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে। আর সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম দেওয়ার পাশাপাশি গতি সঞ্চার করে পুঁজিবাদকে অতিক্রমের লক্ষ্যাভিমুখী আন্দোলনেযে দীর্ঘ রূপান্তরের প্রক্রিয়া আজও চলছে।

হাজার হাজার বছর ধরে শ্রমজীবী জনগণ ও প্রগতিশীল মানুষরা এক শোষণহীন মানবিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। সেই স্বপ্ন সুনির্দিষ্ট ও বাস্তব রূপ পায় মার্কসএঙ্গেলসের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শের মধ্য দিয়ে। ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত হয় কমিউনিস্ট ইশতেহার। এই মতাদর্শের ভিত্তিতে পৃথিবীর দেশে দেশে, বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলিতে মেহনতি মানুষের আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। তবে ১৮৭১ সালে প্যারি কমিউনে শ্রমিক শ্রেণীর ক্ষমতা দখলের চেষ্টা সফল হয়নি। ফলে প্যারি কমিউনের অভিজ্ঞতার থেকে শিক্ষা নিয়েই লেনিনের মতো বিপ্লবীরা মার্কসবাদের প্রয়োগে উদ্যোগী হন।

মার্কসএঙ্গেলস কমিউনিস্ট ইশতেহার রচনার সময় এবং পরে এই ধারণার কথা বলেছিলেন যে উন্নত পুঁজিবাদী দেশেই আগে শ্রমিক বিপ্লব হবে। তবে ১৮৮২ সালে কমিউনিস্ট ইশতেহারের রুশ সংস্করণের ভূমিকায় মার্কসএঙ্গেলস ইঙ্গিত দেন, ‘‘রুশ বিপ্লব পশ্চিমে এক সর্বহারা বিপ্লবের সঙ্কেতে পরিণত হওয়ার’’ সম্ভবনা রয়েছে।[]

রাশিয়ায় মার্কসবাদী সাহিত্যের চর্চা বহু আগে থেকে শুরু হয়। মার্কসের জার্মান ভাষায় লেখা ‘ডাস ক্যাপিটাল’ (প্রথম খণ্ড) গ্রন্থটি প্রথম অনুদিত হয় রুশ ভাষায়। বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অংশত পরিধিস্থিত রাশিয়া। দেশটির ভূরাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার জন্যেই তার পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যের বিকাশ ঘটে পশ্চিম ইউরোপের থেকে কিছুটা ভিন্নভাবে। আর এটাই রাশিয়ার তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ। রাশিয়ার এই স্বতন্ত্র পুঁজিবাদ বিপ্লবীদের নেতৃত্বে শ্রমজীবী জনগণের ক্ষমতা দখলের জমি তৈরি করেছিল।

রাশিয়ায় বিপ্লবী শক্তিগুলি, বিশেষত বলশেভিক পার্টি তথা কমিউনিস্ট পার্টি জার স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলে। আর এই সব লড়াইসংগ্রাম ক্রমে বিপ্লবের রূপ নেয়। ১৯০৫ সালে অবশ্য এরূপ এক বিপ্লব ব্যর্থ হয়। জারের সরকার ব্যাপক দমনপীড়ন নামিয়ে আনে। কিন্তু, তার মধ্যেও বলশেভিকরা একই সঙ্গে প্রকাশ্য ও গোপন, আইনি এবং বেআইনি কাজের মেলবন্ধন ঘটিয়ে মেহনতি জনগণকে সংগঠিত করতে থাকেন।

এ সময়কালে লেনিন শ্রেণী সংগ্রামের নতুন অভিজ্ঞতা ও সমস্যার আলোকে মার্কসবাদকে সামগ্রিক ভাবে তার বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়ে অর্থাৎ লেনিনবাদে উন্নীত করেন। স্তালিন যেমন লেনিনবাদকে ‘‘সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ’’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।[] বার্নস্টাইনের সংশোধনবাদ, নারোদনিক, অর্থনীতিবাদী, মেনশেভিক, আইনি মার্কসবাদী, অটযোভিস্ট, বিলোপবাদী, কাউটস্কিপন্থী, ট্রটস্কিপন্থী ইত্যাদির মতো বিভিন্ন প্রকারের সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রামের মধ্যদিয়েই লেনিনবাদ বিকশিত হয়। আর বলশেভিকরা মর্কসবাদলেনিনবাদকে রাশিয়ার বাস্তবতা অনুযায়ী সৃজনশীলভাবে প্রয়োগ করেন।

লেনিন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সংশোধনবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। আর নিজের দল রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির (আরএসডিএলপি) অভ্যন্তরে সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের মাধ্যমে বলশেভিকবাদের সূচনা করেন। ক্রমে গড়ে তোলেন সর্বহারা শ্রেণীর সংগ্রামী ও সুশৃঙ্খল অগ্রণী বাহিনী — এক নতুন ধরনের বিপ্লবী পার্টি। যা অনুসরণ করে বলশেভিক সাংগঠনিক নীতি, অর্থাৎ গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা। যার মূল কথা হল ‘‘আলোচনার স্বাধীনতা এবং কাজের ঐক্য’’। পার্টিকে নেতৃত্ব দেন পেশাদার বিপ্লবীরা।

সম্রাজ্যবাদকে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেন লেনিন। আর সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভবের ফলে বিশ্ব পুঁজিবাদী শৃঙ্খলের দুর্বলতম গ্রন্থিকে চিহ্নিত করে সেখানে আঘাত করেন বলশেভিকরা। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে বিপ্লবী গৃহযুদ্ধে পরিণত করেন। যখন ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় ফের বিপ্লবের পরিস্থিতি তৈরি হয়। ইউরোপে তখন শ্রমিক আন্দোলন অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। যার সমর্থন পায় রুশ বিপ্লব। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যে সেসময় বিশ্বকে পুনরায় নিজেদের অনুকূলে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিতে যুদ্ধ চলছিল। জারের সরকারও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির তখন রাশিয়ায় বিপ্লব দমন করার মতো যথেষ্ট সময়শক্তি ছিল না। এদিকে বিশ্বযুদ্ধ রাশিয়ায় গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি করে। চরম দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন সৈনিক, শ্রমিক ও কৃষকরা। যাদের বিপুল সমর্থন পায় ‘শান্তি, রুটি ও জমি’র বলশেভিক স্লোগান।

রাশিয়ায় সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিককৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে দুই পর্যায়ে বিপ্লব সংঘটিত হয়। প্রথমে ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব হয়। সাম্রাজ্যবাদের যুগে অবশ্য বুর্জোয়ারা সামন্তবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে কার্যত অক্ষম ছিল। বরং সামন্ত ব্যবস্থার সাথে তারা আপস করে। ফলে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে হয় সর্বহারা শ্রেণীকেই। যারা ঐ বিপ্লবকে সর্বহারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান।

রাশিয়ায় স্বৈরাচারী জার রাজতন্ত্র বলপূর্বক উচ্ছেদ করা হয় ফেব্রুয়ারিতে, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। একদিকে কেরেনস্কির নেতৃত্বে বুর্জোয়া জোট সরকার গঠিত হয়। অন্যদিকে শ্রমিক ও কৃষকদের স্বশাসনের মাধ্যম – সোভিয়েত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি তৈরি হয় বিপ্লবী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। যা দ্বৈত ক্ষমতা সৃষ্টি করে সেদেশে। কেরেনস্কির নেতৃত্বে বিশ্বাসঘাতক অস্থায়ী সরকারের কার্যকলাপের দরুন গণঅসন্তোষ ক্রমেই বাড়তে থাকে। যখন দ্বিতীয় পর্যায়ে — সর্বহারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয় নভেম্বরে। সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পুঁজিপতি ও সামন্ত শ্রেণীর রাজনৈতিক ক্ষমতা ধ্বংস করে শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষ বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে। আর রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। অস্থায়ী সরকারকে উৎখাত করে রাশিয়ার সমস্ত ক্ষমতা হস্তান্তর করে শ্রমিককৃষকদের সোভিয়েতকে। কমরেড লেনিনস্তালিন এবং বলশেভিক পার্টি পরে যাকে বলা হতো সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি — এদের নেতৃত্বে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবেই গঠিত হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। যেখানে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ক্রমে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। আর শোষক শ্রেণীর একনায়কত্বের জায়গায় সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

নভেম্বর বিপ্লবের পরেই কৃষি ক্ষেত্রে সামন্ততন্ত্র উচ্ছেদের কর্মসূচী রূপায়ণ করা হয়। সকল জাতির সম্পূর্ণ সমানাধিকার এবং সেই সঙ্গে জাতিগুলির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও দেওয়া হয়। আর এই বিভিন্ন জাতিগুলির সমন্বয়েই ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক (ইউএসএসআর)-এর ভিত্তি তৈরি হয়। কমরেড লেনিনের মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন কমরেড স্তালিনতৃতীয় আন্তর্জাতিকের (কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল) সময়কালে।

বলশেভিক বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশেই শ্রমিক শ্রেণী রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেছিল। বিশেষত জার্মানিতে শ্রমিক আন্দোলন যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। কিন্তু এই বিপ্লব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নকে এক দেশে সমাজতন্ত্র গড়ার পথে এগোতে হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সাম্রাজ্যবাদ সর্বদাই অসম বিকাশ ঘটায়। সেজন্য এক দেশে বিপ্লব হওয়া শুধু কোন সম্ভবনা নয়, এটা আবশ্যিক। কারণ, একই সময় সারা বিশ্ব জুড়ে বিপ্লব হবেনা। যতদিন সাম্রাজ্যবাদ থাকবে এবং অসম বিকাশ হবে ততদিন এটা অসম্ভব। এটা লেনিনবাদের একটি মৌলিক তত্ত্ব যা এখনও সত্য।

আর লেনিন মনে করতেন, পুঁজিবাদী দেশগুলির সর্বহারা বিপ্লবী আন্দোলনের উচিত উপনিবেশ এবং নির্ভরশীল দেশগুলির জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া। বলশেভিক বিপ্লব বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিপ্লববাদী আন্দোলনে প্রেরণা জোগায় এবং গণআন্দোলনগুলিকে জোরদার করে তোলে। দেশেদেশে উপনিবেশ এবং আধা উপনিবেশ মুক্তির সংগ্রাম রুশ বিপ্লব থেকে উৎসাহ পায়। আর সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃষ্টান্তের চাপেই বিভিন্ন কল্যাণমূলক ব্যবস্থা চালু করতে বাধ্য হয় পশ্চিমী পুঁজিবাদী দেশগুলি।

সদ্যোজাত সোভিয়ের ইউনিয়ন অবশ্য মারাত্মক প্রতিবিপ্লবের মুখোমুখি হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ ও অবরোধ হয় সেখানে। চার বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার লাল ফৌজ প্রতিবিপ্লব দমন করে। তবে সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ ও গৃহযুদ্ধ সেদেশের অর্থনীতিকে বিধ্বস্ত করে। সেজন্যে ১৯২০’র দশকে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসাবে নয়া অর্থনৈতিক নীতি (১৯২১ ১৯২৯) গ্রহণ করতে হয়। এদিকে তপ্ত যুদ্ধের পর শীতল যুদ্ধ চলতে থাকে। তার মধ্যেই ১৯৩০’র দশকে বিশেষত যৌথকরণ কার্যক্রমকে সংহত করা হয়। আর উৎপাদনের উপকরণের রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়।

বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত রাশিয়ায় জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটে। সেখানে সকল নাগরিকের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। নরীদের জন্য সমানাধিকার আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর সেই সঙ্গে ব্যাপক মাত্রায় শিল্পায়ন হয়। বিজ্ঞানপ্রযুক্তি এবং সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। সমাজতান্ত্রিক নির্মাণে সোভিয়েত রাশিয়াকে নেতৃত্ব দেন স্তালিন। যার নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার লাল ফৌজ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করে মানবসভ্যতাকে রক্ষা করে।

তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা ছিল। এর কারণ অংশত সর্বহারার একনায়কতন্ত্র সংক্রান্ত পূর্বতন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার অভাব (স্বল্পকালস্থায়ী প্যারি কমিউন ব্যতীত) এবং সেই সঙ্গে ইউএসএসআর’র বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী অবরোধ ও আগ্রাসণ। সেদেশে যেমন সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের বিকাশের ক্ষেত্রে দুর্বলতা থেকে যায়। ক্রমে ক্রমে সোভিয়েত প্রতিষ্ঠানগুলি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তাছাড়া উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে জোর দেওয়া হলেও উৎপাদন সম্পর্ক ও উপরিকাঠামোর ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ঘাটতি থেকে যায়। পরবর্তীকালে সোভিয়েত নেতৃত্বের কিছু অধিবিদ্যাগত (মেটাফিজিক্যাল) দুর্বলতাও দেখা দেয়। আর একাংশের মধ্যে আমলাতান্ত্রিকতা ও ব্যক্তিপূজার ঝোঁক ক্রমেই বাড়তে থাকে। মার্কসবাদলেনিনবাদকে যান্ত্রিক ভাবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা তৈরি হয়। সেই সঙ্গে ব্যাপক মাত্রায় বিরাজনীতিকরণ চলতে থাকে। আর এর মধ্যেই উদ্ভব ঘটে বিশেষ সুবিধাভোগী আমলাতন্ত্রের। যাদের কর্তৃত্ব ও প্রভাব বাড়তে থাকে। ফলে এক নতুন আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়া শ্রেণীর জন্ম হয় সোভিয়েত ইউনিয়নে।

কমরেড স্তালিনও পরবর্তীকালে কিছু ভুল পদক্ষেপ নেন। তবে রাশিয়ায় বিপ্লব ও নির্মাণে স্তালিনের অবদান তাঁর এই ভুলগুলোর তুলনায় অনেক বড় হয়ে উঠেছে। সেজন্যেই মাও সেতুঙ এ ব্যাপারে বলেছেন, স্তালিনের ‘‘মূল্যায়ন হওয়া উচিত সত্তর শতাংশ সাফল্য এবং তিরিশ শতাংশ ভুল’’ (মাও সেতুঙ, নির্বাচিত রচনাবলী, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৭, ১৯৫৬)[]

এদিকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদের সাধারণ সঙ্কটের দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা হয় এবং পরবর্তী বেশ কয়েক বছর ধরে তা চলে। পূর্ব ইউরোপ, চীন, উত্তর ভিয়েতনাম এবং উত্তর কোরিয়া পুঁজির জোয়াল থেকে মুক্ত হয়। আর এক শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক শিবির আবির্ভূত হয়। যা বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে। যখন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির মধ্যেকার সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিকতাবাদের সঙ্গে দেশপ্রেমকে মেলানোর নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল।

তবে ১৯৫৩ সালে স্তালিনের মৃত্যুর পর আধুনিক সংশোধনবাদী ক্রুশ্চেভ চক্র প্রতিবিপ্লবের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্ষমতা দখল করে। আর ১৯৫৬ সালে সেদেশে পুনপ্রতিষ্ঠিত হয় পুঁজিবাদ। যা ছিল রাষ্ট্রীয় আমলাতান্ত্রিক পুজিবাদ। ক্রুশ্চেভ ‘শান্তিপূর্ণ রূপান্তর’, ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’ এবং ‘শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা’র দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদী নীতি ঘোষণা করেন। যখন সোভিয়েত রাশিয়ায় বিকৃত জাতীয়তাবাদী প্রবণতা দেখা দেয়। সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের তৎপরতা শুরু হয়। সংশোধনবাদ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতেও সমাজতন্ত্রকে ধ্বংস করে। আর ঐ দেশগুলিকে কার্যত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের উপনিবেশে রূপান্তরিত করে। পূর্ব ইউরোপে স্বাধীন বিকাশের প্রশ্নে যেমন অনুমোদন দিতে অস্বীকার করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সংশোধনবাদ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়ার হাতিয়ার। যা মার্কসবাদের সংশোধনের অজুহাতে তার মূল নীতিগুলিকে জলাঞ্জলি দেয়। চিরাচরিত সংশোধনবাদ প্রকাশ্যেই তা করে। কিন্তু আধুনিক সংশোধনবাদ মার্কসবাদের মুখোশ পরে মার্কসবাদের বিরোধিতা করে।

সোভিয়েত ইউনিয়নে পুঁজিবাদের পুন:প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞতা ও চীনের প্রারম্ভিক নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন চীনের কমিউনিস্টরা। তাঁদের নেতৃত্বে সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংগ্রাম সংঘটিত হয়। যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক চীনের মধ্যে মহাবিতর্ক হয়। চীনে পুঁজিবাদের পুন:প্রতিষ্ঠা রোধ করতে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবেরও (১৯৬৬–১৯৭৬) সূচনা করা হয় মাও সে–তুঙএর নেতৃত্বে। তবে ১৯৭৬ সালে মাও সে–তুঙ–এর মৃত্যুর পর দেঙ জিয়াও পিঙ’–র দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠী চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব কব্জা করে। আর পুঁজিবাদী পথ অনুসরণ করে।

১৯৯১ সালে অবশ্য পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নেরও পতন ঘটে। পূর্ব ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নে রাষ্ট্রীয় আমলাতান্ত্রিক ধনতন্ত্র ভেঙে পড়ে এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভিত্তিক ‘‘সাধারণ’’ ধনতন্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। ফলে এঅঞ্চলের জনসাধারণের দুর্দশা আরও বাড়ে।

এদিকে যেটা লক্ষণীয়, সংশোধনবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি বলশেভিক বিপ্লবের সাফল্যের ইতিহাস বিকৃত করতে এখনও ক্রমাগত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় ঘটলেও নভেম্বর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আদর্শ এখনও বিপ্লববাদী সংগ্রামকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে উঠতে প্রেরণা জোগাচ্ছে। প্রসঙ্গত, স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে, পুঁজিবাদের বয়সও প্রায় ৫০০ বছর হয়ে গেছে; তাকে বহুবার হোঁচট খেতে হয়েছে। আর এখনও দুনিয়ার সর্বত্র পুঁজিবাদ পুরোপুরি সংহত হতে পারেনি। বরং সঙ্কটে পড়ে খাবি খাচ্ছে।

যদিও সাম্রাজ্যবাদ নিজেই বিশ্বায়িত। তবে বৈদ্যুতিন তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ ও তা কাজে লাগানোয় সাম্রাজ্যবাদের সাফল্যের দরুন অতীতের তুলনায় আরও ব্যপকভাবে বিশ্বায়িত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ। স্পষ্টতই সাম্রাজ্যবাদের রূপের পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু তার মূল চরিত্র একই রকম রয়েছে। সম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় এবং তা হচ্ছে একচেটিয়া পুঁজিবাদ। যখন বর্তমানে আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির বিশ্বময় আধিপত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পুঁজিবাদের কাঠামোগত সঙ্কটও ঘনীভূত হচ্ছে। আর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দোসররা বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

এর মধ্যেই রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও নির্মাণের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। যেমন লক্ষণীয়, রাশিয়ার সংসদে (ডুমা) গিয়ে বলশেভিকরা সংসদকে উন্মোচন করার কাজটিও করেছিলেন। তবে স্পষ্টতই লেনিনবাদী পার্টিটির ভরকেন্দ্র ছিল সংসদ ও সংসদীয় রাজনীতির বাইরে। আর নভেম্বর বিপ্লবের পরেই বলশেভিক পার্টিকে সংবিধান সভা ভেঙে দিতে হয়েছিল। কারণ, তখন সংবিধান সভা প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতিয়ার হিসাবে কাজ করছিল। বৈপ্লবিক সংস্কার করার ও সোভিয়েত সরকারের মাধ্যমে সর্বহারার একনায়কত্ব অনুশীলনের পথে তা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই ঘটনাক্রম শিক্ষণীয়। যখন ইতিমধ্যেই ‘‘বিবর্তনমূলক সমাজবাদ’’ এবং তার যমজ ভাই ‘‘সংসদীয় পথে সমাজবাদ’’এর সংস্কারবাদী প্রতিশ্রুতি যে কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন, তা ইতিহাসে বারংবার প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে।

আরও যেটা লক্ষণীয়, রুশ বিপ্লব সফল হওয়ার আগে পর্যন্ত আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে সংশোধনবাদের আধিপত্য ছিল। আর লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিকদের মতো প্রকৃত বিপ্লবীরা সংখ্যালঘু ছিলেন। কিন্তু, বলশেভিকরা সঠিক রণনীতি ও রণকৌশল অবলম্বন করে লাগাতার আন্দোলনসংগ্রামের মাধ্যমে যেভাবে শক্তি বৃদ্ধি করেন আজকের দিনের সংগ্রামে তা অত্যন্ত শিক্ষণীয়।

বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার বৈশ্বিক সঙ্কট চলছে। বিপ্লবী আন্দোলন তৈরিতে বস্তুগত উপাদান অনুকূল। কিন্তু সেই সঙ্গে দরকার বিষয়ীগত উপাদানের। যার অর্থ, সমাজতন্ত্রের পক্ষে জনগণের চেতনায় পুঁজিবাদের বিকল্প প্রতিষ্ঠা করা। এর জন্যে বিপ্লবী সংগঠন ও জনগণকে এমএলএম মতাদর্শে শিক্ষিত করে তোলা দরকার। যাতে চেতনার মান উন্নয়ন হয়। আর বিপ্লবী বাহিনীর সাংস্কৃতিক রূপান্তর ও সর্বহারাকরণ ঘটানো যায়অসর্বহারা প্রবণতা মোকাবিলার মাধ্যমে। স্পষ্টতই, এর জন্য বলশেভিকোচিত দৃঢতা অর্জন করা দরকার। মাও সেতুঙএর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্টরা যেমন বলশেভিকীকৃত কমিউনিস্ট পার্টি গড়ায় জোর দিয়েছিলেন; অর্থাৎ এমন ‘‘এক পার্টি যা জাতীয় মাপের এবং ব্যাপক গণচরিত্রসম্পন্ন, আর মতাদর্শগত, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দিক থেকে সম্পূর্ণ সংহত একটি পার্টি’’।[]

লেনিনবাদী নীতি অনুসারে জনগণের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ রেখে, গণউদ্যোগকে স্বীকৃতি দিয়ে এবং সেই সঙ্গে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে ত্রুটি সংশোধন (যার অন্তর্ভুক্ত মতাদর্শগত সংশোধন, রাজনৈতিক সংশোধন, সাংগঠনিক সংশোধন আর সাংস্কৃতিক সংশোধন) প্রক্রিয়া চালানোও জরুরি। আর স্বাস্থ্যকরভাবে কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম পরিচালনা করার বিষয়টি এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এভাবে বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন বিপ্লবী শক্তির। যার লক্ষ্য থাকবে সর্বহারার একনায়কতন্ত্রের অধীনে সমাজতন্ত্র নির্মাণ করা। যাতে শ্রেণীহীন সমাজ অর্থাৎ সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার দিকে এগোনো যায়।

বর্তমান বিশ্বের গুরুতর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সমস্যাগুলি পুঁজিবাদের সহজাত বৈশিষ্ট্য। সেজন্যেই মানবতার সেবায় এবং পরিবেশ রক্ষায় নিয়োজিত এমন এক সমাজ ও অর্থনীতির দ্বারা পুঁজিবাদকে প্রতিস্থাপন করা আবশ্যক। যখন একমাত্র বিকল্প সমাজতন্ত্র। আর ব্যাপক, গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক, পরিবেশগত ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ারই প্রেরণা দেয় বলশেভিক বিপ্লব। এই বিপ্লবের ইতিবাচক ও নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। যখন বর্তমানে নয়া উদারবাদী বিশ্বায়নের ফলে দুনিয়া জুড়ে বৈষম্য ও দারিদ্র বাড়ছে। তাছাড়া সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠতরাজ চলছে। যাতে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। এদিকে, পুঁজিবাদের সঙ্কটও ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। যে সঙ্কটের বোঝা চাপানো হচ্ছে জনসাধারণের ঘাড়ে। ফলে বাড়ছে জনবিক্ষোভ। যা দমন করতে মরিয়া শাসক শ্রেণী। ধর্মবর্ণজাতিসম্প্রদায়ের বিভেদে মানুষকে ভাগ করতে উঠে পড়ে লেগেছে তারা। যখন নানা রূপে নব্য ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটছে।

এর মধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নভেম্বর বিপ্লবের শতবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। যখন সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাচ্ছেন শ্রমজীবী জনসাধারণ। যাদের রাডিকাল অংশ রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন; আর সংশোধনবাদ ও মতান্ধতার মোকাবিলা করে এমএলএম মতাদর্শকে নিজ নিজ দেশের বাস্তবতা অনুযায়ী সৃজনশীল ভাবে প্রয়োগ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিশ্ব সর্বহারা বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সংগ্রাম করছেন। যা মহান রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতাকেই প্রমাণ করছে

০৬/১১/২০১৭

তথ্যসূত্র

[] Karl Marx & Frederick Engels, ‘‘Manifesto of the Communist Party: Preface’’, The 1882 Russian Edition

[] J. V. Stalin, “Concerning Questions of Leninism’’, Collected Works, Vol. VIII, January 25, 1926

[] Mao Tse-tung, “STRENGTHEN PARTY UNITY AND CARRY FORWARD PARTY TRADITIONS”, in Selected Works of Mao Tse-tung, Vol. V, (Foreign Languages Press, Peking, First Edition), p. 317, 1956

[] Mao Tse-tung, ‘‘INTRODUCING THE COMMUNIST’’, in Selected Works of Mao Tse-tung, Vol. II, October 4, 1939

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s