সংবাদ সম্মেলনে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন কমিটির বক্তব্য

Posted: অক্টোবর 31, 2017 in দেশ, বিভাগ সমূহ, মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , ,

৩০ অক্টোবর ২০১৭, প্রগতি সম্মেলন কক্ষ, মুক্তি ভবন, ঢাকা।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

দুনিয়াকাঁপানো সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষে আপনাদের সবাইকে রক্তিম শুভেচ্ছা। আজকের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হবার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে শুরু করছি।

বন্ধুগণ,

অসহনীয় দ্রব্যমূল্যের কারণে শ্রমিক কৃষক গরীব মেহনতী মানুষের ঘরে ঘরে আজ শুধু হাহাকার আর হাহাকার। মাত্র তিনদিন আগে শেরপুরে ভাতের অভাবে ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হলো কিশোরী কনিকা। এ যেন কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষকের জীবনের করুন অবস্থার এক প্রতিকী চিত্র। অথচ, সরকারের কথিত উন্নয়নের গল্প এ নির্মম বাস্তবতাকে উপহাস করছে।

বাংলাদেশের আকাশে বাতাসে আজ একদিকে বিভৎস নির্যাতনগণহত্যার শিকার হয়ে দেশছাড়া লাখ লাখ রোহিঙ্গার অসহায় আহাজারি; অন্যদিকে গুম, খুন, ধর্ষণসহ হরেক রকম নির্যাতনের শিকার মানুষ ও স্বজনের বুকচাপা কান্নার শব্দ। প্রতিদিনের সংবাদেই ফুটে উঠছে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা আর অসহায়ত্বের ছবি। সীমান্তের ওপারে আরাকানে মানুষের বাড়ীঘরে আগুন অথবা নদীসাগরে ভাসমান গলিত লাশ আপনারা দেখছেন। কদিন আগে গোবিন্দগঞ্জে সাওতালদের ঘরে আগুন, ধানক্ষেতে পড়ে থাকা গুলিবিদ্ধ লাশ অথবা বাঁশখালিতে পুলিশের গুলিতে বুক ঝাঁঝড়া হওয়া কৃষকের লাশ আপনারা নিশ্চয় ভোলেননি।

শুধু বাংলাদেশ নয়, মধ্যপ্রাচ্যআফ্রিকাসহ দুনিয়াজুড়ে পুঁজিবাদসাম্রাজ্যবাদ ও দালালদের স্বার্থের সংঘাতসংঘর্ষযুদ্ধ ও নির্যাতনে জর্জরিত লাখো কোটি মানুষ জীবন বাঁচাতে আজ এক দেশ থেকে আর এক দেশে অথবা দেশের ভেতরেই উদ্বাস্তু হয়ে দুর্বিসহ জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। নিপীড়িত মানুষ মুক্তির পথ খুঁজছে। কিন্তু, সঠিক দিশার অভাবে যথাযথ সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারছে না, নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না। দিশাহীনতার এই সময়ে মুক্তির সঠিক দিশাটাই নিপীড়িত জনগণের জন্য সবচেয়ে বেশী দরকারি। একই সাথে দরকার ভুল পথগুলো চিহ্নিত করা। কারণ, ভুল পথে কখনোই মুক্তি আসে না। বরং শোষণনির্যাতনের পুরনো ব্যবস্থাই তাতে পুষ্ট হয়। অবরুদ্ধ হয় মুক্তির পথ।

.

বন্ধুগণ,

আজ থেকে একশো বছর আগে ১৯১৭ সালে অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বাস্তবে দেখিয়েছিল মানুষের মুক্তির প্রকৃত পথ হলো সমাজতন্ত্রসাম্যবাদ। রাশিয়ায় শ্রমিক ও গরীব কৃষক এবং সাধারণ সৈনিকরা সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পুঁজিপতি ও জমিদারদের রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করেছিল। ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল শোষকদের আধিপত্য ও নিপীড়নের হাতিয়াররাষ্ট্র। কায়েম করেছিল শ্রমিকশ্রেণীর নতুন ধরনের রাষ্ট্র, সোভিয়েত রাষ্ট্র ও নতুন সমাজসমাজতন্ত্র। সুবিধাবাদ, সংস্কারবাদসহ সব ধরনের বিপ্লববিরোধী ভুল পথপদ্ধতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে মার্কসবাদী পথ দেখিয়েছিলেন কমরেড লেনিন।

মার্কসএঙ্গেলস শিখিয়েছিলেন শ্রেণীসংগ্রামই হলো ইতিহাসের চালিকা শক্তি। শোষণনিপীড়নের উৎস হলো শ্রেণীবিভক্ত শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থা। শোষণনিপীড়ন থেকে মুক্ত হতে হলে শোষণমুলক ব্যবস্থাকেই বিদায় করতে হবে, কায়েম করতে হবে শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব। কেননা, শোষণমূলক ব্যবস্থা দূর করার উপায় হলো শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব। শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্বে শোষণের যাবতীয় ভিত্তি, উপায়উপকরণ বিলুপ্ত করার সমাজ সমাজতন্ত্র। যা এগিয়ে যাবে শোষণবৈষম্যহীন মুক্ত মানুষের সমাজসাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে। ইতিহাসের অনিবার্য গতি সেদিকেই।

এই শিক্ষায় অবিচল থেকে রাশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণী গড়ে তুলেছিল শ্রেণীসংগ্রামের সুশৃঙ্খল অগ্রবাহিনীবলশেভিক কমিউনিস্ট পার্টি। এমন এক বিপ্লবী পার্টি, যা বিপ্লবী সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে পারে এবং যা গড়ে তুলতে পারলেই কেবল প্রলেতারিয় বিপ্লব করা যায়। বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে রাশিয়ায় শোষকনিপীড়কদের বিরুদ্ধে কায়েম হয়েছিল শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব। শ্রমিকশ্রেণী সুদৃঢ় জোট বেঁধেছিল গরীব কৃষকের সাথে এবং মৈত্রী গড়ে তুলেছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সঙ্গে। শ্রমিক কৃষক মেহনতী জনগণের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিল এক অভূতপূর্ব স্বাধীনতা, গণতন্ত্রসহ তাদের সার্বিক অধিকার।

.

সাংবাদিক বন্ধুগণ,

কমরেড লেনিনের মৃত্যুর পর কমরেড স্ট্যালিন সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিকে শ্রেণীসংগ্রামের মাঠে নেতৃত্ব দেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে মানুষকে চুড়ান্তভাবে মুক্ত করতে সমাজতন্ত্রের নির্মাণ এগিয়ে নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করে শ্রমিকশ্রেণীর বিজয় নিশ্চিত করেন। কিন্তু, কমরেড স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর ক্রুশ্চেভ চক্র সমাজতন্ত্রের নামেই শান্তিপূর্ণ সহবস্থান ও শ্রেণী সমন্বয়বাদসহ শ্রেণীসংগ্রাম বিরোধী ও মার্কসবাদ বিরোধী তত্ত্ব ও পথ অবলম্বন করে রাশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব ও সমাজতন্ত্রকে নস্যাত করে। অক্টোবর বিপ্লবে ক্ষমতা হারানো শোষক পুঁজিপতিশ্রেণীকে ক্ষমতা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৯১ সালে এই পুঁজিপতিরা খোলাখুলিভাবে রাশিয়ায় পুঁজিবাদ ঘোষণা করে।

আবার, রুশ বিপ্লবের দিশা ও প্রেরণায় ঘটেছিল চীন বিপ্লব। কিন্তু, ১৯৭৬ সালে কমরেড মাও সেতুঙ এর মৃত্যুর পর চীনেও তেঙ চক্রের নেতৃত্বে নতুন বুর্জোয়ারা ক্ষমতা দখল করে। শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব ও শোষণবৈষম্য অবসানের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে হটিয়ে ভুয়া সমাজতন্ত্র বা পুঁজিবাদ কায়েম করে। এভাবে, শোষকদের ক্ষমতা আপাতত ফিরে এলেও শোষিতের মুক্তির লক্ষ্যে পুঁজিবাদীসাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকে হটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলছেই। গত একশ বছর ধরে শ্রমিকশ্রেণী ও শোষিত জনগণ সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা ও শিক্ষায় সমৃদ্ধ হয়েছে।

একদিকে পুঁজিবাদসাম্রাজ্যবাদ আজ আবারও গোটা বিশ্বকে গ্রাস করেছে। নতুনভাবে ভাগবাটোয়ারার লড়াইয়ে পারমাণবিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি করেছে। দেশে দেশে কায়েম করছে ফ্যাসিবাদ। জনগণকে বিভক্ত করে শোষণশাসনের জন্য উস্কে দিচ্ছে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতাসহ বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল ভাবধারা। চালিয়ে যাচ্ছে নজিরবিহীন শোষণলুন্ঠননিপীড়নের বিভীষিকা। প্রকৃতিপরিবেশের বিরুদ্ধে চালানো হচ্ছে চরম ধ্বংসাত্মক তৎপরতা। শোষণলুন্ঠণের নৈরাজ্যে মানব সমাজের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে। বাংলাদেশেও সাম্রাজ্যবাদ ও আগ্রাসী ভারতের অনুগত শাসকশ্রেণীর কয়েক দশকের শাসনশোষণে জর্জরিত জনগণ। আওয়ামী সরকার কায়েম করেছে এক নজিরবিহীন ফ্যাসিবাদ।

অপরদিকে, অব্যাহত আছে জনগণের শোষণমুক্তির লড়াই। মুক্তিকামী জনগণ খুঁজছে মুক্তির দিশা, সঠিক পথ। এমন সময় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন মুক্তিকামী মানুষের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কেননা, সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শোষিতের ক্ষমতা কায়েম করেছিল, দেখিয়েছিল মানব মুক্তির প্রকৃত পথ। আর সমাজতান্ত্রিক সমাজকে নস্যাৎ করে শোষকরা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে শোষণের পুরনো ব্যবস্থা। ব্যাহত করেছে শোষিতের মুক্তির পথ।

কাজেই, মুক্তিকামী মানুষের মাঝে আজ সমাজতন্ত্রসাম্যবাদের সঠিক দিশা নিয়ে যেতে হবে। সেজন্য উর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে বলশেভিক সংগ্রামী শিক্ষা, শ্রেণীসংগ্রাম, শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব, বলপ্রয়োগে শোষিতের ক্ষমতাদখল, একশ বছরে সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে লেনিনস্ট্যালিনমাও সেতুঙ মার্কসবাদী শিক্ষকদের পথ। বাতিল করতে হবে শ্রেণীসংগ্রাম বিরোধী, শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব বিরোধী, মার্কসবাদ ও সমাজতন্ত্র বিরোধী পথকে। এটাই সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শিক্ষা।

.

সাংবাদিক বন্ধুগণ,

বাংলাদেশে শ্রমিকশ্রেণী ও শোষিতনিপীড়িত জনগণের মুক্তির সংগ্রামকে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শিক্ষায় সজ্জিত করে সমাজতন্ত্রের সংগ্রামকে বেগবান করার জন্য আমরা অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। আগামী ১০ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে প্রধান কর্মসূচি। এদিন শুক্রবার সকাল ১০টা ৩০মিনিটে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ১১টা ৩০মিনিটে লাল পতাকাসহ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ১২টা ৩০মিনিটে রুশ বিপ্লবের উপর চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হবে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিস্টিটিউশন, বাংলাদেশএর দ্বিতীয় তলার সেমিনার কক্ষে। বিকেল ৩টা ৩০মিনিটে একই স্থানে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। এই প্রধান কর্মসূচির পর দেশের একাধিক জেলায়ও আমরা উদযাপন কর্মসূচি আয়োজন করছি। যার মধ্যে আগামী ১৭ নভেম্বর রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হবে মিছিল ও আলোচনাসভা। এসব কর্মসূচির খবর এবং সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শিক্ষা জনসাধারণের মাঝে তুলে ধরার জন্য আমরা আপনাদের সহযোগিতা কামনা করছি। আশা করছি, আপনাদের সংবাদ মাধ্যমে এসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ/প্রচার করে আমাদের সহযোগিতা করবেন। জনগণের কাছে রুশ বিপ্লবের শিক্ষা ও মুক্তির সঠিক দিশা তুলে ধরায় আপনাদের ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসবেন।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে ধৈর্য্য ধরে এতক্ষণ আমাদের বক্তব্য শোনার জন্য আবারও ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করছি।

.

.

হাসান ফকরী

আহ্বায়ক,

সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন কমিটি।

.

পুঁজিবাদসাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক, নিপাত যাক!

ভূয়া সমাজতন্ত্র নিপাত যাক!

সমাজতন্ত্রকমিউনিজমের বিশ্বব্যবস্থা জিন্দাবাদ!

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s