সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের মাদ্রাসা শাখা খোলা প্রসঙ্গে

Posted: সেপ্টেম্বর 28, 2017 in মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , ,

লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

শুনলাম বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ছাত্র সংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট মাদ্রাসায় তাদের শাখা বিস্তৃত করেছে। বাসদ সদস্য কিবরিয়া হোসাইনের ফেসবুক আইডি থেকে জানা যায়, দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার ঘোড়াবান ছালেহিয়া দারুচ্ছুন্নত দাখিল মাদ্রাসার ১৭ সদস্যবিশিষ্ট ছাত্র ফ্রন্টের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়েছে। তিনি সেখানে কয়েকটি ছবিও পোস্ট করেছেন। ভালো কথা। এতে কেউ কেউ বেশ আপ্লুতও হচ্ছেন। এতে দোষেরও কিছু নেই।

তবে প্রশ্ন হলো, কোনো রাজনৈতিক সংগঠন কিসের ভিত্তিতে নতুন জায়গায় শাখা খুলতে পারে?

ছাত্র ফ্রন্ট তাদের দলিলে ঘোষিত মতাদর্শিক অবস্থান ‘মার্ক্সবাদলেনিনবাদ’ বলে উল্লেখ করে। এই মতাদর্শের ভিত্তিতেই তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা। আর তার ভিত্তিতেই নতুন শাখাও খোলার কথা। এখন প্রশ্ন আসে, ফ্রন্টের নেতারা কী মাদ্রাসার ওই শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেদের মতাদর্শিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন? যদি তারা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দলে ভিড়িয়ে থাকেন, তবে মাদ্রাসা কমিটি, মসজিদ কমিটি, মাজার কমিটি, মন্দির কমিটি, আখড়া কমিটি, গীর্জা কমিটি বা প্যাগোডা কমিটিও তারা গঠন করতে পারেন। আবার যদি তা না করে থাকেন, তাহলে এটা নির্জলা ভণ্ডামো। আর সংশোধনবাদী তৎপরতায় ওই ভণ্ডামোটাই কিন্তু মতাদর্শিক ভিত্তি! নাকি তারা মার্ক্সবাদলেনিনবাদের নামে নতুন ধর্ম দর্শনের প্রবর্তন করতে যাচ্ছেন?? যদি এমন উদ্ভট ধরণের কোনো তত্ত্ব তারা প্রসব করে থাকেন, তাহলে সেটা শিবদাশ ঘোষের চিন্তায় নতুন বিকাশই বলতে হবে!

অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন, ‘বুর্জোয়া শিক্ষাক্রম আর মাদ্রাসার মধ্যে তো কোনো পার্থক্য নেই। তাহলে এতে বাধা দেওয়ার কী হলো?’ কিন্তু বন্ধুগণ, ধর্মভিত্তিক (ধর্ম শব্দটি এখানে রিলিজিওন অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে) শিক্ষার সঙ্গে বুর্জোয়া শিক্ষা পদ্ধতির একটি মৌলিক পার্থক্য তো আছেই। আর তা হলো, ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তি। বুর্জোয়া শিক্ষায় কোনো শিক্ষার্থীকে ধর্ম পালনে বাধ্য করা হয় না। কিন্তু ধর্মশিক্ষায় তা করা হয়। কারণ ধর্মটাই একটা প্রধান বিষয়। আর তাকে ঘিরেই সেই শিক্ষা পদ্ধতি। যদিও বাংলাদেশের দালালবুর্জোয়ারা যে শিক্ষা পদ্ধতি সামনে এনেছে, তাতে স্কুলে ধর্মশিক্ষা পড়ানো হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জীবন সেই ধর্মের ভিত্তিতেই চলতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা প্রয়োগ করতে পারে না।

এখানে ধর্ম প্রসঙ্গে মার্ক্সবাদ কী বলে, তার জানাবোঝা থাকাটা খুবই জরুরি।

কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস দেখিয়েছেন, অর্থনীতি– উৎপাদনপুনরুৎপাদন ও বিনিময়ের পুরো প্রক্রিয়াটি হলো ভিত্তি। যার উপর গড়ে ওঠে রাজনীতি, দর্শন, ধর্ম, নৈতিক চেতনা, শিল্প, সাহিত্য ইত্যাদি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা– উপরিকাঠামো। অর্থাৎ শ্রেণীবিভক্ত সমাজের মধ্যকার শ্রেণীসমূহের আন্তসম্পর্ক এবং শোষণ প্রক্রিয়া থেকেই উদ্ভূত হয় ধর্ম ও সামাজিক নীতিনৈতিকতার বিবিধ ধারা। প্রাকৃতিক শক্তিগুলোর কাছে অসহায়ত্ব থেকেই অতিপ্রাকৃত চিন্তার আবির্ভাব এবং বিকাশ ঘটে। এমনকি আজ পর্যন্ত এই চেতনাই অতিপ্রাকৃত শক্তির বেঁচে থাকার মূল আধার। আর এর উপর ভিত্তি করে শাসকশ্রেণী নিজের শোষণ কাঠামোকে পোক্ত করেছে ও করছে। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে ধর্মও শ্রেণীচেতনার ঊর্ধ্বে নয়। ধর্ম যেমন কখনো সমাজের অগ্রগতিতে বাধা হিসেবে, শ্রেণী নিপীড়নের সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, ঠিক তেমনি কখনো এই ধর্ম নিপীড়নের বিরূদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবেও থেকেছে সপ্রতিভ। কোনো ধর্ম একরৈখিকভাবে অগ্রসর হয়নি, একই ধর্মের বিভিন্ন ধারা বিভিন্নভাবে অগ্রসর হয়েছে।

মার্ক্স বলেন, “ধর্ম হলো নিপীড়িত জীবের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন জগতের হৃদয়, ঠিক যেমনটা আত্মাবিহীন পরিবেশের আত্মা। ধর্ম হলো জনগণের জন্য আফিম।” এখানে মার্ক্স ধর্মকে ‘আফিম’ বলে উল্লেখ করে এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, এটি অসহায়ের চিন্তা জগতকে এক কল্পিত অবলম্বন জোগায়। যার মাধ্যমে শাসকশ্রেণী শোষণকে নিয়তি হিসেবে হাজির করে এবং কর্মফলের নামে তাকে দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা করে।

বস্তু এবং চেতনার মধ্যেকার সম্পর্কের প্রশ্নে মার্ক্সবাদী শিক্ষকেরা দেখিয়েছেন, বস্তু নিরপেক্ষভাবে চেতনার কোনো অস্তিত্ব নেই, চেতনা বস্তুর অন্তর্নিহিত। যতোদিন মানুষ থাকবে, ততোদিন চেতনার অস্তিত্বও থাকবে। তবে মানুষের জন্যই চেতনা, চেতনার জন্য মানুষ নয়। ধর্ম সম্পর্কে মার্ক্স বলেন, “মানুষের জীবনে ধর্মীয় জগৎ হচ্ছে বাস্তব জগতেরই প্রতিফলন।” মানুষের মনে ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া এবং প্রাকৃতিক নানা শক্তির শক্তিমত্তা সম্পর্কে মানুষের আশঙ্কা ধীরে ধীরে সেই প্রাকৃতিক শক্তিগুলো সম্পর্কে ভয়ভীতি তৈরি করে– তার বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এঙ্গেলস তাঁর ‘এন্টি ড্যুরিং’ গ্রন্থে লিখেছেন, “সব ধর্মই হচ্ছে মানুষের মনের মধ্যে সেই বহির্শক্তির একটা উদ্ভট প্রতিফলন, যে শক্তিগুলো তাদের প্রাত্যহিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটা এমন এক প্রতিফলন যেখানে পার্থিব শক্তিগুলো কতগুলো অতিপ্রাকৃতিক শক্তির রূপ পরিগ্রহ করে। ইতিহাসের প্রথম দিকে প্রাকৃতিক শক্তিগুলোর প্রভাবেরই প্রতিফলন ঘটেছিল এবং পরে সেগুলো আরও বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপকতম বৈচিত্রতার সঙ্গে বিভিন্নভাবে মূর্তরূপ ধারণ করেছে।”

অর্থাৎ, ধর্মদর্শনে বাস্তবিক জীবনেরই প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। আর এ কারণেই আমরা বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত ঘটনাবলীতে সংশ্লিষ্ট আর্থসামাজিকসাংস্কৃতিক কাঠামোর প্রতিফলনের দেখা পাই।

মার্ক্সের ধর্মসংক্রান্ত গবেষণার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জর্জ টমসন দেখিয়েছিলেন, একদিকে প্রকৃতি সম্পর্কে অজানা আশঙ্কা, পাশাপাশি প্রকৃতি এবং সৃষ্টি রহস্যকে জানার প্রচেষ্টা থেকেই ধর্ম ও বিজ্ঞান দুটো ধারারই বিকাশ ঘটেছিল। প্রকৃতি সংক্রান্ত অজানা আশঙ্কা থেকে প্রথমে উৎপত্তি হয়েছিল জাদুবিদ্যার। এই জাদুবিদ্যা আবার দুটো ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়। একটা বিকশিত হয় বিজ্ঞানের ধারায়, আরেকটা থেকে সৃষ্টি হয় ধর্মের। প্রকৃতির নিয়মাবলী অজানা থাকার ফলে, যারা প্রকৃতির মধ্যেকার সমস্যাকে জানার জন্য বস্তুজগতের মধ্যেই নিয়মাবলীকে খুঁজে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন, তাদের হাত ধরে যেমন শুরু হয়েছিল বিজ্ঞানের পথচলা, তেমনই আবার প্রকৃতির কাছে শুরুতেই আত্মসমর্পণ করা এবং প্রকৃতির মধ্যে তার সমস্যার সূত্রগুলোকে না খুঁজে নিজেদের মনোগত কল্পনার সাহায্যে তাকে খোঁজার প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে উৎপত্তি হয়েছিল ভাববাদ তথা ধর্মীয় চিন্তাধারার।

এখন বাসদ বা তাদের ছাত্র সংগঠন যদি এই ভাববাদকে মার্ক্সবাদলেনিনবাদের নামে পরিচালিত করে, তাতে গদগদ ভাব দেখানোর কোনো মানে নেই। আর যারা বাসদের এই উদ্যোগকে মাদ্রাসার নিপীড়িত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলে সমর্থন করছেন, তারা মতাদর্শ, বিপ্লব আর শ্রেণী প্রশ্নে হয় জেনে বুঝে ভণ্ডামো করছেন; অথবা এটা তাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা।

এর মানে এই নয় যে, বিপ্লবী কমিউনিস্টরা মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, প্যাগোডায় বা ধর্মের নামে বা ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে কোনো শোষণনিপীড়নে চুপ করে থাকবে। বরং সমাজের যে কোনো অংশে শোষণনিপীড়ন এবং অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তারা সমাজের প্রতিটা অংশে, যে কোনো ধর্মাবলম্বী বা ধর্মহীন মানুষদের পক্ষে সংগ্রাম পরিচালনা করাটাই কমিউনিস্টদের কাজ। বিপ্লবীরা বিবিধ সীমাবদ্ধতা, প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সে কাজটা যে করছেন না, তা নয়। তবে তীব্র বৈষম্যপূর্ণ এ সমাজে যতো বেশি মানুষকে সংযুক্ত করা যায়, গণআন্দোলন ততো শক্তিশালী হবে। আর আন্দোলন যে কখনোই নিরস্ত্র বা অহিংস হয় না, তা নতুন করে বলে দেওয়ার কিছু নেই। মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদ থেকে আমরা সেই শিক্ষাটাই পেয়েছি।

আবার গণআন্দোলনে সাধারণের সংযুক্তির মানে যেমন এ নয় যে, মতাদর্শকে ছুড়ে ফেলে ধর্মের ভিত্তিতে শাখা খুলে বসতে হবে। আবার এ থেকে যে কেউ মতাদর্শকে ধারণ করে তার শ্রেণীগত পরিবর্তনও ঘটাতে পারেন। কিন্তু এর আগে পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে মতাদর্শিক কোনো সংগঠনে সংযুক্ত করা যেতে পারে না। ইস্যুভিত্তিক ঐক্য আর মতাদর্শিক ঐক্যের পার্থক্য বোঝাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

উল্লেখ্য, সামনে সিপিবিবাসদবাম মোর্চার সংশোধনবাদীরা নির্বাচনের স্বপ্ন দেখছে। আর এর মাধ্যমে তাদের সামনে সরকার সমর্থিত বিরোধী দল হওয়ার সুযোগও রয়েছে। তাই তারাও সাম্প্রদায়িকতার বাড়বাড়ন্তের এ সময়ে ধর্মকে তাদের সংশোধনবাদী তৎপরতার অংশ করে নিতে চাইছে বলেই মনে হচ্ছে। আগামীতে তাদের এ তৎপরতা আরো স্পষ্টভাবে সামনে আসবে বলে মনে করছি।।

২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.