রাশিয়া ও চীনের ঐতিহাসিক শিক্ষা

লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংস্কৃতি, সামন্তবাদবিরোধী সংস্কৃতি হলো – নয়াগণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি পরিচালিত হতে পারে একমাত্র সর্বহারাশ্রেণীর সংস্কৃতি ও মতাদর্শ; অর্থাৎ কমিউনিজমের মতাদর্শের দ্বারা। অন্য কোনো শ্রেণীর সংস্কৃতি ও মতাদর্শের দ্বারা এই সংস্কৃতি পরিচালিত হতে পারে না। এক কথায়, নয়াগণতান্ত্রিক সংস্কৃতি হলো সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বাধীন জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং সামন্তবাদবিরোধী সংস্কৃতি।”

মাও সেতুঙ, নয়াগণতন্ত্র সম্পর্কে

এক.

রাশিয়ায় অক্টোবর বিপ্লবের কথা আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু ওই বিপ্লব নিয়ে কথা বলার সময় একটা কথা অনেকেই বলেন না যে, এরপর ১৯২২ সাল পর্যন্ত এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সেখানে চলমান ছিলো, যেখানে প্রাণ হারিয়েছিলেন কয়েক লাখ মানুষ। এমন এক পরিস্থিতিতে বৈপ্লবিক সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণকার্য কেবল একরৈখিকভাবে চলমান ছিলো না। আর এতে পশ্চাদপসরণও ওই বিপ্লবেরই অংশ। ১৯২২ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচী থেকে আমরা কৃষিপ্রধান দেশে সমাজতন্ত্রের পথে প্রাথমিক পুনর্গঠন সম্পর্কে ধারণা পেতে সক্ষম হবো। এই ধারণা পরবর্তীতে আরো বিকশিত হয় কমরেড মাও সেতুঙএর নয়াগণতন্ত্রের থিসিসে।

রুশ বিপ্লবের পর ১৯১৮ সালে যে করণীয় সামনে আসে, তা হলো– ‘সোভিয়েত সরকারের আশু কর্তব্য’; যা ছিলো সর্বহারা বিপ্লবের পুনর্গঠনের স্বার্থে অনস্বীকার্য। উক্ত রচনায় কমরেড ভ্লাদিমির লেনিন বলেন, “এরকম একটি বিপ্লবকে সাফল্যমণ্ডিত করা যেতে পারে কেবলমাত্র যদি জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এবং প্রধানত মেহনতি জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠরা ইতিহাসের স্রষ্টা হিসেবে স্বাধীন সৃজনশীল কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কেবলমাত্র যদি সর্বহারা এবং দরিদ্র কৃষকেরা যথেষ্ট শ্রেণীসচেতনতা, আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা, আত্মত্যাগ ও অধ্যবসায় প্রদর্শন করেন; তাহলেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয় সুনিশ্চিত হবে। স্বাধীনভাবে নতুন সমাজ গড়ে তোলার কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয় – এমন এক রাষ্ট্র, সোভিয়েত ধরনের রাষ্ট্র গঠন করে আমরা এই কঠিন সমস্যার একটি ক্ষুদ্র অংশেরই সমাধান শুরু করেছি মাত্র।”

উল্লেখ্য যে, বিপ্লবপূর্ব রাশিয়া ছিলো একটি ব্যতিক্রমধর্মী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র। একদিকে, সেখানে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটছিলো; অন্যদিকে বিশাল গ্রামাঞ্চলে প্রাকপুঁজিবাদী ও সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম ছিলো। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ছিলো কৃষক। আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিলো স্বৈরাচারী জারতন্ত্র। তবে রাশিয়া কোন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপনিবেশ, আধাউপনিবেশ, বা নয়াউপনিবেশ ছিলো না। যে কারণে রাশিয়ার পুঁজিতন্ত্র সাম্রাজ্যবাদে বিকশিত হতে পেরেছে। আবার সাম্রাজ্যবাদী হওয়া সত্ত্বেও সেখানে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়নি।

কমরেড লেনিনের শিক্ষানুসারে, যুদ্ধ বা তীব্র সংকটের ফলে জন্ম হয় এক দুর্বল গ্রন্থির; যখন সমাজের সকল মৌলিক দ্বন্দ্বগুলো একবিন্দুতে এসে হাজির হয়। আর তখন ওই দুর্বল গ্রন্থিতে সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে – যদি সেই সংকটকে কাজে লাগানোর জন্য কোনো শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি উপস্থিত থাকে। প্রথম সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়ায় এই দ্বন্দ্বগুলো এক কেন্দ্রবিন্দুতে (focal point) এসে দাঁড়িয়েছিলো; যেখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিপ্লবী উপাদান মজুদ ছিলো। তৎকালীন রাশিয়ায় জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠের জীবন দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলো। সেখানে আদিম সাম্যবাদ থেকে আধুনিক বৃহদায়তন শিল্প পর্যন্ত সমাজ বিকাশের বিভিন্ন পর্যায় একসঙ্গে বিদ্যমান ছিলো; আর সমগ্র নিপীড়িত জনগণ এক নিপীড়ক শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্ত হতে চাচ্ছিলো। আর ওই সংকটে বিপ্লবী নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য উপস্থিত ছিলো শক্তিশালী বলশেভিক পার্টি।

লেনিন বলেন, “আমরা রাশিয়ায় জয়ী হতে পেরেছিলাম এবং এতো সহজে জয়লাভ করেছিলাম শুধুমাত্র এই কারণে যে, সাম্রাজ্যবাদী লড়াইয়ের সময় থেকেই আমাদের বিপ্লবের জন্য আমরা তৈরি হতে শুরু করেছি। এটা ছিলো প্রাথমিক শর্ত। রাশিয়ায় দশ লক্ষ শ্রমিক ও কৃষকের হাতে অস্ত্র ছিলো; আর আমাদের আওয়াজ ছিলো– সাম্প্রতিকতম সময়ের মধ্যে যে কোনো মূল্যে শান্তি চাই। আমরা জয়লাভ করেছিলাম, কারণ কৃষক সম্প্রদায়ের বিরাট একটা অংশ বিপ্লবী চিন্তাধারা নিয়ে বড় বড় জোতদারদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়েছিলো।” (কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের রণকৌশলের সমর্থনে ভাষণ, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকএর তৃতীয় কংগ্রেস, ১ জুলাই ১৯২১)

রাশিয়ার বিপ্লব ছিলো মূলত সমাজতান্ত্রিক গঠন প্রক্রিয়ার গবেষণাগার। আর এমন একটি পশ্চাদপদ সমাজে বিপ্লবের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী কোনো অভিজ্ঞতাও ছিলো না। গৃহযুদ্ধ চলমান এমন এক দেশে ক্ষমতা দখল করাটাই সর্বহারাশ্রেণীর জন্য যথেষ্ট ছিলো না; প্রয়োজন পড়ে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের; দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির। আর এজন্য দরকার পড়ে বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের।

বিপ্লব পরবর্তী পশ্চাদপসরণ সম্পর্কে লেনিন বলেন, “উচ্চস্তরের বিশেষজ্ঞদের রাষ্ট্র কাজে লাগাতে পারে দুইভাবে – পুরনো বুর্জোয়া পদ্ধতিতে (অর্থাৎ অনেকবেশি বেতন দিয়ে); নয়তো নতুন সর্বহারা পদ্ধতিতে

আমাদের এখন পুরনো বুর্জোয়া পদ্ধতিই গ্রহণ করতে হবে এবং উচ্চস্তরের বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের ‘কাজের’ জন্য অত্যন্ত বেশি বেতন দিতে আমাদের সম্মত হতে হবে। এই ব্যাপারটির সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে তারা সকলেই এর গুরুত্ব উপলব্ধি করেন; কিন্তু সর্বহারা রাষ্ট্র কর্তৃক এই ব্যবস্থা অবলম্বনের গুরুত্ব সম্পর্কে সকলেই চিন্তা করে দেখেন না। সুস্পষ্টভাবেই, এই ব্যবস্থা হলো একটা আপস, এটা হলো প্যারি কমিউনের এবং প্রতিটা সর্বহারা রাষ্ট্রশক্তির মূলনীতির ব্যতিক্রম – এই মূলনীতি সকলের বেতনকেই সাধারণ শ্রমিকের মজুরির স্তরে নিয়ে আসার আহবান জানায় এবং এই কথাই ঘোষণা করে যে, ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার উচ্চাকাঙ্ক্ষার ধারণার বিরুদ্ধে শুধু কথায় নয়, কাজেও লড়াই করতে হবে।

এই ব্যবস্থা অবলম্বনের মানে শুধু এই নয় যে, পুঁজির বিরুদ্ধে (পুঁজি কতোগুলো টাকার যোগফল নয়, পুঁজি একটা সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক) অভিযান – কয়েকটি ক্ষেত্রে এবং বেশকিছু মাত্রায় – বন্ধ করা হচ্ছে; এর আরো মানে হলো যে, আমাদের সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাষ্ট্রশক্তি এক পা পিছু হটে এসেছে; আমাদের এই সোভিয়েত রাষ্ট্র গোড়াতেই বড় বড় অফিসারদের বেতন কমিয়ে সাধারণ শ্রমিকের মজুরির স্তরে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলো এবং এই নীতিই অনুসরণ করে চলেছিলো।

বেশি বেতনে বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের নিযুক্ত করা যে প্যারি কমিউনের মূলনীতি থেকে পশ্চাদপসরণ, সে কথা জনসাধারণের কাছ থেকে গোপন করে রাখার মানে হবে বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদের স্তরে পতিত হওয়া এবং জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা। এই এক পা পিছু হটার ব্যবস্থা কি পরিস্থিতিতে এবং কেন আমরা অবলম্বন করলাম; তা খোলাখুলিভাবে ব্যাখ্যা করা এবং তারপর যে সময় নষ্ট হয়েছে তা পূরণ করার কি কি পন্থা উন্মুক্ত রয়েছে; তা প্রকাশ্যে আলোচনা করার অর্থ হলো – জনগণকে শিক্ষিত করে তোলা এবং অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা; কিভাবে সমাজতন্ত্র গড়তে হবে তা জনগণের সঙ্গে এককাতারে শেখা।পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আমরা যে ‘অভিযান’ আরম্ভ করেছি; তা সবচেয়ে কঠিন; সামরিক অভিযানের চেয়েও লাখো লাখো গুণ কঠিন। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ বা আংশিক পশ্চাদপসরণ ঘটেছে বলে হতাশায় ম্রিয়মান হয়ে পড়া হবে নির্বোধের কাজ এবং অপমানজনক।…” (সোভিয়েত সরকারের আশু কর্তব্য)

বিপ্লবের এই প্রেক্ষাপটে লেনিন বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর কথা উল্লেখ করেছেন। এই সময়কালেই রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব করেন। তিনি দেশব্যাপী জনগণকে শিক্ষিত করে তোলার; নতুন সংস্কৃতিকে ধারণ করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। অনভিজ্ঞ সোভিয়েত সরকার হিসাবরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সংগঠিত করতে পারছিলো না। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন বৃদ্ধি করাও সম্ভব হচ্ছিলো না; আর তাই সার্বিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য দরকার পড়ে পশ্চাদপসরণের।

লেনিন বলেন, “শ্রমের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি করার অন্য শর্ত হলো – প্রথমত, ব্যাপক জনসাধারণের শিক্ষা ও সংস্কৃতির মান উন্নত করা। এটা এখন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ঘটছে; বুর্জোয়া রুটিনের বাইরে যারা কিছু দেখতে পায় না, তারাই এই ঘটনা লক্ষ্য করতে অক্ষম; সোভিয়েত ধরনের সংগঠনের ফলে জনগণের ‘নিম্নতরস্তরে’ জ্ঞানার্জনের জন্য এবং উদ্যোগ গ্রহণের জন্য যে কী বিরাট আগ্রহ এখন বিকশিত হচ্ছে; তা বুঝতে তারা অক্ষম। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের ব্যবস্থা করতে হলে শ্রমজীবী জনগণের শৃঙ্খলা, তাদের দক্ষতা, কর্মকুশলতা, শ্রমের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির ধারা উন্নত করতে হবে এবং উন্নততর সংগঠন গড়তে হবে।…”

তিনি আরো বলেন, “আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এক অস্বাভাবিক রকমের কঠিন, জটিল এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে – কৌশল প্রয়োগ করার এবং পশ্চাদপসরণ করার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে; পশ্চিমা দেশগুলোতে দুঃখজনক মন্থরগতিতে বিকাশ লাভ করছে, সেখানে বিপ্লবের নতুন নতুন বহিঃপ্রকাশের জন্য অপেক্ষা করে থাকারই পর্যায় চলছে। দেশের মধ্যে চলছে ধীরগতিতে নির্মাণকার্যের এবং নির্মমভাবে ‘নিয়মশৃঙ্খলা কঠোর করার’ পেটিবুর্জোয়া বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের উপাদানের বিরুদ্ধে সুদৃঢ় সর্বহারা শৃঙ্খলার দীর্ঘস্থায়ী ও দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ একটানা সংগ্রামের পর্যায় – সংক্ষেপে এই হলো, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যে বিশেষ স্তরে আমরা এখন অবস্থান করছি, তারই বৈশিষ্ট্যসূচক লক্ষণগুলো।”

উন্নত শিক্ষাসংস্কৃতিতে ঋদ্ধ জনগণের মানোন্নয়নের মাধ্যমেই কেবল এই পশ্চাদপসরণ থেকে সরে আসা সম্ভব; কারণ মেহনতি জনগণকে বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের স্থানপূরণে সক্ষম করে তোলা সম্ভব হলে ওই বিশেষজ্ঞদের যেমন প্রয়োজন ফুরোবে; তেমনি অর্থনৈতিক পুনর্গঠনেও রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রক্ষমতায় কোনো মিত্রশক্তি না থাকায় উৎপাদিকাশক্তি বৃদ্ধির কাজটাও সোভিয়েত সর্বহারাদের নিজেদেরই করতে হচ্ছিলো। আর এজন্য বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন হয়। এই বিশেষজ্ঞদের বেশিরভাগই বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গীসম্পন্ন। আর এটাই স্বাভাবিক; যেহেতু তারা ওই বুর্জোয়া সাংস্কৃতিক চেতনাতেই গড়ে উঠেছেন। লেনিনএর মতে, এসব বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার মধ্যদিয়ে তাদের বুর্জোয়া চেতনা থেকে বাইরে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে। আর পশ্চাদপসরণের ঐতিহাসিক শিক্ষা থেকে আমরা বুঝতে সক্ষম হই যে, সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণপ্রক্রিয়া কখনোই সরলরৈখিক নয়।

লেনিন বলেন, “পুরাতন শ্রেণীকে সরিয়ে নতুন শ্রেণী ক্ষমতায় এসে তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে কেবলমাত্র অন্য শ্রেণীর সঙ্গে সংগ্রাম করে। আর তারা তখনই চূড়ান্তভাবে সাফল্য অর্জন করতে পারে যখন তারা সমস্ত শ্রেণীর বিলোপ সাধন করতে পারে। শ্রেণীসংগ্রাম এই জটিল এবং বিস্তৃত পদ্ধতি দাবী করে। অন্যথায় আপনারা বিভ্রান্তির অতলে তলিয়ে যাবেন।…” (রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিবেদন, ২৯ মার্চ ১৯২০)

লেনিন এখানে সমাজতন্ত্রের সুদীর্ঘ পর্যায় জুড়ে শ্রেণীসংগ্রামের আবশ্যকতার কথাই উল্লেখ করেছেন। সেই সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক গঠনে পরাজিত শ্রেণীকে ব্যবহারের ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। যখন বুর্জোয়ারা সামন্ততান্ত্রিক প্রভুদের ডিঙিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলো, তখন তাদের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য ওই সামন্ততান্ত্রিক শাসকদের থেকেই অভিজ্ঞ লোকের প্রয়োজন পড়ে। আর এর মধ্যদিয়েই পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে। কোনো ব্যবস্থাই আকাশ থেকে নেমে আসেনি। মার্ক্স যথার্থই বলেছিলেন, “প্রতিটা সমাজই তার পূর্ববর্তী সমাজের জন্মদাগ বহন করে।” আর তাই তা পরিচালনার জন্য পূর্বতন ব্যবস্থা থেকে অভিজ্ঞদের ব্যবহার করা যেতে পারে। আর ওই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেই এগোতে হবে। সর্বহারাশ্রেণী ক্ষমতাসীন হলেও এমনি করে দরকার পড়ে পূর্বতন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতাকে। এখানে মূল বিষয়টা হলো – কোন শ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন রয়েছে, সেটা। আর সেই শ্রেণীর আধিপত্যের লক্ষ্যেই ওই অভিজ্ঞতাকে ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে।

লেনিন বলেন, “শাসনকার্য এবং রাষ্ট্রগঠনের কাজে আমাদের এমন লোকদের দরকার যারা প্রশাসনের পদ্ধতি জানেন এবং যাদের রাষ্ট্র এবং ব্যবসার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আর তা অন্য কোনো শ্রেণী নয়, আমরা কেবলমাত্র পুরাতনশ্রেণীর ওপর নির্ভর করতে পারি।

আমরা যে শ্রেণীকে উৎখাত করেছি, তাদের লোকজনদের দিয়েই আমাদের প্রশাসনিক কাজ চালাতে হবে। তারা নিজেদের শ্রেণীর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন রয়েছে, তাদের শিক্ষিত করতে হবে। একই সময়ে আমাদের নিজেদের শ্রেণী থেকেও প্রশাসক নিয়োগ করতে হবে। কমিউনিস্টদের তত্ত্বাবধানে মেহনতি কৃষক, কারখানা শ্রমিক, প্রাপ্তবয়স্ক সর্বহারাদের শিক্ষিত করার কাজে আমাদের সমস্ত রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করতে হবে।” ()

সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্যের জন্য লেনিন তিনটি তত্ত্ব প্রদান করেন– () সম্পত্তি সম্পর্কের বদল; () পূর্ববর্তী শাসকশ্রেণীর অভিজ্ঞদের থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা; এবং () শ্রমিকশ্রেণী থেকে জাতীয় স্তরে প্রশাসক নিয়োগ এবং এই শ্রেণীকে প্রশিক্ষিত করে তোলা।

অক্টোবর বিপ্লবপরবর্তী কর্মসূচীসমূহ থেকেই বোঝা যায় যে, সেখানকার আর্থসামাজিক অবস্থা বৃহৎ শিল্পপুঁজি নির্ভর ছিলো না; তা ছিলো কৃষিপ্রধান। আর এই বাস্তবিক কর্মসূচীসমূহের পর্যালোচনার মাধ্যমে আমরা বিপ্লবী পুনর্গঠনকে অনুধাবন করতে সক্ষম হবো।

লেনিন বলেন, “আমাদের সবকিছুকে একই ইচ্ছার অধীনে আনতে হবে; কারণ একটি কৃষক রাষ্ট্রে জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্ব ও একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করাতে পারে।” (কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিককার্যের প্রতিবেদন, ৮ মার্চ ১৯২১)

কৃষিপ্রধান দেশে বিপ্লবের ক্ষেত্রে কৃষিঅর্থনীতির পুনর্গঠন আবশ্যক। সোভিয়েত রাশিয়াতেও এর ব্যাতয় ঘটেনি। কৃষকদের সমবায় ও কমিউনগুলোকে শক্তিশালী করা এবং একচেটিয়াগুলোর বাজেয়াপ্তকরণ হলো এর কেন্দ্রীয় বিষয়। এখানে কৃষকদের শ্রেণীবিভাগ বোঝাটাও জরুরী। কৃষিপ্রধান দেশে কৃষিমজুর ও ভূমিহীন কৃষক বিপ্লবের চালিকাশক্তি। আর স্বল্প পরিমাণ জমিসম্পন্ন কৃষক হলো সর্বহারাশ্রেণীর নিকটতম মিত্র; মাঝারি কৃষক দোদুল্যমান মিত্র এবং বৃহৎ কৃষক দূরবর্তী মিত্র। মাঝারি কৃষক সমাজতন্ত্রের প্রতি শর্তনিরপেক্ষ পূর্ণ আস্থা রাখবে, এমনটা প্রত্যাশা করা যায় না। তারা তখনই সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করবে, যখন তারা বুঝতে পারবে যে, বুর্জোয়ারা পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার পর সমাজতন্ত্র ছাড়া আর কোনো পথ নেই। মাঝারি কৃষক ও পেটিবুর্জোয়াদের সঙ্গে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার।

এ প্রসঙ্গে লেনিন বলেন, “আমরা মাঝারি কৃষকদের অধিকারচ্যুত করতে চাই না এবং পেটিবুর্জোয়া গণতান্ত্রিকদের বিরুদ্ধে কোনো শক্তি প্রয়োগ করতেও চাই না। আমরা তাদের বলি যে, আপনারা আমাদের কোনো বিপজ্জনক শত্রু নন! আমাদের মূল শত্রু হলো বুর্জোয়ারা। কিন্তু আপনারা যদি তাদের সঙ্গে যোগ দেন, তাহলে আমরা আপনাদের প্রতিও সর্বহারাদের গৃহীত পদক্ষেপ প্রয়োগ করতে বাধ্য হবো।” (কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিবেদন, ১৮ মার্চ ১৯১৯)

তিনি আরো বলেন, “রাশিয়ার কৃষকদের একটা বড় অংশই মাঝারি কৃষক, সেজন্য ব্যক্তিগত ভিত্তিতে বিনিময়ের জন্য ভীত হবার কোনো কারণ নেই। রাষ্ট্রের সঙ্গে বিনিময়ের জন্য প্রত্যেকেই কিছু না কিছু দিতে পারে। প্রথমত, তাদের উদ্বৃত্ত শস্য; দ্বিতীয়ত, তাদের উৎপাদিত শস্য; তৃতীয়ত, তাদের শ্রম।”

ক্ষুদ্র সম্পত্তির মালিকানা এবং মাঝারি কৃষকদের প্রশ্নে সোভিয়েত রাষ্ট্রের গৃহীত পরিকল্পনার ৪৭ নং ধারায় বলা হয়, “মাঝারি কৃষকদের ব্যাপারে রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির নীতি হবে তাদের ধীরে ধীরে সমাজতান্ত্রিক গঠনের কাজে টেনে আনা। এর জন্য দলকে কতোগুলো কাজে ব্রতী হতে হবে। তার মধ্যে অন্যতম হলো – কুলাকদের থেকে তাদের আলাদা করা, তাদের বিভিন্ন প্রয়োজনের দিকে দৃষ্টি রেখে, আদর্শগত অস্ত্রে তাদের অনুন্নতিকে দূর করে, কোনোরূপ দমনমূলক আচরণ না করে, তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল ব্যাপারে প্রয়োজনবোধে কোনো বাস্তব চুক্তি করে, সমাজতান্ত্রিক গঠনের জন্য তাদের প্রয়োজনীয় সুবিধা দান করে ঐ শ্রেণীকে মেহনতি মানুষের কাতারে এনে দাঁড় করাতে হবে।”

এঙ্গেলসএর বরাতে লেনিন আরো বলেন, “এঙ্গেলসই কৃষকদের ছোট, মাঝারি এবং বৃহৎ – এই তিন বিভাগকে নির্দেশ করেন এবং ইউরোপের বহুদেশে এখনও এই বিভাগ চালু রয়েছে। এঙ্গেলস বলেছিলেন, ‘হয়তো কোনো কোনো জায়গায় বড় কৃষকদেরও দমন করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই’; আর মাঝারি কৃষকদের উপর অহেতুক বলপ্রয়োগ করার কথা কোনো অনুভূতিসম্পন্ন সমাজতন্ত্রী চিন্তাও করতে পারেন না (ছোট কৃষকরা আমাদের বন্ধু)।”

১৯১৮ সালেই সোভিয়েত রাষ্ট্রে দরিদ্র কৃষক সমিতি গঠিত হয়। লেনিন যেমন বলেছেন – এই দরিদ্র কৃষক সংগঠন কাজ শুরু করলেই তা সমাজতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হতে পারে। যখন বিপ্লব গ্রামাঞ্চলে, প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছানো সম্ভব হবে; তখনই তা সর্বহারা বিপ্লবের ভিত্তিকে মজবুত করতে পারবে। গ্রামীণ অর্থনীতির অগ্রগতি সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

লেনিন বলেন, “গত বছরে রাজনৈতিক নেতৃত্বগ্রহণের ফলে আমরা প্রধান যে শিক্ষাটি লাভ করেছি তা হলো – এই ক্ষেত্রে সাংগঠনিক সমর্থন অর্জন করতে হবে। যেসব ক্ষেত্রে আমরা চরম অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছিলাম, সেসব ক্ষেত্রে দরিদ্র কৃষক সমিতি গঠন করে, সোভিয়েতগুলোর নতুন নির্বাচন করে, এবং খাদ্যনীতির পরিবর্তন করে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। রাশিয়ার সেই সকল দূরবর্তী জায়গা – যেমন, ইউক্রেন এবং ডন অঞ্চল – এইসব জায়গায় এই নীতিকে হয়তো পরিবর্তন করতে হতে পারে। রাশিয়ার সব জায়গার জন্যও একই ধরনের আইন প্রণয়ন করা অসঙ্গত হবে।” (কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিবেদন, ১৮ মার্চ ১৯১৯)

মার্ক্সবাদকে বাস্তবিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে – ভৌগোলিক, আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ভিন্নতাকে মাথায় নিয়ে প্রয়োগের কথাই বলেছেন লেনিন। যান্ত্রিক প্রয়োগ কখনোই উত্তরণের পথ নির্দেশ করে না।

লেনিন বলেন, “এটা খুবই স্বাভাবিক যে, যখন সর্বহারা বিপ্লব দানা বেঁধে উঠছে, তখন সামাজিক জীবনে প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোকে একদম সামনে নিয়ে আসতে হবে। এটা আরও নিশ্চিত যে, বিপ্লব কোনো একটিমাত্র দল বা সরকার নয়, জীবনের সর্বাপেক্ষা গুঢ় ভিত্তি এবং জনসংখ্যার এক বিরাট অংশের ওপর তার প্রতিক্রিয়া বিস্তার করে, সে একইসঙ্গে জীবনের সকল অংশকে জড়িয়ে নিতে পারে এবং যদি এখন আমরা মফস্বলের কাজ নিয়ে আলোচনা করি এবং সেই সঙ্গে মাঝারি কৃষকদের অবস্থাকেও বিশেষ গুরুত্ব দিই, তখন সাধারণভাবে সর্বহারা বিপ্লবের দৃষ্টিকোণ থেকে সেটা অস্বাভাবিক কিছু হবে না।” (মফস্বলের কাজের প্রতিবেদন, ২৩ মার্চ ১৯১৯)

১৯১৭ সালের অক্টোবরে কয়েক লক্ষ কৃষক বিপ্লবে সামিল হয়েছিলেন। তারা একচেটিয়া কারখানা আর ব্যাংকের হাত থেকে মুক্ত হতে চাচ্ছিলো। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগের মতো অগ্রসর তারা ছিলো না।

লেনিন বলেন, “১৯১৮ সালের গ্রীষ্মকালে গ্রামীণক্ষেত্রে সত্যিকারের সর্বহারা বিপ্লব শুরু হয়েছিলো। যদি আমরা এই বিপ্লবকে উজ্জীবিত করতে না পারি, তাহলে আমাদের কাজ অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। প্রথম স্তর হলো – শহরে ক্ষমতা অধিগ্রহণ এবং সোভিয়েত ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠা। দ্বিতীয় স্তর হলো তা, যা সকল সমাজতন্ত্রীদের জন্য মৌলিক ব্যাপার এবং যা বাদ দিলে কেউ সমাজতন্ত্রী হয়ে উঠতে পারে না। আর তা হলো – গ্রামীণ জেলাগুলোতে সর্বহারা এবং আধাসর্বহারা উপাদানগুলোকে আলাদা করা এবং মফস্বলে সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য শহরের সর্বহারাদের সঙ্গে তাদের সমঝোতা করিয়ে দেওয়া।” ()

তৎকালীন রাশিয়া ছিলো এমন একটি দেশ; যেখানে কারখানার শ্রমিকেরা সংখ্যালঘু এবং কৃষকেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই দুটো শ্রেণীর স্বার্থ ভিন্ন; কৃষক ও শ্রমিক এক জিনিস নয়। কৃষকদের; তথা সমগ্র জনগণকে সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্যে টেনে আনতে অবশ্যই নতুন শিক্ষাসংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ করে তোলার প্রয়োজন পড়ে। গ্রামের কৃষকদের উৎপাদিত শস্যের সঙ্গে শিল্প দ্রব্যের অধিকমাত্রায় বিনিময় কৃষকের জীবনযাত্রা, উৎপাদনের মান এবং চেতনা জগতের পরিবর্তন করতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের সমবায় স্থাপনের উপর লেনিন গুরুত্বারোপ করেন।

অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য ১৯২১ সালে গ্রহণ করা হয় ‘নয়াঅর্থনৈতিক কার্যক্রম’। এই কার্যক্রম অনুসারে, কৃষকেরা উদ্বৃত্তউৎপাদনের সুযোগ পান। আর এই উদ্বৃত্ত ফসলের মাধ্যমে তারা নির্ধারিত খাজনা পরিশোধেরও সুযোগ পান এবং খাজনা দেওয়ার পর উদ্বৃত্ত অংশ নিজেদের ইচ্ছামাফিক বিক্রয় করারও সুযোগ তাদের দেওয়া হয়। রাষ্ট্রের সঙ্গে বিনিময়ের সুযোগও কৃষকদের দেওয়া হয়। আর এর ফলে ব্যক্তিগত বাণিজ্য এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের অনুমোদন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। লক্ষ্য ছিলো দ্রুত শস্য উৎপাদন বাড়ানো। আর এই শস্যের উদ্বৃত্ত বৃহৎ শিল্পের বিকাশের সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। এই কার্যক্রমও নিশ্চিতভাবেই পশ্চাদপসরণ। লেনিন এই ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ বলে উল্লেখ করেন; একইসঙ্গে তিনি একে ‘সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর সিড়ি’ বলেও উল্লেখ করেন।

নয়াঅর্থনৈতিক কার্যক্রমএর আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিলো বিদেশি পুঁজিপতিদের রাশিয়াতে আসার সুযোগ দেওয়া। জ্বালানি, খনিজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানিকে রাশিয়ায় ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রথমদিকে, এই বিদেশি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতে গিয়ে বেশকিছু ছাড়ও দিতে হয়েছিলো; আর এই সবকিছু থেকেই অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছিলো; যা পরবর্তীতে সংশোধিত হয়েছিলো। যেখানে জনগণের স্বার্থকেই সর্বাগ্রে স্থান দেওয়া হয়েছিলো। একইসঙ্গে সেখানে বেশকিছু মিশ্র সংস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব সংস্থা বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ কারখানা গড়ে তোলে। অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত একটা দেশে এই উদ্যোগ নিতে হয়েছিলো নিজেদের শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার স্বার্থে।

লেনিন তৎকালীন রাশিয়ার অর্থনৈতিক উপাদানগুলোকে এভাবে উল্লেখ করেন – ১) পিতৃগত আদিম চেহারার কৃষিব্যবস্থা; ) ক্ষুদ্রায়তনে পণ্যউৎপাদন (যেসব কৃষক শস্য বিক্রি করে, তাদের বেশিরভাগই পড়ে এর মধ্যে); ) ব্যক্তিমালিকানাধীন পুঁজিবাদ; ) রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ; এবং ৫) সমাজতন্ত্র। রাশিয়ার বিশাল আয়তনে বিপ্লবপরবর্তী পুনর্গঠনের সময়ে এমন বৈচিত্র্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থাকাটা খুবই স্বাভাবিক; আর এসবের মধ্যদিয়ে সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্য পরিচালনা ছিলো এক অসাধ্য সাধনের মতো ব্যাপার; যা লেনিন করেছিলেন। তৎকালীন রাশিয়ায় উৎপাদনের সামাজিকীকরণ একইপ্রকারে সকল স্থানে বর্তমান ছিলো না। উক্ত অর্থনৈতিক উপাদানগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদই এই সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারতো। আর যেহেতু সর্বহারাশ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন – এই সামাজিকীকরণের মানে হলো – সমাজতান্ত্রিক গঠনের দিকেই আরেকধাপ অগ্রসরতা। তবে এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, কোনো অসমাজতান্ত্রিক উপাদান যেন অধিক প্রাধান্য না পায়। লেনিন বলেন যে, সমাজতন্ত্রকে জয়ী হতে হলে গ্রাম ও শহরের মাঝে পণ্য বিনিময় বাড়াতে হবে। সমাজতান্ত্রিক শিল্পব্যবস্থা এবং কৃষকদের কৃষি কাজের মাঝে সুদৃঢ় বন্ধন আবশ্যক। আর এই ব্যবস্থাপনা ও বিচক্ষণ বাণিজ্যের কৌশল রপ্ত করেই এই সংগ্রামে জয়ী হওয়া সম্ভব।

সোভিয়েতসমূহে পুঁজিবাদের উপস্থিতি সম্পর্কে লেনিন বলেন, “করের বিনিময়ে দ্রব্য সামগ্রী মানেই হলো – বাণিজ্যিক স্বাধীনতা। করের বিনিময়ে দ্রব্য সামগ্রী দেবার পর অবশিষ্ট খাদ্যাংশ নিয়ে কৃষক যেভাবে খুশী বিনিময় করতে পারে।বাণিজ্যিক স্বাধীনতার অর্থ হলো – পুঁজিবাদের স্বাধীনতা; তবে সে স্বাধীনতা কিছুটা নতুন ধরনের। এর অর্থ হলো – আমরা খানিকটা নতুন করে পুঁজিবাদ তৈরি করছি। খোলাখুলিভাবে আমরা একাজটাই করছি। এটা হলো রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ। বুর্জোয়া কর্তৃত্বাধীন কোনো সমাজে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ আর সর্বহারাশ্রেণীর কর্তৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ – দুটো ভিন্ন চিন্তাধারা। একটা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের অর্থ হলো – এই পুঁজিবাদ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি প্রাপ্ত এবং বুর্জোয়াশ্রেণীর উপকারার্থে এবং সর্বহারাশ্রেণীর অপকারার্থেই পরিচালিত। আর সর্বহারাশ্রেণীর কর্তৃত্বে পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থাতে তা কার্যকর থাকে সর্বহারাশ্রেণীর উপকারার্থে; এখনও পর্যন্ত টিকে থাকা জাঁদরেল বুর্জোয়াদের প্রতিরোধ করা এবং সংগ্রাম পরিচালনার স্বার্থেই সবকিছু ঘটে থাকে।” (রুশ কমিউনিস্ট পার্টির রণকৌশল সংক্রান্ত প্রতিবেদন, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকএর তৃতীয় কংগ্রেস, ২৫ জুলাই ১৯২১)

তিনি আরো বলেন, “আমরা যে প্রকার পুঁজিবাদ চালু করেছি সেটা অপরিহার্য। যদি এটা কুৎসিত ও খারাপ হয়; তবে আমরা একে শোধরাবার চেষ্টা করবো; কারণ ক্ষমতা আমাদের হাতে

আমরা নিশ্চয় শিখবো, আমরা নিশ্চয় লক্ষ্য রাখবো যে, একটি সর্বহারা রাষ্ট্রে সর্বহারাদের দ্বারা বর্ণিত রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের কাঠামো ও শর্তের বাইরে যেন তা না চলে যায়। সর্বহারাশ্রেণীর উপকারে আসবে এমন অবস্থার বাইরে যেন না যায়।

আমরা পুঁজিবাদকে অনুমোদন করেছি; কিন্তু কৃষকদের প্রয়োজনের সীমার মধ্যে। এটা অপরিহার্য। এটা ছাড়া কৃষকরা বাঁচতে পারতো না এবং তাদের কৃষিকাজ চালাতে পারতো না।” (কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক প্রতিবেদনের সমাপ্তি ভাষণ, ২৮ মার্চ ১৯২২)

১৯২২ সালের পার্টি কংগ্রেসেই লেনিন বলেন, “এক বছর যাবৎ আমরা পিছু হটেছি। এখন পার্টির নামে পশ্চাদপসরণ বন্ধের আহবান জানাতে হবে। পশ্চাদপসরণের যে উদ্দেশ্য ছিলো, তা পূরণ হয়েছে। পশ্চাদপসরণের এই যুগ শেষ হয়েছে বা হচ্ছে। এখন আমাদের উদ্দেশ্য – স্বতন্ত্র – নিজেদের শক্তিকে নতুন করে বিন্যস্ত করা।”

এখানে লেনিন সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণে নতুন উদ্যমে সামিল হওয়ার আহবান জানাচ্ছেন। অবশ্যই এই বিনির্মাণকালও সমাজতন্ত্রের অংশ – নিত্যনতুন বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সমাজতন্ত্রের নতুন সংযোজনবিয়োজনও অবশ্যম্ভাবী। আর তাতে পশ্চাদপসরণের কালে গৃহীত কর্মসূচীও এক নিমিশেই মিলিয়ে যায় না; বরং পর্যায়ক্রমে তা সমাজতান্ত্রিক রূপ পরিগ্রহ করে।

সকল বিপ্লবেরই মৌলিক প্রশ্ন হলো – রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রশ্ন। লেনিন অত্যন্ত সহজবোধ্য ও গভীরভাবে দেখিয়ে দেন যে, সর্বহারা বিপ্লবের মৌলিক প্রশ্ন হলো – সর্বহারা একনায়কত্বের প্রশ্ন। বৈপ্লবিক পন্থায় বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে চূর্ণবিচূর্ণ করে প্রতিষ্ঠিত এই একনায়কত্ব হলো – একদিকে সর্বহারাশ্রেণী আর অন্যদিকে কৃষক সম্প্রদায় ও অন্যান্য সকল মেহনতি জনগণের মধ্যেকার বিশেষ ধরনের মৈত্রী। এটা হলো – অন্যরূপে ও নতুন অবস্থাধীনে শ্রেণীসংগ্রামেরই ধারাবাহিকতা। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে শোষক শ্রেণীগুলোর প্রতিরোধের বিরুদ্ধে, বৈদেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং পুরাতন সমাজের শক্তি ও অভ্যাসের বিরুদ্ধে এক লাগাতার সংগ্রাম – একই সময়ে রক্তাক্ত ও রক্তপাতহীন, হিংসাত্মক ও শান্তিপূর্ণ, সামরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংগ্রাম। সর্বহারা একনায়কত্ব দ্বারা এবং এইসব ফ্রন্টে দৃঢ়তার সঙ্গে ও লাগাতারভাবে সংগ্রাম আয়োজনের জন্যে মেহনতি জনগণকে পুরোপুরিভাবে সংঘবদ্ধ করা ছাড়া সমাজতন্ত্রের বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়।

দুই.

কৃষিপ্রধান দেশে সর্বহারা বিপ্লবের ক্ষেত্রে লেনিনএর বিপ্লবী তত্ত্বকে আরো অগ্রসর করেন কমরেড মাও সেতুঙ – ‘নয়াগণতন্ত্র সম্পর্কে’ থিসিসে। মাওএর তত্ত্বানুসারে, এই বিপ্লব দুটি পর্বে বিভক্ত – সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবী গণতন্ত্রের পর্ব এবং সমাজতন্ত্রের পর্ব। রুশ বিপ্লবের শিক্ষাই এক্ষেত্রে মূল উপজীব্য হিসেবে কাজ করেছে। মাও বলেন, “চীনের বিপ্লবকে অবশ্যই দুই পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্বের কাজ হলো – সমাজের এই ঔপনিবেশিক, আধাঔপনিবেশিক ও আধাসামন্ততান্ত্রিক রূপকে একটা স্বাধীন, গণতান্ত্রিক সমাজে পরিবর্তিত করা; দ্বিতীয় পর্বের কাজ হলো – বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।” (নয়াগণতন্ত্র সম্পর্কে, জানুয়ারি ১৯৪০)

মাও আরো বলেন, “যদিও সামাজিক চরিত্রের বিচারে উপনিবেশ ও আধাউপনিবেশের এই বিপ্লবের প্রথম পর্যায় বা প্রথম পর্ব এখনো মূলত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিকই রয়েছে এবং তার বাস্তব দাবি যদিও হলো – পুঁজিবাদের বিকাশের পথ পরিষ্কার করা; তবু এই বিপ্লব আর সেই পুরনো ধরনের বিপ্লব নয় – যা বুর্জোয়াশ্রেণীর নেতৃত্বে পরিচালিত হতো এবং যার লক্ষ্য ছিলো এক পুঁজিবাদী সমাজ ও বুর্জোয়া একনায়কত্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তোলা। বরং এই বিপ্লব এক নতুন ধরনের বিপ্লব; যা সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে পরিচালিত এবং যার লক্ষ্য বিপ্লবের প্রথম পর্যায়ে এক নয়াগণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং সমস্ত বিপ্লবীশ্রেণীর যুক্ত একনায়কত্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই বিপ্লবই আবার সমাজতন্ত্রের বিকাশের জন্য আরও বিস্তৃত পথ পরিষ্কার করবে।

এই ধরনের বিপ্লব অনিবার্যভাবে সর্বহারাশ্রেণীর সমাজতান্ত্রিক বিশ্ববিপ্লবের অংশে পরিণত হয়। এই ‘বিশ্ববিপ্লব’ আর পুরনো বিশ্ববিপ্লব নয়; পুরনো বুর্জোয়া বিশ্ববিপ্লব বহুদিন আগেই শেষ হয়ে গেছে। এই বিপ্লব নতুন বিশ্ববিপ্লব; সমাজতান্ত্রিক বিশ্ববিপ্লব।” ()

রুশ বিপ্লবের পর এই বিষয়টি সামনে আসে যে, বুর্জোয়াশ্রেণীর নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব কিনা! যদিও ঔপনিবেশিকতা থেকে জাতীয় মুক্তিতে সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্ব সম্পর্কে ১৮৮২ সালেই এঙ্গেলস ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কাউটস্কিকে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেন, “স্থানীয় অধিবাসীরাই বসবাস করে এমন সব দখলীকৃত দেশ – ভারত, আলজেরিয়া, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ ও স্পেনীয় অধিকৃত দেশগুলো – এদের ভার সাময়িকভাবে সর্বহারাশ্রেণীকে নিতে হবে এবং যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। এ প্রক্রিয়া ঠিক কিভাবে বিকাশ লাভ করবে তা বলাটা মুশকিল। ভারতে হয়তো, প্রকৃতপক্ষেই যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, বিপ্লব করবে এবং নিজের মুক্তির প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত শ্রেণী হিসেবে সর্বহারাশ্রেণী যেহেতু কোনো ঔপনিবেশিক যুদ্ধ করতে পারে না, তাই সেই বিপ্লবকে তার নিজ পথে চলতে দিতে হবে। সব ধরনের ধ্বংস ছাড়া তা এগোতে পারে না। একই কথা আলজেরিয়া বা মিশরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেটাই হবে নিশ্চিতভাবে আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো বিষয়।”

তবে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, একচেটিয়া কর্পোরেট পুঁজির বিশ্বব্যাপী আগ্রাসনে এখন আর কোনো দেশেই বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব নয়। আর তাই এই গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সর্বহারাশ্রেণীকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। আর তাই এই বিপ্লবের ধরণও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে ভিন্ন হতে বাধ্য।

নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব আর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য হলো – প্রথম পর্বে সকল পুঁজি বাজেয়াপ্ত করা হয় না, কেবলমাত্র বৃহৎ একচেটিয়াদের উৎখাত করা হয়, ক্ষুদ্র পুঁজির বিকাশ ঘটে; দ্বিতীয় পর্বে ক্রমান্বয়ে সুসংহতভাবে সকল ব্যক্তিগত পুঁজি বাজেয়াপ্ত করা হয়। নয়াগণতান্ত্রিক স্তরে কৃষি জমিতেও ক্ষুদে ব্যক্তিগত মালিকানা বজায় থাকে – রূপগতভাবে জমির রাষ্ট্রীয়করণ হলেও জমির ব্যক্তিগত চাষাবাদ বজায় থাকে ব্যক্তিগত মালিকানার মতোই। সারগতভাবে তাতে জমিতে কৃষকের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিপ্লবের এই পর্বে ভূমি সংস্কারের মানে হলো – প্রকৃত কৃষকের হাতে জমি প্রদান আর অকৃষকদের জমির মালিকানা থেকে উচ্ছেদ করা।

রাশিয়ায় বিপ্লবের পরপরই সমস্ত জমিকে রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়েছিলো। কিন্তু সেখানে কার্যত জমিতে কৃষকদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ১৯৩০এর দশক পর্যন্ত সেখানে ধনীকৃষক অর্থনীতির অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিলো। একইসঙ্গে সেখানে বিভিন্ন শ্রেণীর কৃষক বিদ্যমান ছিলো। শহরেও ক্ষুদ্র উৎপাদকশ্রেণী বিদ্যমান ছিলো। এক দীর্ঘ, জটিল, রক্তক্ষয়ী ও কষ্টকর সংগ্রামের মধ্যদিয়ে উৎপাদনউপায়সমূহকে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে অগ্রসর করা সম্ভব হয়। বেশ দীর্ঘ একটা সময়ের পরই রাশিয়ায় সমবায়গুলো গঠিত হতে পেরেছিলো। সমবায় গঠনের পরও কৃষিক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় খামার (জনগণের মালিকানা) ও যৌথ খামার (যৌথ মালিকানা) – এই দুই ধরনের পরিস্থিতি বজায় ছিলো। চীনের ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই কৃষকদের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির আস্থা ও নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে ওঠায় বিপ্লবের কয়েক বছরের মধ্যেই ধনীকৃষক অর্থনীতি বিলুপ্ত করা সম্ভব হয়েছিলো। মাও বলেন, “আমরা কাজ করেছিলাম ভিন্নভাবে, প্রকৃতপক্ষে ভূমি সংস্কারের মতো তাড়াতাড়িই ধনীকৃষক অর্থনীতিকে আমরা বিলুপ্ত করেছিলাম।” (ক্রিটিক)

ঐতিহাসিক পটভূমি, সমাজ ও শ্রেণীবিন্যাস, শিল্পায়নের মাত্রা, ভৌগোলিক অবস্থান, সাম্রাজ্যবাদীদের ভূমিকা, সাংস্কৃতিক গঠন ও লড়াইয়ের ইতিহাস ইত্যাদি চীনে বিপ্লবোত্তর সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলো। রাশিয়ার সাফল্য ও ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা ছিলো চীনের জন্য ভীষণভাবে শিক্ষণীয়। রাশিয়ায় বিপ্লব ও বিপ্লবোত্তর পুনর্গঠনকালে কৃষকদের ভূমিকা যে মাত্রায় ছিলো; চীন বিপ্লবের প্রতিটি পর্যায়ে কৃষকদের এই ভূমিকা ছিলো সেই তুলনায় অনেক বেশি। রাশিয়ায় জমির জাতীয়করণ ও যৌথকরণ কর্মসূচি অনেক কঠিন অভিজ্ঞতা পার করেছিলো। এসব কাজের অভিজ্ঞতা ও ভুল শোধরাবার সুযোগ ছিলো চীনা সর্বহারাদের কাছে। আর রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের আগেই চীনা পার্টি মুক্তাঞ্চলে ভূমি সংস্কারের মধ্যদিয়ে নতুন যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলো; তা পরবর্তী সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণকার্যে ভীষণভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

নয়াগণতন্ত্রের অর্থনৈতিক ধরন কেমন হবে, এসম্পর্কে মাও সেতুঙ বলেন, “মালিকানা চীনদেশীয় হোক, অথবা বিদেশীয়ই হোক – যে প্রতিষ্ঠানগুলো একচেটিয়া চরিত্রের অথবা ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনার পক্ষে অত্যন্ত বড় – যেমন ব্যাংক, রেলপথ, বিমানপথের মতো প্রতিষ্ঠানসমূহ – সেগুলো রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত ও শাসিত হবে; যাতে ব্যক্তিগত পুঁজি জনগণের জীবনযাত্রার ওপর আধিপত্য না করতে পারে; এই হচ্ছে পুঁজি নিয়ন্ত্রণের মৌলিক নীতি।

সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে পরিচালিত নয়াগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অর্থনীতি সমাজতান্ত্রিক চরিত্রসম্পন্ন হবে। আর এটাই হবে জাতীয় অর্থনীতির পরিচালিকাশক্তি। কিন্তু এই প্রজাতন্ত্র অন্যান্য ধরনের পুঁজিবাদী ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবে না, এবং যে পুঁজিবাদী উৎপাদন ‘জনগণের জীবনযাত্রার ওপর আধিপত্য’ করতে পারে না – তার বিকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করবে না, কারণ চীনের অর্থনীতি এখনো অত্যন্ত পশ্চাদপদ স্তরে রয়েছে।

জমিদারদের জমি বাজেয়াপ্ত করে তা ভূমিহীন কৃষক ও অল্প জমির মালিক কৃষকদের মধ্যে বিলি করে দেওয়ার, . সান ইয়াৎসেনএর স্লোগান, ‘কৃষকের হাতে জমি দাও’ – কার্যকর করার, গ্রামাঞ্চলে সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্ক বিলুপ্ত করার এবং জমিকে কৃষকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করার জন্য এই প্রজাতন্ত্র কতকগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। গ্রামাঞ্চলে ধনীকৃষক অর্থনীতি যেমন আছে, তেমনই চলতে দেওয়া হবে – এটাই হলো ‘ভূমিস্বত্ব সমীকরণের নীতি’। এই নীতির সঠিক স্লোগান হলো – ‘কৃষকের হাতে জমি দাও’। এই পর্যায়ে সাধারণভাবে সমাজতান্ত্রিক কৃষিব্যবস্থা স্থাপন করা হবে না, কিন্তু ‘কৃষকের হাতে জমি দাও’ – এই নীতির ভিত্তিতে বিকশিত নানাধরণের সমবায়অর্থনীতিতে সমাজতান্ত্রিক উপাদানও থাকবে।

“‘পুঁজি নিয়ন্ত্রণ’ এবং ‘ভূমিস্বত্ব সমীকরণ’এর পথ ধরে চীনের অর্থনীতিকে চলতে হবে এবং কোনোমতেই তাকে ‘মুষ্টিমেয় লোকের একচেটিয়া অধিকারে’ থাকতে দেওয়া হবে না; আমরা কিছুতেই মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি ও জমিদারদের ‘জনগণের জীবনযাত্রার ওপর আধিপত্য’ করতে দিতে পারি না; আমরা কোনোমতেই ইউরোপআমেরিকার পদ্ধতিতে পুঁজিবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে দেবো না।

এটাই হলো নয়াগণতন্ত্রের অর্থনীতি। আর নয়াগণতন্ত্রের রাজনীতি হলো এই নয়াগণতন্ত্রের অর্থনীতিরই কেন্দ্রীভূত অভিব্যক্তি।” ()

১৯৪৯ সালে চীন বিপ্লবের পর চীনকে স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসতে প্রায় তিন বছর লেগে যায়। এসময়ে পরাজিত কুওমিনটাং, তাদের দালাল, জমিদার, সাম্রাজ্যবাদের চর এবং তাদের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড দমন করতে হয় সর্বহারাশ্রেণীকে। ১৯৫২ সালের মধ্যে ভূমি সংস্কার সম্পন্ন হয়। এই সময়ের মধ্যে নয়াগণতান্ত্রিক পুনর্গঠন সম্পন্ন করতে বিভিন্ন বাস্তবিক পদক্ষেপ ও কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। গ্রামে গ্রামে ভূমি সংস্কার পরিণত হয় দরিদ্র্য নারীপুরুষের উৎসবে। ভূমি সংস্কারের ক্ষেত্রে উত্তর চীন ও দক্ষিণ চীনের মাঝেও ভিন্নতা ছিলো। উত্তর চীন ছিলো বিপ্লবী তৎপরতার প্রধান কেন্দ্র। তাই সেখানে বিপ্লবের পরপরই ভূমি সংস্কার শুরু করা সম্ভব হয়েছিলো। পক্ষান্তরে, দক্ষিণ চীন বিপ্লবী যুদ্ধের পরই কেবল বিপ্লবীদের দখলে আসে। আর তাই সেখানে মাওএর প্রস্তাব ছিলো – এসব সদ্যমুক্ত এলাকায় জমিদারদেরকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে প্রথমে শুধু তাদের উপরই আঘাত হানা এবং বৃহৎ কৃষকদের আপাতত আঘাত না করা; পরবর্তীতে একটু সুস্থির ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে ধনীকৃষকদেরও ভূমি সংস্কারের আওতায় আনা।

চীনে বিপ্লবী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়া যুদ্ধ শুরু করে। এই যুদ্ধ পরিণত হয় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চীনসোভিয়েত যুদ্ধে। ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত, প্রায় তিন বছর চীনকে ঐ ফ্রন্টে ব্যস্ত থাকতে হয়। চীনের বিপ্লবী সরকার প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে ১৯৫৩ সালে। তখন থেকেই সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণকাজ শুরু হয়; যা ১৯৫৬ সালে একটা পর্যায় অতিক্রম করে। এই সময়ের মধ্যে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও হস্তশিল্প – এই প্রধান ক্ষেত্রগুলোর সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরে বিপুল অগ্রগতি সাধিত হয়। সেই সঙ্গে গ্রামেশহরে নতুন প্রতিষ্ঠান, উৎপাদন সম্পর্ক এবং নতুন সংস্কৃতি নির্মাণের অবিরাম কর্মউৎসব ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে সারাদেশে। অর্থনীতি ও রাজনীতির প্রতিফলনই ঘটে সংস্কৃতিতে। আর এজন্যই দরকার পড়ে নতুন বিপ্লবী সংস্কৃতির বিকাশ সাধনের। চীনা সমাজে শিক্ষাসংস্কৃতির এই বিপ্লবী রূপান্তর ছিলো চোখে পড়ার মতো।

বিপ্লবপূর্ব চীনে প্রচলিত কয়েকটি বচন থেকেই সেই পশ্চাদপদ সমাজে নারীর অবস্থান এবং সে সময়ের পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি সম্পর্কে আন্দাজ করা যায়। এলিজাবেথ ক্রল তাঁর গবেষণাকালে এসব বচনের একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন, যেমন – ‘নুডলস যেমন ভাত নয়, নারীও তেমনি মানুষ নয়’, ‘স্ত্রী হলো কেনা ঘোড়ার মতো, আমি তাকে চালাবো এবং যখন খুশি চাবুক মারবো’, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর সতী স্ত্রীর কর্তব্য হচ্ছে মৃত স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকা এবং আর বিয়ে না করা’, ‘পুরুষের স্থান সর্বত্র, নারীর স্থান শুধুমাত্র রান্নাঘরে’, ‘নারী যে কুয়া খুঁড়বে তাতে পানি উঠবে না, যে নৌকা মেয়েরা চালাবে তা পানিতে ডুববে’।

১৯৫০ সালের মে মাসে বিবাহ সংস্কার আইন প্রবর্তন করা হয়; যা হাজার বছরে নারীর অধস্তনতার আইনগত ভিত্তি ভেঙে দেয়। এই আইনে জোরপূর্বক বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়। এই আইনে চীনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিবাহকে সাবালক নারী ও পুরুষের স্বেচ্ছাচুক্তি হিসেবে অভিহিত করা হয়। সম্পত্তি, বিবাহ বিচ্ছেদ ও সন্তানের ওপর নারী সমান অধিকার লাভ করে। এই আইনে একইসঙ্গে পরিবারে দুজনের সমান দায়িত্বও নির্ধারিত হয়। বিবাহ বিচ্ছেদ অনেক সহজ করা হয়। বহুবিবাহ, পতিতাবৃত্তি, ‘অবাঞ্ছিত’ মেয়েশিশু হত্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

বিপ্লবের পর অনুষ্ঠিত প্রথম জনশুমারি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে; তখন জনসংখ্যা পাওয়া যায় ৫৮ কোটি ৩০ লাখ। বিপ্লবকালে এই সংখ্যা ৫০ কোটিরও বেশি ছিলো এই ধারণা করা যায়। এতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে আবাদি জমি মোট জমির শতকরা মাত্র ১৩ ভাগ। জনসংখ্যার তুলনায় পানির প্রাপ্যতাও কম। বিশ্বের শতকরা ৫ ভাগ পানি ও শতকরা ৭ ভাগ আবাদি জমি দিয়ে শতকরা ২০ ভাগ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা চীনের জন্য সবসময়ই একটি গুরুদায়িত্ব হিসেবে থেকেছে। বিপ্লবীদের সামনে সমস্যা ছিলো – প্রথমত, বিশাল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন; এবং দ্বিতীয়ত, খাদ্য ও জমির ওপর জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা। ১৯৪৯ সালে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিলো মোট ১০ কোটি টন। মাথাপিছু প্রাপ্যতা ছিলো ২০০ কেজি। এই উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ভুমিতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিপ্লবী সরকার কয়েকটি ধাপে অগ্রসর হলো। কৃষক জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, ব্যাপক অংশগ্রহণের ভিত্তিতে, অংশগ্রহণমূলক স্থায়ী একটি কাঠামোর দিকে অগ্রসর হলো চীনা পার্টি এবং তার সঙ্গে যুক্ত বহুরকম সংগঠন। আগে থেকে কোনো মডেল ছিলো না। শুধু ছিলো জীবন, ভূমিসহ সকল সম্পদ এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় কতিপয় শোষক দুর্বৃত্তবাদে সর্বজনের মালিকানা নিশ্চিত করবার লক্ষ্য ও দৃঢ়চিত্ত পদক্ষেপ।

চীনে জমিদার জোতদাররা মোট জনসংখ্যার শতকরা ১০ ভাগ হলেও তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো মোট আবাদি জমির শতকরা ৭০ ভাগ। এসব জমি ক্ষুদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের মাঝে বিলি করা হয়। সকল পর্যায়েই নিচ থেকে, ভেতর থেকে সবার অংশগ্রহণ ও সম্মতির ভিত্তিতেই ভূমি সংস্কার এবং সমবায়ী কাঠামো নির্মাণের কাজ অগ্রসর হয়। কয়েক বছরে সারাদেশে কমিউন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই ধারা একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে পরিণতি লাভ করে। এর পর্যায়ক্রমিক ধাপগুলো ছিলো – পারস্পরিক সহযোগী দল, প্রাথমিক সমবায়, উচ্চতর সমবায় এবং কমিউন।

১৯৫৩ সালের মধ্যে কৃষি ও গ্রামীণ সমাজের চেহারা পাল্টে যায়। ভুস্বামীদের ক্ষমতার ভিত্তি উৎপাটিত হয়। ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে সৃষ্ট নতুন সম্পর্ক সমাজে প্রাণখুলে বিকশিত হবার চেষ্টা করতে থাকে। প্রায় ৩১ কোটি মানুষ ভূমি সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ৩০ কোটি কৃষক, যাদের খুব কম জমি ছিলো; কিংবা কৃষিমজুরবর্গাচাষী, যাদের কোনো জমি ছিলো না – ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে তাদের হাতে আসে প্রায় ১২ কোটি একর জমি আর তার সঙ্গে কৃষি যন্ত্রপাতি, গবাদিপশু, ঘরবাড়ি।

ভূস্বামীদের জমি বাজেয়াপ্ত ও তার বন্টনের পর শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব। প্রথমে প্রাচীন পারস্পরিক সহযোগিতার প্রথা অনুযায়ী গড়ে উঠে পারস্পরিক সহযোগী দল। একে বলা হয় প্রাকসমবায় স্তর। ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরে পার্টি গৃহীত নীতি অনুযায়ী, কয়েকটি পারস্পরিক সহযোগী দল মিলে আধাসমাজতান্ত্রিক চরিত্রের প্রাথমিক সমবায় গঠন শুরু হয়। এই কাঠামোতে জমি, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদির ওপর সদস্যদের ব্যক্তিমালিকানা থাকতো। একসঙ্গে আবাদ হতো এবং জমি, গবাদিপশু, কৃষি সরঞ্জাম এবং শ্রম অনুযায়ী ফসল বিতরণ হতো।

গ্রামাঞ্চলে ভূমি সংস্কারের পর্যায়ক্রমিক অগ্রগতি নিয়ে ক্রমান্বয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষিকে যৌথ চাষাবাদ ও সমবায়ের দিকে নিয়ে যাওয়া এবং শিল্পের বিকাশ সম্পর্কে মাও সেতুঙ বলেন, “চীনে বিশাল জনসংখ্যার জন্য অপর্যাপ্ত জমি (সারা দেশে গড়পড়তা মাথাপিছু জমি ৩ মৌ, দক্ষিণাঞ্চলের প্রদেশগুলোর বিভিন্ন অঞ্চলে মাথাপিছু জমি ১ মৌ কিংবা তারও কম) রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ খুবই ঘনঘন (প্রতি বছর বিশাল পরিমাণ আবাদী জমি বন্যা, খরা, পোকা, ইত্যাদি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়)বর্তমানে বিক্রয়ের মতো খাদ্যশস্য এবং কাঁচামাল উৎপাদনের মাত্রা খুবই নিচু; কিন্তু এগুলোর জন্য রাষ্ট্রের চাহিদা প্রতিদিনই বাড়ছে, এবং এতে সৃষ্টি হয়েছে গভীর দ্বন্দ্ব। দ্বিতীয়ত, সমাজতান্ত্রিক শিল্পায়নের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা ভারী শিল্প; যা কৃষিতে ব্যবহারের জন্য ট্রাক্টরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক সার, পরিবহণের জন্য আধুনিক উপকরণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হবে তখনই যখন বৃহদায়তন চাষাবাদ করা যাবে এবং তা সমবায়ের মাধ্যমেই সম্ভব। আমরা সমাজব্যবস্থাতেই শুধু বিপ্লব আনছি না, ব্যক্তি মালিকানাধীন থেকে সামাজিক মালিকানায় রূপান্তর শুধু নয়, তা আনতে হবে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে, হস্তশিল্প থেকে প্রবর্তন করতে হবে বৃহদায়তন আধুনিক যন্ত্রশিল্পের। এবং এই দুই দিকের বিপ্লব ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এছাড়া হালকা শিল্পের ব্যাপক বিকাশের জন্য একইসঙ্গে কৃষি এবং ভারী শিল্পের বিকাশ প্রয়োজন।” উল্লেখ্য, চীনা পরিমাপের একক মৌ। এই পরিমাপ অনুসারে, ১ একর সমান ৬.০৭ মৌ।

জমি জাতীয়করণ না করে ক্রমান্বয়ে যৌথ চাষাবাদের মধ্যে সকলকে সম্পৃক্ত করে বৃহদায়তন কৃষির দিকে অগ্রসর হয় চীন। পার্টির মধ্যে দুটো বিপরীত মতের বাইরে থেকে মাও সেতুঙ এই ধারায় পার্টিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন অবিরাম আলোচনা, বিতর্ক, ও গবেষণার মধ্যদিয়ে। একটি মত ছিলো – আইন করে সকল ব্যক্তি মালিকানা বিলুপ্ত করে শিল্প কৃষিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ করার পক্ষে। এর বিপরীত মত ছিলো – যৌথ চাষাবাদের প্রবর্তন না করে বাজার, পণ্য উৎপাদনের বিধি মোতাবেক ব্যক্তি মালিকানার বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটানো। শিল্পখাতের বড় অংশ বাজার অর্থনীতির নিয়মে চালানোর পক্ষেও ছিলেন তারা। আমদানি রপ্তানি ও আভ্যন্তরীণ ব্যবসাবাণিজ্যে সরকারি নিয়ন্ত্রণেরও তারা বিরোধী ছিলেন। মাও সেতুঙ এই দুই বিপরীত মতকেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে মতদুটোর সংঘাত শেষ হয়নি, কোনো মীমাংসাও হয়নি। বরং ৬০ ও ৭০ দশকে এই সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

বিপ্লবপূর্ব চীনে শিল্পবাণিজ্যের শতকরা ৮০ ভাগের মালিকানা ছিলো আমলামুৎসুদ্দি পুঁজিপতিদের হাতে। নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রক্রিয়ায় এই পুঁজিকে বাজেয়াপ্ত করা হয়। এসম্পর্কে মাও বলেন, “এর একটি গণতান্ত্রিক বিপ্লবী চরিত্র ছিলো, এটা যতোটা দালালপুঁজিবাদের বিরোধিতা করছে; কিন্তু এর একটা সমাজতান্ত্রিক চরিত্রও ছিলো, যতোটা তা বৃহৎ বুর্জোয়াদের বিরোধিতা করেছিলো।”

তিনি আরো বলেন, “…যুদ্ধ পরিচালনা করে আমরা বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী পার্টির শাসনকে উৎখাত করেছিলাম এবং আমাদের সমগ্র পুঁজিবাদী অর্থনীতির শতকরা ৮০ ভাগ যে আমলাতান্ত্রিক পুঁজি, তাকে বাজেয়াপ্ত করেছিলাম; শুধুমাত্র এভাবেই বাকি যে ২০ ভাগ জাতীয় পুঁজি, তাকে পুনর্গঠনের জন্য শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি গ্রহণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিলো। পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াতেও আমাদেরকে প্রচণ্ড সংগ্রামের মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছিলো…” (ক্রিটিক)

জাতীয় বুর্জোয়া; অর্থাৎ ক্ষমতাসীন সর্বহারাশ্রেণীর অধীনস্ত পুঁজিবাদকে রাতারাতি উৎখাত করাটা তৎকালীন চীনে সম্ভব ছিলো না। চীন ছিলো পশ্চাদপদ একটি দেশ; শিল্পের বিকাশ ছিলো অনুন্নত। কিন্তু শিল্পবাণিজ্যের বিকাশের জন্য যোগ্য ব্যক্তি ছিলো না। আর এজন্যই দরকার পড়ে জাতীয় বুর্জোয়াদের; তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার না করার কোনো কারণ ছিলো না। আর এজন্যই বিপ্লবের পরও তাদের সঙ্গে চীনা পার্টির যুক্তফ্রন্ট বজায় ছিলো। তাই জাতীয় বুর্জোয়াদের উৎখাতের কাজটা করা হয়েছিলো ধাপে ধাপে। এই উৎখাতের কথা মাথায় রেখেই কমরেড লেনিন নির্দেশিত রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের তত্ত্বকে (‘রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ’) মাও সুচারুরূপে প্রয়োগ করেন। মাও বলেন, “রাষ্ট্রব্যক্তিগত যুক্তপরিচালনা; ব্যক্তিগত উদ্যোগাধীন সংগঠনগুলোতে রাষ্ট্রের নির্দেশানুসারে উপাদান প্রস্তুত করা অথবা সামগ্রী তৈরি করা, সেখানে রাষ্ট্র সর্বপ্রকার কাঁচামাল যোগানের ব্যবস্থা করবে এবং সবরকম প্রস্তুত দ্রব্য নিয়ে নিবে এবং অনুরূপভাবে নির্দেশসমূহ দিয়ে রাষ্ট্র সব না হলেও প্রায় সব প্রস্তুত দ্রব্য নিয়ে নিবে। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন শিল্পের ক্ষেত্রে এই তিন প্রকার রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ গ্রহণ করা যেতে পারে।” (নির্বাচিত রচনাবলী, ৫ম খণ্ড)

১৯৫৩ সালে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের প্রথম পর্যায়ে মাও এই পুঁজিবাদকে বর্ণনা করেন এভাবে – “এটি সাধারণ নয়, বরং একটি বিশেষ ধরনের পুঁজিবাদী অর্থনীতি। এর অস্তিত্ব প্রধানত পুঁজিবাদীদের মুনাফা তৈরির জন্য নয়, বরং জনগণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন মেটানোর জন্য।” ()

চীনে জাতীয় বুর্জোয়ারা এমনি এমনি সমাজতন্ত্রের পথে আসেনি। জাতীয় বুর্জোয়াদের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের মধ্যদিয়ে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর সাধনে বাধ্য করা হয়। আর তা একইসঙ্গে অর্থনৈতিক ও মতাদর্শিক সংগ্রামের মাধ্যমে বিকাশিত হয়েছিলো।

মাও বলেন, “স্বাধীনতার পর জাতীয় পুঁজিপতিদেরকে সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পথ গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছিলো। আমরা চিয়াং কাইশেককে (ক্ষমতা থেকে) নামিয়েছিলাম, আমলাতান্ত্রিক পুঁজিকে বাজেয়াপ্ত করেছিলাম, ভূমি সংস্কার সম্পন্ন করেছিলাম, ‘তিনটি দোষ’ ও ‘পাঁচটি দোষ’এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম অভিযান পরিচালনা করেছিলাম এবং সমবায়গুলোকে কার্যকরী বাস্তবতায় পরিণত করেছিলাম। প্রথম থেকেই আমরা বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করেছি। এই পরিবর্তনসমূহ জাতীয় বুর্জোয়াদেরকে ধাপে ধাপে পুনর্গঠন মেনে নিতে বাধ্য করলো।” (ক্রিটিক)

১৯৫৬ সাল নাগাদ কৃষি সমবায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিকশিত হয়। এপর্যায়ে জমি ও কৃষি সরঞ্জামের মালিকানাও ক্রমে সমবায়ের হাতে স্থানান্তরিত হয়। সেই সঙ্গে শিল্পের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে ধাপে ধাপে। যা ছিলো সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের দিকে আরেক ধাপ অগ্রসরতা।

মার্ক্সবাদ যান্ত্রিক কোনো মতবাদ নয়; আর তাই তার প্রয়োগও যান্ত্রিকভাবে করা সম্ভব নয়; যারাই এর যান্ত্রিক প্রয়োগে নিমজ্জিত হয়েছেন; তাদের স্থান হয়েছে সংশোধনবাদ আর সুবিধাবাদের আঁস্তাকুড়ে। বিপ্লবের কোনো স্তরে পশ্চাদপসরণ করাটাও ওই বিপ্লবেরই অংশ। সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণে পশ্চাদসরণও সেই সমাজতন্ত্রেরই অংশ।

আর বিপ্লবী কাজে নিযুক্ত রাজনৈতিক পার্টি, গ্রুপ বা ব্যক্তি, সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের এই ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলে তারা ক্রমেই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। এক্ষেত্রে একটি কথা মনে রাখাটা জরুরী। সর্বহারাশ্রেণী হলো – ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ববাদী ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী; ঐতিহাসিক ভাববাদ ও যান্ত্রিক বস্তুবাদের বিরোধী। বাস্তবিক অবস্থায় বাস্তবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই যার মূল কর্মনীতি। যে কোনো মতবাদ, একেবারে সর্বোৎকৃষ্ট মতবাদ, এমনকি মার্ক্সবাদলেনিনবাদমাওবাদও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সংযুক্ত না হলে, বাস্তবিক অবস্থার নিরিখে তা চাহিদা পূরণ না করতে পারলে এবং জনগণ কর্তৃক তা আয়ত্ত করা সম্ভব না হলে, তা অকেজোই থেকে যায়। অর্থাৎ, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রণকৌশল নির্ধারণ করতে সক্ষম না হলে কোনো মতবাদই কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে রুশ ও চীন বিপ্লবের অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় যে, সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের লক্ষ্যে পরিচালিত এই বৈপ্লবিক গণতন্ত্রের অগ্রসরতার শিক্ষা বাঙলাদেশসহ কৃষিপ্রধান সকল দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে তা হতে হবে চীনরাশিয়ার অনুকরণে নয়; বরং বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষাপটে সেই শিক্ষাকে কাজে লাগানোর মধ্যদিয়ে।।

জানুয়ারি ২০১৬

তথ্যসূত্র

১। ভ্লাদিমির লেনিন, সোভিয়েত সরকারের আশু কর্তব্য

২। ভ্লাদিমির লেনিন, কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিবেদন, ১৮ মার্চ ১৯১৯

৩। ভ্লাদিমির লেনিন, মফস্বলের কাজের প্রতিবেদন, ২৩ মার্চ ১৯১৯

৪। ভ্লাদিমির লেনিন, কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিবেদন, ২৯ মার্চ ১৯২০

৫। ভ্লাদিমির লেনিন, কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিককার্যের প্রতিবেদন, ৮ মার্চ ১৯২১

৬। ভ্লাদিমির লেনিন, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের রণকৌশলের সমর্থনে ভাষণ, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকএর তৃতীয় কংগ্রেস, ১ জুলাই ১৯২১

৭। ভ্লাদিমির লেনিন, রুশ কমিউনিস্ট পার্টির রণকৌশল সংক্রান্ত প্রতিবেদন, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকএর তৃতীয় কংগ্রেস, ২৫ জুলাই ১৯২১

৮। ভ্লাদিমির লেনিন, কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক প্রতিবেদনের সমাপ্তি ভাষণ, ২৮ মার্চ ১৯২২

৯। ভ্লাদিমির লেনিন, বস্তুকর প্রসঙ্গে

১০। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট (বলশেভিক) পার্টির ইতিহাস

১১। মাও সেতুঙ, নয়াগণতন্ত্র সম্পর্কে

১২। আনোয়ার কবীর, মাও সেতুঙ চিন্তাধারার সপক্ষে

১৩। আনু মুহাম্মদ, চীন :: পরাশক্তির বিবর্তন

১৪। বিবিধ

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.