লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত

মার্ক্সবাদ হাজার হাজার সত্যের সমষ্টি, কিন্তু এগুলো সবই কেন্দ্রীভূত হয় একটিমাত্র বাক্যে – ‘বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত’। হাজার হাজার বছর ধরে এটা বলে আসা হচ্ছিলো যে, দাবিয়ে রাখাটা ন্যায়সঙ্গত, শোষণ করাটা ন্যায়সঙ্গত এবং বিদ্রোহ করা অন্যায়। এই পুরনো সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র মার্ক্সবাদের উদ্ভবের পরই উল্টে গেলো। এটা একটা মহান অবদান। সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সর্বহারাশ্রেণী এই সত্যকে শিখেছে এবং মার্ক্স এই উপসংহার টেনেছেন। আর তারপর এই সত্য থেকেই আসে প্রতিরোধ, সংগ্রাম, সমাজতন্ত্রের জন্য লড়াই।”

মাও সেতুঙ, স্তালিনএর ষাটতম জন্মবার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে ইয়োনানে সর্বস্তরের জনগণের সমাবেশে প্রদত্ত ভাষণ থেকে

সমাজতন্ত্র কী?

এক কথায় বললে, সর্বহারাশ্রেণীর ক্ষমতাধীন সমাজই সমাজতান্ত্রিক সমাজ – যেখানে পুঁজিবাদকে সমূলে উৎখাত করা হয়েছে। সর্বহারাশ্রেণী কর্তৃক রাষ্ট্রক্ষমতা দখল; পুরনো ব্যবস্থাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে নতুন ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিস্থাপন, উৎপাদনউপায়সমূহের সামাজিকীকরণ এবং রাষ্ট্র ক্রমশ নিজেই নিজেকে শুকিয়ে মারা – এগুলোই সমাজতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এরূপ সমাজে ক্ষমতার সাধারণ ও মূল রূপটি হলো সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব। এই ধারণার মূলে রয়েছে ‘রাষ্ট্র’এর ধারণা; যা কখনোই শ্রেণীনিরপেক্ষ নয়।

শ্রেণীবিভক্ত সমাজে সকল ব্যক্তিই কোনো না কোনো শ্রেণীর অন্তর্গত। এরূপ সমাজে শ্রেণীশোষণ, শ্রেণীবৈষম্য, শ্রেণীসংগ্রাম বিদ্যমান রয়েছে। আর শাসনক্ষমতার জোরেই বুর্জোয়াশ্রেণী শ্রমিকশ্রেণীসহ অন্যান্য মেহনতি, উৎপাদক শ্রেণীসমূহকে শোষণ করতে পারে। এই শোষণকে উৎখাত করতে হলে সর্বাগ্রে শাসনক্ষমতা বা রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বুর্জোয়াশ্রেণীকে উৎখাত করতে হবে। আর এই ব্যবস্থা প্রতিস্থাপিত হবে সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের দ্বারা। এই রাষ্ট্রের মূল কাজ হলো – বুর্জোয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিসমূহকে দমন করা; উৎপাদনউপায়ের সামাজিকীরণে ক্রমউত্তরণ। সমাজতান্ত্রিককালই হলো সাম্যবাদে পৌঁছার উৎক্রমণকাল; যেখানে শ্রেণীশোষণকে পরিপূর্ণরূপে উৎখাত করা সম্ভব – ক্রমান্বয়ে যা পরিণত হবে শোষণহীন সমাজে; যেখানে শ্রেণীর বিলুপ্তি ঘটবে আর তখন শোষকযন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্র তার কার্যকারিতা হারাবে; অর্থাৎ রাষ্ট্র ক্রমশ শুকিয়ে বিলীন হয়ে যাবে।

এন্টি ড্যুরিং’ গ্রন্থে কমরেড ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস বলেন, “সর্বহারাশ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে এবং সর্বাগ্রেই উৎপাদনউপায়গুলি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে পরিণত করে। কিন্তু তাতে করে সর্বহারাশ্রেণী শ্রেণী হিসেবে সে নিজেই নিজেকে বিলুপ্ত করে, সমস্ত শ্রেণীবৈষম্য ও শ্রেণীবৈরিতার বিলুপ্তি ঘটায় এবং রাষ্ট্র হিসেবে রাষ্ট্রেরও বিলোপ সাধন করে। শ্রেণীবৈরিতার মধ্যে পরিচালিত হওয়ায়, এতোকাল পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল, অর্থাৎ নির্দিষ্ট শোষকশ্রেণীর একটা সংগঠনের দরকার ছিল – দরকার ছিল ঐ শ্রেণীর উৎপাদনের বাহ্যিক শর্তসমূহ বজায় রাখার জন্যে, আর তাই বিশেষ করে নির্দিষ্ট উৎপাদন পদ্ধতির (দাসত্ব, ভূমিদাসত্ব, মজুরিদাসত্ব) দ্বারা নিপীড়নমূলক অবস্থাধীনে শোষিতশ্রেণীকে জোর করে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে। রাষ্ট্র ছিল সমগ্রভাবে সমাজেরই প্রতিনিধি, একটি দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠানে তার কেন্দ্রীভবন। কিন্তু তা ছিল শুধু সেই পরিমাণেই ঐ শ্রেণীটির রাষ্ট্র, যে পরিমাণে সে নিজে, তার স্বকালে, সমগ্রভাবে সমাজের প্রতিনিধিত্ব করতো – প্রাচীনকালে তা ছিল দাসমালিক নাগরিকদের রাষ্ট্র; মধ্যযুগে সামন্ত অভিজাতদের; আর আমাদেরকালে বুর্জোয়াশ্রেণীর রাষ্ট্র। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র যখন হয়ে উঠবে সমগ্র সমাজেরই প্রতিনিধি, তখন সে নিজেকেই করে তুলবে অনাবশ্যক। দাবিয়ে রাখার মতো কোনো সামাজিক শ্রেণী যখন আর থাকবে না, যখন অপসারিত হয়ে যাবে শ্রেণীশাসন, আর উৎপাদনের ক্ষেত্রে বর্তমান নৈরাজ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সংগ্রাম, সেই সঙ্গে এই সংগ্রাম থেকে উদ্ভূত সংঘাত ও অমিতাচার; তখন দাবিয়ে রাখার মতো আর কিছু থাকবে না – কোনো আবশ্যকতাই থাকবে না বিশেষ দমনমূলক শক্তির, তথা রাষ্ট্রের। সমাজের পক্ষ থেকে উৎপাদনের উপায়সমূহের অধিকার গ্রহণ – এই যে প্রথম কাজটি দ্বারা রাষ্ট্র প্রকৃতই এগিয়ে আসবে সমগ্র সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে, সেটিই হবে রাষ্ট্র হিসেবে তার শেষ স্বাধীন কাজ। সামাজিক সম্পর্কস্মূহের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ তখন একের পর এক পরিমণ্ডলে অবান্তর হয়ে দাঁড়াবে এবং তারপর আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যক্তির শাসননিয়ন্ত্রণের জায়গায় আসবে বস্তুর শাসন, আর উৎপাদনপ্রক্রিয়ার পরিচালনা। রাষ্ট্র ‘বিলুপ্ত’ (abolished) হয়ে যাবে না। ‘ক্ষয় হওয়ার মধ্য দিয়ে তা বিলীন’ (It withers away) হয়ে যাবে। ‘স্বাধীন জনরাষ্ট্র’ (People’s State) কথাটির মূল্যাবধারণ করতে হবে এই দিক থেকেই – উভয়ত প্রচারমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে, কিছু সময়ের জন্যে তার যুক্তিসম্মত ব্যবহারের দিক থেকে, এবং তার চরম বৈজ্ঞানিক অপ্রতুলতার দিক থেকে, আর নৈরাজ্যবাদীদের তথাকথিত এই দাবির দিক থেকেও যে, রাতারাতি রাষ্ট্রের বিলোপ ঘটাতে হবে।”

মার্ক্সীয় মতানুসারে, শ্রেণীর বিলুপ্তি ঘটার আগে রাষ্ট্রের বিলোপ ঘটে না। সকল পুঁজিবাদী দেশেই শাসনক্ষমতা থাকে বুর্জোয়াশ্রেণীর হাতে। সরকারের রূপ যাই থাকুক না কেন, তা অপরিবর্তনীয়ভাবে বুর্জোয়াশ্রেণীর একনায়কত্বকে আড়াল করে। বুর্জোয়া রাষ্ট্রের অভীষ্ট হলো – পুঁজিবাদী শোষণকে টিকিয়ে রাখা; কলকারখানাফ্যাক্টরি ও জমির উপর বুর্জোয়াশ্রেণীর ব্যক্তি ও কর্পোরেশনের মালিকানা রক্ষা করা। সমাজতন্ত্রকে বিজয় অর্জন করতে হলে অবশ্যই বুর্জোয়াশ্রেণীর শাসন উচ্ছেদ করতে হবে এবং তার স্থলে অধিষ্ঠিত করতে হবে সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব। সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বের অর্থ হলো – ব্যাপক জনগণের স্বার্থে শোষকদের ক্ষুদ্র দলটির ওপর শ্রেণীগত আধিপত্য। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে সর্বহারাশ্রেণী শাসকশ্রেণীতে পরিণত হয় – সকল সামাজিকীকৃত উৎপাদন পরিচালনা করে, শোষকশ্রেণীর প্রতিরোধ চূর্ণবিচূর্ণ করে, সকল নিপীড়িত শ্রেণীগুলোকে নেতৃত্ব দান করে ও মতাদর্শিক পুনর্গঠনে নেতৃত্ব প্রদান করে।

শাসকশ্রেণীতে পরিণত হয়েই সর্বহারাশ্রেণী শ্রেণীহীন সমাজ গড়ার কাজ চালিয়ে যেতে থাকে অর্থনৈতিক ক্রমউত্তরণ ও রাজনৈতিক মতাদর্শিক সংগ্রাম পরিচালনার মাধ্যমে। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সর্বহারাশ্রেণীর বিরামহীন শ্রেণীসংগ্রামের মাধ্যমে, সর্বহারা বিপ্লব ও সম্পত্তির মালিকানার সামাজিকীকরণের মাধ্যমেই কেবল পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব। পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সাধন তাৎক্ষণিকভাবেই সম্পন্ন করা যায় না। একটি দীর্ঘ উত্তরণকাল এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এই সময়কালে রাষ্ট্রক্ষমতা সর্বহারাশ্রেণীর হাতেই থাকে।

কমরেড ভ্লাদিমির লেনিন বলেন, “শ্রেণীসমূহের বিলুপ্তি হচ্ছে একটা দীর্ঘ, কষ্টসাধ্য ও বিরামহীন শ্রেণীসংগ্রামের ব্যাপার, যা পুঁজির শাসনের উচ্ছেদের পর, বুর্জোয়া রাষ্ট্রের ধ্বংস সাধনের পর, সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার পর তিরোহিত হয়ে যায় না, বরং কেবলমাত্র তার রূপ বদলায়, বহুদিক দিয়েই হয়ে দাঁড়ায় অধিকতর তিক্ত।” (ভিয়েনার শ্রমিকদের প্রতি শুভেচ্ছা)

১৮৭৫ সালে ‘গোথা কর্মসূচীর সমালোচনা’ শীর্ষক গ্রন্থে কমরেড কার্ল মার্ক্স বলেন, “পুঁজিবাদী সমাজ আর কমিউনিস্ট সমাজ; এই দুইয়ের মাঝে রয়েছে একটি অপরটিতে রূপান্তরের এক পর্ব। তারই সঙ্গে সহগামী থাকে একটি রাজনৈতিক উৎক্রমণ পর্ব (transitional period), যখন রাষ্ট্র সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লবী একনায়কত্ব ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।”

অর্থাৎ, সমাজতন্ত্র হলো – পুঁজিবাদ উৎখাতের পর থেকে সাম্যবাদে উত্তরণকালীন একটা পর্ব। এ সময়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজও পুঁজিবাদে অধঃপতিত হতে পারে; আবার পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ ঘটতে পারে। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত সর্বহারা একনায়কত্বের যে সমস্ত অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে রয়েছে, তাতে আমরা ‘সমাজতন্ত্র’ নামক সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো বস্তুর দেখা পাই না। বরং এমন সমাজ যেখানে পুঁজিবাদের উৎখাত ঘটেছে; সেই সমাজ ক্রমউত্তরণের মধ্যদিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়। সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণকালীন পুরো পর্যায়টিই সমাজতন্ত্রের অন্তর্গত। মার্ক্স থেকে মাও পর্যন্ত কমিউনিজমের মহান শিক্ষকেরা আমাদের এটাই শিখিয়েছেন যে, এটা এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া; যা দীর্ঘকালব্যাপী চলমান থাকে – পুঁজিবাদ থেকে কমিউনিজমে উৎক্রমণের কাল। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে সমাজতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেই সাম্যবাদের পর্বটির আবির্ভাব ঘটবে। কিন্তু সুপ্রতিষ্ঠিত, অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের সবগুলো নীতি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসৃত না হলেও, যদি সেখানে সমাজতন্ত্রের বিকাশ ক্রমউত্তরণকালীন পর্যায়ে থাকে; তবে তাকে অবশ্যই সমাজতন্ত্র বলতে হবে – সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বই এক্ষেত্রে মূল মানদণ্ড। আর এজন্যই আমরা বলি, রাশিয়া ও চীনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অর্থাৎ, রাশিয়া ও চীন সমাজতন্ত্রের পথে ছিল। রাশিয়া ও চীনের অভিজ্ঞতা বা শিক্ষা মার্ক্সএর উপরোক্ত কথার যথার্থতাই প্রমাণ করে – “পুঁজিবাদী সমাজ আর কমিউনিস্ট সমাজ; এই দুইয়ের মাঝে রয়েছে একটি অপরটিতে রূপান্তরের এক পর্ব” – সেখানে পুঁজিবাদ উৎখাত হয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়; আবার পরবর্তীতে রাশিয়া ও চীন যথাক্রমে স্ট্যালিন ও মাও পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাদে অধঃপতিত হয়। এই সমাজগুলো কমিউনিজমের লক্ষ্যে তাদের যাত্রা যতোদিন অব্যাহত রেখেছিল, যতোদিন তাদের গতি ছিল সামনের দিকে, যতোদিন পর্যন্ত ‘বুর্জোয়া অধিকার’ এবং সমস্ত বুর্জোয়া অবশেষ ও নবউদ্ভূত বুর্জোয়া উপাদানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত ছিল; ততোদিন এই সমাজগুলো সমাজতান্ত্রিক সমাজই ছিল। এই সমাজগুলো অবশ্যই ক্রমাগতভাবে উচ্চতর স্তর, সাম্যবাদে উন্নীত হতো; এবং ভবিষ্যতের সামজতান্ত্রিক সমাজগুলোতেও তা হবে, ক্রমাগত সেগুলো কমিউনিজমের সন্নিকটবর্তী হবে এবং রাষ্ট্র শুকিয়ে মরা শুরু করবে – এগুলো অনিবার্য।

সমাজতন্ত্র আর সাম্যবাদ বা কমিউনিজমের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ‘সাধ্য অনুযায়ী শ্রম ও শ্রম অনুযায়ী ভোগ’ – এটা হলো সমাজতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। অপরদিকে, ‘সাধ্য অনুযায়ী কাজ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভোগ’ – এটা হলো সাম্যবাদের বৈশিষ্ট্য। সমাজতন্ত্রে শ্রেণী থাকবে, তাই শ্রেণীসংগ্রামও থাকবে, আর তাই রাষ্ট্রও থাকবে, থাকবে সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব। কিন্তু সাম্যবাদে শ্রেণী থাকবে না, তাই শ্রেণীসংগ্রামও থাকবে না, যেহেতু দমন করার মতো কোন শ্রেণীর অস্তিত্ব থাকবে না, তাই রাষ্ট্রের কার্যকারিতা থাকবে না, আর তাই সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বও থাকবে না।

এঙ্গেলস বলেন, “সর্বহারাশ্রেণীর কাছে যতোদিন রাষ্ট্রের প্রয়োজন থাকছে, ততোদিন সে প্রয়োজনটা স্বাধীনতার স্বার্থে নয়, নিজ প্রতিপক্ষীয়দের দমনের স্বার্থে এবং যখন স্বাধীনতার কথা বলা সম্ভব হবে, তখন রাষ্ট্র হিসেবে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব আর থাকছে না।”

বিপ্লবী গণতন্ত্র সম্পর্কে

১৮৮২ সালের ২৬ জুন, বার্নস্টেইনকে লেখা এক চিঠিতে এঙ্গেলস উল্লেখ করেন, “আয়ারল্যান্ডের আন্দোলনে দুটি প্রবণতা লক্ষ্যণীয় – বিপ্লবী কৃষি আন্দোলন, যা কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যক্ষ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে এবং তার রাজনৈতিক অভিব্যক্তি হলো বিপ্লবী গণতন্ত্র; অপরদিকে রয়েছে – জাতীয় উদারনৈতিক শহুরে বুর্জোয়ারা। এটি কৃষক আন্দোলনে সবসময়ের ক্ষেত্রেই সত্য। এই আন্দোলন তখনই সফল হতে পারে, যখন তা শহুরে কেন্দ্রগুলোতে নেতৃত্ব খুঁজে পাবে। বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে, তা হতে পারে বুর্জোয়া নেতৃত্ব, অথবা সর্বহারা নেতৃত্ব। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে যে, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের দ্বারা জাতীয় মুক্তির মতো কোনো মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে বুর্জোয়ারা অকার্যকর – আয়ারল্যান্ড যার অন্যতম উদাহরণ।” অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রে এঙ্গেলস বুর্জোয়া গণতন্ত্র থেকে ভিন্ন এক বিপ্লবী গণতন্ত্রের বিষয়টি তুলে ধরেছেন, যে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দিবে সর্বহারাশ্রেণী। পরবর্তীতে, কমরেড মাও সেতুঙ যাকে নয়াগণতন্ত্র বলে তত্ত্বায়ন করেছেন।

ঔপনিবেশিকতা থেকে জাতীয় মুক্তিতে সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্ব সম্পর্কে ১৮৮২ সালে এঙ্গেলস কাউটস্কির নিকট এক চিঠিতে লিখেন, “স্থানীয় অধিবাসীরাই বসবাস করে এমন সব দখলীকৃত দেশ – ভারত, আলজেরিয়া, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ ও স্পেনিয় অধিকৃত দেশগুলো – এদের ভার সাময়িকভাবে সর্বহারাশ্রেণীকে নিতে হবে এবং যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। এ প্রক্রিয়া ঠিক কিভাবে বিকাশ লাভ করবে তা বলাটা মুশকিল। ভারতে হয়তো, প্রকৃতপক্ষেই যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, বিপ্লব করবে এবং নিজের মুক্তির প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত শ্রেণী হিসেবে সর্বহারাশ্রেণী যেহেতু কোনো ঔপনিবেশিক যুদ্ধ করতে পারে না, তাই সেই বিপ্লবকে তার নিজ পথে চলতে দিতে হবে। সব ধরনের ধ্বংস ছাড়া তা এগোতে পারে না। একই কথা আলজেরিয়া বা মিশরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেটাই হবে নিশ্চিতভাবে আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো বিষয়।”

পুঁজিবাদ, তথা সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনকবলিত ঔপনিবেশিক, আধাঔপনিবেশিক বা নয়াঔপনিবেশিক দেশসমূহে এই সর্বহারা বিপ্লব দুটি পর্বে বিভক্ত – নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। প্রথম পর্ব হলো – ঔপনিবেশিক / আধাঔপনিবেশিক / নয়াঔপনিবেশিক ও ফ্যাসিবাদী শোষণ থেকে মুক্ত স্বাধীন ও নয়াগণতান্ত্রিক সমাজ গঠন; আর দ্বিতীয় পর্ব হলো – এই বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক সমাজে রূপান্তর। এই সংগ্রাম পরিচালিত হয় সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে অন্যান্য মেহনতি শ্রেণীসমূহের গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব – নয়াগণতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে পরিচালিত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। যা সাম্যবাদের লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক উৎক্রমণেরই একটি ধাপ; তার থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।

মাও সেতুঙ বলেন, “যদিও প্রথম সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধ এবং অক্টোবর বিপ্লবের পরে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতির কারণে (গ্রিক আগ্রাসনকে হটিয়ে দেওয়াতে বুর্জোয়ার সাফল্য এবং সর্বহারার দুর্বলতা) কামালপন্থী বুর্জোয়া একনায়কত্বের উদ্ভব তুরস্কে ঘটেছিল; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্যের সাফল্যের পর আর কোনো দ্বিতীয় তুরস্ক হতে পারে না, ৪৫ কোটি অধিবাসীর দেশে তো নয়ই। চীনের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে (মিটমাটের ঝোঁকসম্পন্ন বুর্জোয়ার নড়বড়ে অবস্থা এবং বিপ্লবী একাগ্রতাসম্পন্ন সর্বহারার শক্তি), ব্যাপারটা তুরস্কের মতো সহজ কখনোই হয়নি। ১৯২৭ সালে প্রথম মহান বিপ্লব ব্যর্থ হবার পর চীনা বুর্জোয়াশ্রেণীর কিছু সদস্য কি কামালপন্থার গাওনা গায়নি? কিন্তু চীনের কামাল কোথায়? আর চীনের বুর্জোয়া একনায়কত্ব এবং পুঁজিবাদী সমাজই বা কোথায়? এ প্রসঙ্গে এটাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, কামালের তুরস্ককেও শেষ পর্যন্ত ইঙ্গফরাসি সাম্রাজ্যবাদের কোলে আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছিল, আর এভাবে তুরস্ক ক্রমান্বয়ে এক আধাউপনিবেশ এবং প্রতিক্রিয়াশীল সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার অংশে পরিণত হয়েছিল। আজকের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে, উপনিবেশ এবং আধাউপনিবেশের এইসব “বীর”দের হয় সাম্রাজ্যবাদী ফ্রন্টে দাঁড়িয়ে নিজেকে বিশ্বপ্রতিবিপ্লবী শক্তির অংশে পরিণত করতে হবে, না হয় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ফ্রন্টে দাঁড়িয়ে নিজেকে বিশ্ববিপ্লবের শক্তিগুলির অংশে পরিণত করতে হবে। তাদের এদুটির যে কোনো একটিকে বাছতেই হবে, কারণ তৃতীয় কোনো রাস্তা নেই।” (নয়াগণতন্ত্র সম্পর্কে)

১৯৪০ সালের জানুয়ারিতে মাও তত্ত্বায়ন করেন নয়াগণতন্ত্রের থিসিস। এই ঐতিহাসিক রচনায় কমিউনিস্ট আন্দোলনে কিছু মৌলিক সংযোজন এসেছিল, যা ছিল পরিবর্তিত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দাবি। এর আগে পর্যন্ত জাতীয় প্রশ্ন বা জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে প্রধানত বুর্জোয়াদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অংশ হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু এই থিসিসে বলা হয় – ঔপনিবেশিক, আধাঔপনিবেশিক দেশগুলোতে, যেখানে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের পর বুর্জোয়াশ্রেণীর একটা অংশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে, আর অপর অংশটি জাতীয় প্রশ্নে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম নয়, সেখানে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের দায়িত্বটিকেও সর্বহারাশ্রেণীকেই কাঁধে তুলে নিতে হবে। সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে এই বিপ্লবের মিত্রশক্তি হলো – মাঝারি ও ভূমিহীন কৃষক, শহুরে মধ্যশ্রেণীসহ ব্যাপক নিপীড়িত শ্রেণীসমূহ। শত্রুশ্রেণী হলো বুর্জোয়া শাসকশ্রেণী ও সাম্রাজ্যবাদের দালাল শ্রেণীসমূহ। এই গণতন্ত্র হবে বুর্জোয়া গণতন্ত্র থেকে পৃথক – তার রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিও হবে বুর্জোয়া চেতনা থেকে পৃথক। বুর্জোয়া গণতন্ত্র যেমন আদতে বুর্জোয়াশ্রেণীর একনায়কত্ব, তেমনি এই বিপ্লবী গণতন্ত্র হলো সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব। এই বিপ্লবী গণতন্ত্রকে নামকরণ করা হয় – নয়াগণতন্ত্র। আর এই নয়াগণতন্ত্র সাম্যবাদের পথে বিপ্লবী অভিযাত্রা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। তাকে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদে যাওয়ার পূর্ববর্তী ধাপ হিসেবে তত্ত্বায়ন করা হয় এই থিসিসে।

থিসিসে উদ্ধৃতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়, “জাতীয় সমস্যার মূল বিষয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এখন আর সাধারণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ নয়, তা এখন সাধারণ সর্বহারা, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবেরই অংশে পরিণত হয়েছে…” (আত্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে আলোচনার সারসংকলন, ১৯১৬ – লেনিন)। ১৯১৮ সালে অক্টোবর বিপ্লবের প্রথম বার্ষিকীতে এক প্রবন্ধে স্ট্যালিন বলেন, “এই বিপ্লব (অক্টোবর বিপ্লব) জাতীয় সমস্যার পরিধিকে বিস্তৃত করে দিয়েছে – তাকে ইউরোপে জাতীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে আংশিক সমস্যা হতে রূপান্তরিত করেছে সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে নিপীড়িত জাতিসমূহ, উপনিবেশ ও আধাউপনিবেশগুলোর মুক্তির সাধারণ সমস্যায়।”

লেনিন বলেন, “জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য গণতন্ত্র এবং জনগণের শোষক ও নিপীড়কদের বলপ্রয়োগে দমন, অর্থাৎ গণতন্ত্র থেকে বহিস্কার – গণতন্ত্রের এই রূপান্তরই ঘটে পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদে উৎক্রমণের সময়।”

বর্তমান বিশ্বপ্রেক্ষাপটে বুর্জোয়া নেতৃত্বাধীন কোনো জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদের নাগপাশ থেকে নিপীড়িত জাতিসত্তা ও জনগণকে মুক্ত করতে পারে না। কারণ তারা নিজেরাই সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা আবদ্ধ। সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বব্যাপী শোষকব্যবস্থা কায়েম করার মাধ্যমে তার শোষণ প্রক্রিয়াকে যেমন তীব্রতর করে, তেমনি সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দেশগুলোকেও নতুন পন্থায় উপনিবেশে পরিণত করে; যার নাম – নয়াউপনিবেশবাদ; যেখানে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এক দালালবুর্জোয়াশ্রেণীর বিকাশ ঘটায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণী দুর্বল অবস্থায় বিদ্যমান। এর ফলে সাম্রাজ্যবাদের মদতপুষ্ট দালালবুর্জোয়াশ্রেণীই এসময়ের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ধারকবাহকে পরিণত হয়। আর এজন্যই এসময়ে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্বও দিতে হবে সর্বহারাশ্রেণীকে।

নয়াগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে কমরেড মাও আরো বলেন, “জনগণের রাষ্ট্র জনগণকে রক্ষা করে। শুধু জনগণের রাষ্ট্র থাকলেই জনগণ সারা দেশব্যাপী ও সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির দ্বারা নিজেদেরকে শিক্ষিত ও পুনর্গঠিত করতে পারবেন, স্বদেশি ও বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রভাব (যা এখনো খুবই জোরদার, যা দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান থাকবে এবং যাকে দ্রুত বিনাশ করা যায় না) থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারবেন, পুরোনো সমাজ থেকে প্রাপ্ত বদভ্যাস ও খারাপ মতাদর্শ দূর করতে পারবেন, প্রতিক্রিয়াশীলদের দ্বারা নিজেদেরকে বিপথে চালিত হতে দেবেন না এবং অব্যাহতভাবে অগ্রসর হতে থাকবেন – অগ্রসর হতে থাকবেন সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট সমাজের দিকে।” (নয়াগণতন্ত্র সম্পর্কে)

বুর্জোয়া গণতন্ত্র, নয়াগণতন্ত্র, সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র ও পরিপূর্ণ গণতন্ত্রের মাঝে আমাদের সুস্পষ্ট পার্থক্য রেখা টানতে জানতে হবে। বুর্জোয়া সংসদীয় গণতন্ত্র সমাজে বিভাজনকে টিকিয়ে রেখে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানে একটা আপাত সমতাকে তুলে ধরে, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ক্ষমতাসীন থাকে বুর্জোয়াশ্রেণীর একনায়কত্ব। অপরদিকে, নয়াগণতন্ত্রে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয় সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে কৃষক, মধ্যশ্রেণী সহ অন্যান্য উৎপাদক শ্রেণীসমূহের গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব। আর সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রে ক্ষমতাসীন থাকে সর্বহারাশ্রেণীর গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব, যার লক্ষ্য থাকে উপরের সমতাকে নিচুতলা পর্যন্ত প্রসারিত করা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে সেই সমতার প্রতিনিধিত্বমূলক করে তোলা। অর্থাৎ, পুঁজিবাদ যেখানে উৎপাদনের সামাজিকীকরণ করে, কিন্তু উৎপাদনের উপায়সমূহের মালিকানা থাকে বুর্জোয়াশ্রেণীর হাতে; সেখানে সমাজতন্ত্রে উৎপাদনের উপায়সমূহও সামাজিকীকরণ করা হয়। অপরদিকে, কেবলমাত্র সাম্যবাদী শ্রেণীহীন সমাজেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র – যেখানে রাষ্ট্র কার্যকর থাকে না।

চীন বিপ্লবের উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, সেখানে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর জাতীয় বুর্জোয়াদের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে পাঠানো হয় এবং পুঁজিবাদকে সামগ্রিকভাবে উৎখাতের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বুর্জোয়ারা সমাজতন্ত্রের পথে যেতে বাধ্য হয়েছিল এবং সমাজতন্ত্র মেনে নেওয়ার শর্তে তাদের গণতান্ত্রিক সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি, সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণকালেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় শ্রমিককৃষক ছাড়াও পেটিবুর্জোয়া এবং জাতীয় বুর্জোয়াদেরও অংশ ছিল। এই গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব জাতীয় গণতান্ত্রিক চরিত্রের নয়; বরং তা ছিল সমাজতান্ত্রিক চরিত্রের। আর সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব শক্তিশালী হওয়ার কারণেই জনগণের এরূপ গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব কায়েম করা সম্ভব হয়েছিল।

রাশিয়াতেও অক্টোবর বিপ্লবপরবর্তী সময়কালে অনুরূপ উদাহরণ রয়েছে। সেখানকার গণতান্ত্রিক দলগুলো ছিল, মূলত বুর্জোয়াপেটিবুর্জোয়া চরিত্রের। তারা সমাজতন্ত্র মেনে নেওয়ার শর্তে গণতন্ত্র ভোগ করতো, তেমনি জাতীয়পেটিবুর্জোয়ারাও ভোগ করতো। বিপ্লবপরবর্তী সময়ে মেনশেভিক ও বামপন্থী সোস্যালিস্ট রেভল্যুশনারিদের বলশেভিকদের সঙ্গে সরকারে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ১৯১৮ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত সোস্যাল রেভল্যুশনারি পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতায় ক্ষমতাসীন ছিল।

মেনশেভিক বা বামপন্থী সোস্যালিস্ট রেভল্যুশনারি দলগুলো নিজেদের সমাজতান্ত্রিক ও সর্বহারাশ্রেণীর দল বলে প্রচার করলেও, মূলত তারা ছিল পেটিবুর্জোয়াদের সংগঠন। কিন্তু সমাজতন্ত্রকে, বলশেভিক বিপ্লব ও বলশেভিক নেতৃত্বকে মেনে নেওয়ার শর্তে লেনিন তাদেরকে গণতান্ত্রিক সুযোগ দিয়েছিলেন এবং সরকারেও ক্ষমতার অংশ তাদেরকে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তারা ষড়যন্ত্রমূলক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা চালালে তাদের নিষিদ্ধ করা হয়। তখন আর গণতান্ত্রিক সুযোগ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। এরপর তারা সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ প্রক্রিয়া নস্যাৎ করতে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গেই হাত মিলিয়েছিল। রুশ বিপ্লবের এই পর্যায়টি ছিল মূলত নয়াগণতান্ত্রিক ধাঁচের, যেখানে কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয় – যা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি থেকে ভিন্নতর; কিন্তু তা ছিল সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ প্রক্রিয়ার অন্তর্গত এবং অপরিহার্য। তৎকালীন রাশিয়ার আর্থসামাজিক অবস্থার কারণেই এমন বাস্তবতা তৈরী হয়েছিল। এ বিষয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে।

সমাজতন্ত্র বিনির্মাণ প্রক্রিয়ায় জনগণের মধ্যকার দ্বন্দ্বের মীমাংসা করার ক্ষেত্রে মাও সেতুঙ বলেন, “জনগণের মধ্যে ভুল ভাবধারার ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। এই সমস্ত চিন্তা নিষিদ্ধ করে তার প্রকাশের কোনো সুযোগ না দেওয়া ঠিক হবে কি? নিশ্চয়ই নয়। জনগণের মধ্যকার মতাদর্শগত প্রশ্নের সমাধানের ক্ষেত্রে, মানুষের চিন্তাজগতের প্রশ্ন সমাধানের ক্ষেত্রে স্থূল পদ্ধতির প্রয়োগ শুধু নিষ্ফল নয়, রীতিমত ক্ষতিকর। ভুল মতের প্রকাশ নিষিদ্ধ করা যেতে পারে, কিন্তু সেই ভাবধারা থেকেই যাবে।” (জনগণের মধ্যকার দ্বন্দ্বের সঠিক মীমাংসা)

একই রচনায় তিনি আরো বলেন, “শতফুল ফুটতে দেওয়া আর শত রকমের মতবাদকে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে দেওয়ার নীতি – শিল্পকলার বিকাশ এবং বিজ্ঞানের প্রগতির পথ খুলে দেওয়ার কর্মনীতি এবং আমাদের দেশে সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রসার ঘটানোর কর্মনীতি। শিল্পকলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন রূপ আর শৈলীর স্বাধীনভাবে বিকাশ লাভ করা উচিত এবং বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মতবাদের স্বাধীনভাবে প্রতিযোগিতা করা উচিত। আমরা মনে করি, একটা বিশেষ শিল্পশৈলী বা মতবাদকে চাপিয়ে দেওয়ার এবং অন্য শৈলী বা মতবাদকে নিষিদ্ধ করার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা শিল্পকলা আর বিজ্ঞানের বিকাশের পক্ষে ক্ষতিকর হবে।”

এখানে শিল্পকলা বা বৈজ্ঞানিক বিকাশকে শ্রেণীদৃষ্টিভঙ্গীর বাইরে থেকে দেখা হয়নি। বরং জনগণের মাঝে শ্রেণী অবস্থানকে আরো সুদৃঢ় এবং সংগঠিত করার জন্যই এই কথাটি বলা হয়েছে। জনগণের মধ্যকার ভুল চিন্তাকে নিষিদ্ধ করলেও তা থেকে যাবে। তা নিষিদ্ধ করলে বরং জনগণের একাংশ সেই পরিত্যক্ত আবর্জনাকেই লোভনীয় কিছু বলে মনে করতে পারে। আর তাতে জনগণের মাঝে বিভক্তি আর অবিশ্বাসের বীজই কেবল বপন করা হবে। বরং জনগণ যখন নিজে থেকেই সঠিক আর ভুলের পার্থক্য নির্দেশ করবে; তখন জনগণের মাঝে সর্বহারাশ্রেণীর ভিত্তিটিই আরো মজবুত হবে। জনগণের মধ্যে এই গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে অবশ্যই তারা সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লবী পার্টি থেকে, আর পার্টি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

মাও জনগণের মধ্যকার এই গণতন্ত্রের বিষয়টা শুধু তাদের ঐক্যবদ্ধ রাখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখেননি, বরং তার চেয়েও বেশি করে দুটো বিষয় ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি হচ্ছে জনগণের মতাদর্শগত পুনর্গঠনের প্রশ্ন এবং অপরটি হচ্ছে সঠিকতা বা সত্য গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া ও তা নির্ধারণের উপায় সংক্রান্ত প্রশ্ন।

সর্বহারা একনায়কত্বের দুটো দিক – একটা হলো, তা সমাজতন্ত্রের শত্রুদের উপর একনায়কত্ব প্রয়োগ করে; অন্যটা হলো, তা সমাজতন্ত্রের পক্ষের ব্যাপক জনগণের জন্য গণতন্ত্র (সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র) নিশ্চিত করে। এই যে জনগণ সমাজতন্ত্রের পক্ষে, তারা কিন্তু বিভিন্ন ধরনের মতাদর্শে সজ্জিত। তারা অগ্রসর, মাঝারি, পশ্চাদপদে বিভক্ত। মার্ক্সবাদ সম্বন্ধে তাদের ধারণা একেক ধরনের, মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে তারা একেক মাত্রায় ধারণ করে এবং একেক মাত্রায় আয়ত্ত করে। সমাজতন্ত্রকেও তারা একেক মাত্রার মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সহকারে দেখে। সুতরাং এই জনগণের মধ্যে মতাদর্শগত ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে, আর পার্থক্য থাকলে দ্বন্দ্ব অনিবার্য। উপরিকাঠামোর অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো শিল্পসংস্কৃতিবিজ্ঞানেও এই বিভিন্ন মত প্রকাশ পেতে বাধ্য। সেখানেও দ্বন্দ্ব অবশ্যম্ভাবী।

শুধুমাত্র শিল্পকলা বা পদ্ধতিগত প্রশ্নের মতপার্থক্য আকারেই নয়, সমগ্র সমাজতান্ত্রিক পর্যায়কাল জুড়ে এই দ্বন্দ্ব শ্রেণী সংগ্রাম আকারেও থেকে যাবে, মার্ক্সীয় ধারণা ও অমার্ক্সীয় ধারণা আকারেও তা থেকে যাবে। জনগণের মধ্যে এর সমাধান সম্ভব শুধুমাত্র সমালোচনাআত্মসমালোচনা, আলোচনাবিতর্কপর্যালোচনা প্রভৃতির মাধ্যমেই। এবং একমাত্র এভাবেই সম্ভব জনগণের মতাদর্শগত পুনর্গঠন ঘটানো, তাদেরকে ক্রমাগতভাবে বেশি বেশি সংখ্যায় ও বেশি বেশি করে মার্ক্সবাদে টেনে আনা, সমাজতন্ত্রে তাদের সাধারণ স্বীকৃতি ও সাধারণ সমর্থনকে মার্ক্সবাদের প্রতি তাদের সঠিক উপলব্ধি ও আস্থায় পরিণত করা সম্ভব।

সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব যদি জনগণের মতাদর্শগত পুনর্গঠনের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করে, তাহলে বুর্জোয়াদের উপর একনায়কত্ব প্রয়োগ করা হবে অর্থহীন। জনগণের মধ্য থেকেই অতিদ্রুত অসংখ্য নব্যবুর্জোয়ার উদ্ভব ঘটতে থাকবে এবং কমিউনিস্ট পার্টি তার উপর ন্যস্ত ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবে। সর্বহারাশ্রেণীর নিজেকে এবং সমগ্র মানব জাতিকে মুক্ত করার কথা সেক্ষেত্রে কেবল পুস্তকেই থেকে যাবে।

এই বিষয়টির সঙ্গেই জড়িত আরেকটি গুরত্বপূর্ণ বিষয় হলো – মার্ক্সবাদ, তথা সঠিকতা ও সত্যের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ সাধনের প্রশ্ন। বাস্তবে জনগণের মধ্যকার ভুল মতাদর্শের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাধ্যমেও সত্যটা বিকশিত হবে। মার্ক্সবাদ শুধু তার বৈরী শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাধ্যমেই যে বিকশিত হয় তা নয়, বরং জনগণের মধ্যকার অবৈরী কিন্তু অমার্ক্সীয়, অবৈজ্ঞানিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেও তা বিকশিত হবে। এ প্রসঙ্গে মাও বলেন,

যদি নির্ভুল ভাবধারাগুলোকে চারা গাছের মতো উষ্ণ ঘরে আদরযত্নে রেখে দেওয়া হয়, যদি সেগুলো কখনো ঝড়ঝাপ্টার সম্মুখীন না হয় এবং রোগ প্রতিশেধক শক্তি না পায়; তাহলে ভ্রান্তমতের বিরুদ্ধে সেগুলো জয়লাভ করতে পারবে না। সতরাং, একমাত্র আলোচনাসমালোচনা আর যুক্তি দিয়ে বলার পদ্ধতি অবলম্বন করেই আমরা নির্ভুল মতকে বিকশিত করতে পারি, ভ্রান্তমতকে হারাতে পারি এবং বিভিন্ন প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারি।”

জনগণের মধ্যে ‘গণতন্ত্র’ প্রয়োগ করেই প্রতিক্রিয়াশীলদেরকে, জনগণের শত্রুদেরকে জনগণ থেকে চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, প্রতিক্রিয়াশীলরা নিজেদেরকে বেশিদিন আড়াল করতে সক্ষম হতে পারে না। জনগণের মধ্যকার গণতন্ত্রের সুযোগে তাদের প্রতিক্রিয়াশীলতাও দ্রুতই জনগণের সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়তে বাধ্য; আর জনগণ তাদেরকে নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে আরও ভালোভাবে চিনতে ও সমূলে উৎখাত করতে সক্ষম হবে।।

জানুয়ারি ২০১৬

তথ্যসূত্র

১। কার্ল মার্ক্স – ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস, কমিউনিস্ট ইশতেহার

২। কার্ল মার্ক্স, ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ

৩। কার্ল মার্ক্স, গোথা কর্মসূচির সমালোচনা

৪। কার্ল মার্ক্স, পুঁজি

৫। ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস, পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি

৬। ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস, এন্টিড্যুরিং

৭। ভ্লাদিমির লেনিন, রাষ্ট্র ও বিপ্লব

৮। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট (বলশেভিক) পার্টির ইতিহাস

৯। মাও সেতুঙ, নয়াগণতন্ত্র সম্পর্কে

১০। মাও সেতুঙ, জনগণের মধ্যকার দ্বন্দ্বের সঠিক মীমাংসা

১১। আনোয়ার কবীর, মাও সেতুঙ চিন্তাধারার সপক্ষে

১২। শাহেরীন আরাফাত, জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে

১৩। বিবিধ

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s