বদরুদ্দীন উমরের সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে

Posted: অগাষ্ট 9, 2017 in দেশ, মতাদর্শ
ট্যাগসমূহ:, , , ,

লিখেছেন: আহ্‌নাফ আতিফ অনিক

শ্রদ্ধেয় বদরুদ্দীন উমর তার পুরো জীবনটাই ব্যয় করেছেন জনগণের পক্ষের রাজনীতিতে। তাত্ত্বিক ভ্রান্তি থাকলেও তিনি জীবনভর দৃঢ়ভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হিসেবে নিজেকে ধরে রাখতে পেরেছেন। দেশের বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ যখন গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েছেন, তখন তিনি স্রোতের বিপরীতেই থেকেছেন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদসোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ বিরোধী লড়াইয়ে উমর ভাই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাই তার বক্তব্যকে সমালোচনা করতে গিয়ে কখনোই তাকে ব্যক্তিগতভাবে সমালোচনা করা কোনো মার্ক্সবাদী ব্যক্তির কাজ নয়। উমর ভাই কয়েকদিন আগে প্রথম আলোতে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তাতে তিনি সিপিবিকে বাকশালের গর্ভে জন্ম নেয়া পার্টি বলে উল্লেখ করেছেন। দেখা যাচ্ছে, তার এই বক্তব্যকে খণ্ডন না করে সিপিবিপন্থীরা উমর ভাইকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করছেন। তারা বলছেন, উমর ভাই কি করেছেন? হ্যাঁ, এটা একটা প্রশ্ন বটে! কেউ নিজে কিছু না করলে কী জনগণের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া পার্টির সমালোচনা করা যাবে না? উল্লেখ্য, সিপিবির নেতারা তো দাবি করেন, তারা জনগণের অধিকার আদায়ে রাজনীতি করেন। দলটির দলিলেও এমনটা দাবি করা হয়। তবে তাদের সমালোচনা করলেই কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করাটা কিভাবে যৌক্তিক হতে পারে? সিপিবি নিয়ে উমর ভাইয়ের সমালোচনার মীমাংসা করতে হবে লাইনগত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এভাবে উমর ভাইকে আক্রমণ করা সিপিবিপন্থীদের আওয়ামী বামপন্থার শিক্ষা!

যাইহোক, উমর ভাইয়ের সাক্ষাৎকারের সঙ্গে একমত নই। উনি বেশ কিছু জায়গায় খুবই সরলীকরণ করে বক্তব্য রেখেছেন ও নিজের তাত্ত্বিক ভ্রান্তির পরিচয় দিয়েছেন। সেই সব জায়গায় আমার মত তুলে ধরছি।

.

প্রথম আলো : কিন্তু এখানে বামপন্থী রাজনীতি তো প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি।

বদরুদ্দীন উমর : ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কমিউনিস্ট পার্টি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে বিপ্লবের নামে সন্ত্রাসবাদের দিকে চলে গেল, তারপরে সেই সন্ত্রাসবাদের পতন হলো, তারপরে আবার একটা রাজনীতি শুরু হলো, যেটাকে বলে সংসদীয় রাজনীতি। পঞ্চাশের দশকে যখন এসব ঘটছে, তখনো কিন্তু সারা দুনিয়ায় সমাজতন্ত্র নিয়ে আশাউদ্দীপনা ছিল। তারপর স্তালিনের মৃত্যুর পর ক্রুশ্চেভ ভিন্ন পথ নিলেন, তারপর আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভক্ত হলো, দেশে দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভক্ত হয়ে গেল। তাছাড়া চীন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পরে আমেরিকা, পাকিস্তান ইত্যাদি দুনিয়ার যত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করে তাদের সঙ্গে গেল। ফলে আগে চিন্তার ক্ষেত্রে যে শৃঙ্খলা ছিল, সেটা নষ্ট হয়ে গেল। লেনিন তো পরিত্যক্ত হলেনই, এমনকি চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় সব বইপত্র বাদ দিয়ে লাল বই পড়া শুরু হলো, তার ফলে মাও সেতুংয়ের গুরুত্বপূর্ণ লেখাপত্রও পরিত্যাগ করা হলো। চীন বলত যে সশস্ত্রভাবে সংগ্রাম করতে হবে, সেই মতবাদ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রাম বা গেরিলাযুদ্ধ করার মতো প্রকৃত পরিস্থিতি এখানে ছিল না বলে সন্ত্রাসবাদ দেখা দিল। মাও বলেছিলেন, গেরিলারা হলো মাছ আর জনগণ হলো পানি, কিন্তু আমাদের মতো দেশগুলোতে অবস্থা দাঁড়াল পানি ছাড়াই মাছের মতো। এসব করে ভারত উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

মূল্যায়ন

উমর ভাই বলেছেন পার্টি সমাজতন্ত্রের রাজনীতি ছেড়ে দিলো। তার মানে ৪৭এর আগে পার্টি সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি নিতো? আসলে এখানে লাইনগত ভ্রান্তি করলেন তিনি। ১৯৪৭ সালের আগে ভারতীয় উপমহাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বিপ্লবী পার্টি ও বিপ্লবী কর্মসূচি গড়ে তুলতে পারেনি বলেই ব্রিটিশদের ক্ষমতা কংগ্রেসকে হস্তান্তরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল ও কংগ্রেসের মাধ্যমেই স্বাধীনতার এক কল্পিত চিন্তা করেছিল। যা সেই সময়ের পার্টির লাইনের সুবিধাবাদকে নির্দেশ করে। পার্টি যদি এখানে বিপ্লবী ভূমিকা নিতো, তাহলে ভারতীয় উপমহাদেশের চেহারা ভিন্ন হতে পারতোভিন্নভাবে দেখা হতো এ ভূখণ্ডের ইতিহাস।

উমর ভাই বলছেন, ক্রুশ্চেভ ভিন্ন পথ নিলো। ক্রুশ্চেভের সেই ভিন্ন পথ কি ছিল, তা উল্লেখ না করেই উমর ভাই পার্টি বিভক্তির কথা বললেন। পার্টি কেন বিভক্ত হলো তা বললেন না। এখানে তিনি পার্টি বিভক্তির প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নেননি। তিনি বললেন, কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভক্ত হয়ে গেল। কমিউনিস্ট আন্দোলনের এই বিভাজনকে তিনি নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করলেন। তীব্র মতাদর্শিক বিতর্ককে বিভক্তি বলে দিলেন। মতাদর্শিক বিতর্ক এড়িয়ে গেলেন, কার্যত তার বিপক্ষে অবস্থান নিলেন। যে মহাবিতর্ক কিনা পুরো বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিপ্লবী কারা, তা স্পষ্ট করে পার্থক্য করে দিয়েছিল। কিন্তু উমর ভাই ওই সাক্ষাৎকারে মধ্যপন্থী অবস্থান নিয়েছেন

এরপর উমর ভাই বললেন, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পরে চীন, আমেরিকাসহ প্রতিক্রিয়াশীল দুনিয়ার সঙ্গে আপোষ করলো। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পর্কে উমর ভাইয়ের ভ্রান্তিই এখানে প্রকাশ পায়। উমর ভাই কী এটা জানেন না যে, কেন চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব হয়েছিল! চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব আদতে ছিল একটি রাজনৈতিক বিপ্লব। যেই বিপ্লবের মাধ্যমে কমরেড মাও সেতুঙ সমাজতন্ত্রের পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে রেখেছিলেন। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফলেই চীনে সমাজতন্ত্র আরো দশ বছর টিকে ছিল। মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মধ্যদিয়েই মাওবাদের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ভিত্তি গড়ে উঠে। মাওএর মৃত্যুর পরপরই তেং চক্র ক্ষমতা দখল করে পুঁজিবাদে ফিরে যাওয়ার পথে এগোয়। আর এতে চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অপরিহার্যতাই প্রমাণিত হয়।

উমর ভাই চীনের লাল বই পড়াকেও নেতিবাচকভাবে আঘাত করলেন। তিনি বললেন, চীনে মাওর গুরুত্বপূর্ণ লেখা বাদ পড়ে গেল। লাল বই একটা নতুন সমাজ গড়ার, সমাজতন্ত্রে শ্রেণী সংগ্রামের মৌলিক লাইনগত ও আদর্শগত ভিত্তি তুলে ধরেছিল। কিন্তু মাও শুধু নিজের লেখা নয়, মৌলিক মতাদর্শিক বই পড়ার ওপর জোর দিয়েছেন। যা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের একাধিক দলিলে দেখা গেছে। কিন্তু উমর ভাই লাল বইকেই প্রধান কারণ হিসেবে নিয়ে আসলেন। এভাবে তিনি সম্পূর্ণভাবে কমরেড মাও সেতুঙ সূচীত মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে আঘাত করলেন।

উমর ভাই বললেন, চীন সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলতো। আসলেই চীন সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলতো। মার্ক্সবাদ কোন অহিংস মতবাদ নয়। বাস্তবে কোনো আন্দোলনই শেষ বিচারে নিরস্ত্র থাকতে পারে না। রুশ বিপ্লবও ছিল একটি সশস্ত্র গণঅভ্যূত্থান। তাহলে সশস্ত্র সংগ্রাম ভুল, এমন তত্ত্ব উমর ভাই কোথায় পেলেন?? অন্যদিকে উমর ভাই এখানে আবারো ছেলে ভুলানো গল্পের মত কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিপ্লবী ধারাকে খারিজ করে দিলেন। যেমনটা বর্তমান ভারত রাষ্ট্র ভগৎ সিং, সুখ দেব, রাজ গুরু, চন্দ্র শেখর আজাদদের সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দেয়। ঠিক সেভাবেই বদরুদ্দীন উমর এখানে বিপ্লবীদের অবদান ও ইতিবাচক দিককে খারিজ করে দিলেন। তিনি তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকাণ্ডকে খণ্ডন করলেন না। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের আলোকে ইতিহাসকে সারসংকলন না করে নিজের ভ্রান্ত অবস্থান দ্বারা একপেশেভাবে বিপ্লবীদের খারিজ করে দিলেন, যা আসলে বিলোপবাদ।

.

প্রথম আলো : রাশিয়া ও চীনে বিপ্লব হয়েছে, ভারতে হলো না কেন?

বদরুদ্দীন উমর : রাশিয়া ও চীনে শ্রমিক ও কৃষকদের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির যে ভিত্তি ছিল, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে তা ছিল না। এখানে পার্টিতে মধ্যশ্রেণির প্রাধান্য ছিল। শ্রমিক ও কৃষকের আন্দোলনগুলোর মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের কোনো লক্ষ্য, রণনীতি ও কর্মসূচি কমিউনিস্ট পার্টির ছিল না। কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশদের তাড়িয়ে নিজেরা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করবে এমন কথা কখনো উচ্চারণ করেনি। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হবেএটা ধরে নিয়েই রাজনীতি করেছিল। অর্থাৎ কৃষকশ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টি নয়, ভারতীয় বুর্জোয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্যই তারা কাজ করেছিল। দ্বিতীয়ত, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বিপ্লব করার পরিবর্তে সন্ত্রাসবাদের দিকে চলে যাওয়া। তৃতীয়ত, নির্বাচনভিত্তিক রাজনীতির কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করা। সংসদীয় রাজনীতি ও নির্বাচন ভারতবর্ষের রাজনীতির প্রকৃতিতে একটা বড় পরিবর্তন ঘটাল। একের পর এক নির্বাচন হতে লাগল, সেসব নির্বাচনে কমিউনিস্টরা অংশ নিতে লাগলেন, ফলে কমিউনিস্ট রাজনীতি সংসদীয় রাজনীতির কাঠামোর মধ্যে ঢুকে গেল। এই কাঠামোতে কমিউনিস্টদের প্রতিদ্বন্দ্বী তো কোনো বিপ্লবী শক্তি নয়, তারা অন্যান্য সংসদীয় রাজনৈতিক দল, যাদের মূল চরিত্র বুর্জোয়া। কাজেই কমিউনিস্টরা আসলে ভারতের বুর্জোয়া শ্রেণির বাম অংশ হিসেবে নেমে পড়লেন।”

মূল্যায়ন

এখানে বদরুদ্দীন উমর এসে বললেন যে, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে মধ্যশ্রেনী প্রাধান্য ছিল। কিন্তু আমরা জানি যে, ব্যক্তি পার্টির অধীন থাকে। আবার পার্টির মতাদর্শিক লাইন নেতৃত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে। যখন তা করে না, তখন আর সেই পার্টি প্রকৃত অর্থে কমিউনিস্ট পার্টি থাকে না। তাহলে এখানে পরিষ্কারভাবে তিনি উল্লেখ করলেন না যে পার্টির লাইন ভুল ছিল। উনি নেতৃত্বকে দোষারোপ করলেন প্রধানভাবে। পার্টির ভুলগুলোকে লাইনগতভাবে উপস্থাপন করাটা জরুরি। ব্যক্তি রণদীভের বা ব্যক্তি জ্যোতি বসুর চেয়ে তাদের লাইন কি ছিল, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যশ্রেণী থেকে আসলেই যে সে শ্রেণীচ্যুত হতে পারে না, তা সঠিক নয়। মার্ক্সলেনিনমাও কেউই শ্রমিকশ্রেণীর ঘরে জন্মাননি। বরং তারা সেই শ্রেণী থেকে চ্যুত হয়ে শ্রমিকশ্রেণীর নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, নয়াগণতান্ত্রিক স্তরে কমিউনিস্ট পার্টিতেও যে মধ্যবিত্ত, পেটিবুর্জোয়া চরিত্রের কমরেডরা থাকবে, বা থাকতে পারে, এ বিষয়টা কিন্তু মাও তার বিপ্লব পরবর্তী লেখাগুলোতে খুব স্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছেন। তাই আমাদের মতো সমাজে বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টিতে নিখাদ শ্রেণী খুঁজতে যাওয়াটা বিশুদ্ধতাবাদী চিন্তা। এখানকার কোনো কোনো গ্রুপ, যারা কমিউনিস্ট পার্টি ছিল না ও নাই বলে জীবনভর ভ্রান্ত্রিতে কাটায়, তারাই এমন ভ্রান্তি লালন করে চলেছে

শ্রদ্ধেয় বদরুদ্দীন উমর ওই সাক্ষাৎকারে বিপ্পবী লাইন ও সংসদীয় লাইনকে এক করে গুলিয়ে ফেললেন। তিনি সংসদীয় ধারা ও বিপ্লবী ধারাকে এক কাতারে মেপে খারিজ করলেন। এখানেও তিনি লাইনগত ভ্রান্তির পরিচয় দিলেন। যেন সশস্ত্র সংগ্রাম ও সংসদীয় ধারা আকাশ থেকে পড়েছিল! তাদের কোনো তাত্ত্বিক অবস্থান ছিল না! তিনি উল্লেখ করলেন, “কমিউনিস্টরা নির্বাচনে অংশ নিলো আর কমিউনিস্ট রাজনীতি সংসদীয় রাজনীতিতে ডুবে গেল।” এটা ভীষণ খামখেয়ালীপূর্ণ বক্তব্য।

এখানে তিনি নির্বাচনে অংশ নেয়া পার্টিকে কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে উল্লেখ করছেন। উমর ভাই এখানে সংসদীয় কমিউনিস্ট নামধারীদের কথাই উল্লেখ করলেন, কিন্তু এর বিপরীতে যে সিপিআই (এমএল), এমসিসিআইএর মতো গ্রুপ নিজেদের সংগঠিত করছিল, তাকে তিনি এড়িয়ে গেলেন। আর তা ভুলবশত নয়। কারণ, কয়েক মাস আগে উমর ভাই সংস্কৃতি পত্রিকায় এক লেখায় ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করেন। সেখানে তিনি কিন্তু চারু মজুমদার (সিএম) বা এ সময়ের মাওবাদী আন্দোলনকে স্থান দেননি। তিনি কমিউনিস্ট বলতে সিপিআই, সিপিএমএর মতো সংসদীয় সংশোধনবাদীদের কথাই উল্লেখ করেছেন। যা উমর ভাইয়ের চিন্তার ভ্রান্তি অথবা সীমাবদ্ধতা।

.

প্রথম আলো : তাহলে কেন যোগ দিয়েছিলেন?

বদরুদ্দীন উমর : কারণ, সেই সময় ওটার চেয়ে ভালো আর কিছু ছিল না। যাই হোক, তত দিনে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভক্ত হয়ে গেছে। তবু পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট আন্দোলন অনেকটা দাঁড়িয়ে ছিল; কিন্তু বাংলাদেশ হওয়ার পরে তাও আর থাকল না। একাত্তর সালে কমিউনিস্টদের বিরাট নির্বুদ্ধিতার কারণে ভীষণ ক্ষতি হলো। মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি তো আওয়ামী লীগের ভেতরে ঢুকে গেল; আর পিকিংপন্থী বলে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কাণ্ডজ্ঞান কিছু ছিল বলে তো মনে হয় না। আমি তো পিকিংপন্থীদের সঙ্গে ছিলাম, একাত্তর সালে আমি তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে দেখেছি, দেশের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণাই নেই। তাঁরা মাও সেতুংয়ের যুক্তফ্রন্টের কথা বলতেন, কিন্তু আমাদের এখানে এ রকম একটা যুদ্ধের সময় যেখানে যাঁরা আছেন, সবাইকে নিয়ে যে একটা যুক্তফ্রন্ট গঠন করা দরকার, এই বিষয়টা গুরুত্ব পেল না। অবশ্য প্রথমে এ রকম একটা সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে সবার সঙ্গে মিলে কাজ করা হবে, এমনকি আওয়ামী লীগের সঙ্গেও; মাওলানা ভাসানীও একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর ১৪ এপ্রিল চৌ এন লাইয়ের যে বার্তাটা এল, তাতে তিনি বললেন যে পূর্ব পাকিস্তানে যে লড়াই চলছে, সেটা কতিপয় বিচ্ছিন্নতাবাদীর কাজ, পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ একসঙ্গে থাকতে চায় এবং পাকিস্তান অখণ্ড থাকলেই পাকিস্তানের জনগণের সমৃদ্ধি ঘটবে। তাদের তো এই কথা বলার এখতিয়ার ছিল না। আমি তখন যশোরের একটা গ্রামে ছিলাম, শোনার পরে তাড়াতাড়ি ঢাকায় ছুটে এলাম, এসে দেখি সর্বনাশ হয়ে গেছে। প্রথম দিকে যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেটা দেখলাম একদম উল্টে গেছে। বলা হলো এখন আওয়ামী লীগকে শত্রু মনে করতে হবে; দুই কুকুরের লড়াই আরম্ভ হয়ে গেছে। আমার সঙ্গে সেই সময় পার্টির দ্বন্দ্ব আরম্ভ হয়। ডিসেম্বরে আমি পার্টি থেকে ইস্তফা দিলাম।”

মূল্যায়ন

এখানে বদরুদ্দীন উমর পিকিংপন্থীদের ঢালাওভাবে কাণ্ডজ্ঞানহীনবলে দিলেন! এভাবে একটা বিপ্লবী ধারাকে তার সামগ্রিক পর্যালোচনা ব্যতীত কাণ্ডজ্ঞানহীনবলাটা তাত্ত্বিকভাবে এক ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীনতা। এখানে তিনি ১৯৭১ সালে চীনপন্থীদের দেশের অবস্থা সম্পর্কে কোনো জ্ঞান ছিল না বলে দাবি করেছেন। অথচ কমরেড সিরাজ সিকদারসহ ঐকবদ্ধভাবে না হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পিকিংপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন ও জনগণের সঙ্গে মিশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও ভারতীয় আগ্রাসনকে মোকাবিলা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে কমরেড সিরাজ সিকদারএর দলের নেতা কমরেড সামিউল্লাহ আজমী তাহের বাংলাদেশের পতাকার ডিজাইন করেছিলেন। পরবর্তীতে যা আওয়ামীলীগ চুরি করে নিজেদের নামে চালিয়ে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে কমরেড সিরাজ সিকদারএর দল পেয়ারা বাগানসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় জনগণের সঙ্গে মিশে মুক্তিযুদ্ধকে জনযুদ্ধে রূপান্তরিত করতে চেষ্টা করেছেন। সিরাজ সিকদারএর দলের অগণিত নেতাকর্মী যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে কমরেড মতিনআলাউদ্দিনটিপুরা উত্তরবঙ্গে পাকিস্তানী বাহিনীকে প্রতিরোধ করেছেন। দক্ষিদিকে বৃহত্তর খুলনায় নূর মোহাম্মদের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। তারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে কমরেড সিরাজ সিকদার আওয়ামীলীগসহ যুক্তফ্রন্ট গঠনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আওয়ামীলীগ সেটাতে মাথা দেয়নি। পাকিস্তানের সঙ্গে দেন দরবার চালিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেই আবারো সিরাজ সিকদার আওয়ামীলীগের সঙ্গে আলোচনা চালাতে চেয়েছেন, কিন্তু আলোচনার নাম করে ডেকে নিয়ে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির দ্বিতীয় প্রধান নেতাসহ পাঁচ জনকে হত্যা করে আওয়ামীলীগ। যুক্তফ্রন্ট বা যৌথ মুক্তিযুদ্ধের চিন্তা তখন ভেস্তে যায়।

উমর ভাই দুই কুকুর তত্ত্ব নিয়ে বলতে গিয়ে টাইমলাইন গুলিয়ে ফেলেছেন। শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণের প্রতিক্রিয়া আকারেই ৮ মার্চ ১৯৭১ তারিখে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) পক্ষ থেকে দলিলটি লেখা হয়, যা মুক্তিযুদ্ধ শীর্ষক দলীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১১ মার্চ ১৯৭১ তারিখে

এখানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) দুই কুকুরের দলিল খ্যাত দলিলটি থেকে একাংশ উদ্ধৃত করা হলো। প্রসঙ্গত দলিলটি সম্পর্কে আমার ভিন্ন অবস্থান রয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, ইয়াহিয়া, ভুট্টো প্রভৃতির সহিত শেখ মুজিবের লড়াই হইলঃ পূর্ব বাংলার বাজারকে লুটপাট ও ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা লইয়া মার্কিনের পাচাটা দুই কুকুরের মধ্যে লড়াই। ইয়াহিয়াভুট্টোরা হইল, মার্কিনের পদলেহী বড় ধনিক, পাঞ্জাবী ধনিক ও জমিদারদের প্রতিনিধি। তাহারা মার্কিনের ছত্রছায়ায় বন্দুকের জোরে পূর্ব বাংলার বাজারকে দখলে রাখিতে চায়। আর শেখ মুজিব মার্কিনের ছত্রছায়ায় পূর্ব বাংলার বাজারকে মার্কিনের পদলেহী বাঙ্গালী ধনিক ও জোতদার মহাজনদের দখলে আনিতে চায়। পূর্ব বাংলার বাজার, তথা শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত মেহনতী জনতাকে অবাধে লুটপাট করিবার জন্যই শেখ মুজিব দাবী তুলিয়াছেনঃ আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক।

এইভাবে, পূর্ব বাংলার বাজার ও জনগণকে লুণ্ঠন এবং ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা লইয়া মার্কিনের পাচাটা দুই কুকুরের মধ্যে একদিকে চলিতেছে আপোষ প্রচেষ্টা; অন্যদিকে চলিতেছে চক্রান্ত, দরকষাকষি, চাপ সৃষ্টি এবং কামড়াকামড়ি। জনগণের দুশমন এই দুই কুকুরের মধ্যে কামড়াকামড়ির ফলেই ইয়াহিয়া তাহারই তৈরী জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে, আর শেখ মুজিব একদিকে ঘোষণা করেন অহিংস অসহযোগ আন্দোলন, আর অন্যদিকে, মার্কিন ও তার পদলেহী বাঙ্গালী শোষকদের স্বার্থ জনগণের দৃষ্টির আড়ালে রাখা এবং এই দুশমন শোষকদের স্বার্থে জনগণকে সমাবেশ করিবার জন্য তিনি জনগণের স্বাধীনতা ও মুক্তির, বাংলাদেশের স্বাধীনতার আওয়াজ লইয়া জনগণের দুয়ারে হাজির হইয়াছেন

১৪ এপ্রিল চৌ এন লাইয়ের যে বার্তাটা এলো কিন্তু উমর ভাইয়ের কথায় মনে হবে যেন, এর পরই কথিত দুই কুকুর তত্ত্ব এসেছে। কিন্তু ইপিসিপি (এমএল) দলিলটি তার এক মাসেরও বেশি সময় আগের। আর এতে উমর ভাইয়ের বিভ্রান্তিটাই স্পষ্ট হয়েছে। অথবা বয়সের কারণেও তিনি গুলিয়ে ফেলতে পারেন!

ষাটের দশক থেকেই যে কমিউনিস্টরা স্বাধীনতার দাবি সামনে আনছিলো, তাও উমর ভাই এড়িয়ে গেছেন। উপরন্তু বিচ্যুতি থাকলেও বিপ্লবীদের সেই সংগ্রামকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে আখ্যা দিয়েছেন। আর এতে তার চিন্তা অসাড়তা প্রকাশ পেয়েছে। অথবা তিনি সশস্ত্র বিপ্লবী লাইনের সংগ্রামকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন।

যুদ্ধের শেষ দিকে যখন ভারত বাংলাদেশে আগ্রাসন চালায়, তখন চীনপন্থীরা ভারত ও পাকিস্তান এবং দেশের অভ্যন্তরের প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে ত্রিমূখী লড়াই চালান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন পিকিংপন্থীদের মধ্যে যুদ্ধ প্রশ্নে ঐক্যে সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিলো, তখনি ভারত বাংলাদেশের যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে ক্ষমতা দখল করে আওয়ামীলীগকে পুতুল সরকার হিসেবে বসায়।

এভাবে ঢালাওভাবে পিকিংপন্থীদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হিসেবে হাজির করার মানে হলো, প্রতিক্রিয়াশীলদের মতোই বক্তব্য দেওয়া, দালাল বুর্জোয়াদের বক্তব্যকে বৈধতা দেওয়া, তাদের বানোয়াট মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বৈধতা দেওয়া এবং কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে প্রচারণায় সমর্থন যোগানো। বদরুদ্দীন উমর সামগ্রিকভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে মূল্যায়ন না করে তকমা লাগিয়ে দিলেন। পার্টিগুলোর বিপ্পবী ভূমিকাকে বাদ দিয়ে দিলেন।

অন্যদিকে, চীন কেন সেসময়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ায়নি, এটাও ঢালাওভাবে বলাটা এবং তিনি যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা বুর্জোয়াদের প্রচারণার মতোই। তিনি পার্টি থেকে ইস্তফা দিয়েই দায় সারলেন। পার্টির ভেতরে আন্তঃসংগ্রাম চালালেন না। যদিও তিনি এখানে উল্লেখ করেন নাই যে, তখনকার পার্টি প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে গিয়েছিল কিনা! সেটা হলে ভিন্ন কথা ছিল। আর যতক্ষণ না প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে যায়, ততক্ষণ পার্টির ভেতরে সংগ্রাম চালানো বিপ্লবীদের অবশ্য কর্তব্য।

.

প্রথম আলো : সিপিবি ছাড়াও তো অনেক বামপন্থী দল আছে, তাদের অবস্থা কী?

বদরুদ্দীন উমর : ছোট ছোট বাম দলের ব্যাপারে মুশকিল হচ্ছে, এখানে লেনিনের সংখ্যা খুব বেশি হয়ে গেছে। এমনকি ছাত্রছাত্রীদের যে ছোট ছোট স্টাডি সার্কল আছে, তাদের প্রত্যেকেই মনে করে, এ দেশে কোনো কমিউনিস্ট আন্দোলন নেই; কিছু লোক বলে, এ দেশে কোনো দিন কোনো কমিউনিস্ট আন্দোলন ছিল না ইত্যাদি; এবং প্রত্যেকেই মনে করে যে সে লেনিন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কেউ হয়তো একটা ছোট দল করে, কেউ হয়তো দুইদশজন নিয়ে আন্দোলন করে; কিন্তু তারা সবাই যে একসঙ্গে কাজ করবে বা এ ধরনের কোনো চিন্তা করবে—এটা নেই। কাজেই তারা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু মার্ক্সবাদী সাহিত্যচর্চা করে, পত্রিকা বের করে ইত্যাদি করে। কিন্তু আসলে কোনো বিপ্লবের চিন্তা এখানে দেখাই যায় না।” 

মূল্যায়ন

এখানেও উমর ভাই রাজনৈতিক লাইনকে প্রাধান্য না দিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বক্তব্যকে সামনে নিয়ে আসলেন। পার্টিতে লেনিনএর সংখ্যা বেশি হলো, না মাওএর সংখ্যা বেশি হলো, এভাবে না বলে বলা দরকার ছিল তাদের লাইন সঠিক নয়। লাইনগতভাবে বেশিরভাগ বাম দল হলো সংশোধনবাদী ও দালাল বুর্জোয়াদের লেজুড়। তারা এর থেকে বের হয়ে আসতে পারে না বলেই বিপ্লবী শক্তি দাঁড়ায় না। আর কার্যত লেনিন বা মাওএর মতো ডাইনামিক চরিত্রের নেতৃত্ব তো এখন আরো বেশি জরুরি। আর বাস্তবে লেনিনএর সংখ্যা যদি বেশি হতো, তাহলে তো বিপ্লবী তত্ত্ব ও তার প্রয়োগ উমর ভাইয়ের জীবদ্দশাতেই ঘটে যেতে পারে বলে মনে হচ্ছে।

বিপ্লবের চিন্তা আকাশ থেকে পড়ে না। বিপ্লবী চিন্তা হলো বিপ্লবী লাইন ও বিপ্লবী অনুশীলনের ফল। ব্যক্তি কত ভালো নাকি মন্দ তার থেকে বড় প্রশ্ন হলো, সেই ব্যক্তিটি কোন লাইনকে সঠিক মনে করছেন।

কোনো বিপ্লবের চিন্তা এখানে দেখাই যায় না বলে কার্যত তিনি নিজেকেসহ সবাইকে খারিজ করেছেন। আজীবন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে থাকা একজন মানুষের কাছ থেকে এমন হতাশাবাদ শোনাটা বরাবরই দুঃখজনক। আর এমন হঠকারী বক্তব্য কোনো মার্ক্সবাদী তো দূরের কথা, গণতান্ত্রিক চিন্তার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

শ্রদ্ধেয় বদরুদ্দীন উমর তার পুরো সাক্ষাৎকার জুড়েই মতাদর্শগতভাবে খন্ডণ করার চেয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে পুরো কমিউনিস্ট আন্দোলনকে দেখেছেন। সেটা করতে গিয়ে তিনি দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী অবস্থান থেকে সরে এসে ভাসাভাসা মন্তব্য করেছেন। যা আন্তরিক বিপ্লবী কর্মীরা তার কাছে আশা করে না। কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসকে সঠিকভাবে না দেখলে আজকের দিনে এসেও যে সঠিক অবস্থান নেয়া যায় না, তা তার বক্তব্যের এক তরফা হতাশাবাদ থেকে বোঝা যায়। এটা সত্য যে উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সারসংকলন আমাদের সঠিক মার্ক্সবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেই করতে হবে। অতীতের ভুলগুলোকে পরিহার করতে হবে। এদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে। আর তাই অতীতের ইতিবাচকতাকে অবশ্যই ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে।।

Advertisements
মন্তব্য
  1. shahjahan sarker বলেছেন:

    লেখাটির ওপর মতামত আরো আগে দেয়া উচিত ছিল।সময় করে তা পারিনি বলে দুঃখিত। কোন ভুল মত খণ্ডন করা খুব অধ্যাবসায়ের বিষয়। বিশেষ করে সঠিক তথ্য, তত্ত্ব বা মতাদর্শের (মার্কসবাদ সম্মত)ভিত্তিতে সঠিক মত হাজির করাটা গভীর অনুশীলন ও অধ্যয়ন ছাড়া সম্ভব নয়।এ-সব বিচারে বর্তমান লেখাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।উমর সাব-এর কাণ্ডজ্ঞানহীন সাক্ষাৎকারটি আওয়ামী ঘরানার লোকেদের সন্তুষ্ট করা এবং গা বাঁচানো বলে সন্দেহ নেই। আর এ নির্লজ্জ বক্তব্য এসেছে তাঁর চরম সংশোধনবাদী মতাবস্থান থেকে। আজকের যুগে মার্কসবাদের বিকাশ লেনিনবাদ-মাওবাদকে গভীরভাবে গ্রহণ না করার মধ্যে জনাব উমরের বক্তব্য অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়েছে। এ থেকে উমর সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে সাহিত্যান্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন। ওটা বোঝার মতো কোন প্রচেষ্টাও উমর করেছেন বলে মনে হয় না।সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে বোঝার চেষ্টা করলে উমর অমন স্থুল বক্তব্য হাজির করতে গিয়ে নিজেই বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তেন। অর্থাৎ উমর সাব সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে সঠিক-বেঠিক কী মনে করেন, সে কথাতো দূরে থাক—সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পর্কে তাঁর উপস্থাপিত তথ্য একেবারে কাঁচা আর বালকসুলভ।
    এ-ধরনের মতাবস্থান এবং হালকা-হালকা মার্কসবাদ অধ্যয়ন থেকে ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট আন্দোলন সম্পর্কে কথা বলা কতটা যে বিভ্রান্তিকর হতে পারে, তা উমর ভাবতে রাজি নন।সাংস্কৃতিক বিপ্লব, মুক্তিযুদ্ধ, চৌ এন লাই-এর চিঠি যুক্তফ্রন্ট ইত্যাদি বিষয়গুলি গুলিয়ে ফেলা বয়সের ভারের কীর্তি নয়, ভাসাভাসাভাবে বিপ্লব করা আর আঁকড়ে ধরে মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-স্ট্যালিন-মাও-এর মতো করে বিপ্লবী মনোভাব ও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা সে-তো ভিন্ন জিনিস। উমর প্রথমটাতে সন্তুষ্ট। ’৭১-এর ডিসেম্বরের দিকে দল থেকে সহসাই পদত্যাগ করার কোন সন্তোষজনক কারণ না দর্শানো-র বিষয়টি আলোচিত নিবন্ধটিতে ভালভাবেই এসেছে।বৃহত্তর খুলনায় নূর মোহাম্মদের নেতৃত্বে যে বিশাল মুক্তিযুদ্ধ চলেছিল, এগুলো কি দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি ছিল? নূর মোহাম্মদ তখন ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সামরিক প্রধান। হক সাহেব ছিলেন সে পার্টির মূখ্য নেতা। উমর-ও ছিলেন সে পার্টির অন্যতম নেতা। তারপরেও হক সাহেবের ভূমিকার সাথে নূর মোহাম্মদের মুক্তিযুদ্ধের কোন বিরোধ ছিল কি-না, এবং তার কোনটিতে তাঁর সমর্থন ছিল—এ সম্পর্কে পাঠক কিছুই জানতে পারলেন না। মাঝখানে দুই কুত্তার কামড়াকামড়ি প্রসঙ্গ তুলে কমিউনিস্ট মতাদর্শী ও তৎকালিন পিকিংপন্থী শ্রদ্ধেয় নূর মোহাম্মদ-এর মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা আড়ালে পড়ে গেল। আড়ালে ঢেকে দেয়া হলো মাওবাদী নেতা সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ ও তাঁর সহযোদ্ধাদের জীবনদান এবং আত্মত্যাগ।আর উমর সাহেব তা মূর্ত না করে বা তুলে না ধরে ‘সর্বনাশ’ হয়েছে বলে পার্টিতে ইস্তফা দিলেন, এটা কোন ধরনের দায়দায়িত্ব? কোন ধরনের বিপ্লব চর্চা? ইস্তফায় তাঁর একান্ত অধিকার থাকলেও, তখনকার তাঁর পার্টির ইতিবাচক ভূমিকা, পার্টির মধ্যকার বিরোধগুলো-তো তিনি স্পষ্ট করবেন—তা না করে নতুন প্রজন্মের নিকট বিষয়টা হাজির করলেন খেলো ভাবে! আওয়ামী লীগপন্থী নেতা-কর্মীদের নিকটও কমিউনিস্ট বা কমিউনিস্টমতালম্বীদের ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে প্রশংসনীয় ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করে তুললেন।
    সংগত কারণে, প্রগতিবাদী কবি দাউদ হায়দারের ভাই আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবী জাহিদ হায়দার পরের দিন সম্ভবত ২৪ জুলাই প্রথম আলোয় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বললেন, “বদরুদ্দিন উমর জানেন কি-না জানি না, তবে আমার মনে আছে : “মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধ করতে যাওয়ার পথে কিংবা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে আসার পর অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে পিকিংপন্থীরা ‘কুকুরের মতো গুলি করে মেরেছে।” উমরের মতো জাহিদ হায়দারও কোনরূপ তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই ভাসাভাসা বক্তব্য দিয়ে দায় সারলেন। ঘটনার সত্যতা আংশিক থাকতেও পারে।কারণ ভারতকে আন্তর্জাতিক মিত্র করে ভারতনির্ভর মুক্তিযুদ্ধকে তৎকালিন ‘পিকিংপন্থীরা’ বিরোধীতা করেছেন।এ প্রক্রিয়ায় এমন অনাকাঙ্খিত একতরফা ঘটনা সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু পিকিংপন্থী কথার ছাপে খোদ সমাজতান্ত্রিক চীনকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেতনা জাহিদ হায়দারের মতো ব. উমরকেও সন্তুষ্ট করেছে কি-না জানি না। উমর সাহেব এ নিয়ে বাদ-প্রতিবাদও করেননি। ঘটনার সত্যতা থাকলে আত্ম-সমালোচনা করে এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেছেন বলে মনে হয় না। এই হচ্ছে বিপ্লব ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি উমরের ভাবমানস। আর এর দায় দায়িত্ব ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে তৎকালিন পিকিংপন্থী প্রকৃত বিপ্লবী ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি, যারা বরিশালের পেয়ারা বাগানে, বৃহত্তর খুলনায় এবং রাজশাহীতে আত্মনির্ভরশীল মুক্তিযুদ্ধ গড়ে তুলেছিলেন। যদিও শেষে অহিদুর রহমান ভারতে আশ্রয় নিয়ে বিচ্যুতির দিকে গড়িয়েছিলেন।
    বদরুদ্দীন উমর বক্তব্য আর জাহিদ হায়দারের প্রতিক্রিয়া একই উদ্দেশ্য হাসিল করেছে।এবং মুক্তিযুদ্ধে প্রকৃত বিপ্লবীদের ভূমিকা ও আত্মদানকে আড়াল করেছে।
    আহনাফ আতিক অনিককে ধন্যবাদ বিষয়টি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করায়।

    • shahjahan sarker বলেছেন:

      উপরের অলোচনায় নীচ থেকে ৪ লাইনে ওহিদুর রহমান হবে। অহিদুর নয়।

    • shahjahan sarker বলেছেন:

      ’যদিও শেষে অহিদুর রহমান ভারতে আশ্রয় নিয়ে বিচ্যুতির দিকে গড়িয়েছিলেন।’ –আমার এ তথ্যে ভুল থেকে গিয়েছে। দয়াকরে লাইনটি মুছে দেবেন। এ স্থলে হবে– ওহিদুর রহমান তাঁর লেখা ’’মুক্তি সংগ্রামে আত্রাই’’ গ্রন্থে বলেছেন, …আমরা রাজশাহী জেলার কমরেডরা ’দুই কুকুরের লড়াই’ তত্ত্বটি প্রত্যাখ্যান করে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি থেকে পদত্যাগ করে রাজশাহী আঞ্চলিক কমিউনিস্ট পার্টি নাম ধারণ করে স্থানীয়ভাবে মুক্তিবাহিনী গড়ে তুলি।

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s