লিখেছেন: কামরুল ইসলাম ঝড়ো

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সোভিয়েত সরকারের আমন্ত্রণে ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া গিয়েছিলেন। প্রথম মহাযুদ্ধের পর রাশিয়ার সামাজিক বিপ্লব এবং তাদের কর্মযজ্ঞ দেখে তিনি অভিভূত হন। এ সময় তিনি লেখেন: “… আপাতত রাশিয়ায় এসেছিনা এলে এ জন্মের তীর্থদর্শন অত্যন্ত অসমাপ্ত থাকত। এখানে এরা যা কাণ্ড করছে তার ভালোমন্দ বিচার করবার পূর্বে সর্বপ্রথমেই মনে হয়, কী অসম্ভব সাহস। সনাতন বলে পদার্থটা মানুষের অস্থিমজ্জায় মনেপ্রাণে হাজারখানা হয়ে আঁকড়ে আছে; তার কত দিকে কত মহল, কত দরজায় কত পাহারা, কত যুগ থেকে কত ট্যাক্‌সো আদায় করে তার তহবিল হয়ে উঠেছে পর্বতপ্রমাণ। এরা তাকে একেবারে জটে ধরে টান মেরেছে; ভয় ভাবনা সংশয় কিছু মনে নেই। সনাতনের গদি দিয়েছে ঝাঁটিয়ে, নূতনের জন্যে একেবারে নূতন আসন বানিয়ে দিলে। পশ্চিম মহাদেশ বিজ্ঞানের জাদুবলে দুঃসাধ্য সাধন করে, দেখে মনে মনে তারিফ করি। কিন্তু এখানে যে প্রকাণ্ড ব্যাপার চলছে সেটা দেখে আমি সব চেয়ে বেশি বিস্মিত হয়েছি। শুধু যদি একটা ভীষণ ভাঙচুরের কাণ্ড হত তাতে তেমন আশ্চর্য হতুম নাকেননা নাস্তানাবুদ করবার শক্তি এদের যথেষ্ট আছেকিন্তু দেখতে পাচ্ছি, বহুদূরব্যাপী একটা ক্ষেত্র নিয়ে এরা একটা নূতন জগৎ গড়ে তুলতে কোমর বেঁধে লেগে গেছে। দেরি সইছে না; কেননা জগৎ জুড়ে এদের প্রতিকূলতা, সবাই এদের বিরোধী—যত শীঘ্র পারে এদের খাড়া হয়ে দাঁড়াতে হবেহাতে হাতে প্রমাণ করে দিতে হবে, এরা যেটা চাচ্ছে সেটা ভুল নয়, ফাঁকি নয়। হাজার বছরের বিরুদ্ধে দশপনেরো বছর জিতবে বলে পণ করেছে। অন্য দেশের তুলনায় এদের অর্থের জোর অতি সামান্য, প্রতিজ্ঞার জোর দুর্ধর্ষ।”

এরপর গড়িয়ে গেছে অনেক সময়। সাংঘাতিক পরিবর্তন হয়েছে পরিস্থিতির। গুটিকয়েক লোকের কাছে পরাজিত হয়েছে বিপুল মানুষ। এখন রাষ্ট্রের বিরোধীরা নেই বিরোধী অবস্থানে। নাগরিকেরা থাকে না নগরাধিকারের পক্ষে। মানুষ ‘ভিকটিম কমপ্লেক্সের’ বৃত্তে আবদ্ধ। তারা ধরেই নিয়েছে, কর্তৃপক্ষের কেউই আর তাদের ধার ধারে না। তাদের দ্বারা কিছুই বদলাবে না।

নব্বইয়ের পর থেকে সেখানে সৃষ্টি হওয়া শুরু হয়েছে নাগরিক নিবীর্যতা বা অক্ষমতা, অপ্রীতিকর অর্থনৈতিক দুরবস্থা। এখন ক্ষমতাসীনদের কট্টর শাসন, প্রবঞ্চক নির্বাচন, দুর্নীতিগ্রস্থ আমলাতন্ত্র, গণমাধ্যমের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, প্রতিবাদপ্রতিরোধের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত করে দিয়েছে অসহায়ত্বের বেদনাবোধ। ভোট দিতে যায় না মানুষ, বিক্ষোভেও না। সেখানকার মানুষেরা বলেন, ‘আমাদের পছন্দঅপছন্দের কোনো মূল্য নেই তাদের (কর্তৃপক্ষ) কাছে। আমরা মিছিলমিটিংয়ে যাই না। গেলে যে কোনো উপায়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। আমাদের অধিকারের জন্য আমরা লড়াই করি না, সংগ্রাম করি না। আমরা বেঁচে আছি, এতেই ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।’ তাই বলা যায়, কোটি কোটি মানুষ টিকে আছে সেখানে ঠিকই, কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে প্রাণের শেষ দুর্বল শক্তিটুকু নিয়ে ধ্বংসের পাড়ে। তারা কর্তৃপক্ষকে ঘৃণা করে, কিন্তু পরিবর্তনের কথা মনে এলেই ভয়ের জ্বরে ভোগে। তারা অন্যায়টা বোঝে, কিন্তু প্রতিবাদী সক্রিয় কর্মীদের সহ্য করতে পারে না। তারা আমলাতন্ত্রকে পছন্দ করে না, কিন্তু জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে রাষ্ট্র্বের সামরিক নিয়ন্ত্রণের কাছে নতজানু হয়ে থাকে। তারা পুলিশের ভয়ে ভীত, কিন্তু পুলিশী শাসনকাঠামো বিস্তৃতির বিপক্ষে কোনো কথা বলে না। টেলিভিশন তাদের সাথে অবিরাম প্রতারণা করে চলছে, তা জানা সত্ত্বেও তারা টেলিভিশনের সব মিথ্যাচার নির্বিরোধে গ্রাস করে নিচ্ছে। তাদের বৈষম্যবোধ ও আকাঙ্ক্ষাশক্তির মাজা ভেঙে গেছে বা চুরমার করে দেওয়া হয়েছেফলে এক মনোবিদের উপমার মতো, সাধারণ মানুষ যেন বৈদ্যুতিক শকের আওতায় থাকা একটা ঘরে আনা হয়েছে, সুইচ টিপলেই শক খেতে হচ্ছে, আবার তারা এ থেকে বাঁচতে পারছে না, কিংবা ব্যর্থ হচ্ছে নিচু পার্টিশনওয়ালটা ডিঙ্গিয়ে সেই তড়িতায়িত হওয়া ঘর থেকে নিরাপদ ঘরে চলে যেতে।

কালুগা প্রদেশের একটা গ্রামের কথা বলি। মস্কো থেকে এর দূরত্ব ৩০০ কিলোমিটার। এখানে অন্যান্য গ্রামের তুলনায় সুযোগসুবিধা অনেক বেশি। কিন্তু মানুষজন কোলাহলপ্রিয় ও ঝগড়াটে। সামান্য কারণে বা একটু উত্তেজিত হলেই বেড়িয়ে পড়ে ছুরি নিয়ে। প্রতি সন্ধায় শোনা যায় চিৎকারচেঁচামেচি। কারো মুরগি চুরি হয়ে গেছে। কার কুকুরকে কে যেন বিষ খাইয়েছে। একজন আরেকজনের বউকে পটিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে। ওই যে একজন মার খেয়েছে। মারখাওয়া লোকটি এখন তার আক্রমণকারীদের পিছপিছ ছুটছে কুড়াল নিয়ে। তাদের উদ্যম, উদ্যোগ, গর্ব এখন এসব কর্মকাণ্ডকে ঘিরেই।

গ্রামটাতে মাত্র কয়েকটি বাড়ি পানির সংযোগ পেয়েছে। অধিকাংশ গ্রামবাসীকে বালতি করে পানি বয়ে আনতে হয় রাস্তার ঝর্ণা থেকে। শীতের শুষ্ক মৌসুমে কোনো এক দিন হঠাৎ ঝর্ণাগুলো শুকিয়ে যায়। বছরের এই সময়টাতে সবচেয়ে কাছের গিরিখাতটি থাকে খুবই পিচ্ছিল। যে মানুষগুলো গোলমেলে, ঝগড়াপ্রিয়, মারমুখো, তারাই দীর্ঘ পথ পারি দিয়ে পায়ে হেঁটে ক্লান্ত, শ্রান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ে থাকে বালতি নিয়ে। গ্রামের কেউই তাদের কোনো সমস্যার কথা কর্তৃপক্ষকে জানায় না, যদিও প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই টেলিফোন আছে। কেমন জানি নিষ্পৃ, নিশ্চল হয়ে গেছে মানুষগুলো!

বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটে। হরহামেশাই অনেক দিনের পুরনো বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গ্রামটা ডুবে থাকে গাঢ় অন্ধকারে। এ অবস্থায় যা করার কথা তা হলো বিদ্যুতের জরুরি বিভাগকে ডাকা, কিন্তু গ্রামবাসীরা তা করে না। রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে তারা অন্ধকারেই পড়ে থাকে। অক্ষম ক্ষমতা সারা গ্রামকে আচ্ছন্ন করে রাখে। রাজধানী নগরেও এর থেকে পৃথক কোনো চিত্র পাওয়া যাবে না। কর্তাব্যক্তিরা যখন হাসপাতাল, চিকিৎসা কর্মসূচিএই ধরুন, জাতীয় ক্যান্সার প্রোগ্রাম বন্ধ করা শুরু করল, সবাই ক্ষেপে উঠল। চিকিৎসা সমস্যা সবার কাছেই সমান। রোগ হিন্দুমুসলমানবৌদ্ধখ্রিস্টান, এ দল ওই দল দেখে হানা দেয় না। সরকারি হাসপাতাল, যেখান থেকে কিছু লোক অন্তত চিকিৎসা পেতো, তার পরিসরও সংকুচিত হয়ে গেছে। মাত্র এক বছরের মধ্যে সাত হাজার চিকিৎসাকর্মী উদ্বৃত্ত হয়ে পড়ে। ২৮টি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। কর্মবৃন্ত থেকে ছিঁড়ে পড়ে অনেক চিকিৎসক, কিন্তু তাদের ক্ষোভে সামিল হয় না কেউ, বিক্ষোভে সমর্থন দেয় না কোনো লোক।

এক লোককে তার সন্তানের চিকিৎসার জন্য বসতবাড়িটুকুও বেচে দিতে হয়েছে। কেউ এ ব্যাপারে তার সামনে কথা উঠালেই ওই লোক জনস্বাস্থ্য ও কর্তৃপক্ষকে শাপশাপান্ত করে চৌদ্দ গোষ্ঠী ধুয়ে দেয়। ডাক্তারদের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবার পরামর্শ দেওয়া হলে, কেবলই মাথা নাড়ায়, ‘মাথা ঘামিয়ে লাভ কী?’

অনুরুপ মনোভাব, একই প্রতিক্রিয়া বাকি সবার‘লাভ কী? কিছুই বদলাবে না। কিচ্ছু হবে না।’ সুরাহা কী জানতে চাইলে একটাই উত্তর, ‘সমাধান একটাই, দেশ থেকে বের হয়ে যাওয়া।’

অধিকাংশ রাশিয়ানদের মাথায় দেশান্তরের চিন্তা। যেতেও পেরেছেন অনেকে। যারা ছিলেন বিরোধী, গত কিছু বছর যাবত প্রতিবাদ র‍্যালিতে যোগ দিয়ে আসছিলেন তারা। দেশ ছাড়ার কারণটা ছিল যতটা না কষ্ট ও শাস্তির ভয়, তারচেয়ে বেশি ছিল সারাদেশে প্রবাহিত হতাশার আগুনে পুড়ে মরার ভীতি। কর্তৃপক্ষ তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সব ধরনের উপায় উপকরণ কাজে লাগাচ্ছে একটা অনুগত ও অধীনস্থ সমাজ নির্মাণে এবং তা অক্ষুন্ন রাখতে। এমনিতেই আগের তুলনায় বর্তমানে অনেক দুর্বল সাধারণ মানুষের ইচ্ছাশক্তি। তার ওপর মগজ ধোলাই হয়ে উঠেছে প্রধান অস্ত্র তাদের সেই ইচ্ছাশক্তিকে ডাবিয়ে রাখার, মুক্ত চিন্তাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেওয়ার।

মাথাটা পরোক্ষভাবে কিনেই হোক, অথবা ভয় দেখিয়েই হোক, গণমাধ্যমকে কব্জা করে রেখেছে কর্তৃপক্ষ। দৃশ্যপটে মনে হতে পারে ভাগাভাগি আছে। ক্রেমলিনবাদী এবং মেকি স্বাধিনতামুখী। আসলে পর্দায় যাই দেখুন না কেন, ঘুরে ফিরে সব একইভুয়া প্রতিবেদন, রাজনীতিবিদদের অর্থহীন দ্বন্দ্ব, প্রেসিডেন্ট তথা ব্যক্তিপূজা, ভুলভাল প্রচারপ্রপাগান্ডা, কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতা, প্রচলিত আইনের সঙ্গে অদ্ভুত সব সংযোজন। মাঝে মাঝে খবর দেখলে স্নায়ুরোগী হওয়া আর প্রতিদিন টিভি দেখলে মানসিক রোগী হওয়া ছাড়া অন্য কিছু হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সারাবিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ এ অবস্থার দীর্ঘায়ু কামনা করে না।

(তথ্যসূত্র: রাশিয়া অন দ্যা ভার্জ অফ অ্যা নার্ভাস ব্রেকডাউন লিজা আলেক্সান্দ্রোভাজরিনা)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s