লিখেছেন: সব্যসাচী গোস্বামী

The philosophers have always interpreted the world in various ways; the point, however, is to change it. (Marx, Theses On Feuerbach: Thesis 11, 1845) 

এক.

যে কোনো মতাদর্শ কিংবা দার্শনিক তত্ত্বেরই একটা বস্তুগত ভিত্তি থাকে। যে কোনো নির্দিষ্ট দেশকালের নিরিখে, নির্দিষ্ট আর্থসামাজিক ব্যবস্থার মধ্য থেকেই একেকটা মতাদর্শ জন্ম নেয়। সমাজে নতুন বস্তুগত পরিস্থিতি নতুন ধারণা এবং তত্ত্বের জন্ম দেয়। এটাই মার্ক্সবাদের শিক্ষা। মার্ক্সবাদের নিজের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য।

১৮৪০ দশকের দিকে ইউরোপে প্রথম দুনিয়ার সবচেয়ে আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও উন্নত মতাদর্শ মার্ক্সবাদের উদ্ভব হয়েছিল। মনে রাখতে হবে, এটা ছিল এমন এক সময় যখন ইউরোপ সারা দুনিয়ায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে আধিপত্য বিস্তার করছে। বস্তুত এ সময় সমাজে এমন কিছু বৈশিষ্ট্যের আবির্ভাব ঘটেছিল, যা মার্ক্সবাদের উৎপত্তির পেছনে বস্তুগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল

প্রথমত, ১৭৬০ সাল থেকে ১৮৩০ সাল অবধি ঘটে চলা ইউরোপজুড়ে শিল্প বিপ্লবের প্রবাহ, যা একদিকে যেমন শিল্প পুঁজির এবং আধুনিক বুর্জোয়াশ্রেণীর জন্ম দিয়েছিল, পাশাপাশি জন্ম দিয়েছিল আধুনিক শিল্প শ্রমিক, তথা সর্বহারাশ্রেণীরও

দ্বিতীয়ত, ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইউরোপের দেশে দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব। এর মধ্য দিয়ে পুরনো সামন্ততান্ত্রিক ধ্যানধারণাকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে ইউরোপের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করলো বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের রাজনীতি ও উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণাসমূহ

তৃতীয়ত, যদিও এই সময়কালটা ছিল বস্তুত রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে বুর্জোয়াদের উত্থানের যুগ, তথাপি মনে রাখা দরকার, ওই একই সময়ে সর্বহারাশ্রেণীও ক্রমশ সচেতন শ্রেণী হিসেবে তাদের নিজস্ব স্বাধীন উদ্যোগে সংগ্রাম বিকাশের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে গুরুত্ব অর্জন করছিল গড়ে উঠছিল বিভিন্ন ধরণের সর্বহারাশ্রেণীর নিজস্ব শ্রেণীসংগঠন। যা আগামীদিনে রাজনীতিতে সর্বহারাশ্রেণীর এক বিপুল উত্থানেরই ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

এটা ছিল এমন একটা সময়, যখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উৎপাদনের তথা উৎপাদিকা শক্তির ব্যাপক বিকাশ ঘটানোর পাশাপাশি শ্রমবিভাজনের ভিত্তিতে উৎপাদনের সামাজিকীকরণ ঘটেছে বিপুলহারে বাজার ব্যবস্থার বিপুল প্রসারের মধ্য দিয়ে একটা বিরাট অঞ্চলকে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার অঙ্গীভূত করা হয়। প্রকৃতি বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক বিকাশের একটা উল্লম্ফন ঘটেছে, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির একটা সার্বিক বিকাশ ঘটিয়েছে পাশাপাশি সামন্ততান্ত্রিক চিন্তাধারাগুলোর বিরুদ্ধে একটা সর্বাত্মক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনাগুলোর ব্যাপক প্রসার ঘটছিল।

এরকম একটা প্রেক্ষাপটেই মার্ক্সবাদ, শ্রমিকশ্রেণীর তথা দুনিয়ার সমস্ত নিপীড়িত জনগণের মুক্তির দিশা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো

অনেকেই মনে করেন যে, কার্ল মার্ক্সের মূল অবদান হলো শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্বকে আবিষ্কার করা কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয় মার্ক্স নিজেই বলেছিলেন, তিনি মৌলিকভাবে যা দেখিয়েছেন তা হলো

প্রথমত শ্রেণী চিরকাল ছিল না। সমাজ বিকাশের একটা নির্দিষ্ট স্তরে, বিশেষত উৎপাদন শক্তির বিকাশের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে এসেই সমাজে শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, আজকের সমাজে শ্রেণী সংগ্রামের গতিমুখ সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বের দিকে

তৃতীয়ত, সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব কোনো নির্দিষ্ট সমাজ ব্যবস্থা নয়, তা হলো পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদে উৎক্রমণের একটা পর্যায়কাল মাত্র।

সর্বহারাশ্রেণীর মতাদর্শ হিসেবে মার্ক্সবাদের আত্মপ্রকাশ ঘটে মূলত সেসময়ের শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামের মধ্য দিয়েই পাশাপাশি তাত্ত্বিক সংগ্রামের দিকটিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। লেনিন তার মার্ক্সবাদের তিনটি উৎস ও উপাদান শীর্ষক লেখায় দেখিয়েছেন, মার্ক্সবাদী মতাদর্শের উৎপত্তির ক্ষেত্রে প্রধান তিনটি উৎস হলো

) জার্মান চিরায়ত দর্শন ১৭৬০ সাল থেকে ১৮৩০ সাল অবধি ইউরোপের দার্শনিক চিন্তার ক্ষেত্রে যার প্রভাব ছিল ব্যাপক। জার্মান মধ্যশ্রেণী ছিল এই চর্চার মধ্যমণিচিরায়ত জার্মান দর্শনের প্রগতিশীল এবং প্রগতিবিরোধী নানা দিক ছিল বিশেষত হেগেলের দর্শনে যা ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা গেছে। কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস এইসব প্রচলিত সামন্ততান্ত্রিক প্রগতি বিরোধী দিকগুলো বাদ দিয়ে এটাকে একটা প্রগতিশীল ও বিপ্লবী দিশা দে। বস্তুত মার্ক্সবাদ হেগেলের দর্শনের মধ্য থেকে দ্বন্দ্বতত্ত্বকে গ্রহ করে এবং ভাববাদকে বর্জন করে একে প্রগতিশীল ও বিপ্লবী দর্শন দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদে রূপান্তরিত করেনযা ছিল এতোদিন হাতের উপর ভর করে পা উপরে তুলে দাঁড়িয়ে, তাকে পায়ের উপর ভর করে দাঁড় করান হেগেলের দ্বন্দ্ব তত্ত্ব ছাড়াও, ফয়েরবাখের বস্তুবাদী দর্শন থেকেও মার্ক্সএঙ্গেলস বেশ কিছু বস্তুবাদী উপাদান সংগ্রহ করেছিলেনবস্তুত এই দর্শন থেকে উপাদান সংগ্রহ করে মার্ক্স ও এঙ্গেলস যান্ত্রিক বস্তুবাদকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী তত্ত্বে রূপান্তরিত করেছিলেন এই দুই দর্শনেরই সীমাবদ্ধতা ছিল মার্ক্সএঙ্গেলসের আগে পুরনো ধরণের বস্তুবাদ, যা ছিল আসলে যান্ত্রিক বস্তুবাদ, তা বস্তুর বিকাশের নিয়মকে ব্যাখ্যা করতে পারেনি, ফলত তাকে বারবার ভাববাদের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু বস্তু মানেই হলো বিপরীতের ঐক্য তথা অভেদবস্তুর ভেতরে বিপরীতের মধ্যেকার অভেদ ও সংগ্রামই যে আসলে বস্তুর বিকাশের চালিকা শক্তি, বস্তুর মধ্যেকার এই দ্বান্দ্বিক নিয়ম মার্ক্স কর্তৃক আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই প্রথম বস্তুবাদীরা বস্তুর বিকাশের নিয়মকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন, পাশাপাশি বস্তু এবং চেতনার আন্তসম্পর্কের ক্ষেত্রেও বস্তুর ভূমিকাই যে প্রধান; বস্তু নিরপেক্ষভাবে চেতনার যে কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না, এই তত্ত্বকেও তা শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করায় এবং শেষ অবধি তা ভাববাদকে তাত্ত্বিকভাবে পরাস্ত করে বস্তুবাদকেই প্রতিষ্ঠা করে।

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী তত্ত্বের নিরিখেই এরপর মার্ক্সএঙ্গেলস সমাজ বিকাশের নিয়মকে ব্যখা করে দেখান যে, সমাজ বিকাশের অনিবার্য অভিমুখ কেন সাম্যবাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাঁরা দেখান, সমাজে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ হচ্ছে একটা ইচ্ছা নিরপেক্ষ সামাজিক নিয়ম। কোনো একটা সমাজে বিদ্যমান উৎপাদন সম্পর্ক যখন উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করতে পারে না, তখন সমাজে আসে এক ক্রান্তিকাল। পুরানো সমাজের গর্ভে নতুন সমাজের, তথা নতুন উৎপাদন সম্পর্কের আগমনের লক্ষণগুলো তখন দেখা দেয়। তৈরি হয় তখন অনুকূল বিপ্লবী পরিস্থিতি। উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যেকার দ্বন্দ্বই সমাজ বিপ্লবে চালিকাশক্তির ভূমিকা নেয়।

মার্ক্সঙ্গেলস ইতিহাসকে বস্তুবাদী পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করলেন এবং দেখালেন আধুনিক বুর্জোয়া ব্যবস্থায় উৎপাদনের ব্যাপকমাত্রায় সামাজিকীকরণ ঘটলেও, যেহেতু মালিকানা ব্যবস্থা থেকে যায় ব্যক্তিগতস্তরে এই দুইয়ের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব উৎপত্তি হয়, তা শেষ পর্যন্ত আধুনিক বুর্জোয়া ব্যবস্থাকেও একদিন ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চ থেকে সরিয়ে নতুন উৎপাদন সম্পর্কের তথা নতুন সমাজ ব্যবস্থার জন্ম দেবে। যেখানে মালিকানারও সামাজিকীকরণ ঘটবে। আর এই নতুন উৎপাদন সংগ্রামের জন্য যে বিপ্লবী সংগ্রাম চলবে, তার নেতৃত্বে থাকবে সর্বহারাশ্রেণী। কারণ, দুনিয়াজুড়ে অনেক নিপীড়িত শ্রেণীর অস্তিত্ব থাকলেও সর্বহারাশ্রেণী তথা শ্রমিকশ্রেণী হলো এমন এক শ্রেণী, যে শ্রেণী সমাজের ইতিহাসে সবচেয়ে সচেতন, অগ্রণী, লড়াকু শ্রেণী। তার রয়েছে সবচেয়ে সচেতন ও সঠিক বিশ্ববীক্ষা। কারণ, এ যাবৎকাল অবধি যত ধরণের শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে, তার মধ্যে শ্রমিকশ্রেণীই হচ্ছে একমাত্র শ্রেণী, যারা ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের শ্রেণী অস্তিত্ত্বকেও বিলোপ করে শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে। তাদের এই অগ্রণী শ্রেণী হয়ে ওঠার পেছনে মূলত দুটো বস্তুগত কারণ উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, সবচেয়ে আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থায় উৎপাদক হিসেবে তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহ। দ্বিতীয়ত, সর্বহারাশ্রেণী হচ্ছে এমন এক শ্রেণী, যে কোনো ধরনের উৎপাদন উপকরণের মালিক নয়। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পুঁজির মালিকের কাছে শ্রমশক্তি বিক্রি করা ছাড়া অন্য কোনোভাবে সে বেঁচে থাকতে পারে না। কমিউনিষ্ট ইস্তাহারে তাই মার্ক্সএঙ্গেলস দৃপ্ত ঘোষণা করেছিলেন যে, শৃঙ্খল ছাড়া সর্বহারার হারাবার কিছু নেই, কিন্তু জয় করবার জন্য আছে গোটা দুনিয়াটা। সমাজের সমস্ত সম্পত্তির তথা উৎপাদন উপকরণের সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই, সমাজের একজন সদস্য হিসেবে সর্বহারাশ্রেণী উৎপাদন উপকরণের মালিক হতে পারবে। মূলত এই দুটি বস্তুগত কারণের জন্যই তাদের শ্রেণীগত আকাঙ্ক্ষা হলো যাবতীয় উৎপাদন উপকরণের মালিকানার সামাজিকীকরণ ঘটানো। আর মালিকানার সামাজিকরণের উপর ভিত্তি করে যে নতুন উৎপাদন সম্পর্ক গড়ে উঠবে, অন্তর্বস্তুতে তালো সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্ক। পুঁজিবাদে যে উৎপাদনের সামাজিকীকরণ এবং ব্যক্তিগত মালিকানার মধ্যকার দ্বন্দ্ব সমাজতন্ত্রে এসে সমাধান হবে। শ্রমিকশ্রেণী তথা আধুনিক সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বেই একমাত্র যা প্রতিষ্ঠা হবে। এইভাবে সমাজ বিজ্ঞানের ইতিহাসের গতির একটা দিক নির্দেশ করলো মার্ক্সবাদ। জন্ম হলো ঐতিহাসিক বস্তুবাদী তত্ত্ব।

) ব্রিটিশ রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র যেহেতু ব্রিটেনেই প্রথম বুর্জোয়া উৎপাদন অপেক্ষাকৃত একটি সুশৃঙ্খল রূপ নেয় ও বুর্জোয়া বাজার ব্যবস্থাও বেশ বিকশিত হয়ে ওঠে, তাই এখানেই বুর্জোয়া উৎপাদনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো বোঝা অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। আর এই কাজে প্রধান ভূমিকা পালন করেন অ্যাডাম স্মিথ এবং রিকার্ডো। স্মিথই প্রথম মূল্যের ধারণা প্রবর্তন করেন, যা কিনা বুর্জোয়া অর্থনীতির মৌলিক নিয়ম বোঝার চাবিকাঠি। মূল্যের ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান রিকার্ডো তিনি মূল্যের ধারণার ভিত্তিতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীগুলোকে চিহ্নিত করেন এবং তাদের স্বার্থের মধ্যেকার বৈপরীত্য উপলব্ধি করেন। তাদের সৃষ্ট রাজনৈতিক অর্থনীতি একদিকে যেমন সামন্ততন্ত্রকে ক্ষয়িষ্ণু ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করে, তেমনি তাদের বুর্জোয়া সীমাবদ্ধতা তাদের দৃষ্টিভঙ্গীকে সংকুচিত করে। সামন্ত সমাজে তারা শ্রেণী সংগ্রামকে গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু বুর্জোয়াশ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামের গুরুত্ব উপলব্ধি করেননি। নির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্ককে তারা ঐতিহাসিক বিকাশের ফল হিসেবে না দেখার ফলে, তারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে অন্তিম, তথা স্বাভাবিক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করেনকার্ল মার্ক্স তার দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শন ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী ধারা অনুসরণ করে পুঁজিবাদের মর্মবস্তু ও তার গতি প্রকৃতি আবিষ্কার করেন। যে মূল্যতত্ত্ব আবিষ্কার করেও স্মিথ ও রিকার্ডো তার মর্মার্থ তুলে ধরতে পারেননি, মার্ক্স সেই মূল্যের ধারণাকে আরো পরিশীলিত করে উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব আবিষ্কার করেন এবং এইভাবে বাজারে সাম্যের আড়ালে বুর্জোয়া সমাজের কঙ্কালটি সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হন। তিনিই প্রথম দেখালেন যে, বুর্জোয়াদের মালিকানা কোনো বিশেষ গুণে নয়, শ্রমিকের উদ্বৃত্ত শ্রমই মালিকের মুনাফার উৎস। কিন্তু এখানেই তিনি থামলেন না, তিনি বুর্জোয়া ব্যবস্থার দ্বন্দ্বগুলোকে চিহ্নিত করলেন, সমাজের উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের সঙ্গে তা সম্পর্ক উদঘাটন করলেন এবং এইভাবে বুর্জোয়া সমাজের ঐতিহাসিক পরিণতি আবিষ্কার করতে সক্ষম হলেন। তিনি দেখালেন, বুর্জোয়া ব্যবস্থায় আবির্ভূত শ্রমশক্তির বিক্রেতা যে শ্রমিকশ্রেণী শোষিত, নিপীড়িত, শৃঙ্খলিত, তারাই আসলে নতুন সমাজ তথা সাম্যবাদী সমাজ গড়ার প্রতিনিধি। তারাই সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব গড়ে তুলে বুর্জোয়া ব্যবস্থার উৎপাদনের সামাজিক চরিত্র ও মালিকানার ব্যক্তিচরিত্রের মধ্যকার অবসান ঘটিয়ে সমাজকে ক্রমাগত সাম্যবাদের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যে সমাজে মৃত শ্রম তথা পুঁজি জীবন্ত শ্রমের উপর আধিপত্য চালাবে না, যে সমাজে মানুষ কাজ করবে তার সাধ্য অনুযায়ী এবং ভোগ করবে তার চাহিদা অনুযায়ী। এইভাবে কার্ল মার্ক্সের হাতে রাজনৈতিক অর্থনীতি নিছক সমাজ কাঠামো ব্যাখ্যা করার হাতিয়ার রইলো না, তা বর্তমান শোষণভিত্তিক সমাজকে বৈপ্লবিক উপায়ে ধ্বংস করে নতুন সমাজ গড়ার বিশেষ কার্যকরী হাতিয়ারে রূপান্তরিত হলো

) ফরাসি সমাজবাদী তত্ত্ব এই তত্ত্বগুলোতে নতুন সর্বহারাশ্রেণীর আশা, আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন থাকলেও এগুলোতে মূলত পুঁজিবাদের শোষ ও সর্বহারাশ্রেণীর অবর্ণনীয় দিন যাপনের বাস্তব প্রতিফলনই ঘটেছিল। মুক্তির আকাঙ্ক্ষা দিশা ছিল না, মূলত নিজেরদের মস্তিষ্ক প্রসূত যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে তারা সমাজতন্ত্রের একটি কাল্পনিক ভাবীকালকে তুলে ধরার চেষ্টা করতেন। সমাজের অভ্যন্তরেই যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কারণগুলো লুকিয়ে আছে, সেগুলোকে তাঁরা তুলে ধরতে পারেননি। বস্তুত এগুলো ছিল এক ধরণের কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব। সাঁসিঁমো, ফুরিয়ে ও ওয়েনের মতো সমাজতন্ত্রীরা ছিলেন এইসব কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের প্রবক্তামার্ক্স সমাজ বিকাশের নিয়মগুলোকে খুঁজে বের করে এই সমাজবাদী তত্ত্বকে একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করালেন এবং এবং জন্ম দিলেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্বের।

এইভাবে মার্ক্স ও এঙ্গেলস, মার্ক্সীয় দর্শন তথা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, মার্ক্সীয় রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র এই তিনটি ভিত্তির উপর দাঁড় করালেন মার্ক্সীয় মতাদর্শকে।

মার্ক্স ও এঙ্গেলস যেহেতু দর্শনকে শুধুমাত্র তাত্ত্বিক চর্চ্চার বিষয় মনে করতেন না, বরং আরো বেশি করে তাকে দুনিয়া বদলের হাতিয়ার মনে করতেন, তাই তাত্ত্বিক চর্চার পাশাপাশি সর্বহারাশ্রেণীর দর্শন হিসেবে তাঁরা সর্বহারাশ্রেণীর রাজনৈতিক সংগ্রামে গভীরভাবে যুক্ত হয়েছিলেন ১৮৪০এর দশক থেকেই তাঁরা কমিউনিষ্ট লীগের সাথে যুক্ত হয়ে যান। এই কমিউনিষ্ট লীগ ছিল একটা আন্তর্জাতিক সংগঠন। খুব দ্রুতই তাঁরা কমিউনিষ্ট লীগের নেতৃত্বে চলে আসেন। ১৮৪৮ সালে তারা কমিউনিষ্ট ইস্তাহার প্রকাশ করেন, যা দুনিয়াজুড়ে শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনের মধ্যে মার্ক্সবাদের প্রভাবকে তাৎপর্যপূর্ণ বৃদ্ধি ঘটায়। ওই বছরই ইউরোপজুড়ে সর্বহারাশ্রেণীর সংগ্রাম প্রথম অভ্যুত্থান আকারে ফেটে পড়ে। প্রথমে ব্রাসেলস থেকে বেলজিয়াম সরকার এবং পরে প্যারিস থেকে ফ্রান্স সরকার মার্ক্সকে বিতাড়ন করে। বিপ্লবী ঝঞ্ঝার সময় সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বকে সংহত করার জন্য মার্ক্স ও এঙ্গেলস Neu Rheimische zeitung’ নামের একটি দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশ করা শুরু করে পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে শ্রমিকশ্রেণীকে সংগঠিত করার কাজ চালাতে থাকেন। এরপর বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর মার্ক্সকে জার্মানি থেকে বিতাড়িত হতে হয়। সামগ্রিকভাবে শ্রমিক আন্দোলনে তখন তৈরি হয়েছে হতাশা এবং নানা রকম সংশয়। মার্ক্স বিপ্লবের ব্যর্থতার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করে লিখলেন দুটি বই ক্লাস স্ট্রাগলস ইন ফ্রান্স ১৮৪৮ থেকে ১৮৫০ এবং এইটটিন ব্রুমেয়ার অফ লুই বোনাপার্ট বই দুটিতে মার্ক্স প্রথম বস্তুবাদী দৃষ্টিকো থেকে সমসাময়িক ঘটনাবলীকে ব্যাখ্যা করার উদ্যোগ নেন এবং দেখান যে, শ্রমিক বিপ্লবে কারা বন্ধু শ্রেণী এবং কারাই বা বিপ্লবের শত্রু। এর ভিত্তিতে তিনি সর্বহারাশ্রেণীর কর্তব্য হাজির করেন। ইতিমধ্যে কমিউনিষ্ট লীগ পুলিশি আক্রমণে সদর দপ্তর থেকে উৎখাত হয়েছে এবং জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে লীগের নেতৃত্বকারী কমরেডরা গ্রেপ্তার হন। লীগ কার্যত ভেঙে যাওয়ার মুখে। ১৮৫২ সালে তা ঘোষিতভাবে ভেঙে দেওয়া হলো। কিন্তু মার্ক্স ও এঙ্গেলস থেমে থাকলেন না। তাঁরা একদিকে বিপ্লবের সার সংকলন করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবেই আবার শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনকে পুনরায় সংগঠিত করার প্রচেষ্টা শুরু করেন। এই উদ্যোগ সাংগঠনিকভাবে বাস্তব রূপ পায় ১৮৬৪ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক গঠনের মধ্য দিয়ে। মার্ক্সই এর প্রথম কর্মসূচি ও গঠনতন্ত্র লিখলেন। কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গলেস প্রথম থেকেই আন্তর্জাতিককে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও মতাদর্শগতভাবে পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। এর জন্য তাদের প্রথম আন্তর্জাতিকে বিদ্যমান নানা নৈরাষ্ট্রবাদী (এনার্কিস্ট) ও সুবিধাবাদী প্রবতাগুলোর সঙ্গে মতাদর্শিক সংগ্রাম চালাতে হয়েছে। ১৮৭১ সালে প্যারি কমিউনের ঘটনা, এই সংগ্রামকে একদিকে যেমন গভীরতর করে, পাশাপাশি কমিউন আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হাজির করে যদিও কমিউন ৭২ দিনের মাথায় শ্বেত সন্ত্রাসে ভেঙ্গে পড়ে, তথাপি সামগ্রিক দিক থেকে এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। একদিকে শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে গেঁড়ে বসে থাকা সুবিধাবাদীরা এই মহান অভ্যুত্থানকে অপরিণত কার্যকলাপ বলে দূরে সরে থেকেছে, অন্যদিকে কমিউনার্ডরা দারুণ বীরত্বের সঙ্গে সংগ্রাম করলেও আন্দোলনে নেতৃত্বের রাশ যেহেতু ছিল নৈরাষ্ট্রবাদীদের হাতে, তাই একে বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যায়নি মার্ক্স একদিকে সুবিধাবাদীদের উন্মোচন করলেন, পাশাপাশি প্রথম আন্তর্জাতিকের নেতা হিসেবে কমিউনের সংগ্রামকে ভালোভাবে পর্যালোচনা করে বেশ কিছু মূল্যবান শিক্ষাকে সামনে তুলে ধরলেন, যা আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের কাছে ভীষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে আজো। তিনি তার সিভিল ওয়ার ইন ফ্রান্স বইটি কমিউন সংগ্রাম চলাকালীনই লিখেছিলেন, যা কমিউনের পতনের দুদিন পর প্রকাশিত হয়। ওই লেখায় তিনি প্রথমত কমিউনের মুখ্য সাফল্যগুলোকে সর্বহারা বিপ্লবীদের সামনে তুলে ধরেন এবং কমিউনের সংগ্রামের প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গীটিও আন্তর্জাতিক সর্বহারাশ্রেণীর সামনে তুলে ধরেন। বস্তুত সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বাধীন নতুন সমাজ সম্পর্কে মূর্ত ধারণা মার্ক্স প্যারিস কমিউনের সংগ্রাম থেকেই অর্জন করেছিলেন। আগে সাম্যবাদ সম্পর্কিত ধারণাটি ছিল মূলত তাত্ত্বিক স্তরে কমিউন তার বাস্তব চিত্রটা কিছুটা সামনে নিয়ে আসেবস্তুত কমিউন ছিল সর্বহারাশ্রেণীর রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিচালনার প্রথম পদক্ষেপ। অনেক দুর্বলতা সত্ত্বেও তা আন্তর্জাতিক সর্বহারাশ্রেণীকে তাই অনেক মূল্যবান শিক্ষা দিয়েছিল। মার্ক্স তাই সুবিধাবাদীদের মতো দুর্বলতাগুলোকে প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করে সংগ্রাম থেকে দূরে সরে না থেকে, কমিউন থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণে মনযোগী হন। শেষ পর্যন্ত তিনি মূলত এই শিক্ষায় উপনীত হন যে প্রথমত, বিপ্লবের সাফল্যের জন্য চাই একটি সঠিক রণনীতি ও স্বচ্ছ দৃষ্টি সম্পন্ন শক্তিশালী, সুশৃঙ্খল সর্বহারা নেতৃত্ব। দ্বিতীয়ত, সর্বহারাশ্রেণীকে শুধুমাত্র ক্ষমতা দখলের মধ্যে থেমে থাকলে হবে না, খুব দ্রুত পুরনো রাষ্ট্র যন্ত্রটাকে ধ্বংসও করতে হবে।

প্যারি কমিউনের পতনের গভীর প্রভাব পড়েছিল প্রথম আন্তর্জাতিকে। সংগ্রাম ধাক্কা খাওয়ায় ফ্রান্সের একটা বড় অংশের শ্রমিক নেতারা নির্বাসিত হয়ে বিভিন্ন দেশে উদ্বাস্তু হয়ে জীবন যাপন করতে থাকেনপ্রখ্যাত মার্ক্সবাদী নেতা বেবেল এবং লিবনেখের দীর্ঘ কারাবাসের ফলে জার্মান শ্রমিক আন্দোলনও ব্যাপক ধাক্কা খায়। ব্রিটিশ শ্রমিক আন্দোলনেরও বেশ কিছু শ্রমিক নেতা প্যারি কমিউনের প্রতি মার্ক্স ও এঙ্গেলসের দৃঢ় সমর্থন মেনে নিতে পারেননি, তাই তাঁরা প্রতিবাদে প্রথম আন্তর্জাতিকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। পাশাপাশি নৈরাষ্ট্রবাদীদের নানা অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডও চলতে থাকে, যা সামগ্রিকভাবে প্রথম আন্তর্জাতিককে দুর্বল করে। মার্ক্সএঙ্গেলস ১৮৭২ সালের কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিকের সদর দপ্তর লন্ডন থেকে নিউ ইয়র্কে স্থানান্তর করেন। কিন্তু দুর্বল হয়ে পড়া প্রথম আন্তর্জাতিককে আর টিকিয়ে রাখা যায়নি শেষ পর্যন্ত ১৮৭৬ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক ভেঙে দেওয়া হয়। প্যারি কমিউনের পতনের পর প্রায় ৩৫ বছর ধরে একটি আপাত শান্তির যুগ চলে। বুর্জোয়াদের সঙ্গে সর্বহারাশ্রেণীর কোনো বড় ধরণের রক্তাক্ত সংঘর্ষের ঘটনা ই সময়ে ঘটেনি। এ সময়কালেই দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক ধারার বিভিন্ন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিগুলো গড়ে ওঠে। তাদের রাজনীতি বিভিন্ন ধরণের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সংগঠিত করা, সংসদীয় সংগ্রাম চালানো, দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশ করা, সমবায় গঠন করা, ইত্যাদি কাজকর্মের মধ্যে সীমিত ছিল। এ ধরণের বিভিন্ন শ্রমিক পার্টিগুলো নিয়েই ১৮৮৯ সালে গড়ে উঠে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক। যদিও পুরনো সুবিধাবাদীদের অনেকেই আবার দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে সামিল হয়েছিলেন, তথাপি সামগ্রিকভাবে দেখলে সন্দেহ নেই যে, দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের গঠন আন্তর্জাতিকভাবে সর্বহারাশ্রেণীর আন্দোলনে আবার নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেএর ফলে দেশে দেশে নতুন করে সর্বহারাশ্রেণীর রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং ওয়ার্কার্স পার্টিগুলো গড়ে ওঠেমার্ক্স ও এঙ্গেলস তাদের জীবনের শেষদিন অবধি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের মধ্যে কাজ করে গেছেন এবং মতাদর্শগত সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।

সামগ্রিকভাবে দেখলে দেখা যাবে মার্ক্স ও এঙ্গেলস একদিকে যেমন বাস্তব শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শিক্ষা নিয়েছেন; শ্রমিকশ্রেণীর বিভিন্ন আন্দোলনগুলোকে বিশ্লেষণ করে তত্ত্বের বিকাশ ঘটিয়েছেন; পাশাপাশি প্রুধোঁ, বাকুনিন, ব্লাঁকিদের মতো নৈরাষ্ট্রবাদীদের বিরুদ্ধে এবং লাসাল, বার্নস্টেইনের মতো সুবিধাবাদীদের বিরুদ্ধে মতাদর্শিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্থাৎ বিপ্লবী অনুশীলন ও তাত্ত্বিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণীর প্রকৃত বিপ্লবী মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

দুই.

মার্ক্সবাদ একটি বিজ্ঞান। তা কোনো আপ্তবাক্য নয় ধর্মীয় নীতিকথার মতো বিষয় নয়। কর্মের দিশারি। মার্ক্সবাদীরা মনে করেন এই বস্তুজগত সতত পরিবর্তনশীল। চরম অথবা পরম সত্যে তাদের বিশ্বাস নেই। একটা নির্দিষ্ট দেশকালের (Time and space) নিরিখে তারা সত্যকে দেখেন। বিজ্ঞান বলেই তার মধ্যে একটা উন্মুক্ততা (Openness) আছে, তাই ধর্মগ্রন্থের বাণীর মতো তাকে অলঙ্ঘনীয় কোনো সত্য হিসেবে ধরা হয় না। সামাজিক অনুশীলনের মাধ্যমে তা প্রতি মূহূর্তে আরো বেশি বেশি পরিশীলিত ও বিকশিত হয়ে চলে। সমাজের বিকাশের সঙ্গেঙ্গে মার্ক্সবাদও তার মৌলিক অবদানের উপর ভিত্তি করেই বিকশিত হয় এবং তা সমাজ বদলের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। লেনিন বলেছিলেন, বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ হচ্ছে মার্ক্সবাদের আত্মা। তার নিরিখে দেখলে দেখা যাবে, বিংশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত যে আপাত শান্তির বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল সেই পরিবর্তনের নিরিখে, মার্ক্সবাদী দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে নতুন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে মার্ক্সবাদী তত্ত্বকে আরো বিকশিত করা। সে সময় উল্লেখযোগ্য যে পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, তা হলো

প্রথমত, শ্রমিক আন্দোলনের জগতে মার্ক্সবাদের একটা ধারাবাহিক বিকাশের প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছিল

দ্বিতীয়ত, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অবাধ প্রতিযোগিতার বদলে একচেটিয়া, তথা মনোপলি পুঁজির যুগে প্রবেশ করেছিল।

তৃতীয়ত, শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী ভূমিকায় ভীত হয়ে এই একচেটিয়া পুঁজি, শ্রমিকশ্রেণীরই একটা অংশকে কিছু সুবিধা প্রদান করে, শ্রমিকশ্রেণীর ভেতর একটা সুবিধাভোগী শ্রেণীর জন্ম দিয়েছিল, যা শ্রমিক আন্দোলনে সুবিধাবাদী চিন্তার সামাজিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে। যদিও মার্ক্স ও এঙ্গেলস বেঁচে থাকাকালীনই শ্রমিক আন্দোলনে নৈরাষ্ট্রবাদের পাশাপাশি সুবিধাবাদের বিরুদ্ধেও তীব্র সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, কিন্তু পরে একচেটিয়া পুঁজি তথা সাম্রাজ্যবাদের যুগে তা আরো ব্যাপক মাত্রা পায়দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদীরা মার্ক্সবাদকে পরিবর্তনের নামে কাটছাঁট করতে গিয়ে তার বিপ্লবী অন্তর্বস্তুকেই বাদ দিতে চাইছিলেনতারা মার্ক্সের উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব, শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সশস্ত্র উপায়ে ক্ষমতা দখল করে শ্রমিকশ্রেণী কর্তৃক সর্বহারা একনায়কত্বের দিকে অগ্রসর হওয়া, তথা সাম্যবাদে পৌঁছানোর তত্ত্ব, এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদী তত্ত্বকে কার্যত নাকচ করে দেওয়ার পক্ষপাতি ছিলেন। এ ব্যাপারে সে সময় প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন লাসাল এবং বার্নস্টেইন।

লাসালের বক্তব্য ছিল পুঁজিপতিদের সরকারের কাছে আবেদন নিবেদনের মাধ্যমে শ্রমিক সমবায় গড়ে তুলতে হবে, যা সমাজকে ধীরে ধীরে সমাজতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাবে। এছাড়া মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন ইত্যাদি সম্পর্কেও লাসাল প্রমুখের ভুল ধারণা ছিল। লাসাল ও ব্রিটিশ শ্রমিক আন্দোলনের নেতা ওয়েস্টনের মতো কিছু ব্যক্তি মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনকে শ্রমিকশ্রেণীর পক্ষে ক্ষতিকর বলে মনে করতেন। এই ভুল ধারণার বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য মার্ক্সকে ১৮৬৫ সালে মজুরিমূল্যমুনাফা পুস্তিকাটি প্রথম আন্তর্জাতিকের সাধারণ কাউন্সিল মিটিংয়ে পেশ করতে হয়েছিল। যেখানে মার্ক্স দেখিয়েছিলেন, শ্রমিকশ্রেণীর মজুরি বৃদ্ধি মূল লক্ষ্য নয়, তাদের প্রকৃত লক্ষ্য হচ্ছে মজুরি প্রথার তথা মজুরি দাসত্বের অবসান ঘটানো। কিন্তু এটাও ঠিক যে, মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন শ্রমিকশ্রেণীর একটি ন্যায্য আন্দোলন। শ্রমিকশ্রেণীকে যা করতে হবে। সুবিধাবাদীদের অন্য আরেক সৈনিক বার্নস্টেইনের বক্তব্য ছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মার্ক্সবাদের মৌলিক পরিবর্তন করা দরকারতিনি বললেন, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য হিংস বিপ্লবের প্রয়োজন ফুরিয়েছে, এখন বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে নিলেই ধীরে ধীরে তা সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাবে। সংসদের মাধ্যমে সরকার দখলের রাজনৈতিক লাইনই শ্রমিকশ্রেণীর প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন। তারা প্রত্যেকেই প্যারি কমিউনের শিক্ষাকে জলাঞ্জলি দিয়ে বুর্জোয়াদের কাছে শ্রমিক আন্দোলনকে কার্যত আত্মসমর্পনের লাইন হাজির করেছিলেন। লাসাল ও বার্নস্টেইনের মূল বক্তব্যের মধ্যে কোনো মৌলিক ফারাক ছিল না তারা মার্ক্সবাদকে সংশোধনের নামে তার বিপ্লবী মর্মবস্তুকে বাদ দিতে চেয়েছিলেন। তাদের বক্তব্যের মর্মবস্তু ছিল, উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ যেহেতু ইচ্ছা নিরপেক্ষ, তাই উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ একদিন আপনা আপনিই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। বিপ্লব বা বল প্রয়োগের, তথা সমাজ পরিবর্তনের জন্য সচেতন উদ্যোগের কোনো দরকার নেইএই যুক্তির মাধ্যমে তারা মার্ক্সবাদকে এক ধরণের নিয়তিবাদী দর্শনের সমতুল্য করতে চেয়েছিল। পরবর্তীতে কমরেড মাও সেতুঙ নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিষ্ট পার্টি এই তত্ত্বকে উৎপাদিকা শক্তির তত্ত্ব নামে অভিহিত করে। মার্ক্সবাদকে সংশোধনের নামে নির্বিষ করার এই হীন ষড়যন্ত্রে যারা সামিল হয়েছিলেন, তাদের মতবাদগুলোকে কমরেড ভ্লাদিমির লেনিন পরবর্তীতে সংশোধনবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সেই অর্থে দেখলে লাসালই প্রথম সংশোধনবাদের প্রবক্তা।

শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখব সংশোধনবাদ বার বার নানা রূপে ফিরে ফিরে এসেছে। শ্রমিক আন্দোলনের প্রতিনিধির মুখোশ পরে তারা শ্রমিক আন্দোলনকে পেছন থেকে ছুরি মেরেছে। লাল পতাকা হাতে নিয়ে তারা লাল পতাকার বিরোধিতা করেছে। লাসাল এবং বের্নেস্টাইনের পর, সংশোধনাবাদের প্রতিনিধি হিসেবে রঙ্গমঞ্চে এলেন কাউটস্কি এবং প্লেখানভের মতো আইনি মার্ক্সবাদীরা। তাদের বক্তব্যের মোদ্দা বিষয় ছিল প্রথমত, পুঁজিবাদ এখনো বিকাশমান এবং উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে প্রগতিশীল ভূমিকা রেখে চলছে। দ্বিতীয়ত, আজ পুঁজিবাদের যে পররাজ্যগ্রাসী ভূমিকা তা আসলে অন্যান্য দেশেও পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটাবে, অর্থাৎ প্রগতি আনবে, সভ্যতার অগ্রগতি ঘটাবে এবং সাম্রাজ্যবাদ অতি সাম্রাজ্যবাদের স্তরে প্রবেশ করলে বৃহৎ পুঁজিপতি গোষ্ঠীগুলো বিশ্ব পরিচালকের আসনে বসবে এবং তারা নিজেদের মধ্যে আপস করে যুদ্ধ ইত্যাদির অবলুপ্তি ঘটাবে। অর্থাৎ পুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদের রূপ যখন আরো বিকাশমান হয়ে অতি সাম্রাজ্যবাদে রূপান্তরিত হবে, তখন তা যুদ্ধের অবলুপ্তি ঘটাবে। তাদের যুক্তি অনুযায়ী যেহেতু সাম্রাজ্যবাদের স্তরে এসেও পুঁজিবাদ বিকাশমান এবং প্রগতিশীল ভূমিকা রাখতে সক্ষম, অতব আপাতত সর্বহারাশ্রেণীর কাজ হলো বিকাশমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে আংশিক অর্থনৈতিক দাবিদাওয়ার সংগ্রাম, আইনি সংগ্রাম, সংসদীয় সংগ্রাম ইত্যাদি সংস্কারমূলক কাজের মধ্যে সীমিত থাকা। এইভাবে তারা মার্ক্সবাদের বিপ্লবী অন্তর্বস্তুকেই জলাঞ্জলী দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আন্তর্জাতিক মার্ক্সবাদী আন্দোলনের অন্যতম শিক্ষক কমরেড লেনিন তখন এইসব সুবিধাবাদীদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কমরেড লেনিন শুধুমাত্র তাত্ত্বিক সংগ্রামেই থেমে থাকেননি, বরং তিনি আরো ভালো জানতেন যে হাজারটা ধূসর তত্ত্ব কথার চেয়ে একটা সফল অনুশীলন অনেক বড় সামাজিক শক্তির জন্ম দেয়। তাই তিনি তত্ত্বকে অনুশীলনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করে মার্ক্সবাদকে দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়েছিলেন। যে সফল প্রয়োগের নাম ছিল বলশেভিক বিপ্লব বিপ্লব প্রথম প্রমাণ করেছিল, মার্ক্সবাদ কেবল তত্ত্বের বিষয় নয় বরং তা ঘোর বাস্তব এক অনুশীলনের বিষয়। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়েই জন্ম নিয়েছিল প্রথম সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সোভিয়েত ইউনিয়ন।

বস্তুত বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রকৃত স্বরূপটিকে অত্যন্ত সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন তথা বিশ্ব সর্বহারা আন্দোলনের সঠিক রণনীতি ও রণ কৌশলের রূপরেখা হাজির করলেন কমরেড লেনিন। কাউটস্কির অতিসাম্রাজ্যবাদের তত্ত্বকে খণ্ডন করে তিনি দেখালেন সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে প্রথমত একচেটিয়া পুঁজি। দ্বিতীয়ত এটা হচ্ছে পুঁজিবাদের এমন একটা স্তর, যা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। পরগাছাবৃত্তি হচ্ছে এই পুঁজির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তৃতীয়ত, এটা হচ্ছে পুঁজিবাদের অন্তিম পর্যায়, যখন পুঁজিবাদ মুমূর্ষু অবস্থায় পৌঁছে গেছে।

একচেটিয়া পুঁজি, তথা মনোপলি ক্যাপিটালের বৈশিষ্ট্যগুলোকে উন্মোচন করে তিনি দেখালেন, এই একচেটিয়া পুঁজির আবির্ভাবের ফলে কিছু বৃহৎ কার্টেল, সিন্ডিকেট ও ট্রাস্টের মধ্যে যাবতীয় পুঁজির কেন্দ্রীভবন ও ঘনীভবন হচ্ছে। কিছু বৃহৎ বা অতি বৃহৎ পুঁজিপতি গোষ্ঠী মিলে অন্যান্য প্রতিযোগীদের সরিয়ে দিয়ে বাজারের উপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। এদের সঙ্গে বৃহৎ ব্যাংকগুলোর মিলনে গড়ে উঠেছে ফিন্যান্স পুঁজি, তথা লগ্নিপুঁজি। আগে পুঁজিবাদের অতিউৎপাদনের সমস্যা থেকে মাঝে মাঝে পর্যায়ক্রমিক সংকট দেখা দিতো। কিন্তু বারবারই সেই সংকট কাটিয়ে উঠে পুঁজিবাদ আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে দাঁড়াতো। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের যুগে, তথা একচেটিয়া পুঁজির যুগে, পুঁজিবাদের সামনে আরেক নতুন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকট দেখা দিয়েছে, তা হলো পুঁজি রপ্তানির ক্ষেত্রের সংকট। যা তার সংকটকে স্থায়ী সাধারণ সংকটের দিকে নিয়ে যায়। যা থেকে তার আর মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এর ফলে দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদ, তথা মনোপলি পুঁজি, তথা লগ্নিপুজি নিজেকে রপ্তানিকরণের দিকে ধাবিত হয়। ফলত তাকে সেই দেশগুলোকে পদানত করে উপনিবেশ কিংবা আধাউপনিবেশে পরিণত করতে হচ্ছে। তাই তারা প্রথমত, অনুন্নত দেশগুলোর স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে সেই দেশগুলোকে উপনিবেশ অথবা আধাউপনিবেশে রূপান্তরিত করেছে, পাশাপাশি নিজেদের শ্রেণী স্বার্থের কথা মাথায় রেখে, সেসব উপনিবেশ অথবা আধাউপনিবেশগুলোর বুর্জোয়া বিকাশ তথা স্বাধীন পুঁজির বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেফলস্বরূপ, উপনিবেশিত দেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে ঠেকাতে, তাকে সে দেশের চরম প্রতিক্রিয়াশীল সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে আঁতাত করতে হয়েছে। একসময় যে পুঁজিবাদ সামন্ততন্ত্রকে উৎখাত করেছে ইউরোপজুড়ে, পরে উপনিবেশ ও আধাউপনিবেশগুলোতে তারাই হয়ে গেছে সামন্তবাদের দোসর। এইভাবে পুঁজিবাদ দেশে দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লবেরও শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও কতগুলো মনোপলি পুঁজিপতি গোষ্ঠীর স্বার্থে, এইসব সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি গোটা দুনিয়াটাকে নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে নিয়েছে। যা আবার যুদ্ধ তথা বিশ্বযুদ্ধের বস্তুগত ভিত্তি প্রস্তুত করেছে দুনিয়াজুড়ে। কারণ, এই ভাগবাঁটোয়ারায় প্রত্যেক সাম্রাজ্যবাদী দেশ তো আর সমভাবে সন্তুষ্ট হতে পারে না, তারা সবাই চায় নিজেদের অধিকৃত সীমানার আরো সম্প্রসার ঘটুক, যাতে বাজারের উপর তার কর্তৃত্ব আরো বৃদ্ধি পায়, পুঁজি রপ্তানির ক্ষেত্র আরো বেশি বেশি সম্প্রসারিত হয়। আর এই বাজার দখল এবং পুঁজি রপ্তানির ক্ষেত্র দখলের সংগ্রামই তাদের বিশ্বটাকে বণ্টন ও পুনর্বণ্টনের দিকে ঠেলে দেয়। যা শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন আঞ্চলিক যুদ্ধ এবং বিশ্বযুদ্ধের দিকে দুনিয়াকে ঠেলে দেয়শুধু তাই নয়, যুদ্ধ মানে যেহেতু ধ্বংসলীলাও, ফলত ফিন্যান্স পুঁজির লগ্নি রপ্তানির এতোটাই সংকট যে, যুদ্ধের ফলে ঘটা ধ্বংসলীলা তাদের আবার নতুন নতুন পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ করে দেয়, এ কারণেও তারা যুদ্ধ চায়। এসব কারণগুলোকে বিবেচনা করে লেনিন যথার্থই বলেছেন, “সাম্রাজ্যবাদ মানেই যুদ্ধ।

খুব স্বাভাবিকভাবেই একচেটিয়া পুঁজির যুগ সম্পর্কিত লেনিনীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সর্বহারা বিপ্লবী শ্রেণীর সংগ্রামের এবং আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সামনেও চলে আসে একগুচ্ছ নতুন রণনীতি, যা সুবিধাবাদীদের কর্মকৌশলের সম্পূর্ণ বিপরীত একগুচ্ছ প্রকল্প। এতোদিন যে বুর্জোয়াশ্রেণী সমাজের প্রগতিতে তথা সমাজের উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে প্রগতিশীল ভূমিকা রেখেছিল, একচেটিয়া শ্রেণীর উদ্ভবের সঙ্গেঙ্গে তাদের এই ভূমিকা বিপরীতে বদলে গেলো। তারা রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে এবং সাংস্কৃতিকভাবে হয়ে পড়ে এক চরম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। এর ফলে বস্তুগতভাবেই তার আর কোনো বিপ্লবী ভূমিকা থাকার প্রশ্নই থাকে না। পাশাপাশি, তার এই অন্তিমকালে বস্তুগতভাবেই সর্বহারা বিপ্লবের যুগের সূচনা হলো। শুধু তাই নয়, এতোদিন ধরে যে বুর্জোয়া শক্তি দেশে দেশে সামন্ততন্ত্রকে উৎখাত করে গণতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিল, বিশ্বপুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদে রূপান্তরের ফলে তাদের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার কারণে, আন্তর্জাতিকভাবে দেশে দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতৃত্বের দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই সর্বহারাশ্রেণীর কাঁধে বর্তালো। ফলত মার্ক্সবাদ এক নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে এসে উপস্থিত হলো। তা হলো সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগ। আর এই যুগে মার্ক্সবাদের বিকশিত রূপ হিসেবে আবির্ভাব ঘটলো লেনিনবাদের

তিন.

মার্ক্সবাদী সাহিত্যের চর্চা রাশিয়ায় বহু আগে থেকে শুরু হয়েছে। মার্ক্সের জার্মান ভাষায় লেখা ডাস ক্যাপিটাল গ্রন্থটি প্রথম অনুদিত হয় রুশ ভাষায়। মূগ্রন্থটি লেখা হয়েছিল ১৮৬৭ সালে। রুশ ভাষায় তা অনুদিত হয় ১৮৭২ সালে। বইটি নিয়ে সে সময় ব্যাপক চর্চা হয়, যা মার্ক্সবাদকে জনপ্রিয় করে এমনকি এর প্রভাবে ১৮৭৩৭৪ সালে রাশিয়ার বড় শহরগুলোর বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ সমাবেশগুলোতে ক্যাপিটালের উদ্ধৃতি ব্যাপকহারে ব্যবহৃত হতে থাকে। প্লেখানভের হাত ধরেই রাশিয়াতে মার্ক্সবাদ জনপ্রিয় হয়। তিনি এঙ্গেলসের সঙ্গে পরামর্শ করেই শুরুর দিকে শ্রমিক আন্দোলন শুরু করেছিলেন। লেনিনও তাকেই রাশিয়া মার্ক্সবাদের জনক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মার্ক্সএঙ্গেলসের অনেক লেখাকে রুশ ভাষায় অনুবাদ করেন। এছাড়াও শ্রমিক মুক্তি গোষ্ঠী নামে একটি মার্ক্সবাদী সংগঠন তৈরি করে কাজ করতে থাকেন। নারদনিকদের বিরুদ্ধে তাত্ত্বিক সংগ্রামেও তিনি এক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সোশ্যালিজম এন্ড এনার্কিজম, ইন ডিফেন্স অফ মেটেরিয়ালিজম, ফান্ডামেন্টাল প্রবলেমস অফ মার্ক্সিজম ইত্যাদি সব গুরুত্বপূর্ণ বই তিনি লেখেন। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি প্রাথমিকভাবে মার্ক্সবাদকে সংহতকরণের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। যদিও তিনি মনে করতেন যে, রাশিয়ায় বুর্জোয়া বিপ্লব যতদিন না সমাপ্ত হচ্ছে এবং সারা রাশিয়া জুড়ে শিল্পায়ন না ঘটছে, ততদিন অবধি রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের কোনো ভবিষ্যত নেই। এই ভাবনা শেষ পর্যন্ত তাকে সুবিধাবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। যা হোক, তিনি ছাড়াও ভেরা জাসুলিচ নামে একজন বিপ্লবী নারীও রাশিয়ায় মার্ক্সবাদকে জনপ্রিয় করতে ভূমিকা রেখেছেন। এই বিপ্লবী নারী সেন্ট পিটার্সবার্গের মেয়রকে হত্যা চেষ্টায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন। এ কারণে তিনি বিপ্লবী মহলে যথেষ্ঠ জনপ্রিয়ও হয়েছিলেন। পরে মার্ক্সবাদের সংস্পর্শে এসে তিনি অনুপ্রাণিত হন এবং ১৮৮১ সালে কার্ল মার্ক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মার্ক্সের মৃত্যর পর ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল। ১৮৮৩ সালে তিনি শ্রমিক মুক্তি গ্রুপের সদস্য হন। এরও কিছু সময় পর লেনিন শ্রমিক মুক্তি গ্রুপের সদস্য হন। যদিও ১৮ বছর বয়স থেকেই তিনি মার্ক্স, এঙ্গলেস ও প্লেখানভের বই পড়ে মার্ক্সবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং মার্ক্সবাদী নানা আলোচনা চক্রের মধ্য দিয়ে মার্ক্সবাদকে প্রচার করতে থাকেন। সাংগঠনিক দক্ষতা ও মার্ক্সবাদী প্রজ্ঞার কারণে খুব দ্রুতই লেনিন ছোট ছোট পাঠ্য গোষ্ঠীর মধ্যে একজন নেতৃত্বকারী কর্মী হয়ে ওঠেন। এমনকি মস্কো পাঠচক্রেও তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৮৯৫ সালে বিভিন্ন মূল শহরের এ ধরনের পাঠচক্র মিলিতভাবে শ্রমিক মুক্তি গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য লেনিন ও আরেকজন প্রতিনিধিকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। প্রসঙ্গত বলা দরকার স্বয়ং প্লেখানভও জীবনের অধিকাংশ সময়টাই ইউরোপের অন্যান্য দেশে বিশেষত সুডেনে কাটিয়েছিলেন। শুধু প্লেখানভই নয়, শ্রমিক মুক্তি গ্রুপের অন্যান্য নেতারাও দেশের বাইরেই থাকতেন। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস অবধি লেনিন ও তাঁর সহযোগী কমরেডরা ইউরোপ ঘোরেন ওই সময় ইউরোপে লেনিনের সঙ্গে প্লেখানভের দেখা হয় এছাড়াও জার্মান ও ফ্রান্সের অন্যান্য শ্রমিক নেতাদের সঙ্গেও তাঁর দেখা সাক্ষাত হয়। এঙ্গেলেসের সঙ্গেও দেখা করতে চেয়েছিলেন লেনিন, কিন্তু এঙ্গেলসের অসুস্থতার কারণে তা আর হয়ে উঠেনি। ফিরে এসে তিনি সমস্ত গ্রুপগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে উদ্যোগ নেন এবং শ্রমিক মুক্তির জন্য সংগ্রামী লীগ গঠন করেন। লীগ গঠনের পরপরই তিনি বিভিন্ন ফ্যাক্টারিতে জঙ্গী বিক্ষোভ ও ধর্মঘট সংগঠিত করতে উদ্যোগ নেন এবং একটি গোপন পত্রিকা প্রকাশে উদ্যোগ নেন

১৮৯৪ সালে লেনিন নারদনিকদের বিরুদ্ধে লিখলেন তাঁর সুবিখ্যাত বই হোয়াট দ্য ফ্রেন্ডস অফ দ্য পিপল আর এন্ড হাউ দে ফাইট এগেইনষ্ট দ্য সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট। প্লেখানভ অনেক আগে থেকেই নারদনিকদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন, কিন্তু লেনিনের এই বইটি নারদনিকদের রাজনৈতিক মতাদর্শের স্বরূপ উন্মোচনে খুবই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। যাই হোক, এই পর্যায়ে তিনি যে গোপন পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিচ্ছিলেন তা বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই রাশিয়ান সিক্রেট পুলিশ একজন ইনফর্মারের খবরের উপর ভিত্তি করে তাঁকে ১৮৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসে গ্রেপ্তার করে। জেল থেকেই তিনি গোপনে কমরেডদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করতে থাকেন এবং এই সময় তিনি ব্যাপক পড়াশুনাও করেন। জেল থেকে তিনি গোপন পদ্ধতিতে কোড ব্যবহার করে চিঠি এবং নানা ইস্তেহার লিখে তাঁর মা ও বোন আন্নার সহযোগিতায় বাইরে পাঠাতে থাকেন। একবছর পর তিনি জেল থেকে মুক্তি পান এবং তারপরই তাকে তিন বছরের জন্য সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় আরেক বিপ্লবী সাথী নাদেজদা ক্রুপস্কায়ার। তার সহযোগিতায় লেনিন ইন্ড্রাস্টিয়াল ডেমোক্র্যাসি বইটিকে ইংরেজি ভাষা থেকে রুশ ভাষায় অনুবাদ করেন। পরে এই বিপ্লবী নেত্রী লেনিনের জীবন সাথী হন। ক্যাপিটালিস্ট ডেভেলপমেন্ট ইন রাশিয়া বইটির কাজও তিনি সেই সময়ই করেন, যা ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত হয়। এছাড়াও তিনি সুবিধাবাদী বার্নস্টেইনের চিন্তার প্রভাবাধীন রুশ শ্রমিক আন্দোলনে গেড়ে বসে থাকা অর্থনীতিবাদের বিরুদ্ধে ঐ সময়ই তাত্ত্বিক সংগ্রাম শুরু করেন। তার পাশাপাশি রাশিয়ায় বিপ্লবের জন্য কি কর্মসূচী নেওয়া উচিত এবং বিপ্লবীদের আশু লক্ষ্য কি হওয়া উচিত, তা নিয়েও নানা লেখালেখি করতে থাকেন লেনিন

১৯০০ সালে নির্বাসন থেকে বেরিয়ে আসার পরপরই বিপ্লবী সর্বহারা পার্টি বানানোর জন্য তিনি উদ্যোগ নেন। যার নাম রাখা হয় রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টি সংক্ষেপে আরএসডিএলপি। পার্টি বানানোর এই প্রক্রিয়া অবশ্য নির্বাসন পর্বেই শুরু হয়ে যায় লেনিন উপলব্ধি করলেন, সারা রাশিয়াজুড়ে প্রচারিত একটা রাজনৈতিক সংবাদপত্র ছাড়া বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মার্ক্সবাদীদের ঐক্যবদ্ধ করা যাবে না। ফলত একটা নতুন পত্রিকা প্রকাশিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলো। পত্রিকার নাম রাখা হলো ইস্ক্রা। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় স্ফুলিঙ্গ। এই পত্রিকা সমস্ত পার্টি সেলের সঙ্গে একদিকে যেমন গোপনে যোগাযোগ রাখবে, পাশাপাশি তা বিভিন্ন ধরণের সুবিধাবাদী ও সংশোধনবাদী প্রবণতাগুলোর বিরুদ্ধে সর্বহারার প্রকৃত শ্রেণী লাইনকেও ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবে। তাই লেনিন চাইলেন প্রথম পার্টি কংগ্রেসের আগেই পত্রিকাটি প্রকাশনায় নিয়ে যেতে। প্রথম পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলী ছয় জনকে নিয়ে গঠিত হলো। শ্রমিক মুক্তি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তিনজন, যারা বাইরের বিভিন্ন দেশে রয়েছেন আর রাশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে লেনিন, মার্তভ, পত্রেসভ। প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশিত হলো ১৯০০ সালের ডিসেম্বর মাসে।

রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টি এমন একটা সময় গড়ে উঠেছিল, যখন দুনিয়া জুড়ে এক অগ্নিগর্ভ অবস্থা। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো তাদের উপনিবেশ দখলের জন্য কুকুরের মতো কামড়াকামড়িতে মেতেছে। ফলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে আঞ্চলিক যুদ্ধ একটা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। দুনিয়ার পুনর্বন্টনের জন্য এই লড়াইগুলো বিশ্বযুদ্ধের বস্তুগত ভিত্তি তৈরি করছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের আপাত শান্তিপূর্ণ অবস্থা ভেঙে দেশে দেশে আবার বিপ্লবী সংগ্রামগুলো ফেটে পড়ছে। এ অবস্থায় আরএসডিএলপিকে একটা প্রকৃত অর্থে বিপ্লবী পার্টি হিসেবে গড়ে তুলতে লেনিন উদ্যোগ নিলেন। লেনিন এমন একটা পার্টি গড়ে তোলার কথা বললেন, যেখানে পার্টির নেতৃত্বকারী ভূমিকায় থাকবেন পেশাদার বিপ্লবীরা, যারা গোপনে লাখ লাখ শ্রমিককে সমাবেশিত করে বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তুলবেন এবং এই কাজ বাদ দিয়ে অন্য কোনো পেশার সঙ্গে তাঁরা যুক্ত থাকবেন না। আর অন্যদিকে থাকবে আঞ্চলিক স্তরে একটা বিশাল পার্টি নেটওয়ার্ক, যা হবে হাজার হাজার লাখ লাখ শ্রমজীবী জনগণের সমর্থনপুষ্ট অসংখ্য পার্টি সেল। কোথা থেকে শুরু করতে হবে?, কি করিতে হইবে?, কিংবা সাংগঠনিক কাজ সম্পর্কে একজন কমরেডকে চিঠি এ ধরণের লেখাগুলোতে তিনি স্পষ্টভাবে দেখালেন, সর্বহারাশ্রেণীর পার্টির মতাদর্শগত ও সাংগঠনিক প্রশ্নে কি অবস্থান নেওয়া উচিত। এসব লেখায় তিনি অর্থনীতিবাদীদের দৃষ্টিকোণকে ব্যাখ্যা করে দেখালেন, কিভাবে তারা পার্টি এবং সর্বহারাশ্রেণীর শ্রেণীচেতনার গুরুত্বকে উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে শ্রমিক আন্দোলনকে স্বতস্ফুর্ততার গড্ডালিকা প্রবাহে ঠেলে দেয়; এবং কিভাবে অর্থনীতিবাদীরা মার্ক্সবাদী পার্টিকে সংস্কারবাদী পার্টিতে রূপান্তরিত করে।

১৯০৩ সালের জুলাইআগষ্টে, রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণভাবে সামনে আসে। একদিকে, লেনিন এবং অন্যান্য বিপ্লবীরা চাইছিলেন একটা দৃঢ় সুশৃঙ্খল, পেশাদার বিপ্লবীদের নেতৃত্বাধীন, গোপন এবং কার্যকরী বিপ্লবী পার্টি। যেখানে প্রতিটি পার্টি সদস্যকে পার্টির কোনো না কোনো পার্টি কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে। অন্যদিকে, মার্তভদের মতো অর্থনীতিবাদীরা চাইছিলেন একটা ঢিলেঢালা আইনি পার্টি। যেখানে পার্টিকে লেভি (আর্থিক সহায়তা) দিলে এবং পার্টির কর্মসূচীকে সমর্থন করলেই তাদের সদস্যপদ দেওয়া যাবে। অর্থাৎ পার্টি সমর্থক, শুভানুধ্যায়ীদেরও মার্তভ সদস্যপদ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। মনে রাখতে হবে, মার্তভদের এই মত কিন্তু দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সুবিধাবাদীদের বক্তব্যের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ ছিল। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক স্তরেও এ ধরণের মতামত তখন জেঁকে বসেছে। যা হোক, এই প্রশ্নে বিতর্কে কংগ্রেসে প্রথমে মার্তভরা ভোটে জিতলেও, কংগ্রেস চলাকালীন মাঝপথে সুবিধাবাদীদের একটা অংশ কংগ্রেস থেকে ওয়াক আউট করে চলে যাওয়ায়, শেষ পর্যন্ত লেনিনের বক্তব্যই সংখ্যাগুরুর মত হিসেবে কংগ্রেসে গৃহীত হয়। রুশ ভাষায় সংখ্যাগুরুকে বলা হয় বলশেভিক আর সংখ্যালঘুকে বলা হয় মেনশেভিক। সে সময় থেকে রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টিতে দুটি ধারার জন্ম হয় বলশেভিক আর মেনশেভিক। কংগ্রেসের কিছুদিন পর থেকেই মেনশেভিকরা বিভিন্ন গ্রুপবাজি এবং বিভেদকামী কার্যকলাপ শুরু করেছিল। যা যথেষ্ট সংশয় তৈরি করছিল। এসব সংশয় দূর করার জন্য পার্টি কংগ্রেসের আগে এবং পরে পার্টির আভ্যন্তরী সংগ্রাম কি কি বিষয় নিয়ে, কিভাবে চলেছে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে ১৯০৪ সালের মে মাসে লেনিন লিখলেন এক কদম আগে দুই কদম পিছে বইটি। যা ভবিষ্যতের বলশেভিক পার্টি গঠনের ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক ভূমিকা রাখলো। বইটি আঞ্চলিক পার্টি সংস্থাগুলোতে ব্যাপক জনপ্রিয় হলো। যদিও পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে, পার্টি মুখপত্র ইস্ক্রার সম্পাদনা বোর্ডে মেনশেভিকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। এর জোরে তারা কংগ্রেসে নির্ধারিত যাবতীয় সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। ফলশ্রুতিতে ১৯০৫ সালে পার্টি ভেঙে পড়ে

এদিকে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দুনিয়ায় দেশে দেশে বিশেষত এশিয়া মহাদেশে বিপ্লবী পরিস্থিতি ক্রমশ পরিপক্ক হচ্ছে। কিন্তু দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে তখন সুবিধাবাদীদের রমরমা। তারা এই পরিপক্ক পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর বদলে, সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া শক্তির কাছে আত্মসমর্পণের লাইন গ্রহণ করে। রাশিয়ায় তখন বিপ্লবের অনুকূলে খুবই চমৎকার পরিস্থিতি। রুশজাপান যুদ্ধে রাশিয়ার শোচনীয় পরাজয় এই পরিস্থিতিকেই আরো বাড়িয়ে দেয়। যুদ্ধে মেনশেভিকরা যখন জাতীয়তাবাদের ধুয়ো তুলে জার সরকারের লেজুরবৃত্তিতে নামলো, বলশেভিকরা তখন তথাকথিত ভুয়া জাতীয়তাবাদ ও উগ্রদেশপ্রেমের বুলিকে অস্বীকার করে যুদ্ধের বিরোধিতা করলো। তাঁরা স্পষ্টতই ঘোষণেরে, এটা একটা প্রতিক্রিয়াশীল যুদ্ধ এবং জারের পতনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তোলার বিষয়টাতে তাঁরা গুরুত্বারোপ করে। শুধু মুখে ঘোষণা নয়, পরিস্থিতির সদ্ব্যাবহার করার লক্ষ্যে তারা ঐতিহাসিক সংগ্রাম শুরু করে। ১৯০৪ সালে বাকুতে খনিজ তেল সংশোধনাগারের শ্রমিকদের এক বিশাল ধর্মঘট আগামীতে রাশিয়া জুড়ে বিরাট বিপ্লবী সংগ্রামের জোয়ারের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। ১৯০৫ সালে তা যেন ফেটে পড়লো। কারখানায় কারখানায় শ্রমিকরা ধর্মঘটে সামিল হলেন। গ্রামাঞ্চলে কৃষকরা জমিদার জোতদারের হাত থেকে জমি দখল করতে শুরু করলেন। এমনকি নৌবাহিনীতেও বিদ্রোহ শুরু হলো। বিশেষ করে যুদ্ধ জাহাজ পোটেমকিনের নৌসেনাদের বিদ্রোহ তো ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে

বিদ্রোহ দমন করতে জার চিরাচরিত লাঠি এবং গাজরের নীতি নিলেন। তিনি রাশিয়ান সংসদ ডুমার অধিবেশন ডাকলেন। অক্টোবরনভেম্বর মাসে, রাশিয়াজুড়ে তখন বিদ্রোহের ঝড় বইছে। এ অবস্থায় বলশেভিকরা ডুমা বয়কটের সিদ্ধান্ত নিলেন। মেনশেভিকরা তাদের সংস্কারবাদী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে ডুমায় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেন। এ সময়েই বলশেভিকরা প্রথম একটা ঐতিহাসিক কাজ করলেন। তারা শ্রমিকদের নিয়ে গঠন করলেন সোভিয়েত শ্রমিকদের পাল্টা ক্ষমতার ভ্রুণ রূপডিসেম্বরে ঘটলো বলশেভিকদের নেতৃত্বে সশস্ত্র অভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থান প্রবল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে ভেঙে দেওয়া হলো। জারের প্রধানমন্ত্রী স্তলেপিনের নেতৃত্বে প্রবল দমন পীড়ন চলে। ১৯১২ সালের পরবর্তী বিদ্রোহ শুরুর আগে পর্যন্ত এই চরম দমনের দিনগুলো চলতে থাকে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এই অধ্যায়কে স্তলেপিন প্রতিক্রিয়ার যুগ বলে চিহ্নিত করা হয়। এই অভ্যুত্থানের আপাত পতন ঘটলেও তা জারের শাসনের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিলো। প্রাথমিকভাবে ব্যর্থ হলেও, শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের জন্য ১৯০৫ সালের এই বিপ্লব প্রচুর সম্বৃদ্ধশালী শিক্ষা নিয়ে এসেছিল। এটা একদিকে বলশেভিকদের বিপ্লবী রাজনীতিকে এবং সঠিক রণনীতিকেও প্রমা করলো, পাশাপাশি মেনশেভিকদের সংগ্রাম ভীরুতাকেও জনগণের সামনে উন্মোচন করলো। এছাড়াও এর থেকে বলশেভিক বিপ্লবীরা চিনতে পারলেন কারা বিপ্লবের শত্রু, আর কারাই বা বন্ধু। বিপ্লবের জন্য সংগ্রাম ও সংগঠনের রূপ কি হবে সে সম্পর্কেও তারা স্পষ্ট অবস্থান নিতে শিখলো।

বস্তুত প্রতিটি প্রশ্নেই বলশেভিক এবং মেনশেভিকদের বোঝাপড়া ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে। মেনশেভিকরা মনে করতেন রাশিয়া বিপ্ল এই মূহূর্তে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক স্তরে রয়েছে, তাই এক্ষেত্রে উদারনৈতিক বুর্জোয়াশ্রেণীকেই নেতৃত্বকারী ভূমিকা রাখতে হবে। এইভাবে তারা শ্রমিকশ্রেণীর ভূমিকাকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার পক্ষপাতি ছিলেন। বলশেভিকদের মত ছিল শ্রমিকশ্রেণী কখনোই বুর্জোয়াদের বিশ্বাস করে বিপ্লবের নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে পারে না। বরং বিপ্লবের নেতৃত্ব তাদের নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া উচিত। এর ভিত্তিতেই বলশেভিকরা তাদের রণনীতি ও রণকৌশলকে আরো স্পষ্টভাবে নির্ধারিত করলেন এবং সশস্ত্র বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আহ্বান রাখলেন। মেনশেভিকরা জারের সংস্কারে যেখানে সংগ্রামকে আটকে রাখতে চাইলেন এবং কৃষকদের বিশ্বাস না করে লিবারেল বুর্জোয়াদের উপর আস্থা রাখলেন, বলশেভিকরা সেখানে লিবারেল বুর্জোয়াদের বিছিন্ন করে শ্রমিককৃষকের শক্তিশালী জোটের উপর গুরুত্ব দিলেন। বলশেভিকরা যখন ডুমা বয়কট করে, আঞ্চলিকভাবে সফল অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠন করলেন। মেনশেভিকরা তখন বিপ্লবী সংগ্রামকে শান্তিপূর্ণ ও আইনি পথে বেঁধে রাখতে চাইলেন এবং ডুমাকে দেশের প্রধান বিপ্লবী কেন্দ্রে পরিত করতে চাইলেন। আগেও বলেছি, মেনশেভিকদের অবস্থান ছিল দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের অনেক সুবিধাবাদীদের নেতৃত্বাধীন পার্টিগুলির মতোই আইনিবাদী এবং সংস্কারবাদী। লেনিন এবং বলশেভিক পার্টিকে শুধুমাত্র মেনশেভিকদের বিরুদ্ধেই লড়াই চালাতে হচ্ছিল না, পাশাপাশি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সুবিধাবাদীদের বিরুদ্ধেও লড়াই চালাতে হচ্ছিল। দুটো লড়াইয়ের মধ্যে নিবিড় সম্পর্কও ছিল। লেনিনের লাইনই ছিল মার্ক্সবাদের বিপ্লবী লাইনের ধারাবাহিকতা। এটা ছিল পুঁজিবাদ যখন এক নতুন যুগে, অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদের যুগে অনুপ্রবেশ করেছে, সে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে মার্ক্সবাদের বিকশিতরূপ। লেনিন তাঁর নতুন এই লাইনকে বেশ কিছু লেখাপত্রের মধ্য দিয়ে সামনে এনেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯০৫ সালে লেখা একটি বই টু ট্যকটিস অন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি ইন ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট। এই বইয়ে মেনশেভিকদের মতো সুবিধাবাদীদের সঙ্গে যে মূল পার্থক্যগুলো ছিল তা দেখানো হলো তিনি দেখালেন, প্রথমত সর্বহারাশ্রেণী এখন থেকে অবশ্যই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে নেতৃত্ব দেবে। তারা উদারনৈতিক বুর্জোয়াদের বিপ্লব থেকে বিছিন্ন করবে এবং কৃষকের সঙ্গে দৃঢ় মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হবে। দ্বিতীয়ত, সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জার রাজতন্ত্রকে উৎখাত করার জন্য বিপ্লবী সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তৃতীয়ত, বুর্জোয়া বিপ্লবের বিজয়ের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেই বিপ্লব থেমে থাকবে না, বরং তাকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বিপ্লবী সর্বহারাশ্রেণী ও সর্বহারা বিপ্লবী পার্টির কাজ।

এই রণনীতির উপর ভিত্তি করে ১৯০৫ সালের অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পরপরই বলশেভিকরা নতুন উদ্যমে বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। স্তলেপিন প্রতিক্রিয়ার যুগে প্রবল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুখে যদিও বলশেভিক বিপ্লবীদের আক্রমণাত্মক রণকৌশলকে কিছুটা বদলে নিতে হলো। তারা কিছুটা রক্ষণাত্মক অবস্থান থেকে বিপ্লবের জন্য পরবর্তী পরিস্থিতি গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু করলেন। এই সময় তারা আইনি ও বেআইনি কাজের মধ্যে এক সমন্বয় গড়ে তুললেনএকদিকে গোপন পার্টি কাঠামোকে অটুট রেখে, বিশেষত নেতৃত্বের মূল অংশকে গোপনে রেখে, পার্টির একাংশকে প্রকাশ্যে এনে, আইনি নানা কাজে, বিশেষত ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদিকে এবং বিভিন্ন প্রকাশ্য আড়াল রক্ষাকারী সংগঠনকে দিয়ে আইনি, প্রকাশ্য কাজের সুযোগ নিয়ে, আবার শ্রমিক কৃষকদের সংগঠিত করতে শুরু করলেনপাশাপাশি সংসদে (ডুমা) গিয়ে তারা সংসদকে উন্মোচন করার কাজটিও করতে লাগলেন। এই সময় শ্রমিক আন্দোলনে দুধরনের বিচ্যুতির বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম করতে হয়েছে। একদল ছিলেন লিকুইডিস্ট বা বিলোপবাদী। এরা দক্ষিণপন্থী। মেনশেভিকরা ছিল এর প্রতিনিধি। এদের বক্তব্য ছিল এই মূহূর্তে গোপন পার্টি কাঠামোকে তুলে দিয়ে পার্টিকে একটা আইনি লেবার পার্টিতে পরিত করা হোক; আরেকদল ছিল রিকলিস্ট বা অটযোভিস্ট, তারা মূলত বলশেভিকদেরই একাংশ, যাদের বক্তব্য ছিল সমস্ত ধরণের আইনি প্রকাশ্য কাঠামো থেকে এবং ডুমা থেকে বলশেভিকদের উঠে এসে, সম্পূর্ণ বেআইনি গোপন কাঠামোর মধ্যে পার্টিকে নিয়ে যাওয়া হোক। বলশেভিকদের এই দুই বিচ্যুতির বিরুদ্ধেই সংগ্রাম চালাতে হয়েছে। তাদের প্রকাশ্য ও গোপন; আইনি ও বেআইনি কাজের মেলবন্ধন ঘটিয়ে অত্যন্ত সৃজনশীলভাবে জনগণকে সমাবেশিত করতে হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা ব্যাপক মেনশভিক প্রভাবিত শ্রমিক সংগঠনকেও নিজেদের সপক্ষে নিতে সক্ষম হয়েছে এবং পরবর্তী বিপ্লবী সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি চালাতে পেরেছেবলাবাহুল্য, নতুন পরিস্থিতিতে গৃহীত নতুন রণকৌশলের মধ্য দিয়ে তাঁরা ব্যাপক শ্রমজীবী জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করেছেএমনকি এই সময় তারা ১৯১২ সাল থেকে আইনিভাবে প্রাভদা নামে নতুন দৈনিক সংবাদপত্রও প্রকাশ করতে লাগলো, যা ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল।

১৯০৯ সালে আন্তর্জাতিক মতাদর্শগত আন্দোলনে লেনিন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এই সময় প্রকাশিত হলো তাঁর প্রথম দার্শনিক গ্রন্থ মেটেরিয়ালিজম এন্ড ইম্পিরিওক্রিটিসিজম: ক্রিটিক্যাল কমেন্টস অন এ রিয়েকশানারি ফিলসফি নামে সুবিখ্যাত গ্রন্থটি। ১৯০৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর অবধি প্রায় নয় মাস ধরে বিপুল গবেষণা করে তিনি বইটি লেখেন। এই সময় প্রায় সমগ্র ইউরোপজুড়ে একটি দর্শন খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলমতটির নাম হলো ইম্পিরিওক্রিটিসিজম বা প্রত্যক্ষ বিচারবাদ এই মতের প্রবক্তারা দাবি করতেন যে, বিশুদ্ধ প্রত্যক্ষই হলো বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রকৃত ভিত্তি, অতব দর্শনের ক্ষেত্রে সত্যানুসন্ধানের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিচারই একমাত্র গণ্য হওয়া উচিত। মতটির প্রধান প্রবক্তা ছিলেন অষ্ট্রিয়ার পদার্থবিজ্ঞানী আনর্স্ট মাখ। তাঁর চিন্তার অনুগামী ছিলেন রুশ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট আন্দোলনের বেশ কিছু ব্যক্তি। এদের মধ্যে এ বগদানভ, জি বাজারভ, ভি লুনাচারস্কি প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁদের লেনিন দার্শনিক শোধনবাদী বলে উল্লেখ করেছিলেন, কারণ তাঁরা মুখে মার্ক্সবাদের বুলি আউরালেও বস্তুত ছিলেন ভাববাদের প্রবর্তক। বিজ্ঞান তথা পদার্থবিজ্ঞানের মুখোশের আড়ালে তাঁরা মার্ক্সবাদের বৈজ্ঞানিক সত্যকেই জলাঞ্জলী দিতে চাইতেন। বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ বিচারবাদ বইটিতে লেনিন দেখালেন মাখের প্রত্যক্ষবিচারবাদ আসলে বার্কলের ২০০ বছর আগের পুরনো ভাববাদেরই নব্যরূপ মাত্র। বার্কলি মনে করতেন, বাস্তব জগতটি নেহাতই মনগড়া একটা বিষয়। মনের বাইরে বাস্তব বহির্জগতের কোনো অস্তিত্ব নেই। মাখের বক্তব্যটি শুনতে উল্টো শোনালেও আসলে একই। বহির্জগত সম্পর্কে ব্যক্তির মনের অনুভূতিই এখানে চরম সত্য, যা আসলে একাজ্ঞতাবাদ। লেনিন তাই উক্ত বইটিতে বললেন, মাখের মতেও বস্তুমাত্রই সংবেদনপুঞ্জ। কোনোরকম বাকবিতণ্ডার সাহায্যে এই অবধারিত সত্য অস্বীকার করা সম্ভব নয় যে, আনর্স্ট মাখের এই মতটি আত্মকেন্দ্রিক ভাববাদ বা বার্কলেরই পুনরুক্তি মাত্র। মাখ বলেন, বস্তুমাত্রই সংবেদনযৌগ, বার্কলে বলেন, তা শুধু সংবেদনপুঞ্জ এইকথা মানলে স্বীকার করতেই হবে যে, পুরো জগতটা আমার মনের ধারণা। ফলে ব্যক্তিগত জ্ঞাতা ছাড়া শেষ পর্যন্ত আর কারো অস্তিত্ব স্বীকার করা অসম্ভব। এই হলো বিশুদ্ধ একাজ্ঞতাবাদ। এইভাবে লেনিন আসলে বিজ্ঞানের মোড়কে মাখ প্রমুখের ভাববাদকে খণ্ডন করে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে আরেকবার ভাববাদের সামাজিক শক্তি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করলেন। ১৯২০ সালে এই বইটির পুনর্মুদ্রণের সময় তিনি বইটিকে আরো পরিমার্জিত করেন। যদিও মূলভাবটি অক্ষতই ছিল। এইভাবে লেনিন দার্শনিক জগতে তার অবদান রাখেন। পরে তিনি ফিলোসফিক্যাল নোটবুকের মধ্য দিয়ে দর্শন সংক্রান্ত তার গবেষণাধর্মী কাজটি করছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর যা প্রকাশিত হয়।

উনিশ শতকের শুরুর দিক থেকে সাম্রাজ্যবাদীশক্তি তাদের মুনাফার স্বার্থে উপনিবেশ দখলের জন্য পরস্পরের মধ্যে কামড়াকামড়িতে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। বিশ্বপুঁজির প্রকৃত যুদ্ধলিপ্সু চরিত্র এর মধ্য দিয়ে দুনিয়ার জনগণের কাছে আরো বেশি বেশি করে উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল। পুঁজিবাদ যে শোষ এবং মুনাফার স্বার্থে সব রকমের অন্যায় এবং ধ্বংসাত্মক কাজ করতে পারে; সে যে মুনাফা ছাড়া আর কিছুই বোঝে না; তা দুনিয়ার নিপীড়িত জনতার সামনে একেবারে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। যদিও আগেই বলেছি, সাম্রাজ্যবাদের যুগে শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনের মধ্যে শোধনবাদ তথা সুবিধাবাদীরা ততদিনে একটা সামাজিক ভিত্তি পেয়ে গেছে। যুদ্ধের দিনগুলোতে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের মধ্যে তারা বেশ জেঁকে বসেছিল। সুবিধাবাদীদের সঙ্গে প্রকৃত বিপ্লবীদের মতাদর্শগত বিতর্ক যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদীদের উপনেবেশনীতিকে ঘিরে এক চূড়ান্ত রুপ পায়। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের ১৯০৭ সালের কংগ্রেসে উপনিবেশ প্রশ্নে এবং যুদ্ধের প্রশ্নে এই বিতর্ক আরো স্পষ্ট হলো। এই কংগ্রেসে আন্তর্জাতিকের নেতৃত্ব একটা প্রস্তাব গ্রহণ করে, যেখানে নাম কা ওয়াস্তে উপনিবেশ নীতির সমালোচনা করা হলেও, সাম্রাজ্যবাদের পররাজ্যগ্রাসকে সম্পূর্ণভাবে বিরোধিতা করা হলো না। সভ্যতার স্বার্থেই যেন উপনিবেশ নীতি অন্তর্বস্তুতে এমন কথাই বলা হলো। আন্তর্জাতিকের মধ্যকার বিপ্লবী অংশটি এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধীতা করলেন। বিশেষত রোজা লুক্সেমবার্গ এবং লেনিন এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করলেনসাধারণ সভায় নেতৃত্বের প্রস্তাবিত এই প্রস্তাবটি পরাজিত হলো। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়লো ১০৮টি আর বিরুদ্ধে ১২৭টি

একইভাবে যুদ্ধের প্রশ্নে অগাষ্ট বেবেলের দ্বারা পেশ করা প্রস্তাবটিও পরাজিত হলো। বেবেলের প্রস্তাবটিতে যুদ্ধ সম্পর্কিত প্রশ্নে কোনো স্পষ্ট দিক নির্দেশই ছিল না। লেনিন ও জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা রোজা লুক্সেমবার্গ এ প্রশ্নে স্পষ্ট দিক নির্দেশনার দাবি জানালেন। তারা লেন, আন্তর্জাতিককে যুদ্ধ থামানোর প্রশ্নে মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গীকে মাথায় রেখে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। সেই অনুযায়ী তারা প্রস্তাবনাটিতে সংশোধনী আনলেন। তারা জানালেন যে, আন্তর্জাতিককে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করতে বিশ্ব শান্তির জন্য কার্যকরী ভূমিকা নিতে হবে যুদ্ধ যদি শেষ পর্যন্ত শুরুই হয়ে যায়, তাহলে তার ফলে উদ্ভুত অর্থনৈতিক সংকটকে কাজে লাগিয়ে শ্রমজীবী জনগণকে রাস্তায় নামিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল যুদ্ধের বিরোধিতা করতে হবে যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত সংকটজনক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিপ্লবী সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মুখোশকে আরো বেশি বেশি করে উন্মোচিত করতে হবে। এটাই মার্ক্সের দেখানো দিক নির্দেশনা। সুবিধাবাদীরা এই বক্তব্যের সরাসরি বিরোধিতা করতে পারলো না। ফলে লেনিন ও রোজার সংশোধনী গৃহীত হলো।

১৯১০ থেকে ১৯১২ সালে যুদ্ধের বিপদ আরো বাড়লো। আন্তর্জাতিকের পরবর্তী কংগ্রেসে তাই সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো যে, প্রত্যেক দেশের সমাজবাদীরা পার্লামেন্টে যুদ্ধের বিরোধীতা করবে। সেখানে রোজা ও লেনিনের প্রস্তাবগুলো আবারো গৃহীত হলো। কিন্তু আন্তর্জাতিকের সুবিধাবাদীদের এইসব সিদ্ধান্তগুলো অনুশীলনের কোনো সদিচ্ছা ছিল না। সে সময়ের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রভাবশালী নেতা কার্ল কাউটস্কি, যিনি ছিলেন জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা, তিনি কংগ্রেসে ভোট দান থেকে বিরত ছিলেন। ১৯১৪ সালের ৪ আগস্ট জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের কংগ্রেসে গৃহীত সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করে জার্মানের পার্লামেন্টে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের পক্ষে ভোট দেয়দুনিয়ার মজদুর এক হও এই আন্তর্জাতিক স্লোগানকে ভুলে তারা পিতৃভূমি রক্ষার সংগ্রামের ধূয়ো তুললেন। অর্থাৎ পিতৃভূমি রক্ষার জন্য লড়াইয়ের নামে তারা একদেশের শ্রমিকের বিরুদ্ধে অন্য দেশের শ্রমিকের যুদ্ধের পক্ষেই কার্যত ওকালতি করলেন। সে সময় থেকেই কার্যত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের পতনের সূচনা হ। ফ্রান্স, ব্রিটেন, বেলজিয়ামের মতো দেশগুলোর সমাজবাদী পার্টিগুলোও অনতিবিলম্বে পিতৃভূমি রক্ষার সংগ্রামের ধূয়ো তুলে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসির সুবিধাবাদী নেতৃত্বের পথই অনুসরণ করলো। বলশেভিকরাই একমাত্র পার্টি, যারা আন্তর্জাতিকের কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যুদ্ধবিরোধী অবস্থানে দৃঢ় থাকলো। আন্তর্জাতিকের প্রধান নেতৃত্বের এই সুবিধাবাদী অবস্থানের ফলে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকদের যুদ্ধের প্রশ্নে প্রকৃত মার্ক্সবাদী অবস্থানটি সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া ছাড়া আর উপায় থাকলো না। সুবিধাবাদীরা যখন পিতৃভূমি রক্ষার ডাক দিলেন, তখন রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টি (বলশেভিক) প্রতিক্রিয়াশীলদের সৃষ্ট যুদ্ধকে বিপ্লবী গৃহযুদ্ধে রূপান্তরিত করার ডাক দিলো এবং তৃতীয় আন্তর্জাতিক গড়ার আহ্বান করলো। এইভাবে সুবিধাবাদী এবং প্রকৃত মার্ক্সবাদীদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রেখা তৈরি হয়ে গেল।

যেহেতু যুদ্ধের প্রশ্নে শ্রমিক আন্দোলনে এই সব বিতর্কগুলো নানা সংশয় তৈরি করেছিল, তাই তা দূর করতে লেনিন এ প্রশ্নে স্পষ্ট দিক নির্দেশ করলেনতিনি জানালেন প্রথমত, সমাজতন্ত্রীরা শান্তিবাদী নয় যে, তারা স ধরণের যুদ্ধের বিরোধিতা করবে। সমাজতন্ত্রীদের লক্ষ্য হলো সমাজতন্ত্র তথা সাম্যবাদী শোষণ বিভেদহীন দুনিয়া প্রতিষ্ঠা করা যে দুনিয়ায় যুদ্ধের কোনো বস্তুগত কারণই আর থাকবে না, লে জন্ম নেবে একটা যুদ্ধহীন দুনিয়া, কিন্তু এই কমিউনিজম বা সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সময় যুদ্ধের সম্ভাবনা রয়েছে সর্বদা। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের প্রশ্নে অবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সমাজবাদীদের উচিত দুটো বিষয়কে খেয়াল রাখা, যুদ্ধের লক্ষ্য কি এবং যুদ্ধটি কোন শ্রেণীর স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে লেনিন দেখালেন, এই বিশ্বে দুধরণের যুদ্ধ আছে ন্যায় যুদ্ধ আর অন্যায় যুদ্ধ। প্রতিক্রায়াশীলদের স্বার্থবাহী সব যুদ্ধই অন্যায় যুদ্ধ আর ন্যায় যুদ্ধ তিন রকমের ১) সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক দেশের জনগণের যুদ্ধ; ) সর্বহারাশ্রেণীর সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষে পরিচালিত বিপ্লবী গৃহযুদ্ধ; ) সমাজতান্ত্রিক ঘাঁটি রক্ষার জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের দেশগুলোর যুদ্ধ। শেষে লেনিন জানালেন, সমাজতন্ত্রীদের উচিত শান্তি আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো, পাশাপাশি এটাও তাদের সোচ্চারভাবে বলা উচিত যে, বিপ্লবই শেষ পর্যন্ত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

১৯১৫ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সুবিধাবাদী নেতা কার্ল কাউটস্কি সাম্রাজ্যবাদের সূত্রায়ন করে একটি বই লিখলেন, যেখানে তিনি তাঁর অতি সাম্রাজ্যবাদএর কুখ্যাত তত্ত্বটিকে সামনে নিয়ে আসেন। মার্ক্সবাদীদের সামনে তাই এই তত্ত্ব খণ্ডনের আবশ্যকতা দেখা দিলো। কাউটস্কির তত্ত্বকে খণ্ডন করে লেনিন ১৯১৬ সালে লিখলেন তার সেই সুবিখ্যাত গ্রন্থ সাম্রাজ্যবাদ পুজিবাদের সর্বোচ্চ রূপ। সাম্রাজ্যবাদ প্রশ্নে মার্ক্সবাদী এবং সুবিধাবাদীদের মধ্যেকার অবস্থানগত পার্থক্য নিয়ে যেহেতু এই লেখায় আমরা আগেই আলোচনা করেছি, তাই আর নতুন করে তা উত্থাপন করার দরকার নেই

আন্তর্জাতিকের সুবিধাবাদীদের সঙ্গে মার্ক্সবাদীলেনিনবাদীদের বিতর্কের প্রতিফলন রাশিয়াতেও দেখা দিলো। ১৯১৪ সাল থেকে আবার বিপ্লবী সংগ্রাম রাশিয়াতে ফেটে পড়ছিল। বলশেভিকরা শ্রমিকদের মধ্যে যুদ্ধের বিরোধিতা করে এবং জারতন্ত্রকে ছুড়ে ফেলে দেবার দাবিতে ব্যাপক প্রচারাভিযান চালাচ্ছিলেন। সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীতেও বলশেভিকদের ব্যাপক পরিমাণে পার্টি ইউনিট তৈরি হচ্ছিল। বিশেষত যুদ্ধরত দুই বাহিনীর মধ্যকার সৈন্যরা যে পরস্পরের বন্ধু এবং ভাই বলশেভিকদের এই বক্তব্য খুবই জনপ্রিয় হচ্ছিল। দেশীয় বুর্জোয়া এবং ভূস্বামীরাও যুদ্ধ থেকে বেড়িয়ে আসার পথ খুঁজছিল। দিকে দিকে সৈনিকদের অসন্তোষ এবং বিদ্রোহী মনোভাব বাড়ছিল। প্রচুর আহত সৈনিক চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছিলেন। শ্রমিক ও কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থা অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।

১৯১৭ সালের জানুয়ারি থেকে গণঅসন্তোষের তীব্রতা আরো বাড়লো। মস্কো, পেট্রোগ্রা, বাকু ইত্যাদি বড় বড় শিল্প শহরে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ধর্মঘটে সামিল হলেনবলশেভিকরা তাতে পূর্ণ সমর্থন জানালেনমার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বলশেভিকদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শ্রমজীবী নারীরা ব্যাপক পরিমাণে রাস্তায় নামলেনতারা যুদ্ধ, অনাহার ও জারতন্ত্রের অবসান চেয়ে ধর্মঘট ডাকলেন১১ মার্চ শ্রমিকশ্রেণী সার্বিকভাবে এই ধর্মঘটে রাস্তায় নামে আসেওই দিনই বলশেভিকদের কেন্দ্রীয় কমিটি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের আহ্বান জানায়। ১২ মার্চ ৬০ হাজার সৈনিক বিদ্রোহ করে বিপ্লবের পক্ষে চলে আসেএই সংবাদ ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে জারের সরকারি পদাধিকারী ও সৈন্যরা বিদ্রোহে সামিল হতে শুরু করেতারা সর্বত্র জার সরকারের কর্তৃত্বকে উৎখাত করতে শুরু করলেন। এই ঘটনাকে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব বলা হয়, কারণ রাশিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ( যা তখন বিশ্বের অন্যান্য ক্যালেন্ডারের চেয়ে ১৩ দিন পিছিয়ে থাকতো) দিনটি ছিল ২৭ ফেব্রুয়ারি, যেদিন জারতন্ত্রের পতন ঘটে।

জারতন্ত্রের পতনের সঙ্গেঙ্গে বলশেভিকরা শ্রমিক ও সৈনিক ডেপুটিদের সোভিয়েত গড়ে তুলতে শুরু করলো। বলশেভিকরা যখন রাস্তায় নেমে জনগণের বিক্ষোভ বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিচ্ছে, এসময়ে মেনশেভিক ও সোশ্যালিষ্ট রেভলিউশনারিরা (যারা ছিল পেটি বুর্জোয়াশ্রেণীর প্রতিনিধি, নারদনিকদেরই ক্ষয়িষ্ণু দশার প্রতিনিধি) উদারনৈতিক বুর্জোয়াদের ডুমার প্রতিনিধিদের সঙ্গে পেছনের দরজা দিয়ে দর কষাকষি করে একটা অস্থায়ী সরকার গড়ে তোলে। এর ফলে রাশিয়াতে দুধরণের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা পায়। অস্থায়ী সরকারের মধ্য দিয়ে মেনশেভিক ও সোশ্যালিষ্ট রেভলিউশানারিদের নেতৃত্বে উদার বুর্জোয়াদের একনায়কত্ব এবং শ্রমিক ও সৈনিক ডেপুটিদের সোভিয়েতএর মধ্য দিয়ে শ্রমিককৃষকের একনায়কত্ব। লেনিন এই অবস্থাকে দ্বৈত ক্ষমতা বলে উল্লেখ করেছিলেন। ১৯১৭ সালের ১৬ এপ্রিল (রুশ ক্যালেন্ডার) লেনিন দীর্ঘ নির্বাসনের পর পেট্রোগ্রাদে ফিরে আসেন এবং পরদিন তিনি বলশেভিকদের একটি সভায় বিখ্যাত এপ্রিল থিসিস পেশ করেন। তিনি অস্থায়ী সরকারের বিরোধিতা করে, সমস্ত ক্ষমতা শ্রমিক ও সৈনিক ডেপুটিদের সোভিয়েতএর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য লড়াইয়ের আহ্বান রাখেন এবং শ্রমিক কৃষক সৈনিক ডেপুটিদের সোভিয়েতএর মধ্য দিয়ে কি করে শান্তি, ভূমি ও রুটির নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে, তার কর্মসূচী হাজির করেন। পাশাপাশি, যেহেতু শ্রমিকশ্রেণীর প্রধান লক্ষ্য কমিউনিজম তথা সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা, তাই রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টির (বলশেভিক) নাম বদলে পার্টির নাম রাখা হয় কমিউনিষ্ট পার্টি অফ রাশিয়া (বলশেভিক)। তিনি এপ্রিল থিসিসে পরিস্কারভাবে তৃতীয় আন্তর্জাতিক গঠনের গুরুত্বটিকে সামনে আনেন এবং মার্ক্সবাদী বিপ্লবী পার্টিগুলোর কেন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির বদলে কমিউনিষ্ট পার্টি নাম হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নে সুনির্দিষ্ট যুক্তির অবতারণা করেন। সেই সময় থেকে সুবিধাবাদী সংশোধনবাদীরা সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট এবং প্রকৃত কমিউনিষ্টদের মধ্যে বিশ্ব শ্রমিক আন্দোলনের একটা স্পষ্ট বিভাজন রেখা তৈরি হয়ে যায়। আর বিশ্বের দেশে দেশে সর্বহারাশ্রেণীর দায়িত্ব এসে পড়ে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বদলে কমিউনিষ্ট পার্টি গড়ে তোলা। যাই হোক, এপ্রিল থিসিস পেশ করার তিন সপ্তাহের মধ্যে আগষ্ট মাসে, দীর্ঘ দশ বছর পর আবার ষষ্ট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে স্তালিন পার্টির মূল রাজনৈতিক রিপোর্ট ও প্রস্তাবসমুহ পেশ করেন যেখানে সশস্ত্র গণ অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত হতে বলা হয় এবং পার্টির নীতিমালা সম্পর্কিত নতুন প্রস্তাব নেওয়া হয় এবং বলা হয় প্রতিটি পার্টি সদস্যকে এবং পার্টি ইউনিট এবং সংস্থাকে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা মেনে চলতে হবে। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতি সমুহও এই কংগ্রেসে গৃহীত হয়। এই নীতিসমূহই হলো লেনিনবাদী পার্টি নীতি। কংগ্রেসের কিছুদিনের মধ্যে বলশেভিকদের উৎখাত করতে রাশিয়ার সেনাপ্রধান জেনারেল কর্নিলোভ একটা সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেন, কিন্তু যেহেতু বাহিনীতে তখন বলশেভিকদের প্রভাব ব্যাপক, তাই সৈনিকদের বিরাট একটা অংশ তাতে সামিল হননি। ফলে সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়। ব্যাপক জনতা তখন বলশেভিকদের রাজনৈতিক কর্মসূচীর উপরই আস্থাশীল হয়ে পড়েছেন। দ্রুত সোভিয়েতগুলোয় বলশেভিকদের প্রভাব বাড়ছে। ঝড়ের গতিতে জনগণ বিপ্লবের পক্ষে এগিয়ে আসছেন। বলশেভিকরা উপলব্ধি করলেন, সশস্ত্র অভ্যুত্থানের এই সুযোগলেনিন নিরাপত্তার কারণে এ সময় ফিনল্যান্ডে চলে যান। সেখানে বসে তিনি এই বিপ্লবে ঝঞ্ঝার দিনে লিখলেন রাষ্ট্র ও বিপ্লব গ্রন্থটি। মার্ক্সবাদকে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করার এবং পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য এই গ্রন্থ তখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিপ্লবের ঝঞ্ঝার দিনে মার্ক্সবাদ কিভাবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য শিক্ষা দিয়েছে এবং বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণী কি প্রতিষ্ঠা করতে চলেছেন, তা উপলব্ধি করার জন্য এবং বিপ্লবে সশস্ত্র কর্মসূচীর ভূমিকা এবং সর্বোপরি সর্বহারা একনায়কত্বের প্রশ্নটিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বইটি সামনে নিয়ে আসে। যা ছিল সংগ্রামের ওই স্তরে দাঁড়িয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক কাজ। ১৯১৭ সালের ২০ অক্টোবর লেনিন আবার ফিনল্যান্ড থেকে পেট্রোগ্রাদে ফিরে আসেন। এর পর কেন্দ্রীয় কমিটির এক ঐতিহাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে কদিনের মধ্যে সশস্ত্র অভ্যুত্থান শুরু হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়প্রতিটি এলাকার রেডগার্ডদের, অভ্যুত্থান সংগঠিত করার জন্য এলাকায় পাঠানো হয়। অভ্যুত্থানের খবর আগে থেকেই আঁচ করে অস্থায়ী সরকার ১৯১৭ সালের ৬ নভেম্বর বলশেভিকদের উপর আক্রম শুরু করে। রেডগার্ড এবং সেনাবাহিনীর বিপ্লবী ইউনিটগুলোর সহায়তায় বলশেভিকরা ব্যাপক প্রত্যাঘাত করে। ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর সমগ্র রাশিয়ার রাষ্ট্র ক্ষমতা সোভিয়েতের হাতে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সোভিয়েত কংগ্রেস ডেকে শান্তি ও জমির জন্য ডিক্রি জারি করে। গঠন হলো প্রথম সোভিয়েত সরকার। এই প্রথম জন্ম নেয় শ্রমিকশ্রেণীর নিজস্ব রাষ্ট্র। নতুন সরকার প্রথমেই গঠন করলো কাউন্সিল অফ পিপলস কমিশারস লেনিন তাঁর প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হলেন। মহান সর্বহারা বিপ্লব এই প্রথম সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করলো।

চার.

আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি বলশেভিক বিপ্লবের শতবর্ষের দোরগোড়ায়। লাল রাশিয়ার রঙ বদলে গেছে অনেক দিনপুঁজিবাদী পথের পথিকরা ক্ষমতা পুনর্দখল করতে আপাতত সমর্থ হয়েছেকিন্তু তা বলে বলশেভিক বিপ্লবের তাৎপর্য দুনিয়া থেকে মুছে যায়নি। লেনিন অনেক আগেই পুঁজিবাদের ফিরে আসার সম্ভাবনার কথা বলে গিয়েছেন। তিনি এটাও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, সমাজতন্ত্র বা সর্বহারা একনায়কত্ব কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নয়, এটা হচ্ছে পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদী ব্যবস্থায় যাবার একটা উৎক্রমনশীল পর্যায়। এখানেও শ্রেণী দ্বন্দ্বের অস্তিত্ব থাকে। পরে মাও সেতুঙ আরো বিস্তারিতভাবে দেখালেন, পুঁজিবাদের মতো সমাজতন্ত্রেও শ্রম আর পুঁজির দ্বন্দ্বই প্রধান দ্বন্দ্ব থাকে। শুধু দ্বন্দ্বের প্রধান দিকের পরিবর্তন হয়। অর্থাৎ দ্বন্দ্বের দুই বিপরীত একটা আরেকটায় রূপান্তরিত হয়। পুঁজিবাদে দ্বন্দ্বের প্রধান দিকে থাকে পুঁজি, অর্থাৎ শাসকশ্রেণী হিসেবে রাষ্ট্রপরিচালনা করে পুঁজিপতি শ্রেণী। সেখানে তখন কায়েম হয় বুর্জোয়া একনায়কত্ব। সমাজতন্ত্রে দ্বন্দ্বের প্রধান দিকে থাকে শ্রম অর্থাৎ তখন সর্বহারাশ্রেণী শাসক শ্রেণীতে রূপান্তরিত হয়। স্পষ্টভাবে বললে, শাসক পুঁজিপতি শ্রেণী শাসিত শ্রেণীতে এবং শাসিত সর্বহারাশ্রেণী শাসক শ্রেণীতে রূপান্তরিত হয়। সেখানে তখন কায়েম হয় সর্বহারার একনায়কত্ব। ফলত সমাজতন্ত্রে প্রবলভাবেই শ্রেণী সংগ্রাম বিদ্যমান থাকে। সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয়, এবং পুঁজিবাদের ফিরে আসার সামাজিক ভিত্তিগুলিকে নির্মূল করার চেষ্টা করা হয়অপরদিকে সমস্ত পুরনো সংস্কৃতি ও ধ্যান ধারণাকে কাজে লাগিয়ে পার্টির বাইরে ও ভেতরে থাকা পুঁজিবাদী পথের পথিকরা নিরন্তর রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের চেষ্টা চালিয়ে যায়।

সর্বহারার একনায়কত্বের মূর্ত রূপ হিসেবে মাও সেতুঙ সামনে নিয়ে আসেন অব্যহত বিপ্লবের তত্ত্ব। তিনি দেখালেন, ভিত্তি ও উপরিকাঠামোর মধ্যে দ্বন্দ্বে সাধারণভাবে ভিত্তি প্রধান হলেও, কখনো কখনো উপরিকাঠামোর ভূমিকা প্রধান জায়গায় চলে আসতে পারে। ভিত্তিতে রুপান্তর হয়ে গেলেই তার সঙ্গে সঙ্গে উপরিকাঠামোয় রূপান্তর ঘটে যায় না। উপরিকাঠামোয় রূপান্তরের জন্য অব্যহতভাবে বিপ্লবের উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে উপরিকাঠামো পুঁজিবাদের পুনরায় ফিরে আসার শক্তিশালী উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারেএই উপরিকাঠামোর বিপ্লবকে নাম দেওয়া হলো সর্বহারার মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লব। চীন দেশে তা হাতে কলমে পরীক্ষানিরীক্ষাও হ। যদিও মাও সেতুঙ বলেছিলেন একটা দুটো নয়, অনেকগুলো সাংস্কৃতিক বিপ্লবের জয়ের মধ্য দিয়েই সমাজতন্ত্রের বিজয় সুনিশ্চিত হবে। ১৯৬৬ সালে চীনে প্রথম মহান সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হয়। এ বছর সেই মহান সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লবেরও অর্ধশতবর্ষ পার হলো।

যে তীব্র মতাদর্শগত সংগ্রামের পরেও শুধু সোভিয়েত রাশিয়া নয়, চীনসহ প্রতিটি সমাজতান্ত্রিক দেশেই পুঁজিবাদের আবার পুনপ্রতিষ্ঠা হয়েছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও এই বিপ্লবী সংগ্রামগুলো কয়েক দশকের জন্য হলেও সমাজতন্ত্র তথা সর্বহারা একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছিল, যা শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তির সংগ্রামে দিয়ে গেছে প্রচুর সম্বৃদ্ধ অভিজ্ঞতা। যে অভিজ্ঞতার সারসংকলন করেই আজকের কমিউনিষ্ট আন্দোলনকে এগিয়ে যেতে হবে।

মার্ক্সবাদের আবির্ভাব থেকে লেনিনবাদের প্রতিষ্ঠা এবং বলশেভিক বিপ্লবের সফল অনুশীলন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে কিভাবে শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দুনিয়া বদলের বিপ্লবী অনুশীলন থেকে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক মতাদর্শের সৃষ্টি ও বিকাশ ঘটতে পারে। কিভাবে সংগ্রামের প্রতিটি চড়াই উৎরাইয়ে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী পদ্ধতি প্রয়োগ করে, মতান্ধতা ও সুবিধাবাদী চিন্তা কাটিয়ে, সংগ্রামের এবং বাস্তব পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করতে হয়। সেই অনুযায়ী সংগ্রামের প্রকরণ ও পদ্ধতির প্রয়োজনীয় বদল ঘটাতে হয়। রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণ করতে হয়। কিভাবে শ্রেণী লাইন ও গণলাইনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হয়। নীতির প্রতি দৃঢ় থেকে কিভাবে কৌশল ঠিক করতে হয়। মার্ক্সবাদের সাধারণ সত্যের উপর দাঁড়িয়ে, বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ করতে হয় এবং সংগ্রামকে সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়কিভাবে মার্ক্সবাদের সাধারণ সত্যকে ছেড়ে দিয়ে স্রেফ বাস্তব অবস্থার বিশ্লেষণের চেষ্টা করলে, তা থেকে দক্ষিনপন্থী বিচ্যুতি দেখা দেয় আবার উল্টোদিকে বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ না করে স্রেফ মার্ক্সবাদের সাধারণ সত্যকে আঁকড়ে থাকলে তা মতান্ধতার জন্ম দেয়। বলশেভিক বিপ্লবের সমগ্র যাত্রাপথের বিপ্লবী অনুশীলন ও মতাদর্শিক সংগ্রাম, বস্তুতপক্ষে মার্ক্সবাদের সঙ্গে ভাববাদের মতাদর্শিক সংগ্রামকে একটা এমন উচ্চশিখরে পৌঁছে দিয়েছে যে, দুনিয়াজুড়ে সর্বহারার বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি ব্যাপক জনতা আকৃষ্ট হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে, বলশেভিক বিপ্লবের অভিঘাতে, এমনকি এক সময় বিশ্বের একতৃতীয়াংশ অঞ্চলে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিয়েছিল সর্বহারাশ্রেণী। শিল্পে, সাহিত্যে, বৈজ্ঞানিক চর্চ্চায়, খেলাধূলায়, শিক্ষার প্রশ্নে, স্বাস্থ্যনীতির প্রশ্নে, সর্বোপরি প্রতিটি সৃজনশীল ক্ষেত্রে, পুরানো চিন্তাকে সরিয়ে, তা এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। সমকালীন দুনিয়ায় এমন কোনো সৃষ্টিশীল মানুষ পাওয়া যাবে না, যারা এর দ্বারা প্রভাবিত হননি। বলশেভিক বিপ্লব ভাববাদের শিকড়ে গিয়ে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে। তাই বলশেভিক বিপ্লবকে এবং তার থেকে প্রাপ্ত যাবতীয় শিক্ষাকে ভুলিয়ে দিতে, এর বিরুদ্ধে ন্যাক্কারজনকভাবে কুৎসা এবং অপপ্রচারে নেমে পড়েছে দেশবিদেশের পুঁজিপতি শ্রেণীসহ তামাম শোষক প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণী এবং তাদের ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীরা। সর্বহারাশ্রেণীসহ সমাজের সকল প্রগতিশীল অংশের কর্তব্য হলো এইসব বুর্জোয়া কুৎসার মুখোশ উন্মোচন করার পাশাপাশি মহান নভেম্বর বিপ্লবের শিক্ষা নিয়ে দেশে দেশে মুক্তি সংগ্রাম গড়ে তোলা।

আজ যখন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের আপাত পতনে উল্লসিত বিশ্বপুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদী শিবির; যখন শ্রমিকশ্রেণীর ধর্মঘটসহ যাবতীয় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত অধিকারকে মালিকশ্রেণী কেড়ে নিচ্ছে, নিত্য নতুন শ্রম আইন সংস্কার করে, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নামে; যখন শ্রমিকশ্রেণীর বাঁচবার অধিকারই বিপন্ন হয়ে পড়ছে; যখন কৃষকরা ঋণের দায়ে দলে দলে আত্মহত্যা করছেন; যখন কর্পোরেট লুণ্ঠনের স্বার্থে জঙ্গল থেকে উৎখাত করা হচ্ছে আদিবাসী ভূমিসন্তানদের; যখন নারীদের উপর ক্রমশ বাড়ছে শোষণ, জুলুম, অত্যাচার; যখন বেকারত্ব ক্রমবর্ধমান; যখন ভারতে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ববাদ আক্রম নামিয়ে আনছে দলিত ও সংখ্যালঘু মানুষদের উপর; যখন, নিপীড়িত জাতিসত্তার জনগণ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার চাইলে তাদের গায়ে ঙ্গি তকমা সেঁটে তাদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে তখন বলশেভিক বিপ্লব আমাদের লড়াই করে মাথা উঁচু করে বাঁচার শিক্ষাই শুধু দিচ্ছে না, পাশাপাশি সে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে একটা উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে আমাদের পথ দেখাচ্ছে

মহান নভেম্বর বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক!

Advertisements
মন্তব্য
  1. Ivan Orokkhito বলেছেন:

    শ্রদ্ধেয় সব্যসাচী গোস্বামী,
    আপনার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন দীর্ঘ ও প্রাঞ্জল প্রবন্ধটির জন্য বিপ্লবী শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানাই । প্রবন্ধটির ব্যাপারে আমার মত ও পর্যবেক্ষন যথাসম্ভব সংক্ষেপে বলছি :
    ১। এটি সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনে কিছু সংযোজন বিয়োজনের মাধ্যমে পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করা ও বিতরণ আবশ্যক কেননা এই রকম একটি প্রবন্ধের মধ্যে বহু গুরুত্বপূর্ণ ও ধারাবাহিক বিবরণ সহ আলোচনা অদ্যাবদি দেখি নি।
    ২। দীর্ঘ পাদটীকা পুস্তিকাটির সাথে যুক্ত করা খুবই প্রয়োজন কেননা বহু পাঠক এটি পড়ে উপকৃত হবেন এবং প্রায়শই পড়ার জন্য এটি সংগ্রহে রেখে দিলে খুব ভাল হবে। মার্ক্সবাদের নতুন কর্মীদের জন্য এই পুস্তিকাটি একটি দ্রুত পথনির্দেশিকা হবে যা থেকে তারা আরো কি কি বিষয় অনুসন্ধান করতে পারবেন সেই সম্পর্কে ধারণালাভ করতে পারবেন ।
    ৩। আমার মনেহয়, ইস্ক্রা, তার সম্পাদকদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়, লেনিন , ক্রুপস্কায়া, অর্থনীতিবাদী, ভাববাদী, হেগেল , ফয়েরবাখ , এমন বহু লোক বিষয় , আলোচ্য অংশ যা রয়েছে তার একটি সংক্ষিপ্ত টীকা অংশ যুক্ত থাকলে প্রবন্ধটি সমেৎ বইটি একটি দরকারী সাহিত্য হয়ে যায় ।
    ৪। পাঠের সময় এবং এর পরে আমি কিভাবে টীকা যুক্ত করা যায় সেইসব ব্যপারে ভেবেছি । আপনি চাইলে আমি এইসমস্ত টীকা যুক্ত করার ব্যপারে এবং এটি একটি ডেক্সটপ পাব্লিশড বই হিসাবে ( ই বুক ) হিসাবে আপনার সহযোগীতা নিয়ে খুব সহজে আর ভালভাবেই তৈরী করে দিতে পারি । প্রিন্টিং এর জন্য তৈরী করে দিতে হলেও এই শ্রম আমি স্বেচ্ছায় দিতে রাজি আছি । আপনার অনুমতি প্রয়োজন , তাছাড়া এর প্রচার প্রয়োজন মনে করেন কি না তাও বিষয় । সমস্তকিছু মিলেই আপনার মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম।

    বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক , লাল সালাম ।

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s