লিখেছেন: সারোয়ার তুষার

বহুদিন পর উঁহু, সম্ভবত এই প্রথম বস কোনো কাজের কাজ দিয়েছে বলে মনে হলো তার। চাকরিতে জয়েন করার পর এ পর্যন্ত যেসব অ্যাসাইনমেন্ট তূর্য পেয়েছে, সেসব শুধুমাত্র জঘন্যই না, অনেকটা ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব দ্য বিগ ব্রাদার’ টাইপ। তারপরেও করতে হতো। করতে হয়। অন্নসংস্থান বলে কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর কি করবো, কি করবো এই যখন অবস্থা তূর্যের, তখন বন্ধুস্বজন অনেকেই সাংবাদিকতায় ঢোকার পরামর্শ দিয়েছিল। সেই অর্থে আটটাপাঁচটা ডিউটি নাই, ফ্রিডম আছে। আর তার যেহেতু লেখালেখির বাতিক আছে, সেই সুযোগও নাকি পাওয়া যাবে। শিক্ষকতায় ঢুকতে পারলে নাকি সবচেয়ে ভালো হতো অবারিত স্বাধীনতা, আবার জাতির বিবেকও নাকি হওয়া যায়! শুনেই তূর্যের ভিড়মি খাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল, আরঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো যাক, তাহলে সাংবাদিকতাই ভালো। শিক্ষক হয়ে জাতির বিবেক মারার মত রুঢ় পরিহাস তো অন্তত করতে হবে না।

সবই ঠিক ছিল, পরামর্শ মতো একটা প্রতিষ্ঠিত অনলাইন পোর্টালে জায়গা করে নিতে পারে তূর্য, কিন্তু কিছুদিন কাজ করার পরই মনে হলো এখানে সাংবাদিকতাটা হচ্ছে কোথায়? সাংবাদিকতা সম্পর্কে সেই যে প্রবাদপ্রতিম উক্তিআই টক এবাউট দ্য গভর্নমেন্ট, আই ডোন্ট টক টু দ্য গভর্নমেন্ট”এর ছিটেফোঁটাই বা কোথায় এখানে? আইএফ স্টোন মহাশয় বর্তমানকালের সাংবাদিক হলে হয়তো উল্টোটা বলতেন। স্রেফ রিপোর্টিংটাই ইদানিং সাংবাদিকতা, রাষ্ট্রকর্পোরেশনের প্রেসনোট পাবলিশ করার মহান (!) দায়িত্ব নিয়েছে যেন সবাই। কোনো প্রশ্ন নাই, কোনো অনুসন্ধান নাই। একটা আপাত বিদ্রোহী চেতনা দেখা যায় কোনো কোনো পত্রিকাপোর্টালের মধ্যে, কিন্তু তলে তলে সবাই টেম্পো চালায়। একদিন এই কথাটা তূর্য শেয়ার করেও ফেলে এক কলিগের সঙ্গে। তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই বলেন, “আরে তূর্য টেনশন করো ক্যান? তুমি যখন সিনিয়র হইবা, তখন টকশোতে গিয়া সাংবাদিকতা ফলানোর বিস্তর সুযোগ পাইবা। শুধু সাংবাদিকতা কেন, একাধারে বুদ্ধিজীবী, চিন্তক, তাত্ত্বিক এইগুলাও হইতে পারবা। হোয়াই টেকিং সো স্ট্রেস ম্যান?” বলেই দুগ্ধপোষ্য শিশুর হঠাৎ বড় হতে চাওয়ার সময় অনর্থক জিজ্ঞাসাকে ভালোই জব্দ করা গেছে সুলভ হাসি দিলেন।

অনেকদিন পর ‘তলে তলে টেম্পো চালাও’ শব্দটা মনে পড়ায় হাসি পেলো তূর্যের। বিশ্ববিদ্যালয় আর কিছু দিতে পারুক বা না পারুক, কিছু শব্দের দীক্ষা দিতে পেরেছে। যেমন, “কিরে ম্মম্মাহ ঝোল খাওয়া কেমন চলে?” বিশ্ববিদ্যালয়ের শব্দ সংস্কৃতির সঙ্গে যাদের পরিচয় নাই, তাদের কাছে এটাকে বন্ধুতে বন্ধুতে নির্দোষ খুনসুটি সুলভ শব্দপ্রয়োগই মনে হবে। কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে ভয়াবহ অশ্লীল ইঙ্গিত। সাধারণত যেসব ছেলেরা মেয়েদের কাছে পাত্তা পেত না, তারাই তাদের নারীমহলে জনপ্রিয় বন্ধুদের উদ্দেশ্যে এসব বলতো এবং এই শব্দপ্রয়োগের ক্ষেত্রে কুশীলসুশীল মিলেমিশে একাকার। এরকমই আরেক শব্দগুচ্ছ ‘তলে তলে টেম্পো চালানো’। বাইরে তোমার যাই থাক চান্দু, ভেতরে ভেতরে তুমি আপোষ কইরা বইসা আসো!

এসব ভাবতে ভাবতেই তূর্যের মনে পড়লো এতো ভাবার ফুরসত তার নাই। একে তো তার ইন্টারেস্টের মধ্যে পড়া অ্যাসাইনমেন্ট, তার উপর বস সময় দিয়েছে মাত্র সাতদিন। ও আচ্ছা, অ্যাসাইনমেন্টের বিষয়ই তো বলা হয়নি। গুম। ফোর্সড ডিসএপিয়ারেন্স। সাম্প্রতিক সময়ে শহরে কতগুলো গুমের ঘটনা ঘটেছে, কারা গুমের শিকার হয়েছে, সম্ভাব্য কারণ, পারিবারিক অবস্থা, কোন শ্রেণীর মানুষ, রাজনৈতিক অবস্থানসহ ইন্স এন্ড আউটস এবাউট গুম। অ্যাসাইনমেন্টটা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তূর্য খুশিতে বাকবাকুম হয়ে গেছে। তবে অফিসে খুব বেশি উচ্ছ্বাস দেখানোর সুযোগ নেই। এখানে সবই পরিমাণ মতো। রিজিড। কলিগরা সবাই জানে কোন ঘটনায় কতটুকু হাসতে হবে, কোন ঘটনার পেছনে কতোটুকু সময় ব্যয় করতে হবে। তূর্যের মনে হয়, এরা ক্যামনে পারে? প্রত্যেকেই প্রত্যেকের ভেতরের ফেইক দরদ, প্রতিক্রিয়া টের পাচ্ছে আবার এসব নিয়ে দিব্যি চালিয়েও যাচ্ছে। তূর্য কেন পারেনা? পারছেনা? পাশের ডেস্কের শায়লা আপু কিছুদিন আগে জিবা জড়ানো কন্ঠে যা বলেছিল, তার মানেটা পরিষ্কার হতে থাকে, “তূর্য, একটা কথা বলি কেমন? তোমার শরীর থেকে এখনো ছাত্র ছাত্র গন্ধ যায়নি। আই লাভ ইউর টেন্ডারনেস।” বলেই ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হেসেছিল। শায়লা আপুকে তূর্য খুব পছন্দ করে। মাঝে মাঝে অফিস শেষে শায়লা আপু তাকে ট্রিট দিতে চায়, কিন্তু অফিসের পর তূর্যের মক্কা ত্রপা, তাই কেবলা চেঞ্জ করার সুযোগ নাই। শায়লা আপুর পয়সা অনেক। সেই তুলনায় পয়সা ঢালবার জায়গা কোথায়? শপিং আর রেস্টুরেন্টের পেছনে কত আর খরচ করা যায়? একঘেয়েমি বলেও তো একটা ব্যাপার আছে নাকি!

তূর্য ফুল ফোর্সে অ্যাসাইনমেন্টের কাজে নেমে পড়ে। প্রথমেই ওয়ার্কপ্ল্যান ঠিক করে নেয়। গত কয়েক মাসের পত্রপত্রিকা ঘাটতে হবে। কিন্তু পত্রপত্রিকায় আর কয়টা গুমের খবর ছাপা হয়? ওই যে পরিমাণমতো কথাটা তো এ ক্ষেত্রেও খাটবে। কিন্তু এত বড় অ্যাসাইনমেন্ট তূর্য একলা করে কী করে? মাথায় মুহিবের নামটা আসে। বিশ্ববিদ্যায়ের প্রিয় জুনিয়রগুলোর মধ্যে একজন এবং যথেষ্ট হেল্পফুল। রাজনীতি না করলেও পলিটিক্যালি কনশাস একটা ছেলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই তাকে বাম ভাবে। মুহিব আপত্তি করেনা। বাম বলতে এতো বেশি কিছু বোঝায় যে, আপত্তি করার কিছু খুঁজে পায়না সে। যদি বলা যায়, কাজটা করে দে, স্কট কিংবা গ্রেইবার পাবি। তাহলেই আর বাক্য ব্যয় করতে হবে না। হৃষ্টচিত্তে করে দেবে কাজ। ওকে দিয়ে জরুরি মালমশলাগুলো তৈরি করানো যাবে। মালমশলা যত ভালো, তরকারি হবেতো ভালো।

এই অ্যাসাইনমেন্টটা যে করেই হোক খুব সিরিয়াস হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন তূর্যের পড়াশোনার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল স্ট্যা, , ভায়োলেন্স। মনে পড়ে প্রথম যখন পড়েছিল রাষ্ট্র হচ্ছে বৈধ সন্ত্রাসের একচেটিয়া মনোপলি কি ধাক্কাই না সে খেয়েছিল! ছোটবেলায় পড়া সুশীল রাষ্ট্র তাহলে কোথায় গেল? এখন যতই সে পড়ে ম্যাক্স বেবার, নীৎশে, ফুকো, চমস্কি, ক্রপোৎকিন, পিঁয়েরে ক্লস্ত্রে, অ্যাগাম্বেন তার চিরচেনা সেই কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ধারণা মুছে যেতে থাকে। নতুন চিন্তা কি দুর্বিষহ যন্ত্রণা আর অভাবনীয় আনন্দ নিয়ে এসেছিল তার জন্য! এরপর থেকে সমাজরাষ্ট্রআইনকায়দাকানুনকে দেখার চোখই বদলে গেল তূর্যের। জনবহুল দ্বীপে নিজেকে সে আবিষ্কার করে একা, নিঃসঙ্গ। কতোতো তর্ক এসব নিয়ে! আশ্চর্য হয়ে তূর্য আবিষ্কার করে এখানে প্রত্যেকেই রাষ্ট্রপূজারী। একেবারে ‘ইচ এন্ড এভরিওয়ান’। ডান, বাম, আস্তিক, নাস্তিকসহ সকলেই। সকলেই মনে করে রাষ্ট্র জল হাওয়ার মত অমোঘ, অনিবার্য। কারো মধ্যেই অনুসন্ধিৎসা নাই। কেউ রাষ্ট্রকে সন্দেহ করেনা। কেউ রাষ্ট্রের দিকে আঙ্গুল তোলে না। এইভাবে নিজেকে একা, বিচ্ছিন্ন আবিষ্কার করে অসহায় লাগতে শুরু করে তূর্যের। আবার ভালোও লাগে। অনন্ত গড্ডাল তো সে নয়। মনে হয় এই ধাক্কাটার দরকার ছিল।

অফিস থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এতোসব ভাবতে থাকে তূর্য। চিন্তার ডালপালা কোথায় যে ছড়িয়ে যায়! বহুদিন পর নিজেকে বেশ চাঙ্গা মনে হতে থাকে। এতোটা উদ্দীপ্ত তাকে ইদানিং ত্রপাও করতে পারেনা। বসের চেহারাটা ভেসে ওঠে। শার্প, করিৎকর্মা মার্কা চেহারা। একটা প্রতিষ্ঠানকে কি করে টাইট রাখতে হয় এই লোক বেশ ভালো জানেন। তবে এতোদিন পর্যন্ত বসকে ঘিরে কোন আলাদা ভালো লাগা বা বিরক্তি কোনটাই ছিলনা তূর্যের। আজ বসকে একটু একটু ভালো লাগতে শুরু করেছে। তার জন্যই তূর্য আজ এতোটা এক্সাইটেড। অল ক্রেডিট গোজ টু মিস্টার হামিদ চৌধুরী

হঠাৎ ভুলে যাওয়ার পর কোন অনিবার্য করণীয় মনে পড়লে যেভাবে চমকে ওঠে মানুষ, ঠিক সেভাবে চমকে ওঠে তূর্য ত্রপার কথা মনে পড়ায়। এক্ষুণি ফোন লাগাতে হবে। প্রথম রিং হতেই ফোন ধরে ত্রপা। কোন একটা কারণে সে বেশ খুশি তা তার উচ্ছ্বসিত কন্ঠস্বরেই টের পাওয়া যায়। সেও অফিস থেকে বের হয়েছে। তার কাছে যাওয়া মাত্রই উচ্ছ্বাসের কারণটা জানা গেল। সামনের মাস থেকে তার বেতন বাড়বে। আরো কিছু টাকা প্রসাধনীর পিছনে ব্যয় হবে কথাটা বলতে গিয়েও বললো না তূর্য। এই মুহূর্তে ত্রপাকে রাগানো ঠিক হবেনা। সামনে তার অনেক বড় কাজ।

শরমা হাউজে চলো। শরমা খেতে ইচ্ছে করছে।”, রিকশায় উঠেই বলে তূর্য।

বাহ হঠাৎ ভোগ বিলাস করতে চাইছো? এরকম ভোগবাদী পুঁজিবাদী হলে হবে?” খোঁচাটা মোক্ষম হলো, ভাবে ত্রপা। তূর্য হেসে ফেলে। ত্রপা তাকে বুঝে ফেলেছে বোন টু বোন।

আহা তাই বলে একটুআধটু অবকাশ যাপনও করা যাবে না নাকি? আর এই শহরে অবকাশও যে কিনতে হয় ভুলে গেলে নাকি? শুধুমাত্র ভোগের উদ্দেশ্যে বাঁচাটাকেই ভোগবাদী বলে। টুকটাক স্বাদের পরিবর্তনের ইচ্ছা তো হতেই পারে তাইনা?”

রেস্টুরেন্টে এসেই বিরক্ত লাগা শুরু করলো তূর্যের। কিছু মানুষকে দেখলে মনে হয় এরা শুধু রেস্টুরেন্টে খায়, সেলফি তোলে, চেক ইন আর আপলোড দেয়। আর সবচেয়ে বিচ্ছিরি রকমের নার্সিসিজম মনে হয় কি খাচ্ছি সেই ছবিও ফেসবুকে তুলে দেওয়া। এসব দেখলে বিরক্তি লাগতেই থাকবে। এর চেয়ে ত্রপাকে নতুন অ্যাসাইনমেন্টের কথা জানানো যাক।

ত্রপা জানো, আর্জেন্টিনায় তখন সামরিক শাসন চলছে। সত্তরআশির দশকের দিককার কথা। সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তেমন কোন প্রতিবাদপ্রতিরোধ নেই। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যারাই মুখ খোলে তাদের খোঁজ আর পাওয়া যায়না। এমনকি যে সকল আইনজ্ঞ এরকম গুম হওয়া নিয়ে প্রতিবাদ করছিল, আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিল, তারাও নিরুদ্দেশ হতে শুরু করলো। চারিদিকে ভয়াবহ রকমের আতঙ্ক বিরাজ করছে। কেউ মুখ খুলছেনা। সেই সময়ে ১৪জন মা তাদের নিখোঁজ সন্তানদের খোঁজে পথে নামলেন। তারা প্রেসিডেন্সাল ভবন, মিনিস্ট্রিসহ বিভিন্ন জায়গায় ডেমনস্ট্রেশন করা শুরু করলেন। যেন একটা অচলায়তন ভাঙলেন তারা। তাদের দেখাদেখি আরো আরো মায়েরা তাদের নিখোঁজ সন্তানদের ফেরত চাইলেন। দেখতে দেখতে পুরো বিশ্বেরই নজর পড়লো ই মায়েদের উপর। এই মায়েরা ইতিহাসে ‘মাদারস অব দ্য ডিজএপিয়ার্ড’ নামে স্মরণীয় হয়ে আছেন।” তূর্য দীর্ঘক্ষণ বলা শেষ করে থামে।

তার মানে এখন এই গুম হয়ে যাওয়া নিয়ে আছো নিশ্চই?” এজন্যই ত্রপাকে এতো ভালো লাগে। সে ধরে ফেলতে পারে তূর্যের চিন্তা। অবশ্য শুরুর দিকে বেশ কষ্ট হতো। তূর্য যখন যা পড়তো, যা নিয়ে ভাবতো সেসব নিয়েই কথা বলতো ঘন্টার পর ঘন্টা। আর ত্রপা সে কি রাগ করতো! এখন ত্রপা মানিয়ে নিয়েছে, অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আচ্ছা, তূর্য ত্রপার কিসের কিসের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে? এটা মনে পড়তেই একটু যেন অস্বস্তি তৈরি হয় তূর্যের। থাক এখন সেসব না ভাবলেও চলবে।

রাতে রুমে এসেই কাজে ডুব দিলো তূর্য। আজ আর ভার্চুয়াল সামাজিকতা রক্ষার দিকে যায়না সে। মুহিবকে তার কাজটা বুঝিয়ে দেয় কেবল ইনবক্সে। এরকম কাজে মুহিব খুবই আগ্রহ পাবে তা জানাই ছিল। গত কয়েক মাসের পত্রপত্রিকায় যেসব গুমের খবর এসছে, সেগুলো জড়ো করবে মুহিব। মোটামুটি ঘাঁটাঘাঁটি করে তূর্য বেশ বড়সড় ধাক্কা খায়। গুমের সংখ্যা নেহাত কম না। কে নেই এই তালিকায়? বাম রাজনীতিক, সংস্কৃতিকর্মী, শ্রমিক নেতা, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, এমনকি সরকারি দলের নেতাকর্মী পর্যন্ত গুম হয়েছে! বেশিরভাগ গুমের ক্ষেত্রেই একই ঘটনা। একটা সাদা মাইক্রোবাস হঠাৎ বাড়ির গেটে কিংবা রাস্তায় টার্গেটের গতি রোধ করে থামে, কিছু ষণ্ডামার্কা লোক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে ওই ব্যক্তিকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে নেয় এবংসেই ব্যক্তির আর ফেরত না আসা। কখনো কখনো সপ্তাহখানেক পরে কারো কারো লাশ নদীর ধারে ভেসে উঠতে দেখা যায় অথবা তাদের লাশ পাওয়া যায় খোলা ময়দানের পাশে ঝোপে। লাশগুলোর বীভৎস অবস্থা, হাতপাচোখ বাঁধা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে চোখ উপড়ে ফেলা হয়। তূর্যের গা শিওরে ওঠে। এমন না যে গুমের ব্যাপারে সে বকলম ছিল। কিন্তু এখন যতই গভীরে সে ঢোকে, তার বিভীষিকাময় লাগতে থাকে। এতোতো গুম? তাও এক শহরে? সারাদেশের তাহলে কী অবস্থা? মাথা ভারী হয়ে আসে তূর্যের। আজ বাথরুমেও বিশেষ সুবিধা করা যায়না। ইজাকুলেশন হয় না। ত্রপা, শায়লা আপু, সায়মা কাউকেই কল্পনায় আনা যাচ্ছে না। মাথার ভেতর কেবল ঘুরছে গুম গুম গুম গুম গুম….

মুহিব একটা ‘মাইন্ডব্লোয়িং’ ছেলে। সে কেবল গুম হওয়া ব্যক্তির তালিকাই তৈরি করেনি। পত্রপত্রিকায় যে সমস্ত নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান চেয়ে বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছে সেসবেরও একটা তালিকা তৈরি করেছে। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে নিরুদ্দেশ ব্যক্তির নামে কতগুলো জিডি হয়েছে থানায়, সেই খোঁজও সে নিয়েছে। এদের সবাই নিশ্চ গুম হয়নি, তবুও এটা একটা ভালো কাজ। এসব ধরে ধরে এগুলেও অনেক সূত্র মিলবে। প্রয়োজনে বসের কাছ থেকে কিছু সময় এক্সটেন্ড করিয়ে নিবে। তবুও কাজ ভালো হতেই হবে। মুহিব ছেলেটার কথা ভাবে তূর্য। দুই ব্যাচ জুনিয়র। অথচ মাঝে মাঝে তূর্যের চেয়ে বেশি পরিণত আচরণ করে ফেলে। এই যেমন নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিজ্ঞাপন, জিডি এসব নিয়ে তূর্য মোটেও ভাবেনি। হঠাৎ হৈচৈ এর শব্দে সম্বিত ফেরে তূর্যের। ডেস্ক থেকে মাথা তুলতেই দেখতে পায় কলিগরা সবাই রেস্টরুমে। ও আচ্ছা, আজ তো বাংলাদেশের খেলা। তার মানে আজ অফিস চলবে ঢিলেঢালা। তূর্য রেস্টরুমে ঢুঁ মারে, টেলিভিশনের পর্দায় ভাসছে গ্যালারির ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ স্লোগান সম্বলিত বিশাল ব্যানার। স্লোগানটা মাথায় খেলে যায় যেন তূর্যের। তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনাবাহ! এই কারণেই কি গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ধলেশ্বরী, সুরমা, কুশিয়ারায় ভেসে ওঠে? আহা রাষ্ট্র! তোমার লীলা বোঝা বড় দায়!

পৃথিবী একটা খোলা বইয়ে পরিণত হলে যে সন্তুষ্টি ও যন্ত্রণা কাজ করে একই সঙ্গে, সেই রকম একটা সন্তুষ্টি ও যন্ত্রণা নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ে তূর্য। আজ বাকি কাজ বাসাতেই করবে। শুধুমাত্র খেলা দেখার জন্য অফিসে থাকার কোন মানে হয় না। খেলা ফেসবুকের পাতায় পাতায়। স্ক্রল করা মাত্রই বল টু বল আপডেট। এর চেয়ে বরং আম্মাকে ফোন দেয়া যাক। গত রাতে কাজের চাপে আম্মার ফোন ধরা হয়নি। আম্মার কথাবার্তায় ইদানিং পুত্রদায়গ্রস্ত সুলভ হাহাকার। অবশ্য আম্মাকে দোষ দেওয়া যায় না। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো বিয়ে করে ফেলছে। কারোর কারোর তো বাচ্চাকাচ্চাও জন্ম দেওয়া শেষ। সেদিনের ছেলে অমিত, পাশ করেছে দুদিন হয়নি অথচ বিয়ে করে বসে আছে। আর লাবণ্য? পুঁচকি মেয়েটা একটা কন্যাসন্তান প্রসব করলো দিন দশেক আগে। কেন রে ভাই? তোদের এত তাড়া কিসের? আর ক’টা দিন প্রেম করলে হয়টা কী? যত্তসব ইঁচড়েপাকা পোলাপাইন। এসব খবর আম্মা ফোনে জানায় আর আফসোস করে। তারও তো নাতিনাতনির মুখ দেখতে ইচ্ছে করে নাকি! আব্বা অবশ্য এসব ব্যাপারে বেশ সংযত মন্তব্য করে। ছেলেদের পঁচিশের মধ্যে বিয়েটা সেরে ফেলা উচিত টাইপ। তূর্য কেবল শোনে। কিছুই বলেনা। কীইবা বলতে পারে সে?

ফ্রেশ হয়ে বিছানায় এসে সেইভ করে রাখা নিউজ লিংক,পত্রিকার কাটিংগুলো দেখতে থাকে তূর্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য, সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, আইনজীবী, সিভিল সোসাইটি, মানবাধিকার সংস্থার বিবৃতি, প্রতিক্রিয়াগুলো খেয়াল করার মতো। দেখা যাচ্ছে যে কেউই আসলে গুমের ধারণাটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেনা। সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতো স্বাভাবিকভাবেই না, এমনকি মানবাধিকার সংস্থাও না। তারা মূলত গুমের ফ্রিকোয়েন্সি অর্থাৎ গুমের সংখ্যা নিয়ে চিন্তিত। যেমন একজন গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকারকর্মীর বিবৃতি তূর্যের নজর কাড়ে, “গুমখুন সীমা অতিক্রম করে ফেলছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এতো বেশি গুমখুন আইনের শাসনের দৃষ্টান্ত নয়।” প্রথমেই যে প্রশ্নটা মাথায় টোকা দেয়, হোয়াট ইজ দিস সীমা? তার মানে কি গুম সীমার মধ্যে হলে আইনের শাসন ঠিকঠাক থাকবে? তূর্যের মনে হয়, ওই মানবাধিকারকর্মী না বুঝে কিছু বলেননি, বরং তার মনে হয় কি পরিমাণ গুম হলে তা আইনের শাসনের সীমা অতিক্রম করেনা সেটা পশ্চিমা এনজিও স্পন্সরড মানবাধিকার সংস্থা, সিভিল সোসাইটি ভালোই জানে।

মিডিয়ার ব্যবহৃত শব্দবন্ধনীও নজর এড়ায় না। “অমুক স্থান থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার করা গেছে।” ‘অজ্ঞাত’, ‘মৃতদেহ’, ‘উদ্ধার’ শব্দগুলো তূর্যের করোটিতে ব্যাপক ঝড় তোলে। ব্যক্তি উদ্ধার না পেয়ে মৃতদেহ কী করে উদ্ধার পায়? কেন পায়? ব্যক্তিকে দেহতে পরিণত করাই কি তাহলে জীবনমরণের বিধাতা রাষ্ট্রের কাজ? এটাই কি তাহলে ফুকোর সেই আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্রের বায়োপাওয়ার তথা জৈবক্ষমতা? চিন্তার জট যেন খুলতে থাকে। আরো কয়েকটা কেস স্টাডি করে তূর্য। কিছুক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার প্রেসক্লাব কিংবা ডিসির অফিস কিংবা কোনো পাবলিক স্পেসে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। তারা তাদের স্বজনকে অক্ষত ও জীবিত অবস্থায় ফেরত চায়। অক্ষত, জীবিত শব্দগুলোর মানে এতো পরিস্কার বুঝতে পারেনি আগে কখনোই তূর্য। সব চিন্তার একটা মালা তৈরি হচ্ছে। সো মিনিংফুল। চ্যাটে মুহিবের সঙ্গে ভাবনাগুলো শেয়ার করে তূর্য। মুহিব আরো একবার মুগ্ধ করে তাকে। সে বলে একই সপ্তাহের পত্রিকার সংবাদের মধ্যে বেশ যোগসূত্র আছে। ধরতে পারাটাই হলো কাজ। পত্রিকার সামনের পাতার সংবাদ যদি থাকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের জন্য অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র কেনার খবর, গার্মেন্টস সেক্টরে বিদেশী বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগের খবর , সেই একই সপ্তাহে পেছনের পাতায় হয়তো ছাপা হয় কোন শ্রমিক নেতার গুম হওয়ার খবর। মুহিব ইজ টাইপিং লেখা ভাসতে থাকে স্ক্রিনে। তূর্য নিজেকে বার আবিষ্কার করে যেন। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ধারাবাহিকভাবে, সবচেয়ে নীরবে গুমের শিকার নাকি হয় শ্রমিকশ্রেণী। ইংল্যান্ডে প্রথম পুলিশ বাহিনী গঠন করা হয় শিল্প বিপ্লবের পর। উদ্দেশ্য নতুন বিকশিত শ্রমিকশ্রেণীকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। বিশ্বের অনুন্নত রাষ্ট্রসমূহে সস্তা শ্রম, শ্রম শোষণের সাম্রাজ্যিক ছক এসব নিয়ে ঝাড়া লিখে চলে মুহিব। সে এদুয়ার্নো গ্যালিয়ানোর বই পড়ে নাকি এসব জেনেছে। কল্যাণকামী রাষ্ট্র একটা মিথ ছাড়া কিছুই না, শ্রম শোষণের সাম্রাজ্যিক ছক, তৃতীয় বিশ্বে কোন ফ্যাক্টরি নাই , যা আছে সব সোয়েট শপশ্রমশিবির এসব কথা পড়ে তূর্যের মনে হয় মুহিব ছেলেটা কি বামপন্থী হয়ে উঠছে ইদানিং?

নিজেকে এতোটা অসহায় মনে হয়নি তূর্যের কখনো। এ তো ভয়াবহ ব্যাপার। রাষ্ট্র মানেই দেখা যাচ্ছে কিলিং মেশিন। তার এখন ভয় লাগছে এই রিপোর্ট পাবলিশ হবার পরে তার অস্তিত্ব থাকবে তো? ত্রপাকে খুলে বলে সবকিছু। সে বলে এসব কিছু না। গুম নিয়ে কাজ করায় তূর্য নাকি ট্রমার মধ্যে আছে। অন্য কাজে হাত দিলে ঠিক হয়ে যাবে। ত্রপাকে নিয়ে এই এক শান্তি। পরিস্থিতি বুঝতে পারে মেয়েটা। সবসময় সাপোর্টিভ মুডে থাকে। এই কথা ভাবতেই আবারো সেই অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে চলে আসে। পরিস্থিতি অনুযায়ী আচরণ তূর্য নিজে কি করে? সে কি সাপোর্টিভ থাকতে পেরেছে কখনো? ধুর ছাই! এসব আবার ভাবার কিছু হলো? ফাইলে মনোযোগ দেয় তূর্য। ত্রপার ভাবনা সরতেই গুম তার বিমূর্ত রাক্ষস মূর্তি নিয়ে হাজির হয়। গুম গুম গুম গুম গুম। মুহিব তাহলে ঠিকই বলেছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইদানিং গুমের মাসতুতো ভাই খুন কম হয় এই ধারণা ঠিক না বরং সবার সহ্যসীমা বেড়ে গেছে। আগে খুন হলে বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকতো, এখন কম দিন বন্ধ থাকে বা থাকেইনা। মুহিব ছেলেটার জন্য চিন্তা হয় তূর্যের।

কিন্তু গুম তো খুনের চেয়েও ভয়ংকর। গুম হওয়া ব্যক্তি না জীবিত না মৃত। আইনত সে মৃত না। পুলিশের খাতায় সে মৃত না। ফলে তার স্থাবরঅস্থাবর সম্পত্তি কেউ ক্লেইম করতে পারেনা। কী ভয়াবহ! কী করুণ! এ তো একজনের নাই হয়ে যাওয়া না, গোটা পরিবারের নাই হয়ে যাওয়া। আত্মীয়স্বজন সবার একযোগে নাই হয়ে যাওয়া। একজন হারিয়ে যায় কালের গর্ভে, বাকিরা বেঁচে থেকেও আসলে মৃত। জীবন্মৃত। আসলে আমরা সবাইই কি গুম হয়ে যায়নি? তূর্য ভাবে, আমাদের সত্তাই কি গুম হয়ে যায়নি? মার্কেজের গল্পউপন্যাসে বর্ণিত সময়ের মতো একটা সময় কি পার করছিনা আমরা? মার্কেজের অনেক সমালোচক মনে করেন, এই যে মার্কেজের অনেক গল্পে চরিত্রের কোন নাম থাকেনা, স্রেফ থাকে বেহালাবাদক, কর্নেল, প্রৌঢ়, প্রৌঢ়া; এর কারণ মার্কেজের সেই সময়ে লাতিন আমেরিকায় ব্যক্তিসত্তাই গুম হয়ে গিয়েছিল। বহুদিন পরপর এক একটা স্বাভাবিক মৃত্য হতো। এই গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিসত্তা মার্কেজকে তাড়িয়ে বেড়াতো বলেই মার্কেজ চেতন বা অবচেতনভাবে চরিত্রের নাম উহ্য রাখতেন। তূর্যের মনে হয়, তার চেয়েও একটা ভয়াবহ সময় হয়তো এ সময়ে এখানকার মানুষ অতিবাহিত করছে। যখন গুমেরও বৈধতা আছে।

আস্তিকের কাছে নাস্তিকের গুম হওয়া, নাস্তিকের কাছে আস্তিকের গুম হওয়া, ডানের কাছে বামের গুম হওয়া, বামের কাছে ডানের গুম হওয়া এবং সামগ্রিকভাবে সমষ্টিগত চেতনার গুম হয়ে যাওয়ার সময়ে বাস করছে তূর্য। ভালোবাসা, সমঝোতা, বোঝাপড়া, সহমর্মিতা, আনন্দ, উচ্ছ্বাস, মানবিকতা গুম হয়ে যাওয়ার সময়ে বাস করছে তূর্য ও তার পৃথিবী। ঘৃণা, দ্বেষ, কতলই যাদের কাছে শেষকথা পৃথিবী যেন আজ অচল তাদের সুপরামর্শ (!) ছাড়া। তূর্যের মনে হতে থাকে মানুষ হয়তো আয়নায় নিজেকে এখন আর দেখতে পায়না কিংবা দেখতে পায় আপাদমস্তক ঘৃণা। যার আয়না যতো বড়, তার ঘৃণা ততো বেশি। তূর্য কি আয়নায় নিজেকে দেখতে পাবে? প্রতিবিম্ব ঘৃণা গায়ে মেখে কি কাল সে অফিসে যাবে? অরওয়েলকে মনে পড়ে তূর্যের। জর্জ অরওয়েল আপনি বলেছিলেন দুই মিনিট ঘৃণার কথা। আপনি কি জানতেন ঘৃণা মনুষ্যত্বকেই গুম করে ফেলবে?

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s