কর্পোরেট লুটের বিরুদ্ধে নিয়মগিরি রক্ষা করতে গ্রিন নোবেল জয়ীর আহ্বান

Posted: জুন 1, 2017 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: অজয় রায়

এ বছর গোল্ডম্যান পরিবেশ পুরস্কার জয়ী উড়িশ্যার সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলনের নেতা প্রফুল্ল সামন্তরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তার কর্পোরেটবান্ধব নীতি পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।[] ডোঙ্গরিয়া কোন্ড আদিবাসীদের ভূমির অধিকার সুনিশ্চিতকরণ এবং বৃহদায়তন, উন্মুক্ত আকরিক অ্যালুমিনিয়াম খনি প্রকল্প থেকে নিয়মগিরি পাহাড় রক্ষা করতে সামন্তরা বারো বছরব্যাপী আইনি লড়াই চালান। যা নিয়মগিরির বুকে স্থানীয় আদিবাসীদের চলমান গণসংগ্রামেরই পরিপূরক ছিল।

উল্লেখ্য, গোল্ডম্যান এনভায়রনমেন্টাল প্রাইজ গ্রিন নোবেল পুরস্কার নামেও পরিচিত। যার জন্য গত এপ্রিলে এশিয়া থেকে মনোনীত হন সামন্তরা। কর্পোরেটের হাতে প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের বিরুদ্ধে, জনসাধারণের অধিকার রক্ষার জনআন্দোলনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন তিনি এই পুরস্কারটিকে। সামন্তদের মতে, বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের অধীনে ভারতীয় রাষ্ট্র রূপান্তরিত হয়েছে কর্পোরেট রাষ্ট্রে, যা আমাদের জনসাধারণের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকারের বিরোধী[]

এদিকে, লক্ষণীয় বিষয় হলো, গত ১ মে নিয়মগিরিতে কুনি সিকাকা (২০) নামে এক আদিবাসী যুবতীকে গ্রেপ্তার করে নিরাপত্তা বাহিনী।[] তিনি বামপন্থী জঙ্গি বলে দাবি পুলিশের। কুনি সিকাকার দুই আত্মীয় ডোঙ্গরিয়া কোন্ডদের সংস্থা নিয়মগিরি সুরক্ষা সমিতির (এনএসএস) সদস্য। যারা থানায় তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের উপস্থিতিতেই পুলিশ এটাকে আত্মসমর্পণ হিসেবে উপস্থাপন করে। পরে অবশ্য তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একাংশের বক্তব্য, মধ্যরাতে হানা দিয়ে পুলিশ ঐ আদিবাসী যুবতীকে আইনবিরুদ্ধভাবে আটক করে। এদিকে, এনএসএসএর সভাপতি কুমুতি মাঝি অভিযোগ তুলেছেন যে, কুনি সিকাকার স্বামী এবং শ্বশুর এনএসএসএর সদস্য বলেই তাকে পুলিশ নিশানা করেছে। মাঝি আরও বলেন, বক্সাইট খননের উদ্যোগ এখনও চলছে। আর সেই চেষ্টায় রাজ্য সরকার ডোঙ্গরিয়ার স্থানীয় মানুষদেরকে ‘বামপন্থী জঙ্গি’ আখ্যা দিচ্ছে ও তাদের ধরপাকড় করছে কর্পোরেটের চাপে।[]

প্রসঙ্গত, উড়িশ্যার কালাহাণ্ডি এবং রায়গড়া জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে নিয়মগিরি পাহাড়। সেখানকার অধিবাসীরা বেশিরভাগই ডোঙ্গরিয়া কোন্ড জনজাতির মানুষ। ২০০৪ সালে বহুজাতিক সংস্থা বেদান্ত উড়িশ্যা সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে। সেই মোতাবেক সিদ্ধান্ত হয় যে, নিয়মগিরি পাহাড় খনন করে বক্সাইট উত্তোলন করা হবে। স্থানীয় আদিবাসীরা অবশ্য গোড়া থেকেই এর বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু করেন। তাদের বক্তব্য হলো, পবিত্র নিয়মগিরি পাহাড়ে খনি প্রকল্প হলে তা ওই অঞ্চলের পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করবে। তাদের জল ও প্রাকৃতিক সম্পদের সরবরাহ বিঘ্নিত হবে। আর জীবিকা এবং বাসস্থান বিপন্ন হয়ে পড়বে। উল্লেখ্য, বক্সাইটসমৃদ্ধ পাথর আছে নিয়মগিরির পাহাড়ের উপর দিকে। যে পাথর বৃষ্টির জল ধরে রাখে। আর বছরজুড়ে সেই জল নদী হয়ে নেমে আসে।

আদিবাসীদের এই আন্দোলনের মুখে ২০১০ সালে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রণালয় নিয়মগিরির অরণ্যপর্বতে বক্সাইট খননের অনুমোদন বাতিল করে দেয়।[] কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে উড়িশ্যা সরকার সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছিল। তবে সুপ্রিমকোর্ট তার রায়ে জানিয়ে দেয়, এই প্রকল্পকে ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে দুটি জেলার গ্রাম সভার উপর। আর ২০১৩ সালে নিয়মগিরির আদিবাসী গ্রামসভাগুলি সিদ্ধান্ত নেয়, এ অঞ্চলের অরণ্যপর্বতে বক্সাইট খনন করা যাবে না।

স্পষ্টতই, নয়াউদারবাদী নীতির অধীনে ‘উন্নয়ন’এর নামে ভারতেও প্রাকৃতিক সম্পদ অবাধে লুট করতে তৎপর বহুজাতিক সংস্থাগুলো। আর ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের মতে, বেসরকারি খনি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সরকার নামমাত্র পরিমাণে রাজস্ব পাচ্ছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরাজনীতিবিদআমলা চক্র দেদার মুনাফা কামাচ্ছে।

এর মধ্যেই নিয়মগিরি পাহাড়ে বক্সাইট খননের অনুমোদন দিতে নতুন করে গ্রামসভার মতামত নেওয়ার জন্য উড়িশ্যা মাইনিং কর্পোরেশন গত বছর যে আরজি জানিয়েছিল, তাও খারিজ করে দেয় শীর্ষ আদালত। তবে লক্ষণীয় যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্প্রতি প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নিয়মগিরি সুরক্ষা সমিতি বেআইনি ঘোষিত বামপন্থী জঙ্গি দলের একটি ফ্রন্টাল সংগঠন। প্রফুল্ল সামন্তরা অবশ্য বলেছেন, “নিয়মগিরি সুরক্ষা সমিতি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট সম্পূর্ণ মিথ্যা আর তা ডোঙ্গরিয়া ও সেই সঙ্গে ঝরানিয়া এবং কুটিয়া আদিবাসীদের স্বাভাবিক বাসভূমির অধিকার খর্ব করার উদ্দেশ্যমূলক প্রচেষ্টা। যার বিরুদ্ধে আদিবাসীরা এনএসএসএর অধীনে ২০০৩ সাল থেকেই গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন।”[]

২৫/০৫/২০১৭

তথ্যসূত্র

[] “Rethink ‘corporate-friendly’ policy, Green Nobel winner Prafulla Samantara to PM Narendra Modi”, May 03, 2017, The Economic Times

[] Ibid

[] “Niyamgiri activists allege witch-hunt”, May 18, 2017, The Hindu

[] ‘‘Odisha government targeting Dongrias to resume mining, allege NSS’’, May 06, 2017, The New Indian Express

[] Neha Sethi, “Government rejects Vedanta’s bauxite mining plans in Niyamgiri”, January 11, 2014

[] Prafulla Das, “Not a front for Maoists, says Niyamgiri samiti”, April 18, 2017, The Hindu

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s