লিখেছেন: সৌম্য মন্ডল

নকশালবাড়ির রাজনীতি নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য এই লেখা। যারা সব জানেন, এটা তাদের জন্য লেখা নয়, বরং যারা জানতে চান এ লেখা তাদের জন্য।

) নকশালবাড়ি থেকে অনেক বড় বড় সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন বাংলায় বা ভারতে ঘটে গেছে। ঘটে গেছে এবং ঘটে চলেছে অনেক প্রতিরোধ। কিন্তু তবুও সেই আন্দোলনগুলো থেকে নকশালবাড়ির নাম স্বতন্ত্র। কিন্তু কেন? কারণ নকশালবাড়ি আন্দোলন শুধু ১৯৬৭ সালের একটি গ্রাম, বা একটি কৃষক আন্দোলনের নাম নয়। যদি তাই হতো, তাহলে অন্যান্য আন্দোলনগুলোর থেকে আলাদাভাবে নকশালবাড়ির গুরুত্ব থাকতো না। নকশালবাড়ি একটা বিশেষ রাজনৈতিক লাইন বা আন্ডারস্ট্যান্ডিংএর নাম।

সিপিআই (এম)-এর ভেতর সুবিধাদি অকমিউনিস্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে যারা মতাদর্শগত সংগ্রাম চালাচ্ছিলেন, বিকল্প বিপ্লবী কমিউনিস্ট রাজনীতির পক্ষে পার্টি কর্মী এবং জনগণকে সংগঠিত করছিলেন, নকশালবাড়ি হলো তাদের রাজনীতির প্রতিষ্ঠা। সুতরাং রাজনৈতিক লাইন বা আন্ডারস্ট্যান্ডিংএর ভিত্তিতে আমরা ভারতের কমিউনিস্ট রাজনীতিকে দুভাগে ভাগ করতে পারি। নকশালবাড়ির আগে এবং নকশালবাড়ির পরে। সুতরাং নকশালবাড়ি আন্দোলন আমাদের কাছে শুধু একটা ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক কর্মসূচী, তত্ত্ব।

) নকশালবাড়ির রাজনীতি কি?

# নকশালবাড়ির সময় থেকে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচী কেবল মজুরি বৃদ্ধি বা জমি দখলের সংগ্রাম নয়, পার্টির কর্মসূচী পরিণত হয় রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল, বিপ্লব। অর্থাৎ মার্ক্স, লেনিন মাওদের বিপ্লবী মতাদর্শকে ভারতে প্রতিষ্ঠা করা।

# কর্মীদের আত্মত্যাগ, গণসংগ্রামকে ভোট বাক্সে ভাঙিয়ে কাউন্সিলর, এমএলএ, এমপি বের করার লক্ষ্যের পরিবর্তে লক্ষ্য পরিণত হয় রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্য কে সেবা করা।

# নকশালবাড়ির সময় থেকে বিপ্লব, সশস্ত্র সংগ্রাম, ক্ষমতা দখল ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির আ্যজেন্ডাইয় পরিণত হয়।

# ভোটে লড়ে বিপ্লব যে হয় না, এ নিয়ে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। অন্যদিকে, ভারতের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে এবং বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এক সঙ্গে দেশজোড়া সশস্ত্র অভ্যুত্থান সম্ভব নয়। ভারতের বিপ্লবের পথ দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধ। শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে, কৃষি বিপ্লবী অক্ষে। লাল ফৌজ গঠন, অঞ্চলভিত্তিক ক্ষমতা দখল, গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও, ঘাঁটি এলাকা তৈরি, এই হলো বিপ্লবের লাইন।

# বিপ্লবের শত্রু সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ। এদের দেশি চামচা পুঁজিপতি, যেমন টাটা, বিড়লা আম্বানি ইত্যাদিরা। বিপ্লবের বন্ধু শ্রমিকশ্রেণীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভূমিহীন ক্ষেত মজুর, কৃষক সম্প্রদায়। সাম্রাজ্যবাদের কাছে নিপীড়িত ছোটো পুঁজিপতি বিপ্লবের বন্ধু। এ ছাড়াও নিপীড়িত নিম্ন বর্ণ, জাতিসত্তা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বিপ্লবের বন্ধু।

) নকশালবাড়িই কি প্রথম দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধ বা সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের প্রথম প্রয়োগ ভারতে? না, এর আগে অনেকবার কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা সশস্ত্র কার্যকলাপ চালিয়েছেন, তেলেঙ্গানা বিদ্রোহ তার একটি চমৎকার উদাহরণ। পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চাপে যা ধ্বংস হয়। নকশালবাড়ির সময় থেকে জনযুদ্ধ এবং কৃষি বিপ্লব পার্টির কেন্দ্রীয় আ্যজেন্ডায় পরিণত হয়। এর আগে কর্মীদের উদ্যোগ থাকলেও পার্টি লাইন ছিলো না।

) নকশাল ও মাওবাদী কি আলাদা? নকশালবাড়ি আন্দোলনের সময় ১৯৬৯ সালে দুটি কমিউনিস্ট বিপ্লবী সংগঠন তৈরি হয় সিপিআই (এমএল) এবং এমসিসি। ১৯৭২ সালে সিপিআই (এমএল)-এর সাধারণ সম্পাদক চারু মজুমদার পুলিশ হেফাজতে শহীদ হওয়ার পর পার্টি বহুভাগে ভেঙে যায়। এই সিপিআই (এমএল)-এর ভেঙে যাওয়া গ্রুপগুলোর মধ্যে কিছু গ্রুপ ঐতিহাসিক আন্দোলন হিসেবে নকশালবাড়িকে মান্যতা দিলেও নকশালবাড়ির রাজনৈতিক লাইন থেকে তারা সরে এসে বিভিন্ন কায়দায় নকশালবাড়ি পূর্ব সংশোধনবাদী রাজনীতিতে ফিরে আসে। আর কিছু সিপিআই (এমএল) গ্রুপ ছিলো বা আছে, যারা নকশালবাড়ির রাজনৈতিক লাইন থেকে সরে আসেনি, তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ এমসিসির সঙ্গে পার্টি ঐক্য করে সিপিআই (মাওয়িস্ট) পার্টি গঠন করে। অর্থাৎ, নকশালপন্থীরা শুধু ভেঙে যায় এমনটা নয়, এখন জুড়ে যাওয়াটাই প্রধান। সব সিপিআই (এমএল) গোষ্ঠী নকশালবাড়ির রাজনৈতিক লাইনে নেই। মাওবাদীরা সবচেয়ে বড় কেন্দ্র, যারা নকশালবাড়ির লাইনে রাজনীতি করে। তবে এক মাত্র কেন্দ্র নয়।

) ৫০ বছরে নকশাল আন্দোলন কি করলো? না, ভারতে বিপ্লব হয়নি ঠিকই। কিন্তু ভারতের সমাজে কিছু পরিবর্তন এসেছে। কিছু কর্মসূচী সরকার নিতে বাধ্য হয়েছে। যা ভারতে শ্রমজীবী মানুষের বার্গেনিং পাওয়ারকে বাড়িয়েছে। জীবনের মানকে কিছুটা উন্নত করেছে। কিছুটা সরকারি ভূমিসংস্কার, বা দখল করে কৃষকের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া, মজুরি বৃদ্ধি, জঙ্গলের অধিকার আইন, উন্নয়ন কর্মসূচী, দুটাকার চাল, জাতপাত বিন্যাসের কিছু পরিবর্তন। সামন্ত শেকল ভেঙে গণহারে নারীদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ বিপ্লবের অগ্রগতির সঙ্গে কিছু আংশিক সাফল্য এসেছে। এই সাফল্যের পিছনে শুধুমাত্র নকশালপন্থীদের ভূমিকা আছে, এমনটা নয়। কিন্তু নকশাল আন্দোলনের একটা বড় চাপ অবশ্যই আছে। দেশে সশস্ত্র সংগ্রামের ধারা আছে বলেই মাফিয়াদের সরকার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনগুলোকে টুকরো রুটি ছুড়ে দেয় মাঝে মাঝে।

নকশালপন্থীদের সবচেয়ে বড় সার্টিফিকেট দিয়েছে তাদের শত্রুরা। ভারত রাষ্ট্র তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার পক্ষে সবচেয়ে বড় বিপদবলে উল্লেখ করেছে নকশালদের। ছত্তিশগড় ঝাড়খণ্ড, ওড়িশ্যা, অন্ধ্র, বিহার, তেলেঙ্গানাসহ ১৯ টা রাজ্যের ২৬০টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলন, যা একটি গ্রাম নকশালবাড়ি থেকে শুরু হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। আজ শুধুমাত্র দক্ষিণ ছত্তিশগড়ে দুই লাখ আধা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে নকশালদের। এছাড়া স্যাটেলাইট, বোমারু হেলিকপ্টারতো আছেই। মাওবাদীদের ঘাঁটি এলাকায় চলছে সমান্তরাল সরকার। মনে রাখবেন, প্যারি কমিউন সপ্তাহখানেক টিকে ছিলো, ভারতে তা টিকে আছে ৩০ বছর। এই সমান্তরাল সরকার বিকল্প গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামো, বিকল্প চিকিৎসা, শিক্ষার চর্চা করছে। গোণ্ডি ভাষায় লিপি তৈরি হয়েছে। গোণ্ডি ভাষায় কৃষি বিজ্ঞান, সমাজবিদ্যা, পদার্থ বিজ্ঞান পড়ানো হচ্ছে। কিছু না থাকুক, নকশাল আন্দোলনের দান হিসেবে গোণ্ডি অভিধানটি তো রয়ে যাবে!

ভারতের, ফিলিপাইনের, তুরস্কর দিকে সারা দুনিয়ার খেটে খাওয়া মানুষ তাকিয়ে আছে। কারণ বিপ্লব আর কমিউনিজমের স্বপ্নকে তারাই বাঁচিয়ে রেখেছে।

*** অনেকে বলছেন যে, নকশালবাড়ি একমাত্র রাস্তা নয়। তাহলে প্রশ্ন উঠবে বাকি রাস্তাগুলো কি? সেই উত্তর তাদের কাছে নেই। জানতে হবে, বুঝতে হবে, আর নিরপদ দূরত্বে থেকে প্রগতিশীলতার যোগ ব্যায়াম চর্চা করতে হবে! আমরা মনে করি, নকশালবাড়ি বাদেও অনেক পথ আছে। যেই পথে অন্য কিছু হতে পারে, বিপ্লব নয়। ভারতের সামাজিক প্রেক্ষিতে নকশালবাড়ি একমাত্র পথ। বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই তত্ত্ব সমৃদ্ধ হচ্ছে এবং হবে।।

না ঝুটা বাম, না ভাগুয়া রাম

নকশালবাড়ি লাল সেলাম!”

Advertisements
মন্তব্য
  1. আসিফ বলেছেন:

    ভারতের, ফিলিপাইনের, তুরস্কর দিকে সারা দুনিয়ার খেটে খাওয়া মানুষ তাকিয়ে আছে। কারণ বিপ্লব আর কমিউনিজমের স্বপ্নকে তারাই বাঁচিয়ে রেখেছে।

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s