প্লাবিত হাওরে হাহাকার: প্রতিবাদের পথে জেলে-কৃষকরা

Posted: মে 16, 2017 in দেশ, প্রকৃতি-পরিবেশ
ট্যাগসমূহ:, , , , , ,

লিখেছেন: অজয় রায়

‘‘দাদা গো, আমরার জীবন বাঁচাইবার শেষ অবলম্বনটাও ভাইস্যা গেলো”, হাওরের এক কৃষক যেমন জানিয়েছেন সংবাদমাধ্যমকে। আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলের সাতটি জেলা – কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এ অঞ্চলের প্রধান ফসল বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে। বিষক্রিয়ায় বহু মাছ ও হাঁস মারা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত অধিবাসীদের জন্য ত্রাণ সহায়তার অপ্রতুলতা নিয়েও অভিযোগ উঠছে। যখন বহু মানুষ একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন, তাদের অনেকে পরিবার নিয়ে বিভিন্ন শহরে চলে যাচ্ছেন কাজের সন্ধানে।

দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গত ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, হাওর এলাকার ৬টি জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৮ লাখ ৫০ হাজার ৮৮।[] তবে ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের ধারণা, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আসল সংখ্যা আরও অনেক বেশি। বাংলাদেশ হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের (হ্যাপ) সাম্প্রতিক রিপোর্টে যেমন বলা হয়েছে, ফসলহানির ফলে হাওর অঞ্চলে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটের ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছেন।[]

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওর অঞ্চলে কৃষি ঋণের সুদের হার অর্ধেক ও ঋণ আদায় আপাতত বন্ধ রাখার ঘোষণা করেছেন। তবে সরকারি কৃষি এবং এনজিও ঋণের চেয়েও বেশি হলো মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ। ফলে হাওর এলাকার কৃষকদের সমস্ত মহাজনী সুদ, সরকারি কৃষি এবং এনজিও ঋণ মকুব করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং নদীর পানি বাড়ার কারণে প্লাবিত হয়েছে হাওরের কৃষি জমি। তাছাড়া এ অঞ্চলে সময় মতো বাঁধ নির্মাণের কাজ হয়নি। বিভিন্ন জায়গায় দুর্বল বাঁধ তৈরি করা হয়েছিল। যার মধ্যে অনেকগুলোই ভেঙে গেছে। আর বাঁধ নির্মাণে গাফিলতি ও দুর্নীতি বিপর্যয়ের পথ প্রশস্ত করেছে। বাঁধ তৈরির কাজে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তিন কর্মকর্তাকে অবশ্য সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে হাওরে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতিতে যুক্ত ঠিকাদার ও প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ সকলের আরও কঠোর শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

প্লাবিত হাওর এলাকাকে দুর্গত অঞ্চল ঘোষণার জন্য দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। আন্দোলনকারীদের, বিশেষত প্রগতিশীল অংশের বক্তব্য, হাওরে বিপর্যয়ের দায় সরকারকে নিতে হবে ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আর ইজারাদারি ব্যবস্থা বন্ধ করে ফসলহারা মানুষদের জন্য সমস্ত হাওরজলাশয় উন্মুক্ত করে দিতে হবে। হাওরের ভাসান পানিতে জেলেকৃষকদের মাছ ধরার দাবি অবশ্য দীর্ঘদিনের। সেই অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে এ অঞ্চলে আশির দশকে বামপন্থীদের নেতৃত্বে জেলেকৃষকদের আন্দোলনও হয়েছিল। যা ভাসান পানি আন্দোলন নামে পরিচিত। রাষ্ট্র যখন রাজস্ব আদায়ের নামে দেশের সব হাওরজলাভূমি ইজারা দিতে শুরু করে, হাওরের ওপর নির্ভরশীল কৃষক ও জেলেদের ভাসান পানিতে মাছ ধরার প্রথাগত অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তখনই অধিকার আদায়ে বামপন্থীদের নেতৃত্বে রীতিমতো বিদ্রোহ করে হাওর অঞ্চলের কৃষকজেলেরা। নব্বই দশক পর্যন্ত চলেছিল ভাসান পানি আন্দোলন

প্রসঙ্গত, উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় সাত জেলা নিয়ে হাওর অঞ্চল। যার অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশের একষষ্ঠাংশ। এই এলাকা বছরে ছয় মাস পানিতে ডুবে থাকে। আর বাকি সময় সেখানে বোরো চাষ হয়। হাওরে পাহাড়ি ঢল নামে উত্তরপূর্ব ভারতের থেকে। যেখানে মেঘালয়ের পাহাড়ে বেপরোয়াভাবে চলছে খনি খননের কাজ। ফলে এখন পাহাড় ভেঙে নামছে পাথর বালি। ক্রমশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে হাওরভূমি। যার ফলে সেখানে বৃষ্টির পানি ধারণ ক্ষমতা লোপ পাচ্ছে। তাছাড়া মেঘালয়ের পাহাড়ি অরণ্য ও হাওরের জলাবন, যা অতীতে পাহাড়ি ঢলের বিধ্বংসী গতি শ্লথ করতে পারতো, তা এখন আর নেই। উন্নয়নএর নামে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ এবং সড়ক নির্মাণের দরুনও রুদ্ধ হয়ে পড়েছে হাওরের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ। পরিণতিতে পানি দূষিত হচ্ছে। আর সামান্য বৃষ্টিতেই প্লাবিত হচ্ছে এ অঞ্চল।

এদিকে, সরকার হাওরজলাশয় ইজারা দিয়ে রেখেছে দখলদার ব্যবসায়ীদের। যারা মাছ চাষ ও পাহাড়ি পাথর বালির কারবার করে বিপুল পরিমাণ মুনাফা লুটে চলেছে। আর আগ্রাসী হাইব্রিড বিপজ্জনক মাছ ছেড়েছে জলাভূমিতে। সম্প্রতি অবশ্য মন্ত্রিসভা বৈঠকে আফ্রিকান মাগুর ও পিরানহার মতো নিষিদ্ধ মাছের পোনা এবং মাছ আমাদানি না করা সংক্রান্ত ‘মৎস সংঘ নিরোধ আইন২০১৭’এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। তবে এসব শুধুই খাতায়কলমে দেখানো হচ্ছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের ধারণা।

স্পষ্টতই, সাম্রাজ্যবাদের দালাল শাসকশোষক শ্রেণী ফ্যাসিবাদী শাসন চালাতে চায়। যখন সরকারের শ্রেণী স্বার্থে পরিচালিত নয়াউদারবাদী নীতি রূপায়ণ প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠের পথ প্রশস্ত করছে। এই প্রক্রিয়াতেই হাওরে ইজারাদার ও মেঘালয়ে খনি লুটেরারা দেদারসে পয়সা কামানোর সুযোগ পাচ্ছে। আর এ প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

হাওর অঞ্চলে সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য ভারতবাংলাদেশ উভয় পক্ষের সমন্বয়ের ভিত্তিতে এ অঞ্চলের জলাভূমির উপযুক্ত সংরক্ষণ ও নদীগুলোর নাব্যতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আবার হাওরের জেলেকৃষকরাও প্রতিবাদে ক্রমশ সরব হচ্ছেন। এ অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত অধিবাসীদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আদায়, সমস্ত ঋণ মকুব, ভাসান পানিতে জেলেকৃষকদের মাছ ধরার অধিকার ও বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতিতে যুক্তদের কঠোর শাস্তির দাবিতে পথে নামছে বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন।।

০৮/০৫/২০১৭

তথ্যসূত্র:

[] দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা, ‘‘অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলে সৃষ্ট হাওর এলাকার সম্প্রতি বন্যা পরিস্থিতির তথ্যাদি (২৮ এপ্রিল ২০১৭, পর্যন্ত)’’

[] “Damage by Flashfloods in north-eastern Haor areas in Bangladesh 2017: Situation Bulletin”, Haor Advocacy Platform (HAP), 30 April 2017

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s