লিখেছেন: সব্যসাচী গোস্বামী

এক.

তার আসল নাম ছিল ‘বিপদ তাড়ন’। সকলে কিন্তু তাকে ‘বিপদ’ বলে ডাকতো। কেউ কেউ আবার পিছনে তাকে ‘আপদ’ বলেও ব্যঙ্গ করতোসে যেদিন জন্মায়, সেদিনই তার বাবার কোম্পানির লকআউট উঠে যায়। লকআউটের সাত মাস বড় কঠিন দিন গেছে। কোম্পানির গেটের তালা আবার খুলে যাওয়ায় সবার মনে একটু স্বস্তি হয়েছিল কেন না, তখন তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য। জোড়া খুশির খবরে আনন্দিত হয়ে ঠাকুমাই নাতির নাম রেখেছিল ‘বিপদ তাড়ন’।

বিপদ সিপিএমও ছিল না, তৃণমূলও ছিল না। হার্মাদ বা ভৈরবও ছিল না, বিদ্বজ্জনও ছিল না। সে ছিল এক ছাপোষা মানুষ। বাবার মৃত্যুর পর সেও মেটাল টুলস কোম্পানিতে শ্রমিকের কাজ করতে ঢুকেছিল দিনগত পাপক্ষয়ের মধ্যে দিয়ে তার সময় কেটে যাচ্ছিল। সকালবিকাল কারখানায় ডিউটি, বাড়ির দোকান বাজার, সপ্তাহে একদিন রেশন দোকানে লাইন, সন্তানদের পড়তে বসানো, মাঝে মধ্যে টিভিতে বসে ক্রিকেট খেলা দেখা, আর ফি বছর ভোটের লাইনে দাঁড়ানো এই ছিল তার জীবন। বাবার মতন সেও ছিল একজন ভোটার। তবে ভোট যে সে কাকে দিতো, তা কেউ জানতো না। জিজ্ঞেস করলে বলতো, ‘তোমারে বলবো কেনে? সেডা তো বলার কতা নয়!’ সরকারি দলের লোকেরা ভাবতো – ব্যাটা বিরোধীদের সমর্থক, আর বিরোধী দলের নেতারা ভাবতো – বিপদ নিশ্চয়ই তলায় তলায় সরকার পক্ষের লোক।

এমনিতে বিপদ নির্বিবাদী লোক হলেও, দোষের মধ্যে সে ছিল গরীব ও ঠোঁট কাটা। তার এই মুখের উপর স্পষ্ট কথা বলে দেওয়াটা কারো কারো অপছন্দের বিষয় ছিল। এই যেমন সরকার পক্ষের নেতা গোবিন্দ সরকার, তাকে দেখে এমনিতে সবাই ভয় পায় – পেছনে ‘গোঁয়ার গোবিন্দ’ বলে ডাকলেও সামনে কেউ ট্যাঁফো করার সাহস পায় না – কিছু দিন আগেই তো তার সঙ্গে সুনীল বসুর দেখা হলো – সুনীল বাবু রাইটার্সের ইউ ডি ক্লার্ক – বিরোধী দলের ইউনিয়নের মস্ত বড় নেতা – গোবিন্দ বাবুকে দেখে হাত কচলাতে কচলাতে বলেছিলেন, “আপিসে চাপে পড়ে যাই করি না কেন, ভোট বাক্সে ঠিক জায়গাতেই আমি ভোটটা ফেলব গোবিন্দ!” গোবিন্দ জানতো এ ব্যাটা বিরোধী দলের কমিটেড ভোটার, তবু তার এই সমীহ ভাব তাকে কিছুটা প্রীত করেছিল বই কি! কিছুটা আত্মশ্লাঘা মিশিয়ে সে বলেছিল – “ঠিক আছে! ঠিক আছে!”

এ হেন গোবিন্দ সরকার, নিজে বিপদকে রাস্তায় দেখা হতে জিজ্ঞেস করেছিল,“বিপদ, পরিবর্তনের ধারাকে অব্যাহত রাখতে তোমার ভোটটা পাচ্ছি তো?” বিপদ দুম্ করে মুখের উপর উত্তর দিল – “পরিবর্তন আর কনে হলো দাদা? সব ঝ্যামন ছেল ত্যামনই তো দেকি।” একদল সাঙ্গোপাঙ্গোর মাঝে একথা খুবই আঁতে লেগেছিল গোবিন্দর। তবু ভোটের দিকে তাকিয়ে সে তেমন কিছু বলে নি। রাগে গট্‌গট্‌ করে চলে যেতে যেতে সাঙ্গোপাঙ্গোদের বলেছিল – “শালা কি বলল শুনলি! এ নিশ্চয়ই ওদেরই ভোটার।” তারপর আস্তে করে গলার স্বর নামিয়ে তার ডান হাত, গালকাটা জগাকে বলল, “ব্যাটাচ্ছেলে আবার তলায় তলায় মাওবাদী নয় তো? খবর নে খবর নে…”

বিরোধী দলের স্থানীয় নেতা মিহির তরফরদার আবার মিহি স্বরের মিষ্টভাষী। সবাই জানে রেগে গেলে উনি মুখে কিচ্ছুটি বলবেন না, কিন্তু পরে পেছনে আছোলা বাঁশ ভরতে তার জুড়ি নেই। তাই তার সাথে কথা বলে সবাই সতর্ক হয়ে, সাত পাঁচ ভেবেতিনি একদিন রাস্তায় ধরলেন বিপদকে, কি বিপদ বাবু, পরিবর্তনের কি বুঝছেন? বিপদ বলল, মোরা মুক্কু সুক্কু মানুষ মির্‌দা, তোটুকু বোঝলাম আবনাদিগেরও কোনো পরিবর্তন হবে নি, উঁয়াদেরও কোনো পরিবর্তন হবে না। আমাদেরও কোনো পরিবর্তন হবে না। আমরা ঝেথায় ছেলেম, সেতায়ই থাকবো।”

কথা শুনে রাগে গা জ্বলে যাচ্ছিল মিহির তরফদারের, কিন্তু তিনি ঠাণ্ডা মাথার বুদ্ধিমান মানুষ। কথা আর বাড়াননি। যেতে যেতে তার সঙ্গী বাদলকে বলেছিল, “এ বলদগুলির কো দিন বুদ্ধি হবে! শিল্প হচ্ছে না, চাকরি হচ্ছে না, টাটার মতন এতো বড় একটা শিল্পপতি মুখ ফিরিয়ে নিলো, তবু গিয়ে ওদেরই ভোট দেবে! দাঁড়া আরেকবার সরকারে আসি, দেখে নেবো কত ধানে কত চাল। শোন্‌ ভোটে কিন্তু বিনা যুদ্ধে রণে ভঙ্গ দেওয়া চলবে না। প্রতি ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়াই দিতে হবে …”

দুই.

ভোটের আসর জমজমাটভোট তো নয়, যুদ্ধ। কার হাতে থাকবে কুসুমপুর মিউনিসিপালিটির শাসন। দু’পক্ষেরই যুদ্ধংদেহি মনোভাব। এদিকটায় বিরোধীদের এখনো কিছু সংগঠন আছে। তাই রাজ্যব্যাপী মিউনিসিপালিটির ইলেকশান হলেও, কুসুমপুর কার হাতে থাকবে তা নিয়ে মিডিয়ার আগ্রহ একটু বেশি। বিধায়ক মুকুন্দ সরকারের ইচ্ছা, বোর্ড গঠন করলে তার ভাই গোবিন্দ সরকারকে এবার চেয়ারম্যান করারবিরোধী অমল দাস গোষ্ঠি যাতে অন্তর্ঘাত না করতে পারে, সেদিকেও নজর দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধী দলও এবার বেগ দেবে মনে হচ্ছে। কোনও ঝুঁকি না নিয়ে তিনি একটা অর্ধসমাপ্ত এপার্টমেন্টে বাইরে থেকে বড় সরো একটা বাইক বাহিনী এনে জমায়েত করে রেখেছেন বিরোধীরা জোর দিয়েছে ঘরে ঘরে প্রচারে। দু’পক্ষই আড়ালে আবডালে একে তাকে ধমকাচ্ছে চমকাচ্ছে বলে খবর। নির্বাচন কমিশনও সতর্ক দৃষ্টি রাখার চেষ্টা করছে।

মুকুন্দ বাবু আবার মন্ত্রী রতিকান্ত মিত্রের ঘনিষ্ট লোক। নির্বাচনি কেন্দ্রীয় সভায় তাই তিনিই প্রধান বক্তা। পানাক্ত, ঢুলু ঢুলু, রক্তাভ চোখে জনসভায় তিনি প্রথম দিকে বেশ ঢিমে লয়েই বলছিলেন, কিভাবে মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে উন্নয়নের কাজ এগিয়ে চলছে; কিভাবে দু’বছরেই তারা প্রতিশ্রুতির একশো শতাংশ কাজ সেরে ফেলেছে; ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কানের কাছে গোবিন্দ সরকার কিছু একটা ফিস্‌ফাস করে বলার পরেই তিনি হঠাৎ বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। বলতে শুরু করলেন, “বন্ধুগণ এই উন্নয়নের কাজকে ব্যাহত করতে বিরোধীরা মাওবাদীদের সাথে হাত মিলিয়েছেআমাদের কাছে বিশ্বস্ত সূত্রে খবর আছে কুসুমপুরে মাওবাদীদের আনাগোনা বাড়ছেস্টেশন চত্বরে, চায়ের দোকানে বসে তারা চা খাচ্ছেভাড়া দিয়ে মেস বাড়িগুলিতে থাকছেবিরোধীদের এসব ষড়যন্ত্র আমরা মেনে নেবো নাফূঃ দিয়ে উড়িয়ে দেবোমাথা ভেঙে দেবোপ্রয়োজনে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেবো আপনারা আমাদের ভোট দিয়ে গণতন্ত্রকে জয়যুক্ত করুন।”

বিরোধীরা নিয়ে এলো আরেক প্রাক্তন মন্ত্রীকে। তিনি বললেন, “দুর্নীতিরাজ চলছে। মেয়েরা রাস্তাঘাটে বেরোতে পারছে না। ধর্ষ নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্প হচ্ছে না। বিনিয়োগকারীরা চলে যাচ্ছে। রাজ্যকে এরা অন্ধকারের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। বুলেটে নয় ব্যালটের মাধ্যমে এদের প্রতিহত করুন। গণতন্ত্রকে রক্ষা করুন।”

তিন.

এমন ভোট দেখেনি কুসুমপুর। আগে টিভিতে দেখেছে। রেডিওতে শুনেছে। পেপারে পড়েছে বিস্তর। কিন্তু এই প্রথম সচক্ষে তারা দেখল বাইক বাহিনী। দু’পক্ষের সশস্ত্র বহিরাগতদের আনাগোনা। প্রতি রাতে শুনলো ফায়ারিংয়ের শব্দ। পেটোর আওয়াজ।

ভোট আসবে, যাবে। প্রাণ গেলে সাধের প্রাণটা তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না, তাই ভোটের দিন অনেকেই প্রথম দিকে বুথমুখো হলো না। পরিবেশ কিছুটা শান্ত হতে কেউ কেউ বেরোলো। দাঁড়ালো ভোটের লাইনেবিদ্যা নিকেতনের স্কুলের মাঠে ভোটের লাইনে বিপদকেও যেন দেখা গেলো এক ঝলক! কুড়ি পঁচিশ মিনিট ভোট শুরু হতে না হতেই আবার ঢুকল বাইক বাহিনী। দু’পক্ষই পজিশন নিয়ে মুহুর্মুহু বোমা ফাটালো বুথের মাঠে। হুড়মুড় করে মানুষ ছুটলো বুথের নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। পুলিশ ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বুথের ভেতর বসে থাকলো। কিই বা করতে পারে মান্ধাতার আমলের মাস্কেটধারী দু’জন বয়স্ক কনস্টেবল। এক ঘন্টারও পর কেন্দ্রীয় বাহিনী এলো। পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হলো। বিদ্যানিকেতনের মাঠে তখন পড়ে আছে একটা ছিন্নভিন্ন লাশ। বিপদ তাড়নের শবদেহ।

পরদিন সরকারপক্ষ এবং বিরোধীপক্ষ উভয়েই বিপদ তাড়নকে দলীয় কর্মী বলে দাবি করলো এবং বিপক্ষের উপর খুনের দায় চাপালো। প্রেস কনফারেন্সে এসপি সাহেব এক প্রশ্নের জবাবে মুচকি হেসে বললেন, “দু’একটা বিছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে ভোট মোটের উপর শান্তিপূর্ণভাবেই মিটেছে।”

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s