আমেরিকান দুঃস্বপ্ন: নব্য ফ্যাসিবাদের উদ্বোধনী ট্রাম্পেট বাজছে মার্কিন মুল্লুকে

Posted: মে 8, 2017 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , ,

লিখেছেন: অজয় রায়

একদিন সকালে দেখা যায় শিশুদের খেলার মাঠে দুটি নাৎসিদের প্রতীকী স্বস্তিকা চিহ্নের পাশে লেখা রয়েছে গো ট্রাম্প। গত নভেম্বরের মাঝামাঝি মার্কিন মুল্লুকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরেই এ ঘটনা ঘটে। সাউদার্ন পভার্টি ল সেন্টারের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরবর্তী এক মাসের মধ্যেই সহস্রাধিক বিদ্বেষমূলক অপরাধ বা হেইট ক্রাইমের ঘটনা ঘটেছে সেদেশে।[] আর এখনও তা চলছে। নিশানায় রয়েছেন মূলত সংখ্যালঘু, অভিবাসী ও মুসলিমরা।

এদিকে, ধনকুবের, ফ্যাসিবাদী ও প্রাক্তন সেনা জেনারেলদের মন্ত্রিসভা বানিয়েছেন ট্রাম্প। আর বিনিয়োগ আকর্ষণের অজুহাতে বৃহৎ ব্যবসায়িক সংস্থাগুলিকে ব্যাপকহারে কর ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে চরম দক্ষিণপন্থী ট্রাম্পের প্রশাসন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক পরিষেবা ক্ষেত্রে তারা ব্যয় সঙ্কোচনের পথে হাঁটছে। ইরায়েলপ্যালেস্টাইন দ্বিরাষ্ট্রের নীতি বাতিল করার লক্ষ্য নিচ্ছে। স্থানীয় আমেরিকান আদিবাসীদের জমি দখল করে পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকারক ডাকোটা অ্যাকসেস পাইপলাইন তৈরিরও উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এইসব নীতি রূপায়ণ করার জন্য গণতান্ত্রিক পরিসর পুরোপুরি ছেঁটে ফেলার চেষ্টা চালাচ্ছে। আর প্রতিবাদকারীদের উপর পুলিশি দমনপীড়ন নামিয়ে আনছে।

সেই সঙ্গে সামরিক তৎপরতা বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প। ইতিমধ্যেই মার্কিন সামরিক ব্যয় ১০ শতাংশ বাড়ানোর কথা ঘোষণা করেছেন তিনি।[] যখন বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মার্কিন আধিপত্য ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার কতৃত্ব বজায় রাখতে উঠে পড়ে লেগেছে। যুদ্ধের প্রস্তুতিতে জোর দিচ্ছে সেদেশের শাসকশ্রেণী। ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করতে মরিয়া তারা। আর ইসলামিক স্টেট (আইএস) সন্ত্রাসীদের মোকাবিলার অজুহাতে মার্কিন কর্তৃপক্ষ স্থলবাহিনী ব্যবহার আরও বাড়াতে চাইছে।

ওয়াশিংটনের শাসক মহলে বিদেশনীতি নিয়ে কিছু মতপার্থক্য ছিলোই। রাশিয়াচীন দুদেশের মধ্যে কাকে আগে আক্রমণ করা হবে? এবিষয়ে ট্রাম্প গোড়ায় চীনকে মূল নিশানা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মস্কোর হাতের পুতুল বলে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। যা ভুল প্রমাণ করার অজুহাতে এখন ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের পথ প্রশস্ত করার সুযোগ পেয়েছেন। সম্প্রতি তিনি সিরিয়ার একটি সরকারি বিমানঘাটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলির সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন। উত্তর কোরিয়া অভিমুখেও রণতরী পাঠিয়েছেন ট্রাম্প এবং দেশটির উপর স্বতপ্রণোদিতভাবে আঘাত হানার হুমকি দিয়েছেন। আর আফগানিস্তান যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়েছেন সেখানে, বৃহত্তম অপারমাণবিক বোমা ফেলে। এর মধ্যেই পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কাও করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

রাজনীতিতে নবাগত ধনকুবের ট্রাম্প গত নভেম্বরে মার্কিন মুল্লুকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে হারিয়ে দেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিন্টনকে। স্পষ্টতই নয়াউদারনীতিকে প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছেন সেদেশের জনসাধারণ। যে নীতির দরুন নিম্ন মজুরি, বেকারত্ব ও কাজের নিরাপত্তাহীনতার মতো সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে। আয় ও সম্পদ বন্টনের বৈষম্য বেড়েছে। আর্থিক সংকটের আবর্ত থেকে বেরোতে পারছে না মার্কিন মুল্লুকও। এদিকে, উৎপাদনের আরও স্বয়ংক্রিয়করণ হয়েছে। নয়াউদারবাদী বিশ্বায়ন পুঁজিকে অত্যন্ত গতিশীল করে তুলেছে। পুঁজি শুধু লগ্নি হিসেবেই নয়, উৎপাদন ক্ষেত্রেও তার কাজকর্ম স্থানান্তরিত করতে চাইছে উচ্চ মজুরির অঞ্চল থেকে নিম্ন মজুরির অঞ্চলে।

এর মধ্যেই বেড়েছে জনঅসন্তোষ। ফ্যাসিবাদের উত্থানের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও। চরম দক্ষিণপন্থী ট্রাম্প ‘আমেরিকা প্রথমে’এর নামে উগ্র জাতিয়তাবাদী উসকানি দিয়েছেন। রুটিরুজির মূল সমস্যা থেকে মানুষের নজর ঘুরিয়ে দিতে জাতিবিদ্বেষী, বর্ণবিদ্বেষী, অভিবাসীবিরোধী এবং সাম্প্রদায়িক ও লিঙ্গবৈষম্যমূলক প্রচার চালিয়েছেন। পুঁজিবাদকে রক্ষা করাই তার প্রকৃত উদ্দেশ্য। নির্বাচনে সমাজের ক্ষোভকে নিজের সমর্থনে ভোটবাক্সে চালান করেছেন তিনি দক্ষতার সাথে। বিশেষত, মরচে বলয়ের (রাস্ট বেল্ট) শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবীদের সমর্থন আদায় করেছেন। তাছাড়া দোদুল্যমান ভোটদাতাদের প্রদেশগুলিতে যে ভোটার দমন কৌশল নেওয়া হয়েছিল, তার নিশানায় ছিলেন অশ্বেতাঙ্গ ভোটাররা। ফলে সুবিধা হয়েছে ট্রাম্পের। এদিকে যেটা লক্ষণীয়, প্রাইমারি নির্বাচনে বার্নি স্যান্ডার্স ‘সমাজবাদী’র ছদ্মবেশ ধরে প্রচার চালিয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেলেও পরবর্তীকালে তিনি যথারীতি আত্মসমর্পণ করেন ও ক্লিন্টনকে সমর্থন জানান।

বর্তমানে ইউরোপে ফ্যাসিবাদীদের ভোট বাড়ছে। ব্রিটেনে ব্রেক্সিট কাণ্ড ঘটেছে এবং তার পরবর্তীকালে মার্কিন মুল্লুকে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। এগুলি স্পষ্টতই বিশ্বায়িত নয়াউদারবাদী ব্যবস্থার সংকটের লক্ষণ। এদিকে ট্রাম্প মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ছয়টি মুসলিমপ্রধান দেশের নাগরিকদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে আরেকটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) চুক্তি থেকেও বেরিয়ে গিয়েছে।

স্পষ্টত, নয়াউদারবাদী বিশ্বায়নের মেকি সমালোচনা করেই শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন ট্রাম্প। ‘জাতীয়তাবাদী’ সুর চড়াচ্ছেন তিনি। যার লক্ষ্য আসলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ছোট শরিকদের উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো। সেজন্য তিনি অবশ্য কেবল কিছু সংরক্ষণবাদী পদক্ষেপ নিতে পারেন। যা মুখে না বললেও চিরকালই করে আসছে মার্কিন প্রশাসন।

প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রের মার্কিন কংগ্রেসের এবং বহু অঙ্গরাজ্যের রক্ষণশীল আইনসভারও সমর্থন পাচ্ছেন ট্রাম্প। তবে মার্কিন মুল্লুকের ডেমোক্র্যাটিক এবং রিপাবলিকান পার্টি উভয়েই বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করে। আর বহুজাতিক সংস্থা ও লগ্নি পুঁজির বিনিয়োগ এবং স্বার্থের আন্তর্জাতিক চরিত্র রয়েছে। ফলে ট্রাম্পকে ‘উগ্রজাতীয়তাবাদের’ নামে কতোদূর এগোতে দেয় তারা – তাও দেখবার বিষয়। তবে এর মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৃণমূলস্তরে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে পথে নামছেন বহু মানুষ। বিশ্বের নানা প্রান্তেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলছে।।

৩০/০৪/২০১৭

তথ্যসূত্র:

[] “Trump’s Election Sees More Than 1,000 Hate Crimes in a Month”, December 16, 2016, Telesur

[] “U.S. President to raise defense spending by 54 billion dollars: White House”, February 28, 2017, Xinhua

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s