যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা কূটনৈতিক সম্পর্কের আড়ালে ঔপনিবেশিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার পায়তারা

Posted: জানুয়ারি 16, 2017 in আন্তর্জাতিক
ট্যাগসমূহ:, , , , , , , , , , , ,

লিখেছেন: শাহজাহান সরকার

‘নিয়মানুগ’ শব্দের অন্তরালে উপনিবেশের পুনরাবৃত্তি

ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যু এবং ফ্যাসিবাদী ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন রাষ্ট্র প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যকার সম্পর্ক ত্বরান্বিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ-নিবন্ধে উভয় দেশের মধ্যকার ‘নিয়মানুগ’ (নরমালাইজ) সম্পর্ক সৃষ্টিতে ওবামার ভূমিকা আলোচিত হবে। ওবামার পদক্ষেপ এক চমৎকার মৌলিক পটভূমি তুলে ধরে যে, কেন কিউবায় বিপ্লব জরুরি হয়ে পড়েছিল, কেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য কিউবার গৃহযুদ্ধের প্রধান লক্ষবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। কিভাবে ও কেন যে বিপ্লব শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভে সফল হয় নি। কী করেই-বা সম্ভব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদ ও মিডিয়ার স্বার্থ হাসিলের সকল প্রচারণার মধ্যে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা।

২০১৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কিউবা কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামা আরও ঘোষণা দেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের উপর বিধিনিষেধ শিথিল করবেন। ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে কিউবায় টাকা পাঠানো, টেলিকমিউনিকেশন সরঞ্জাম, নির্দিষ্ট ব্যাংকিং লেনদেনের উপরও কড়াকড়ি শিথিল করবেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিউবাকে বিচ্ছিন্ন করা এবং কিউবাকে শাস্তি দেবার কোন অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের ছিল না। কিউবার বিরুদ্ধে অবরোধ ছিল কিউবার উপর গুণ্ডামিকে বৈধ করা। মার্কিন যুক্তরষ্ট্রের নিয়মানুগ বা নরমালাইজেশন-এর শর্ত হচ্ছে সে-রকম এক ভনিতা যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবার জনগণের উপর কর্তৃত্বব্যঞ্জক কিছু করতে যাচ্ছে না।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও কিউবা

১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কিউবার জনগণকে ধারণাতীতভাবে দুঃখ-কষ্ট ও দুর্বিপাকে ফেলার হোতা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে স্প্যানিশ-আমেরিকা যুদ্ধের ফলে কিউবা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের অধীনে এসেছিল। কিউবার মানুষ স্পেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছিল। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকে তার নিয়ন্ত্রণাধীনে আনতে তখনকার পরিস্থিতিকে নিজের দখলে রেখেছিল। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে তথাকথিত প্ল্যান্ট সংশোধনী আইন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে পাশ হয়েছিল, যা কিউবার সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এই আইনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র কিউবার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ চালাতে পারবে।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কিউবায় মার্কিন নৌসেনা চার বার অবতরণ করেছিল। সেখানে তারা গুয়ান্তানামো নৌঘাঁটি নামে একটি সামরিক উপনিবেশ কায়েম করেছিল, যা বিশ্বজুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের বন্দিশিবির ও টর্চার ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে নাইন-এলিভেন – ৯/১১- উত্তর সময় থেকে।

১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কিউবার ৮০ শতাংশ উপযোগিতার উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিউবার ৯০ শতাংশ খনিতে, প্রায় ১০০ শতাংশ তেল শোধনাগারে, ৯০ শতাংশ গরুর খামারে, ৪০ শতাংশ চিনি শিল্পেও ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নিয়ন্ত্রণ। সুগার প্লান্টেশনের শ্রমিকদের অবিশ্বাস্যভাবে নির্যাতনের পরিস্থিতিতে রাখা হতো। বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে দাস নির্যাতনের মতো আচরণ করা হতো। অধিকন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিউবা পরিণত হয় জুয়ার সিন্ডিকেটে, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, হোটেল মালিক ও গুণ্ডা-বদমায়েশের নন্দন কাননে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী এবং পর্যটকগণ কিউবার রাজধানী হাভানাকে পরিণত করেছিল যৌন পর্যটন কেন্দ্রে। তৎকালীন কিউবায় প্রায় ১ লক্ষ পতিতা ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক জোরদার করে একের পর এক ঘৃণিত শাসককে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা দিয়েছিল।

এ ভয়াবহতার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে কিউবার বিপ্লব সংঘটিত হয়। মার্কিনি প্রচার যন্ত্রে “কিউবাকে খোয়ানোর” সংবাদ প্রচারিত হচ্ছিল। মিয়ামিতে নির্বাসিত কিউবানরাও বিপ্লবের প্রশংসা করেছিল। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কিউবান জনগণের বিপ্লবী অভ্যুত্থান একটি ন্যায্য ও জনপ্রিয় বিদ্রোহ ছিল। এটি বিশ্বপুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদকে আচ্ছা মতো দমাতে পারেনি। এমনকি গোষ্টীতন্ত্রসহ সকল প্রকার নিপীড়নের শেকর উপড়ে ফেলে প্রকৃত মুক্তির সামাজিক বিপ্লব পরিচালনাও করতে পারেনি। তা সত্ত্বেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের পরাজয় ঠেকাতে নিজেদের বিরোধ মেটাতে সক্ষম হয়নি। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সমূদ্র উপকূল আক্রমণে গিয়েছিল, কিন্তু কিউবার জনতা তা প্রতিহত করেছিল। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা – সিআইএ ফিদেল কাস্ত্রেকে গুপ্তহত্যার জন্য মাফিয়া চক্র নিযুক্ত করেছিল। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কিউবার উপর অন্যায়ভাবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রেখেছে। তবে অবরুদ্ধ কিউবা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিক বাণিজ্য বহাল রাখতে ও প্রয়োজনীয় ওষুধ, কৃষি এবং শিল্পপণ্য পেতে সক্ষম হয়েছে।

সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের অন্তরালে সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি

শেষদিকের ৫০ বছর ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল প্রশাসকগণ কিউবার শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে প্রচেষ্টা চালিয়েছে – কিউবাকে অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরুদ্ধ করে, ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে কিউবান সরকার উৎখাতের প্রচেষ্টা করেছিল। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কিউবায় একটি অধীনস্ত দালাল সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। তারা কি কখনো কিউবার জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? নামমাত্রও? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই কৌশলগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। কী এমন ঘটেছে যে, তাদের কৌশলে পরিবর্তন আসলো, যদিও লক্ষ্য সিদ্ধিতে নয়?

মার্কিন শাসকশ্রেণীর নিষ্পত্তিমূলক অধ্যায়ের সাথে ওবামার নেতৃত্ব, এ-সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, কিউবার আগেকার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বজায় রেখে কাস্ত্রো শাসককে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষমতাচ্যূত করে সাম্রাজ্যবাদের কৌশলগত স্বার্থে কাজ করা তেমন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। যে কারণে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীগণ নিয়মানুগ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় তীর শানাচ্ছে এবং এর মধ্য দিয়ে শাসক পাল্টাতে সক্ষম হবেন বলে মনে করছেন। আর সে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে কিউবাকে পরিবর্তন করবেন এবং আগের মতো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নয়া-উপনিবেশে পরিণত করবেন। এ-সত্যতার ফলে বারাক ওবামার “সাহসী” ও “নির্ভিক” অলঙ্করণ মিথ্যার গহ্বরে “অতীতের সঙ্গে তলিয়ে” গেছে।

কিউবার অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে নিপতিত হয়েছে। ফিদেল কাস্ত্রো ও রাহুল কাস্ত্রোর পুরাতন লাইনের নেতৃত্ব মরিয়া হয়ে খুঁজছে অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য সাজসরঞ্জাম। আর জটিল পরিস্থিতির ফাঁদে পড়ে স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে চুক্তি করতে ইচ্ছা পোষণ করছে। এমনকি গত পাঁচ-সাত বছর ধরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও আর্থিক প্রবাহ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে ক্রমবর্ধিত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা নিয়েছেন এক মহাপদক্ষেপ – যাদের রয়েছে কর্তৃত্বের হাত। কিউবার নেতৃত্ব তারই অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মানুগ ও উম্মুক্ত পথের উপায়, যা তাকে রক্ষার নামে ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এই নিয়মানুগ নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিষদাঁত মারাত্মকভাবে কিউবাকে চিবিয়ে ধরবে – কিউবার জনগণের শ্রমের উপর অধিক মুনাফা করতে, তার প্রশিক্ষিত পেশাদার শ্রেণীর মধ্যে শোষণ চালাতে এবং দ্বীপের সম্পদ লুণ্ঠন করতে। অর্থসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও প্রস্তাবিত বিষয়গুলিতে বৃহৎ কর্পোরেশন কার্গিল ও ফানজিল (নির্বাসিত এক কিউবান ব্যক্তির মালিকানাধীন) কৃষিশিল্পে লগ্নি করবে, যা পরিশোধিত চিনি নিয়ন্ত্রণ করে। নিউইয়র্ক ভিত্তিক জেনারেল মটরস ও ক্যাটারপিলার কোম্পানি ওবামার ঘোষণাকে অভিনন্দন জানিয়েছে।

কিন্তু সেখানে বড় ধরনের রণনীতিগত সমস্যা যুক্ত রয়েছে। কিউবার প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অবস্থানের সাথে তার বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত। এ স্বার্থগুলি হচ্ছে – লাতিন আমেরিকার উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, তা শক্তিশালী করা – যা দিয়ে তারা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্ধতভাবে তাদের “পুরাতন জায়গায়” ফেরার পরিকল্পনা করছে।

“সন্ত্রাসের সাথে যুদ্ধ” নাইন-এলিভেন (৯/১১) থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পুরো বিশ্বের বিরুদ্ধে। তখন থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য-এশিয়ায় যেমন মনোযোগ নিক্ষেপ করেছিল, লাতিন আমেরিকায় তেমন মনোযোগ দিতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে হুগো শ্যাভেজের ভেনিজুয়েলা – যা এখন নিকোলাস মাদুরোর অধীনে – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে আরো বেশি স্বাধীন অবস্থানে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। যা কাজে লেগেছিল কিউবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সাহায্যের উৎস হিসেবে – এটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জন্য বড় যন্ত্রণাদায়কও বটে।

একই সময়ে পুঁজিবাদী চীন লাতিন আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর চীন এখন লাতিন আমেরিকায় দ্বিতীয় বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ। লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ব্রাজিল সহ ওই অঞ্চলের অনেক দেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারই চীন। নিকারাগুয়ার সঙ্গে চীন একটি চুক্তি করেছে অর্থায়ন ও খাল খননে, যা পানামা খালের থেকেও বেশি লম্বা ও গভীর হবে।

এগুলো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের নিকট উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কিউবার প্রতি তাদের পরিবর্তনের নীতি অবশ্যই কিউবাকে নিয়মানুগ সম্পর্কের দ্বারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যিক নেটওয়ার্কে ফিরিয়ে আনবে, যা পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠারই অংশ।

কিউবান সমাজ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা: এটা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়

কিউবান নেতৃত্ব মার্ক্সবাদী বাক্যাংশ-শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেন। আবার কিউবার অর্থনীতিতে নির্দিষ্ট কিছু বিধিবৎ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা সমাজতান্ত্রিক বলে মনে করা হয়। যেমন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে ব্যাপক সামাজিক কর্মসূচিও রয়েছে – যাকে সমাজতান্ত্রিক বলে মনে করা হয়। কিন্তু সারবস্তুগতভাবে এটা কোনো সমাজতন্ত্র নয়। আর কিউবাও সমাজতান্ত্রিক নয়। সমাজতন্ত্র হচ্ছে অতি গুরুত্বপূর্ণ এক উল্লম্ফনের যাত্রাপথ, যা পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদের দিকে নিয়ে যায়। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হচ্ছে সেই নির্বাণ, যা সব শোষণ-নিপীড়নের উচ্ছেদ ঘটায়। এটি এমন একটি জনগণের ক্ষমতায়নের সম্পর্ক, যা আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন ও পৃথক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জন্ম দেয় এবং ক্রমবিকশিত সমাজের দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করে। আরো বেশি সচেতনভাবে বিশ্বের এবং নিজেদের পরিবর্তন করতে – মানবতার একটি বিশ্ব-সম্প্রদায় সৃষ্টির লক্ষ থেকে, যেখানে আর শ্রেণী বিভাজন ও সামাজিক বৈষম্য থাকে না; সামাজিক বিবাদও দীর্ঘায়িত হয় না।

সাম্যবাদ বা কমিউনিজম অর্জন করতে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন অগ্রসর নেতৃত্ব দরকার, যার ভিত্তি হচ্ছে বাস্তবতার বিজ্ঞানসম্মত উপলব্ধি এবং বিশ্বমানবতার মুক্তির লক্ষে সমাজের ও বিশ্বের রূপান্তর ঘটানো। কিন্তু কিউবা তা নয়। ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে বিপ্লব বুর্জোয়া অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্কের বন্ধন ছিন্ন করেনি।

১৯৫৯ সালের আগে কিউবা “একক চাষের” মধ্যে থেকেছে : যার অর্থনীতি বিশ্ববাজারে চিনি উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল ছিল এবং এটা ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কতৃত্বাধীনে। এই অর্থনীতির উত্তরাধিকার হিসেবে কাস্ত্রো পুরাতন অর্থনীতির আমূল পরিবর্তনে কিউবার জনগণকে সংগঠিত করতে পারেন নি। যার ফলে, কিউবার নেতৃত্বে একটি “দ্রুত নিষ্পত্তিকারী দৃষ্টিভঙ্গি” চিনিই ছিল কিউবার অর্থনীতির রাজা। এর ফলে কিউবার অর্থনীতি বিশ্ববাজারে জিম্মি থাকতো। কিন্তু কিউবার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পটপরিবর্তনের ফলে কিউবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বদলে তৎকালীন সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদকে বেছে নেয়, তার চিনি বিক্রির বাজার ও ঋণের উৎস হিসেবে। উল্লেখ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন গত শতাব্দীর পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক সমাজ থেকে সরে দাঁড়ায়।

কিউবার অর্থনীতি পরনির্ভরশীল ও বিকৃত থেকেছে। কিউবা নিজের খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা মেটাতে পারেনি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিউবার কাস্ত্রো সরকার হাজার হাজার শ্রমিক ও শ্রমশক্তিকে চতুর্মুখী সমাজ রূপান্তরে প্রয়োগ করতে পারেনি এবং বিশ্ববিপ্লবকেও এগিয়ে নিতে পারেনি। বরং পরনির্ভরশীলতা ও শোষণের সম্পর্কগুলো আগের মতোই বহাল রেখেছে। কিউবা এক ধরনের দমনমূলক কল্যাণকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যা জনগণের ক্ষমতায়নে বিরত রাখে এবং অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের পুঁজিবাজারের অধীনে থাকে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় থেকে কিউবান নেতৃত্ব নতুন নির্ধারণী নীতি অনুসন্ধান করে। পর্যটন প্রসারণ ছিল বিরাট উত্তুঙ্গে। পতিতাবৃত্তির পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল এক সামাজিক প্রপঞ্চ বা ব্যাধি হিসেবে। বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হয়েছিল প্রাকৃতিক সম্পদের ধ্বংস ডেকে আনতে। উপরন্তু বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য পতন ভেনিজুয়েলার অর্থনীতিকে পতনের গহ্বরে ছুড়ে দেয় – যা কিউবার অর্থনীতিতে নতুন চাপের সৃষ্টি করে। এমন ব্যবস্থা কোনোভাবেই সমাজতন্ত্র নয়।

অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা: যুক্তরাষ্ট্রীয়-স্টাইল স্বাধীনতার সুবিধাসমূহ

সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট মতবাদ এবং অঢেল সুবিধা পাওয়ার জন্য প্রচারমাধ্যম ক্রমাগত যে উপাখ্যান সৃষ্টি করছে, তা “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রীয় পদ্ধতিতে স্বাধীনতার সুবিধাসমূহ”-এর ভাবনা অনুসারে কিউবার জনগণের কাছে পৌঁছে যাবে।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব এবং সামাজিক মাধ্যমে তথ্য পেতে বিনামূল্যে সুযোগ পাওয়া যায়? হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র “ইন্টারনেট স্বাধীনতার” সুযোগ দেয় – পৃথিবীর যে কোনো সমাজে বা ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রকে নিজ নাগরিকের উপর এতো ব্যাপক পরিসরে ও অনাকাঙ্খিত মাত্রায় নজরদারি চালাতে এর আগে দেখা যায়নি, যা চালাচ্ছে এনএসএ-সহ অন্যান্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা।
কাস্ত্রোর দমনমূলক “পুলিশি রাষ্ট্রের” পরিবর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের “আইনের শাসনমূলক” রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে দেখুন – যে ব্যবস্থা কালো ও লাতিনদের ওপর পুলিশের নৃশংসতাকে, হত্যাকাণ্ডকে এবং ব্যাপক কারাদণ্ডে দণ্ডিত করাকে বৈধতা দেয়। যদি বলা হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গুয়ান্তোনামোর বন্দিদের প্রতি “মানবাধিকারের পরাকাষ্ঠা” রক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল – যেমন, বিনা বিচারে অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখা, জলযানে বন্দি করা, নিদ্রাহীন বঞ্চনা সহ্য করা এবং জোর করে উত্যক্ত করা।

“ক্ষমতায়নের হাতিয়ার” হিসেবে বাজারকে “উদ্যোক্তার আকাঙ্ক্ষায়” প্রসারিত করা? হাইতির দিকে তাকান এবং দেখুন, স্থানীয় জীবিকা ধারনের কৃষি, চাল এবং শূকর উৎপাদন ছিল অবারিত-সীমাহীন। কিন্তু সেগুলো ধ্বংস হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার দ্বারা। হন্ডুরাসের দিকে তাকান, গুয়েতেমালার দিকে তাকান অথবা বাংলাদেশ! নারী শ্রমিকদের জিজ্ঞাসা করুন, অতিকায় লাভজনক সোয়েটশপ বা ঘামঝরা কর্মশালা-র শোষণ সম্পর্কে – যে কারখানাগুলো চলে কয়েদিখানার মতো, যেগুলো মৃত্যু ফাঁদও বটে।

প্রকৃত বিপ্লব

কিউবার জনগণ ১৮৯৮ থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ আধিপত্য দ্বারা দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছেন। তারপর ৫০ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ, সামরিক আগ্রাসন, হুমকি এবং হস্তক্ষেপ চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বৈধতা নেই অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে কিউবাকে বিচ্ছিন্ন করার। কিউবা-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের পুনঃসূচনা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক নির্দেশিত, যা কিউবার জনগণের জন্য কোনো ইতিবাচক বার্তা বয়ে আনে না।

প্রকৃত বিপ্লব করতে কী প্রয়োজন কিউবায় এবং গোটা দুনিয়ায়? একটি মুক্তির বিপ্লব, যার লক্ষ সকল শোষণ-নির্যাতন, সব অত্যাচারী সম্পর্ক এবং ধ্যান-ধারণা সমূলে উৎখাত করা, যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক-সামাজিক আন্দোলন ও ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকে। মানবজাতিসমূহের জন্য, যেখানে নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি করা হয়েছে সত্যিকার সমৃদ্ধি আনয়নে। আজকের পৃথিবীতে এ-চ্যালেঞ্জ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটাই একমাত্র বিকল্প, যা বর্তমান ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে পারে। আর তা খুবই সম্ভব।।

নোট: যুক্তরাষ্ট্রের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি-র মুখপত্র ‘রেভলিউশন’ ম্যাগাজিন অবলম্বনে লিখিত।  

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s