লিখেছেন: শাহ্জাহান সরকার

1004863_10206878705819702_2597906129812456238_n২ জানুয়ারি, ২০১৭ সাল মাওবাদী নেতা সিরাজ সিকদারের ৪২তম মৃত্যু দিবস। ১৯৭৫ সালের এ দিনে তিনি তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের হাতে বন্দি অবস্থায় শহীদ হন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩১ বছর। এই স্বল্প বয়সে সম্ভাবনাময় এ নেতার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা হয়। সিরাজ সিকদারের মৃত্যু দেশে এবং আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক মহান নেতার অকাল তিরোধান, যা আমাদের দেশে এবং বিশ্ববিপ্লবে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে এনেছে। তাঁর মহান আত্মত্যাগ কোনোভাবেই ভুলবার নয়।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সিরাজ সিকদার ছিলেন অকুতোভয় এক মহান ও বিপ্লবী মুক্তিযোদ্ধা। বুদ্ধিদীপ্ত এ গেরিলা যোদ্ধার অসাধারণ ভূমিকা তাঁকে অমর এবং অনুসরণীয় করে রেখেছে। বিপ্লবপাগল এ বীর গেরিলা যেমন যুদ্ধের মাঠে ছিলেন নির্ভ, তেমনি রাজনৈতিক তত্ত্ব অধ্যয়নগবেষণা পরিচালনা করা, শ্রমিককৃষকের মাঝে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলা এবং তাতে নেতৃত্ব দেয়া খুব অল্প বয়সেই তিনি রপ্ত করেছিলেন।

তুরস্কের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মহান নেতা ইব্রাহিম কাইপাকায়া, পেরুর কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হোসে কার্লোস ম্যারিয়েতে গুই, এমন দুই ক্ষণজন্মা নেতা ভারতের নকশাল নেতা শহীদ কমরেড চারু মজুমদারের সাথে সিরাজ সিকদারের নাম বিশ্বকমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এঁদের অবদান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

এ মহান নেতা জন্মেছিলেন এক মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ও সরকারি চাকরিজীবী পরিবারে। দিনটি ছিল ১৯৪৪ সালের ২৭ অক্টোবর। তাঁর শিক্ষা জীবনও ছিল উজ্জ্বল। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে তিনি প্রথম স্থান দখল করেন। পরে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংগ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। এখানেও তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দেন এবং পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ লাভ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।

735219_10206878706019707_6001951291786763583_nগত শতাব্দীর মধ্যভাগে বিশেষত ষাটের দশকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তাল সময়ে তিনি এ দেশের প্রধানতম প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের অন্যতম সহসভাপতি ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্তির পর অল্প কিছুদিন চাকরি জীবনে জড়িত ছিলেন। তবে অচিরেই তিনি স্বাচ্ছন্দময় চাকরি জীবন পরিত্যাগ করেন এবং রাজনীতিতে সার্বক্ষণিকভাবে দায়িত্ব হাতে তুলে নেন। প্রাথমিকভাবে ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ)-এর মাধ্যমে এ দেশের আদি কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত থাকলেও মতাদর্শিক ও রাজনৈতিকভাবে তিনি দ্রুতই তা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেন।

চীনের সমাজতান্ত্রিক সমাজে অব্যাহত সংগ্রামের উলম্ফন মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবর ঢেউ তাঁকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। কিন্তু ষাট দশকের মধ্যভাগে সোভিয়েত ইউনিয়ন রাশিয়ায় সংশোধনবাদী ক্রুশ্চভ ক্ষমতা দখলের মধ্যদিয়ে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াকে পুঁজিবাদে অধঃপতিত করলে প্রথমে লেবার পার্টি অব আলবেনিয়ার শীর্ষনেতা আনোয়ার হোজা এটার বিরোধিতা করেন চীনা পার্টি মাও সেতুঙের নেতৃত্বে ক্রশ্চভের বিরুদ্ধে মতাদর্শিক সংগ্রাম শুরু করলে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক শিবির বিভক্ত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সিরাজ সিকদার মাও সেতুঙের আদর্শের সৈনিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেন।

কমিউনিস্ট বিপ্লবের মহান লক্ষে ১৯৬৭ সালে ঢাকার মালিবাগে তিনি “মাও সেতুঙ চিন্তাধারা গবেষণাগার” প্রতিষ্ঠা করেন। এর কিছুদিন পরে মাও সেতুঙ চিন্তাধারা অনুসারী একটি নতুন ধরনের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন “পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন”। সময়টা ছিল ১৯৬৮ সালের ৮ জানুয়ারি। এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও বিপ্লবের প্রস্তুতিমূলক সংগঠন। এই প্রস্তুতি সংগঠনের মাধ্যমে তিনি সশস্ত্র বিপ্লবের সূচনা করেন। ১৯৭০ সালের ৫মে তারিখে ঢাকাস্থ তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিকসাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান “পাকিস্তান কাউন্সিলে” বোমা হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে তিনি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে পাক বাহিনীর আকস্মিক আক্রমণের পরই তিনি ঢাকা ত্যাগ করে বরিশালে চলে যান এবং পেয়ারা বাগান এলাকায় মহান মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা ঘাঁটি গড়ে তুলেন। অবিলম্বেই তিনি তাঁর সংগঠন “পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন”কে ’৭১ সালের ৩ জুন তারিখে “পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি”তে রূপ দেন এবং পার্টির নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। পার্টির গাইড লাইন হিসেবে তিনি মার্কসবাদলেনিনবাদমাওবাদ (তখনকার মতে মাও সেতুঙ চিন্তাধারা) গ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নিয়মানুগ স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি নতুন করে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মাওবাদী আদর্শে বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলেন। এর ফলে তৎকালীন শাসকশ্রেণি ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। তারা এ সংগ্রামের উপর বর্বর হামলা চালায়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি কমরেড সিরাজ সিকদার তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের পুলিশমিলিটারির হাতে গ্রেফতার হন। এর একদিন পরেই তাঁকে বন্দী অবস্থায় হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের পর সরকারী প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল “পালাতে গিয়ে নিহত”, যে কথা কেউ বিশ্বাস করেনি। এ দিনে তাঁর অনুসারীগণ দেশব্যাপী ‘জাতীয় শহীদ দিবস’ পালন করে থাকেন।

(সিরাজ সিকদার রচনা সংগ্রহ: শ্রাবণ প্রকাশনীর প্রকাশকের কথা অবলম্বনে লিখিত)

Advertisements

মতামত জানান...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s